দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই আমাদের চন্দননগরের বাড়িতে শুরু হয়ে যেত জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য ঘর ঝাড়ামোছার পালা। শোওয়ার ঘরের তাক থেকে বছরখানেকের ধুলো ঝেড়ে সেখানে নতুন করে পুরনো খবরের কাগজ পেতে গুছিয়ে রাখা হত কাচের শিবমূর্তি, পিতলের নৌকো, ডিমের খোলা আর কালো ভেলভেটের তৈরি পেঙ্গুইন, নৈনিতাল থেকে আনা মোমের কুকুর আর এরকম নানা ঘর সাজানোর জিনিস। এর কোনোটা মা বাবা পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কোনোটা রথের মেলা বা রাজস্থানের সংগ্রহ। প্রতিবার গুছোনোর সময় আমি চেষ্টা করতাম একটা প্যাটার্ন মেনে জিনিসগুলো সাজানোর, যেমন, কেরালার কাঠের আর চন্দননগরের রথের মেলার বাঁশের নৌকা একই সারিতে থাকবে, হরিদ্বারের পাথরের আর পুরীর ঝিনুকের ধূপদানি পাশাপাশি থাকবে, তাহলে বিবিধের মাঝে মিলনের মাহাত্ম্য চোখে পড়বে সহজে, কিন্তু প্রতিবারই শুরু করার একটু পরেই খেই হারিয়ে রাজস্থানী পুতুলের পাশে বসে পড়ত তাজমহল বা হাতির দাঁতের হাতির সারি।
ঘর গোছানোর পাশাপাশি চলত পর্দা বেডকভার কাচা, রান্নাঘরে বড়মাপের হাঁড়ি ডেকচি নামিয়ে মাজা ধোওয়ার পর্ব। ঠাকুরঘর থেকে বসার ঘর, গোটা বাড়ি ঝকঝকে হয়ে কাচা পর্দায় সেজেগুজে তৈরি হয়ে থাকতো অতিথিদের জন্যে। আর ফ্রিজের ভেতর তৈরি থাকত মায়ের হাতের রসগোল্লার পায়েস। ঘন দুধের মধ্যে সরজড়ানো রসগোল্লাগুলোর স্বাদ একবার পেলে আর ভোলা যায় না।
আমাদের স্কুল তো দুর্গাপুজোর আগে বন্ধ হয়ে খুলতো একেবারে জগদ্ধাত্রী পুজোর পর, কাজেই এই একটা মাস কাটতো যাকে বলে তুরীয় আনন্দে। মাঝেমাঝেই একবেলার পড়তে বসা মুলতুবি রয়ে যেত বইয়ের তাক গোছানো বা জানলার পর্দা লাগানোর অছিলায়। আমাদের মতলব বুঝে মা চোখ পাকানোর আগেই তাঁর হাত থেকে ঝাড়ন নিয়ে লেগে পড়তাম খাটের ছত্রি মোছার কাজে।
এরকমই এক বছর, সেটা বোধহয় 1998 সাল, পুজোর মাসদুয়েক আগে বাড়ির দোতলার ঘরগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। রং করা নতুন দোতলাটায় উঠলে মনে হচ্ছে যেন আমাদেরই আরেকটা বাড়িতে এলাম। আত্মীয়মহলে তো জানতোই আমাদের নতুন দোতলার খবর, জগদ্ধাত্রীপুজোর আগে আগে মামা-মাসিদের মহল থেকে দাবি উঠল 'দিদির বাড়িতে দোতলা-প্রবেশ করতে হবে"।
"দোতলা-প্রবেশ মানে? এটা কি আলাদা বাড়ি নাকি যে নতুন করে গৃহপ্রবেশ করতে হবে?" মা-র কাছে মামা-মাসিদের পাঠানো প্রস্তাব শুনে বাবার প্রথম কথা ছিল এটাই।
"তাছাড়া লোকে গৃহপ্রবেশের পুজো করে আনকোরা নতুন বাড়িতে, পুজোর আগে সেবাড়িতে কেউ থাকেনা। আমাদের দোতলায় তো আমরা অলরেডি রাত্রে ঘুমোচ্ছি, মানে সেটা তো আর নতুন নেই। তাহলে আর পুজোর দরকার কি? প্রতিবারের মতো পুজোর কদিন সবাই মিলে হই-চই করলেই হলো, আলাদা পুজো আবার কেন?"
বাবার অকাট্য যুক্তির উত্তরে মা পুজোর উপকারিতা বোঝাতে বসলেন, "আহা বুঝছো না কেন, পুজো সবসময়ই ভালো। বাড়ি নতুন হোক বা পুরনো, তোমাদের সবার ভালোর জন্যই তো পুজো করা। তাছাড়া বেশি কিছু তো হবে না, সকালে পুজো আর দুপুরে খাওয়া-দাওয়া, ব্যস। এই দ্যাখো লিস্ট বানিয়ে রেখেছি, চল্লিশজন হচ্ছে"
"চল্-লিশ! কোত্থেকে?!" বাবার জিজ্ঞাসায় মায়ের মুখ থমথমে হয়ে উঠলো। আবহাওয়া গরম হচ্ছে দেখে বাবা তড়িঘড়ি সামলালেন "মাত্র চল্লিশ! আমি ভাবলাম একশো ছাড়াবে"!
অষ্টমীতে গৃহপ্রবেশের দিন আছে, ঠিক হল ঐদিন আমাদের 'দোতলা প্রবেশ'এর পুজো হবে।
অষ্টমীর দিন সকাল থেকেই ব্যস্ততা। অন্যান্য বারের মতো আগের দিন ঠাকুর দেখে রাত বারোটায় বাড়ি ফেরা হয়নি। সপ্তমীর সন্ধেয় বেরনোর প্রোগ্রামটাই বাতিল হয়ে গেছে পরেরদিনের পুজোর জোগাড়ের জন্য। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সক্কাল সক্কাল উঠে মা-মাসি দের তাড়ায় চান সেরে পুজোর জন্য চন্দন বাটা, ফুল সাজানো এইসব কাজ, তাও আবার উপোস ক'রে। পুজো মিটলে তবে নাকি খাওয়াদাওয়ার পাট শুরু হবে। কে না জানে সামনে খাবার ভর্তি থালা থাকলে যত ক্ষিধে পায়, "উপোস করছি" ভাবলেই ক্ষিধে পায় তার তিনগুণ!
পুজো, পুজোর পর নতুন দোতলায় মেঝেতে পাত পেড়ে বসে জনা চল্লিশেকের হই-হই করে খাওয়া-দাওয়া পর্ব ভালোভাবেই মিটল, বিকেল চারটে নাগাদ শুরু হলো কেলো, থুড়ি, মেঘের কীর্তি। হঠাৎ দেখি, আকাশ অন্ধকার করে বিকেলেই সন্ধে নেমে এসেছে, আর বেশ শনশন আওয়াজ করে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নভেম্বরে কালবৈশাখী! চৈত্র-বৈশাখের ঘাটতি অঘ্রাণে পুষিয়ে নিতে চাইছে নাকি? এরকম তো কথা ছিলো না! ঘণ্টাখানেক আগেও আকাশ দিব্যি ঝকঝকে ছিল। জ্ঞান হয়ে অব্দি জগদ্ধাত্রী পুজোয় কখনো ঝড়বৃষ্টি দেখিনি, এবার সেটা দেখতে হবে ভেবে মনটা খারাপ লাগছিল।
দেখতে দেখতে চড়বড় চড়বড় আওয়াজ করে শুরু হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি। বাড়িতে তখন আমরা আঠেরো জন। হুড়োহুড়ি করে জানলা দরজা বন্ধ করে সবাই একটু হাঁফ জিরোতে যেই বসেছি, ব্যস, লোডশেডিং। "এই রে, ঝড়বৃষ্টির জন্য পাওয়ার গেল বোধহয়। কখন আসবে কে জানে! কি যে হচ্ছে এবার?" বাবার ঘোষণা শুনে সবাই মুষড়ে পড়লাম। একে তো পুজোর মধ্যে বৃষ্টি ব্যাপারটাই মন খারাপ করে দেয়, তারপর আবার লোডশেডিং!কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর মামা হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো। ঘরের কোণে আমার আর দিদির গোঁজ করে রাখা মুখগুলো দেখে বোধহয় মায়া হয়েছিল।
"দিদি, ক'টা ছাতা আছে রে বাড়িতে? তুতু-বুবু চল্ খুঁজবি চল্ ক'টা ছাতা পাওয়া যায়"।
মা-ও উঠলেন ছাতা খুঁজতে। আনাচে-কানাচে খুঁজে সাতটা বিভিন্ন সাইজের ছাতা পাওয়া গেল, তার মধ্যে একটা খুললে সহজে বন্ধ হয় না, বন্ধ হলে খুলতে চায় না।
"এক-একটা ছাতায় দুজন করে হলে মোট চোদ্দোজন, বাকি চারজন কি ভিজবে?"
আরে, মামা তো দারুণ প্ল্যান করেছে। ছাতা নিয়ে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরনো! দশমীর আগেই আমাদের ছাতাওয়ালা প্রসেশন। আর সঙ্গে যদি থাকে সাতটা টর্চ, উফ্ফ্, জমে যাবে তাহলে! ছাতা-টর্চের জোনাকি-থিম প্রসেশন বাম্পার হিট!
প্ল্যানটা বুঝতে পেরে মান্তুমাসি তাড়াতাড়ি ব্যাগ হাতড়ে দুটো ছাতা আর একটা টর্চ বের করলেন। "দ্যাখো, ভাগ্যিস এনেছিলাম ছাতাদুটো, নইলে আজ বেরনোই হত না।"
দীপঙ্কর মেসো মাসির এই দূরদর্শিতায় মোটেই প্রীত হলেন না, "না বেরলেও ক্ষতি হত না। আমি বেরোচ্ছি না। এই সোফা থেকে আজ সন্ধেয় আমাকে কেউ উঠতে বোলো না"। মেসো পূর্ণ সমর্থন পেলেন বাবার কাছে, "যার যেখানে যাবার ইচ্ছে বেরিয়ে পড়ো, আমরা দুজন বাড়ি ছেড়ে নড়ছি না"।
অগত্যা আটটা ছাতা, ষোলোজন মানুষ। টর্চ পাওয়া গেল তিনটে। 'জোনাকি থিম' সফল হলো না দেখে মনটা দমে গেল, তবে ছাতার প্রসেশনই বা কম কীসে! ইতিমধ্যে কারেণ্ট চলে এসেছে। ষোলোজনের মধ্যে থেকে বেছে বেছে লম্বা-বেঁটে, মোটা-রোগা সবরকম কম্বিনেশন মিলিয়ে মিশিয়ে জুটি তৈরি হলো, যাতে মাথায় বৃষ্টির জল যথাসম্ভব কম পড়ে। বৃষ্টিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আটজোড়া মানুষ আটটা ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়লাম ঠাকুর দেখতে।
রাস্তায় বেরিয়ে কিছুদূর এসে সে এক অসাধারণ দৃশ্য। পরে অনেকবার আফসোস হয়েছে সেই দৃশ্যের ছবি তুলে রাখতে পারিনি বলে। দেখা গেল রাস্তায় হাজার হাজার ছাতা, তার নিচে হাজার হাজার মানুষ। সবাই আমার মামার প্ল্যানে সামিল হয়েছে।
রাস্তায় জল থৈ-থৈ, মাঝেমাঝেই আওয়াজ উঠছে 'ছপাৎ ছপাৎ', ঘাড় উঁচু করে প্যাণ্ডেলের কারুকাজ দেখতে গেলেই সামনের ছাতাওয়ালার ছাতা থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে পিছনে দাঁড়ানো মানুষের গায়ে, পিছনে হেঁটে আসা মানুষের জুতোর জল ছিটকে লাগছে সামনে চলতে থাকা মানুষের গায়ে। প্রথম দু'একবার ঝগড়া করছে দু'পক্ষই, "কিরকম লোক মশাই, দেখে চলুন, গোটা প্যাণ্টটাই তো দিলেন কাদায় ভিজিয়ে", "ও দিদি, ছাতাটা ঠিক করে ধরুন, আমার শাড়িটা তো গেল", একটু পরেই সব্বাই বুঝছে ঝগড়া করা বৃথা। এভাবেই চলতে হবে আজ, বৃষ্টি মাথায় করে ঠাকুর দেখতে বেরনোর প্ল্যান তো আর পাশেরবাড়ির মেজমাইমার নয়, ওটা পুরোপুরি নিজের ইচ্ছে। কাজেই যতক্ষণ না নিজের সেই ইচ্ছে বলছে, "ভাই রে, অনেক হল ঠাকুর দেখা, চান করা, এবার ঘরে ফিরি চল্", ততক্ষণ এভাবেই এর গায়ে ছাতার জল গড়িয়ে পড়বে, ওর শাড়িতে কাদা ছিটকে লাগবে, ছাতায় ছাতায় ঠোকাঠুকি হবে, "কেন যে লোকে ঠাকুর দেখতে বেরোয়" বলতে গিয়েই নিজেকে সামলে নেবে ঠাকুর দেখতে বেরনো লোকজন।
বলা বাহুল্য, আমরা ষোলোজনই সেদিন প্রায় চান করে বাড়ি ফিরেছিলাম। এবং সেদিনই ছিল প্রথমদিন, যেদিন বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা সত্ত্বেও মা আমাকে আর দিদিকে একবারের জন্যও বকুনি দেননি। বাড়ি ফিরে আমরা অবাক! বাবা আর মেসো রান্নাঘরে। কোমরে গামছা জড়িয়ে মেসো খিচুড়ির হাঁড়ি নামাচ্ছেন, আর বাবা মন দিয়ে আঠেরো পিস ডিমের ওমলেট ভেজে চলেছেন। সে রাতে ভিজে গায়ে নাক টানতে টানতে গুলিয়ে ফেলছিলাম কোন্টা খিচুড়ি-ওমলেট আর কোন্টা অমৃত!
উপসংহার হিসাবে যদিও পরের দিন সকাল থেকেই ষোলোজনের হাঁচির কনসার্ট শুরু হয়ে গিয়েছিল। হাঁচির চোটে কখনো মা-মাসি দের চায়ের কাপ থেকে চা চলকে পড়ছে, তো কখনো ছোড়দাদুর বাড়ি কাঁপানো হাঁচির আওয়াজে চমকে পালাতে গিয়ে পাড়াতুতো বেড়াল কম্বল নার্ভাস হয়ে পিছলে পড়ছে মেঝেয়।
যাইহোক, আমাদের 'দোতলা-প্রবেশ, বৃষ্টি-পুজো-ছাতা প্রসেশন সবে মিলেমিশে সেবারের জগদ্ধাত্রী পুজো বেশ ঘটনাবহুল ছিল। তবে সেবার বৃষ্টির হুজ্জোতি চলেছিল আরো দু'দিন, এবং পুজোর বিসর্জন বরাবরের মত দশমীতে না হয়ে হয়েছিল একাদশীর দিন। সুতরাং, আমরা বইপত্তর ঝেড়েঝুড়ে পড়াশুনোর পর্ব শুরু করেছিলাম আরো একদিন দেরিতে। বুকের ভেতরের "ধুত্! আবার পড়তে বসতে হবে!" ভাবটাকে আরো একদিন সরিয়ে রাখা গিয়েছিল সেবার।