Monday, 30 July 2018

#লীলা_মজুমদারের_জন্মদিনে_শ্রদ্ধার্ঘ্য



লীলা মজুমদারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সম্ভবত 'এক বাকসো ভূত 'এর হাত ধরে। ছোটবেলায় বইমেলায় গেলে সময়ের অভাবে কোনওবারই লিস্টি মিলিয়ে বাছাই করা বই কেনার সুযোগ হতো না, সেই অভাব ঢাকতেই বোধহয় বাবা মা প্রত্যেকবার একটা করে 'কিশোর গল্প সঙ্কলন ' গোছের বই কিনে দিতেন। সেগুলোকে কিশোর সাহিত্যের মণিমুক্তোর আকর বলাই যায় অনায়াসে। এরকমই একটা বই 'এক বাকসো ভূত ' এ লীলা মজুমদার আমার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন, 'কর্তাদাদার কেরদানি ' গল্পের মাধ্যমে। সেই প্রথম আলাপের রেশ এমনই ছিলো যে তাঁর লেখনীকে এরপর আর আলাদা করে চিনে নিতে ভুল হতো না। কেমন সেই লেখনী, সে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না! আমার মনে হয় তাকে 'লেখনী ' না বলে 'গল্প বলার ধাঁচ ' বললে আরও ভালো লাগে, কারণ ওঁর লেখা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে কোনও 'লেখা ' পড়ছি। তিনি বৈঠকখানার ঠিক মধ্যিখানে, কিংবা বারান্দার কোণটিতে একটা মোড়া পেতে বসে আপন করা স্বরে বলে চলেছেন একটার পর একটা গল্প, আর আমরা, গল্পলোভীর দলবল, তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসে হাঁ করে গিলে চলেছি সেসব গল্প, এমন একটা অনুভূতি ফিরে ফিরে আসে তাঁর প্রতিটি লেখা পড়ার সময়।

লীলা মজুমদারের সাহিত্যকীর্তির কাছে আমি নানাভাবে ঋণী। তাই তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার সময় মনে হলো ঋণস্বীকারের এই বোধহয় উপযুক্ত সময়। প্রথমেই বলে রাখি, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির বেশিরভাগই আমার পড়া তথাকথিত শৈশব ও কৈশোর পেরনোর পর। আমার সারা ছোটবেলা জুড়ে ছিলো দিদা বম্মাদের বলা গল্পের দলেরা। গ্রীষ্মের অলস দুপুর, বর্ষার একঘেয়ে সন্ধে, শীতের নিঝঝুম রাত্তির, সবটুকু ভরে থাকতো তাঁদের বলা গল্পেরা। সেইসব গল্প সঙ্গে নিয়ে একে একে তাঁরা যখন চলে গেলেন, বড্ড একা হয়ে গেলাম। সেই মনে মনে একা হয়ে যাওয়া দিনগুলোতেই আমায় আগলে রাখলেন, ভরিয়ে রাখলেন লীলা মজুমদার। তাঁর বলে চলা গল্পগুলো শেখালো, হারায়নি, হারায়নি, কিচ্ছুটি হারায়নি, সব রাখা আছে বেশ করে চাবি দিয়ে, চাবি রয়েছে নিজের মনেই, যখন খুশি বের করে সেসব মণিমুক্তো নাড়াচাড়া করো, কেউ কিচ্ছু বলবে না। এমনটি বোঝালো তাঁর গুপি, তাঁর কুমু, বোগি, আর যত না-মানুষ সাঙ্গোপাঙ্গোর দলবল। তাই তো তিনি আমার বড় আপন।

সংসার করতে এসে আবিষ্কার করলাম কিচ্ছুটি জানি না, বিশেষ করে হেঁশেলের কাজ। ততদিনে এক মেয়ের মা হয়ে বসেছি, আর আমার মা পাড়ি দিয়েছেন অমৃতধামে। কম জ্বালানি খরচ করে ভাত সেদ্ধ করাই বলো, বা ঝোলে কাঁচালঙ্কার সুগন্ধ বেরুবে মনমাতানো, অথচ একফোঁটা ঝাল হবে না, কিভাবে, এসবের কিচ্ছু জানি না, বুঝতে পারলাম। আশ্রয় নিলাম লীলা মজুমদারের কোলেই, তাঁর 'রান্নার বই ' এর কাছে। যাঁরা বইটি পড়েছেন, আশা করি একমত হবেন, এমন সহজভাবে হেঁশেলের কারিকুরি শেখানোর হ্যাণ্ডবুক বড়ই বিরল। রন্ধনপ্রণালীর বইও সাহিত্যগুণে কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে, এই বই তার নিদর্শন। অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করি, 'কুটোটি ভেঙ্গে দুটো না করা ' আমায় সংসারের কাজ শিখতে সাহস জুগিয়েছেন লীলা মজুমদার।

কন্যারত্নকে সঙ্গ দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে খেয়ালবশে যখন আবার কলম ধরলাম অবসর সময়ে, তখন বোধহয় অবচেতনে কলকাঠি নেড়েছিলেন তিনিই, নইলে ছোটদের জন্য লিখতেই কেন এত ভালবাসি? ছোটদের জন্য গল্প লিখতে গিয়ে, এবং কন্যারত্নের রোজকার কাণ্ডকারখানা বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যখন শিশুমনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে বসি, তখনও আমায় দিশা দেখান তিনিই। তিনি এবং রায়পরিবারের আরও কয়েকজন দিকপাল সদস্য না থাকলে বোধহয় শিশুদের চোখ দিয়ে জগৎ দেখার অভ্যেস তৈরি হওয়া সম্ভব ছিলো না। ঠিক কোন পরিস্থিতিতে পড়লে এক কিশোর মনে মনে বীরপুরুষ বিশু আর সিংহ কুকুরকে গড়ে নিয়ে টংলিং-এ আশ্রয় খোঁজে, কেন বাতাস বাড়ি আবিষ্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, 'ছেড়ে যাই ছেড়ে যাই ' করেও কেন সেখানে যেতে হলে সব্বাইকে নিয়েই যেতে হয়, পুজোয় নতুন জামা না হলেও আকাশে রামধনু এঁকে কিভাবে দিব্যি খুঁজে নেওয়া যায় অনাবিল আনন্দ, এসবই শিখিয়েছেন তিনি। আর শিখিয়েছেন জীবে প্রেম। তুমি যেমন এই সবুজ পৃথিবীর কাছে ভারি গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনই ওরাও, ওই বেড়াল ঘোড়া হাঁস মুরগী শেয়াল হাতি, ওরাও ঠিক একইরকম দরকারি এই পৃথিবীর কাছে, এই চিরন্তন সত্যি কথাটা এত সহজ ভঙ্গিতে সরসভাবে তিনি বারেবারে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ছোটদের সঙ্গে সঙ্গে তা বড়দেরও ভাবতে বাধ্য করে, ডুবতে বাধ্য করে আত্মসমীক্ষায়, ভুলগুলো আমরা বড়োরাই বেশি করি কিনা!

তাঁকে নিয়ে কথা শুরু করলে থামা যাবে না, তাঁর কীর্তিকে কলমে ধরি, এমন ক্ষমতাও আমার নেই। তবুও তাঁর অগণিত ভাবশিষ্যের একজন হয়ে তাঁর জন্মদিনে এই প্রার্থনা করি, যেন আজীবন তাঁর শিষ্যত্বটুকু বজায় রাখতে পারি।

****

No comments:

Post a Comment