Wednesday, 25 July 2018

বিজলিঘরের কারিগরেরা

চারপাশে বেজায় পুজো-পুজো গন্ধ। আকাশ ঘন নীল কিংবা মেঘ-কালো যা-ই হোক না কেন, বাঙালির পুজোর আনন্দ তাতে কমে না। আর শুধু বাঙালিই বা বলি কেন, দেশের নানা কোণেই তো এই মরসুমে পুজোর আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। জন্মাষ্টমী-গণেশ চতুর্থী থেকে সেই যে পুজো-পার্বণের হুল্লোড় শুরু হয়, দীপাবলী-ভাইফোঁটা পার করে শীতের হাওয়া গায়ে লাগলেও তার রেশ ফিকে হয় না। আর কে না জানে, উৎসব মানেই আলো, দিনের আলো না ফুরোতেই প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে, রাস্তার দু’পাশে, আমার-আপনার-সবার বাড়িতে সর্বত্র জ্বলে ওঠে হরেক কিসিমের মন-ভোলানো চোখ-ধাঁধানো আলোর মালা। এই সময়ে সন্ধেবেলায় হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার করে ঝুপ করে লোডশেডিং হ’লে কেমন লাগে বলুন তো? তেড়ে গাল পাড়তে ইচ্ছে করে না ‘ইলেক্ট্রিক অফিস’-এর লোকজনকে? ঠিক যেমন রাস্তায় বেরিয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকালে ট্রাফিক পুলিশের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করা ‘নিয়ম’, কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে যদি শোনেন এমার্জেন্সি ও. টি অ্যাটেণ্ড করতে হচ্ছে ব’লে ডাক্তার দু’ঘণ্টা পরে আসবেন, তখন যেমন ডাক্তারবাবুর ‘টাকার খাঁই’-কে তুলোধনা করেন মনে মনে, ঠিক তেমনই ‘ঠাণ্ডা ঘরে বসে পা নাচানো’ লোকগুলোর ‘ক্যালাসনেস’-এর কারণে পাওয়ার-অফের হুজ্জোতি পোহাতে হচ্ছে পুজোর সময়েও, এই ভেবে তিতিবরক্ত হই না কি আমরা?

কিন্তু জানেন কি, পুজোর মরসুমে যাতে আমরা আলো-ঝলমলে রাস্তায় নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারি, তার জন্য শহর থেকে অনেক দূরের কতগুলো কারখানায় ওইসময় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজকর্ম চলে? সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেককেই পোশাকি ভাষায় ইঞ্জিনিয়ার বলা হয়, সেই ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে কিছুজন হিমশীতল একটা ঘরে সারাদিন কাটান, আট থেকে দশঘণ্টা ঠায় কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে, মাথায় বরফ চাপিয়ে, এক মুহূর্তের জন্যেও চেয়ার ছেড়ে ওঠার উপায় নেই তাঁদের। বাকিদের সারাদিন দৌড়ে বেড়াতে হয় সারা কারখানার বিভিন্ন এলাকা জুড়ে, কাউকে হয়তো নব্বই মিটার উঁচুতে উঠতে হলো, আবার কাউকে মাটির নিচে তিরিশ মিটার নামতে হলো। কিন্তু, কারখানাগুলোয় কি এমন দরকারি জিনিস তৈরি হয়, যে, পুজোর ক’টাদিন সেখানে ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়?

যে জিনিসটা না হলে ইদানীং কালে আমাদের চোখে আঁধার ঘনাচ্ছে, সেই অমূল্য রতন বিদ্যুৎ তৈরি হয় শহর থেকে অনেক দূরের ঐ কারখানাগুলোতে। এদিকে আবার বেশিরভাগ বিদ্যুৎ-কারখানার কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা থাকে কারখানার কাছাকাছি অঞ্চলেই, সেগুলোও জনবসতির কাছাকাছি নয়, পুজোপার্বণের রোশনাই সেখানে খুব বেশি পৌঁছায় না। উৎসবের দিনগুলোয় সবারই ইচ্ছে করে কাজ থেকে একটু ছুটি নিই, দুটোদিন বাড়ির লোকের কাছে থাকি, বাচ্চাদের সঙ্গে হৈ-হৈ করি, কিন্তু, ওই যে বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা, সেখানে ইয়াব্বড় এক উনুনে গরম জলের হাঁড়িতে অষ্টপ্রহর জল ফুটছে, ফুটন্ত জলের বাষ্প পাইপ বেয়ে গিয়ে টারবাইন নামের একটা মস্ত বড়ো চাকা জাতীয় বস্তুকে অনবরত ঘুরিয়েই চলেছে, সেই ঘূর্ণন আবার কোন্‌ বিচিত্র পদ্ধতিতে জেনারেটর নামক একটি যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করছে মহামূল্যবান সম্পদ বিদ্যুৎ। তারপর তাকে গুনে-গেঁথে মাপ করে কমিয়ে বাড়িয়ে গুচ্ছখানেক তারের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয় ন্যাশনাল গ্রিড নামক ভয়ানক জটিল একটা ব্যবস্থার কাছে। সেই গ্রিডই নাকি সারা দেশের কোথায় কত বিদ্যুৎ পৌঁছোবে তার মাপজোক করে দেয়। এই গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠানোর কাজ চুকলে তবে কারখানার কর্মীদের কাজ শেষ, কিংবা হয়তো শেষ নয়, কারণ এই যে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রিডে পাঠানো—এই কাজটা তো চব্বিশ ঘণ্টা ধ’রে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই চলতে থাকে। উৎসবের দিনগুলোয় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে আকাশছোঁয়া, একমুহূর্তের জন্যেও চাহিদার চেয়ে জোগান কম হলে চলবে না। সে যদি পুজোর মুখে হঠাৎ বর্ষায় জ্বালানি কয়লা ভিজে স্যাঁতসেতে হয়ে যায়, ভেজা কয়লায় যদি উনুনে আগুন না জ্বলে, তবুও পুজোর রোশনাই কম হলে গোলমাল বেধে যাবে চারপাশে। এবার ভিজে কয়লা কেমন করে শুকিয়ে খটখটে ক’রে তা দিয়ে আগুন জ্বালা হবে, সে ভাবনা আমাদের নয়, ওসব ভাববে ‘ঠাণ্ডা ঘরে বসে থাকা’ লোকগুলো। আমাদের কেবল বাড়িতে-প্যাণ্ডেলে আলোর ঝলকানি আর রাতভর হুল্লোড়ের ব্যবস্থাটুকু হ’লেই হলো। প্রদীপের আলোটুকু পেলেই আমরা খুশি, সলতে পাকানোর গল্পে আমাদের কাজ কী?

তবে কিনা যাঁরা এই সলতে পাকানোর কাজটি করেন, তাঁরাও তো আমাদেরই মতো শখ-আহ্লাদপূর্ণ জীবন কাটাতে চাওয়া কয়েকটি সাধারণ মানুষ, তাই পুজোর দিনগুলোতেও তাঁরা মুখটি বুজে কাজ সামলে চলেছেন, ভাবলে মনটা কেমন হয়ে যায়। ঠিক যেমন দমকলকর্মী, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, অনেকটা তেমনই এঁদের কাজটাও জরুরি পরিষেবার অঙ্গ।

ধরুন আজ দুর্গাপুজোর সপ্তমী,বাড়িতে বছর পাঁচেকের মেয়েটা নতুন জামা পরে বারবার বাবাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছে, বাবা কখন বাড়ি আসবে, কখন ঠাকুর দেখতে বেরনো হবে, ওদিকে বাবা তখন অফিসে সেই কম্পিউটারগুলোর সামনে বসে একনাগাড়ে কতগুলো বোতাম টেপাটিপি করে চলেছে। তার কাছে তখন পুজো মানে সে যতক্ষণ ওই চেয়ারে বসে আছে ততক্ষণ বিজলী তৈরির কাজটাকে সুষ্ঠুভাবে চালানো। মেয়ের হাসিমুখ দেখার চেয়েও এই কাজটা সেই মুহূর্তে তার কাছে বেশি দরকারি।

এবারে আসা যাক ছুটির কথায়। পুজো-দীপাবলীতে বিদ্যুৎ-কর্মীদের যে একেবারেই ছুটি মেলে না, এটা বলা উচিত নয়। অমনটা করলে চলবে কিভাবে? কারখানার বাইরেও পরিবার, বাড়ি, সামাজিকতা—এসবও তো আছে নাকি? এই যে অষ্টপ্রহর কারখানায় শ্রমদান, সে হোক না ঠাণ্ডা ঘরে বসে সুইচ টেপা, তাতেও মাথার পরিশ্রম কম হয় না, তা সেই শ্রমদানের বিনিময়ে মাসের শেষে যে টাকাটা পাওয়া যায়, সেটা তো ঐ পরিবার আর সমাজ-সামাজিকতার জন্যই জোগাড় করা! যে লোকটার দেশের পৈতৃক ভিটেয় বহুকালের দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যেতে পারে সে গিয়ে পুজোর ক’টাদিন তদারকি না করলে, তার কি ঐ চারদিন ছুটি না নিলে চলবে? চাকরি পাওয়ার আগের সেই সংগ্রামের দিনগুলোয় সে হয়তো মনে মনে মা দুগ্‌গাকে বলে রেখেছিল, “একবার চাকরিটা পেতে দাও মা, কাঁধ পেতে পুজোর চারদিনের সব কাজ তুলে দেব সুষ্ঠুভাবে”, পুজোর খরচের টাকাটুকু পাঠিয়ে কর্তব্য সারলে তার কি মন ভরে?

কিংবা ধরো যে ছেলেটার বোন পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল স্বামীর হাত ধ’রে, পাঁচ বছর পরে কোলে দেড় বছরের ছেলে নিয়ে দেশে আসছে পনেরোদিনের জন্য, দীপাবলী আর ভাইফোঁটায় বাবা-মা-দাদার সঙ্গে বাড়িতে থাকবে ব’লে, সেই ছেলেটা ঐ ক’দিন বাড়ি না গিয়ে থাকে কেমন করে?

তাই পালা-পার্বণে ছুটি মঞ্জুরের প্রসঙ্গ উঠলে দেখা হয় ছুটির প্রয়োজন কার বেশি। এমনিতেই সারা বছরই এর-ওর ছুটির প্রয়োজন হয়, আজ এঁর বিয়ে, কাল ওঁর মেয়ের বিয়ে, পরের সপ্তাহে কারও ছেলের ভিনরাজ্যে কলেজে ভর্তি হ’তে যাওয়া, কিংবা আরেকদিন কারও মায়ের চোখ অপারেশন, এমন সব কারণে ছুটির প্রয়োজন বছর-ভর চলতেই থাকে। যার যখন বেশি দরকার তখন তাকে ছুটি নিতে দেওয়া হয়, তবে কারখানা তো চব্বিশ ঘণ্টা চালাতেই হবে, তাতে ফাঁকি পড়লে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধবে, কাজেই কোনও একজন ছুটি নিলে তার কাজের দায়িত্ব নিতে হয় অন্য কাউকে। সেটা কেমন?

কারখানা সাধারণত চলে তিনটে শিফ্‌টে। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হওয়া মর্নিং শিফ্‌ট, ভরদুপুরে শুরু হওয়া ইভনিং শিফ্‌ট, আর রাতভর চলতে থাকা নাইট শিফ্‌ট। ধরো, প্রত্যেক শিফ্‌টে চারজন কম্পিউটারে বসা ইঞ্জিনিয়ার (অর্থাৎ কন্ট্রোল ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ার) আর ছ’জন টহলদারি করা ইঞ্জিনিয়ার (এঁদের ভালো নাম ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার) থাকবেন, এমনটা নিয়ম। এবার কোনও একদিন ইভনিং শিফ্‌টে একজন ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ার ছুটি নিলেন। তখন কাকভোরে কারখানায় ঢোকা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ইভনিং শিফ্‌টের কাজও ক’রে দিতে হবে, অর্থাৎ তিনি একটানা ষোলো-সতেরো ঘণ্টা ঠায় কম্পিউটারের সামনে ব’সে মাথা খেলিয়ে যাবেন। কেউ ছুটি নিলে তাঁর কাজের দায়িত্ব কে নেবেন, তাঁর একটানা কাজ করে দেওয়ার পরের পাওনা ছুটি আবার কেমন করে তিনি জোগাড় করবেন, সেসব ভারি জটিল হিসেব, ও বোঝা আমাদের কম্ম নয়। যাঁদের গরজ তাঁরা বুঝে নিয়ে কাজ চালাতে থাকেন।

তা, দোল-দুর্গোৎসবের ছুটিগুলোও এমনভাবেই ঝুলিতে জড়ো করা হয়। ধরো, কেউ ছুটি পেলো ষষ্ঠী-সপ্তমী, সে হয়তো ঐ দু’দিনের ছুটি জোগাড়ের জন্য পঞ্চমীর দিনে ষোলো ঘণ্টা আপিস করল, আবার অষ্টমীর দিনে কারখানায় গিয়ে ফেরত এল নবমীর সকালে। আবার কেউ হয়তো ভাইফোঁটার দিনের ছুটিটায় বাড়িতে থাকতে পেলো ঠিকই, তবে তার আগের দু’রাত তাকে জেগে কাটাতে হলো কারখানায়। সে মানুষটার ঘুমের ঘোর কাটতে কাটতেই ভাইফোঁটার সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল।

এই হলো এই মানুষগুলোর জীবনের রোজনামচা। আলো গড়ার কারিগর এঁরা। বাইরে থেকে দেখলে ভারি সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা মনে হয় এঁদের ঘর-গেরস্থালীকে। কেমন গাছের ছায়ায় ঘেরা ছিমছাম উপনগরে বাস এঁদের আর এঁদের পরিবারদের। কোম্পানির দেওয়া ঘর-বাড়ি, নামমাত্র খরচে বিদ্যুৎ-জল ইত্যাদি পরিষেবা, দিব্যি কোম্পানির গাড়িতে চেপে সুখকর অফিসযাত্রা --- বাইরে থেকে দেখলে বেশ লাগে, ঈর্ষাও জাগতে পারে মনে, কিন্তু পর্দা সরিয়ে অন্দরে উঁকি দিন, দেখতে পাবেন আমাদের বিদ্যুৎ-নির্ভর আধুনিক জীবনযাত্রাকে আরও মসৃণ করে তুলবেন ব’লে ঐ আপাত-সুখটুকুর আড়ালে মানুষগুলো কেমন দিন-রাত্রি একাকার করে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন।।

(অক্ষর পত্রিকা, শারদ সংখ্যা ২০১৭ তে প্রকাশিত )

No comments:

Post a Comment