সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নীল তিমির ধাক্কায় টেক-স্যাভি গেমপ্রিয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে জীবন থেকে সরে যাওয়ার এক উদ্দাম প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে, মিডিয়ার কল্যাণে সে সংবাদ আমাদের সবার কাছেই পৌঁছেছে। সত্যি বলতে কি, নীল তিমি সংক্রান্ত খেলাটি সম্পর্কে আপনার বিন্দুমাত্র কৌতূহল না থাকলেও সাবধান করার অছিলায় সেটি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য আপনার মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও অনেকে নিয়ে ফেলেছে। তাই এই মারণখেলা নিয়ে বেশি কথা খরচ করছি না। বরং আজ একটা গোলাপি তিমির গল্প শুনব চলুন।
এই 2017-র এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে একটা খেলা শুরু করেছে Baleia Rosa (পর্তুগিজ ভাষায় গোলাপি তিমি) নামক একটি ওয়েবসাইট, ইতিমধ্যে সাড়ে তিন লাখের ওপর লোক তাদের ফেসবুকের পাতায় খেলাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন, খেলতে শুরুও করেছেন।
এইটুকু পড়ে ভুরু কুঁচকে ফেলেছেন তো? ভাবছেন আপদগুলো আবার একটা মরণফাঁদের গল্প শোনাতে এসেছে! আজ্ঞে না মশাই, এ কোনও মরণফাঁদ নয়, বরং নীল তিমির করালগ্রাস থেকে আমার আপনার আশেপাশের সদ্যযৌবন পাওয়া প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটা চেষ্টা বলতে পারেন, অন্তত পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টাদের বক্তব্য তাই। তা, কেমন এই খেলা?
ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতোই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমেও রয়েছে পঞ্চাশটি কাজের এক তালিকা, খেলব বলে তাদের খাতায় নাম তুললে আপনাকে টুকটুক করে সেইসব কাজগুলো একে একে সেরে ফেলতে হবে। তবে গোলাপি তিমির দেওয়া কাজগুলো অতীব জীবনমুখী।
হয়তো আপনাকে বলা হল রোজ একটা করে চিরকুটে লিখে ফেলুন সেদিন কি ভাল কাজ করলেন, তারপর সেটা জমা করুন লক্ষ্মীর ভাঁড়ে, এক বছর পর ভাঁড় ভেঙ্গে ভাল কাজের ডায়েরি পড়বেন।
কিংবা ধরুন বাবা-মা-পিসি-মাসি এঁদের সবাইকে আপনি কত্ত ভালবাসেন সেটা তাঁদের জানানোর দায়িত্ব পড়ল আপনার ওপর। তা, এদেশে তো গুরুজনদের জড়িয়ে ধরে 'ভালোবাসি' বলার চল বিশেষ নেই, কাজেই তাঁদের হাতে হাতে ক'টা কাজ করে দেবেন, নিদেনপক্ষে আধঘণ্টাটাক সময় বের করে তাঁদের মুখোমুখি বসে দুটো নিঃস্বার্থ কথা বলবেন, ওতেই ওঁরা আপনার ভালবাসা দিব্যি অনুভব করবেন।
আমাদের দেশে এখন জোরকদমে স্বচ্ছতা অভিযান চলছে। তাতেও উৎসাহ জোগানোর উপায় আছে গোলাপি তিমির কাছে। সারাদিনে একবারের জন্য হলেও যদি অন্য কারও রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা নিজে হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসেন, তবে আপনি একজন সফল খেলোয়াড়। বিনা কারণে রাস্তা পরিষ্কার রাখার দায় আমাদের না-ই থাকতে পারে, কিন্তু খেলায় জেতার বাসনায় তো অবশ্যই আমরা রাস্তা সাফসুতরো করে ফেলব, তাই না?
এমন ভালো কাজের তালিকা বেশ লম্বা, যেমন, নিজের অব্যবহৃত জিনিসপত্র দুর্গত মানুষের সাহায্যার্থে দান করা, মজাদার পোশাক পরে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা, মাঝেমধ্যে আয়নার ওপারের মানুষটার সঙ্গে হেসে রঙ্গতামাসা করা, যাতে বোঝা যায় সে সত্যিই ভাল আছে, মেঘের মধ্যে তুলোর ঝুড়ি বা ডাইনোসর লুকিয়ে আছে কিনা তা খোঁজা, মনের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে কাগজে এঁকে ফেলে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য চলতে শুরু করা, এবং সবার শেষে সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি, একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা। জীবন শেষ করে দেওয়ার চেয়ে জীবন বাঁচানো যে অনেক কঠিন কাজ সে তো আমরা সবাই জানি। গোলাপি তিমির ছুঁড়ে দেওয়া এই যে জীবন বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ, এটা যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার জীবনে হতাশা বলে সম্ভবত আর কিছু থাকবে না। যে মানুষটা হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিলো, তাকে আরেকটা জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনা, এই কাজটাই করতে চাইছে গোলাপি তিমি। তার দেওয়া আপাত বালখিল্য কাজগুলো এই উদ্দেশ্যেই তৈরি। বারবার 'তুমি ভালো, তুমি সুন্দর, তুমি কত কিছু করতে পারো!' এগুলো মনে করিয়ে খেলতে থাকা মানুষটার আত্মবিশ্বাসের ভিত পোক্ত করে দেয় সে, যেখানে হতাশার কোনও জায়গা নেই।
2015 থেকে ওয়েবদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল নীল তিমির আক্রমণ, তার মোকাবিলায় 2017 তে এল গোলাপি তিমি। সাও পাওলোতে সরকারের পক্ষ থেকেও গোলাপি তিমির প্রয়াসকে সমর্থন করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বব্যাপী মারণখেলাকে কিছুটা হলেও রোখা যায়। ভারতেও থাবা বসিয়েছে নীল তিমি, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষেধক হিসেবে এখানেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমটাকে যদি নাও ব্যবহার করতে চাই, খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ভালো কাজের তালিকাকেও যদি রোজকার জীবনে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, তাতে আর কিছু না হোক, জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগাযোগ বাড়বে, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অকালে পরপারে পাড়ি দিতে চাওয়ার প্রবণতা তাতে কিছুটা কমতে পারে।।
********************
তথ্যসূত্রঃ
http://baleiarosa.com.br
http://indianexpress.com
ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত
https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.708159399363905.1073741828.707552542757924/776736352506209/?type=3&source=54
No comments:
Post a Comment