আজকের
পর্বটা বেশ লম্বা-চওড়া হবে মনে হচ্ছে। কুটুনের নানাবিধ শিল্পচর্চার বিবরণী থাকছে
কিনা, বেশ ওজনদার রচনা হবে সম্ভবত। গৌরচন্দ্রিকা না করে শুরু করা যাক তবে।
প্রথমেই
আসি কুটুনের সঙ্গীতচর্চার কথায়। মেয়ের গানের গলাটি প্রথম দিন থেকেই ভারি সরেস। তার
জীবনের প্রথম দু’তিন রাত তো নার্সিং-হোমেই কেটেছিল, রোজ সকালে রাতের আয়ামাসিরা এসে
তার মা-কে গপ্প শোনাত, সে নাকি খিদে পেলেই বাজখাঁই গলায় চেঁচায়। মা মোটেই বিশ্বাস
করেননি সেকথা। কাঁথা-অয়েলক্লথে মোড়া ঐ একফোঁটা পুঁচকে, সে অমন গলার শির ফুলিয়ে
চিৎকার জুড়বে! বললেই হল! এসব অপপ্রচার। যাই হোক, ক’দিন পরে মা হাসিমুখে ছা নিয়ে
ঘরে ফিরলেন। প্রথম কিছুদিন পুঁচকে মেয়ে সারা দিন সারা রাত ঘুমোত। মা মনে মনে
আয়ামাসিদের ওপর বিরক্তই হচ্ছিলেন, “দ্যাখো দেখি, কেমন মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে আমার
শান্তশিষ্ট বাছাটির নামে!”
দিনপনেরো
পর থেকে কুটুনের রুটিনে সামান্য বদল ঘটল। সারাদিন সে ক্লান্তির চোটে চোখের পাতা
খুলতে পারত না, ঠিক রাত সাড়ে ন’টা-দশটার পর ক্লান্তি দূর হত। তারপর প্রায় সারারাত
ধরে চলত তার সুরসাধনা। বাড়ির লোকে অবশ্য অতটা সঙ্গীতবোদ্ধা নন, তাই এই সাধনার
মাহাত্ম্য তেমন করে বুঝে উঠতেন না। তাঁরা কখনও
কোলে দুলিয়ে, কখনও কাঁধে নাচিয়ে, যেভাবে হোক মেয়েকে ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন।
আর তাইতে কুটুন আরো বিরক্ত হয়ে দাপুটে গলায় প্রতিবাদ করত। সে এক সময় গেছে, বুঝলে?
সারা রাত মেয়ের গলা সাধার দাপটে বাড়ির লোক তটস্থ হয়ে থাকেন, আর দিনভর চোখেমুখে জল
ছিটিয়ে ঝিমুনি কাটিয়ে সংসারের কাজ সারেন।
মাসচারেকের
পর থেকে অবশ্য রাতের জলসার সময়টা কমে এসেছিল। মা হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে নেচেকুঁদে দু’ঘণ্টার
মধ্যেই মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়তেন। আহা! ঘুম যে তখন মায়ের কাছে কতটা
কাঙ্খিত ছিল সে বলে বোঝানো যায় না।
এই
সময় থেকেই মা, এবং বাবা উপলব্ধি করলেন, কুটুন গান শুনতে ভালবাসে। মা আবার ইতিমধ্যে
নানা পত্রপত্রিকায় পড়ে ফেলেছেন “শিশুমস্তিষ্কে সুরের উপকারিতা” ইত্যাদি বিষয়ে,
ব্যস, মেয়েকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, তেল মাখানো, নাওয়ানো সবেতেই তিনি সুরের ছোঁয়া
বোলাতে শুরু করলেন। তাঁর গান গাওয়ার ইতিহাস যে খুব জনমোহিনী, তা নয়, কলেজে
পড়াকালীন এক বান্ধবীর বাড়িতে ঘরোয়া আড্ডায় তাঁরা তিন বান্ধবী এমন দাপুটে ভঙ্গীতে “জীবনে
কি পাবো না” গেয়ে উঠেছিলেন, যে, বাকি বন্ধুরা নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
তাঁরা অবশ্য ভ্রূক্ষেপ করেননি, গানখানি শেষ করে তবেই থেমেছিলেন। এখনও, মেয়ে তাঁর
গাওয়া গান পছন্দ করছে কিনা সে ব্যাপারে তিনি বিশেষ খোঁজ রাখেন না। তিনি গেয়ে চলেন
নিজের সন্তুষ্টির জন্যই, ছেলেভোলানো গানে কথা কম পড়লে আবার নিজের বোনা কাব্যিও
গেঁথে দেন ঐ গানের সুরেই।
যেমন
ধরো, মা গাইছেন,
“চাঁদ
উঠেছে ফুল ফুটেছে কদমতলায় কে?
হাতি
নাচছে ঘোড়া নাচছে খুকুমণির বে”।
গানের
কথা ফুরিয়েছে, এদিকে মেয়ে তখনও জেগে,ব্যস, মা গেঁথে নিলেন নতুন কথা,
“খুকুমণির
বে’তে কে কে এল?
জেব্রা
এল আর এল আর্মাডিলো।
আর
এল সজারু শিম্পাঞ্জি
জিরাফ
এল গায়ে তার সাদা গেঞ্জি”, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এহেন
গেঞ্জি-পরিহিত জিরাফের গান শুনেই সঙ্গীতচর্চায় কুটুনের হাতেখড়ি হয়। এরপর কুটুন, আর
তার মা, দুজনেরই বয়স এবং সঙ্গীতচর্চা সমান লয়ে এগিয়ে চলে।
বছর
দেড়েক আগের কথা। কুটুনের মুখে তখন দু’একটি
বুলি ফুটেছে। নিজের ভাষায় সে তার পছন্দের গানের ফরমায়েস করতে শিখেছে। মায়ের গলায় (সম্ভবত
কিঞ্চিৎ এলোমেলো সুরে) গান শোনার পাশাপাশি রেডিও (মায়ের আবার রেডিও শোনার বাতিক
আছে, রেডিওর কান মুচড়ে পিঠ চাপড়ে তিনি ধানবাদে বসে মাঝেমধ্যে কলকাতার স্টেশন ধরে
ভারি আরাম পান), মোবাইল ফোন, এসবে ধীরে ধীরে তার কান পাকছে, মায়ের সঙ্গে তার
ভাব-বিনিময় ভাষা পাচ্ছে ক্রমশ। সে যদি বলে, “হাই-ই”, মা অমনি বুঝে নেন এটি হল “হা-রে-রে-রে”
শোনানোর অনুরোধ, কিংবা, মেয়ে যদি বলে, “হুই-ই”, তবে মা ধরে ফেলেন, মেয়ে এখন “ওরে
গৃহবাসী” শুনতে চায়। তিনিও দিব্যি রুটি সেঁকতে সেঁকতে কিংবা আলনায় কাপড় গোছাতে
গোছাতে একটাই গান দশ-বারোবার গেয়ে চলেন, আর কুটুনও আহ্লাদে মাথা দুলিয়ে জামাকাপড়ের
ভাঁজ খুলতে খুলতে ভাঙ্গা গলার গান মন দিয়ে শুনে চলে।
এরকমই
একদিন, বাবা সন্ধেবেলায় খাওয়ার টেবিলে তাল ঠুকে কি যেন একটা গুনগুন করছেন, কুটুন
আবিষ্কার করল, আরে, বাবাও তো কম বড় গাইয়ে নন! সে তড়িঘড়ি বাবার কাছে গিয়ে নতুন গান
শোনানোর আর্জি জানায়,
“বাবা,
তি-নু-নুন্-নুন্”
বাবাও
বোঝেন না, মেয়েও এর বেশি কিছু বোঝাতে পারে না। বিচ্ছিরি কমিউনিকেশন গ্যাপ। বাবার
কাছে মেয়ের ভাষার শব্দকোষ হলেন মা। প্রথমে মা-ও কিচ্ছু বোঝেন না। অনেক ভেবে মনে
পড়ে আগের সন্ধেয় “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে” কুটুনের মনে প্রথমবার ঢুকেছিল। সে গানের কলি
“কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ” যে কোন্ জাদুতে কুটুনের ভাষায় “তি-নু-নুন্-নুন্”
হয়ে গেছে তা বোঝা স্বয়ং গুরুদেবেরও অসাধ্য।
ঘুম
উপলক্ষে গাইতে হবে, এমন কিছু বাঁধাধরা গান আছে। যেমন, “মন মোর মেঘের সঙ্গী”। এটি
কুটুনের কথা ফোটার বয়সের আগে থেকেই মা গেয়ে আসছেন। ফলে, কথা ফুটতে শুরু হওয়ার
পরেও, রোজ রাতে বালিশে মাথা রেখেই সে “মনো, মনো” বলে মা-কে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। কোনোদিন
হয়ত মেয়ে ঘুমোনোর আগেই মায়ের একটু ঝিমন্ত ভাব এসেছে, মেয়ে অমনি উঠে বসে মা-কে
থাবড়ে-থুবড়ে বাকি গানটা গাইয়ে তবে ঘুমোতো।
আরেকটা
গান ছিল, “ধুম এসো”, অর্থাৎ কিনা, “ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো”। কাঁদো
কাঁদো মুখে “ধুম এসো” আওড়ানো মানেই এবার ঘুমের জোগাড় করতে হবে। এখন তো কুটুন একটু
বড় হয়েছে, একেকদিন রাতে বালিশে শুয়ে সে নিজেই নিজেকে চাপড়ে “ধুম পালানি মাসিপিসি
মোদেল বালি এস” গাইতে থাকে।
কুটুনের
ঝাঁপিতে এখন অনেক গান জমে উঠেছে। এত অল্প জায়গায় সেসব বলে শেষ করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ,
সলিল চৌধুরী থেকে শুরু করে এ.
আর. রহমান হয়ে ভাটিয়ালির আন্তর্জাতিক সংস্করণ,
সবেতেই সে সমান উৎসাহী। স্কুলের সৌজন্যে সম্প্রতি কুটুনের গলায় তার নিজের ভাষায়
দেশের জাতীয় সঙ্গীতও শোনা যাচ্ছে। আবার কোত্থেকে যেন বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি, তিন
ভাষাতেই “পিসা-বুদান”, অর্থাৎ, “We shall overcome” শিখে
এসেছে।
এবার
আসি কুটুনের ছবি আঁকার গল্পে। দেড় বছর বয়সেই তাকে ব্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে মা এক
বাক্স রঙ পেন্সিল আর একখানা সাদা খাতা কিনে তার সামনে রেখে দিয়েছিলেন। সেই থেকে
তার আঁকায় হাতেখড়ি। ভাড়াবাড়ির দেওয়াল তো নানা রঙে রঙিন হয়েছেই, বাবার ল্যাপটপ,
মায়ের সাধের ফ্রিজ, মায় তার নিজের ভাত খাওয়ার থালাও মাঝেমাঝেই রং পেন্সিলের দাগে
সেজেগুজে ওঠে। আর, ছবি আঁকার খাতায় মেয়ের কল্পনাশক্তি মনের আনন্দে ডানা মেলে।
হযবরল-র
সেই চন্দ্রবিন্দু বেড়ালকে মনে আছে? যে মাটিতে দাগ কেটে কেটে “এই মনে করো গেছোদাদা,
এই মনে করো গেছোবৌদি রান্না করছে” এইসব আঁকাআঁকি করছিল? ঠিক ঐরকমভাবেই কুটুনও তার
খাতায় একটা করে দাগ কিংবা গোল্লা আঁকে, আর বলতে থাকে, “এতা বাবা, এতা মা, এতা
তুতুন, এতা মাম্মাম, এতা দাদু”, এমন করে চটি, ব্যাগ, স্কুল, চাঁদ, বালিশ, দই-মাখা
ভাত, সব এঁকে ফেলে সে। একদিন তো স্বামী বিবেকানন্দেরও একখানা ছবি এঁকেছিল। ছবিটার
সঙ্গে বিশেষ একটি সব্জির খুব মিল পাওয়া গিয়েছিল বটে, তবে চোখ, কান আর মুখ নিজের
নিজের জায়াগায় ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। কুটুনের আঁকা ছবিতে বাবা চেনা যায়
দাড়ি দে’খে, মা চেনা যায় দাঁত বের করা হাসিমুখ দে’খে, আর মাম্মাম (ঠাকুমা) চেনা
যায় কপালের টিপ দে’খে। ছবি আঁকার বিদ্যে মাঝেমাঝে তার পুষ্যিপুতুলদেরও শেখানোর
চেষ্টা চলে। মা আড়াল থেকে দেখেন, ছুটকি-পুতুলের হাতে পেন্সিল ধরিয়ে কুটুন প্রাণপণে
বিদ্যাদানের চেষ্টা করছে, “পাত্তো পাত্তো (পাকড়ো, পাকড়ো), অ্যায়সে”!
নাচের
গল্পে বিশেষ কিছু বলার নেই। এদিকে আবার মেলা লেখা হয়ে গেছে, পড়তে বসে লোকের হাঁফ ধরবে, তাই ছোট করেই বলে নিই।
কুটুন যখন সাত-আটমাসের ছানা ছিল, রাতবিরেতে অকারণ
কান্না জুড়লে তার মায়ের আর সব জারিজুরি যখন ফেল করত, তখন তিনি নিজের ছোটবেলায় শেখা
খানকতক নাচের মুদ্রা জড়ো করে এর ঘাড়ে ওকে চাপিয়ে হাতেকলমে করে দেখিয়ে মেয়ের কান্না
থামাতেন। বাবা বাড়িতে থাকলে তিনিও এব্যাপারে নিজের দক্ষতা জাহির করতে ছাড়তেন না।
সেই থেকেই বোধহয় কুটুনের ধারণা হয়েছিল, তার মা, বাবা দুজনেই প্রতিভাবান
নৃত্যশিল্পী। ব্যস, এখন যখন যেখানে তার নাচ করতে ইচ্ছে করে, অবশ্যই বাবাকে অথবা
মা-কে তার সঙ্গে পা মেলাতে হয়। সে স্কুলের ফাংশানই হোক, কিংবা ঘরোয়া জলসাই হোক,
কুটুন স্টেজে উঠছে মানে মা অথবা বাবাকেও সঙ্গে থাকতে হবে। বাড়িতে একেকদিন
সন্ধেবেলায় নাচ প্র্যাকটিসের শখ জাগে মেয়ের মনে। মা হয়ত সবে রুটি বেলে তাওয়া-তে সেঁকতে
শুরু করেছেন, মেয়ের নাচ পেল, অমনি তার সনির্বন্ধ অনুরোধে মা-কে রুটি সেঁকার জালতি
হাতেই একপাক নেচে নিতে হল। সেসব রাতে খাওয়ার থালায় দু’তিনটে পোড়া রুটি পাওয়া যায়
বটে, তবে মেয়ের শখ তো পূরণ হয়!!
No comments:
Post a Comment