ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্য - kromosho prokashyo থেকে
#ধূপছায়া_মজুমদার
একটা ডায়েরি। সম্ভবত আর্চিজের, হ্যাঁ, সেই আর্চিজ গ্যালারির, কাদের যেন কথা অনুযায়ী একসময় যে আর্চিজ গ্যালারি আর ভালবাসা নাকি সমার্থক শব্দ ছিল, সেই আর্চিজ গ্যালারিরই নাম ছোট্ট করে খোদাই করা আছে ডায়েরিটার মলাটের পিঠের দিকে। ডায়েরিটার মলাটের ছবিটা দেখলেই কেন জানি মামারবাড়ির চিলেকোঠার বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে তাতানের। যদিও ডায়েরিটা সেখানে পাওয়া যায়নি, ওটা আসলে তাতানের পিসি শিরীনের ছিলো, দাদুর ঘরের বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে সেখান থেকে এক দুপুরে তাতান পেয়েছিল ডায়েরিটা, তাও হলো বছরখানেক। আঠেরো উনিশ বছর ধরে জিনিসটা কারও চোখে পড়েনি কেন কে জানে!
ডায়েরিটার হাল্কা মেরুন বর্ডার, সেই বর্ডারের মাঝে হলদেটে দেওয়ালের সামনে কাঠের মেঝেতে রাখা একটা বেতের ঝুড়ির ছবি, বেতের ঝুড়িটা আধখোলা হয়ে উপচে পড়ছে কার যেন জাঙ্ক জুয়েলারি আর জমিয়ে রাখা কিছু হলদেটে চিঠি, ছবিটা দেখলেই তাতানের মনে হয় মামারবাড়ির বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা। ওই ট্রাঙ্কটায় বম্মার বিয়ের বেনারসি আর দাদুর জন্মের খবর বয়ে আনা একটা চিঠি দেখেছিল তাতান, তারপর থেকেই কোথাও কোনও আড়াল থেকে পুরনো জিনিসকে উঁকি মারতে দেখলেই ওর ওই ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে যায়।
তা, তাতান যে ওর পিসির ডায়েরি নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ও কি জানে না অন্যের ডায়েরিতে হাত দিতে নেই, অন্যের ডায়েরি পড়তে নেই? শিরীন জানতে পারলে রাগ করবে না? তা সে একটু করে বোধহয় রাগ, তাতান খেয়াল করে দেখেছে, এই একবছরেও ও ডায়েরিটার নামের পাতা আর যে পাতায় একটা ফার্ণের পেন্সিল স্কেচ করা আছে, সেটা উল্টে আর ভেতরে ঢুকতে পারেনি। হয় দুচোখে নেমে এসেছে রাজ্যের ঘুম, নইলে হঠাৎ শুরু হওয়া যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে গেছে প্রায়, তাতানের সাইনাসের প্রব্লেম আছে, মাথাব্যথা সর্দি এগুলো ওর বারোমাসের সাথী। তবুও, ডায়েরির পাতা ওল্টানো আর সাইনাসের ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠার দিনগুলো মিলে যাওয়াটাকে ও ঠিক কাকতালীয় বলে মেনে নিতে পারে না। ও জানে, শিরীনের ডায়েরিটাকে ঘিরে থাকে এমন একটা কিছু, যার নাগাল কারও পাওয়া সম্ভব নয়।
পিসিকে তাতান শিরীন বলেই ডাকে, বাড়ির বাকি সবার কাছে শুনে শুনে ছোট থেকেই অভ্যেসটা হয়েছে। শিরীন ওদের সময়ে ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টদের মধ্যে একজন ছিলো। মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম হয়েছিল, শিরীনের ঝকঝকে চেহারা আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ বহুদিন পরেও ওর স্কুলের টিচার, নন টিচিং স্টাফ সবার মনে ছিল, কেউ কেউ বোধহয় এখনও মনে রেখেছে। কারণ, ওদের এই ছোট্ট শহরে রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই ইলাদিদা, তপতীদিদাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, ওর ঠাম্মিও শিরীনদের স্কুলেই ইংলিশ টিচার ছিলেন, সেই সুবাদে তাঁর কলিগরা সবাই তাতানের দিদা। তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করেন, তাতানের মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো। শিরীনকে স্পষ্টভাবে মনে না রাখলে তুলনাটা তাঁরা করতে পারতেন?
"তাতান, তাতান, উঠবি না? ডায়েরিটা খোলা রয়েছে যে টেবিলে, পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে হাওয়ায়, ধরবি না? আয়, পাতাগুলো ধুলো হয়ে যাওয়ার আগে নেড়েচেড়ে দেখে নে, আয়, আয়!"
ধড়মড় করে উঠে বসল তাতান। কে ডাকছিল ওকে? কোথায় ডায়েরি? বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালতেই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরিটা, ফরফর শব্দে পাতা উড়ছে, এক দুটো পাতা বোধহয় আলগা হয়ে এসেছে। হবে না? আঠেরো বছর কম সময় নাকি? তাতান তাড়াতাড়ি উঠে এসে পাতাগুলো গুছিয়ে তুলে রাখল ডায়েরির মধ্যে। কিন্তু ওকে ডাকল কে? গলাটা অচেনা, কিন্তু কথা বলার ধরনটা ঠাম্মির মতো, ডাকছিল এমন আপন করে, যেন কতজন্মের চেনা সে!
"মা, শিরীনের ভয়েস কেমন ছিলো? কথা বলতো কেমন করে?"
"এ আবার কি প্রশ্ন সকাল সকাল? নাও, কর্নফ্লেক্সের বাটি শেষ করে উদ্ধার করো আমায়। আমায় যা বললে বললে, ঠাম্মির সামনে নামটা ভুলেও উচ্চারণ করবে না। জানো তো সবই, তাও কেন কথার অবাধ্য হও!"
তাতান জানে, এবাড়িতে শিরীনের নাম উচ্চারণ করা, ওর ছবি দেখতে চাওয়া, ওর কথা জিজ্ঞেস করা সবই একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু তাতানই বা কি করবে? এতদিন ছোট ছিল, যে যা বলেছে শুনেছে, কিন্তু এখন বড় হচ্ছে ও, কৌতুহলও বড় হচ্ছে, নিজের পিসি, তার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করবে না মানুষের? আশ্চর্য! কিসের এত রাখঢাক তাতান বোঝে না।
"তাতান, তাতান, তুই জানতে চাস সব কথা? শুনতে চাস?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবটুকু জানতে চাই। ওরা কেন কিচ্ছু বলে না জানি না। তুমি বলবে?"
"বলব রে, সব বলব। বলব বলেই তো বার বার..."
"কিন্তু তুমি কে? তোমায় দেখলে কেন মনে হয় আয়না দেখছি? কিন্তু চিনতে পারি না! কে তুমি?"
"হি হি হি, আমি তোর আয়না? নাকি তুই আমার চোখ?"
"তাতান, অ্যাই তাতান, ওঠ ওঠ, অনেক বেলা হয়ে গেল, এক্ষুনি মামারা এসে পড়বে মা।"
ঘুমটা ছিঁড়ে গেল মায়ের ডাকে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটাও ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল। কি যেন একটা ধরতে চাইছিল হাত বাড়িয়ে, হলো না, ফসকে গেল, ছেঁড়া ছেঁড়া চিন্তা নিয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছে, মেসেজ এল, সায়ক।
"মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্য ডে! মেনু কি ওবেলা? মাটন ছাড়া আজকাল কিছু হজম হচ্ছে না, জানিস! কি কেলো মাইরি!"
ঝরঝর করে হেসে ফেলল তাতান। চড়ের একটা ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই করে বাথরুমে ঢুকল। বেসিনের কলটা খুলতেই স্বপ্নটা ফিরে এলো আবার, আয়নায় চোখ পড়তেই ঝট করে মনে পড়ে গেল, ওর মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো।
"তাতান, তাতান, হ্যাপি বার্থডে! ইউ আর এইটিন নাউ। বড় হয়ে গেছিস তুই।"
"তুমি শিরীন?"
"এই দ্যাখো! মেয়ে চিনে ফেলেছে।" ঝরঝর করে হেসে ফেলল আয়না, আর তাতান অবাক হয়ে দেখল আয়না, নাকি শিরীন, তারও মাড়ির ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একজোড়া গজদাঁত।
"তুমি রোজ আমায় ডাকছ কেন? আগে তো কখনও দেখিনি তোমায়? হঠাৎ কোত্থেকে এলে? ঠাম্মির কাছে তোমার কথা বলতে নেই কেন? কেন তোমার নাম করা এবাড়িতে বারণ? বলো শিরীন, বলো।" সব্বাইকে বারবার করা প্রশ্নগুলো তাতান করে বসল স্বপ্নে আসা আয়নাকেও।
"ওই যে টেবিলে রেখেছিস ডায়েরিটা, ওটা কি আগে কখনও দেখেছিলি নেড়েচেড়ে? ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো এর আগে উল্টেছিলি কখনও? ওতে হাত না দিলে আমায় জানবি কেমন করে? আয় তাতান আয়, পাতা উল্টে দ্যাখ!"
এবার আর ওই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না তাতান। উঠে গিয়ে বসলো টেবিলে, পাতা ওল্টাতে হলো না, কেউ যেন ওর পাশে বসে যত্ন করে উল্টে দিতে লাগল ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো, আর তাতানের আঠেরো বছরের জন্মদিনে ওর সামনে উঠে এলো একটা ছবি, চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া, আর অচেনা কারও চেনা হয়ে আসা, সব একাকার হয়ে যেতে লাগল মিলেমিশে।
মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম শিরীন যে উচ্চমাধ্যমিকেও মারকাটারি রেজাল্ট করবে, সে নিয়ে কারও কোনও সন্দেহই ছিলো না। টেস্টের রেজাল্টেও তার একটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর একে একে ফাইনাল, জয়েন্ট, জয়েন্টের রেজাল্ট, এসব পেরিয়ে এসেছিল উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন। স্কুলে রেজাল্ট জানতে গিয়েছিল শিরীন, গিয়েই শুনেছিল তুমুল হট্টগোল, ইংলিশের বনানীদি, অর্থাৎ শিরীনের মা, নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। রেজাল্ট দেখা শিকেয় তুলে শিরীন ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে, মায়ের মাথাটা কোলে তুলে নিতে নিতে দেখেছিল ভিড়টা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, কেমন যেন চোরা চাউনিতে দেখছে সবাই ওকে, জ্ঞান ফেরার পর মাকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখে আবার রেজাল্টের বোর্ডের কাছে এসেছিল ও, বন্ধুরা তখন নীরবতা পালন করছে নোটিশ বোর্ডের সামনে। চোখে প্রশ্ন নিয়ে বোর্ডে নিজের রোল নম্বরটা খুঁজে পেয়ে খুঁটিয়ে দেখতেই দুলে উঠেছিল পায়ের নিচের মাটি। পাশে দাঁড়ানো শ্রীপর্ণা দুহাত দিয়ে ওকে আঁকড়ে না ধরলে ওও বোধহয় মায়ের মতোই জ্ঞান হারাতো। অঙ্কে নাকি শিরীন ব্যাক পেয়েছে, ওর নামের পাশে লেখা আছে যে এবারের উচ্চমাধ্যমিকে হেরে যাওয়া মানুষদের মধ্যে ও একজন। রেজাল্ট হাতে নিয়ে জানা গিয়েছিল নয় পেয়েছে ও অঙ্কে, দুশো নম্বরের মধ্যে একশো বিরাশি ও ঠিক করে এসেছিল, পৃথিবী উল্টে গেলেও এই সত্যিটা উল্টে যাওয়ার নয়, তার পরেও ওর রেজাল্টে লেখা আছে ও নয় পেয়েছে, অনলি নাইন।
"এক লহমায় দুনিয়ার সব রং কেউ শুষে নিলে দুনিয়াটাকে কেমন দেখতে লাগে জানিস? আমি জানি। আজ একমাস ধরে দেখে আসছি কেমন হয় রংহীন দুনিয়া, ঠিক কতটা সহজে সবটুকু ভুলে গিয়ে কাছের লোকেরাও দূরে ঠেলে ফেলে দেয় ফেল করা ছেলেমেয়েদের। ফেল করিনি কোনওদিন, বুঝলি! এই অভিজ্ঞতাটা কেমন হয় জানতাম না। কতটা অসহায় লাগে একশো আশির বদলে নয় দেখতে, জানা ছিল না, জানা ছিল না।"
লিখেছিল শিরীন, রেজাল্টের একমাস পরে। আরও লেখা ছিল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে চলেছে তাতান, ঠাম্মি নাকি ওই একমাসে মেয়ের মুখ দেখেননি, তাকে খেতে দেননি, তার বেশিরভাগ বইখাতা একদিন নাকি পুড়িয়েও দিয়েছিলেন। যেটুকু যা যত্ন করার করতো তাতানের বাবা আর মা। তাতান তখনও পৃথিবীর আলো দেখেনি।
অবাক হয়ে ভাবে তাতান, তার এই নরম ঠাম্মি এতটা নিষ্ঠুর কেমন করে হয়েছিলেন?
ভাবতে ভাবতে টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাতান।
"তাতান, বাকিটুকু জানবি না? ওই দ্যাখ, ওই ঘরের খাটে, ফুলের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে শিরীন, জানিস, আগের দিনই দাদাভাই রিভিউয়ের জন্য অ্যাপ্লাই করে এসেছিল, বউমণিকে বলেছিল, আমি ঘুমোচ্ছিলাম বলে রাতে আর জানায়নি, ভেবেছিল পরেরদিন সকালে বলবে। ওরা কি করে জানবে বল, বিকেলে, যখন দাদাভাই বউমণি অফিসে, তখন মা শিপ্রাদির ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা বলেছে, পরের মাসেই রেজিস্ট্রির কথাও পাকা করে ফেলেছে, ওরা কি করে জানবে যে একশো আশি উল্টেপাল্টে নয় হয়ে গেছে বলে আমি রাতারাতি মায়ের গলগ্রহ হয়ে গিয়েছি ওই কদিনে? বড্ড লেগেছিল জানিস তাতান! গালে চড় এসে না পড়লেও যে বুকে কতটা লাগে সেদিন বুঝেছিলাম। বাবার কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে হয়েছিল হঠাৎ। একমাসের ঘুমের ওষুধ তো ছিলোই, আর কিচ্ছু ভাবিনি, জানিস! ওই দ্যাখ, মা কেমন পাথর হয়ে বসে আছে, হয়তো আফসোসও করেছিল। নইলে রিভিউয়ের রেজাল্ট আসার পরের দুবছর কি আর রিহ্যাবে থাকতে হয়! রিভিউয়ের রেজাল্টে সবাই বুঝেছিল আমি সত্যি বলেছিলাম, জানিস! নয় নয়, ওটা আসলে একশো আশিই ছিল।"
কে রিহ্যাবে ছিল, ঠাম্মি? চমকে উঠল তাতান। এরা কত কিছু বলেনি তাকে!
"তুমি, তুমি কি করে জানলে সব?"
আচ্ছা, শিরীনকে কি ওর ভয় পাওয়া উচিত? মানে, স্বপ্ন, না সত্যি, বোঝা যাচ্ছে না, তবে শিরীন যে অশরীরী, তাতে তো সন্দেহ নেই। কি করবে তাতান?
"হি হি, অত ভেবেচিন্তে ভয় পেতে হয় নাকি রে পাগলি? ভয় করলেই ভয়, নইলে কিছুই নয়। শুনিসনি?"
"তুমি এতদিন আসোনি কেন শিরীন?"
"ওই ডায়েরিটা যে এতদিন সামনে আসেনি রে! আমার সবটুকু যে ওতেই আছে। ঘুমিয়ে ছিলাম ওখানেই এত বছর, তুইই তো আমায় জাগালি, নিয়ে এলি ধুলো ঝেড়ে। আমিও জানতে পারলাম তুই কিচ্ছু জানিস না।"
"তুমি যাবে না তো শিরীন, আর যাবে না তো আমায় ছেড়ে? জানো, এবাড়িতে আমার কোনও বন্ধু নেই, তুমি থাকো প্লিজ!"
"আমার কি থাকলে চলে রে? কতটা কষ্ট যে হয়, যদি বোঝাতে পারতাম! টান, শুধু টান, একটা অদ্ভুত কষ্ট রে, মনে হয় আমার সবটুকু ভেঙেচুরে যাচ্ছে, আর পারছি না রে তাতান, এবার আমায় মুক্তি দে।"
তাতান কি করবে বুঝে উঠতে পারে না, এই ক'দিনে শিরীনকে এই প্রথম বড় ম্রিয়মাণ লাগে।
"ওই ডায়েরিটা, ওটাকে কাল পুড়িয়ে দিতে পারবি? ওটা থাকলে আমারও আর কোত্থাও যাওয়া হবে না।"
"তুমি যেও না পিসিমণি! আমি ডায়েরিটা আবার ওই বইয়ের তাকে রেখে আসব। আমার কাছে তোমার বলতে তো এইটুকুই রইলো, বলো? এটুকুও নিয়ে চলে যেও না, প্লিজ!"
স্বপ্ন, নাকি সত্যি? জানে না তাতান। আলো আঁধারির মাঝে আধোঘুমের ঘোরে তাতানের চোখ উপচে জল ঝরে ঝরঝর, সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চায় তার আসার আগেই চলে যাওয়া পিসিমণির হাত, ধরা যায় কিনা বোঝা যায় না, ওদিকে বাইরে দুই একটা পাখির ডাক জানান দেয় শেষের দিকে আরও একটা দিন এগিয়ে যাওয়া হলো।
(সমাপ্ত)
#ধূপছায়া_মজুমদার
একটা ডায়েরি। সম্ভবত আর্চিজের, হ্যাঁ, সেই আর্চিজ গ্যালারির, কাদের যেন কথা অনুযায়ী একসময় যে আর্চিজ গ্যালারি আর ভালবাসা নাকি সমার্থক শব্দ ছিল, সেই আর্চিজ গ্যালারিরই নাম ছোট্ট করে খোদাই করা আছে ডায়েরিটার মলাটের পিঠের দিকে। ডায়েরিটার মলাটের ছবিটা দেখলেই কেন জানি মামারবাড়ির চিলেকোঠার বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে তাতানের। যদিও ডায়েরিটা সেখানে পাওয়া যায়নি, ওটা আসলে তাতানের পিসি শিরীনের ছিলো, দাদুর ঘরের বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে সেখান থেকে এক দুপুরে তাতান পেয়েছিল ডায়েরিটা, তাও হলো বছরখানেক। আঠেরো উনিশ বছর ধরে জিনিসটা কারও চোখে পড়েনি কেন কে জানে!
ডায়েরিটার হাল্কা মেরুন বর্ডার, সেই বর্ডারের মাঝে হলদেটে দেওয়ালের সামনে কাঠের মেঝেতে রাখা একটা বেতের ঝুড়ির ছবি, বেতের ঝুড়িটা আধখোলা হয়ে উপচে পড়ছে কার যেন জাঙ্ক জুয়েলারি আর জমিয়ে রাখা কিছু হলদেটে চিঠি, ছবিটা দেখলেই তাতানের মনে হয় মামারবাড়ির বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা। ওই ট্রাঙ্কটায় বম্মার বিয়ের বেনারসি আর দাদুর জন্মের খবর বয়ে আনা একটা চিঠি দেখেছিল তাতান, তারপর থেকেই কোথাও কোনও আড়াল থেকে পুরনো জিনিসকে উঁকি মারতে দেখলেই ওর ওই ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে যায়।
তা, তাতান যে ওর পিসির ডায়েরি নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ও কি জানে না অন্যের ডায়েরিতে হাত দিতে নেই, অন্যের ডায়েরি পড়তে নেই? শিরীন জানতে পারলে রাগ করবে না? তা সে একটু করে বোধহয় রাগ, তাতান খেয়াল করে দেখেছে, এই একবছরেও ও ডায়েরিটার নামের পাতা আর যে পাতায় একটা ফার্ণের পেন্সিল স্কেচ করা আছে, সেটা উল্টে আর ভেতরে ঢুকতে পারেনি। হয় দুচোখে নেমে এসেছে রাজ্যের ঘুম, নইলে হঠাৎ শুরু হওয়া যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে গেছে প্রায়, তাতানের সাইনাসের প্রব্লেম আছে, মাথাব্যথা সর্দি এগুলো ওর বারোমাসের সাথী। তবুও, ডায়েরির পাতা ওল্টানো আর সাইনাসের ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠার দিনগুলো মিলে যাওয়াটাকে ও ঠিক কাকতালীয় বলে মেনে নিতে পারে না। ও জানে, শিরীনের ডায়েরিটাকে ঘিরে থাকে এমন একটা কিছু, যার নাগাল কারও পাওয়া সম্ভব নয়।
পিসিকে তাতান শিরীন বলেই ডাকে, বাড়ির বাকি সবার কাছে শুনে শুনে ছোট থেকেই অভ্যেসটা হয়েছে। শিরীন ওদের সময়ে ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টদের মধ্যে একজন ছিলো। মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম হয়েছিল, শিরীনের ঝকঝকে চেহারা আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ বহুদিন পরেও ওর স্কুলের টিচার, নন টিচিং স্টাফ সবার মনে ছিল, কেউ কেউ বোধহয় এখনও মনে রেখেছে। কারণ, ওদের এই ছোট্ট শহরে রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই ইলাদিদা, তপতীদিদাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, ওর ঠাম্মিও শিরীনদের স্কুলেই ইংলিশ টিচার ছিলেন, সেই সুবাদে তাঁর কলিগরা সবাই তাতানের দিদা। তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করেন, তাতানের মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো। শিরীনকে স্পষ্টভাবে মনে না রাখলে তুলনাটা তাঁরা করতে পারতেন?
"তাতান, তাতান, উঠবি না? ডায়েরিটা খোলা রয়েছে যে টেবিলে, পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে হাওয়ায়, ধরবি না? আয়, পাতাগুলো ধুলো হয়ে যাওয়ার আগে নেড়েচেড়ে দেখে নে, আয়, আয়!"
ধড়মড় করে উঠে বসল তাতান। কে ডাকছিল ওকে? কোথায় ডায়েরি? বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালতেই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরিটা, ফরফর শব্দে পাতা উড়ছে, এক দুটো পাতা বোধহয় আলগা হয়ে এসেছে। হবে না? আঠেরো বছর কম সময় নাকি? তাতান তাড়াতাড়ি উঠে এসে পাতাগুলো গুছিয়ে তুলে রাখল ডায়েরির মধ্যে। কিন্তু ওকে ডাকল কে? গলাটা অচেনা, কিন্তু কথা বলার ধরনটা ঠাম্মির মতো, ডাকছিল এমন আপন করে, যেন কতজন্মের চেনা সে!
"মা, শিরীনের ভয়েস কেমন ছিলো? কথা বলতো কেমন করে?"
"এ আবার কি প্রশ্ন সকাল সকাল? নাও, কর্নফ্লেক্সের বাটি শেষ করে উদ্ধার করো আমায়। আমায় যা বললে বললে, ঠাম্মির সামনে নামটা ভুলেও উচ্চারণ করবে না। জানো তো সবই, তাও কেন কথার অবাধ্য হও!"
তাতান জানে, এবাড়িতে শিরীনের নাম উচ্চারণ করা, ওর ছবি দেখতে চাওয়া, ওর কথা জিজ্ঞেস করা সবই একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু তাতানই বা কি করবে? এতদিন ছোট ছিল, যে যা বলেছে শুনেছে, কিন্তু এখন বড় হচ্ছে ও, কৌতুহলও বড় হচ্ছে, নিজের পিসি, তার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করবে না মানুষের? আশ্চর্য! কিসের এত রাখঢাক তাতান বোঝে না।
"তাতান, তাতান, তুই জানতে চাস সব কথা? শুনতে চাস?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবটুকু জানতে চাই। ওরা কেন কিচ্ছু বলে না জানি না। তুমি বলবে?"
"বলব রে, সব বলব। বলব বলেই তো বার বার..."
"কিন্তু তুমি কে? তোমায় দেখলে কেন মনে হয় আয়না দেখছি? কিন্তু চিনতে পারি না! কে তুমি?"
"হি হি হি, আমি তোর আয়না? নাকি তুই আমার চোখ?"
"তাতান, অ্যাই তাতান, ওঠ ওঠ, অনেক বেলা হয়ে গেল, এক্ষুনি মামারা এসে পড়বে মা।"
ঘুমটা ছিঁড়ে গেল মায়ের ডাকে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটাও ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল। কি যেন একটা ধরতে চাইছিল হাত বাড়িয়ে, হলো না, ফসকে গেল, ছেঁড়া ছেঁড়া চিন্তা নিয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছে, মেসেজ এল, সায়ক।
"মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্য ডে! মেনু কি ওবেলা? মাটন ছাড়া আজকাল কিছু হজম হচ্ছে না, জানিস! কি কেলো মাইরি!"
ঝরঝর করে হেসে ফেলল তাতান। চড়ের একটা ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই করে বাথরুমে ঢুকল। বেসিনের কলটা খুলতেই স্বপ্নটা ফিরে এলো আবার, আয়নায় চোখ পড়তেই ঝট করে মনে পড়ে গেল, ওর মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো।
"তাতান, তাতান, হ্যাপি বার্থডে! ইউ আর এইটিন নাউ। বড় হয়ে গেছিস তুই।"
"তুমি শিরীন?"
"এই দ্যাখো! মেয়ে চিনে ফেলেছে।" ঝরঝর করে হেসে ফেলল আয়না, আর তাতান অবাক হয়ে দেখল আয়না, নাকি শিরীন, তারও মাড়ির ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একজোড়া গজদাঁত।
"তুমি রোজ আমায় ডাকছ কেন? আগে তো কখনও দেখিনি তোমায়? হঠাৎ কোত্থেকে এলে? ঠাম্মির কাছে তোমার কথা বলতে নেই কেন? কেন তোমার নাম করা এবাড়িতে বারণ? বলো শিরীন, বলো।" সব্বাইকে বারবার করা প্রশ্নগুলো তাতান করে বসল স্বপ্নে আসা আয়নাকেও।
"ওই যে টেবিলে রেখেছিস ডায়েরিটা, ওটা কি আগে কখনও দেখেছিলি নেড়েচেড়ে? ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো এর আগে উল্টেছিলি কখনও? ওতে হাত না দিলে আমায় জানবি কেমন করে? আয় তাতান আয়, পাতা উল্টে দ্যাখ!"
এবার আর ওই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না তাতান। উঠে গিয়ে বসলো টেবিলে, পাতা ওল্টাতে হলো না, কেউ যেন ওর পাশে বসে যত্ন করে উল্টে দিতে লাগল ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো, আর তাতানের আঠেরো বছরের জন্মদিনে ওর সামনে উঠে এলো একটা ছবি, চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া, আর অচেনা কারও চেনা হয়ে আসা, সব একাকার হয়ে যেতে লাগল মিলেমিশে।
মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম শিরীন যে উচ্চমাধ্যমিকেও মারকাটারি রেজাল্ট করবে, সে নিয়ে কারও কোনও সন্দেহই ছিলো না। টেস্টের রেজাল্টেও তার একটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর একে একে ফাইনাল, জয়েন্ট, জয়েন্টের রেজাল্ট, এসব পেরিয়ে এসেছিল উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন। স্কুলে রেজাল্ট জানতে গিয়েছিল শিরীন, গিয়েই শুনেছিল তুমুল হট্টগোল, ইংলিশের বনানীদি, অর্থাৎ শিরীনের মা, নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। রেজাল্ট দেখা শিকেয় তুলে শিরীন ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে, মায়ের মাথাটা কোলে তুলে নিতে নিতে দেখেছিল ভিড়টা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, কেমন যেন চোরা চাউনিতে দেখছে সবাই ওকে, জ্ঞান ফেরার পর মাকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখে আবার রেজাল্টের বোর্ডের কাছে এসেছিল ও, বন্ধুরা তখন নীরবতা পালন করছে নোটিশ বোর্ডের সামনে। চোখে প্রশ্ন নিয়ে বোর্ডে নিজের রোল নম্বরটা খুঁজে পেয়ে খুঁটিয়ে দেখতেই দুলে উঠেছিল পায়ের নিচের মাটি। পাশে দাঁড়ানো শ্রীপর্ণা দুহাত দিয়ে ওকে আঁকড়ে না ধরলে ওও বোধহয় মায়ের মতোই জ্ঞান হারাতো। অঙ্কে নাকি শিরীন ব্যাক পেয়েছে, ওর নামের পাশে লেখা আছে যে এবারের উচ্চমাধ্যমিকে হেরে যাওয়া মানুষদের মধ্যে ও একজন। রেজাল্ট হাতে নিয়ে জানা গিয়েছিল নয় পেয়েছে ও অঙ্কে, দুশো নম্বরের মধ্যে একশো বিরাশি ও ঠিক করে এসেছিল, পৃথিবী উল্টে গেলেও এই সত্যিটা উল্টে যাওয়ার নয়, তার পরেও ওর রেজাল্টে লেখা আছে ও নয় পেয়েছে, অনলি নাইন।
"এক লহমায় দুনিয়ার সব রং কেউ শুষে নিলে দুনিয়াটাকে কেমন দেখতে লাগে জানিস? আমি জানি। আজ একমাস ধরে দেখে আসছি কেমন হয় রংহীন দুনিয়া, ঠিক কতটা সহজে সবটুকু ভুলে গিয়ে কাছের লোকেরাও দূরে ঠেলে ফেলে দেয় ফেল করা ছেলেমেয়েদের। ফেল করিনি কোনওদিন, বুঝলি! এই অভিজ্ঞতাটা কেমন হয় জানতাম না। কতটা অসহায় লাগে একশো আশির বদলে নয় দেখতে, জানা ছিল না, জানা ছিল না।"
লিখেছিল শিরীন, রেজাল্টের একমাস পরে। আরও লেখা ছিল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে চলেছে তাতান, ঠাম্মি নাকি ওই একমাসে মেয়ের মুখ দেখেননি, তাকে খেতে দেননি, তার বেশিরভাগ বইখাতা একদিন নাকি পুড়িয়েও দিয়েছিলেন। যেটুকু যা যত্ন করার করতো তাতানের বাবা আর মা। তাতান তখনও পৃথিবীর আলো দেখেনি।
অবাক হয়ে ভাবে তাতান, তার এই নরম ঠাম্মি এতটা নিষ্ঠুর কেমন করে হয়েছিলেন?
ভাবতে ভাবতে টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাতান।
"তাতান, বাকিটুকু জানবি না? ওই দ্যাখ, ওই ঘরের খাটে, ফুলের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে শিরীন, জানিস, আগের দিনই দাদাভাই রিভিউয়ের জন্য অ্যাপ্লাই করে এসেছিল, বউমণিকে বলেছিল, আমি ঘুমোচ্ছিলাম বলে রাতে আর জানায়নি, ভেবেছিল পরেরদিন সকালে বলবে। ওরা কি করে জানবে বল, বিকেলে, যখন দাদাভাই বউমণি অফিসে, তখন মা শিপ্রাদির ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা বলেছে, পরের মাসেই রেজিস্ট্রির কথাও পাকা করে ফেলেছে, ওরা কি করে জানবে যে একশো আশি উল্টেপাল্টে নয় হয়ে গেছে বলে আমি রাতারাতি মায়ের গলগ্রহ হয়ে গিয়েছি ওই কদিনে? বড্ড লেগেছিল জানিস তাতান! গালে চড় এসে না পড়লেও যে বুকে কতটা লাগে সেদিন বুঝেছিলাম। বাবার কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে হয়েছিল হঠাৎ। একমাসের ঘুমের ওষুধ তো ছিলোই, আর কিচ্ছু ভাবিনি, জানিস! ওই দ্যাখ, মা কেমন পাথর হয়ে বসে আছে, হয়তো আফসোসও করেছিল। নইলে রিভিউয়ের রেজাল্ট আসার পরের দুবছর কি আর রিহ্যাবে থাকতে হয়! রিভিউয়ের রেজাল্টে সবাই বুঝেছিল আমি সত্যি বলেছিলাম, জানিস! নয় নয়, ওটা আসলে একশো আশিই ছিল।"
কে রিহ্যাবে ছিল, ঠাম্মি? চমকে উঠল তাতান। এরা কত কিছু বলেনি তাকে!
"তুমি, তুমি কি করে জানলে সব?"
আচ্ছা, শিরীনকে কি ওর ভয় পাওয়া উচিত? মানে, স্বপ্ন, না সত্যি, বোঝা যাচ্ছে না, তবে শিরীন যে অশরীরী, তাতে তো সন্দেহ নেই। কি করবে তাতান?
"হি হি, অত ভেবেচিন্তে ভয় পেতে হয় নাকি রে পাগলি? ভয় করলেই ভয়, নইলে কিছুই নয়। শুনিসনি?"
"তুমি এতদিন আসোনি কেন শিরীন?"
"ওই ডায়েরিটা যে এতদিন সামনে আসেনি রে! আমার সবটুকু যে ওতেই আছে। ঘুমিয়ে ছিলাম ওখানেই এত বছর, তুইই তো আমায় জাগালি, নিয়ে এলি ধুলো ঝেড়ে। আমিও জানতে পারলাম তুই কিচ্ছু জানিস না।"
"তুমি যাবে না তো শিরীন, আর যাবে না তো আমায় ছেড়ে? জানো, এবাড়িতে আমার কোনও বন্ধু নেই, তুমি থাকো প্লিজ!"
"আমার কি থাকলে চলে রে? কতটা কষ্ট যে হয়, যদি বোঝাতে পারতাম! টান, শুধু টান, একটা অদ্ভুত কষ্ট রে, মনে হয় আমার সবটুকু ভেঙেচুরে যাচ্ছে, আর পারছি না রে তাতান, এবার আমায় মুক্তি দে।"
তাতান কি করবে বুঝে উঠতে পারে না, এই ক'দিনে শিরীনকে এই প্রথম বড় ম্রিয়মাণ লাগে।
"ওই ডায়েরিটা, ওটাকে কাল পুড়িয়ে দিতে পারবি? ওটা থাকলে আমারও আর কোত্থাও যাওয়া হবে না।"
"তুমি যেও না পিসিমণি! আমি ডায়েরিটা আবার ওই বইয়ের তাকে রেখে আসব। আমার কাছে তোমার বলতে তো এইটুকুই রইলো, বলো? এটুকুও নিয়ে চলে যেও না, প্লিজ!"
স্বপ্ন, নাকি সত্যি? জানে না তাতান। আলো আঁধারির মাঝে আধোঘুমের ঘোরে তাতানের চোখ উপচে জল ঝরে ঝরঝর, সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চায় তার আসার আগেই চলে যাওয়া পিসিমণির হাত, ধরা যায় কিনা বোঝা যায় না, ওদিকে বাইরে দুই একটা পাখির ডাক জানান দেয় শেষের দিকে আরও একটা দিন এগিয়ে যাওয়া হলো।
(সমাপ্ত)
No comments:
Post a Comment