Sunday, 29 July 2018

#আন্তর্জাতিক_শিশুশ্রমবিরোধী_দিবসে

#ধূপছায়া_মজুমদার

************************

"বয়স বারো কি তেরো বড়জোর চোদ্দ
রিকশা চালাতে শিখে নিয়েছে সে সদ্য"

ঘর ভরে আছে মৃদু স্বরে আর সুরে, স্নান সেরে সোফায় এসে বসে খবরের কাগজটা খুললেন মিসেস সেন। এইটুকুই সময়, নিজেকে দেওয়ার। মিনু চা রেখে গেছে, মুখে দিতেই মুখটা বেঁকে গেল।

"মিনু, মিনু!"

"হ্যাঁ মামীমা!"

"জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেবো তোমার, এত ক্যালাস কেন? একটা কথা বললে মনে থাকে না? কতবার বলেছি আমার চায়ে চিনি দিবি না!"

"এ বাবা, চিনি দিয়েছি? ভুল হয়ে গেছে মামীমা, আর হবে না।"

"ভুল হয়ে গেছে মামীমা! ন্যাকামো! চোদ্দ বছরের ধাড়ি মেয়ে, তাকে রোজ পাখিপড়া করে কাজের ফিরিস্তি বোঝাতে হবে। মাস গেলে মাইনের টাকা গুনে নিয়ে বাপের হাতে তুলে দিতে তো ভুল হয় না? ভালোমন্দ গিলে শাঁসেজলে বেড়েছিস, হাড়হাভাতে চেহারাটা ভুলে গেছিস বোধহয়? দূর করে দেবো বাড়ি থেকে, মরবি না খেতে পেয়ে, তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!"

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বাশুলিথান গাঁ থেকে আসা রাতদিনের ঝি মিনু, মিসেস সেনের মুখ চলতে থাকে, তার সঙ্গে প্রাণপণে পাল্লা দিতে গিয়ে হেরে যান সাউন্ড সিস্টেমের সুমন, ফ্যানের হাওয়ায় ফরফর করে উল্টে যায় কাগজের প্রথম পাতাটা, কাগজের নামের অক্ষরগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকে কড়া পড়ে যাওয়া কচি কচি হাতগুলো, তাদের ছবির নিচে ক্ষুদে অক্ষরে লেখাটা চোখে পড়েই না প্রায়, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস।

***********************

রিয়া আর ওর বাবা একটু পরে বেরোবে ফর্ম জমা দিতে। এই চত্বরে ভালো স্কুল একটাই, কাজেই ঝেঁটিয়ে মেয়েরা আসবে ভর্তি হতে, এক্ষুনি না বেরোলে লাইন অনেক লম্বা হয়ে যাবে। ছুটোছুটি করে জলখাবারের জোগাড় করছিল সোমা, পিঙ্কির দিকে চোখ যেতেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। গামলায় ধরে রাখা জলটার মধ্যে বাসনগুলোকে ডুবিয়ে কোনওরকমে ধুয়েই ছুঁড়ে দিচ্ছে মাজা বাসনের ঝুড়িতে।

"ও কি পিঙ্কি? ও কেমন বাসন ধোয়া? ম্যা গো, ওই সাবানগোলা ঘোলা জলটায় ধুয়ে রেখে দিচ্ছিস? কল খোল, রগড়ে ধো আবার সবকটা বাসন, যেদিকে দেখব না সেদিকেই ফাঁকি। এইজন্য কড়কড়ে নোটগুলো গুনে দিই প্রতিমাসে?"

"কাকিমা কাল থেকে সব ভালো করে ধুয়ে দেবো, রগড়ে রগড়ে, ঝকঝকে করে। আজ ছাড়ান দ্যাও, ইস্কুলে যেতে হবে, ভত্তির ফরম জমা করতে।"

"অ্যাঁঃ, ইস্কুল যাবেন, বিদ্যের জাহাজ হবেন! এবার বলবি সায়েন্স নিয়ে পড়বি! কালে কালে কত যে দেখব!"

একটু থেমে যোগ করে সোমা,

"ওসব ইস্কুল ফিস্কুল গেলে তোর মাকে পাঠিয়ে দিবি, টাইম পেলে সে করুক, নইলে অন্য লোক দেখব। বিদ্যেধরী ঠিকের ঝি রেখে কাজ নেই আমার, দুদিন অন্তর পড়া, পরীক্ষা, নিজে খেটে মরো তখন!"

জলখাবার গোছাতে গোছাতে গজগজ করতে থাকে সোমা, মুখ বুজে বাসন ধুতে থাকে পিঙ্কি, ডাইনিং চেয়ারে বসে তখন রিয়া ওর এক বন্ধুর দিদির প্রোফাইলে শেয়ার করা একটা লেখা পড়ছে মন দিয়ে, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস উপলক্ষ্যে লেখা বেশ জ্বালাময়ী একটা আর্টিকেল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে রিয়ার বাবার মোবাইলেও খোলা রয়েছে ওই আর্টিকেলটাই, অন্য কারও প্রোফাইলে শেয়ার করা। এসব জ্বালাময়ী আর্টিকেল কয়েক মিনিটে কয়েকশো শেয়ার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে, উঠোন থেকে উঠোনে।

****************************

তিন্নির আজ ভ্যাকসিন নেওয়ার ডেট ছিলো। বুস্টারের ফার্স্ট ডোজ, নেওয়ার সময় খুব হাত-পা ছুঁড়েছে, কেঁদেছে। ডক্টর বললেন জ্বর আসবে, তাই একটু টেনশন মতন হচ্ছে শ্রেয়ার। সকালে কিছু খেয়ে বেরোয়নি, এখন ফেরার পথে একটা কচুরির দোকানে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে প্রদীপ্ত। তিন্নি ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই শ্রেয়া গাড়িতেই রয়েছে, প্রদীপ্ত ওর প্লেটটা পাঠিয়ে দিয়েছে দোকানে কাজ করা ছেলেটাকে দিয়ে।

বাচ্চা ছেলে, বছরদশেক হবে হয়তো, খাবার দিতে এসে কেমন জুলজুল করে দেখছিল ঘুমন্ত তিন্নির দিকে। তিন্নির দিকেই কি? নাকি ওর পাশে সিটের ওপর রাখা পিঙ্ক টেডি, অরেঞ্জ বল আর রংবেরঙের ক্যাটারপিলারটার দিকে? বোঝেনি শ্রেয়া, শুধু আড় হয়ে ঘুরে বসে তিন্নিকে আর খেলনাগুলোকে আড়াল করে ছেলেটার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নিয়েছিল।

সকাল থেকে কিছু খায়নি, কচুরির প্রথম টুকরো মুখে পুরতেই আবেশে চোখ বুজে এসেছিল আপনাআপনি। কাঁচতোলা গাড়ির জানলায় টকটক আওয়াজ শুনে চোখ খুলে তাই চমকেই গিয়েছিল শ্রেয়া।

একটা কটা চোখ কটা চুলের ফ্যাকাশে গায়ের রঙের ছেলে কাঁখে একটা কালোকোলো বাচ্চাকে নিয়ে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে, আর ইশারায় নিজের আর বোনের পেটের দিকে দেখাচ্ছে। দুজনেরই সারা গায়ে চিটধরা ময়লা, ভাগ্যিস গাড়ির কাঁচ তোলা, নইলে গন্ধে টেকা যেতো না বোধহয়। শ্রেয়া জানে, এই ভিখিরীদের একটা বিরাট বড় ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলো খুব এফিশিয়েন্ট ওয়ার্কার। এরা ভিক্ষে হিসেবে খাবারের চেয়ে টাকা প্রেফার করে বেশি, ভাগটাগ করে নিজেদের কপালে যা জোটে সবই নেশায় উড়িয়ে দেয়। এদের পয়সা দেওয়া মানে পয়সা নষ্ট করা। এঁটো ডানহাতটা কপালের কাছে তুলে 'মাফ করো' গোছের একটা সিগন্যাল দেয় শ্রেয়া। তাতেও ঠ্যাঁটার মতো দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। হাল ছেড়ে দিয়ে ওদের দিকে পিছন ঘুরে বসে কচুরিতে মন দেয় শ্রেয়া, টেস্টটা সত্যিই ভালো।

গাড়িতে বাজতে থাকা এফ এম চ্যানেলটায় মর্নিং শো-র আর. জে. তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে শ্রোতাবন্ধুদের জানাতে থাকেন আজকের দিনটির তাৎপর্য, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস।

(সমাপ্ত)

ছবি : http://www.un.org/en/events/childlabourday/

No comments:

Post a Comment