Thursday, 26 July 2018

#বাঞ্জি-পুরাণ কথা (অক্ষর পত্রিকায় প্রকাশিত)


আমার পতিদেবতাটি, বুঝলেন, মনে মনে বেজায় অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ। এমনিতে হাবভাব দেখে সেকথা মনে হবে না, দিব্যি ভালোমানুষের মতো পালা করে তিনবেলার শিফটে আপিস যাচ্ছেন, বাড়ি থাকলে হয় ঘুমোচ্ছেন, নইলে টিভি চালিয়ে শেয়ারবাজারের খবর খুলে গ্যাঁট হয়ে সোফায় বসে থাকছেন, ফ্রিজের আনাজপাতি এক্কেবারে ফুরিয়ে গেলে দু'থলি বাজার করে এনে আমায় কৃতার্থ করে দিচ্ছেন, আর ফ্রিজটা বড্ড নোংরা হয়ে থাকলে ঘষেমেজে সেটিকে ঝকঝকে করে তুলছেন। অবিশ্যি বাড়িতে থাকলে মেয়ে তাঁর বাবাকে একদণ্ড একলা ছাড়েন না, সে আলাদা কথা। যাইহোক, এহেন নিরীহ মানুষটির মনে যে থেকে থেকে অ্যাডভেঞ্চারের ঘন্টি বেজে ওঠে, সেকথা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

বছর দুয়েক আগে একবার খেয়াল চাপলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এভারেস্ট দেখতে ফালুট যাবেন ট্রেক করে। তখন কন্যারত্নটি একেবারে কচি, তাকে কাঁখে নিয়ে বারোহাজার ফুট উঁচুতে হেঁটে ওঠার দু:সাহস দেখানো অসম্ভব, তাই তিনি ঠিক করলেন ব্যাচেলর সেজেই বেরিয়ে পড়বেন। তা ভালো, কিন্তু বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে যাও! তা নয়, দুচারজন বন্ধুকে শুধোলেন, তারা কেউ গা করল না, অমনি ছড়ি হাতে আর রুকস্যাক পিঠে শেরপাভায়ার হাত ধরে তিনি একলাই ঘুরে এলেন সান্দাকফু আর ফালুট, চাট্টি নয়া ইয়ারবন্ধুও জুটিয়েছিলেন শুনেছিলাম সেখানে গিয়ে।

সে নয় হলো, কিন্তু এই অভিযানের পর তাঁর সাহস গেল বেড়ে। তার পরের বছর কালিম্পং গিয়েছি বেড়াতে, তিনি বললেন উড়বেন। প্রথমে ভেবেছিলাম বেড়ানোর আনন্দে ভুল বকছেন বোধহয়, তারপর ডেলো পাহাড়ের রংচঙে পার্কে ঢোকার মুখে উড়নেওয়ালাদের বুকিং আপিস দেখে বুঝলাম কেবল আমার কত্তাটির নয়, ভুল বকা রোগে ধরেছে আরও দুতিনজনকে, তাঁরা সব লাইন লাগিয়েছেন উড়বেন বলে, মানে ওই প্যারাগ্লাইডিং-এর প্যারাস্যুট গোছের জিনিসটা গায়েপিঠে মাথায় বেঁধে নিয়ে সাঁইই করে আকাশে ভেসে খানিকক্ষণ পাখি পাখি ভাব জাগানোর চেষ্টা আর কি! ব্যাপারস্যাপার দেখে গলা জিভ শুকিয়ে আসছিল, ভাবছিলাম কেঁদেকেটে ওড়াউড়ির শখ ঘুচিয়ে দিই। কিন্তু অতীতের কথা মনে এল, নিজেকে সামলালাম।  হয়েছিল কি, বিয়ের পরপর গোয়ায় গিয়ে সমুদ্রের বুকে উড়ব বলে বিচ্ছিরি একখানা যন্ত্রে উঠেছিলাম যুগলে। তারপর আমি ভয়ে ভয়ানক কান্নাকাটি চেঁচামেচি জুড়েছিলাম, আর তাইতে ঘাবড়ে গিয়ে কত্তামশাই ওড়ার আনন্দ ভুলে আমায় নিয়ে তড়িঘড়ি নিচে নেমে এসেছিলেন। নামার পর বলেছিলাম, "এবার ভয়টা কমলো, আরেকবার উড়লে হয়!" তাই শুনে নাকি তাঁর গায়ে জ্বালা ধরেছিল ভয়ানক।

 আমার জন্য তিনি মন খুলে উড়তে পারেন নি, এ খোঁটা আমায় আজও সইতে হয়। তাই ঠিক করলাম, যা মন চায় করুকগে লোকটা, বারণ-টারণ কিচ্ছু করব না। আমি মেয়ে নিয়ে ফুল পাখি দেখে বেড়ালাম, আর তিনি সারা গায়ে বকলস বেঁধে ওড়াউড়ি সেরে এলেন। মোক্ষলাভ কদ্দূর কি হয়েছিল জানি না, তবে কিছুদিন দেখলাম মুখেচোখে প্রশান্তি খেলা করছে।

সেই প্রশান্তি আসার ফলেই বোধহয়, একদিন শুনলাম কত্তামশাই বলছেন, "এবার ঋষিকেশ যেতে হবে।"

ঋষিকেশ কেন রে বাবা? সে তো সাধুসন্ন্যাসীদের জায়গা শুনেছি, আমার ইনি আর যাই হোন, সন্নিসীভক্ত ছিলেন না তো কোনওকালে! তবে কি আমার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বিবাগী হয়ে যাবেন ভাবছেন? কি এমন জ্বালাময়ী মানুষ বাপু আমি? স্বয়ং ভোলানাথকেও গিন্নির বচন শাসন একটু আধটু মেনে চলতে হয়, তুমি কি তাঁর চেয়েও ইয়ে নাকি হে! ভাবছি মুখ খুলব, নিজেই হেসে বললেন,
"ঋষিকেশে গিয়ে বাঞ্জি করতে হবে, বাঞ্জি!"

গেঞ্জি শুনেছি, শিম্পাঞ্জী শুনেছি, এমনকি নীলগিরি পাহাড়ে বারো বছর অন্তর ফুটে ওঠা 'নীলকুরিঞ্জি ' ফুলের নামও শুনেছি, কিন্তু বাঞ্জি? সে তো শুনিনি! শুধোলাম তাঁকেই, তিনিও বিগলিত হয়ে জ্ঞান বিতরণে বসলেন, সুযোগ তেমন পান না তো, পেলেই তাই বর্তে যান।

শুনলাম বানুয়াটু (Vanuatu) দেশের পেন্টেকোস্ট (Pentecost) দ্বীপের ছেলেছোকরার দল নাবালক থেকে সাবালক, অর্থাৎ, পুরুষ মানুষ হয়েছেন কিনা তা পরখ করতে 'গল' (Gol) নামে একখানা খেলা খেলে থাকেন, তাতে  পায়ে লতা বেঁধে ২০-৩০ মিটার উঁচু একটা মিনার থেকে ঝাঁপ দিতে হয়। সেই ঝাঁপ থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে নাকি 'বাঞ্জি জাম্পিং ' নামক অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসটির উৎপত্তি। নিউজিল্যান্ডের বেশ কয়েক জায়গায় নাকি বেশ আটঘাট বেঁধে লোকজন এই ঝাঁপদোলনার খেলাটি খেলেন। বেশ শক্তপোক্ত একখানা ইলাস্টিক দড়ি পায়ে কষে বেঁধে ৮০-৯০ মিটার উঁচু টাওয়ার বা ব্রিজ বা পাহাড়চুড়ো থেকে লোকজন মনের আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়েন, ওই একখানা ইলাস্টিক দড়ি তাঁদের ভূপতন এবং হাড়গোড় চূর্ণনের হাত থেকে রক্ষা করবে, এই ভরসায়।

গপ্প শুনতে ভালোই লাগছিল, শেষটায় কত্তামশাই বললেন,
"ইন্ডিয়ায় হাইয়েস্ট লেভেল থেকে বাঞ্জি করায় ঋষিকেশে"
"কত?"
"৮৩ মিটার।"
"তুমি ওই তিরাশি মিটার উঁচু থেকে ঝাঁপাবে? একসময় বয়লারে উঠলে পা কাঁপতো যে তোমার? সেই সেবার এন টি পি সি বিন্ধ্যাচলে হামাগুড়ি দিয়ে বয়লার থেকে নেমেছিলে না?"
"ছো:! সে তো তেরো বচ্ছর আগে। তারপর দামোদর দিয়ে কত জল বয়ে গেছে জানো? আমি এখন হপ্তায় ক'বার বয়লারে চড়ি জানো? ওসব হাইট ফাইট কিস্যুতে আমার ভয় নেই আর। আমি ঋষিকেশ যাবোই, আর বাঞ্জি করবোই। তুমি করবে?"
আমি ক্ষীণজীবী নিরীহ মানুষ, প্যালারামের ফিমেল ভার্শন, তায় আবার এখন একটি ছানামানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিত্যিদিন মাজার ব্যথায় নড়তে পারি না। ওসব শখ করে ঝাঁপাঝাঁপি খেলার শখ মোটেও নেই আমার। ওঁকেও আটকাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই গোয়ার প্যারাসেলিং-এর পর আমায় হ্যাটা করাটা মনে পড়ে গেল আবার। মনে মনে বুক ভর্তি করে নিশ্বাস নিয়ে বলে ফেললাম,
"চলো তবে, ওই চত্বরে ছানাকোলে যাওয়া যায়, এমন কোনও জায়গা বাছো। আমি ছানাকোলে হোটেলের ব্যালকনিতে বসে ছেলেভুলোনো ছড়া আউড়াবো, আর তুমি ঝাঁপদোলনা খেলে আসবে।"

জায়গা বাছা, পকেট গুছোনো, সস্তায় হোটেল খোঁজা সব সেরেসুরে দেখা গেল রুট ম্যাপে ঢুকে পড়েছে ধানোল্টি আর হরিদ্বার। হরিদ্বার যখন, ধার্মিক মানুষজনকে সঙ্গে নেওয়া উচিত, নইলে আমরা পাপীতাপী মানুষ, কোথায় কি দোষত্রুটি হয়ে যাবে, শেষটায় পুণ্যার্জনের খাতায় শূন্য পাই আর কি! দল তৈরি হল পাঁচজনের, আমরা কত্তাগিন্নি, শ্বশুর শাশুড়ি আর আমাদের কন্যা।

গুরুজনদের কাছে এই সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য চেপে যাওয়া হলো ভালোমানুষের মতো মুখ করে। তাঁরা তো উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ের ঝকঝকে আকাশ দেখে আর তাজা হাওয়ায় নিশ্বাস নিয়ে এক্কেবারে আপ্লুত, ধানোল্টিতে দূরে হিমালয়ের হাতছানিতে আমরা সবাই মুগ্ধ, মেয়ে তো ক্ষেপে উঠেছিল পাহাড়ে উঠবেই বলে, কেবল আমার উনিই দেখলাম সুযোগ পেলেই ইউটিউব খুলে ঘাড় গুঁজে কিসব দেখছেন আর হাত মুঠো করছেন, খুলছেন, আবার মুঠো করছেন। বুঝলাম রাজ্যির বাঞ্জি জাম্পের ভিডিও দেখে বুকে বল আনছেন। তা বুকে বল তো একটু লাগবেই বাপু, বাঙালির ছেলে নেচে উঠে চলেছেন ঝাঁপদোলনা খেলতে, তায় আবার এক্কেবারে নির্বান্ধব অবস্থায়, একলাটি। পায়ে ইলাস্টিক দড়ি বেঁধে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার আগে অ্যাড্রিনালিনের বান ডাকে যে 'হুই- হাই - ইয়োওওও' গোছের চিৎকারগুলোয়, সেধরনের হইহল্লা ওঁর পাশটিতে দাঁড়িয়ে করার মতো কেউ নেই যে!

 আমি মানুষটা এমনিতে বেজায় মোটিভেটিং ধরনের, মানে নিজে সেফ জোনে থেকে জ্বালাময়ী বক্তৃতার দ্বারা আশেপাশের জনতাকে ভারি সুন্দর উদ্বুদ্ধ করতে পারি, কত্তামশাইকেও ভোকাল টনিক দিয়ে চাঙ্গা রাখছিলাম। যেদিন উনি একলা যাবেন ঋষিকেশে, তার আগেরদিন একপ্রস্থ ঋষিকেশ ট্রিপ সেরে এসেছি সবাই মিলে, বড়দের বলা হয়েছে কত্তামশাইয়ের এক বন্ধু থাকেন ঋষিকেশে, তিনি পরদিন ওঁকে নেমন্তন্ন করেছেন। শাশুড়ি সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন সে বন্ধু সবাইকে, নিদেনপক্ষে আমাকে আর মেয়েকে কেন নেমন্তন্ন করলেন না, কোনওরকমে চাট্টি মিছে কথা বলে তাঁকে ভুলিয়েছি, আর মনে মনে মা গঙ্গাকে পেন্নাম ঠুকেছি, "হেই মা গঙ্গা, মিছে কথা বলার পাপ দিও না মা, ছেলে ঝাঁপদোলনা খেলে এলেই তার বাপ-মাকে সব সত্যি কথা বলে দেবো।" ছেলে যাচ্ছেন পায়ে দড়ি বেঁধে পাহাড়ের ওপর থেকে টপাং করে খাদে ঝাঁপাতে, নিচে বয়ে চলেছেন মা গঙ্গার পাহাড়ি ভার্শন, এসব কথা কোন মুখে তার মা-বাবাকে জানাই বলুন তো?

রাত্তিরবেলায় সবাই ঘুমোতে গেলে আমরা দুটিতে গঙ্গার ধারের ঝুলন্ত ব্যালকনিতে এসে বসলাম। ইতিমধ্যে কত্তামশাই জাম্পিন হাইটস (Jumpin Heights)-এর ওয়েবসাইট থেকে বুকিং সেরে ফেলেছেন পরেরদিনের জন্য, আর তারপরেই শুরু হয়েছে তাঁর বুক দুরদুর, পেট গুড়গুড়। 'যাবো কি যাবো না' জাতীয় দোলাচলে দুলছেন তিনি গঙ্গাতীরে বসে বসে। আমি গিয়ে পাশে বসতেই "থাক, যাব না " দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে, অনুমোদন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। কঠোর স্বরে মনে করালাম টাকাপয়সা দেওয়া হয়ে গেছে, এখন আর পেট গুড়গুড়ের দোহাই দিলে চলবে না। মনে মনে ভাবছি, "হুঁ হুঁ বাবা, আমায় খুব হ্যাটা করা হয়েছিল সমুদ্রের ওপর উড়তে ভয় পেয়েছিলাম বলে, এখন দ্যাখো, ডরে হাত-পা পেটের ভেতরে সেঁধোয় কিনা!"

আমার চোখরাঙানিতে হোক, বা নিজের মনের ভেতরে চাট্টি কাঠকুটো জ্বেলে মনটাকে সেঁকে তাজা করেই হোক, মোটকথা মাঝরাত নাগাদ কত্তামশাই বেশ তরতরে হয়ে উঠলেন। 'ভয় নেমেছে, আপদ গেছে' ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম, সকালে উঠে শুনি তিনি রাত জেগে ঝাঁপের ভিডিও দেখেছেন মন দিয়ে, আর পেট গুড়গুড় ভাবটা আবার ফিরে এসেছে। যাইহোক, রংচঙে জামাজুতো পরে তিনি রওনা হলেন, 'দুগগা দুগগা' বলে সি অফ করে এলাম তাঁকে, আর বুড়োবুড়িকে অনবরত মিছেকথা বলার জন্য ওয়ার্ম আপ করতে লাগলাম। মিছে কথা বলতে গেলে আমার চোখেমুখে একখানা কালচেমতো ছায়া চলে আসে, নিষ্পাপ প্রাণী হওয়ার সমস্যা, বুঝতেই পারছেন, এদিকে কোনওমতে সত্যিকথা বলে ফেললেই ওঁরা দুজন অটো ভাড়া করে ঋষিকেশ পৌঁছে ভিনদেশী জাম্প মাস্টারকে তল্পিতল্পা সমেত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন, আমার মিছে কথা বলতে না পারার দায় সে ভদ্রলোক বইবেন কেন খামোখা! মা গঙ্গাকে আবার পেন্নাম ঠুকে মানুষদুটোকে মিছে কথায় ভুলিয়ে রাখতে হলো।

ওদিকে তখন কত্তামশাই পৌঁছে গিয়েছেন ঋষিকেশের তপোবনে, পুরাকালে তপোবন-চত্বরে পুণ্যাত্মা সন্ন্যাসীরা আশ্রম-টাশ্রম গড়তেন, আর কলিকালের তপোবনে আপিস খুলে বসেছেন ঝাঁপদোলনার কলকাঠি নাড়ার কোম্পানি জাম্পিন হাইটস। বাঞ্জি জাম্পিং-এর পাশাপাশি তাঁরা ফ্লাইং ফক্স, জায়ান্ট সুইং ইত্যাদি নানাবিধ খেলাধুলোরও ব্যবস্থা করেন সিংহহৃদয় অকুতোভয় পর্যটকদের জন্য। ঋষিকেশ থেকে প্রায় ঘন্টাখানেক গেলে পাওয়া যায় নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দির, তার কাছেই এইসব সাহসী খেলাধুলোর পীঠস্থান। মহাদেবের আশীর্বাদ নিয়ে তবেই না এসব ভয়ানক খেলাধুলোয় নাম লেখানো উচিত!

তপোবন থেকে কোম্পানির একখানা হলদে রঙের বাসে করে কত্তামশাই চললেন সেই পীঠস্থানের পানে, সে বাসে সহযাত্রী দুটি মেয়ে। কত্তা প্রথমে ভেবেছিলেন তারাও বুঝি বাঞ্জি জাম্প করতেই যাচ্ছে, মনে ভরসা এসেছিল খানিক, পরে শুনলেন ওরা যাচ্ছে ফ্লাইং ফক্স সেজে তারে ঝোলানো খাঁচায় ঢুকে ওড়াউড়ি করতে, বাঞ্জির মক্কেল তিনিই একা। সামনে আরেকটা বাস যাচ্ছিল, তাতে লোকজন ভর্তি। সেই দেখে তো তিনি খুব খুশি। অ্যাত্তো লোকের মধ্যে চার পাঁচজন ঝাঁপদোলনা খেলবে নিশ্চয়ই। ড্রাইভার ভুল ভাঙালো,
" ও সব তো স্টাফলোগ হ্যায় জী, হামারা ক্রু মেম্বারস।"

তাঁর ততক্ষণে গলা শুকিয়ে কাঠ। তিনি সত্যিই একা? বাঞ্জি জাম্পিং কি তার মানে বিরাট দু:সাহসের কাজ? হুট করে নাম না লেখালেই ভালো হতো কি? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন সাইটে পৌঁছে গেছেন, নাম, বয়স, ওজন, অসুখবিসুখ আছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, "ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে কোম্পানি কোনও দায় নেবেন না, অমুককে খবর দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলবেন" জাতীয় বয়ানে সইসাবুদ করে গাইডের দেখানো রাস্তায় ওপরে উঠে একখানা হলদে খাঁচায় ঢুকে পড়েছেন। সেখানে সার বেঁধে বসে আছেন শখ করে ঝাঁপাতে আসা গুটিকয় সাহসী মানুষজন, সবারই মুখ শুকিয়ে এতটুকু। কত্তামশাইয়ের সামনেই ছিলেন একটি মেয়ে, তিনি বাঞ্জি লাফ দেবেন বলে এসেও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে শেষ অব্দি উড়ন্ত শেয়াল সেজেই খুশি রইলেন। তারপর আলাপ হলো মুম্বই থেকে আসা দুটি ছেলেমেয়ের সঙ্গে। মেয়েটি বসে বসে পা নাচাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গী তখন ঝাঁপ মেরেছেন।
"এক্সাইটেড?" হাঁটু নাচাতে নাচাতে তাঁর প্রশ্ন।
"নো:, স্কেয়ার্ড!"
"ডরনে কা কেয়া হ্যায়? যা কে সির্ফ কুদ যানা হ্যায়, ব্যস!"
মারাঠা-তনয়ার এহেন কনফিডেন্স দেখে আমার কত্তামশাইয়ের বঙ্গজ সত্ত্বা চমৎকৃত। 'হাম কিসিসে কম নেহি ' ফিলিং মনের মধ্যে নেড়েচেড়ে নিজেকে চাগিয়ে তুললেন তিনি। সেই মেয়ে ঝাঁপাতে যাওয়ার পরেই ওঁর পালা। তিনপ্রস্থ দড়ি বাঁধাবাঁধি সেরে, ঘাড়ে বুকে কোমরে পায়ে নানা রকমের বকলস বেঁধে সেইসব বকলস ধরে টেনেটুনে জাম্প মাস্টার দেখে নিয়েছেন ঝুলন্ত অবস্থায় দড়ি ছিঁড়ে 'খানখান' হওয়ার আশঙ্কা কতখানি, আমার উনিও ভয়ে খাবি খেতে খেতে বাঞ্জি জাম্পের ভালোমন্দ সম্পর্কে শুধিয়েছেন জাম্প মাস্টারকে, তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে ঠ্যালা মেরে ঝাঁপাতে বাধ্য করা হয় না কাউকেই, সেটা নাকি স্পোর্টসম্যানশিপের বিরোধী।
একটু আগে এক বীরপুঙ্গব নাকি ঝাঁপানোর আগে কাঁপা গলায় জাম্প মাস্টারকে বলেছিলেন জাম্প মাস্টার নিজেই যদি তাঁকে ঠেলে খাদে পড়তে সাহায্য করেন, তবে ভালো হয়। নিজে নিজে ঝাঁপাতে তাঁর পা কাঁপছে। জাম্প মাস্টার তাঁকে সটান 'না' বলে দিয়েছেন।
ঠিকই তো, খাদের ধারে ঠ্যালা মেরে ফেলে দেওয়া তো সিনেমার ভিলেনদের কাজ, জাম্প মাস্টার অমন বেয়াড়া কাজ করবেন কেন? তিনি পায়ে দড়িবাঁধা মানুষটিকে যত্ন করে ধরে নিয়ে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের ধারে দাঁড় করিয়ে তার পিঠে আলতো করে হাত ঠেকিয়ে দুই সেট 'ফাইভ ফোর থ্রি টু ওয়ান ' গোনেন, আর বলে দেন কাউন্টডাউন শেষ হলেই নিজেকে পাখি ভেবে দুদিকে হাত ছড়িয়ে টুক করে ঝাঁপ দিয়ে ফেলতে হবে। দুই সেট কাউন্টডাউনের পরেও যদি কেউ ঝাঁপাতে ভয় পান, তবে দড়িদড়া খুলে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়, টাকাপয়সা ফেরত পাওয়ার কোনও গল্প নেই।

না ঝাঁপালেও টাকা ফেরত হবে না, একথা শুনেই কত্তা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। কি জানি, পয়সাকড়ির বাজে খরচা হওয়ার আঁচ পেলেই আমার চাঁদপানা মুখখানা তেলোহাঁড়ি হয়ে যায়, একথাও মনে পড়ে গিয়েছিল হয়তো, মোটকথা তিনি ভারি উদ্বুদ্ধ হয়ে 'জীনে কে হ্যায় চারদিন, বাকি হ্যায় বেকার দিন ' কিংবা 'থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে' জাতীয় কিছু বিড়বিড় করতে করতে এগোলেন অকুস্থলের দিকে।

তার পর? তারপর অ্যাড্রিনালিনের ক্রমাগত ক্ষরণ, (হরমোন গ্ল্যাণ্ডের ওভারটাইমের চার্জ চাওয়ার খ্যামতা থাকলে সেদিন চাইতোই, আমি শিওর) কাউন্টডাউন বিগিনস অ্যান্ড এন্ডস, হুউউউ হাআআআ ধ্বনি, এবং..... ঝপাং! ঝাঁপ দিলেন তিনি, বহুদিন ধরে মনের কোণে লালিত স্বপ্ন আজ সফল হলো তাঁর। বলিহারি যাই বাপু অমন স্বপ্নের! সে যাকগে, স্বপ্ন মানুষের নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, অন্য লোকের, সে হোক না কেন অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা বউ, তারও কিচ্ছুটি বলার হক থাকে না।

বাঞ্জি জাম্পের নিয়ম হলো প্রথম ঝাঁপের পর পায়ে বাঁধা ইলাস্টিক দড়িটা তোমায় খেলিয়ে খেলিয়ে নিয়ে বেশ কিছুদূর নামবে, তারপর আবার দড়ির ইলাস্টিসিটি তোমায় টেনে তুলবে ওপর দিকে, তারপর আবার নীচে নামাবে। এরকম বারতিনেক ওপর নীচ করে ল্যাজে, থুড়ি, দড়িতে খেলার পর আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে থাকবে তুমি। সেখানে পাহাড়ী গঙ্গার ধারে মাচা বেঁধে ওঁত পেতে বসে আছেন ঝাঁপদোলনা কোম্পানির লোকজন। তাঁরা একখানা ঘুরন্ত লাঠি তোমার হাতের নাগালে এগিয়ে দিয়ে তোমায় আস্তে করে পেড়ে এনে খুলে নিয়ে মাচায় শুইয়ে দেবেন। তারপর হাত ধরে দাঁড় করিয়ে পায়ের থরোথরো কাঁপুনি থামার সময় দিয়ে এক বোতল জল গিফট করবেন তোমায়। উঁহু, কেবল জল নয়, আরও আছে। একখানা গোলমতো ব্যাজ, যাতে লেখা রয়েছে, শখ করে পাহাড় থেকে লাফানোর ধক তোমার বুকে রয়েছে। আর দেওয়া হবে একখানা তেলা সুন্দর শক্তপোক্ত কাগজে লেখা সার্টিফিকেট, যেখানে লেখা আছে, তুমি বিনা প্ররোচনায় এবং বিনা ঠ্যালায়, 'জাম্পিন হাইটস'-এর তত্ত্বাবধানে সফলভাবে বাঞ্জি জাম্প করতে পেরেছ, এবং নিজের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা টারজান নামক ভদ্দরলোকটিকে (তুমি মহিলা হলে খুঁজে পেয়েছ নিজের মধ্যে থাকা জেন নামের এক বীরাঙ্গনাকে, তিনি কে, আমি জানি না) উপলব্ধি করতে পেরেছো।

এসব অ্যাডভেঞ্চার সেরে আমার কত্তামশাই যখন হরিদ্বারে ফিরলেন, এবং বাবা-মাকে ঘটনাটা জানালেন, তখন সে যে কি কাণ্ড হলো, সে আর বলার নয়। সব শুনেটুনে শ্বশুরমশাই তো পুজো দিয়ে আসবেন বলে বেরিয়েই পড়ছিলেন। ঝাঁপদোলনা খেলার সাড়ে তিন মিনিটের ভিডিও দেখে তাঁদের চোখ যখন ছলছল করছে, তখন সযত্নে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে ছেলে ঘোষণা করলেন, "আমি, অর্থাৎ শ্রী অমুকশঙ্কর অমুক, আজ, পুণ্যতীর্থ হরিদ্বারে গঙ্গাতীরে বসে শপথ নিলাম, আমার পরবর্তী লক্ষ্য হবে স্কাইডাইভিং। একলা ট্রেকিং, ওড়া, পাহাড় থেকে ঝাঁপ ইত্যাদির পর আমার মুকুটে গুঁজতে বাকি রইলো কেবল উড়ন্ত এরোপ্লেন থেকে ঝাঁপানোর পালকটি। আজ থেকে শুরু করলাম ভাঁড়ে মা-লক্ষ্মীর আসন পাতার কাজ।" বলেই একখানা নয়া টাকা মানিব্যাগের এই পকেট থেকে ওই পকেটে চালান করে কৌটো খুলে একমুঠো বাদামভাজা তুলে নিয়ে চিবোতে লাগলেন।

।।বাঞ্জি-পুরাণ কথা সমাপ্ত।।

No comments:

Post a Comment