বই : Thinking in Pictures : My Life with Autism
রচনা : Temple Grandin
প্রকাশক : Vintage Books
বইটি পড়ার জন্য সাজেশন পেয়েছিলাম NIMHANS ব্যাঙ্গালোরের একজন ডাক্তারের কাছে। আমাদের মেয়ের বিহেভেরিয়াল চেঞ্জ শুরু হওয়ার পর যখন NIMHANS-এ যাই, ওঁরা জানিয়েছিলেন, হতেও পারে আমার মেয়ের হাই ফাংশনিং অটিজম আছে। নিশ্চিত না হতে পারার কারণ, ওর যাবতীয় অসুবিধা, স্পিচ রিগ্রেশন, ডিলে ইন রেসপন্স, ল্যাক অফ আই কনট্যাক্ট, ভেরি শর্ট অ্যাটেনশন স্প্যান, সবই শুরু হয় চার বছর হওয়ার পর, বড় স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে, ফর্ম্যাল স্কুলিং শুরু হওয়ার পর। তার আগে ও পুরোদস্তুর কনভার্সেশন চালাতে পারতো, সব কাজে অত্যন্ত উৎসাহী ছিল, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে ভালবাসতো। এর প্রত্যেকটি অভ্যেসই ধীরে ধীরে একেবারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
মেয়ের ব্যাপারে এখানে বেশি বলছি না, বিশদে লেখার ইচ্ছে আছে, অন্য কোনওদিন লিখব। আজকের লেখার উদ্দেশ্য Thinking in Pictures : My Life with Autism বইটির ব্যাপারে কথা বলা। অভিজ্ঞ অনেক অভিভাবকরা হয়তো এই বই তাঁরা পড়েছেন। যাঁরা পড়েননি, তাঁদের অনুরোধ করব পড়ে দেখতে। লেখিকা টেম্পল গ্র্যাণ্ডিন একজন প্রাণিবিদ। এবং তিনি একজন 'অটিজম স্পোকসপার্সন'। অটিজম স্পেকট্রামে থাকা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তিনি অন্যতম একজন, যিনি নিজের ছোটবেলার এবং বড়বেলার বহু অভিজ্ঞতার কথা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। এমনই একটি বই হলো 'Thinking in Pictures'. অটিজমকে বোঝার ইচ্ছে এবং দায়িত্ব, স্পেকট্রামে থাকা মানুষদের বোঝার ইচ্ছে এবং প্রয়োজনীয়তা যাঁদের রয়েছে, তাঁদের কাছে এই বই অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের সেন্সরি প্রবলেম অটিজম স্পেকট্রামের সঙ্গে প্রায়শই জড়িয়ে থাকে, সেসব ইস্যুর লেভেল নানারকমের হয়, বলা চলে এক্সট্রিমলি মাইল্ড টু এক্সট্রিমলি সিভিয়ার। সাধারণ অভিভাবকদের পক্ষে সমস্যাগুলিকে চিনতে পারা সম্ভব হলেও সেসব সমস্যার কারণ ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে, সেটা বোঝা সম্ভব হয় না। কারণ বাচ্চা নিজেও বুঝতে পারে না সমস্যাটা কোথায়, অন্যকে বোঝাতে তো পারেই না। চিকিৎসক এবং থেরাপিস্টের পরামর্শে, এবং ট্রায়াল অ্যাণ্ড এরর মেথডে অন্ধকারে হাতড়ে বাবামাকে এগোতে হয়, ম্যানেজমেন্টের উপায় খুঁজতে হয়। গ্র্যাণ্ডিন তাঁর বইয়ে বিভিন্ন সেন্সরি প্রবলেম উল্লেখ করে করে বুঝিয়েছেন সেসব সমস্যার কারণ, এবং ম্যানেজমেন্টের সম্ভাব্য উপায়, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। তাঁর নিজের, এবং স্পেকট্রামে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে প্রতিটি সমস্যার উদাহরণ হিসেবে।
কেবল প্রবলেম ম্যানেজমেন্টই নয়, স্পেকট্রামে থাকা একটি বাচ্চার স্ট্রেংথকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে তার শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাও গ্র্যাণ্ডিন বুঝিয়েছেন নিজের স্কুলজীবন ও কলেজজীবনের অভিজ্ঞতা (সুখকর এবং তিক্ত দুরকমই) উল্লেখ করে করে, যে অভিজ্ঞতা আমার মনে হয় প্রত্যেক অভিভাবকদের জন্য খুবই কাজের। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, গ্র্যাণ্ডিনের লেভেল হাই ফাংশনিং, তাঁর যা যা স্ট্রেংথ ছিল বা আছে, ততটা সবার নাও থাকতে পারে, কিন্তু যার যতখানি স্ট্রেংথ রয়েছে ততখানি নিয়েই তো আরও কিছুটা এগোনো যায়, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যায়! সেটাই গ্র্যাণ্ডিন তাঁর বইতে বারবার বোঝাতে চেয়েছেন।
তাঁর ছোটবেলার গল্পে এসেছে তাঁর মা এবং পরিবারের অন্যান্যদের ক্রমাগত লড়াই। গ্র্যাণ্ডিনের বোঝার ক্ষমতা, নিজের শক্তি এবং দুর্বলতাকে চিনতে পারার ক্ষমতা, সে তো একদিনে আসেনি, নিজের দুর্বলতাকে সঙ্গে নিয়ে, তাকে পেরিয়ে গিয়ে কেমন করে নিজের লড়াইটা লড়তে হয়, সেটা শেখার ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন তাঁর মা। আমরা মনে রাখব, গ্র্যাণ্ডিনের জন্ম ১৯৪৭-এ। সেই সময়ে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতার ব্যাপারটা আঁচ করা যাচ্ছে নিশ্চয়ই? লড়াই তাঁরা করেছেন সেই যুগে দাঁড়িয়ে। সেকারণেই আমাদের সবার আরও বেশি করে গ্র্যাণ্ডিনের কথা জানা প্রয়োজন।
সবশেষে একটা কথা বলি, মেয়ের অটিজম আছে, নাকি লার্নিং ডিসএবিলিটি, নাকি ট্রমা বা অন্য কিছু, এসব নিয়ে অহরহ উদ্বেগে ভুগতে থাকা মা হিসেবে নয়, একজন সাদামাটা পাঠিকা হিসেবেও যদি বইটার কথা ভাবি, তাহলেও বলব, এই বই কোনও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। কারণ এই বই আমাদের সঙ্গে পরিচয় করায় এমন এক জগতের সঙ্গে, যার সঙ্গে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিচিত হচ্ছেন বা হয়েছেন নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, বাকিরা এখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারে। অজানাকে জানার টানেই তো পাঠক বই হাতে তুলে নেয়, তাই না?
