Sunday, 5 August 2018

পেরিয়ে এলেম : ধূপছায়া মজুমদার


"সত্যি বাপু, এরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝে না। নইলে অমন রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতীর মতো বউ তোর, মা দুর্গার মতো দশহাতে সংসার আগলাচ্ছে, তাকে ঘরের কোণে ফেলে ঐ পোড়া কাঠের টানে বারমুখো হোস কোন্ আক্কেলে? এ কেমন ছেলে পেটে ধরেছিলে বৌঠান?"

'বৌঠান'- এর সাদা হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে জিভে আগল দিলেন ইচ্ছেপিসি। তবুও তাঁর বাণীর শেষাংশ তনয়ার কানে ঢুকে পড়েছিলো, শাশুড়িদের জন্য চা নিয়ে ঘরে ঢুকছিল সে। ঠোঁটে লেগে থাকা ব্র্যাণ্ডেড সর্বংসহা হাসিটা আরেকটু চওড়া করে চায়ের কাপটা পিসির হাতে ধরিয়ে "পিসি আজ তোমার নিরিমিষ তো? পোস্তবাটা একটু তুলে রাখতে বলেছি ছবিকে," বলে মৃদুমন্দ গতিতে দরজার দিকে পা বাড়ালো। ইচ্ছেপিসি পোস্তবাটায় নুন তেল আর কাঁচালঙ্কা মেখে ভাতের পাতে খেতে বড় ভালবাসেন। তাঁর শ্বশুরবাড়িতে আবার পোস্ত খাওয়ার চল একেবারেই নেই। তাই তিনি এবাড়ি এলেই তনয়া মনে করে মেনুতে পোস্ত রাখে। আলোচনার মুখটা ঘুরে গেল সুস্বাদু নিরামিষ রান্নার দিকে, মনে মনে হাঁফ ছাড়লেন সুলতা। নিজের ছেলের 'গুণগান ' শুনতে কারই বা ভালো লাগে!

অড়হর ডালটা হিং দিয়ে সাঁতলাতে বলে তনয়া নিজের ঘরে এলো। মাসকাবারি মুদিখানা আর ওষুধের বাজার কালকেই সেরে এসেছে। রান্নাঘরের জিনিসগুলো গুছোনো হয়েছে রাত্তিরেই, ওষুধগুলো দুপুরে গুছোবে, এখন শাশুড়ির ওষুধের বাণ্ডিল নিয়ে ওঘরে ঢুকলেই পিসির গুষ্টির অসুখের সাতকাহন শুনতে হবে, আর কবে কোন ডাক্তারকে উনি কি ওষুধ সাজেস্ট করে সুফল পেয়েছেন তার গল্পও গিলতে হবে। তার চেয়ে এখন বরং তেল সাবানগুলো গুছিয়ে রাখা যাক।

কিন্তু মন বসছে না যে! মনের মধ্যে এ দেওয়াল ও দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইচ্ছেপিসির কথাটা, "দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম এরা বোঝে না।" ঠিকই তো, না থাকলে তবেই তো তার মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়! বোঝা যায়, যা নেই তা ঠিক কতটা আপনার ছিল। কিন্তু যা নেই, তাকে যে আর ফেরানো যায় না। তখন কেবলই নিজের মনে গুমরে মরো, আর কপাল চাপড়াও!

তাহলে? কি করবে তনয়া? দিনের পর দিন বোঝা টেনে টেনে ক্লান্ত সে, নিজের সঙ্গে যুঝে কালকেই একটা চলনসই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছে, সেই সিদ্ধান্তেই অনড় থাকবে তো? মনের মধ্যে কথাগুলো নিয়ে লোফালুফি খেলতে খেলতে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে সাবান শ্যাম্পু গুছিয়ে রাখে তনয়া, কিছুটা আনমনে। হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে ওর, আলমারি খুলে বিয়ের অ্যালবামের ভেতর থেকে বের করে শাশুড়ির সারা মাসের ঘুমের ওষুধের পাতাটা, কাল রাতে এখানে এনে রেখেছিল, অ্যালবামটাকে এখন আর কেউ খোঁজে না, ভেবেছিল আজ কাজে লাগাবে। বাধ সাধছে ইচ্ছেপিসির কথাটা। জীবনে না থাকলে আর তার মর্ম বোঝা যায় কি?

ঠোঁটে সেই সর্বংসহা হাসিটা এঁকে নিয়ে শাশুড়ির ওষুধের বাণ্ডিলটা নিয়ে এঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওঘরের দিকে এগোয় তনয়া।।

(ধারাবাহিক : ক্রমশঃ প্রকাশ্য পেজে প্রকাশিত)

No comments:

Post a Comment