Wednesday, 29 March 2017

অলিম্পিক? ওদের?

মার্চের চোদ্দ থেকে পঁচিশ তারিখে অস্ট্রিয়াতে বসেছিল বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষদের অলিম্পিকের শীতকালীন আসর. সম্প্রতি ইণ্টারনেটে এসম্পর্কে খুব ছোট্ট একটা খবর চোখে পড়েছিল. ভারতীয় দল (Special Olympics Bharat) নাকি সেখানে তিয়াত্তরটি পদক জিতেছে! তার মধ্যে আবার সাঁইতিরিশটা সোনা!

 ভাবলাম আরেকটু খুঁজি. কম বড় কৃতিত্ব তো নয়, নিশ্চয়ই ভারতীয় মিডিয়া বিস্তারিত খবর জানাবে সাধারণ মানুষকে. 

আমার উদ্দেশ্য অবশ্য বিশেষ মহান ছিল না. মাসকয়েক হল একটা ছোটদের পত্রিকার সন্ধান পেয়েছি, তার সম্পাদকের কাছে নিজের বেশ ভারিক্কি একখানা ইমেজ খাড়া করেছি ভাল ভাল কথা ব'লে, এখন একখানা লেখা না পাঠালে মান থাকে নাকি! ভাবলাম এ খবর তো মন্দ নয়, দু 'চারটে খবরের কাগজ ঘেঁটে দু 'পাতার রচনা লিখে পাঠিয়ে দিলেই হল. লেখা পাঠিয়ে মানরক্ষাও হবে, আবার 'দ্যাখো আমি কেমন দরদী মানুষ, সব দিকে লক্ষ্য রাখি ' একথা বেশ ঘটা করে সবাইকে জানানোও যাবে!

সারাদিন খেটেখুটে নেট ঘেঁটেও একটা খবরের কাগজের আধপাতা রিপোর্ট ছাড়া আর কিচ্ছুটি পেলাম না. পরেরদিন আবার খুঁজতে বসলাম. ততদিনে গেমস শেষ, খেলোয়াড়দের ঘরে ফেরার পালা এবার. ভাবলাম এতগুলো মেডেল নিয়ে সোনার ছেলেমেয়েরা দেশে ফিরছে, ছবিসহ না হলেও খবরটা অন্তত ছাপা হবে. 
দুটো কি তিনটে খবরের খোঁজ পাওয়া গেল নেটে. কয়েক লাইনের খবর. যা খুঁজছিলাম সেভাবে পেলাম না.

একটি দৈনিকের খেলার পাতায় ছবি পাওয়া গেল মেরি কম, সাইনা নেহাওয়াল প্রমুখ ক্রীড়াবিদদের, ওনারা নাকি কোনো এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অলিম্পিকের পদকজয়ীদের সংবর্ধনা দিতে এসেছিলেন. রিপোর্টে মেরি কমের আবার রিং -এ ফেরার ইচ্ছে ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু কথা পাওয়া গেল, কিন্তু স্পেশাল অলিম্পিক ভারতের 73 টি পদকজয়ের ব্যাপারে পাওয়া গেল কেবল একটি বাক্য. ছবির তো প্রশ্নই ওঠে না.

 হ্যাঁ, মানছি, পদকজয়ীদের সংবর্ধনার ছবি ছাপতে হলে হয় সে ছবির অর্ধেক জুড়ে থাকত কতগুলো ক্রাচ কিংবা হুইলচেয়ার, নয়ত চোখেমুখে তথাকথিত মেধা বা সৌন্দর্য কোনোটারই ছাপ না থাকা কতগুলো মুখ. তবে কিনা সেই মানুষগুলো বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছেশক্তি দিয়ে, কখনো কখনো নিজের শারীরিক ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েও 105 টা দেশের প্রায় 2600 মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যখন সাঁইতিরিশটা সোনা, দশটা রূপো আর ছাব্বিশটা ব্রোঞ্জ নিয়ে ঘরে ফেরে, তখন তাদের কথা জানা আর তাদের চেনাটা দেশের মানুষের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে. হ্যাঁ, এই চিনতে চাওয়াটাও একরকমের দেশপ্রেম.

দিনতিনেকের খোঁজাখুঁজির পর কিছু তথ্য পেয়েছি. হয়ত আমারই অক্ষমতা, সেভাবে মন দিয়ে চোখকান খুলে রাখলে হয়ত আরো আগে আরো বেশি তথ্য পাওয়া যেত. যাইহোক, এটুকু সম্বল করেই আপাতত এগোনোর চেষ্টা করি, আশা থাকুক আগামীতে নিশ্চয়ই দেশপ্রেমিক দেশবাসী সঞ্জয় কুমার, শিখা রানিদের একডাকে চিনবে. কি, আসবে তেমন কোনো দিন?


তথ্যসূত্র: www.specialolympics.org
              www.financialexpress.com

(লেখার মতামত সম্পূর্ণ আমার নিজের. কোনো কথা কাউকে আঘাত দিয়ে থাকলে আমি তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী. তথ্যে কোনো ত্রুটি থাকলে জানানোর অনুরোধ করছি.)


Friday, 10 March 2017

"কবে ছেল?"

ঘটনাটা শুনেছিলাম আমার ছোড়দিদার কাছে।
কোনো এক গরমকালের বিকেল, দিদা গাছে জল দেওয়া সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়েছেন দু 'দণ্ড জিরোবেন ব 'লে।  আমার মামারবাড়ি ছিল একেবারে বড়রাস্তার ধারেই। অলস দুপুর সবে আড়মোড়া ভেঙ্গে গুটিগুটি পায়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে, বড়রাস্তায় গাড়ির চলাচল বাড়ছে একটু একটু, বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে নিচের ফুটপাতের ফলওয়ালা তার পসরায় আঁজলা করে খানিকটা জল ছিটিয়ে দিল, যে জুতো - ছাতা -সারাইওয়ালা ঠা -ঠা রোদ্দুরে  বসে না থেকে 103 নম্বরের রোয়াকে গিয়ে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিল এতক্ষণ, সে আবার নিজের জায়গায় এসে জুতো সারানোর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখছে। ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা এরকমই নানা ছবি ছোড়দিদা দেখছিলেন কিছুটা মন দিয়ে, বাকিটা আনমনে।
হঠাৎ চোখ পড়ল নিচে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসা এক মাঝবয়সী মহিলার দিকে। পাড়াতেই কিছু বাড়িতে রোজের বাসনমাজা - ঘরমোছার কাজ করে সে। তার মা করত এক সময়, মেয়েও করেছে বিয়ের আগে কদিন, ছেলেপুলেসমেত বর যবে এবাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গেল, তবে থেকে সেসব বাড়ির ঠিকে কাজের ভার পাকাপাকিভাবে মেয়ের হাতে। রোজ বিকেলে এই সময়টায় সে হাতের শাঁখাপলা আর লোহায় ঝোলানো সেফটিপিন ঝমঝমিয়ে কাজের বাড়ির দিকে হেঁটে যায়।  কালোকোলো চেহারায় সিঁথির সিঁদুর বেশ খোলতাই হয়। কিন্তু আজ চেহারাটা এমন ম্যাড়ম্যাড়ে কেন? ভাল করে নজর করতেই দিদা চমকে উঠলেন। আহা রে! সিঁথিটা আজ একদম খালি যে! হাতগুলোও ন্যাড়া, শাঁখাপলা নোয়া উধাও! পরনের কাপড়টাও সাদাটে।   ওইজন্যই বউটাকে ক 'দিন দেখা যায়নি। দিদা শুনেছিলেন, মনে ছিল না। মনটা একটু ভারি হয়ে গেল।  শাঁখায় সিঁদুরে চেহারাটা বেশ লাগত।
বউটা অবশ্য রোজের মতই কাপড়ের কুঁচিটাকে পায়ের গোছের একটু ওপরে তুলে হেঁটে আসছিল, পথ আগলালো ওর মতোই আরেকজন। সে -ও বাড়ি বাড়ি ঠিকে কাজ করে। আগের জনের নতুন বেশ সে বোধহয় আজকেই দেখল, খবরটা পায়নি আগে। গালে হাত দিয়ে একটুক্ষণ বান্ধবীকে দেখে সে শুধোলো,
 "কবে গেল?"
সদ্যবিধবা বান্ধবীটি হাত উল্টে নিস্পৃহ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
"কবে ছেলো?"
বলে কাপড়ের কুঁচিটাকে আবার পায়ের গোছের ওপর তুলে হেঁটে চলল কাজের বাড়ির দিকে।