Wednesday, 9 August 2017

এ ত মেয়ে মেয়ে নয়

রাতের ট্রেন পদ্মাবৎ এক্সপ্রেস। জেনারেল কামরা, তিলধারণের জায়গা নেই। তারই মধ্যে এক কোণায় একখানা সিট পেয়ে বসেছে বাইশ তেইশ বছর বয়সী একটা মেয়ে। একাই যাচ্ছে , সঙ্গে কোনও পুরুষমানুষ নেই। মেয়েটা দিল্লি চলল চাকরির পরীক্ষার ব্যাপারে। একলা বসে নানান কথা ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসেছিল বোধহয়, কাদের যেন গালাগালির চোটে চটকা ভাঙল। ও মা গো, চারটে মুশকো চেহারার লোক, হাতে কিসব ছোরা-ছুরিও আছে মনে হচ্ছে। কি চায় ওরা? ওর গলার হারটা? ওটা ওর মায়ের দেওয়া, বড় দামী জিনিস যে! না না, ওটায় হাত লাগাতে দেবে না কাউকে। দাঁতে দাঁত চেপে ডাকাতগুলোর সঙ্গে লড়তে থাকে একলা মেয়েটা। কামরাভর্তি মানুষ, কিন্তু তারা তো সব 'পাবলিক', আম আদমি, তাই তাদের কারোরই ক্ষমতা হয় না এগিয়ে এসে মেয়েটার পাশে দাঁড়ানোর। সোনার হারটা বাগাতে না পেরে রাগী ডাকাতরা একসময় কয়েকশো আম আদমির চোখের সামনে মেয়েটাকে ধাক্কা মেরে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় রেললাইনে। রেললাইনে পড়ে ট্র্যাক থেকে বাঁ পা -টা সরানোর আগেই সেটার ওপর দিয়ে আরেকখানা ট্রেন চলে যায়।

এরপর মেয়েটা সারারাত ছেঁড়খোঁড়া পা নিয়ে ওইভাবেই পড়ে রইল রেললাইনে। সকালে লাইনের ধারে প্রাত:কৃত্য সারতে আসা লোকজন (কারও বদভ্যাস কারও কাছে আশীর্বাদ হয়েও আসতে পারে!) তাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে জানা গেল বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। এসব ঘটনা যখন ঘটছে তখন ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়েছে, মিডিয়া খবর পেয়েছে। মিডিয়ার চাপে ঘটনার কারণ খোঁজা শুরু হয়। প্রথম কদিন সহানুভূতি পেলেও যেই 'কে দায়ী? কেন দায়ী? ' গোছের প্রশ্ন উঠল, অমনি বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টায় রইলেন। কেউ বললেন মেয়েটা নাকি টিকিট কাটেনি, টিটিইকে দেখে ভয়ে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়েছে, কেউ বললেন সে নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।

এসব কথা যখন হাসপাতালে শুয়ে থাকা মেয়েটার কানে পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার মনে অসহায় রাগ থেকে জন্ম নিচ্ছিল একটা অসম্ভব ইচ্ছে। মাউণ্ট এভারেস্ট। হ্যাঁ, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে নিজেকে দেখতে পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করল মেয়েটা।

কি ভাবছেন? সাতসকালে আষাঢ়ে গপ্প শুরু করেছি? আজ্ঞে না মশাই, একটু খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, 2013 সালের এপ্রিল মাসে টাটা স্টিলের স্পনসরশিপে একটা এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। বাহান্ন দিনের সেই অভিযানের শেষে মে মাসের একুশ তারিখে এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা গেঁথে দিয়েছিলেন যিনি, উত্তরপ্রদেশের মানুষ সেই অরুণিমা সিনহা হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা পর্বতারোহী, যিনি কৃত্রিম অঙ্গের সাহায্যে এভারেস্ট জয় করেছেন। তাঁর একটি পা কৃত্রিম, আরেকটি পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে ধরে রাখার জন্য সেই পায়ে রড বসানো আছে। শুরুতে যে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া ঘটনাটি পড়লেন, সেটি অরুণিমারই জীবনের ঘটনা। তখনও তিনি পর্বতারোহী হননি, জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন।

ভাগ্য (পড়ুন সেদিনের সেই ডাকাতদল) তাঁর পা কেড়ে নেওয়ার পরে শুধুমাত্র মনের জোরে আর সাহসে ভর করে অরুণিমা নিজের জীবনকে নতুন খাতে বইয়েছেন। কেবল এভারেস্ট নয়, 2016 পর্যন্ত বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে তিনি দেশের নিশান উড়িয়ে এসেছেন। ইচ্ছে আছে সবকটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখার। এছাড়া বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের বিকাশে খেলাধুলোর ভূমিকা বুঝে তাদের জন্য গড়েছেন শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি।

উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আজ অরুণিমা সিনহার জন্মদিন। এই অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটির জন্য আমাদের সবার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল। ইনি তো শুধু ভবিষ্যতের পর্বতারোহীদের কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের কাছেই আদর্শ নন, যে মেয়েটা গরীব বাবার মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে বিয়ের বাজারে অচল, কিংবা যে ছেলেটা চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়ে রোজ ভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, অরুণিমার গল্প যে তাদেরও বাঁচার মন্ত্র শেখায়। তাদের বলে, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হেরে পালিয়ে না গিয়ে তোর যেটুকু সম্বল আছে, তাই নিয়েই লড়ে যা, একদিন তুইই জিতবি।

তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/

জল বাঁচানোর কিছু উপায়


প্রতি বছরের মতই এবারও গ্রীষ্ম এসে পড়েছে বীরবিক্রমে। বাড়িতে, স্কুলে সর্বত্র একই আলোচনা, “কি গরম রে বাবা! আগে তো এত গরম পড়ত না!” ঠিক তাই। প্রতি বছরই গরমের পরিমাণ আগের বারের চেয়ে বেড়ে চলেছে। গরম বাড়লেই বাড়ে জলের চাহিদা। এদিকে সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ায় নদী-পুকুরের জল যায় শুকিয়ে, বৃষ্টি খুব কম হয় ব’লে নদী-পুকুরে জল জমতেও পারে না। মাটির নীচের জলও আরো নীচে নেমে যায়। কুয়ো-নলকূপ থেকেও ব্যবহারের যোগ্য জল খুব বেশি পাওয়া যায় না। এমনিতেই আমাদের দেশের জনসংখ্যা যা, ব্যবহারযোগ্য জলের পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম। তার ওপর গরমকালে কম বৃষ্টি, পুকুর-নালা শুকিয়ে যাওয়া--- এসব কাণ্ডের জেরে অবস্থাটা আরো করুণ হয়ে পড়ে।
আমরা যদি একটু ভাবনা চিন্তা করে জল ব্যবহার করি, আর কতগুলো খুব ছোট্ট ছোট্ট অভ্যেস নিজেরা আর বাড়ির বড়রা মিলে মেনে চলতে পারি, তাহলে কিন্তু গ্রীষ্মকালে জলের সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
প্রথমে বলি, এই গরমে, মানে আজ থেকেই তুমি কোন্‌কোন্‌ অভ্যাস তৈরি করতে পারো।
বাড়িতে বৈদ্যুতিন জলের ফিল্টার বসানো আছে কি? থাকলে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, ফিল্টারে যখন জল ভর্তি হয়, যে সরু পাইপটা ফিল্টারের নীচের দিকে বেরিয়ে থাকে, সেটা দিয়ে তখন বেশ অনেকটা জল বাইরে বেরিয়ে যায়। বিশুদ্ধ জল পেতে গেলে এই জলটুকু নষ্ট করতেই হবে, পদ্ধতিটাই এমন। কিন্তু ভেবে দ্যাখো তো, এই নষ্ট হয়ে যাওয়া জলকে কাজে লাগানো গেলে সারাদিনে কতটা জলের অপচয় কমানো যাবে? প্রশ্ন হল, কিভাবে কাজে লাগাবে এই জলকে? খাওয়া যাবে না, রান্না বা বাসন ধোওয়ার কাজেও ব্যবহার করা যাবে না, তবে?
যদি পারো তো, জল বেরনো সরু পাইপটার নীচে একটা বালতি রেখে দাও। না পারলে মাঝারি একটা পাত্র পেতে রেখো, জমতে থাকা জল নিয়ে বারে বারে একটা বালতিতে জমা কোরো। দেখবে সারাদিনে এক-দেড় বালতি জল জমেছে। এই এত্তখানি জল নষ্ট হচ্ছিল, ভাবতে পারো!এই জল দিয়ে তুমি ঘর মুছতে পারো, বাথরুম পরিষ্কারের কাজে লাগাতে পারো, বিভিন্ন আসবাবপত্র পরিষ্কার, এমনকি সাইকেল-বাইক-গাড়ি ধোওয়ার কাজেও লাগবে এই জল।
আরেকটা কাজ করবে, মা-কাকীমাদেরও অনুরোধ করবে কাজটা করতে। ধরো, সবজি কাটার পরে সেগুলোকে জল দিয়ে ধুচ্ছো। ধোওয়া হয়ে গেলে জলটা ফেলে দিয়ো না। খুব নোংরা হয়ে গেলে আলাদা কথা, নইলে এই জলটা দিয়েই রান্নার জায়গাটা পরিষ্কার, কিংবা সবজি কাটার ছুরি-বঁটিগুলো ধোওয়া হয়ে যাবে।
বাথরুমে কিংবা রান্নাঘরে,যে কোনো কল-ই খুব ভাল করে বন্ধ করার পরেও দেখবে, ফোঁটা-ফোঁটা করে জল কিছুক্ষণ পর পর পড়তে থাকে। কলের ঠিক নীচে একটা বালতি বা কোনো পাত্র রেখে দাও। কয়েক ঘণ্টা পরে দেখো, কতখানি জল জমা হয়েছে। বালতি পেতে না রাখলে জলটার অপচয় হত তো! অভ্যেসটা নিজে তো করোই,বাড়ির সব্বাইকেও ধরিয়ে দাও এই অভ্যেস। দেখবে জল-সমস্যার কিছুটা সুরাহা হয়েছে।
 পথ ভুল করে এক-আধদিন বিকেলে যদি একপশলা বৃষ্টি তোমার বাড়িতে হাজির হয়, তবে যে বারান্দা বা জানলায় বৃষ্টির জল আসে, সেখানে বড়সড় পাত্র রেখে বৃষ্টির জল জমাতে ভুলো না। পরেরদিন সকালে ঘর মোছা, বাসন ধোওয়ার মত কাজ এই জলে দিব্যি চলবে।
এ তো হল এক্ষুণি তুমি জল বাঁচানোর জন্য কি কি করতে পারো, তার ছোট্ট ফর্দ। আরও অনেক আছে, সব মনে পড়ছে না বলে লিখতে পারছি না। তুমিও একটু মাথা ঘামাও, দেখো আরো কত ভাল ভাল উপায় বেরোবে। উপায়গুলো কাজে লাগিয়ো, আর ইচ্ছামতীকে জানিও, একসঙ্গে বসে বেশ আলোচনা করা যাবে একদিন।
এবার আসি, জলাভাব কমাবার জন্য সারা বছর আমরা কি কি কাজ করতে পারি, সে কথায়।
জন্মদিনে খুব হই-চই করো নিশ্চয়ই। সারাদিন ভীষণ ব্যস্ত থাকো। এই ব্যস্ততার মধ্যে একটা ছোট্ট কাজ সেরে ফ্যালো। প্রতিবছর জন্মদিনে সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে বাগানে গিয়ে একটা করে গাছ লাগাও। বাড়িতে বাগান না থাকলেও চিন্তা নেই, বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে অল্প ফাঁকা জমি নিশ্চয়ই থাকবে। বাড়ির বড় কাউকে সঙ্গে নিয়ে সেখানেই পুঁতে দিয়ে এস একটা চারাগাছ। দেখবে গোটা বছর তোমার সঙ্গে হৈ-হৈ করে সে গাছ দিব্যি বেড়ে উঠবে পরের জন্মদিনের আগেই। এই রীতি মেনে চল বাড়ির সবার জন্মদিনে। অভ্যেসটা ছড়িয়ে দাও স্কুলের বন্ধু, পাড়ার বন্ধু---- সবার মধ্যে। যে বাড়িতে যতজন সদস্য, সে বাড়ির আশপাশে সারা বছরে বেড়ে উঠবে ততগুলো নতুন চারাগাছ। একবছর পরে দেখবে বাড়ির আশেপাশে সবুজের সংখ্যা কত্ত বেড়ে গেছে! আর গাছ বাড়লে তাদের শিকড়ের টানে মাটি জমাট বেঁধে থাকে, মাটি আরো বেশি জল ধরে রাখতে পারে, বৃষ্টির জল আরও সহজে মাটির গভীরে জমতে পারে, এসব কথা নিশ্চয়ই নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হবে না!
বর্ষাকালে যখন তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি আসবে, তৈরি থেকো। বৃষ্টির জল জমাতে হবে। জানো কি, বেঙ্গালুরু-র ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-র বৈজ্ঞানিক এ. আর. শিবকুমার দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির জল জমানো এবং তাকে কাজে লাগিয়ে সারা বছরের জলের চাহিদা মেটানোর কাজে ব্যস্ত আছেন, এবং তাঁর পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়ে কর্ণাটক, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্য এবং বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশও উপকৃত হচ্ছে? নানা ছোটখাটো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই বৈজ্ঞানিক নিজের বাড়িতে শুধুমাত্র বৃষ্টির জলকেই কাজে লাগিয়ে সারা বছরের জলের চাহিদা মেটান।
এতটা পরিকল্পনা করে এক্ষুণি অবশ্য সবার বাড়িতে বৃষ্টির জল ব্যবহার করা যাবে না, তবে বৃষ্টির দিনগুলোতে জলের চাহিদা কিছুটা মেটানোই যায়।
অনেকের বাড়িতেই দেখবে, বাড়ির গা বেয়ে ছাদ থেকে নীচে একটা মোটা পাইপ নেমে এসেছে। এটা হল রেন-পাইপ। বৃষ্টির জল ছাদ থেকে এই পাইপ বেয়ে নেমে নিচে বাগানে বা নর্দমায় গিয়ে পড়ে। এই রেন-পাইপের নিচের খোলা মুখের সামনে যদি একটা বড় ড্রাম রেখে দেওয়া যায়, তবে বৃষ্টির জল ছাদ থেকে নেমে ড্রামটায় জমা হবে। ড্রামের ওপর একটা পাতলা কাপড় ঢেকে রেখো, যাতে আবর্জনা না পড়ে, আর জলের ওপরে অল্প সাদা তেল ঢেলে দিয়ো, তাহলে মশারা ডিম পাড়তে পারবে না। এই জমা হওয়া বৃষ্টির জল দিয়ে এবার তুমি সাইকেল-গাড়ি ধোয়া-মোছা কর, বাসনপত্র ধুতে পারো, এমনকি, মাঠ থেকে খেলে এসে কাদা-মাখা পা-দুটোও ধুয়ে নিতে পারো। তবে হ্যাঁ, এই জল বেশিদিন জমিয়ে রেখো না।
রাস্তায়, স্টেশনে, স্কুলে--- কোথাও যদি দ্যাখো জলের কল খোলা রয়েছে, জল অপচয় হচ্ছে, বন্ধ করার লোক নেই, কোনো দিকে না তাকিয়ে সটান গিয়ে কলটা বন্ধ করে এসো। কে দেখে কি ভাবল, কিচ্ছুটি ভাবার দরকার নেই। স্কুলে তো আমরা সবাই পড়ি জল সঞ্চয় বাড়ানোর কথা, জলের অপচয় রোধ করার কথা। বইয়ে পড়া কথাগুলোকে কাজে করে দেখো, প্রকৃতির ভারসাম্য তো রক্ষা পাবেই, নিজের মনটাকেও দেখবে অনেক তরতাজা লাগছে।।

তথ্যসূত্রঃ www.thebetterindia.com/92434/a-r-shivakumar-rainwater-harvesting-bengaluru-karnataka/

একটা জেদী মেয়ের গল্প


চলো, আজ একটা হার না মানা মেয়ের জয়ের গল্প শুনব। মেয়েটার নাম অরুণিমা সিন্‌হা।

তার বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্মৌ নগরী থেকে ২০০ কিমি দূরে আম্বেদকরনগর বলে একটা শহরে। বাবা সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার, মা স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্মী। তিন বছর বয়সে বাবাকে হারালেও মা, দিদি, জামাইবাবু, ভাই, এদের ছত্রছায়ায় সেই মেয়ে মোটামুটি হেসেখেলেই বড় হচ্ছিল। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোয় উৎসাহ ছিল, জাতীয় স্তরে ভলিবলও খেলেছে সে। একটু বড় হতে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরি খোঁজার সময় এল। ২০১১ সালে CISF এ চাকরির ব্যাপারে ডাক পেল অরুণিমা।

এরপর এল সেই দিনটা। চাকরি-সংক্রান্ত একটা কাজেই পদ্মাবৎ এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় উঠে মেয়েটা দিল্লি যাচ্ছিল। প্রচণ্ড ভিড় সেই কামরায় হঠাৎই চার-পাঁচজন ডাকাত এসে হাজির হয়। তারা অরুণিমার গলা থেকে সোনার হার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে রুখে দাঁড়ায়, বাধা পেয়ে ডাকাতরা রাগের বশে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে রেললাইনে ফেলে দেয়। রেললাইনে প'ড়ে বাঁ পা-টাকে লাইনের ওপর থেকে সরানোর আগেই আরেকটা ট্রেন চলে যায় সেই পায়ের ওপর দিয়ে।

তারপর সারা রাত অরুণিমা ছিন্নভিন্ন বাঁ-পা নিয়ে রেললাইনের ওপরেই পড়ে রইল। সকালে রেললাইনের ধারে প্রাতঃকৃত্য সারতে আসা লোকজন তাকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করল। সেখানে তার বাঁ-পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হল, ডান পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে জুড়ে রাখতে সেখানে বসানো হল রড। এরপর কিছুদিন হৈ-চৈ, সহানুভূতি, তারপর ধীরে ধীরে লোকে অরুণিমাকে ভুলে যেতে লাগল।

অরুণিমা কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্রথমে মনে মনে ভেঙে পড়লেও আস্তে আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগল। একটা নকল পা আর আরেকটা রড-বসানো পা, এই সম্বল নিয়ে সে মনে মনে ঠিক করল মাউণ্ট এভারেস্ট জয় করবে। তার ইচ্ছেটা অদম্য, কারণ, হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই সে যোগাযোগ করল ভারতের প্রথম এভারেস্ট-বিজয়িনী পর্বতারোহী বাচেন্দ্রী পালের সঙ্গে। উত্তরকাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অফ মাউণ্টেনিয়ারিং থেকে আঠেরো মাসের ট্রেনিং নিল সে। কৃত্রিম পা নিয়ে পাহাড়ে চড়ার যেসব মারাত্মক সমস্যা, সেগুলোকে কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবলের সাহায্যে জয় করতে লাগল অরুণিমা।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে টাটা গ্রুপ-প্রযোজিত ইকো-এভারেস্ট অভিযানের দলের সদস্য অরুণিমা তার হিমালয় যাত্রা শুরু করল, বাহান্ন দিন পরে, ২০১৩ সালের ২১শে মে সে পৌঁছালো বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে। ভারতের অরুণিমা সিন্‌হার নাম লেখা রইল ইতিহাসের পাতায়, সে হল বিশ্বের প্রথম মহিলা, যিনি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাহায্যে মাউণ্ট এভারেস্ট জয় করেছেন।

ভাগ্যলিখন ইত্যাদির দোহাই দিয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে না থেকে যাঁরা জেতার অদম্য ইচ্ছে আর চেষ্টাকে প্রাধান্য দেন, ঈশ্বর এবং ভাগ্য তাঁদেরই সাহায্য করেন, অরুণিমা এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাই আকস্মিক দুর্ঘটনায় জীবনের ছন্দ কেটে গেলেও নিজের মনের জোর আর চেষ্টাকে সম্বল করে মেয়েটা সাফল্যের শিখরে পৌঁছে গেল। এরপর শুরু হল তার জয়যাত্রা।

প্রতিটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দেশের জাতীয় পতাকা ওড়াবে, এই হল তার নতুন লক্ষ্য। আফ্রিকার মাউণ্ট কিলিমাঞ্জারো (২০১৪ সালে), অস্ট্রেলিয়ার মাউণ্ট কোসিউজকো (২০১৫ সালে), দক্ষিণ আমেরিকার মাউণ্ট আকঙ্কাগুয়া (২০১৫ সালে), ইউরোপের মাউণ্ট এলব্রুস (২০১৪ সালে)-সহ পর্যন্ত ছ'টি শৃঙ্গ জয় করেছে সে, আণ্টার্কটিকা আর উত্তর আমেরিকা অভিযান এখনও বাকি।

অভূতপূর্ব সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকারের কাছ থেকে অরুণিমা ২০১৫ সালে 'পদ্মশ্রী' পুরস্কার লাভ করেন। এভারেস্ট-জয় এবং তার নেপথ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে অরুণিমা সিন্‌হার লেখা বই Born Again on the Mountain প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে। অরুণিমার অভিজ্ঞতা জানতে হলে এবং তাঁর জেদ আর লড়াই থেকে কিছু শিখতে চাইলে বইটা পড়ে দেখতে পারো।

পর্বতারোহণের পাশাপাশি অরুণিমা আরও একটা ব্রতে নিজেকে সামিল করেছেন। বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের জন্য সে তৈরি করেছে খেলাধুলো শেখার স্কুল, শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি এবং কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র। উত্তরপ্রদেশের এই সংস্থা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ, বিশেষত বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের প্রয়োজনে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন খেলার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কাজেও এই সংস্থা এগিয়ে আসে।

এই হল অরুণিমা সিন্‌হার কাহিনী, যা আরেকবার প্রমাণ করে, ভাগ্যে কি লেখা আছে, তা নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি নিজে কি চাও, সেটা আগে বুঝে নাও, তারপর সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে নিজের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে থাকো, সাফল্য তোমার হাত ধরবেই। অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, তোমার চেষ্টা তোমায় আলোয় ফেরাবে।।


তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/

রাখীবন্ধন

আজ রাখীপূর্ণিমা। বোনেরা বড় যত্নে আজ ভাইদের হাতে রাখী বেঁধে দিয়েছেন, কেউ কেউ হয়তো হাজার কয়েক মাইল দূরে প্রবাসে রয়েছেন, হাতে রাখী বাঁধার আনন্দ তাঁদের মেটাতে হয়েছে স্কাইপে বা ফেসবুকেই। সারাদিন ধরেই বোনেদের আদরে প্রণামে ভাইদের জীবন মঙ্গলময় হয়ে উঠেছে, ভাইদের আশিসে শ্রদ্ধায় বোনেরা ঋদ্ধ হয়েছেন। রাখীপূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে ক্রমশঃ প্রকাশ্যের পক্ষ থেকে সব বন্ধুদের জন্য রইল শুভেচ্ছা।
বন্ধুরা, ডোকা -লা কিংবা কার্গিল, সিয়াচেন কিংবা জালেপ -লা, এইসব জায়গাগুলোতেও কিন্তু ছড়িয়ে রয়েছেন আমাদেরই ভাইয়েরা, বন্ধুরা। ওঁরা  ওখানে রাতের পর রাত জাগছেন বলেই আমরা এত নিশ্চিন্তে রাখী, বন্ধুদিবস যাপন করতে পারছি। আসুন না, আমরা প্রত্যেকে একবারের জন্য হলেও মনে মনে রাখী পরিয়ে দিই সেইসব ভাই আর বন্ধুদের।
আমার চেনা দুই দিদির ভাই সেনাবাহিনীর কর্মী। কার্গিলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁকে যেতে হয়েছিল। গল্প শুনেছি, যুদ্ধের দিনগুলোয় বাড়িতে অশীতিপর বাবা-মাকে কোনো খবর জানানো হত না। দুইবোনে রাত্রে বাগানে গিয়ে কেঁদে হাল্কা হতেন। আশা করি, সেই ভাইবোনের রাখীবন্ধন উৎসব সুখে কাটছে।
হাওড়া-ব্যাণ্ডেল মেন লাইনের ট্রেনে হকারি করেন বিশুদা। কখনও টর্চ, কখনও ছাতা কিংবা ব্যাগ, তাঁর পসরা বদলে যায় মাঝেমধ্যে। দু -তিনবার রাত দশটার পরের কোনও ট্রেনে দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। ট্রেন ভদ্রেশ্বর পেরোনোর পর মহিলা কামরায় হয়ত দুজন যাত্রী, আশ্বাস পেয়েছি বিশুদার কাছে, "এই বিশুদা ট্রেনে থাকলে দিদি লাস্ট ট্রেনেও কোনও চিন্তা নেই তোমাদের"। আজকের উৎসব তাঁর জন্যও।
বাবলু ভাইয়া, আমাদের পাড়ার কিছু কচিকাঁচা পড়ুয়াদের স্কুলভ্যানের সারথি। গত সপ্তাহে পরপর দু'দিন তাদের বাড়ি আসার সময় আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি। ভাবছি, বাচ্চাগুলো বোধহয় ভিজেই যাবে। ভ্যান এলো, দেখলাম বাচ্চাদের গায়ে বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও লাগেনি, তবে ভ্যান থেকে নেমে গাড়ির জানলা বন্ধ করতে গিয়ে বাবলু ভাইয়া ভিজে চান করে গেছেন। তবে তাতে তিনি বিরক্ত নন, বাচ্চাদের গায়ে যে জল লাগেনি এতেই তিনি খুশি। আজ রক্ষাবন্ধনের উৎসবের একজন শরিক তিনিও।
তবুও আমরা কি এঁদের একশো শতাংশ বিশ্বাস করতে পারি? অবিশ্বাস করছি, এটা ভাবলে বুকে কাঁটা বেঁধে, তাও আমরা নিরুপায়। পরিস্থিতি আমাদের কাছ থেকে বিশ্বাস করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। আজকের এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়েও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, "মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ"। সেই পাপের বোঝা যাতে আমাদের খুব বেশি বইতে না হয়, রাখীবন্ধন উৎসবের দিনে মঙ্গলময়ের কাছে এই প্রার্থনা রইল।