Sunday, 28 May 2017

অন্ধকারের কথা

"মা, বাইরে অন্ধকার", কদিন ধরেই রাত্রে বিছানায় শোবার আগে কচি গলায় একটু আপত্তির সুরে কথাটা শুনতে হচ্ছে। বাইরে অন্ধকারের উপস্থিতি খুব একটা ভাল লাগছে না, সেটা ছোট্ট মানুষের কথায় বোঝা যাচ্ছে। প্রথম দু -একদিন আমল দিইনি, "রাত্রে তো অন্ধকার হবেই" এসব বলে চাপড়ে ঘুম পাড়িয়েছি।

কালকেও একই কথা আবার। ভয়ানক ঘুম পাচ্ছিল। একবার ভাবলাম বাইরের অন্ধকারকেই হাতিয়ার করে হাল্কা ভয় দেখাই, তাহলে ঝিমুনি আসার সময়টাতেই যে গায়ে ঠেলা দিয়ে "মা, ও মা, বাইরে অন্ধকার" বলে ব্যস্ত করা, সেটা থামবে।

তারপরেই মনে হল, ছি ছি, কি করছি, নিজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে দেব না বলে মিছিমিছি একটা অবান্তর ভয় মেয়েটার মনে ঢুকিয়ে দিতে চাইছি? আলোর না থাকাটাই যে অন্ধকার, আলাদা করে কোনও ভয় জাগানো মানে যে অন্ধকারের নেই, সেটা তো আমরাই বোঝাব, নাকি? বাগানে গাছটার নিচে ঝুপসি মত কি একটা প্রাণী যেন গুঁড়ি মেরে বসে আছে মনে হচ্ছে, ওটা যে আসলে গাছেরই ছায়া, ছায়ার চলাফেরা আসলে আলো -আঁধারের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়, চাঁদের আলো এগোলে কিংবা মেঘের আড়ালে লুকোলে যে গাছের ঝুপসি ছায়াটাও ভোল পাল্টায়, সেসব তো কচি মনটাকে বোঝাতে হবে। নইলে খামোখা ছোট্ট মনটা বিনা কারণে অন্ধকারকে ভিলেন ঠাউরে বসবে। আর এই বয়সে একবার কোনও ভয় মনে বাসা বাঁধলে তাকে তাড়ানো মহা ঝকমারি।

অগত্যা নিজের ঘুমে লাগাম পরিয়ে বোঝাতে  শুরু করলাম, "দ্যাখো বাবু, রাত্তিরে যেমন আমাদের ঘুম পায়, তেমন আলোরও ঘুম পায়। আলো চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেই অন্ধকার হয়ে যায়।"
সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন এল, "যেমন আমরাও হই?"
থমকালাম। তাই তো! আমরাও কি অন্ধকার হয়ে যাই? চোখ বুজলে চারপাশ অন্ধকার, এ তো খুব সত্যি কথা। এটাকে কি "আমরাও অন্ধকার হয়ে গেলাম" বলা যায়? উত্তর হাতড়াচ্ছি, এমন সময় শুনলাম আলো -আঁধারির তত্ত্বে উৎসাহ হারিয়ে মেয়ে তার ঘুমের আগের গান গাওয়ার রুটিনে ঢুকে পড়েছে। আমিও প্রসঙ্গ পাল্টে গলা মেলাতে লাগলাম৷

মেয়ে তো ঘুমলো একটু পরেই, আমার মনে ঢুকে পড়ল ভাবনার নতুন সুতো। অন্ধকারকে ভয়, এ কি মানুষের রক্তে মিশে থাকা অভ্যেস, যা নিয়েই সে জন্মায়? নাকি পৃথিবীতে যারা কিছুদিন আগে এসেছে, দু 'চারটে বর্ষা -ভূমিকম্প -মহামারি দেখেশুনে ভয় পেতে শিখেছে, অন্ধকারের ভয়টা নতুন মানুষের মনে তারাই গেঁথে দেয়? নাকি যাকে আমরা দেখতে পাই না, তা -ই আমাদের কাছে অজানা? জানি না বলেই তাকে ভয় পাই? তা -ই যদি হবে, তবে যারা নিজের বাড়ির চেনা বাথরুমটাতেও অন্ধকারে যেতে ভয় পায় তাদের কি বলবে? বাড়ির বাথরুমটাকে দিনের বেলায় চিনতাম, আর মাঝরাতে হুট করে সেটা অচেনা হয়ে গেল, এ হয় নাকি?

তারপর দ্যাখো, মানুষের ভাষাতেও অন্ধকারকে কেমন নেতিবাচক করে দেখায়! অন্ধকার আর কালো, এই দুটো কথা যেন যত ময়লা আর খারাপের বোঝা বইছে। কারো মন খারাপ, অমনি তার মনে আঁধার জমল। কারও ছেলে বদসঙ্গে পড়েছে, ব্যস, সে নাকি অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যে টাকা সৎপথে আয় হয়নি, সে টাকা অমনি হয়ে গেল কালো টাকা। কেন, অসৎ টাকা ময়লা টাকা হতে পারত না? ময়লা কি শুধুই কালো? তার রং তো হলুদ সবুজ ফিকে বেগুনি হতেই পারে? শুধু কালোর কপালেই ময়লার বদনাম কেন? মনের খারাপ হওয়ার দায় অন্ধকার নিতে যাবে কোন দু:খে? তোমার মনের কোন তারে ব্যথা লেগেছে বলে তোমার মন খারাপ, তাতে অন্ধকারের দোষ কি?

আলো সারাদিনের পরে একটু বিশ্রাম নিতে যায়, তখন পৃথিবীর সব রং মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়ে আসে অন্ধকার, আঁধারের মানে তো এইটুকুই। তাকে কেমন আমরা ভিলেন বানিয়ে ফেলি, নিজেদের মনের পাপচিন্তাগুলোকে অন্ধকারের আড়ালে বাইরে এনে ফেলি, আর দোষ চাপাই কালো আঁধারের ঘাড়ে। রাতের অন্ধকার না থাকলে যে সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে আবার পরেরদিনের সূর্যটার আসা হত না, সেকথা আমরা ভুলেই যাই।

Wednesday, 24 May 2017

কুটুন আর বাবা

কুটুনের বাবার বেশ কিছুদিনের অভিযোগ, মেয়ের দিনযাপনে বাবার অবদানকে একেবারেই প্রচারের আলোয় আনা হচ্ছে না। তাঁকে যতই বোঝানো হোক, বাবা -মেয়ের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে হলে যতখানি সময়ের দরকার ততটা পাওয়া যাচ্ছে না বলেই কাজটা হয়ে উঠছে না, তিনি শোনার মানুষ নন। ব্যাপারটায় চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে টুকরো সময় হাতে নিয়েই বসতে হল, জানিনা বাপু এতটুকু সময়ে দুই প্রতিভাধরের গুণ কতটা গাওয়া যাবে।

সকাল থেকেই শুরু হোক। হপ্তায় তিনদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ে দেখে বাবা পাশে ঘুমোচ্ছে (বাকি দিনগুলোয় নিজেই হাত উল্টে বলে "বাবা অফিসি")। কুটুনের ঘুম ভাঙ্গার পরেও যদি কেউ বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় সেটা এক ধরনের অপরাধ। সঙ্গে সঙ্গে সে তার নিজের ভাষায় বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। শুধু মুখের কথায় বাবা উঠে পড়েন তা নয়, তিনি হয়ত তখন কুটুনের বালিশটাই টেনে আরেকবার চোখ বোজার চেষ্টায় আছেন, কুটুন অমনি  "তুতুন-বালিশ নিও না, ওথো ওথো" বলে তাঁকে ব্যস্ত করে তোলে। সবশেষে বালিশ ধরে টান মারে কিংবা বাবার চোখের পাতা টেনে খোলার চেষ্টা করে, অগত্যা বাবাকে উঠে বসতেই হয়।

এসব কাণ্ড চলাকালীন মা কিন্তু ভুলেও ঘরে ঢোকেন না। কি দরকার বাপু কাঁধ পেতে ঝামেলা নেওয়ার. বাবা মেয়ে থাকুন নিজেদের নিয়ে, উনি ততক্ষণে হাতের কাজ একটু এগিয়ে রাখেন।

এরপর সকালের কাজকম্ম জলখাবার ইত্যাদি সেরে দিন এগোয়। বাবা বাড়িতে থাকলে মায়ের চেষ্টা থাকে কুটুন-সংক্রান্ত বেশিরভাগ দায়িত্ব বাবার হেফাজতে দেওয়ার। তিনি নিজের মনে রান্না, কাচাকুচি, বিছানা ঝাড়া আর ফাঁকে ফাঁকে খবরের কাগজে চোখ বোলানোর কাজ সারেন। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার কাজটা করতে হচ্ছেনা বলে এসব দিনে মায়ের মন ভারি ফুরফুরে থাকে।

ওদিকে তখন খাওয়ার টেবিলে কিংবা সোফায় বসে বাবা আর মেয়ের জলসা শুরু হয়েছে। "আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে",  "ভেঙ্গেচুরে যায় আমাদের ঘরবাড়ি" হয়ে  "ভুখ লাগি ভুখ লাগি" , গানের তালিকা বিশাল। কখনও টেবিলে তাল ঠোকা, কখনও আবেগ সামলাতে না পেরে নাচ, হামাগুড়ি, ডিগবাজি সবই ঢুকে পড়ে জলসার মেনুতে।

মাঝেমধ্যে চলে জল খাওয়া পর্ব। এই কাজটি মা বিশেষ ভাল পারেন না। মায়ের হাতে জলের গ্লাস দেখলেই কুটুন হয় দৌড়ে পালায়, নয়ত জলের গ্লাসটা নিয়ে জলটা হড়াত করে মেঝেতে ঢেলে গায়ে মাথায় মাখে, কিংবা কুলকুচি করার সময় কেমন দেখতে লাগে সেটা আয়নায় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বাড়িতে থাকলে এই দায়িত্বটাও বাবাকেই নিতে হয়। তিনি নিজে একটি বড় কাচের গেলাস নিয়ে এবং এরই একখানা ধাতব সংস্করণ মেয়ের হাতে ধরিয়ে দুজন মিলে মাটিতে বসে গেলাসে গেলাসে ঠোকাঠুকি,  "তুই আগে না আমি আগে" এরকম নানা খেলাধুলো দিয়ে জলপান পর্ব পালন করেন। কখনও কখনও ঘুষ হিসেবে ফ্রিজ থেকে এক টুকরো চকলেটও বেরোয়। বাড়ির সব্বাই তাদের বরাদ্দ পেল কিনা সেদিকেও কুটুনের নজর থাকে।

এরপর শুরু হয় ওনাদের শরীরচর্চা। ধরো বাবা অফিসে বেরোবেন বেলা একটায় (হপ্তায় দুদিন উনি দুপুরের গাড়িতে অফিস যান, দুদিন কাকডাকা ভোরে, আর দুদিন রাত জাগেন), ওনার ব্যায়ামের ক্ষিধে জাগবে বেলা বারোটা নাগাদ। সঙ্গী অবশ্যই ক্ষুদে কুটুন। দুই প্রতিভাবানের এই পর্বের কাজের বহর দেখবার মত।

শুরু হয় দৌড় দিয়ে। বসার ঘর থেকে শোওয়ার ঘরের দেওয়াল... এই রাস্তায় বার দশেক ছুটোছুটি চলে, মেয়েকে অন্তত পাঁচবার জিততে দিতেই হয়। এরপর একে একে বার্পি, এক -দুই (সিট আপ), পুশ আপ, চেয়ারে এক পা তুলে মেঝেতে হাত রেখে খানিকটা কসরৎ, খাওয়ার ঘরের মাথায় বাতিল জিনিস জড়ো করার যে তাক আছে সেইটা ধরে কিছুক্ষণ ঝোলাঝুলি করা (বাবা অবশ্য শক্ত করে মেয়েকে ধরে রাখেন ) , এবং অবশ্যই নমো ব্যায়াম।

এটা কি ব্যাপার? বাবার কাছে একটা ভয়ঙ্কর ভারি বারবেল আছে। তাতে কুটুনের হাত দেওয়া বারণ। বাবাকে ওটা তুলে কায়দা করতে দেখে মেয়ের মনেও শখ জাগত জিনিসটা মাঝেমাঝে ছুঁয়ে দেখার , কিন্তু বকুনির ভয়ে কাছে ঘেঁষা হত না, হাত ঠেকিয়ে নমো করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াতে হত। কিছুদিন এভাবে চলার পর কুটুন আবিষ্কার করল, আরে,  রান্নাঘরে তো বারবেলের মত দেখতে একখানা খাসা জিনিস পাওয়া গেছে। আড়ালে আবডালে হয়ত দু  'একদিন মকশো করেও থাকবে, কেননা, একদিন বাবা বারবেল হাতে তুলতেই "দাঁড়াও আমারটা আনি" বলে গটগটিয়ে রান্নাঘর থেকে রুটি বেলার বেলনখানা এনে হাজির করল। কিচ্ছু বলার নেই, নিরীহ হাল্কা বেলন, কুটুনের হাতে বারবেল হিসেবে দিব্যি মানিয়ে গেল। তারপর থেকে বাবা বারবেল ভাঁজতে শুরু করলেই সে-ও তার বেলন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাবা যদি সেই বারবেলের দুপাশে দু 'খানি বাড়তি ওজনের চাকতি ঝোলান, তবে সেও "আম্মো কম কিসে" গোছের মুখ করে তার বেলনের দুপাশে তার মায়ের দুটি ফিনফিনে চুড়ি ঝুলিয়ে নেয়। সমমানের ব্যায়ামের অধিকার সকলের আছে।

যাই হোক, ব্যায়ামের উত্তেজনা কমার পর ঘড়ির দিকে চোখ পড়লে দেখা যায় সাড়ে বারোটা বাজে। অতঃপর হুড়োহুড়ি, চান এবং খেতে বসা... বাবাকে ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। কুটুনও এই ব্যস্ততার আঁচ পোহায়। বাবা চান করতে ঢুকেছেন, মেয়ে এসে দরজা ধাক্কিয়ে বলে চলল "বাবা সালোতা (সাড়ে বারোটা) বেজে গেছে, বেরোও ", কিংবা মায়ের হাত থেকে ডালের বাটিটা নিজেই নিয়ে পরিবেশনের চেষ্টা, এইসব চলতে থাকে।

বাবা আর মেয়ে একসঙ্গে খেতে বসে। দুজনে টেবিলের দুই প্রান্তে, দুই থালায়। এটা না করলে গোল বাধবেই। বাবা যতই ধোপদুরস্ত জামাপ্যাণ্ট পরে খেতে বসুন না কেন, মেয়ে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে কোলে উঠে বাবার থালা থেকে খাবার মুখে তুলবেই, দু  'এক চামচ দই বাবার জামায় ঢালবেই। তাই এইসময় তাকে নিজের কাজে ব্যস্ত রাখতে হয়।

খাওয়ার পর হুড়োহুড়ি করে জুতোমোজা পরে বাবা অফিসে রওনা হন। বেরোনোর আগে দুজনের টা -টা পর্ব চলে কিছুক্ষণ, শেষ অব্দি মায়ের ঠ্যালায় বাবা গিয়ে লিফটে ওঠেন। কোনও কোনও দিন কুটুনও ঝোলভাত মাখা মুখে বাবার পিছু পিছু দৌড়ায়। মা গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে ঘরে আনেন।

এরপরের বাকি দিনটা মা আর মেয়ের। বাবা ফিরবেন সে - ই রাত সাড়ে দশটায়। মেয়ের ততক্ষণে রাতের খাওয়া সারা, কিন্তু বাবা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত ঘুমোতে নেই, তাই চোখ কচলে ঘুম তাড়িয়ে সে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। বাবা এলে আরেক প্রস্থ নাচ গান বাবার থালায় আরেকবার খাওয়া ইত্যাদি সেরে বাবা আর মা দুজনকেই বগলদাবা করে তবে কুটুনের ঘুমের অবসর মিলবে।

Sunday, 7 May 2017

এতদিনে বুঝিলাম...

গত বছর আমার বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করেছিলাম পুজো বলতে অবশ্য যদি ভাবেন, বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসারে ষোড়শপচার সাজিয়ে আসন পেতে মা লক্ষ্মীকে বসতে ডেকেছিলাম, তাহলে আমায় অতিরিক্ত ভক্তীমতী ভেবে ফেলা হবে অতটা আমি নই সত্যি বলতে কি, দুর্গাপুজোর আগে থেকেই মনটা অনবরত নারকেল নাড়ু-মুড়ির মোয়ার নাম জপছিল, তাকে ধমকে থামানো যাচ্ছিল না মোটে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোয় কেউ না কেউ নিশ্চয়ই কোজাগরী পূর্ণিমায় পুজো করেন, আমার বছর দুয়েকের কন্যার জনপ্রিয়তা সেসব বাড়িতে কিছু কম নয়, তার দৌলতে নিশ্চয়ই দু'তিন বাটি নাড়ু-মোয়া বাড়িতে আসবে ও মা, সে গুড়ে বালি! খোঁজ নিয়ে জানলাম পাড়াতুতো কাকীমা-বৌদি-ননদরা যে যার দেশে রওনা দিচ্ছেন লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষ্যে এদিকে আমার মনের ততক্ষণে পুজোর লুচি-মোহনভোগের কথা মনে পড়ে গেছে

ছোটবেলায়  প্রতিবছর টুটুনমাসীদের বাড়িতে পাত পেড়ে কলা-আপেলকুচি-নাড়ু-লুচি-মোহনভোগ খেয়ে বাড়ি এসে খোঁজ নিতাম আর কাদের বাড়ি থেকে প্রসাদ এসেছে, যাতে পরদিন সকালেও প্রসাদ থাকছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়

সেসব দিন বহুকাল হল ইতিহাস হয়েছে, তবে পুজোর দিন মায়ের হাতের নারকেল নাড়ু প্রতি বছরই পাওয়া যেত মা নিজের  অফিস এবং সংসার সামলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে লক্ষ্মীপুজোর আগের সন্ধেয় নারকেল নাড়ু তৈরি করতেন দুর্গাপুজোর পরেই অফিসে কাজের চাপে লক্ষ্মীপুজোয় আর ছুটি নেওয়া যেত না, ব্যস্ত সকালে ঝড়ের বেগে কাজকর্ম মিটিয়ে নতুন একটা শাড়ি পরে মা-লক্ষ্মীর আরাধনা নিজের মত করে সেরে নিয়ে অফিসের পথে পা বাড়াতেন আমাদের স্কুল-কলেজ ছুটি থাকলেও আমরা বিশেষ কিছুই করতাম না, বড়জোর মায়ের শাড়ির কুঁচি ধরে দেওয়া, কিংবা কোনো বছর একটু সকাল-সকাল চান সেরে দু'একটা ফল কেটে রাখা বা ঠাকুরঘর মুছে রাখা, এটুকুই প্রসাদ খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজই বাধ্যতামূলক বলে আমাদের মনে হতনা মা নিজেই উদ্যোগী হয়ে একা হাতে সব করতেন 

তা, বছরতিনেক হল সে রীতিরও ইতি হয়েছে মা নিজেই মা-লক্ষ্মীর কাছে গিয়ে পৌঁছেছেন, বোধহয় আরও মন দিয়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ চাইবেন বলেই মা নেই, ওসব-ও আর হয় না

তবে এবার পুজোর আগে থেকেই মনটা বড় প্রসাদ প্রসাদ করছিল কিনা, তাই লোভে পড়ে ভেবে ফেললাম আমিই যদি বাড়িতে প্রসাদ, মানে পুজোর জোগাড় করে ফেলি? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমি পুজোআচ্চার নিয়মকানুন বিশেষ কিছুই জানিনা যেকোনো পুজোর আগে আলপনা আঁকা, বাসনকোসন ঘষেমেজে ধুয়ে তাতে নানা উপাদেয় খাবারদাবার নিয়ে ঠাকুরঘরে সাজিয়ে রাখা, ফুল জোগাড় হলে ভাল, নহলে শুধু হাত জোড় করেই "ঠাকুর তুমি ভাল থাকো, তাহলেই আমরা ভাল থাকব" গোত্রের প্রার্থনা করা (পৃথিবীর সাতশো কোটি মানুষের রোজ দু'বেলা চোদ্দোশো কোটি চাওয়া মেটাতে ভগবান জেরবার তাঁর ভাল থাকার কথাটাও তো ভাবতে হবে!),এবং সবশেষে হাত ধুয়ে এসে ঐসব নানাবিধ সুখাদ্য আয়েস করে বসে খেয়ে আঙ্গুল চাটা--- আমার কাছে পুজোর অত্যাবশ্যক কাজ হল এগুলোই

আমার ডেরায় আমিই সর্বেসর্বা কাজেই প্রসাদের লিস্টি আমি নিজেই বানিয়ে ফেললাম মেয়ের বাবা কোথায় যেন গিয়েছিলেন অফিস ট্যুর উপলক্ষ্যে (গিন্নির প্রসাদভক্তির ঠ্যালায় বাজার করতে বেরনোর চেয়ে অফিস ট্যুর শতগুণে আদরণীয়, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ মানুষ-মাত্রেই একমত হবেন), ফিরবেন পুজোর দিন বিকেলে, অগত্যা বাঁ কাঁখে মেয়েকে চেপে ডান হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম বাজারের দিকে

বাচ্চা কোলে বাজার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা আশা করি আমার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবেন আমার নিজেরও একসময়, তখনও মা হইনি, মনে হত, "আহা, ফুলের মত বাচ্চাগুলো প্রজাপতির মত খেলে বেড়ায়" ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু এখন কাঁধের ঝোলা, কোলের বাচ্চা, হাতের থলে সবকিছু একসঙ্গে সামলে বাজার করার পরিস্থিতিতে পড়লে নিজের বাচ্চাকে দেখেও উড়ন্ত আরশোলা কিংবা খেলে বেড়ানো ছাগলছানা ছাড়া অন্য কোনো উপমা মাথায় আসে না, বিশ্বাস করুন!
যাই হোক,মহৎ উদ্দেশ্যে মানুষ উদ্যোগী হলে ভগবান সহায় হন, তাই মেয়ে বার দুয়েক মুড়কি-বাতাসার ঝুড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও, এবং বাধা পেলেই বার বার মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়া সত্ত্বেও মোটের উপর নির্বিঘ্নেই একথলি বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম

পরদিন ভোরবেলায় উঠব ভেবে রেখেছিলাম, ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম আটটা বেজে গেছে নিজের ঘুমের রাশ কেন যে নিজের হাতে থাকে না কে জানে? যাই হোক, রান্নার জোগাড় করতে করতে হঠাৎ মনে হল সবাই তো শুনেছি সারাদিন উপবাসী থেকে সন্ধ্যেবেলায় লক্ষ্মীপুজো করে, আমিও করব নাকি উপোস? এমনিতে ঘণ্টাতিনেকের বেশি না খেয়ে আমি থাকতে পারি না, তায় আবার লো প্রেশারের ধাত! মাথা ঘুরে পড়ে গেলে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হবে তার ওপর 'উপোস করছি' ভাবলেই বেশি ক্ষিধে পায় ঠিক করলাম উপোসই করব, তবে ফি-ঘণ্টায় এক গেলাস করে শরবত খেয়ে যাব

দুপুরে মেনু ছিল গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি আর আলুর দম খাওয়ার লোক বলতে কন্যে,তাও আবার সে হাঁ করবে আর আমি খাওয়াব ভাবুন দেখি একবার, নুন-চিনির শরবত খেয়ে উপোস করে আছেন, সামনে বেড়ে রেখেছেন এক থালা ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর আলুর দম কতখানি সহনশক্তি থাকলে ওই ধোঁয়া-ওঠা থালার হাতছানি এড়িয়ে থাকা যায়! কিন্তু আমি তো দিব্যি মুখ ফিরিয়ে রইলাম! তবে কি এ মাহাত্ম্য উপোসের , নাকি বিকেলের হবু প্রসাদের, কি জানি??

মনের কষ্ট মনেই চেপে রেখে "উপোস করে চোদ্দোবার 'ক্ষিধে পাচ্ছে ক্ষিধে পাচ্ছে' ভাবতে নেই" এসব আউড়ে মনকে ধমকে চুপ করানো হল এরপর মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ভোগ রান্নার পালা সকালে অবশ্য নারকেল কোরা সেরে রাখা হয়েছে পাশে বসে মেয়ে মন দিয়ে নারকেল কোরা দেখেছে (বেড়াল যেভাবে মাছ কোটা দ্যাখে), মাঝে মাঝে থালার দিকে হাত বাড়ালে তাকে বুঝিয়েছি, "বিকেলে আগে ঠাকুর খাবে, মা লক্ষ্মী খাবেন, তারপর আমরা খাব", শুনে ছোট্ট মানুষটা হাত গুটিয়ে নিয়েছে ছবির মধ্যে থেকে হাত বাড়িয়ে মা-লক্ষ্মী যখন নারকেল কোরা খাবেন, তখন তাঁকে না জানি কেমন দেখতে লাগবে, এসবই বোধকরি ভাবতে শুরু করেছে ভারি অবাক হয়ে আর তাকে বারণ করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেছে আরেকটা ছোট্ট মেয়ের কথা, থালায় রাখা সাদা নারকেল কোরা দেখলে আর গুড়ের পাক দেওয়া নারকেল নাড়ুর গন্ধে যার জিভে জল আসতোই আসতো, আর মায়ের নরম-গরম চাউনিতে জিভের জল গিলে নিয়ে সে-ই কখন পুজোর শেষে থালায় করে মা প্রসাদ আনবে, তার জন্য হা-পিত্যেশ করে তাকে বসে থাকতে হত

মা আর মেয়ে, মেয়ে আর মা--- কি অদ্ভুত ভাবে ভূমিকা গুলো অদল-বদল হয়ে যায়, তাই না! আজ মেয়েকে যখন চোখ রাঙাই, তখন যদি কেউ আমার সামনে আয়না ধরে, তবে বোধহয় আমার চাউনি আর মায়ের সেই নরম-গরম চাউনির মধ্যে বেশ কিছুটা মিল খুঁজে পাব

সন্ধ্যেবেলায় পুজোর শেষে (ক্ষুদে গিন্নি অবশ্য থালায় ভোগ সাজিয়ে ঠাকুরঘরে রাখার পরেই একখানা লুচি আর একখানা নারকেল নাড়ু তুলে গালে পুরেছিল) পড়শিদের প্রসাদ দিয়ে এসে যখন নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসলাম, দেখলাম লুচি, মোহনভোগ, আলুভাজা, নারকেল নাড়ু, মায় সিন্নি অব্দি খাসা হয়েছে খেতে আমি যে এত ভালো রাঁধতে জানি, নিজেই জানতুম না! মা যদি জানতেন তাঁর 'কুটোটি ভেঙে দুটো না করা' মেয়েটা কেবল মায়ের হাতের রান্না খেতে কেমন হত তা মনে করার চেষ্টা করতে করতেই দিব্যি রেঁধে ফেলেছে, বেশ নিশ্চিন্ত হতেন তা, মা-কে তো আর এই নতুন শেখা বিদ্যের নমুনা দেখানো গেল না

মা যেখানে আছেন সবই জানতে পারছেন, আমাদের হাসি-কান্না-রাগ-হৈ-চৈ-এর সব খবরই রাখছেন, এসব ভেবে মনকে আগলানোর চেষ্টা তো করি, কিন্তু মা যে জানতে পারছেনই, সে খবরটা তো আর কেউ এসে আমার কাছে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, সবই তো আমাদের মনগড়া ধারণা, নিজেদের ভাল থাকার জন্য মনকে প্রবোধ দেওয়া, তাই কখনো কখনো মন কিচ্ছুটি বোঝে না সারাদিনের কাজের মাঝে মনের মধ্যেকার একটা ছোট্ট আমি ছোটবেলার সেই রোজকার ভুলগুলো করে আবার মায়ের বকুনি খেতে চায়, আর যে আমিটা বছরদুয়েক হল মা হয়েছে, সে চায় একবার অন্তত তার মা এসে তাকে মা হওয়ার পাঠ দিক, মা হতে শেখাক সে তো আর হওয়ার নয়, তাই নিজের ছোটবেলা-টাকে মনে করতে করতেই মায়ের মত মা হওয়ার একটা বৃথা চেষ্টা করতে থাকি রোজ।।


(এখানে পুজো-আচ্চা সম্পর্কে যা কিছু লিখলাম সবই আমার নিজের মনের কথা যেসব মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে নিয়মিত পূজার্চনা করে থাকেন, তাঁদের মনে কোথাও আঘাত দিয়ে ফেললে তাঁরা যেন নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করে দেন, এই অনুরোধ রইল)


['আমি অনন্যা' পত্রিকা (ISSN:2394-4307), ধানবাদ- January-March 2017 সংখ্যায় প্রকাশিত]