বই : রুকুর গ্যালাক্সি
লেখা আর ছবি : বিনায়ক রুকু
প্রকাশক : গুরুচণ্ডা৯
মূল্য : ১৫০ টাকা
থ্যাঙ্কস রুকু, হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
চেনা ছকে বাঁধা সাদা কালো রাত আর সাদা কালো মুখমুখোশের ভিড়ে একটা রঙিন কোলাজে সাজানো গ্যালাক্সির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে তুমি, আদর নিও। তোমার বই হাতে পেয়েছি অনেকদিন হলো, কিন্তু বইয়ের প্রতিটি শব্দ আর ছবিকে ছুঁয়ে দেখব বলে আলাদা করে রেখেছিলাম, আজ বসার সময় হলো।
কেমন লাগল তোমার বই? এক কথায় যদি বলতে হয়, তোমার ভাষা ধার করেই বলি, রুকুর গ্যালাক্সির সঙ্গে আলাপ করে আমার আনন্দরাও লম্বা লম্বা পা ফেলছে। দীপাবলির রাতে এক বারান্দা গ্যালাক্সি আর স্পেসম্যান তুমি, জানলা খুললেই বিছানায় চলে আসা তোমার আইসক্রিম কুয়াশারা, লণ্ডনের রাস্তায় রিষড়ার ম্যাপ বসিয়ে টেমস আর গঙ্গাকে তোমার মিলিয়ে দেওয়া, তোমার চাঁদের কারশেড, সবকিছু পড়ছি আর ভাবছি, আমরা যারা লিখতে পারলে ভাল থাকি, তারা যেমন যেমন ভাবনাকে কলমে ধরব বলে নিয়ত সংগ্রাম করে চলি, তেমন তেমন ভাবনাকে কী অনায়াসে তুমি লেখায় রেখায় ফুটিয়ে তুলছ!
"ভালো music এই ছোট্ট ছোট্ট মাছের মত
ঝাঁক, ঝাঁক, ঝাঁক ঢুকছে। কানে।
বাজে Music Shark।"
এই উপমাকে কলমে আনতে তোমায় কতটা ভাবতে হয়েছে জানি না, জানি না এই উপমা তুমি তোমার সহজাত বোধ দিয়েই উপলব্ধি করতে পেরেছ কি না, তবে আমার মতো আরও অনেকের কাছেই একাজ যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য, হয়তো অসম্ভবও। তোমার ভাবনারা আরও অনেক লেখায় ছবিতে প্রকাশিত হোক, আমাদের ঋদ্ধ করুক, এই আশা রাখি। তোমার আরও বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম। ভাল থেকো।
আমার এ চিঠি বিনায়ক রুকুকে লেখা, তার দ্বিতীয় বইটি কিছুদিন আগে হাতে পেয়েছি, তার মা সুন্দর ব্যবস্থা করে পাঠিয়েছেন। ভেবেছিলাম চিঠিটি তার কাছে পাঠিয়েই লেখাটা শেষ করব, চিঠিটাকেই পাঠপ্রতিক্রিয়া ভেবে পড়ে যদি কারও ইচ্ছে হয়, 'রুকুর গ্যলাক্সি' বইটি কেনার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু বইটা পুরোটা পড়ে মত বদলাতে হলো। বইটায় রুকুর সৃষ্টি ছাড়াও আরও কিছু কথা আছে, যা সবার জানা দরকার।
বিনায়ক রুকু সতেরো বছরের একটি ছেলে, নিজের ভাবনাকে লেখায় রেখায় ফুটিয়ে তোলে। তবে তার নিজের একটা লড়াইয়ের গল্প আছে। অবশ্য লড়াই তো আমাদের সবারই জীবনে কমবেশি থাকে, তাই না? রুকুর লড়াইটা কেমন? আসুন, তার নিজের ভাষাতেই শুনে নিই একটু সেই লড়াইয়ের কয়েকটি লাইন :
"রুকু কথা বলতে গিয়ে গোছাতে পারেনা।
'খাতাতে গোছাতে পাঋ (পারি)', রুকু বলে।
অসুবিধে নেই। রুকুর। ওদের অসুবিধে।
যাদের, ওদের, তাদের, আমাকে বুঝতে হবে।"
আরেক জায়গায় রুকু লিখছে, তার রুকুবোটের কথা,
"রুকুবোটটাও একটু অটিস্টিক।
একা একা গান শোনে।
............
রুকুবোটকে কেউ আদর করে না। অটিস্টিক তাই।
পড়ার ঘরে একা বসে থাকে।
রুকুর কিছু হলেই, রুকুর কষ্ট হয়।"
রুকুর লড়াই কীসের সঙ্গে, বুঝতে পারছি কি আমরা? একাকিত্বের কারণ চিহ্নিত করার ক্ষমতা যখন আমার থাকে, অথচ সেই কারণ দূর করার ক্ষমতা আমার হাতে থাকে না, তখন ঠিক কতটা ব্যথা নিজের ভেতরে জমা হয়, উপলব্ধি করতে পারছি কি? যদি বুঝতে চাই, তবে সেই উপলব্ধিই আনার কাজটা করতে পারে 'রুকুর গ্যালাক্সি'। অটিজম স্পেকট্রামে আছে, এমন এক কিশোরের কলমে তুলিতে তার ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করবে 'রুকুর গ্যালাক্সি'।
অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার নিয়ে খুব যে স্বচ্ছ ধারণা সবার মধ্যে আছে তা নয়, জানার তাগিদও যে সবাই অনুভব করবেন তাও নয়, তবুও যদি কেউ জানতে চান, বুঝতে চান অটিজম স্পেকট্রামে আছে এমন এক কিশোরের সৃজনীশক্তিকে, এই বই তাঁর ভাল লাগবে।
বইয়ের শেষ অংশে রুকুর মায়ের কলমে রয়েছে তাঁদের সংগ্রামের কথা। রুকুর যখন আড়াই বছর বয়স, তখন থেকে ধীরে ধীরে বোঝা গিয়েছিল তার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার রয়েছে। দৈনন্দিনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রুকুর মা বাবার প্ল্যানিং এবং ম্যানেজমেন্ট প্র্যাক্টিসের শুরু তখন থেকেই। রুকুর মা যেভাবে তাঁদের অভিজ্ঞতা লিখেছেন, আর কারও কাছে না হোক, অটিজম আছে এমন যেকোনও শিশুর বাবা মা অভিভাবকদের কাছে তা অপরিহার্য এবং অত্যন্ত শিক্ষণীয় একখানি গাইড বলে আমার মনে হয়েছে।
বিনায়ক রুকুকে, তার অভিভাবকদের এবং প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই, 'রুকুর গ্যালাক্সি'র সঙ্গে আমাদের পরিচয় করানোর জন্য।

No comments:
Post a Comment