Wednesday, 14 December 2022

 #কমিকস_স্মৃতিকথা

(পর্ব ১ : বঙ্গীভূত বিদেশী কমিকসরা)
নিজের বইয়ের ভাণ্ডার গড়ে তোলা আমার শুরু হয়েছিল মোটামুটি ক্লাস ফোর ফাইভ থেকে। এর আগে রোববার রোববার বাবা বাজার সেরে আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে বাড়ি ঢুকতেন, আর আমি অমনি টুক করে খবরের কাগজের দুই নম্বর পাতাটা উল্টে নিচের বাঁকোণে জাদুকর ম্যানড্রেক আর অরণ্যদেবের কমিকসে চোখ বুলিয়ে নিতাম। সেই আমার কমিকসের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। কি করে যেন ধারণা হয়েছিল, এই দুটোই বড়দের কমিকস, তাই একটু রেখেঢেকে পড়তাম, যদিও বড়দের চোখ রাঙানি সইতে হয়নি কখনও। এরপর আনন্দমেলা হাতে পেতে আলাপ হলো কমিকসের দুনিয়ার রাজারাজড়াদের সঙ্গে।
প্রথমেই আসতো আর্চি। সূচীপত্রের কয়েকটা পাতা পরেই সোনালী চুল, শুঁয়োপোকা ভুরু আর গালভর্তি ব্রণর দাগ নিয়ে হাজির হতো এক ছটফটে কিশোর, আর্চিবল্ড অ্যান্ড্রুজ, সঙ্গে থাকতো তার অগণিত বান্ধবীরা, বেটি আর ভেরোনিকার নাম মনে আছে তাদের মধ্যে। মিস গ্রান্ডি বলে কোনও এক মধ্যবয়সিনী চরিত্র ছিলেন, আর্চিদের ক্লাসটিচার বা অমনি কেউ হবেন সম্ভবত। সত্যি কথা বলতে কি, বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, ডেট, এই শব্দগুলো সম্পর্কে ধারণা আমায় প্রথম দেয় আর্চির কমিকসের পাতাগুলোই। খুব যে পছন্দের চরিত্র ছিল তা বলব না, খানিকটা অকালপক্কই লাগতো তাকে আমার, তবে তার সদাহাস্যময় মুখখানা বেশ মনে আছে এখনও।
কমিকস শব্দটা মনে এলে বলতেই হয় টিনটিনের কথা। টিনটিনের প্রতি আমার মুগ্ধতা আজীবন থাকবে, সে সম্ভবত আমার প্রথম প্রেম। হার্জ ছদ্মনামের আড়ালে জর্জ রেমি নামে কোনও এক বেলজিয়ান ভদ্রলোক টিনটিনের জনক, এসব তত্ত্বকথা তখন জানতাম না, তখন কেবল আনন্দমেলায় টিনটিন পেলেই গোগ্রাসে গিলতাম, আর, ফিবছর বইমেলায় গিয়ে একখানা করে টিনটিনের বই বগলে বাড়ি আসতাম। আমার প্রথম কেনা টিনটিন কমিকস 'তিব্বতে টিনটিন'। সেই বইতেই জেনেছি বেলজিয়ান কিশোর আর তার অসমবয়সী দুই বন্ধুকে বাঙালিয়ানায় মুড়ে দিয়েছেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। সত্যি, তিনি দায়িত্ব না নিলে বোধহয় টিনটিনের পক্ষে বাঙালি মজ্জায় এভাবে মিশে যাওয়া একটু শক্ত হতো। আমরা জানতেও পারতাম না, ভয়ঙ্কর রেগে গেলে চেঁচিয়েমেচিয়ে উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে 'বিদঘুটে শশা, বেগুনি অক্টোপাস, অবিমৃষ্যকারী অলম্বুষ' ইত্যাদি বলে তেড়ে গালাগাল দিলে রাগ জুড়িয়ে জল হয়ে যায়। চুপিচুপি বলে রাখি, ইস্কুলে বন্ধুমহলে তো বটেই, এখন এই মাঝতিরিশে কত্তামশাইয়ের ওপরে গায়ের ঝাল ঝাড়ার দরকার হলেও আমি মনে মনে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের শেখানো বচনগুলোই আউড়াই, আর মনে মনে বলি, "কি জিনিস শিখিয়েছ গুরু!" ক্যাপ্টেনের হুইস্কিপ্রেমের কথা নিশ্চয়ই আলাদা করে আর বলতে হবে না, এমনই তার মাহাত্ম্য, যে, 'চাঁদে টিনটিন' না 'চন্দ্রলোকে অভিযান ' কিসে যেন তিনি হুইস্কির বশে ভেসে ভেসে মহাকাশযানের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলেন, "আমি এক ছোট্ট কোকিল, গাইছি কুহু কুহু'', মনে আছে? আর, তিব্বতে টিনটিনেই তো, ছোট্ট কুট্টুস অব্দি হুইস্কি টেস্ট করতে ছাড়েনি!
নাহ, ক্যাপ্টেন বড্ড বেশি জায়গা নিয়ে নিচ্ছেন, এবার একটু সিরিয়াস কথা হোক। আমার কেমন জানি মনে হয়, টিনটিন, আর আবোলতাবোল, এই দুটো বই যেন বইয়ের ভেতর আরেকটা বই। ছোটবেলায় যখন কম বুঝতাম, তখন এই দুটো বইয়েরই প্রতিটি লাইনের মহিমা ছিল একরকম, চুম্বকের মতো, শুরু করলে এক্কেবারে শেষ পাতা অব্দি পড়ে তবে থামতে হয়, বড় হয়ে আবার অনেকবার করে পড়ে দেখলাম, পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ব্যঙ্গের ছিটে, যা দেশকালের সীমা ছাড়িয়ে অতীব বিশ্বজনীন এবং প্রাসঙ্গিক। একটা ছোট্ট ছবির কথা মনে পড়ল, বলে নিয়েই অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবো।
'সোভিয়েত দেশে টিনটিন', টিনটিন ছদ্মবেশে সেখানকার সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা নিজের চোখে দেখতে গেছে, সেই নিয়ে লেখা 'দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ টিনটিন' সিরিজের চব্বিশটি বইয়ের প্রথম বই। সেখানে, সোভিয়েত দেশের এক কারখানায় নির্বাচন হচ্ছে, ভোট দিচ্ছেন শ্রমিকরা, আড়াল থেকে নজর রাখছে টিনটিন। একজন হোমরাচোমরা মানুষ চেয়ারে বসে হাঁক পাড়ছেন, "কে কে অমুক দলকে ভোট দেবে না হাত তোলো।" তাঁর দুপাশে দুই 'দাদা ', হাতের পিস্তল তাক করা ভোটারদের দিকে। বলা বাহুল্য, একটি হাতও উঠল না, নির্বিঘ্নে নির্বাচন সমাপ্ত হলো।
হুবহু এইরকম ছিল কিনা দৃশ্যটা, মনে নেই, তবে বক্তব্য এইরকমই ছিল।
টিনটিনের পর আসি আরেক প্রিয় কমিকস অ্যাস্টেরিক্স-ওবেলিক্সের কথায়। গোসিনি আর ইউদেরজোর কলমে-ছবিতে ওই দুই গল যোদ্ধা আর তাদের গ্রামের লোকের সঙ্গে যার একবার আলাপ হয়েছে, তার আর চিন্তা নেই, সে খোঁজ পেয়ে গেছে এক আজব দুনিয়ার। কে নেই সেই গ্রামে? সোনালী চুল আর ঝোলা গোঁফের বেঁটেখাটো যোদ্ধা অ্যাস্টেরিক্স, আদুরে গোলগাল চেহারার ওবেলিক্স যার পেশা মেনহির বানানো আর নেশা রোমান সৈন্য পেটানো, পুরোহিত এটাসেটামিক্স যার তৈরী জাদুপানীয় গল গ্রামটির বাসিন্দাদের যাবতীয় শক্তির উৎস, এক দরদী কিন্তু অত্যন্ত বাজে গাইয়ে কলরবিক্স যিনি কিনা দু'একবার স্রেফ গান গেয়ে রোমান সৈন্য ঘায়েল করেছেন, আর আছেন গ্রামের দলপতি বিশালাকৃতিক্স যাঁর একমাত্র ভয় আগামীকাল মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার, আবার নিজেই বলেন, "আগামীকাল কখনও আসে না।" ভারি ভালো লাগে এই কথাখানা। সত্যিই তো, আগামীকাল কক্ষনও আসে না, সব আগামীকালই শেষ পর্যন্ত 'আজ' হয়ে যায়!
এদের প্রতিটি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হতো রোমান সৈন্যদের হাত থেকে নিজেদের গ্রামকে রক্ষা করা। রোমান সেনারা সারা গলদেশ দখল করলেও এদের কাছে বারবার হেরে যেতো, সেই নিয়েই বোনা হতো কাহিনীগুলি। প্রতিটি নতুন অ্যাসটেরিক্সের গল্পের শুরুতে চরিত্রদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার স্টাইলটা আমার বেশ লাগতো। সবাই চেনা লোক, তাও বেশ সেই নতুন ক্লাসে উঠে দাঁড়িয়ে 'ইন্ট্রো ' দেওয়ার মতো একটা ব্যাপার মনে হতো। হয়তো অন্তর্নিহিত অনেক সত্যি কথা লুকিয়ে থাকতো প্রতিটি গল্পেই, যেমন সবেতে থাকে, কিন্তু সেসবে মন দিতে আমার ইচ্ছে করেনি কখনও। আমি মজে যেতাম ছবি আর সংলাপের ডিটেইলিং আর সরসতায়। অ্যাস্টেরিক্স বাংলায় অনুবাদ কে করেছিলেন মনে পড়ছে না, তিনি যে আমাদের জন্য রত্নখনির সন্ধান দিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। দুটো উদাহরণ দিয়েই চলে যাবো অন্য কমিকসের কথায়, নইলে কথার তোড়ে ভেসে যেতে হবে।
'অ্যাস্টেরিক্স ও ক্লিওপেট্রা' গল্পে, মিশর আর রোমের মধ্যে ধুন্ধুমার লড়াই বেধেছে, অ্যাস্টেরিক্স ওবেলিক্স আর এটাসেটামিক্স সেই যুদ্ধের সাক্ষী, পাঁচিলের এপারে একটি ত্রেব্যুশে (trebuchet) রাখা রয়েছে, তাইতে করে ভারি ভারি পাথর ছুঁড়ে ওপারে রোমান সেনাদের ছত্রভঙ্গ করা হচ্ছে। এক রোমান সৈন্য কোত্থেকে যেন উড়ে এসে সেই ত্রেব্যুশে-তে রাখা পাথরের ওপর আছড়ে পড়লেন, পরমুহূর্তেই পাথরটি ছোঁড়া হলো, ফলে পাথরের সঙ্গে উড়ে গেলেন। ঘটনাটি দেখে সাক্ষীদের আলোচনা :
"উড়েই এসেছিল"
"উড়েই গেল"
"একটু দম নিয়ে গেল।"
দ্বিতীয় উদাহরণ, কোনও এক যুদ্ধে নতুন এক রোমান সেনাপতি ব্যূহ গড়ার এক নতুন কৌশল কাজে লাগিয়েছেন, কৌশলটির নাম 'কচ্ছপব্যূহ'। কিরকম? না, একদল সেনা নিজেদের সামনে ঢাল ধরে একসাথে হেঁটে কচ্ছপের খোলের মধ্যে ঢুকে থাকার মতো একটা চেহারার দল নিয়ে গুঁড়ি মেরে এগোবে শত্রুপক্ষের দিকে। ভালো কথা, এগোচ্ছে 'কচ্ছপব্যূহ', পরের দৃশ্যেই দেখা গেল ঢালটাল ফেলে ব্যূহ ভেঙে সব সৈন্যরা দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। ছবিটির নিচে লেখা : পালানোর এই পদ্ধতির নাম 'খরগোশ '।
এবার বলি গাবলুর কথা। লাল গেঞ্জি কালো প্যাণ্ট গায়ে একটি নিরীহ ন্যাড়ামাথা বালক, যে কক্ষনও কথা বলত না, গুড়গুড় করে হেঁটে এদিক-ওদিক যেতো, আর ইশারায় সব বক্তব্য বুঝিয়ে দিতো। সে ভারি ভালো ছেলে, তাকে বড়রা কেউ চোখ রাঙায় না, কোথাও কোনও ভাঙা খেলনা গাড়ি পেলে সেটাকে সারিয়ে নিয়ে সাঙ্গোপাঙ্গোসমেত সেই গাড়ি নিয়ে আমোদে মেতে ওঠে, আবার কখনও রাস্তার ম্যানহোলের ভেতর ঢুকে কাজ করা লোকটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়, কিংবা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির সাহায্যে নানা ছোটখাটো সমস্যার সমাধান বের করে। সে বেশ উঁচুদরের পর্যবেক্ষকও। সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না, এমন অনেক তুচ্ছ ঘটনাও তার চোখে দিব্যি ধরা পড়ে যায় দেখতাম। অ্যাদ্দিন বাদে গাবলুর কথা মনে পড়ল, স্মৃতি ঠিক কথা বলছে কিনা মিলিয়ে নিতে উইকিপিডিয়ার দ্বারস্থ হলাম। সেখানে দেখলাম কার্ল টমাস অ্যান্ডারসনের 'হেনরি' অর্থাৎ আমাদের গাবলু কোনও এক সময়ে নাকি কথা বলা চরিত্র হিসেবেও জায়গা পেয়েছিল কমিকসের বইয়ে। ভালো লাগল না জেনে। বাকি সবাই তো কথা বলেই, গাবলু না হয় নিঃশব্দেই কাজ সারুক নিজের মতো করে, ভালোই তো!
গাবলু এল যখন, আরেকজনও আসুক, যদিও স্বভাবে সে পুরোপুরি উল্টো। বলছি ডেনিসের কথা। সোনালি চুল ঝেঁপে এসেছে কপালে, পরনে ঢোলা একখানা প্যান্ট, তার কর্মকান্ডে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে বাড়িতে আর পড়শিমহলে। ইস্কুলে ছুটিছাটা থাকলেই হয় সে তার বন্ধু জুটিয়ে নানান পাড়াতুতো অভিযানে বেরোয়, নয়তো প্রতিবেশী মি. উইলসনের বাড়িতে গিয়ে ঘাঁটি গাড়ে। মিসেস উইলসন (নাম বোধহয় মার্থা?) তাকে খুবই স্নেহ করেন, রান্নাঘর থেকে যথেচ্ছ কুকি নিয়ে খেয়ে ফেললেও কিচ্ছুটি বলেন না, কিন্তু মিস্টার উইলসনের পক্ষে ডেনিসকে সয়ে নেওয়া একটু মুশকিল হয়ে যায়। কখনও তিনি বালখিল্য নানা চ্যালেঞ্জে ওই ক্ষুদে দস্যুর কাছে হেরে যান, নয়তো তাঁর দরকারী কাজের সময়ে হাজির হয়ে ডেনিস তাঁকে তিতিবিরক্ত করে তোলে। তবে সময় কেটে যায়। সময় কেটে যেতো আমাদেরও, দস্যি ডেনিসের কীর্তিকলাপ পড়তে পড়তে। আনন্দমেলার পাতায় দস্যি ডেনিস এখনও আসে।
এরপর যে দুজনের কথা বলব, তাঁরা আমার পূর্বপরিচিত, অনেকটাই ছোটবেলায়। প্রথমজন হলেন রোববারের কাগজের দুইয়ের পাতার নিচের কোণের সেই অরণ্যদেব, আর দ্বিতীয়জন হলেন টারজান। লি ফকের সৃষ্ট ফ্যাণ্টমই যে আমাদের বাঙালী অরণ্যদেব, সেকথা বহুদিন পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করিনি। ভাবতাম ফ্যাণ্টম আসলে অরণ্যদেবের আদলে তৈরি অন্য একটি চরিত্র। ভদ্রলোককে বাঙ্গালী ভাবার একটা জোরদার কারণও ছিল, মনে পড়েছে। অরণ্যদেবের বিচরণক্ষেত্র ছিল বাঙ্গালার জঙ্গল, ভেবেছিলাম আসলে ওটা 'বাঙলা'র জঙ্গলই হবে, বইয়ে ভুল করে একটা বাড়তি 'আ'কার দেয়।
সে যাকগে, মোটকথা এই কমিকসটি নিয়ে ভাবতে বসলেই চিতার চেয়েও ক্ষিপ্র অরণ্যের প্রবাদপুরুষ অরণ্যদেব, তাঁর স্ত্রী ডায়ানা, পিগমিদের দলপতি গুরান, বিষমাখানো তীর, তাঁদের খুলিগুহা, দুই ক্ষুদে শিশু কিট আর হেলোয়েজ, ভিলেনদের চিবুকে অরণ্যদেবের সেই বিখ্যাত খুলিচিহ্নের দাগ, কিলাউইয়ের সোনালী বেলাভূমিতে ওদের ছুটি কাটাতে যাওয়া, দুই পোষা ডলফিন সলোমন আর নেফারতিতির পিঠে চেপে কিট হেলোয়েজের জলবিহার সব কেমন সারি দিয়ে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। অভিযানগুলোর ডিটেইলস তেমনভাবে এখন আর মনে নেই, তবে অরণ্যদেব যখন শহরে যেতেন পা অব্দি ঢাকা একখানা ওভারকোট পরে, পাশে হেঁটে যেতো গম্ভীর নেকড়ে ডেভিল, আর তাঁকে সবাই 'মি: ওয়াকার ' নামে সম্বোধন করত, তখন ভারি আশ্চর্য লাগতো। সব মিলিয়ে অরণ্যদেবের জাদুতে মেতে ছিলাম বহু বছর। তবে, এই কমিকসের ছবিগুলো কেমন যেন কালচে অন্ধকারে ঢাকা মতন হতো, রংচঙে নয়, এটা একটু অসন্তোষের বিষয় ছিল আমাদের।
টারজানের সঙ্গে আমার আলাপ অক্ষর চেনার বয়সের এক্কেবারে শুরুতে। 'টারজান' শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে একটি ফর্সামতো যুবক, ভারি সুঠাম চেহারা, সে একটা অতিকায় সিংহের ঘাড় গলা চেপে ধরে তাকে ছুরি মারতে উদ্যত। একটা পাতলা মতো বই ছিল মামারবাড়িতে, সম্ভবত লীলা মজুমদারের অনুবাদ, বাবা রে, তার পাতায় পাতায় সে কি ছবি আর বর্ণনা! ওই ক্ষুদে বয়সেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতো উত্তেজনার চোটে। তা, টারজানের জীবনকাহিনী মোটামুটি ওই বইতেই পড়া হয়ে গিয়েছিল, কিভাবে সে ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে জঙ্গলে এসে পড়েছিল, কেমন ছিল তার জীবনযাত্রা, রোজকার অভিযান, তাই আনন্দমেলায় অত মন দিয়ে আর পড়িনি। ছবিগুলোয় আঁধারের আধিক্য এই কমিকসেরও একটা সমস্যা ছিল, সেকারণেও কিছুটা অবহেলা করতাম বোধহয় টারজান কমিকসকে। মনে করতে গিয়ে দেখছি, প্রায় কোনও ছবিই মনে নেই। অথচ সেই ছোটবেলার বইয়ের টারজান যেদিন কিসব কাগজপত্র ঘেঁটে তার জন্মের ইতিহাস জানতে পেরেছিল, সেই জায়গাটা পড়ে হাপুসনয়নে কেঁদেছিলাম, এটা দিব্যি মনে আছে। টারজানের প্রেমিকা অথবা স্ত্রীর নাম মনে পড়ছে না, জেন কি?
জেন বলতে মনে পড়ল, সব্বোনেশে জেন-কে চেনেন? লাকি লুক-কে? আমাদের অভিষেক মনে করালো তার কথা। 'লাকি লুক আর সব্বনেশে জেন' বলে একটা বই ছিল আমার কাছে, অভিষেকও ওই একটাই বই পড়েছে বলল লাকি লুক সিরিজের। উইকিপিডিয়ার কাছে যেতে লাকি লুক সম্পর্কে আমার ধারণাই বদলে গেল! বেলজিয়ান কার্টুনিস্ট মরিস-এর তৈরি চরিত্র লাকি লুক নাকি বেজায় ওস্তাদ বন্দুকবাজ, বিভিন্ন প্রজাতির গুণ্ডাদের পিছু ধাওয়া করে বেড়ানো তার কাজ। আমি তাকে সব্বোনেশে জেন কমিকসে নেহাতই নিরীহ ছোকরা হিসেবে দেখেছিলাম যে! কি অন্যায়!
তবে সব্বোনেশে জেনের ব্যক্তিত্ব আর দাপটের নিচে সম্ভবত লাকি লুকের প্রতিভা চাপা পড়ে গিয়েছিল। মার্থা জেন ক্যানারি নামে এক মহিলা আমেরিকান যোদ্ধা ছিলেন, ভয়ানক ডাকাবুকো, নেটিভ আমেরিকান ইন্ডিয়ান গুন্ডাদের শায়েস্তা করতে ওস্তাদ ছিলেন। তাঁরই আদলে সৃষ্ট এই সব্বোনেশে জেন। প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী মানুষ। এর আগে কমিকসে যত মহিলা চরিত্র দেখেছি তাঁরা বেশিরভাগই বড্ড হিরোনির্ভরশীল। এই মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়ে সেকারণে বড় আরাম হয়েছিল। কেমন সুন্দর ঘোড়ায় চেপে টগবগিয়ে বন্দুক বাগিয়ে গুণ্ডা তাড়িয়ে বেড়াতেন। আহা, দেখেও সুখ! এঁর কথা লিখতে বসে আমাদের আশাপূর্ণা দেবীর সত্য আর ঘেঁটুর কথা মনে পড়ে গেল। নাহ, আজ নয়, তাদের কথা অন্য কোনওদিন হবে।
একজোড়া ভাইবোনের কথা মনে পড়ল, একটু বলে নিয়েই চুপ করব। টিনটিন-স্রষ্টা হার্জের আরেক সৃষ্টি জো জেট জোকো। আনন্দমেলার পাতাতেই আলাপ, তাদের একটাই অভিযানের কথা মনে আছে। একটা ছোট্ট এরোপ্লেন হুট করে একলা একলা চালিয়ে দুই ভাইবোন জো জেট আর তাদের পোষা শিম্পাঞ্জী জোকো পৌঁছে গেল একটা নির্জন বরফঢাকা দ্বীপে। তারপর সেই দ্বীপে অভিযান আর তাদের উদ্ধার করে আনার গল্প। বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন বোধহয় পৌলমী সেনগুপ্ত। ভালো লাগতো বেশ, মাঝেমধ্যে ওরকম প্লেন চালিয়ে বেরিয়ে পড়তেও ইচ্ছে করতো, জো আর জোকো জোগাড় হয়নি, ফলে এই জেটের সে ইচ্ছেও আর পূরণ হয়নি।
May be an image of 1 person

Tuesday, 3 November 2020

বইয়ের কথা : Thinking in Pictures : My Life with Autism : Temple Grandin



বই : Thinking in Pictures : My Life with Autism

রচনা : Temple Grandin

প্রকাশক : Vintage Books


বইটি পড়ার জন্য সাজেশন পেয়েছিলাম NIMHANS ব্যাঙ্গালোরের একজন ডাক্তারের কাছে। আমাদের মেয়ের বিহেভেরিয়াল চেঞ্জ শুরু হওয়ার পর যখন NIMHANS-এ যাই, ওঁরা জানিয়েছিলেন, হতেও পারে আমার মেয়ের হাই ফাংশনিং অটিজম আছে। নিশ্চিত না হতে পারার কারণ, ওর যাবতীয় অসুবিধা, স্পিচ রিগ্রেশন, ডিলে ইন রেসপন্স, ল্যাক অফ আই কনট্যাক্ট, ভেরি শর্ট অ্যাটেনশন স্প্যান, সবই শুরু হয় চার বছর হওয়ার পর, বড় স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে, ফর্ম্যাল স্কুলিং শুরু হওয়ার পর। তার আগে ও পুরোদস্তুর কনভার্সেশন চালাতে পারতো, সব কাজে অত্যন্ত উৎসাহী ছিল, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে ভালবাসতো। এর প্রত্যেকটি অভ্যেসই ধীরে ধীরে একেবারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। 


মেয়ের ব্যাপারে এখানে বেশি বলছি না, বিশদে লেখার ইচ্ছে আছে, অন্য কোনওদিন লিখব। আজকের লেখার উদ্দেশ্য Thinking in Pictures : My Life with Autism বইটির ব্যাপারে কথা বলা। অভিজ্ঞ অনেক অভিভাবকরা হয়তো এই বই তাঁরা পড়েছেন। যাঁরা পড়েননি, তাঁদের অনুরোধ করব পড়ে দেখতে। লেখিকা টেম্পল গ্র্যাণ্ডিন একজন প্রাণিবিদ। এবং তিনি একজন 'অটিজম স্পোকসপার্সন'। অটিজম স্পেকট্রামে থাকা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তিনি অন্যতম একজন, যিনি নিজের ছোটবেলার এবং বড়বেলার বহু অভিজ্ঞতার কথা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। এমনই একটি বই হলো 'Thinking in Pictures'.  অটিজমকে বোঝার ইচ্ছে এবং দায়িত্ব, স্পেকট্রামে থাকা মানুষদের বোঝার ইচ্ছে এবং প্রয়োজনীয়তা যাঁদের রয়েছে, তাঁদের কাছে এই বই অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে। 


বিভিন্ন ধরনের সেন্সরি প্রবলেম অটিজম স্পেকট্রামের সঙ্গে প্রায়শই জড়িয়ে থাকে, সেসব ইস্যুর লেভেল নানারকমের হয়, বলা চলে এক্সট্রিমলি মাইল্ড টু এক্সট্রিমলি সিভিয়ার। সাধারণ অভিভাবকদের পক্ষে সমস্যাগুলিকে চিনতে পারা সম্ভব হলেও সেসব সমস্যার কারণ ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে, সেটা বোঝা সম্ভব হয় না। কারণ বাচ্চা নিজেও বুঝতে পারে না সমস্যাটা কোথায়, অন্যকে বোঝাতে তো পারেই না। চিকিৎসক এবং থেরাপিস্টের পরামর্শে, এবং ট্রায়াল অ্যাণ্ড এরর মেথডে অন্ধকারে হাতড়ে বাবামাকে এগোতে হয়, ম্যানেজমেন্টের উপায় খুঁজতে হয়। গ্র্যাণ্ডিন তাঁর বইয়ে বিভিন্ন সেন্সরি প্রবলেম উল্লেখ করে করে বুঝিয়েছেন সেসব সমস্যার কারণ, এবং ম্যানেজমেন্টের সম্ভাব্য উপায়, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। তাঁর নিজের, এবং স্পেকট্রামে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে প্রতিটি সমস্যার উদাহরণ হিসেবে।  


কেবল প্রবলেম ম্যানেজমেন্টই নয়, স্পেকট্রামে থাকা একটি বাচ্চার স্ট্রেংথকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে তার শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাও গ্র্যাণ্ডিন বুঝিয়েছেন নিজের স্কুলজীবন ও কলেজজীবনের অভিজ্ঞতা (সুখকর এবং তিক্ত দুরকমই) উল্লেখ করে করে, যে অভিজ্ঞতা আমার মনে হয় প্রত্যেক অভিভাবকদের জন্য খুবই কাজের। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, গ্র্যাণ্ডিনের লেভেল হাই ফাংশনিং, তাঁর যা যা স্ট্রেংথ ছিল বা আছে, ততটা সবার নাও থাকতে পারে, কিন্তু যার যতখানি স্ট্রেংথ রয়েছে ততখানি নিয়েই তো আরও কিছুটা এগোনো যায়, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যায়! সেটাই গ্র্যাণ্ডিন তাঁর বইতে বারবার বোঝাতে চেয়েছেন।


তাঁর ছোটবেলার গল্পে এসেছে তাঁর মা এবং পরিবারের অন্যান্যদের ক্রমাগত লড়াই। গ্র্যাণ্ডিনের বোঝার ক্ষমতা, নিজের শক্তি এবং দুর্বলতাকে চিনতে পারার ক্ষমতা, সে তো একদিনে আসেনি, নিজের দুর্বলতাকে সঙ্গে নিয়ে, তাকে পেরিয়ে গিয়ে কেমন করে নিজের লড়াইটা লড়তে হয়, সেটা শেখার ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন তাঁর মা। আমরা মনে রাখব, গ্র্যাণ্ডিনের জন্ম ১৯৪৭-এ। সেই সময়ে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতার ব্যাপারটা আঁচ করা যাচ্ছে নিশ্চয়ই? লড়াই তাঁরা করেছেন সেই যুগে দাঁড়িয়ে। সেকারণেই আমাদের সবার আরও বেশি করে গ্র্যাণ্ডিনের কথা জানা প্রয়োজন।


সবশেষে একটা কথা বলি, মেয়ের অটিজম আছে, নাকি লার্নিং ডিসএবিলিটি, নাকি ট্রমা বা অন্য কিছু, এসব নিয়ে অহরহ উদ্বেগে ভুগতে থাকা মা হিসেবে নয়, একজন সাদামাটা পাঠিকা হিসেবেও যদি বইটার কথা ভাবি, তাহলেও বলব, এই বই কোনও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। কারণ এই বই আমাদের সঙ্গে পরিচয় করায় এমন এক জগতের সঙ্গে, যার সঙ্গে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিচিত হচ্ছেন বা হয়েছেন নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, বাকিরা এখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারে। অজানাকে জানার টানেই তো পাঠক বই হাতে তুলে নেয়, তাই না?

Wednesday, 19 August 2020

বইয়ের কথা : রুকুর গ্যালাক্সি

 

বই : রুকুর গ্যালাক্সি

লেখা আর ছবি : বিনায়ক রুকু

প্রকাশক : গুরুচণ্ডা৯

মূল্য : ১৫০ টাকা


থ্যাঙ্কস রুকু, হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। 

চেনা ছকে বাঁধা সাদা কালো রাত আর সাদা কালো মুখমুখোশের ভিড়ে একটা রঙিন কোলাজে সাজানো গ্যালাক্সির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে তুমি, আদর নিও। তোমার বই হাতে পেয়েছি অনেকদিন হলো, কিন্তু বইয়ের প্রতিটি শব্দ আর ছবিকে ছুঁয়ে দেখব বলে আলাদা করে রেখেছিলাম, আজ বসার সময় হলো। 

কেমন লাগল তোমার বই? এক কথায় যদি বলতে হয়, তোমার ভাষা ধার করেই বলি, রুকুর গ্যালাক্সির সঙ্গে আলাপ করে আমার আনন্দরাও লম্বা লম্বা পা ফেলছে। দীপাবলির রাতে এক বারান্দা গ্যালাক্সি আর স্পেসম্যান তুমি, জানলা খুললেই বিছানায় চলে আসা তোমার আইসক্রিম কুয়াশারা, লণ্ডনের রাস্তায় রিষড়ার ম্যাপ বসিয়ে টেমস আর গঙ্গাকে তোমার মিলিয়ে দেওয়া, তোমার চাঁদের কারশেড, সবকিছু পড়ছি আর ভাবছি, আমরা যারা লিখতে পারলে ভাল থাকি, তারা যেমন যেমন ভাবনাকে কলমে ধরব বলে নিয়ত সংগ্রাম করে চলি, তেমন তেমন ভাবনাকে কী অনায়াসে তুমি লেখায় রেখায় ফুটিয়ে তুলছ! 

"ভালো music এই ছোট্ট ছোট্ট মাছের মত

ঝাঁক, ঝাঁক, ঝাঁক ঢুকছে। কানে।

বাজে Music Shark।"

এই উপমাকে কলমে আনতে তোমায় কতটা ভাবতে হয়েছে জানি না, জানি না এই উপমা তুমি তোমার সহজাত বোধ দিয়েই উপলব্ধি করতে পেরেছ কি না, তবে আমার মতো আরও অনেকের কাছেই একাজ যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য, হয়তো অসম্ভবও। তোমার ভাবনারা আরও অনেক লেখায় ছবিতে প্রকাশিত হোক, আমাদের ঋদ্ধ করুক, এই আশা রাখি। তোমার আরও বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম। ভাল থেকো।

আমার এ চিঠি বিনায়ক রুকুকে লেখা, তার দ্বিতীয় বইটি কিছুদিন আগে হাতে পেয়েছি, তার মা সুন্দর ব্যবস্থা করে পাঠিয়েছেন। ভেবেছিলাম চিঠিটি তার কাছে পাঠিয়েই লেখাটা শেষ করব, চিঠিটাকেই পাঠপ্রতিক্রিয়া ভেবে পড়ে যদি কারও ইচ্ছে হয়, 'রুকুর গ্যলাক্সি' বইটি কেনার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু বইটা পুরোটা পড়ে মত বদলাতে হলো। বইটায় রুকুর সৃষ্টি ছাড়াও আরও কিছু কথা আছে, যা সবার জানা দরকার।

বিনায়ক রুকু সতেরো বছরের একটি ছেলে, নিজের ভাবনাকে লেখায় রেখায় ফুটিয়ে তোলে। তবে তার নিজের একটা লড়াইয়ের গল্প আছে। অবশ্য লড়াই তো আমাদের সবারই জীবনে কমবেশি থাকে, তাই না? রুকুর লড়াইটা কেমন? আসুন, তার নিজের ভাষাতেই শুনে নিই একটু সেই লড়াইয়ের কয়েকটি লাইন :

"রুকু কথা বলতে গিয়ে গোছাতে পারেনা।

'খাতাতে গোছাতে পাঋ (পারি)', রুকু বলে।

অসুবিধে নেই। রুকুর। ওদের অসুবিধে।

যাদের, ওদের, তাদের, আমাকে বুঝতে হবে।"

আরেক জায়গায় রুকু লিখছে, তার রুকুবোটের কথা,

"রুকুবোটটাও একটু অটিস্টিক।

একা একা গান শোনে।

............

রুকুবোটকে কেউ আদর করে না। অটিস্টিক তাই।

পড়ার ঘরে একা বসে থাকে।

রুকুর কিছু হলেই, রুকুর কষ্ট হয়।"


রুকুর লড়াই কীসের সঙ্গে, বুঝতে পারছি কি আমরা? একাকিত্বের কারণ চিহ্নিত করার ক্ষমতা যখন আমার থাকে, অথচ সেই কারণ দূর করার ক্ষমতা আমার হাতে থাকে না, তখন ঠিক কতটা ব্যথা নিজের ভেতরে জমা হয়, উপলব্ধি করতে পারছি কি? যদি বুঝতে চাই, তবে সেই উপলব্ধিই আনার কাজটা করতে পারে 'রুকুর গ্যালাক্সি'। অটিজম স্পেকট্রামে আছে, এমন এক কিশোরের কলমে তুলিতে তার ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করবে 'রুকুর গ্যালাক্সি'। 

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার নিয়ে খুব যে স্বচ্ছ ধারণা সবার মধ্যে আছে তা নয়, জানার তাগিদও যে সবাই অনুভব করবেন তাও নয়, তবুও যদি কেউ জানতে চান, বুঝতে চান অটিজম স্পেকট্রামে আছে এমন এক কিশোরের সৃজনীশক্তিকে, এই বই তাঁর ভাল লাগবে। 

বইয়ের শেষ অংশে রুকুর মায়ের কলমে রয়েছে তাঁদের সংগ্রামের কথা। রুকুর যখন আড়াই বছর বয়স, তখন থেকে ধীরে ধীরে বোঝা গিয়েছিল তার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার রয়েছে। দৈনন্দিনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রুকুর মা বাবার প্ল্যানিং এবং ম্যানেজমেন্ট প্র্যাক্টিসের শুরু তখন থেকেই। রুকুর মা যেভাবে তাঁদের অভিজ্ঞতা লিখেছেন, আর কারও কাছে না হোক, অটিজম আছে এমন যেকোনও শিশুর বাবা মা অভিভাবকদের কাছে তা অপরিহার্য এবং অত্যন্ত শিক্ষণীয় একখানি গাইড বলে আমার মনে হয়েছে। 

বিনায়ক রুকুকে, তার অভিভাবকদের এবং প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই, 'রুকুর গ্যালাক্সি'র সঙ্গে আমাদের পরিচয় করানোর জন্য।

Sunday, 5 August 2018

পেরিয়ে এলেম : ধূপছায়া মজুমদার


"সত্যি বাপু, এরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝে না। নইলে অমন রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতীর মতো বউ তোর, মা দুর্গার মতো দশহাতে সংসার আগলাচ্ছে, তাকে ঘরের কোণে ফেলে ঐ পোড়া কাঠের টানে বারমুখো হোস কোন্ আক্কেলে? এ কেমন ছেলে পেটে ধরেছিলে বৌঠান?"

'বৌঠান'- এর সাদা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে জিভে আগল দিলেন ইচ্ছেপিসি। তবুও তাঁর বাণীর শেষাংশ তনয়ার কানে ঢুকে পড়েছিলো, শাশুড়িদের জন্য চা নিয়ে ঘরে ঢুকছিল সে। ঠোঁটে লেগে থাকা ব্র্যাণ্ডেড সর্বংসহা হাসিটা আরেকটু চওড়া করে চায়ের কাপটা পিসির হাতে ধরিয়ে "পিসি আজ তোমার নিরিমিষ তো? পোস্তবাটা একটু তুলে রাখতে বলেছি ছবিকে," বলে মৃদুমন্দ গতিতে দরজার দিকে পা বাড়ালো। ইচ্ছেপিসি পোস্তবাটায় নুন তেল আর কাঁচালঙ্কা মেখে ভাতের পাতে খেতে বড় ভালবাসেন। তাঁর শ্বশুরবাড়িতে আবার পোস্ত খাওয়ার চল একেবারেই নেই। তাই তিনি এবাড়ি এলেই তনয়া মনে করে মেনুতে পোস্ত রাখে। আলোচনার মুখটা ঘুরে গেল সুস্বাদু নিরামিষ রান্নার দিকে, মনে মনে হাঁফ ছাড়লেন সুলতা। নিজের ছেলের 'গুণগান ' শুনতে কারই বা ভালো লাগে!

অড়হর ডালটা হিং দিয়ে সাঁতলাতে বলে তনয়া নিজের ঘরে এলো। মাসকাবারি মুদিখানা আর ওষুধের বাজার কালকেই সেরে এসেছে। রান্নাঘরের জিনিসগুলো গুছোনো হয়েছে রাত্তিরেই, ওষুধগুলো দুপুরে গুছোবে, এখন শাশুড়ির ওষুধের বাণ্ডিল নিয়ে ওঘরে ঢুকলেই পিসির গুষ্টির অসুখের সাতকাহন শুনতে হবে, আর কবে কোন ডাক্তারকে উনি কি ওষুধ সাজেস্ট করে সুফল পেয়েছেন তার গল্পও গিলতে হবে। তার চেয়ে এখন বরং তেল সাবানগুলো গুছিয়ে রাখা যাক।

কিন্তু মন বসছে না যে! মনের মধ্যে এ দেওয়াল ও দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইচ্ছেপিসির কথাটা, "দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম এরা বোঝে না।" ঠিকই তো, না থাকলে তবেই তো তার মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়! বোঝা যায়, যা নেই তা ঠিক কতটা আপনার ছিল। কিন্তু যা নেই, তাকে যে আর ফেরানো যায় না। তখন কেবলই নিজের মনে গুমরে মরো, আর কপাল চাপড়াও!

তাহলে? কি করবে তনয়া? দিনের পর দিন বোঝা টেনে টেনে ক্লান্ত সে, নিজের সঙ্গে যুঝে কালকেই একটা চলনসই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছে, সেই সিদ্ধান্তেই অনড় থাকবে তো? মনের মধ্যে কথাগুলো নিয়ে লোফালুফি খেলতে খেলতে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে সাবান শ্যাম্পু গুছিয়ে রাখে তনয়া, কিছুটা আনমনে। হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে ওর, আলমারি খুলে বিয়ের অ্যালবামের ভেতর থেকে বের করে শাশুড়ির সারা মাসের ঘুমের ওষুধের পাতাটা, কাল রাতে এখানে এনে রেখেছিল, অ্যালবামটাকে এখন আর কেউ খোঁজে না, ভেবেছিল আজ কাজে লাগাবে। বাধ সাধছে ইচ্ছেপিসির কথাটা। জীবনে না থাকলে আর তার মর্ম বোঝা যায় কি?

ঠোঁটে সেই সর্বংসহা হাসিটা এঁকে নিয়ে শাশুড়ির ওষুধের বাণ্ডিলটা নিয়ে এঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওঘরের দিকে এগোয় তনয়া।।

(ধারাবাহিক : ক্রমশঃ প্রকাশ্য পেজে প্রকাশিত)

Monday, 30 July 2018

#লীলা_মজুমদারের_জন্মদিনে_শ্রদ্ধার্ঘ্য



লীলা মজুমদারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সম্ভবত 'এক বাকসো ভূত 'এর হাত ধরে। ছোটবেলায় বইমেলায় গেলে সময়ের অভাবে কোনওবারই লিস্টি মিলিয়ে বাছাই করা বই কেনার সুযোগ হতো না, সেই অভাব ঢাকতেই বোধহয় বাবা মা প্রত্যেকবার একটা করে 'কিশোর গল্প সঙ্কলন ' গোছের বই কিনে দিতেন। সেগুলোকে কিশোর সাহিত্যের মণিমুক্তোর আকর বলাই যায় অনায়াসে। এরকমই একটা বই 'এক বাকসো ভূত ' এ লীলা মজুমদার আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন, 'কর্তাদাদার কেরদানি ' গল্পের মাধ্যমে। সেই প্রথম আলাপের রেশ এমনই ছিলো যে তাঁর লেখনীকে এরপর আর আলাদা করে চিনে নিতে ভুল হতো না। কেমন সেই লেখনী, সে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না! আমার মনে হয় তাকে 'লেখনী ' না বলে 'গল্প বলার ধাঁচ ' বললে আরও ভালো লাগে, কারণ ওঁর লেখা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে কোনও 'লেখা ' পড়ছি। তিনি বৈঠকখানার ঠিক মধ্যিখানে, কিংবা বারান্দার কোণটিতে একটা মোড়া পেতে বসে আপন করা স্বরে বলে চলেছেন একটার পর একটা গল্প, আর আমরা, গল্পলোভীর দলবল, তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসে হাঁ করে গিলে চলেছি সেসব গল্প, এমন একটা অনুভূতি ফিরে ফিরে আসে তাঁর প্রতিটি লেখা পড়ার সময়।

লীলা মজুমদারের সাহিত্যকীর্তির কাছে আমি নানাভাবে ঋণী। তাই তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার সময় মনে হলো ঋণস্বীকারের এই বোধহয় উপযুক্ত সময়। প্রথমেই বলে রাখি, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির বেশিরভাগই আমার পড়া তথাকথিত শৈশব ও কৈশোর পেরনোর পর। আমার সারা ছোটবেলা জুড়ে ছিলো দিদা বম্মাদের বলা গল্পের দলেরা। গ্রীষ্মের অলস দুপুর, বর্ষার একঘেয়ে সন্ধে, শীতের নিঝঝুম রাত্তির, সবটুকু ভরে থাকতো তাঁদের বলা গল্পেরা। সেইসব গল্প সঙ্গে নিয়ে একে একে তাঁরা যখন চলে গেলেন, বড্ড একা হয়ে গেলাম। সেই মনে মনে একা হয়ে যাওয়া দিনগুলোতেই আমায় আগলে রাখলেন, ভরিয়ে রাখলেন লীলা মজুমদার। তাঁর বলে চলা গল্পগুলো শেখালো, হারায়নি, হারায়নি, কিচ্ছুটি হারায়নি, সব রাখা আছে বেশ করে চাবি দিয়ে, চাবি রয়েছে নিজের মনেই, যখন খুশি বের করে সেসব মণিমুক্তো নাড়াচাড়া করো, কেউ কিচ্ছু বলবে না। এমনটি বোঝালো তাঁর গুপি, তাঁর কুমু, বোগি, আর যত না-মানুষ সাঙ্গোপাঙ্গোর দলবল। তাই তো তিনি আমার বড় আপন।

সংসার করতে এসে আবিষ্কার করলাম কিচ্ছুটি জানি না, বিশেষ করে হেঁশেলের কাজ। ততদিনে এক মেয়ের মা হয়ে বসেছি, আর আমার মা পাড়ি দিয়েছেন অমৃতধামে। কম জ্বালানি খরচ করে ভাত সেদ্ধ করাই বলো, বা ঝোলে কাঁচালঙ্কার সুগন্ধ বেরুবে মনমাতানো, অথচ একফোঁটা ঝাল হবে না, কিভাবে, এসবের কিচ্ছু জানি না, বুঝতে পারলাম। আশ্রয় নিলাম লীলা মজুমদারের কোলেই, তাঁর 'রান্নার বই ' এর কাছে। যাঁরা বইটি পড়েছেন, আশা করি একমত হবেন, এমন সহজভাবে হেঁশেলের কারিকুরি শেখানোর হ্যাণ্ডবুক বড়ই বিরল। রন্ধনপ্রণালীর বইও সাহিত্যগুণে কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে, এই বই তার নিদর্শন। অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করি, 'কুটোটি ভেঙ্গে দুটো না করা ' আমায় সংসারের কাজ শিখতে সাহস জুগিয়েছেন লীলা মজুমদার।

কন্যারত্নকে সঙ্গ দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে খেয়ালবশে যখন আবার কলম ধরলাম অবসর সময়ে, তখন বোধহয় অবচেতনে কলকাঠি নেড়েছিলেন তিনিই, নইলে ছোটদের জন্য লিখতেই কেন এত ভালবাসি? ছোটদের জন্য গল্প লিখতে গিয়ে, এবং কন্যারত্নের রোজকার কাণ্ডকারখানা বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যখন শিশুমনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে বসি, তখনও আমায় দিশা দেখান তিনিই। তিনি এবং রায়পরিবারের আরও কয়েকজন দিকপাল সদস্য না থাকলে বোধহয় শিশুদের চোখ দিয়ে জগৎ দেখার অভ্যেস তৈরি হওয়া সম্ভব ছিলো না। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে পড়লে এক কিশোর মনে মনে বীরপুরুষ বিশু আর সিংহ কুকুরকে গড়ে নিয়ে টংলিং-এ আশ্রয় খোঁজে, কেন বাতাস বাড়ি আবিষ্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, 'ছেড়ে যাই ছেড়ে যাই ' করেও কেন সেখানে যেতে হলে সব্বাইকে নিয়েই যেতে হয়, পুজোয় নতুন জামা না হলেও আকাশে রামধনু এঁকে কিভাবে দিব্যি খুঁজে নেওয়া যায় অনাবিল আনন্দ, এসবই শিখিয়েছেন তিনি। আর শিখিয়েছেন জীবে প্রেম। তুমি যেমন এই সবুজ পৃথিবীর কাছে ভারি গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনই ওরাও, ওই বেড়াল ঘোড়া হাঁস মুরগী শেয়াল হাতি, ওরাও ঠিক একইরকম দরকারি এই পৃথিবীর কাছে, এই চিরন্তন সত্যি কথাটা এত সহজ ভঙ্গিতে সরসভাবে তিনি বারেবারে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ছোটদের সঙ্গে সঙ্গে তা বড়দেরও ভাবতে বাধ্য করে, ডুবতে বাধ্য করে আত্মসমীক্ষায়, ভুলগুলো আমরা বড়োরাই বেশি করি কিনা!

তাঁকে নিয়ে কথা শুরু করলে থামা যাবে না, তাঁর কীর্তিকে কলমে ধরি, এমন ক্ষমতাও আমার নেই। তবুও তাঁর অগণিত ভাবশিষ্যের একজন হয়ে তাঁর জন্মদিনে এই প্রার্থনা করি, যেন আজীবন তাঁর শিষ্যত্বটুকু বজায় রাখতে পারি।

****

#আধেক_ঘুমে

ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্য - kromosho prokashyo থেকে



#ধূপছায়া_মজুমদার

একটা ডায়েরি। সম্ভবত আর্চিজের, হ্যাঁ, সেই আর্চিজ গ্যালারির, কাদের যেন কথা অনুযায়ী একসময় যে আর্চিজ গ্যালারি আর ভালবাসা নাকি সমার্থক শব্দ ছিল, সেই আর্চিজ গ্যালারিরই নাম ছোট্ট করে খোদাই করা আছে ডায়েরিটার মলাটের পিঠের দিকে। ডায়েরিটার মলাটের ছবিটা দেখলেই কেন জানি মামারবাড়ির চিলেকোঠার বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে তাতানের। যদিও ডায়েরিটা সেখানে পাওয়া যায়নি, ওটা আসলে তাতানের পিসি শিরীনের ছিলো, দাদুর ঘরের বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে সেখান থেকে এক দুপুরে তাতান পেয়েছিল ডায়েরিটা, তাও হলো বছরখানেক। আঠেরো উনিশ বছর ধরে জিনিসটা কারও চোখে পড়েনি কেন কে জানে!

ডায়েরিটার হাল্কা মেরুন বর্ডার, সেই বর্ডারের মাঝে হলদেটে দেওয়ালের সামনে কাঠের মেঝেতে রাখা একটা বেতের ঝুড়ির ছবি, বেতের ঝুড়িটা আধখোলা হয়ে উপচে পড়ছে কার যেন জাঙ্ক জুয়েলারি আর জমিয়ে রাখা কিছু হলদেটে চিঠি, ছবিটা দেখলেই তাতানের মনে হয় মামারবাড়ির বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা। ওই ট্রাঙ্কটায় বম্মার বিয়ের বেনারসি আর দাদুর জন্মের খবর বয়ে আনা একটা চিঠি দেখেছিল তাতান, তারপর থেকেই কোথাও কোনও আড়াল থেকে পুরনো জিনিসকে উঁকি মারতে দেখলেই ওর ওই ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে যায়।

তা, তাতান যে ওর পিসির ডায়েরি নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ও কি জানে না অন্যের ডায়েরিতে হাত দিতে নেই, অন্যের ডায়েরি পড়তে নেই? শিরীন জানতে পারলে রাগ করবে না? তা সে একটু করে বোধহয় রাগ, তাতান খেয়াল করে দেখেছে, এই একবছরেও ও ডায়েরিটার নামের পাতা আর যে পাতায় একটা ফার্ণের পেন্সিল স্কেচ করা আছে, সেটা উল্টে আর ভেতরে ঢুকতে পারেনি। হয় দুচোখে নেমে এসেছে রাজ্যের ঘুম, নইলে হঠাৎ শুরু হওয়া যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে গেছে প্রায়, তাতানের সাইনাসের প্রব্লেম আছে, মাথাব্যথা সর্দি এগুলো ওর বারোমাসের সাথী। তবুও, ডায়েরির পাতা ওল্টানো আর সাইনাসের ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠার দিনগুলো মিলে যাওয়াটাকে ও ঠিক কাকতালীয় বলে মেনে নিতে পারে না। ও জানে, শিরীনের ডায়েরিটাকে ঘিরে থাকে এমন একটা কিছু, যার নাগাল কারও পাওয়া সম্ভব নয়।

পিসিকে তাতান শিরীন বলেই ডাকে, বাড়ির বাকি সবার কাছে শুনে শুনে ছোট থেকেই অভ্যেসটা হয়েছে। শিরীন ওদের সময়ে ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টদের মধ্যে একজন ছিলো। মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম হয়েছিল, শিরীনের ঝকঝকে চেহারা আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ বহুদিন পরেও ওর স্কুলের টিচার, নন টিচিং স্টাফ সবার মনে ছিল, কেউ কেউ বোধহয় এখনও মনে রেখেছে। কারণ, ওদের এই ছোট্ট শহরে রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই ইলাদিদা, তপতীদিদাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, ওর ঠাম্মিও শিরীনদের স্কুলেই ইংলিশ টিচার ছিলেন, সেই সুবাদে তাঁর কলিগরা সবাই তাতানের দিদা। তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করেন, তাতানের মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো। শিরীনকে স্পষ্টভাবে মনে না রাখলে তুলনাটা তাঁরা করতে পারতেন?

"তাতান, তাতান, উঠবি না? ডায়েরিটা খোলা রয়েছে যে টেবিলে, পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে হাওয়ায়, ধরবি না? আয়, পাতাগুলো ধুলো হয়ে যাওয়ার আগে নেড়েচেড়ে দেখে নে, আয়, আয়!"
ধড়মড় করে উঠে বসল তাতান। কে ডাকছিল ওকে? কোথায় ডায়েরি? বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালতেই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরিটা, ফরফর শব্দে পাতা উড়ছে, এক দুটো পাতা বোধহয় আলগা হয়ে এসেছে। হবে না? আঠেরো বছর কম সময় নাকি? তাতান তাড়াতাড়ি উঠে এসে পাতাগুলো গুছিয়ে তুলে রাখল ডায়েরির মধ্যে। কিন্তু ওকে ডাকল কে? গলাটা অচেনা, কিন্তু কথা বলার ধরনটা ঠাম্মির মতো, ডাকছিল এমন আপন করে, যেন কতজন্মের চেনা সে!

"মা, শিরীনের ভয়েস কেমন ছিলো? কথা বলতো কেমন করে?"
"এ আবার কি প্রশ্ন সকাল সকাল? নাও, কর্নফ্লেক্সের বাটি শেষ করে উদ্ধার করো আমায়। আমায় যা বললে বললে, ঠাম্মির সামনে নামটা ভুলেও উচ্চারণ করবে না। জানো তো সবই, তাও কেন কথার অবাধ্য হও!"

তাতান জানে, এবাড়িতে শিরীনের নাম উচ্চারণ করা, ওর ছবি দেখতে চাওয়া, ওর কথা জিজ্ঞেস করা সবই একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু তাতানই বা কি করবে? এতদিন ছোট ছিল, যে যা বলেছে শুনেছে, কিন্তু এখন বড় হচ্ছে ও, কৌতুহলও বড় হচ্ছে, নিজের পিসি, তার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করবে না মানুষের? আশ্চর্য! কিসের এত রাখঢাক তাতান বোঝে না।

"তাতান, তাতান, তুই জানতে চাস সব কথা? শুনতে চাস?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবটুকু জানতে চাই। ওরা কেন কিচ্ছু বলে না জানি না। তুমি বলবে?"
"বলব রে, সব বলব। বলব বলেই তো বার বার..."
"কিন্তু তুমি কে? তোমায় দেখলে কেন মনে হয় আয়না দেখছি? কিন্তু চিনতে পারি না! কে তুমি?"
"হি হি হি, আমি তোর আয়না? নাকি তুই আমার চোখ?"

"তাতান, অ্যাই তাতান, ওঠ ওঠ, অনেক বেলা হয়ে গেল, এক্ষুনি মামারা এসে পড়বে মা।"
ঘুমটা ছিঁড়ে গেল মায়ের ডাকে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটাও ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল। কি যেন একটা ধরতে চাইছিল হাত বাড়িয়ে, হলো না, ফসকে গেল, ছেঁড়া ছেঁড়া চিন্তা নিয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছে, মেসেজ এল, সায়ক।
"মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্য ডে! মেনু কি ওবেলা? মাটন ছাড়া আজকাল কিছু হজম হচ্ছে না, জানিস! কি কেলো মাইরি!"
ঝরঝর করে হেসে ফেলল তাতান। চড়ের একটা ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই করে বাথরুমে ঢুকল। বেসিনের কলটা খুলতেই স্বপ্নটা ফিরে এলো আবার, আয়নায় চোখ পড়তেই ঝট করে মনে পড়ে গেল, ওর মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো।

"তাতান, তাতান, হ্যাপি বার্থডে! ইউ আর এইটিন নাউ। বড় হয়ে গেছিস তুই।"
"তুমি শিরীন?"
"এই দ্যাখো! মেয়ে চিনে ফেলেছে।" ঝরঝর করে হেসে ফেলল আয়না, আর তাতান অবাক হয়ে দেখল আয়না, নাকি শিরীন, তারও মাড়ির ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একজোড়া গজদাঁত।
"তুমি রোজ আমায় ডাকছ কেন? আগে তো কখনও দেখিনি তোমায়? হঠাৎ কোত্থেকে এলে? ঠাম্মির কাছে তোমার কথা বলতে নেই কেন? কেন তোমার নাম করা এবাড়িতে বারণ? বলো শিরীন, বলো।" সব্বাইকে বারবার করা প্রশ্নগুলো তাতান করে বসল স্বপ্নে আসা আয়নাকেও।
"ওই যে টেবিলে রেখেছিস ডায়েরিটা, ওটা কি আগে কখনও দেখেছিলি নেড়েচেড়ে? ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো এর আগে উল্টেছিলি কখনও? ওতে হাত না দিলে আমায় জানবি কেমন করে? আয় তাতান আয়, পাতা উল্টে দ্যাখ!"

এবার আর ওই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না তাতান। উঠে গিয়ে বসলো টেবিলে, পাতা ওল্টাতে হলো না, কেউ যেন ওর পাশে বসে যত্ন করে উল্টে দিতে লাগল ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো, আর তাতানের আঠেরো বছরের জন্মদিনে ওর সামনে উঠে এলো একটা ছবি, চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া, আর অচেনা কারও চেনা হয়ে আসা, সব একাকার হয়ে যেতে লাগল মিলেমিশে।

মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম শিরীন যে উচ্চমাধ্যমিকেও মারকাটারি রেজাল্ট করবে, সে নিয়ে কারও কোনও সন্দেহই ছিলো না। টেস্টের রেজাল্টেও তার একটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর একে একে ফাইনাল, জয়েন্ট, জয়েন্টের রেজাল্ট, এসব পেরিয়ে এসেছিল উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন। স্কুলে রেজাল্ট জানতে গিয়েছিল শিরীন, গিয়েই শুনেছিল তুমুল হট্টগোল, ইংলিশের বনানীদি, অর্থাৎ শিরীনের মা, নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। রেজাল্ট দেখা শিকেয় তুলে শিরীন ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে, মায়ের মাথাটা কোলে তুলে নিতে নিতে দেখেছিল ভিড়টা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, কেমন যেন চোরা চাউনিতে দেখছে সবাই ওকে, জ্ঞান ফেরার পর মাকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখে আবার রেজাল্টের বোর্ডের কাছে এসেছিল ও, বন্ধুরা তখন নীরবতা পালন করছে নোটিশ বোর্ডের সামনে। চোখে প্রশ্ন নিয়ে বোর্ডে নিজের রোল নম্বরটা খুঁজে পেয়ে খুঁটিয়ে দেখতেই দুলে উঠেছিল পায়ের নিচের মাটি। পাশে দাঁড়ানো শ্রীপর্ণা দুহাত দিয়ে ওকে আঁকড়ে না ধরলে ওও বোধহয় মায়ের মতোই জ্ঞান হারাতো। অঙ্কে নাকি শিরীন ব্যাক পেয়েছে, ওর নামের পাশে লেখা আছে যে এবারের উচ্চমাধ্যমিকে হেরে যাওয়া মানুষদের মধ্যে ও একজন। রেজাল্ট হাতে নিয়ে জানা গিয়েছিল নয় পেয়েছে ও অঙ্কে, দুশো নম্বরের মধ্যে একশো বিরাশি ও ঠিক করে এসেছিল, পৃথিবী উল্টে গেলেও এই সত্যিটা উল্টে যাওয়ার নয়, তার পরেও ওর রেজাল্টে লেখা আছে ও নয় পেয়েছে, অনলি নাইন।
"এক লহমায় দুনিয়ার সব রং কেউ শুষে নিলে দুনিয়াটাকে কেমন দেখতে লাগে জানিস? আমি জানি। আজ একমাস ধরে দেখে আসছি কেমন হয় রংহীন দুনিয়া, ঠিক কতটা সহজে সবটুকু ভুলে গিয়ে কাছের লোকেরাও দূরে ঠেলে ফেলে দেয় ফেল করা ছেলেমেয়েদের। ফেল করিনি কোনওদিন, বুঝলি! এই অভিজ্ঞতাটা কেমন হয় জানতাম না। কতটা অসহায় লাগে একশো আশির বদলে নয় দেখতে, জানা ছিল না, জানা ছিল না।"
লিখেছিল শিরীন, রেজাল্টের একমাস পরে। আরও লেখা ছিল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে চলেছে তাতান, ঠাম্মি নাকি ওই একমাসে মেয়ের মুখ দেখেননি, তাকে খেতে দেননি, তার বেশিরভাগ বইখাতা একদিন নাকি পুড়িয়েও দিয়েছিলেন। যেটুকু যা যত্ন করার করতো তাতানের বাবা আর মা। তাতান তখনও পৃথিবীর আলো দেখেনি।
অবাক হয়ে ভাবে তাতান, তার এই নরম ঠাম্মি এতটা নিষ্ঠুর কেমন করে হয়েছিলেন?

ভাবতে ভাবতে টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাতান।

"তাতান, বাকিটুকু জানবি না? ওই দ্যাখ, ওই ঘরের খাটে, ফুলের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে শিরীন, জানিস, আগের দিনই দাদাভাই রিভিউয়ের জন্য অ্যাপ্লাই করে এসেছিল, বউমণিকে বলেছিল, আমি ঘুমোচ্ছিলাম বলে রাতে আর জানায়নি, ভেবেছিল পরেরদিন সকালে বলবে। ওরা কি করে জানবে বল, বিকেলে, যখন দাদাভাই বউমণি অফিসে, তখন মা শিপ্রাদির ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা বলেছে, পরের মাসেই রেজিস্ট্রির কথাও পাকা করে ফেলেছে, ওরা কি করে জানবে যে একশো আশি উল্টেপাল্টে নয় হয়ে গেছে বলে আমি রাতারাতি মায়ের গলগ্রহ হয়ে গিয়েছি ওই কদিনে? বড্ড লেগেছিল জানিস তাতান! গালে চড় এসে না পড়লেও যে বুকে কতটা লাগে সেদিন বুঝেছিলাম। বাবার কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে হয়েছিল হঠাৎ। একমাসের ঘুমের ওষুধ তো ছিলোই, আর কিচ্ছু ভাবিনি, জানিস! ওই দ্যাখ, মা কেমন পাথর হয়ে বসে আছে, হয়তো আফসোসও করেছিল। নইলে রিভিউয়ের রেজাল্ট আসার পরের দুবছর কি আর রিহ্যাবে থাকতে হয়! রিভিউয়ের রেজাল্টে সবাই বুঝেছিল আমি সত্যি বলেছিলাম, জানিস! নয় নয়, ওটা আসলে একশো আশিই ছিল।"

কে রিহ্যাবে ছিল, ঠাম্মি? চমকে উঠল তাতান। এরা কত কিছু বলেনি তাকে!

"তুমি, তুমি কি করে জানলে সব?"

আচ্ছা, শিরীনকে কি ওর ভয় পাওয়া উচিত? মানে, স্বপ্ন, না সত্যি, বোঝা যাচ্ছে না, তবে শিরীন যে অশরীরী, তাতে তো সন্দেহ নেই। কি করবে তাতান?

"হি হি, অত ভেবেচিন্তে ভয় পেতে হয় নাকি রে পাগলি? ভয় করলেই ভয়, নইলে কিছুই নয়। শুনিসনি?"
"তুমি এতদিন আসোনি কেন শিরীন?"
"ওই ডায়েরিটা যে এতদিন সামনে আসেনি রে! আমার সবটুকু যে ওতেই আছে। ঘুমিয়ে ছিলাম ওখানেই এত বছর, তুইই তো আমায় জাগালি, নিয়ে এলি ধুলো ঝেড়ে। আমিও জানতে পারলাম তুই কিচ্ছু জানিস না।"
"তুমি যাবে না তো শিরীন, আর যাবে না তো আমায় ছেড়ে? জানো, এবাড়িতে আমার কোনও বন্ধু নেই, তুমি থাকো প্লিজ!"
"আমার কি থাকলে চলে রে? কতটা কষ্ট যে হয়, যদি বোঝাতে পারতাম! টান, শুধু টান, একটা অদ্ভুত কষ্ট রে, মনে হয় আমার সবটুকু ভেঙেচুরে যাচ্ছে, আর পারছি না রে তাতান, এবার আমায় মুক্তি দে।"

তাতান কি করবে বুঝে উঠতে পারে না, এই ক'দিনে শিরীনকে এই প্রথম বড় ম্রিয়মাণ লাগে।

"ওই ডায়েরিটা, ওটাকে কাল পুড়িয়ে দিতে পারবি? ওটা থাকলে আমারও আর কোত্থাও যাওয়া হবে না।"
"তুমি যেও না পিসিমণি! আমি ডায়েরিটা আবার ওই বইয়ের তাকে রেখে আসব। আমার কাছে তোমার বলতে তো এইটুকুই রইলো, বলো? এটুকুও নিয়ে চলে যেও না, প্লিজ!"

স্বপ্ন, নাকি সত্যি? জানে না তাতান। আলো আঁধারির মাঝে আধোঘুমের ঘোরে তাতানের চোখ উপচে জল ঝরে ঝরঝর, সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চায় তার আসার আগেই চলে যাওয়া পিসিমণির হাত, ধরা যায় কিনা বোঝা যায় না, ওদিকে বাইরে দুই একটা পাখির ডাক জানান দেয় শেষের দিকে আরও একটা দিন এগিয়ে যাওয়া হলো।

(সমাপ্ত)

Sunday, 29 July 2018

#আন্তর্জাতিক_শিশুশ্রমবিরোধী_দিবসে

#ধূপছায়া_মজুমদার

************************

"বয়স বারো কি তেরো বড়জোর চোদ্দ
রিকশা চালাতে শিখে নিয়েছে সে সদ্য"

ঘর ভরে আছে মৃদু স্বরে আর সুরে, স্নান সেরে সোফায় এসে বসে খবরের কাগজটা খুললেন মিসেস সেন। এইটুকুই সময়, নিজেকে দেওয়ার। মিনু চা রেখে গেছে, মুখে দিতেই মুখটা বেঁকে গেল।

"মিনু, মিনু!"

"হ্যাঁ মামীমা!"

"জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেবো তোমার, এত ক্যালাস কেন? একটা কথা বললে মনে থাকে না? কতবার বলেছি আমার চায়ে চিনি দিবি না!"

"এ বাবা, চিনি দিয়েছি? ভুল হয়ে গেছে মামীমা, আর হবে না।"

"ভুল হয়ে গেছে মামীমা! ন্যাকামো! চোদ্দ বছরের ধাড়ি মেয়ে, তাকে রোজ পাখিপড়া করে কাজের ফিরিস্তি বোঝাতে হবে। মাস গেলে মাইনের টাকা গুনে নিয়ে বাপের হাতে তুলে দিতে তো ভুল হয় না? ভালোমন্দ গিলে শাঁসেজলে বেড়েছিস, হাড়হাভাতে চেহারাটা ভুলে গেছিস বোধহয়? দূর করে দেবো বাড়ি থেকে, মরবি না খেতে পেয়ে, তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!"

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বাশুলিথান গাঁ থেকে আসা রাতদিনের ঝি মিনু, মিসেস সেনের মুখ চলতে থাকে, তার সঙ্গে প্রাণপণে পাল্লা দিতে গিয়ে হেরে যান সাউন্ড সিস্টেমের সুমন, ফ্যানের হাওয়ায় ফরফর করে উল্টে যায় কাগজের প্রথম পাতাটা, কাগজের নামের অক্ষরগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকে কড়া পড়ে যাওয়া কচি কচি হাতগুলো, তাদের ছবির নিচে ক্ষুদে অক্ষরে লেখাটা চোখে পড়েই না প্রায়, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস।

***********************

রিয়া আর ওর বাবা একটু পরে বেরোবে ফর্ম জমা দিতে। এই চত্বরে ভালো স্কুল একটাই, কাজেই ঝেঁটিয়ে মেয়েরা আসবে ভর্তি হতে, এক্ষুনি না বেরোলে লাইন অনেক লম্বা হয়ে যাবে। ছুটোছুটি করে জলখাবারের জোগাড় করছিল সোমা, পিঙ্কির দিকে চোখ যেতেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। গামলায় ধরে রাখা জলটার মধ্যে বাসনগুলোকে ডুবিয়ে কোনওরকমে ধুয়েই ছুঁড়ে দিচ্ছে মাজা বাসনের ঝুড়িতে।

"ও কি পিঙ্কি? ও কেমন বাসন ধোয়া? ম্যা গো, ওই সাবানগোলা ঘোলা জলটায় ধুয়ে রেখে দিচ্ছিস? কল খোল, রগড়ে ধো আবার সবকটা বাসন, যেদিকে দেখব না সেদিকেই ফাঁকি। এইজন্য কড়কড়ে নোটগুলো গুনে দিই প্রতিমাসে?"

"কাকিমা কাল থেকে সব ভালো করে ধুয়ে দেবো, রগড়ে রগড়ে, ঝকঝকে করে। আজ ছাড়ান দ্যাও, ইস্কুলে যেতে হবে, ভত্তির ফরম জমা করতে।"

"অ্যাঁঃ, ইস্কুল যাবেন, বিদ্যের জাহাজ হবেন! এবার বলবি সায়েন্স নিয়ে পড়বি! কালে কালে কত যে দেখব!"

একটু থেমে যোগ করে সোমা,

"ওসব ইস্কুল ফিস্কুল গেলে তোর মাকে পাঠিয়ে দিবি, টাইম পেলে সে করুক, নইলে অন্য লোক দেখব। বিদ্যেধরী ঠিকের ঝি রেখে কাজ নেই আমার, দুদিন অন্তর পড়া, পরীক্ষা, নিজে খেটে মরো তখন!"

জলখাবার গোছাতে গোছাতে গজগজ করতে থাকে সোমা, মুখ বুজে বাসন ধুতে থাকে পিঙ্কি, ডাইনিং চেয়ারে বসে তখন রিয়া ওর এক বন্ধুর দিদির প্রোফাইলে শেয়ার করা একটা লেখা পড়ছে মন দিয়ে, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস উপলক্ষ্যে লেখা বেশ জ্বালাময়ী একটা আর্টিকেল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে রিয়ার বাবার মোবাইলেও খোলা রয়েছে ওই আর্টিকেলটাই, অন্য কারও প্রোফাইলে শেয়ার করা। এসব জ্বালাময়ী আর্টিকেল কয়েক মিনিটে কয়েকশো শেয়ার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে, উঠোন থেকে উঠোনে।

****************************

তিন্নির আজ ভ্যাকসিন নেওয়ার ডেট ছিলো। বুস্টারের ফার্স্ট ডোজ, নেওয়ার সময় খুব হাত-পা ছুঁড়েছে, কেঁদেছে। ডক্টর বললেন জ্বর আসবে, তাই একটু টেনশন মতন হচ্ছে শ্রেয়ার। সকালে কিছু খেয়ে বেরোয়নি, এখন ফেরার পথে একটা কচুরির দোকানে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে প্রদীপ্ত। তিন্নি ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই শ্রেয়া গাড়িতেই রয়েছে, প্রদীপ্ত ওর প্লেটটা পাঠিয়ে দিয়েছে দোকানে কাজ করা ছেলেটাকে দিয়ে।

বাচ্চা ছেলে, বছরদশেক হবে হয়তো, খাবার দিতে এসে কেমন জুলজুল করে দেখছিল ঘুমন্ত তিন্নির দিকে। তিন্নির দিকেই কি? নাকি ওর পাশে সিটের ওপর রাখা পিঙ্ক টেডি, অরেঞ্জ বল আর রংবেরঙের ক্যাটারপিলারটার দিকে? বোঝেনি শ্রেয়া, শুধু আড় হয়ে ঘুরে বসে তিন্নিকে আর খেলনাগুলোকে আড়াল করে ছেলেটার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নিয়েছিল।

সকাল থেকে কিছু খায়নি, কচুরির প্রথম টুকরো মুখে পুরতেই আবেশে চোখ বুজে এসেছিল আপনাআপনি। কাঁচতোলা গাড়ির জানলায় টকটক আওয়াজ শুনে চোখ খুলে তাই চমকেই গিয়েছিল শ্রেয়া।

একটা কটা চোখ কটা চুলের ফ্যাকাশে গায়ের রঙের ছেলে কাঁখে একটা কালোকোলো বাচ্চাকে নিয়ে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে, আর ইশারায় নিজের আর বোনের পেটের দিকে দেখাচ্ছে। দুজনেরই সারা গায়ে চিটধরা ময়লা, ভাগ্যিস গাড়ির কাঁচ তোলা, নইলে গন্ধে টেকা যেতো না বোধহয়। শ্রেয়া জানে, এই ভিখিরীদের একটা বিরাট বড় ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলো খুব এফিশিয়েন্ট ওয়ার্কার। এরা ভিক্ষে হিসেবে খাবারের চেয়ে টাকা প্রেফার করে বেশি, ভাগটাগ করে নিজেদের কপালে যা জোটে সবই নেশায় উড়িয়ে দেয়। এদের পয়সা দেওয়া মানে পয়সা নষ্ট করা। এঁটো ডানহাতটা কপালের কাছে তুলে 'মাফ করো' গোছের একটা সিগন্যাল দেয় শ্রেয়া। তাতেও ঠ্যাঁটার মতো দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। হাল ছেড়ে দিয়ে ওদের দিকে পিছন ঘুরে বসে কচুরিতে মন দেয় শ্রেয়া, টেস্টটা সত্যিই ভালো।

গাড়িতে বাজতে থাকা এফ এম চ্যানেলটায় মর্নিং শো-র আর. জে. তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে শ্রোতাবন্ধুদের জানাতে থাকেন আজকের দিনটির তাৎপর্য, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস।

(সমাপ্ত)

ছবি : http://www.un.org/en/events/childlabourday/

Thursday, 26 July 2018

#বাঞ্জি-পুরাণ কথা (অক্ষর পত্রিকায় প্রকাশিত)


আমার পতিদেবতাটি, বুঝলেন, মনে মনে বেজায় অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ। এমনিতে হাবভাব দেখে সেকথা মনে হবে না, দিব্যি ভালোমানুষের মতো পালা করে তিনবেলার শিফটে আপিস যাচ্ছেন, বাড়ি থাকলে হয় ঘুমোচ্ছেন, নইলে টিভি চালিয়ে শেয়ারবাজারের খবর খুলে গ্যাঁট হয়ে সোফায় বসে থাকছেন, ফ্রিজের আনাজপাতি এক্কেবারে ফুরিয়ে গেলে দু'থলি বাজার করে এনে আমায় কৃতার্থ করে দিচ্ছেন, আর ফ্রিজটা বড্ড নোংরা হয়ে থাকলে ঘষেমেজে সেটিকে ঝকঝকে করে তুলছেন। অবিশ্যি বাড়িতে থাকলে মেয়ে তাঁর বাবাকে একদণ্ড একলা ছাড়েন না, সে আলাদা কথা। যাইহোক, এহেন নিরীহ মানুষটির মনে যে থেকে থেকে অ্যাডভেঞ্চারের ঘন্টি বেজে ওঠে, সেকথা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

বছর দুয়েক আগে একবার খেয়াল চাপলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এভারেস্ট দেখতে ফালুট যাবেন ট্রেক করে। তখন কন্যারত্নটি একেবারে কচি, তাকে কাঁখে নিয়ে বারোহাজার ফুট উঁচুতে হেঁটে ওঠার দু:সাহস দেখানো অসম্ভব, তাই তিনি ঠিক করলেন ব্যাচেলর সেজেই বেরিয়ে পড়বেন। তা ভালো, কিন্তু বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে যাও! তা নয়, দুচারজন বন্ধুকে শুধোলেন, তারা কেউ গা করল না, অমনি ছড়ি হাতে আর রুকস্যাক পিঠে শেরপাভায়ার হাত ধরে তিনি একলাই ঘুরে এলেন সান্দাকফু আর ফালুট, চাট্টি নয়া ইয়ারবন্ধুও জুটিয়েছিলেন শুনেছিলাম সেখানে গিয়ে।

সে নয় হলো, কিন্তু এই অভিযানের পর তাঁর সাহস গেল বেড়ে। তার পরের বছর কালিম্পং গিয়েছি বেড়াতে, তিনি বললেন উড়বেন। প্রথমে ভেবেছিলাম বেড়ানোর আনন্দে ভুল বকছেন বোধহয়, তারপর ডেলো পাহাড়ের রংচঙে পার্কে ঢোকার মুখে উড়নেওয়ালাদের বুকিং আপিস দেখে বুঝলাম কেবল আমার কত্তাটির নয়, ভুল বকা রোগে ধরেছে আরও দুতিনজনকে, তাঁরা সব লাইন লাগিয়েছেন উড়বেন বলে, মানে ওই প্যারাগ্লাইডিং-এর প্যারাস্যুট গোছের জিনিসটা গায়েপিঠে মাথায় বেঁধে নিয়ে সাঁইই করে আকাশে ভেসে খানিকক্ষণ পাখি পাখি ভাব জাগানোর চেষ্টা আর কি! ব্যাপারস্যাপার দেখে গলা জিভ শুকিয়ে আসছিল, ভাবছিলাম কেঁদেকেটে ওড়াউড়ির শখ ঘুচিয়ে দিই। কিন্তু অতীতের কথা মনে এল, নিজেকে সামলালাম।  হয়েছিল কি, বিয়ের পরপর গোয়ায় গিয়ে সমুদ্রের বুকে উড়ব বলে বিচ্ছিরি একখানা যন্ত্রে উঠেছিলাম যুগলে। তারপর আমি ভয়ে ভয়ানক কান্নাকাটি চেঁচামেচি জুড়েছিলাম, আর তাইতে ঘাবড়ে গিয়ে কত্তামশাই ওড়ার আনন্দ ভুলে আমায় নিয়ে তড়িঘড়ি নিচে নেমে এসেছিলেন। নামার পর বলেছিলাম, "এবার ভয়টা কমলো, আরেকবার উড়লে হয়!" তাই শুনে নাকি তাঁর গায়ে জ্বালা ধরেছিল ভয়ানক।

 আমার জন্য তিনি মন খুলে উড়তে পারেন নি, এ খোঁটা আমায় আজও সইতে হয়। তাই ঠিক করলাম, যা মন চায় করুকগে লোকটা, বারণ-টারণ কিচ্ছু করব না। আমি মেয়ে নিয়ে ফুল পাখি দেখে বেড়ালাম, আর তিনি সারা গায়ে বকলস বেঁধে ওড়াউড়ি সেরে এলেন। মোক্ষলাভ কদ্দূর কি হয়েছিল জানি না, তবে কিছুদিন দেখলাম মুখেচোখে প্রশান্তি খেলা করছে।

সেই প্রশান্তি আসার ফলেই বোধহয়, একদিন শুনলাম কত্তামশাই বলছেন, "এবার ঋষিকেশ যেতে হবে।"

ঋষিকেশ কেন রে বাবা? সে তো সাধুসন্ন্যাসীদের জায়গা শুনেছি, আমার ইনি আর যাই হোন, সন্নিসীভক্ত ছিলেন না তো কোনওকালে! তবে কি আমার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বিবাগী হয়ে যাবেন ভাবছেন? কি এমন জ্বালাময়ী মানুষ বাপু আমি? স্বয়ং ভোলানাথকেও গিন্নির বচন শাসন একটু আধটু মেনে চলতে হয়, তুমি কি তাঁর চেয়েও ইয়ে নাকি হে! ভাবছি মুখ খুলব, নিজেই হেসে বললেন,
"ঋষিকেশে গিয়ে বাঞ্জি করতে হবে, বাঞ্জি!"

গেঞ্জি শুনেছি, শিম্পাঞ্জী শুনেছি, এমনকি নীলগিরি পাহাড়ে বারো বছর অন্তর ফুটে ওঠা 'নীলকুরিঞ্জি ' ফুলের নামও শুনেছি, কিন্তু বাঞ্জি? সে তো শুনিনি! শুধোলাম তাঁকেই, তিনিও বিগলিত হয়ে জ্ঞান বিতরণে বসলেন, সুযোগ তেমন পান না তো, পেলেই তাই বর্তে যান।

শুনলাম বানুয়াটু (Vanuatu) দেশের পেন্টেকোস্ট (Pentecost) দ্বীপের ছেলেছোকরার দল নাবালক থেকে সাবালক, অর্থাৎ, পুরুষ মানুষ হয়েছেন কিনা তা পরখ করতে 'গল' (Gol) নামে একখানা খেলা খেলে থাকেন, তাতে  পায়ে লতা বেঁধে ২০-৩০ মিটার উঁচু একটা মিনার থেকে ঝাঁপ দিতে হয়। সেই ঝাঁপ থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে নাকি 'বাঞ্জি জাম্পিং ' নামক অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসটির উৎপত্তি। নিউজিল্যান্ডের বেশ কয়েক জায়গায় নাকি বেশ আটঘাট বেঁধে লোকজন এই ঝাঁপদোলনার খেলাটি খেলেন। বেশ শক্তপোক্ত একখানা ইলাস্টিক দড়ি পায়ে কষে বেঁধে ৮০-৯০ মিটার উঁচু টাওয়ার বা ব্রিজ বা পাহাড়চুড়ো থেকে লোকজন মনের আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়েন, ওই একখানা ইলাস্টিক দড়ি তাঁদের ভূপতন এবং হাড়গোড় চূর্ণনের হাত থেকে রক্ষা করবে, এই ভরসায়।

গপ্প শুনতে ভালোই লাগছিল, শেষটায় কত্তামশাই বললেন,
"ইন্ডিয়ায় হাইয়েস্ট লেভেল থেকে বাঞ্জি করায় ঋষিকেশে"
"কত?"
"৮৩ মিটার।"
"তুমি ওই তিরাশি মিটার উঁচু থেকে ঝাঁপাবে? একসময় বয়লারে উঠলে পা কাঁপতো যে তোমার? সেই সেবার এন টি পি সি বিন্ধ্যাচলে হামাগুড়ি দিয়ে বয়লার থেকে নেমেছিলে না?"
"ছো:! সে তো তেরো বচ্ছর আগে। তারপর দামোদর দিয়ে কত জল বয়ে গেছে জানো? আমি এখন হপ্তায় ক'বার বয়লারে চড়ি জানো? ওসব হাইট ফাইট কিস্যুতে আমার ভয় নেই আর। আমি ঋষিকেশ যাবোই, আর বাঞ্জি করবোই। তুমি করবে?"
আমি ক্ষীণজীবী নিরীহ মানুষ, প্যালারামের ফিমেল ভার্শন, তায় আবার এখন একটি ছানামানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিত্যিদিন মাজার ব্যথায় নড়তে পারি না। ওসব শখ করে ঝাঁপাঝাঁপি খেলার শখ মোটেও নেই আমার। ওঁকেও আটকাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই গোয়ার প্যারাসেলিং-এর পর আমায় হ্যাটা করাটা মনে পড়ে গেল আবার। মনে মনে বুক ভর্তি করে নিশ্বাস নিয়ে বলে ফেললাম,
"চলো তবে, ওই চত্বরে ছানাকোলে যাওয়া যায়, এমন কোনও জায়গা বাছো। আমি ছানাকোলে হোটেলের ব্যালকনিতে বসে ছেলেভুলোনো ছড়া আউড়াবো, আর তুমি ঝাঁপদোলনা খেলে আসবে।"

জায়গা বাছা, পকেট গুছোনো, সস্তায় হোটেল খোঁজা সব সেরেসুরে দেখা গেল রুট ম্যাপে ঢুকে পড়েছে ধানোল্টি আর হরিদ্বার। হরিদ্বার যখন, ধার্মিক মানুষজনকে সঙ্গে নেওয়া উচিত, নইলে আমরা পাপীতাপী মানুষ, কোথায় কি দোষত্রুটি হয়ে যাবে, শেষটায় পুণ্যার্জনের খাতায় শূন্য পাই আর কি! দল তৈরি হল পাঁচজনের, আমরা কত্তাগিন্নি, শ্বশুর শাশুড়ি আর আমাদের কন্যা।

গুরুজনদের কাছে এই সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য চেপে যাওয়া হলো ভালোমানুষের মতো মুখ করে। তাঁরা তো উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ের ঝকঝকে আকাশ দেখে আর তাজা হাওয়ায় নিশ্বাস নিয়ে এক্কেবারে আপ্লুত, ধানোল্টিতে দূরে হিমালয়ের হাতছানিতে আমরা সবাই মুগ্ধ, মেয়ে তো ক্ষেপে উঠেছিল পাহাড়ে উঠবেই বলে, কেবল আমার উনিই দেখলাম সুযোগ পেলেই ইউটিউব খুলে ঘাড় গুঁজে কিসব দেখছেন আর হাত মুঠো করছেন, খুলছেন, আবার মুঠো করছেন। বুঝলাম রাজ্যির বাঞ্জি জাম্পের ভিডিও দেখে বুকে বল আনছেন। তা বুকে বল তো একটু লাগবেই বাপু, বাঙালির ছেলে নেচে উঠে চলেছেন ঝাঁপদোলনা খেলতে, তায় আবার এক্কেবারে নির্বান্ধব অবস্থায়, একলাটি। পায়ে ইলাস্টিক দড়ি বেঁধে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার আগে অ্যাড্রিনালিনের বান ডাকে যে 'হুই- হাই - ইয়োওওও' গোছের চিৎকারগুলোয়, সেধরনের হইহল্লা ওঁর পাশটিতে দাঁড়িয়ে করার মতো কেউ নেই যে!

 আমি মানুষটা এমনিতে বেজায় মোটিভেটিং ধরনের, মানে নিজে সেফ জোনে থেকে জ্বালাময়ী বক্তৃতার দ্বারা আশেপাশের জনতাকে ভারি সুন্দর উদ্বুদ্ধ করতে পারি, কত্তামশাইকেও ভোকাল টনিক দিয়ে চাঙ্গা রাখছিলাম। যেদিন উনি একলা যাবেন ঋষিকেশে, তার আগেরদিন একপ্রস্থ ঋষিকেশ ট্রিপ সেরে এসেছি সবাই মিলে, বড়দের বলা হয়েছে কত্তামশাইয়ের এক বন্ধু থাকেন ঋষিকেশে, তিনি পরদিন ওঁকে নেমন্তন্ন করেছেন। শাশুড়ি সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন সে বন্ধু সবাইকে, নিদেনপক্ষে আমাকে আর মেয়েকে কেন নেমন্তন্ন করলেন না, কোনওরকমে চাট্টি মিছে কথা বলে তাঁকে ভুলিয়েছি, আর মনে মনে মা গঙ্গাকে পেন্নাম ঠুকেছি, "হেই মা গঙ্গা, মিছে কথা বলার পাপ দিও না মা, ছেলে ঝাঁপদোলনা খেলে এলেই তার বাপ-মাকে সব সত্যি কথা বলে দেবো।" ছেলে যাচ্ছেন পায়ে দড়ি বেঁধে পাহাড়ের ওপর থেকে টপাং করে খাদে ঝাঁপাতে, নিচে বয়ে চলেছেন মা গঙ্গার পাহাড়ি ভার্শন, এসব কথা কোন মুখে তার মা-বাবাকে জানাই বলুন তো?

রাত্তিরবেলায় সবাই ঘুমোতে গেলে আমরা দুটিতে গঙ্গার ধারের ঝুলন্ত ব্যালকনিতে এসে বসলাম। ইতিমধ্যে কত্তামশাই জাম্পিন হাইটস (Jumpin Heights)-এর ওয়েবসাইট থেকে বুকিং সেরে ফেলেছেন পরেরদিনের জন্য, আর তারপরেই শুরু হয়েছে তাঁর বুক দুরদুর, পেট গুড়গুড়। 'যাবো কি যাবো না' জাতীয় দোলাচলে দুলছেন তিনি গঙ্গাতীরে বসে বসে। আমি গিয়ে পাশে বসতেই "থাক, যাব না " দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে, অনুমোদন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। কঠোর স্বরে মনে করালাম টাকাপয়সা দেওয়া হয়ে গেছে, এখন আর পেট গুড়গুড়ের দোহাই দিলে চলবে না। মনে মনে ভাবছি, "হুঁ হুঁ বাবা, আমায় খুব হ্যাটা করা হয়েছিল সমুদ্রের ওপর উড়তে ভয় পেয়েছিলাম বলে, এখন দ্যাখো, ডরে হাত-পা পেটের ভেতরে সেঁধোয় কিনা!"

আমার চোখরাঙানিতে হোক, বা নিজের মনের ভেতরে চাট্টি কাঠকুটো জ্বেলে মনটাকে সেঁকে তাজা করেই হোক, মোটকথা মাঝরাত নাগাদ কত্তামশাই বেশ তরতরে হয়ে উঠলেন। 'ভয় নেমেছে, আপদ গেছে' ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম, সকালে উঠে শুনি তিনি রাত জেগে ঝাঁপের ভিডিও দেখেছেন মন দিয়ে, আর পেট গুড়গুড় ভাবটা আবার ফিরে এসেছে। যাইহোক, রংচঙে জামাজুতো পরে তিনি রওনা হলেন, 'দুগগা দুগগা' বলে সি অফ করে এলাম তাঁকে, আর বুড়োবুড়িকে অনবরত মিছেকথা বলার জন্য ওয়ার্ম আপ করতে লাগলাম। মিছে কথা বলতে গেলে আমার চোখেমুখে একখানা কালচেমতো ছায়া চলে আসে, নিষ্পাপ প্রাণী হওয়ার সমস্যা, বুঝতেই পারছেন, এদিকে কোনওমতে সত্যিকথা বলে ফেললেই ওঁরা দুজন অটো ভাড়া করে ঋষিকেশ পৌঁছে ভিনদেশী জাম্প মাস্টারকে তল্পিতল্পা সমেত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন, আমার মিছে কথা বলতে না পারার দায় সে ভদ্রলোক বইবেন কেন খামোখা! মা গঙ্গাকে আবার পেন্নাম ঠুকে মানুষদুটোকে মিছে কথায় ভুলিয়ে রাখতে হলো।

ওদিকে তখন কত্তামশাই পৌঁছে গিয়েছেন ঋষিকেশের তপোবনে, পুরাকালে তপোবন-চত্বরে পুণ্যাত্মা সন্ন্যাসীরা আশ্রম-টাশ্রম গড়তেন, আর কলিকালের তপোবনে আপিস খুলে বসেছেন ঝাঁপদোলনার কলকাঠি নাড়ার কোম্পানি জাম্পিন হাইটস। বাঞ্জি জাম্পিং-এর পাশাপাশি তাঁরা ফ্লাইং ফক্স, জায়ান্ট সুইং ইত্যাদি নানাবিধ খেলাধুলোরও ব্যবস্থা করেন সিংহহৃদয় অকুতোভয় পর্যটকদের জন্য। ঋষিকেশ থেকে প্রায় ঘন্টাখানেক গেলে পাওয়া যায় নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দির, তার কাছেই এইসব সাহসী খেলাধুলোর পীঠস্থান। মহাদেবের আশীর্বাদ নিয়ে তবেই না এসব ভয়ানক খেলাধুলোয় নাম লেখানো উচিত!

তপোবন থেকে কোম্পানির একখানা হলদে রঙের বাসে করে কত্তামশাই চললেন সেই পীঠস্থানের পানে, সে বাসে সহযাত্রী দুটি মেয়ে। কত্তা প্রথমে ভেবেছিলেন তারাও বুঝি বাঞ্জি জাম্প করতেই যাচ্ছে, মনে ভরসা এসেছিল খানিক, পরে শুনলেন ওরা যাচ্ছে ফ্লাইং ফক্স সেজে তারে ঝোলানো খাঁচায় ঢুকে ওড়াউড়ি করতে, বাঞ্জির মক্কেল তিনিই একা। সামনে আরেকটা বাস যাচ্ছিল, তাতে লোকজন ভর্তি। সেই দেখে তো তিনি খুব খুশি। অ্যাত্তো লোকের মধ্যে চার পাঁচজন ঝাঁপদোলনা খেলবে নিশ্চয়ই। ড্রাইভার ভুল ভাঙালো,
" ও সব তো স্টাফলোগ হ্যায় জী, হামারা ক্রু মেম্বারস।"

তাঁর ততক্ষণে গলা শুকিয়ে কাঠ। তিনি সত্যিই একা? বাঞ্জি জাম্পিং কি তার মানে বিরাট দু:সাহসের কাজ? হুট করে নাম না লেখালেই ভালো হতো কি? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন সাইটে পৌঁছে গেছেন, নাম, বয়স, ওজন, অসুখবিসুখ আছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, "ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে কোম্পানি কোনও দায় নেবেন না, অমুককে খবর দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলবেন" জাতীয় বয়ানে সইসাবুদ করে গাইডের দেখানো রাস্তায় ওপরে উঠে একখানা হলদে খাঁচায় ঢুকে পড়েছেন। সেখানে সার বেঁধে বসে আছেন শখ করে ঝাঁপাতে আসা গুটিকয় সাহসী মানুষজন, সবারই মুখ শুকিয়ে এতটুকু। কত্তামশাইয়ের সামনেই ছিলেন একটি মেয়ে, তিনি বাঞ্জি লাফ দেবেন বলে এসেও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে শেষ অব্দি উড়ন্ত শেয়াল সেজেই খুশি রইলেন। তারপর আলাপ হলো মুম্বই থেকে আসা দুটি ছেলেমেয়ের সঙ্গে। মেয়েটি বসে বসে পা নাচাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গী তখন ঝাঁপ মেরেছেন।
"এক্সাইটেড?" হাঁটু নাচাতে নাচাতে তাঁর প্রশ্ন।
"নো:, স্কেয়ার্ড!"
"ডরনে কা কেয়া হ্যায়? যা কে সির্ফ কুদ যানা হ্যায়, ব্যস!"
মারাঠা-তনয়ার এহেন কনফিডেন্স দেখে আমার কত্তামশাইয়ের বঙ্গজ সত্ত্বা চমৎকৃত। 'হাম কিসিসে কম নেহি ' ফিলিং মনের মধ্যে নেড়েচেড়ে নিজেকে চাগিয়ে তুললেন তিনি। সেই মেয়ে ঝাঁপাতে যাওয়ার পরেই ওঁর পালা। তিনপ্রস্থ দড়ি বাঁধাবাঁধি সেরে, ঘাড়ে বুকে কোমরে পায়ে নানা রকমের বকলস বেঁধে সেইসব বকলস ধরে টেনেটুনে জাম্প মাস্টার দেখে নিয়েছেন ঝুলন্ত অবস্থায় দড়ি ছিঁড়ে 'খানখান' হওয়ার আশঙ্কা কতখানি, আমার উনিও ভয়ে খাবি খেতে খেতে বাঞ্জি জাম্পের ভালোমন্দ সম্পর্কে শুধিয়েছেন জাম্প মাস্টারকে, তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে ঠ্যালা মেরে ঝাঁপাতে বাধ্য করা হয় না কাউকেই, সেটা নাকি স্পোর্টসম্যানশিপের বিরোধী।
একটু আগে এক বীরপুঙ্গব নাকি ঝাঁপানোর আগে কাঁপা গলায় জাম্প মাস্টারকে বলেছিলেন জাম্প মাস্টার নিজেই যদি তাঁকে ঠেলে খাদে পড়তে সাহায্য করেন, তবে ভালো হয়। নিজে নিজে ঝাঁপাতে তাঁর পা কাঁপছে। জাম্প মাস্টার তাঁকে সটান 'না' বলে দিয়েছেন।
ঠিকই তো, খাদের ধারে ঠ্যালা মেরে ফেলে দেওয়া তো সিনেমার ভিলেনদের কাজ, জাম্প মাস্টার অমন বেয়াড়া কাজ করবেন কেন? তিনি পায়ে দড়িবাঁধা মানুষটিকে যত্ন করে ধরে নিয়ে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের ধারে দাঁড় করিয়ে তার পিঠে আলতো করে হাত ঠেকিয়ে দুই সেট 'ফাইভ ফোর থ্রি টু ওয়ান ' গোনেন, আর বলে দেন কাউন্টডাউন শেষ হলেই নিজেকে পাখি ভেবে দুদিকে হাত ছড়িয়ে টুক করে ঝাঁপ দিয়ে ফেলতে হবে। দুই সেট কাউন্টডাউনের পরেও যদি কেউ ঝাঁপাতে ভয় পান, তবে দড়িদড়া খুলে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়, টাকাপয়সা ফেরত পাওয়ার কোনও গল্প নেই।

না ঝাঁপালেও টাকা ফেরত হবে না, একথা শুনেই কত্তা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। কি জানি, পয়সাকড়ির বাজে খরচা হওয়ার আঁচ পেলেই আমার চাঁদপানা মুখখানা তেলোহাঁড়ি হয়ে যায়, একথাও মনে পড়ে গিয়েছিল হয়তো, মোটকথা তিনি ভারি উদ্বুদ্ধ হয়ে 'জীনে কে হ্যায় চারদিন, বাকি হ্যায় বেকার দিন ' কিংবা 'থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে' জাতীয় কিছু বিড়বিড় করতে করতে এগোলেন অকুস্থলের দিকে।

তার পর? তারপর অ্যাড্রিনালিনের ক্রমাগত ক্ষরণ, (হরমোন গ্ল্যাণ্ডের ওভারটাইমের চার্জ চাওয়ার খ্যামতা থাকলে সেদিন চাইতোই, আমি শিওর) কাউন্টডাউন বিগিনস অ্যান্ড এন্ডস, হুউউউ হাআআআ ধ্বনি, এবং..... ঝপাং! ঝাঁপ দিলেন তিনি, বহুদিন ধরে মনের কোণে লালিত স্বপ্ন আজ সফল হলো তাঁর। বলিহারি যাই বাপু অমন স্বপ্নের! সে যাকগে, স্বপ্ন মানুষের নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, অন্য লোকের, সে হোক না কেন অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা বউ, তারও কিচ্ছুটি বলার হক থাকে না।

বাঞ্জি জাম্পের নিয়ম হলো প্রথম ঝাঁপের পর পায়ে বাঁধা ইলাস্টিক দড়িটা তোমায় খেলিয়ে খেলিয়ে নিয়ে বেশ কিছুদূর নামবে, তারপর আবার দড়ির ইলাস্টিসিটি তোমায় টেনে তুলবে ওপর দিকে, তারপর আবার নীচে নামাবে। এরকম বারতিনেক ওপর নীচ করে ল্যাজে, থুড়ি, দড়িতে খেলার পর আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে থাকবে তুমি। সেখানে পাহাড়ী গঙ্গার ধারে মাচা বেঁধে ওঁত পেতে বসে আছেন ঝাঁপদোলনা কোম্পানির লোকজন। তাঁরা একখানা ঘুরন্ত লাঠি তোমার হাতের নাগালে এগিয়ে দিয়ে তোমায় আস্তে করে পেড়ে এনে খুলে নিয়ে মাচায় শুইয়ে দেবেন। তারপর হাত ধরে দাঁড় করিয়ে পায়ের থরোথরো কাঁপুনি থামার সময় দিয়ে এক বোতল জল গিফট করবেন তোমায়। উঁহু, কেবল জল নয়, আরও আছে। একখানা গোলমতো ব্যাজ, যাতে লেখা রয়েছে, শখ করে পাহাড় থেকে লাফানোর ধক তোমার বুকে রয়েছে। আর দেওয়া হবে একখানা তেলা সুন্দর শক্তপোক্ত কাগজে লেখা সার্টিফিকেট, যেখানে লেখা আছে, তুমি বিনা প্ররোচনায় এবং বিনা ঠ্যালায়, 'জাম্পিন হাইটস'-এর তত্ত্বাবধানে সফলভাবে বাঞ্জি জাম্প করতে পেরেছ, এবং নিজের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা টারজান নামক ভদ্দরলোকটিকে (তুমি মহিলা হলে খুঁজে পেয়েছ নিজের মধ্যে থাকা জেন নামের এক বীরাঙ্গনাকে, তিনি কে, আমি জানি না) উপলব্ধি করতে পেরেছো।

এসব অ্যাডভেঞ্চার সেরে আমার কত্তামশাই যখন হরিদ্বারে ফিরলেন, এবং বাবা-মাকে ঘটনাটা জানালেন, তখন সে যে কি কাণ্ড হলো, সে আর বলার নয়। সব শুনেটুনে শ্বশুরমশাই তো পুজো দিয়ে আসবেন বলে বেরিয়েই পড়ছিলেন। ঝাঁপদোলনা খেলার সাড়ে তিন মিনিটের ভিডিও দেখে তাঁদের চোখ যখন ছলছল করছে, তখন সযত্নে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে ছেলে ঘোষণা করলেন, "আমি, অর্থাৎ শ্রী অমুকশঙ্কর অমুক, আজ, পুণ্যতীর্থ হরিদ্বারে গঙ্গাতীরে বসে শপথ নিলাম, আমার পরবর্তী লক্ষ্য হবে স্কাইডাইভিং। একলা ট্রেকিং, ওড়া, পাহাড় থেকে ঝাঁপ ইত্যাদির পর আমার মুকুটে গুঁজতে বাকি রইলো কেবল উড়ন্ত এরোপ্লেন থেকে ঝাঁপানোর পালকটি। আজ থেকে শুরু করলাম ভাঁড়ে মা-লক্ষ্মীর আসন পাতার কাজ।" বলেই একখানা নয়া টাকা মানিব্যাগের এই পকেট থেকে ওই পকেটে চালান করে কৌটো খুলে একমুঠো বাদামভাজা তুলে নিয়ে চিবোতে লাগলেন।

।।বাঞ্জি-পুরাণ কথা সমাপ্ত।।

Wednesday, 25 July 2018

বিজলিঘরের কারিগরেরা

চারপাশে বেজায় পুজো-পুজো গন্ধ। আকাশ ঘন নীল কিংবা মেঘ-কালো যা-ই হোক না কেন, বাঙালির পুজোর আনন্দ তাতে কমে না। আর শুধু বাঙালিই বা বলি কেন, দেশের নানা কোণেই তো এই মরসুমে পুজোর আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। জন্মাষ্টমী-গণেশ চতুর্থী থেকে সেই যে পুজো-পার্বণের হুল্লোড় শুরু হয়, দীপাবলী-ভাইফোঁটা পার করে শীতের হাওয়া গায়ে লাগলেও তার রেশ ফিকে হয় না। আর কে না জানে, উৎসব মানেই আলো, দিনের আলো না ফুরোতেই প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে, রাস্তার দু’পাশে, আমার-আপনার-সবার বাড়িতে সর্বত্র জ্বলে ওঠে হরেক কিসিমের মন-ভোলানো চোখ-ধাঁধানো আলোর মালা। এই সময়ে সন্ধেবেলায় হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার করে ঝুপ করে লোডশেডিং হ’লে কেমন লাগে বলুন তো? তেড়ে গাল পাড়তে ইচ্ছে করে না ‘ইলেক্ট্রিক অফিস’-এর লোকজনকে? ঠিক যেমন রাস্তায় বেরিয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকালে ট্রাফিক পুলিশের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করা ‘নিয়ম’, কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে যদি শোনেন এমার্জেন্সি ও. টি অ্যাটেণ্ড করতে হচ্ছে ব’লে ডাক্তার দু’ঘণ্টা পরে আসবেন, তখন যেমন ডাক্তারবাবুর ‘টাকার খাঁই’-কে তুলোধনা করেন মনে মনে, ঠিক তেমনই ‘ঠাণ্ডা ঘরে বসে পা নাচানো’ লোকগুলোর ‘ক্যালাসনেস’-এর কারণে পাওয়ার-অফের হুজ্জোতি পোহাতে হচ্ছে পুজোর সময়েও, এই ভেবে তিতিবরক্ত হই না কি আমরা?

কিন্তু জানেন কি, পুজোর মরসুমে যাতে আমরা আলো-ঝলমলে রাস্তায় নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারি, তার জন্য শহর থেকে অনেক দূরের কতগুলো কারখানায় ওইসময় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজকর্ম চলে? সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেককেই পোশাকি ভাষায় ইঞ্জিনিয়ার বলা হয়, সেই ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে কিছুজন হিমশীতল একটা ঘরে সারাদিন কাটান, আট থেকে দশঘণ্টা ঠায় কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে, মাথায় বরফ চাপিয়ে, এক মুহূর্তের জন্যেও চেয়ার ছেড়ে ওঠার উপায় নেই তাঁদের। বাকিদের সারাদিন দৌড়ে বেড়াতে হয় সারা কারখানার বিভিন্ন এলাকা জুড়ে, কাউকে হয়তো নব্বই মিটার উঁচুতে উঠতে হলো, আবার কাউকে মাটির নিচে তিরিশ মিটার নামতে হলো। কিন্তু, কারখানাগুলোয় কি এমন দরকারি জিনিস তৈরি হয়, যে, পুজোর ক’টাদিন সেখানে ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়?

যে জিনিসটা না হলে ইদানীং কালে আমাদের চোখে আঁধার ঘনাচ্ছে, সেই অমূল্য রতন বিদ্যুৎ তৈরি হয় শহর থেকে অনেক দূরের ঐ কারখানাগুলোতে। এদিকে আবার বেশিরভাগ বিদ্যুৎ-কারখানার কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা থাকে কারখানার কাছাকাছি অঞ্চলেই, সেগুলোও জনবসতির কাছাকাছি নয়, পুজোপার্বণের রোশনাই সেখানে খুব বেশি পৌঁছায় না। উৎসবের দিনগুলোয় সবারই ইচ্ছে করে কাজ থেকে একটু ছুটি নিই, দুটোদিন বাড়ির লোকের কাছে থাকি, বাচ্চাদের সঙ্গে হৈ-হৈ করি, কিন্তু, ওই যে বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা, সেখানে ইয়াব্বড় এক উনুনে গরম জলের হাঁড়িতে অষ্টপ্রহর জল ফুটছে, ফুটন্ত জলের বাষ্প পাইপ বেয়ে গিয়ে টারবাইন নামের একটা মস্ত বড়ো চাকা জাতীয় বস্তুকে অনবরত ঘুরিয়েই চলেছে, সেই ঘূর্ণন আবার কোন্‌ বিচিত্র পদ্ধতিতে জেনারেটর নামক একটি যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করছে মহামূল্যবান সম্পদ বিদ্যুৎ। তারপর তাকে গুনে-গেঁথে মাপ করে কমিয়ে বাড়িয়ে গুচ্ছখানেক তারের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয় ন্যাশনাল গ্রিড নামক ভয়ানক জটিল একটা ব্যবস্থার কাছে। সেই গ্রিডই নাকি সারা দেশের কোথায় কত বিদ্যুৎ পৌঁছোবে তার মাপজোক করে দেয়। এই গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠানোর কাজ চুকলে তবে কারখানার কর্মীদের কাজ শেষ, কিংবা হয়তো শেষ নয়, কারণ এই যে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রিডে পাঠানো—এই কাজটা তো চব্বিশ ঘণ্টা ধ’রে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই চলতে থাকে। উৎসবের দিনগুলোয় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে আকাশছোঁয়া, একমুহূর্তের জন্যেও চাহিদার চেয়ে জোগান কম হলে চলবে না। সে যদি পুজোর মুখে হঠাৎ বর্ষায় জ্বালানি কয়লা ভিজে স্যাঁতসেতে হয়ে যায়, ভেজা কয়লায় যদি উনুনে আগুন না জ্বলে, তবুও পুজোর রোশনাই কম হলে গোলমাল বেধে যাবে চারপাশে। এবার ভিজে কয়লা কেমন করে শুকিয়ে খটখটে ক’রে তা দিয়ে আগুন জ্বালা হবে, সে ভাবনা আমাদের নয়, ওসব ভাববে ‘ঠাণ্ডা ঘরে বসে থাকা’ লোকগুলো। আমাদের কেবল বাড়িতে-প্যাণ্ডেলে আলোর ঝলকানি আর রাতভর হুল্লোড়ের ব্যবস্থাটুকু হ’লেই হলো। প্রদীপের আলোটুকু পেলেই আমরা খুশি, সলতে পাকানোর গল্পে আমাদের কাজ কী?

তবে কিনা যাঁরা এই সলতে পাকানোর কাজটি করেন, তাঁরাও তো আমাদেরই মতো শখ-আহ্লাদপূর্ণ জীবন কাটাতে চাওয়া কয়েকটি সাধারণ মানুষ, তাই পুজোর দিনগুলোতেও তাঁরা মুখটি বুজে কাজ সামলে চলেছেন, ভাবলে মনটা কেমন হয়ে যায়। ঠিক যেমন দমকলকর্মী, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, অনেকটা তেমনই এঁদের কাজটাও জরুরি পরিষেবার অঙ্গ।

ধরুন আজ দুর্গাপুজোর সপ্তমী,বাড়িতে বছর পাঁচেকের মেয়েটা নতুন জামা পরে বারবার বাবাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছে, বাবা কখন বাড়ি আসবে, কখন ঠাকুর দেখতে বেরনো হবে, ওদিকে বাবা তখন অফিসে সেই কম্পিউটারগুলোর সামনে বসে একনাগাড়ে কতগুলো বোতাম টেপাটিপি করে চলেছে। তার কাছে তখন পুজো মানে সে যতক্ষণ ওই চেয়ারে বসে আছে ততক্ষণ বিজলী তৈরির কাজটাকে সুষ্ঠুভাবে চালানো। মেয়ের হাসিমুখ দেখার চেয়েও এই কাজটা সেই মুহূর্তে তার কাছে বেশি দরকারি।

এবারে আসা যাক ছুটির কথায়। পুজো-দীপাবলীতে বিদ্যুৎ-কর্মীদের যে একেবারেই ছুটি মেলে না, এটা বলা উচিত নয়। অমনটা করলে চলবে কিভাবে? কারখানার বাইরেও পরিবার, বাড়ি, সামাজিকতা—এসবও তো আছে নাকি? এই যে অষ্টপ্রহর কারখানায় শ্রমদান, সে হোক না ঠাণ্ডা ঘরে বসে সুইচ টেপা, তাতেও মাথার পরিশ্রম কম হয় না, তা সেই শ্রমদানের বিনিময়ে মাসের শেষে যে টাকাটা পাওয়া যায়, সেটা তো ঐ পরিবার আর সমাজ-সামাজিকতার জন্যই জোগাড় করা! যে লোকটার দেশের পৈতৃক ভিটেয় বহুকালের দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যেতে পারে সে গিয়ে পুজোর ক’টাদিন তদারকি না করলে, তার কি ঐ চারদিন ছুটি না নিলে চলবে? চাকরি পাওয়ার আগের সেই সংগ্রামের দিনগুলোয় সে হয়তো মনে মনে মা দুগ্‌গাকে বলে রেখেছিল, “একবার চাকরিটা পেতে দাও মা, কাঁধ পেতে পুজোর চারদিনের সব কাজ তুলে দেব সুষ্ঠুভাবে”, পুজোর খরচের টাকাটুকু পাঠিয়ে কর্তব্য সারলে তার কি মন ভরে?

কিংবা ধরো যে ছেলেটার বোন পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল স্বামীর হাত ধ’রে, পাঁচ বছর পরে কোলে দেড় বছরের ছেলে নিয়ে দেশে আসছে পনেরোদিনের জন্য, দীপাবলী আর ভাইফোঁটায় বাবা-মা-দাদার সঙ্গে বাড়িতে থাকবে ব’লে, সেই ছেলেটা ঐ ক’দিন বাড়ি না গিয়ে থাকে কেমন করে?

তাই পালা-পার্বণে ছুটি মঞ্জুরের প্রসঙ্গ উঠলে দেখা হয় ছুটির প্রয়োজন কার বেশি। এমনিতেই সারা বছরই এর-ওর ছুটির প্রয়োজন হয়, আজ এঁর বিয়ে, কাল ওঁর মেয়ের বিয়ে, পরের সপ্তাহে কারও ছেলের ভিনরাজ্যে কলেজে ভর্তি হ’তে যাওয়া, কিংবা আরেকদিন কারও মায়ের চোখ অপারেশন, এমন সব কারণে ছুটির প্রয়োজন বছর-ভর চলতেই থাকে। যার যখন বেশি দরকার তখন তাকে ছুটি নিতে দেওয়া হয়, তবে কারখানা তো চব্বিশ ঘণ্টা চালাতেই হবে, তাতে ফাঁকি পড়লে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধবে, কাজেই কোনও একজন ছুটি নিলে তার কাজের দায়িত্ব নিতে হয় অন্য কাউকে। সেটা কেমন?

কারখানা সাধারণত চলে তিনটে শিফ্‌টে। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হওয়া মর্নিং শিফ্‌ট, ভরদুপুরে শুরু হওয়া ইভনিং শিফ্‌ট, আর রাতভর চলতে থাকা নাইট শিফ্‌ট। ধরো, প্রত্যেক শিফ্‌টে চারজন কম্পিউটারে বসা ইঞ্জিনিয়ার (অর্থাৎ কন্ট্রোল ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ার) আর ছ’জন টহলদারি করা ইঞ্জিনিয়ার (এঁদের ভালো নাম ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার) থাকবেন, এমনটা নিয়ম। এবার কোনও একদিন ইভনিং শিফ্‌টে একজন ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ার ছুটি নিলেন। তখন কাকভোরে কারখানায় ঢোকা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ইভনিং শিফ্‌টের কাজও ক’রে দিতে হবে, অর্থাৎ তিনি একটানা ষোলো-সতেরো ঘণ্টা ঠায় কম্পিউটারের সামনে ব’সে মাথা খেলিয়ে যাবেন। কেউ ছুটি নিলে তাঁর কাজের দায়িত্ব কে নেবেন, তাঁর একটানা কাজ করে দেওয়ার পরের পাওনা ছুটি আবার কেমন করে তিনি জোগাড় করবেন, সেসব ভারি জটিল হিসেব, ও বোঝা আমাদের কম্ম নয়। যাঁদের গরজ তাঁরা বুঝে নিয়ে কাজ চালাতে থাকেন।

তা, দোল-দুর্গোৎসবের ছুটিগুলোও এমনভাবেই ঝুলিতে জড়ো করা হয়। ধরো, কেউ ছুটি পেলো ষষ্ঠী-সপ্তমী, সে হয়তো ঐ দু’দিনের ছুটি জোগাড়ের জন্য পঞ্চমীর দিনে ষোলো ঘণ্টা আপিস করল, আবার অষ্টমীর দিনে কারখানায় গিয়ে ফেরত এল নবমীর সকালে। আবার কেউ হয়তো ভাইফোঁটার দিনের ছুটিটায় বাড়িতে থাকতে পেলো ঠিকই, তবে তার আগের দু’রাত তাকে জেগে কাটাতে হলো কারখানায়। সে মানুষটার ঘুমের ঘোর কাটতে কাটতেই ভাইফোঁটার সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল।

এই হলো এই মানুষগুলোর জীবনের রোজনামচা। আলো গড়ার কারিগর এঁরা। বাইরে থেকে দেখলে ভারি সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা মনে হয় এঁদের ঘর-গেরস্থালীকে। কেমন গাছের ছায়ায় ঘেরা ছিমছাম উপনগরে বাস এঁদের আর এঁদের পরিবারদের। কোম্পানির দেওয়া ঘর-বাড়ি, নামমাত্র খরচে বিদ্যুৎ-জল ইত্যাদি পরিষেবা, দিব্যি কোম্পানির গাড়িতে চেপে সুখকর অফিসযাত্রা --- বাইরে থেকে দেখলে বেশ লাগে, ঈর্ষাও জাগতে পারে মনে, কিন্তু পর্দা সরিয়ে অন্দরে উঁকি দিন, দেখতে পাবেন আমাদের বিদ্যুৎ-নির্ভর আধুনিক জীবনযাত্রাকে আরও মসৃণ করে তুলবেন ব’লে ঐ আপাত-সুখটুকুর আড়ালে মানুষগুলো কেমন দিন-রাত্রি একাকার করে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন।।

(অক্ষর পত্রিকা, শারদ সংখ্যা ২০১৭ তে প্রকাশিত )

Friday, 23 March 2018

উদযাপন



তিনবাটির টিফিন ক্যারিয়ারটা ব্যাগের মধ্যে ভরে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছোটি ম্যাডামের মহল থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে হাঁটা লাগালো সাবিত্রী। অন্যদিন যাহোক ডালভাত রেঁধে টিফিনবাক্সয় পুরে নিয়ে যায়। আজ তো আর তেমন করলে চলবে না, আজ যে ফেব্রুয়ারির চোদ্দ তারিখ! আজ এবাড়িতে হরেক কিসিমের রান্নাবান্না, মাছ মুর্গি মটনের গন্ধে চারিদিক ম ম করছে, ওবেলা দলে দলে লোক আসবে দামী দামী ফুলের তোড়া হাতে করে, বাড়িতে থাকলে কল্যাণও কেমন সুন্দর এসব তাক লাগানো ব্যাপারস্যাপারে ভাগ নিতে পারতো! সবই কপাল সাবিত্রীর। আউটহাউসের বাইরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে সে। তাদেরও তো আজকের দিনেই মালাবদল হয়েছিল, ছোটি ম্যাডাম ছোটাসাবের বিয়ের পরেই, ওই লগ্নেই। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্রাহ্মণত্বের অহঙ্কার ভুলে গিয়ে সাবিত্রীর বাবা কল্যাণ বাউরিকে জামাই হিসেবে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তাই সাবিত্রী তার বাড়ির ঠিকানা মন থেকে মুছে ফেলে কল্যাণের হাত ধরে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল পাঁচ বছর আগে, আজকের দিনেই। সেদিন ছোটাসাবের বিয়ে, চৌধুরী সাব লোক ভালো, ওই হট্টগোলের মাঝেও কল্যাণ আর সাবিত্রীর মুখ চুন করে এসে দাঁড়ানো দেখে, সব কথা শুনে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওইদিন তাঁর ছেলের বিয়ে হয়ে গেলে ওই আসনেই কল্যাণ মন্ত্র পড়ে সাবিত্রীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেবে। কল্যাণের বাকি দুই কূলেও কেউ ছিল না, কাজেই 'ঝট মাংনি পট বিহা'র জবাবদিহি কাউকেই করতে হয়নি। তারপর কেটে গেছে পাঁচ বছর, কমলা এসেছে ওদের কোল জুড়ে, চৌধুরী ইণ্ডাস্ট্রিজের দুই মালিকের খাস ড্রাইভার তখন কল্যাণ, শাকেভাতে বেশ কাটছিল ওদের দিনকাল, অন্তত এই ছমাস আগে পর্যন্তও।

ভাবনার ঘোরেই হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন চৌধুরী ভিলা ছেড়ে বেরিয়ে এসে অটোস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়েছে সাবিত্রী, সামনের অটোটা স্টার্ট দিয়ে কাছে এসে দাঁড়াতে হুঁশ ফেরে তার।

"আরে ও বউদি, কি অত ভাবছেন? অত ভাবলে মাথা কাজ করবে না আর। দেড় বচ্ছর বাদে দাদা ফেরা অব্দি মাথাটা ঠিক রাখতে হবে ত, নাকি? নিন নিন, উঠুন জলদি, আজ পোচ্চুর প্যাসেঞ্জার!"

পাড়াতুতো দেওর প্রদীপের অটোয় উঠে বসে সাবিত্রী। গন্তব্য আর নতুন করে বলার কিছু নেই, প্রদীপ সবই জানে। শুধু প্রদীপ কেন, গত ছমাস ধরে এ মহল্লার প্রত্যেকটা লোক জানে রোজ দুপুরে সাবিত্রী কোথায় যায়, বছর দেড়েক পর কল্যাণের কোত্থেকে ফেরার অপেক্ষায় সাবিত্রীকে এখন চৌধুরী ভিলায়ছোটি ম্যাডামের রাতদিনের ঝিয়ের কাজ করতে হচ্ছে, সবাই সব জানে।

অটোয় প্রায় আধঘণ্টার রাস্তা, শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত। আজ রাস্তায় একটু বেশিই ভিড় চোখে পড়ছে, বিশেষ করে অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েদের। জোড়ায় জোড়ায় জেন্টস সাইকেল -লেডিস সাইকেল পাশাপাশি, কিংবা একই সাইকেলে দুজনে দুজনের গা ঘেঁষে বসে, গালে গাল ঠেকিয়ে চলেছে সব, কোন চুলোয় কে জানে? এই ভরদুপুরে এত পীরিত জাগছে কোত্থেকে, ভগবান জানেন! মনে মনে গজগজ করতে করতে তিনবাটির টিফিন ক্যারিয়ারটা আঁকড়ে ধরে সাবিত্রী। আজ দইমাছটা খুব মন দিয়ে রেঁধেছে, লোকটা খুশি হবে তো খেয়ে?

ম্যাডামরা বলছিল বোনলেস কিসব রাঁধতে, এত বড় কাতলার আবার ওসব ভাল্লাগে নাকি? সে জোর করে ছোটি ম্যাডামকে বলেছে সে দইমাছই রাঁধবে, তার হাতের দইমাছ একবার খেলে আর ভুলতে পারবে না কেউ। ছ'মাস আগের ঘটনাটার পর থেকে ছোটি ম্যাডাম তার কাছে মুখ তুলে বা জোর গলায় কিছু বলতে পারে না, আর তার কমলাকে এমনভাবে আগলায়, যেন নিজের পেটের মেয়ে। ম্যাডামের নিজের এখনও ছেলেপুলে হয়নি, ডাক্তার দেখাচ্ছে নাকি, কানাঘুষোয় শুনেছে। আগে হলে বাঁজা মেয়েমানুষের অন্যের বাচ্চার ওপর এত দরদ সাবিত্রী সাদা চোখে দেখত না মোটেই, কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। কমলার ওপর ম্যাডামের টান বাড়লে যদি সাবকে বলে কল্যাণকে দুমাস আগেও বাড়ি ফেরাতে পারেন!

মুন্সিপালিটি বাজারের পাশ দিয়ে অটোটা যাওয়ার সময় প্রতিদিনের মতোই আজও সাবিত্রী কাঠ হয়ে বসে ছিল, দেখব না দেখব না করেও চোখ পড়ে গেল বাজারগেটের সামনের পানগুমটিটার দিকে। এই দোকানটাতেই ধাক্কা মেরেছিল ছোটাসাব, ছ'মাস আগের এক সন্ধেয়, গয়নার দোকান থেকে ফেরার সময়। ড্রাইভার কল্যাণকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালানোর শখ হয়েছিল তাঁর সেদিন। রঙিন চোখ, নাকি চশমার অভাবে, কেন সাবিত্রী জানে না, পানদোকান ভেঙে তার মালিকের ঘাড়ে আরামসে গাড়ি তুলে দিয়েছিলেন তিনি। ঠিক তেমনিভাবেই, থানাপুলিশ যখন হলো, নিজের সব দোষ তিনি অবলীলায় তুলে দিয়েছিলেন কল্যাণের ঘাড়ে।

সাবিত্রী আজও জানে না, ঠিক কি কারণে কল্যাণ এতবড় একটা মিথ্যে অপবাদ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে দু'বছরের শাস্তিভোগ করছে সদরজেলে। যতবার জিজ্ঞেস করেছে, কল্যাণের এক উত্তর, "তোদের বাঁচাতে চাই, তাই।"

অবশ্য শুনেছে নাকি জেল হয়েছিল আরও কয়েক বছরের জন্য, বড়াসাবের অসীম দয়া, তাঁর পরিবারের সম্মান বাঁচানোর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি কলকাঠি নেড়ে সে শাস্তি দু'বছরে কমিয়ে এনেছেন। সেই একই কৃতজ্ঞতার উদাহরণ হলো সাবিত্রীর এবাড়িতে রাতদিনের ঝিয়ের চাকরি পাওয়া। আজকের দিনে মেয়েসমেত খাওয়াপরা মানইজ্জত ইত্যাদির দায়িত্ব আত্মীয়রাই কেউ নেয় না, সেদিক দিয়ে এঁরা মহানুভব বৈকি! এমনকি এই যে সাবিত্রী রোজ দুপুরে জেলখাটা বরের জন্য খাবার বয়ে নিয়ে যায়, এও মেমসাব আর বড়াসাবের সুপারিশেই সম্ভব হয়েছে।

বাপরে, ফুলের দোকানগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে। স্কুলকলেজের ছেলেমেয়েদের ভিড় সব। বিরক্ত হতে গিয়ে সাবিত্রীর মনে পড়ে, আরে, তাদের বিয়ের দিনেই ভ্যালিন্টাইন দিনও না? বিয়ের আগে জানতো না, বিয়ের পরেই জানতে পারে আজকের দিনটা নাকি ভালবাসার দিন! অবাক হয়ে গিয়েছিল শুনে। ভালোও বাসতে হয় দিনক্ষণ দেখে! এ তো তার বাপের পাঁজি দেখে নিমবেগুন খাওয়ার মতো ব্যাপার! কল্যাণ বুঝিয়েছিল, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ভালবাসাকে মনে রেখে দেওয়ার জন্য এ হলো ভালবাসার উৎসব। তেমন কিছুই বোঝেনি সাবিত্রী, তবে দুবছর আগে এই দিনটায় কল্যাণ পায়ের আঙুলে পরার চুটকি এনে দিয়েছিল একজোড়া, মুখে রাগ দেখালেও মনে মনে ভারি খুশি হয়েছিল সে।

আগের কথা মনে করে ছোট্ট একটা নিশ্বাস পড়ে। তারপর মনে হয়, মনে রেখে দেওয়া নিয়ে তো কথা! আগেরবার কল্যাণ দিয়েছে, এবার নাহয় সেই দিক কিছুমিছু। কিন্তু জেলের গারদের ওপারে থাকা মরদকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে তথা বিবাহবার্ষিকীতে কি উপহার দেওয়া যায়, তা ভেবে কুলকিনারা পায় না বেচারি সাবিত্রী।

গন্তব্যে পৌঁছে অটো থেকে নেমে চোখ পড়ে পানের দোকানটার দিকে। এই তো, পেয়ে গেছে দেওয়ার জিনিস! লোকটা পান খেতে খুব ভালবাসতো, মোলায়েম মিঠাপাত্তির মিষ্টি পান, জর্দা কম দিয়ে। সাবিত্রীই রাগারাগি করে ছাড়িয়েছে একসময়, খরচা বেড়ে যাওয়ার ভয়ে। আজ সেই একখিলি মিঠা পান কিনে টিফিনবাটির ব্যাগে ঢুকিয়ে থানার ভেতর ঢুকে পড়ে সে, ঠোঁটে লেগে থাকে একচিলতে একটা হাসি, মায়ামাখা, একটু অন্যরকম।

আর তক্ষুনি, ব্রহ্মাণ্ডের কোনও এক কোণে বসে মুচকি হাসেন, কোনও এক সেইণ্ট ভ্যালেন্টাইন।।

(সমাপ্ত)

হারায়_না_তো_কিছু


"ওই ফর্সাপানা মেয়েটা কে গো দিদা, হিরোইনের মতো? আর সঙ্গে ওই কিরিম মাখা বাচ্চাটা?"

"ও মা, ও তো আমার মেয়ে, তোর তুতুলমাসি। বাচ্চাটা ওর ছেলে, আমার দাদুভাই। আজ কত বচ্ছর পর দেশে এসেছে, ক'মাস থাকবে এখন।"

"হ্যা:! ওইটা নাকি তোমার মেয়ে! তোমার মেয়ে তো ওই ফটোকের তুতুলমাসি, রোজ বিকেলে খেলে এসে তোমার কাছে বসে মাথায় তেল মেখে বিনুনি বেঁধে দুধমুড়ি খেয়ে পড়তে বসতো। এমন হিরোইনপানা মেয়ে কখনও মাথায় তেল দেয়? নাকি দুধমুড়ি খায়?"

"না রে পাগলি, ওটাই আমার মেয়ে, তোর তুতুলমাসি। তোরা আসার পরে আর আসেনি তো, তাই চিনতে পারছিস না। নে নে, অনেক বকেছিস, যা ওপর ঘর থেকে গ্রামার বইটা নিয়ে আয়, ক'টা ট্রান্সলেশন দিই।"

একটু পরে দৌড়ে দৌড়ে ঘরে ঢোকে ছোট্ট দুটো হরিণ-পায়ের মালকিন, হাতে গ্রামার বই আর আরেকটা মোটা বই।

"ও দিদা, ওই মেয়েটা 'আরে আরে জাগমোন ' জানে! আমিও বলতে পেরেছি দেখে হাততালি দিয়ে নেচে নিলো একপাক। আমি 'হুঁকোমুখো'ও বলতে পেরেছি, তাই আমায় এটা দিলো, আর বলল জাগমোন নয়, জগোমোহোন।"

"দেখলি! তোকে উচ্চারণ ঠিক করতে বলি, শুনিস না।"

 "এটা তো তুতুলমাসির বই দিদা, ও কেন দিলো এটা? তোমার মেয়ের বইয়ের আলমারি থেকে একটা করে বই নামাচ্ছিল আর শুঁকছিল, বুকে জড়াচ্ছিল আর চোখ মুছছিল, কেন গো? তুতুলমাসিও বইগুলোকে আদর করতো না এরম করেই, তুমি বলো মাঝেমাঝে? তাহলে কি এটাই তুতুলমাসি, হ্যাঁ দিদা?"

"হ্যাঁ রে বাবা হ্যাঁ। বিশ্বাস হলো এবার? মাথায় তেল আর দুধমুড়ি নেই, কিন্তু তোর তুতুলমাসি আছে, ঠিক সেইইরকম।"

(সমাপ্ত)

ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্য - kromosho prokashyo তে প্রকাশিত

Monday, 6 November 2017

খটকা


বিকেল হলেই আজকাল বাড়িটা বড় টানে ভবতোষকে। আগে যেমন সন্ধে হতেই টানতো ক্লাবঘরে তাসের আড্ডা, এখন তেমন করেই দুহাত বাড়িয়ে ডাকে ছোট্ট একতলা বাড়িটা।
এই বুঝি গিন্নি এলেন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, এসেই বুঝি ভবতোষের হাত থেকে রিমোটটা ছোঁ মেরে নিয়েই নিমেষে চ্যানেল বদলে ফুটবল থেকে পটলকুমারের গানে ঢুকে পড়বেন, মোক্ষম গোলখানাই আর দেখতে দেবেন না পতিদেবতাটিকে।
ভাবতে ভাবতেই খেয়াল হয়, আরে, পটল কুমার তো ক-অ-বে শেষ হয়ে গেছে, সেইসঙ্গেই মনে পড়ে, বড়ছেলেকে কালকেই দেখলেন কাবলের দোকান থেকে টুপি কিনতে, ন্যাড়া মাথায় রোদটা বেজায় ঝাঁঝালো লাগে কিনা!
আচ্ছা, এই পোড়া গরমে ছেলেটা ন্যাড়া হয়েছে কোন আক্কেলে? প্রশ্নটা মনে আসতেই সবকিছু মনে পড়ে যায় ভবতোষের।
কেবল একটা খটকা যায় না কিছুতেই। দুদিন আগেই অত খরচা করে দুই ছেলেতে বাপের শেষ কাজ করলো, তাতেও তাঁর শখসাধে ভরা আত্মাটি মুক্তি না নিয়ে রোজ বিকেল হলেই বাড়িটার পানে ধেয়ে যায় কেন?

গোলাপি তিমির বৃত্তান্ত



সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নীল তিমির ধাক্কায় টেক-স্যাভি গেমপ্রিয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে জীবন থেকে সরে যাওয়ার এক উদ্দাম প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে, মিডিয়ার কল্যাণে সে সংবাদ আমাদের সবার কাছেই পৌঁছেছে। সত্যি বলতে কি, নীল তিমি সংক্রান্ত খেলাটি সম্পর্কে আপনার বিন্দুমাত্র কৌতূহল না থাকলেও সাবধান করার অছিলায় সেটি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য আপনার মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও অনেকে নিয়ে ফেলেছে। তাই এই মারণখেলা নিয়ে বেশি কথা খরচ করছি না। বরং আজ একটা গোলাপি তিমির গল্প শুনব চলুন।

এই 2017-র এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে একটা খেলা শুরু করেছে Baleia Rosa (পর্তুগিজ ভাষায় গোলাপি তিমি) নামক একটি ওয়েবসাইট, ইতিমধ্যে সাড়ে তিন লাখের ওপর লোক তাদের ফেসবুকের পাতায় খেলাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন, খেলতে শুরুও করেছেন।

এইটুকু পড়ে ভুরু কুঁচকে ফেলেছেন তো? ভাবছেন আপদগুলো আবার একটা মরণফাঁদের গল্প শোনাতে এসেছে! আজ্ঞে না মশাই, এ কোনও মরণফাঁদ নয়, বরং নীল তিমির করালগ্রাস থেকে আমার আপনার আশেপাশের সদ্যযৌবন পাওয়া প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটা চেষ্টা বলতে পারেন, অন্তত পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টাদের বক্তব্য তাই। তা, কেমন এই খেলা?

ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতোই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমেও রয়েছে পঞ্চাশটি কাজের এক তালিকা, খেলব বলে তাদের খাতায় নাম তুললে আপনাকে টুকটুক করে সেইসব কাজগুলো একে একে সেরে ফেলতে হবে। তবে গোলাপি তিমির দেওয়া কাজগুলো অতীব জীবনমুখী।

হয়তো আপনাকে বলা হল রোজ একটা করে চিরকুটে লিখে ফেলুন সেদিন কি ভাল কাজ করলেন, তারপর সেটা জমা করুন লক্ষ্মীর ভাঁড়ে, এক বছর পর ভাঁড় ভেঙ্গে ভাল কাজের ডায়েরি পড়বেন।

কিংবা ধরুন বাবা-মা-পিসি-মাসি এঁদের সবাইকে আপনি কত্ত ভালবাসেন সেটা তাঁদের জানানোর দায়িত্ব পড়ল আপনার ওপর। তা, এদেশে তো গুরুজনদের জড়িয়ে ধরে 'ভালোবাসি' বলার চল বিশেষ নেই, কাজেই তাঁদের হাতে হাতে ক'টা কাজ করে দেবেন, নিদেনপক্ষে আধঘণ্টাটাক সময় বের করে তাঁদের মুখোমুখি বসে দুটো নিঃস্বার্থ কথা বলবেন, ওতেই ওঁরা আপনার ভালবাসা দিব্যি অনুভব করবেন।

আমাদের দেশে এখন জোরকদমে স্বচ্ছতা অভিযান চলছে। তাতেও উৎসাহ জোগানোর উপায় আছে গোলাপি তিমির কাছে। সারাদিনে একবারের জন্য হলেও যদি অন্য কারও রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা নিজে হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসেন, তবে আপনি একজন সফল খেলোয়াড়। বিনা কারণে রাস্তা পরিষ্কার রাখার দায় আমাদের না-ই থাকতে পারে, কিন্তু খেলায় জেতার বাসনায় তো অবশ্যই আমরা রাস্তা সাফসুতরো করে ফেলব, তাই না?

এমন ভালো কাজের তালিকা বেশ লম্বা, যেমন, নিজের অব্যবহৃত জিনিসপত্র দুর্গত মানুষের সাহায্যার্থে দান করা, মজাদার পোশাক পরে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা, মাঝেমধ্যে আয়নার ওপারের মানুষটার সঙ্গে হেসে রঙ্গতামাসা করা, যাতে বোঝা যায় সে সত্যিই ভাল আছে, মেঘের মধ্যে তুলোর ঝুড়ি বা ডাইনোসর লুকিয়ে আছে কিনা তা খোঁজা, মনের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে কাগজে এঁকে ফেলে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য চলতে শুরু করা, এবং সবার শেষে সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি, একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা। জীবন শেষ করে দেওয়ার চেয়ে জীবন বাঁচানো যে অনেক কঠিন কাজ সে তো আমরা সবাই জানি। গোলাপি তিমির ছুঁড়ে দেওয়া এই যে জীবন বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ, এটা যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার জীবনে হতাশা বলে সম্ভবত আর কিছু থাকবে না। যে মানুষটা হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিলো, তাকে আরেকটা জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনা, এই কাজটাই করতে চাইছে গোলাপি তিমি। তার দেওয়া আপাত বালখিল্য কাজগুলো এই উদ্দেশ্যেই তৈরি। বারবার 'তুমি ভালো, তুমি সুন্দর, তুমি কত কিছু করতে পারো!' এগুলো মনে করিয়ে খেলতে থাকা মানুষটার আত্মবিশ্বাসের ভিত পোক্ত করে দেয় সে, যেখানে হতাশার কোনও জায়গা নেই।

 2015 থেকে ওয়েবদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল নীল তিমির আক্রমণ, তার মোকাবিলায় 2017 তে এল গোলাপি তিমি। সাও পাওলোতে সরকারের পক্ষ থেকেও গোলাপি তিমির প্রয়াসকে সমর্থন করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বব্যাপী মারণখেলাকে কিছুটা হলেও রোখা যায়। ভারতেও থাবা বসিয়েছে নীল তিমি, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষেধক হিসেবে এখানেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমটাকে যদি নাও ব্যবহার করতে চাই, খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ভালো কাজের তালিকাকেও যদি রোজকার জীবনে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, তাতে আর কিছু না হোক, জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগাযোগ বাড়বে, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অকালে পরপারে পাড়ি দিতে চাওয়ার প্রবণতা তাতে কিছুটা কমতে পারে।।

********************

তথ্যসূত্রঃ
http://baleiarosa.com.br
http://indianexpress.com


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.708159399363905.1073741828.707552542757924/776736352506209/?type=3&source=54