Wednesday, 14 December 2022

 #কমিকস_স্মৃতিকথা

(পর্ব ১ : বঙ্গীভূত বিদেশী কমিকসরা)
নিজের বইয়ের ভাণ্ডার গড়ে তোলা আমার শুরু হয়েছিল মোটামুটি ক্লাস ফোর ফাইভ থেকে। এর আগে রোববার রোববার বাবা বাজার সেরে আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে বাড়ি ঢুকতেন, আর আমি অমনি টুক করে খবরের কাগজের দুই নম্বর পাতাটা উল্টে নিচের বাঁকোণে জাদুকর ম্যানড্রেক আর অরণ্যদেবের কমিকসে চোখ বুলিয়ে নিতাম। সেই আমার কমিকসের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। কি করে যেন ধারণা হয়েছিল, এই দুটোই বড়দের কমিকস, তাই একটু রেখেঢেকে পড়তাম, যদিও বড়দের চোখ রাঙানি সইতে হয়নি কখনও। এরপর আনন্দমেলা হাতে পেতে আলাপ হলো কমিকসের দুনিয়ার রাজারাজড়াদের সঙ্গে।
প্রথমেই আসতো আর্চি। সূচীপত্রের কয়েকটা পাতা পরেই সোনালী চুল, শুঁয়োপোকা ভুরু আর গালভর্তি ব্রণর দাগ নিয়ে হাজির হতো এক ছটফটে কিশোর, আর্চিবল্ড অ্যান্ড্রুজ, সঙ্গে থাকতো তার অগণিত বান্ধবীরা, বেটি আর ভেরোনিকার নাম মনে আছে তাদের মধ্যে। মিস গ্রান্ডি বলে কোনও এক মধ্যবয়সিনী চরিত্র ছিলেন, আর্চিদের ক্লাসটিচার বা অমনি কেউ হবেন সম্ভবত। সত্যি কথা বলতে কি, বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, ডেট, এই শব্দগুলো সম্পর্কে ধারণা আমায় প্রথম দেয় আর্চির কমিকসের পাতাগুলোই। খুব যে পছন্দের চরিত্র ছিল তা বলব না, খানিকটা অকালপক্কই লাগতো তাকে আমার, তবে তার সদাহাস্যময় মুখখানা বেশ মনে আছে এখনও।
কমিকস শব্দটা মনে এলে বলতেই হয় টিনটিনের কথা। টিনটিনের প্রতি আমার মুগ্ধতা আজীবন থাকবে, সে সম্ভবত আমার প্রথম প্রেম। হার্জ ছদ্মনামের আড়ালে জর্জ রেমি নামে কোনও এক বেলজিয়ান ভদ্রলোক টিনটিনের জনক, এসব তত্ত্বকথা তখন জানতাম না, তখন কেবল আনন্দমেলায় টিনটিন পেলেই গোগ্রাসে গিলতাম, আর, ফিবছর বইমেলায় গিয়ে একখানা করে টিনটিনের বই বগলে বাড়ি আসতাম। আমার প্রথম কেনা টিনটিন কমিকস 'তিব্বতে টিনটিন'। সেই বইতেই জেনেছি বেলজিয়ান কিশোর আর তার অসমবয়সী দুই বন্ধুকে বাঙালিয়ানায় মুড়ে দিয়েছেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। সত্যি, তিনি দায়িত্ব না নিলে বোধহয় টিনটিনের পক্ষে বাঙালি মজ্জায় এভাবে মিশে যাওয়া একটু শক্ত হতো। আমরা জানতেও পারতাম না, ভয়ঙ্কর রেগে গেলে চেঁচিয়েমেচিয়ে উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে 'বিদঘুটে শশা, বেগুনি অক্টোপাস, অবিমৃষ্যকারী অলম্বুষ' ইত্যাদি বলে তেড়ে গালাগাল দিলে রাগ জুড়িয়ে জল হয়ে যায়। চুপিচুপি বলে রাখি, ইস্কুলে বন্ধুমহলে তো বটেই, এখন এই মাঝতিরিশে কত্তামশাইয়ের ওপরে গায়ের ঝাল ঝাড়ার দরকার হলেও আমি মনে মনে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের শেখানো বচনগুলোই আউড়াই, আর মনে মনে বলি, "কি জিনিস শিখিয়েছ গুরু!" ক্যাপ্টেনের হুইস্কিপ্রেমের কথা নিশ্চয়ই আলাদা করে আর বলতে হবে না, এমনই তার মাহাত্ম্য, যে, 'চাঁদে টিনটিন' না 'চন্দ্রলোকে অভিযান ' কিসে যেন তিনি হুইস্কির বশে ভেসে ভেসে মহাকাশযানের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলেন, "আমি এক ছোট্ট কোকিল, গাইছি কুহু কুহু'', মনে আছে? আর, তিব্বতে টিনটিনেই তো, ছোট্ট কুট্টুস অব্দি হুইস্কি টেস্ট করতে ছাড়েনি!
নাহ, ক্যাপ্টেন বড্ড বেশি জায়গা নিয়ে নিচ্ছেন, এবার একটু সিরিয়াস কথা হোক। আমার কেমন জানি মনে হয়, টিনটিন, আর আবোলতাবোল, এই দুটো বই যেন বইয়ের ভেতর আরেকটা বই। ছোটবেলায় যখন কম বুঝতাম, তখন এই দুটো বইয়েরই প্রতিটি লাইনের মহিমা ছিল একরকম, চুম্বকের মতো, শুরু করলে এক্কেবারে শেষ পাতা অব্দি পড়ে তবে থামতে হয়, বড় হয়ে আবার অনেকবার করে পড়ে দেখলাম, পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ব্যঙ্গের ছিটে, যা দেশকালের সীমা ছাড়িয়ে অতীব বিশ্বজনীন এবং প্রাসঙ্গিক। একটা ছোট্ট ছবির কথা মনে পড়ল, বলে নিয়েই অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবো।
'সোভিয়েত দেশে টিনটিন', টিনটিন ছদ্মবেশে সেখানকার সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা নিজের চোখে দেখতে গেছে, সেই নিয়ে লেখা 'দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ টিনটিন' সিরিজের চব্বিশটি বইয়ের প্রথম বই। সেখানে, সোভিয়েত দেশের এক কারখানায় নির্বাচন হচ্ছে, ভোট দিচ্ছেন শ্রমিকরা, আড়াল থেকে নজর রাখছে টিনটিন। একজন হোমরাচোমরা মানুষ চেয়ারে বসে হাঁক পাড়ছেন, "কে কে অমুক দলকে ভোট দেবে না হাত তোলো।" তাঁর দুপাশে দুই 'দাদা ', হাতের পিস্তল তাক করা ভোটারদের দিকে। বলা বাহুল্য, একটি হাতও উঠল না, নির্বিঘ্নে নির্বাচন সমাপ্ত হলো।
হুবহু এইরকম ছিল কিনা দৃশ্যটা, মনে নেই, তবে বক্তব্য এইরকমই ছিল।
টিনটিনের পর আসি আরেক প্রিয় কমিকস অ্যাস্টেরিক্স-ওবেলিক্সের কথায়। গোসিনি আর ইউদেরজোর কলমে-ছবিতে ওই দুই গল যোদ্ধা আর তাদের গ্রামের লোকের সঙ্গে যার একবার আলাপ হয়েছে, তার আর চিন্তা নেই, সে খোঁজ পেয়ে গেছে এক আজব দুনিয়ার। কে নেই সেই গ্রামে? সোনালী চুল আর ঝোলা গোঁফের বেঁটেখাটো যোদ্ধা অ্যাস্টেরিক্স, আদুরে গোলগাল চেহারার ওবেলিক্স যার পেশা মেনহির বানানো আর নেশা রোমান সৈন্য পেটানো, পুরোহিত এটাসেটামিক্স যার তৈরী জাদুপানীয় গল গ্রামটির বাসিন্দাদের যাবতীয় শক্তির উৎস, এক দরদী কিন্তু অত্যন্ত বাজে গাইয়ে কলরবিক্স যিনি কিনা দু'একবার স্রেফ গান গেয়ে রোমান সৈন্য ঘায়েল করেছেন, আর আছেন গ্রামের দলপতি বিশালাকৃতিক্স যাঁর একমাত্র ভয় আগামীকাল মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার, আবার নিজেই বলেন, "আগামীকাল কখনও আসে না।" ভারি ভালো লাগে এই কথাখানা। সত্যিই তো, আগামীকাল কক্ষনও আসে না, সব আগামীকালই শেষ পর্যন্ত 'আজ' হয়ে যায়!
এদের প্রতিটি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হতো রোমান সৈন্যদের হাত থেকে নিজেদের গ্রামকে রক্ষা করা। রোমান সেনারা সারা গলদেশ দখল করলেও এদের কাছে বারবার হেরে যেতো, সেই নিয়েই বোনা হতো কাহিনীগুলি। প্রতিটি নতুন অ্যাসটেরিক্সের গল্পের শুরুতে চরিত্রদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার স্টাইলটা আমার বেশ লাগতো। সবাই চেনা লোক, তাও বেশ সেই নতুন ক্লাসে উঠে দাঁড়িয়ে 'ইন্ট্রো ' দেওয়ার মতো একটা ব্যাপার মনে হতো। হয়তো অন্তর্নিহিত অনেক সত্যি কথা লুকিয়ে থাকতো প্রতিটি গল্পেই, যেমন সবেতে থাকে, কিন্তু সেসবে মন দিতে আমার ইচ্ছে করেনি কখনও। আমি মজে যেতাম ছবি আর সংলাপের ডিটেইলিং আর সরসতায়। অ্যাস্টেরিক্স বাংলায় অনুবাদ কে করেছিলেন মনে পড়ছে না, তিনি যে আমাদের জন্য রত্নখনির সন্ধান দিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। দুটো উদাহরণ দিয়েই চলে যাবো অন্য কমিকসের কথায়, নইলে কথার তোড়ে ভেসে যেতে হবে।
'অ্যাস্টেরিক্স ও ক্লিওপেট্রা' গল্পে, মিশর আর রোমের মধ্যে ধুন্ধুমার লড়াই বেধেছে, অ্যাস্টেরিক্স ওবেলিক্স আর এটাসেটামিক্স সেই যুদ্ধের সাক্ষী, পাঁচিলের এপারে একটি ত্রেব্যুশে (trebuchet) রাখা রয়েছে, তাইতে করে ভারি ভারি পাথর ছুঁড়ে ওপারে রোমান সেনাদের ছত্রভঙ্গ করা হচ্ছে। এক রোমান সৈন্য কোত্থেকে যেন উড়ে এসে সেই ত্রেব্যুশে-তে রাখা পাথরের ওপর আছড়ে পড়লেন, পরমুহূর্তেই পাথরটি ছোঁড়া হলো, ফলে পাথরের সঙ্গে উড়ে গেলেন। ঘটনাটি দেখে সাক্ষীদের আলোচনা :
"উড়েই এসেছিল"
"উড়েই গেল"
"একটু দম নিয়ে গেল।"
দ্বিতীয় উদাহরণ, কোনও এক যুদ্ধে নতুন এক রোমান সেনাপতি ব্যূহ গড়ার এক নতুন কৌশল কাজে লাগিয়েছেন, কৌশলটির নাম 'কচ্ছপব্যূহ'। কিরকম? না, একদল সেনা নিজেদের সামনে ঢাল ধরে একসাথে হেঁটে কচ্ছপের খোলের মধ্যে ঢুকে থাকার মতো একটা চেহারার দল নিয়ে গুঁড়ি মেরে এগোবে শত্রুপক্ষের দিকে। ভালো কথা, এগোচ্ছে 'কচ্ছপব্যূহ', পরের দৃশ্যেই দেখা গেল ঢালটাল ফেলে ব্যূহ ভেঙে সব সৈন্যরা দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। ছবিটির নিচে লেখা : পালানোর এই পদ্ধতির নাম 'খরগোশ '।
এবার বলি গাবলুর কথা। লাল গেঞ্জি কালো প্যাণ্ট গায়ে একটি নিরীহ ন্যাড়ামাথা বালক, যে কক্ষনও কথা বলত না, গুড়গুড় করে হেঁটে এদিক-ওদিক যেতো, আর ইশারায় সব বক্তব্য বুঝিয়ে দিতো। সে ভারি ভালো ছেলে, তাকে বড়রা কেউ চোখ রাঙায় না, কোথাও কোনও ভাঙা খেলনা গাড়ি পেলে সেটাকে সারিয়ে নিয়ে সাঙ্গোপাঙ্গোসমেত সেই গাড়ি নিয়ে আমোদে মেতে ওঠে, আবার কখনও রাস্তার ম্যানহোলের ভেতর ঢুকে কাজ করা লোকটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়, কিংবা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির সাহায্যে নানা ছোটখাটো সমস্যার সমাধান বের করে। সে বেশ উঁচুদরের পর্যবেক্ষকও। সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না, এমন অনেক তুচ্ছ ঘটনাও তার চোখে দিব্যি ধরা পড়ে যায় দেখতাম। অ্যাদ্দিন বাদে গাবলুর কথা মনে পড়ল, স্মৃতি ঠিক কথা বলছে কিনা মিলিয়ে নিতে উইকিপিডিয়ার দ্বারস্থ হলাম। সেখানে দেখলাম কার্ল টমাস অ্যান্ডারসনের 'হেনরি' অর্থাৎ আমাদের গাবলু কোনও এক সময়ে নাকি কথা বলা চরিত্র হিসেবেও জায়গা পেয়েছিল কমিকসের বইয়ে। ভালো লাগল না জেনে। বাকি সবাই তো কথা বলেই, গাবলু না হয় নিঃশব্দেই কাজ সারুক নিজের মতো করে, ভালোই তো!
গাবলু এল যখন, আরেকজনও আসুক, যদিও স্বভাবে সে পুরোপুরি উল্টো। বলছি ডেনিসের কথা। সোনালি চুল ঝেঁপে এসেছে কপালে, পরনে ঢোলা একখানা প্যান্ট, তার কর্মকান্ডে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে বাড়িতে আর পড়শিমহলে। ইস্কুলে ছুটিছাটা থাকলেই হয় সে তার বন্ধু জুটিয়ে নানান পাড়াতুতো অভিযানে বেরোয়, নয়তো প্রতিবেশী মি. উইলসনের বাড়িতে গিয়ে ঘাঁটি গাড়ে। মিসেস উইলসন (নাম বোধহয় মার্থা?) তাকে খুবই স্নেহ করেন, রান্নাঘর থেকে যথেচ্ছ কুকি নিয়ে খেয়ে ফেললেও কিচ্ছুটি বলেন না, কিন্তু মিস্টার উইলসনের পক্ষে ডেনিসকে সয়ে নেওয়া একটু মুশকিল হয়ে যায়। কখনও তিনি বালখিল্য নানা চ্যালেঞ্জে ওই ক্ষুদে দস্যুর কাছে হেরে যান, নয়তো তাঁর দরকারী কাজের সময়ে হাজির হয়ে ডেনিস তাঁকে তিতিবিরক্ত করে তোলে। তবে সময় কেটে যায়। সময় কেটে যেতো আমাদেরও, দস্যি ডেনিসের কীর্তিকলাপ পড়তে পড়তে। আনন্দমেলার পাতায় দস্যি ডেনিস এখনও আসে।
এরপর যে দুজনের কথা বলব, তাঁরা আমার পূর্বপরিচিত, অনেকটাই ছোটবেলায়। প্রথমজন হলেন রোববারের কাগজের দুইয়ের পাতার নিচের কোণের সেই অরণ্যদেব, আর দ্বিতীয়জন হলেন টারজান। লি ফকের সৃষ্ট ফ্যাণ্টমই যে আমাদের বাঙালী অরণ্যদেব, সেকথা বহুদিন পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করিনি। ভাবতাম ফ্যাণ্টম আসলে অরণ্যদেবের আদলে তৈরি অন্য একটি চরিত্র। ভদ্রলোককে বাঙ্গালী ভাবার একটা জোরদার কারণও ছিল, মনে পড়েছে। অরণ্যদেবের বিচরণক্ষেত্র ছিল বাঙ্গালার জঙ্গল, ভেবেছিলাম আসলে ওটা 'বাঙলা'র জঙ্গলই হবে, বইয়ে ভুল করে একটা বাড়তি 'আ'কার দেয়।
সে যাকগে, মোটকথা এই কমিকসটি নিয়ে ভাবতে বসলেই চিতার চেয়েও ক্ষিপ্র অরণ্যের প্রবাদপুরুষ অরণ্যদেব, তাঁর স্ত্রী ডায়ানা, পিগমিদের দলপতি গুরান, বিষমাখানো তীর, তাঁদের খুলিগুহা, দুই ক্ষুদে শিশু কিট আর হেলোয়েজ, ভিলেনদের চিবুকে অরণ্যদেবের সেই বিখ্যাত খুলিচিহ্নের দাগ, কিলাউইয়ের সোনালী বেলাভূমিতে ওদের ছুটি কাটাতে যাওয়া, দুই পোষা ডলফিন সলোমন আর নেফারতিতির পিঠে চেপে কিট হেলোয়েজের জলবিহার সব কেমন সারি দিয়ে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। অভিযানগুলোর ডিটেইলস তেমনভাবে এখন আর মনে নেই, তবে অরণ্যদেব যখন শহরে যেতেন পা অব্দি ঢাকা একখানা ওভারকোট পরে, পাশে হেঁটে যেতো গম্ভীর নেকড়ে ডেভিল, আর তাঁকে সবাই 'মি: ওয়াকার ' নামে সম্বোধন করত, তখন ভারি আশ্চর্য লাগতো। সব মিলিয়ে অরণ্যদেবের জাদুতে মেতে ছিলাম বহু বছর। তবে, এই কমিকসের ছবিগুলো কেমন যেন কালচে অন্ধকারে ঢাকা মতন হতো, রংচঙে নয়, এটা একটু অসন্তোষের বিষয় ছিল আমাদের।
টারজানের সঙ্গে আমার আলাপ অক্ষর চেনার বয়সের এক্কেবারে শুরুতে। 'টারজান' শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে একটি ফর্সামতো যুবক, ভারি সুঠাম চেহারা, সে একটা অতিকায় সিংহের ঘাড় গলা চেপে ধরে তাকে ছুরি মারতে উদ্যত। একটা পাতলা মতো বই ছিল মামারবাড়িতে, সম্ভবত লীলা মজুমদারের অনুবাদ, বাবা রে, তার পাতায় পাতায় সে কি ছবি আর বর্ণনা! ওই ক্ষুদে বয়সেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতো উত্তেজনার চোটে। তা, টারজানের জীবনকাহিনী মোটামুটি ওই বইতেই পড়া হয়ে গিয়েছিল, কিভাবে সে ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে জঙ্গলে এসে পড়েছিল, কেমন ছিল তার জীবনযাত্রা, রোজকার অভিযান, তাই আনন্দমেলায় অত মন দিয়ে আর পড়িনি। ছবিগুলোয় আঁধারের আধিক্য এই কমিকসেরও একটা সমস্যা ছিল, সেকারণেও কিছুটা অবহেলা করতাম বোধহয় টারজান কমিকসকে। মনে করতে গিয়ে দেখছি, প্রায় কোনও ছবিই মনে নেই। অথচ সেই ছোটবেলার বইয়ের টারজান যেদিন কিসব কাগজপত্র ঘেঁটে তার জন্মের ইতিহাস জানতে পেরেছিল, সেই জায়গাটা পড়ে হাপুসনয়নে কেঁদেছিলাম, এটা দিব্যি মনে আছে। টারজানের প্রেমিকা অথবা স্ত্রীর নাম মনে পড়ছে না, জেন কি?
জেন বলতে মনে পড়ল, সব্বোনেশে জেন-কে চেনেন? লাকি লুক-কে? আমাদের অভিষেক মনে করালো তার কথা। 'লাকি লুক আর সব্বনেশে জেন' বলে একটা বই ছিল আমার কাছে, অভিষেকও ওই একটাই বই পড়েছে বলল লাকি লুক সিরিজের। উইকিপিডিয়ার কাছে যেতে লাকি লুক সম্পর্কে আমার ধারণাই বদলে গেল! বেলজিয়ান কার্টুনিস্ট মরিস-এর তৈরি চরিত্র লাকি লুক নাকি বেজায় ওস্তাদ বন্দুকবাজ, বিভিন্ন প্রজাতির গুণ্ডাদের পিছু ধাওয়া করে বেড়ানো তার কাজ। আমি তাকে সব্বোনেশে জেন কমিকসে নেহাতই নিরীহ ছোকরা হিসেবে দেখেছিলাম যে! কি অন্যায়!
তবে সব্বোনেশে জেনের ব্যক্তিত্ব আর দাপটের নিচে সম্ভবত লাকি লুকের প্রতিভা চাপা পড়ে গিয়েছিল। মার্থা জেন ক্যানারি নামে এক মহিলা আমেরিকান যোদ্ধা ছিলেন, ভয়ানক ডাকাবুকো, নেটিভ আমেরিকান ইন্ডিয়ান গুন্ডাদের শায়েস্তা করতে ওস্তাদ ছিলেন। তাঁরই আদলে সৃষ্ট এই সব্বোনেশে জেন। প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী মানুষ। এর আগে কমিকসে যত মহিলা চরিত্র দেখেছি তাঁরা বেশিরভাগই বড্ড হিরোনির্ভরশীল। এই মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়ে সেকারণে বড় আরাম হয়েছিল। কেমন সুন্দর ঘোড়ায় চেপে টগবগিয়ে বন্দুক বাগিয়ে গুণ্ডা তাড়িয়ে বেড়াতেন। আহা, দেখেও সুখ! এঁর কথা লিখতে বসে আমাদের আশাপূর্ণা দেবীর সত্য আর ঘেঁটুর কথা মনে পড়ে গেল। নাহ, আজ নয়, তাদের কথা অন্য কোনওদিন হবে।
একজোড়া ভাইবোনের কথা মনে পড়ল, একটু বলে নিয়েই চুপ করব। টিনটিন-স্রষ্টা হার্জের আরেক সৃষ্টি জো জেট জোকো। আনন্দমেলার পাতাতেই আলাপ, তাদের একটাই অভিযানের কথা মনে আছে। একটা ছোট্ট এরোপ্লেন হুট করে একলা একলা চালিয়ে দুই ভাইবোন জো জেট আর তাদের পোষা শিম্পাঞ্জী জোকো পৌঁছে গেল একটা নির্জন বরফঢাকা দ্বীপে। তারপর সেই দ্বীপে অভিযান আর তাদের উদ্ধার করে আনার গল্প। বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন বোধহয় পৌলমী সেনগুপ্ত। ভালো লাগতো বেশ, মাঝেমধ্যে ওরকম প্লেন চালিয়ে বেরিয়ে পড়তেও ইচ্ছে করতো, জো আর জোকো জোগাড় হয়নি, ফলে এই জেটের সে ইচ্ছেও আর পূরণ হয়নি।
May be an image of 1 person

No comments:

Post a Comment