Saturday, 8 April 2017

সিনেমার গল্প

গৌতম ঘোষের 'দেখা  ' দেখছিলাম সেদিন,  ট্রেনে যেতে যেতে, সদ্য আলাপ হওয়া সহযাত্রিণীর মুঠোফোনে. অন্যের ফোনে উঁকি দেওয়া খুব একটা ভাল স্বভাব নয় জানি, কিন্তু বাংলা সংলাপ শুনে চোখ কান দুই -ই ধেয়ে যাচ্ছিল ফোনের পানে।

এটা আমার ছোটবেলার অভ্যেস. ট্রেনে কিছু করার না থাকলেই পাশের জনের দিকে নজর যাবে, তার হাতে যদি গল্পের বই থাকে তো ঘাড় বাড়িয়ে তার সঙ্গে আমিও পড়তে শুরু করব, খোলা পাতাটা হুড়োহুড়ি করে শেষ করে উদাস মুখে বসে থাকব সে কখন পাতা উল্টে পরের পাতায় যাবে, হাত নিশপিশ করবে নিজেই পাতা উল্টে নেওয়ার জন্যে. এভাবে নাম না জানা বহু বই শেষ না হতেই ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে অনেকবার. 

বই পড়ার বদলে যদি কেউ বাংলা ছবি দেখে, তাহলেও একই কাজ করে ফেলি. প্রথমে আড়চোখে, তারপর গলা বাড়িয়ে দেখতে বসে যাই. এইদিনও তেমন হয়েছিল.

ছবিতে এক জায়গায় দেখলাম ছোট্ট একটা ছেলেকে "শশী -দা" বিনে পয়সার বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন. মনটা হইহই করে উঠল. আরে! এ তো আমার বহুকালের চেনা জিনিস!

টিভিতে সিনেমা দেখা যায়, একথা জানার আগে থেকেই জানতাম রাত্তিরবেলায় অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে সিনেমা দেখা যায়. আমাদের মামারবাড়ি একদম বড় রাস্তার ধারেই. ভোর থেকে মাঝরাত, সর্বক্ষণ রাস্তায় গাড়ির সারি, হর্ণের আওয়াজে বাড়ির লোক অতিষ্ঠ. আমার কিন্তু বেশ লাগত. আমাদের বাড়িটা আবার ছিল একটু গলির ভেতরে, সারাদিনে গাড়ি -টাড়ি দেখার সুযোগ বিশেষ হত না. তাই মামারবাড়ি গেলে বারান্দা ছেড়ে নড়তে চাইতাম না.
সবচেয়ে মজা হত একটু রাত্তির হলে যখন ভারী ভারী ট্রাক -ট্রেলার গুলো যেত রাস্তা দিয়ে, প্রায় একশো বছরের পুরনো বাড়িটার গায়ে হাল্কা একটা কাঁপুনি ধরত, সেই কাঁপুনি চারিয়ে যেত মা বা দিদার পাশে শুয়ে থাকা আমার মধ্যেও. কাঁপছি না, অথচ পিঠের নিচে একটা গুড়গুড় করা ভাব, ভূমিকম্পের সময়েও কি এমনটাই হয়? জিজ্ঞেস করে বকুনিও খেয়েছি বারকয়েক. ওনারা দু 'তিনবারের ভূমিকম্পের সাক্ষী, রাতবিরেতে ওসব কথা ওনাদের ভাল লাগবে কেন?

এই ভারী ট্রাকগুলো যখন ছুটে যেত, দেখতাম ঘরের দেওয়ালেও একদিক থেকে আরেকদিকে সাঁ করে একটা ছায়া সরে গেল. প্রথমে ভাল বুঝতাম না, ভয় করত কিনা মনে নেই, সম্ভবত অজানাকে ভয় পাওয়ার মত বড় তখনো হইনি. ওইসব ছায়াগুলো যে সিনেমা, এই তত্ত্ব-টাই বা কে বুঝিয়েছিল সেটাও মনে নেই. তবে যেই বুঝলাম যে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেলেই দেওয়ালে আলো -ছায়াদের দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, আর গাড়ির আওয়াজ মিলিয়ে গেলেই দেওয়ালে এসে পড়া রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো আবার শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, অমনি আমাদের নতুন খেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল.

ঘুম আসার আগে অব্দি রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেলেই "এই... আসছে আসছে" বলে বোনেরা ঠেলাঠেলি শুরু করতাম, একলা শুলে নিজেকে ঠেলতাম. "এই -ই-ই যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে.... যা:, চলে গেল", "আবার আসবে দাঁড়া না", এরকম কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত থামত মা, মাসিমণি বা দিদাদের কারো ধমকে.

একটু বড় হওয়ার পরে খেলাটা কিছুটা পাল্টাল. তখন সরে যাওয়া সিনেমার আলো দেখে বোঝার চেষ্টা চলত গাড়ির চরিত্র কেমন. চার চাকা না আট চাকা, গাড়ির মাথায় মাল বোঝাই নাকি অতটা ভার নেই, এমন নানা তথ্য পাওয়ার জন্য কসরত হত. অত কাণ্ড না করে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তা না, এ যেন সিনেমা দেখতে বসে নামের লিস্টি না দেখে মেক-আপের আড়াল থেকে আসল মানুষটাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা!

মাঝেমধ্যে গুনতাম কে ক 'টা গাড়ির তৈরি সিনেমা দেখলাম. এই গুনতি করার সুবিধেটা হল ঠিক কোন সময়ে ঘুমটা এসে পড়ল সেটার একটা আবছা হিসেব পাওয়া যায়. বেশ "কাল পাঁচটা গাড়ি যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছি, আজ দেখি একই সময়ে ঘুম আসে কিনা" এরকম একটা হিসেব. আপেক্ষিকতার মত ঝামেলার বস্তু ভাগ্যিস তখন জানা ছিল না!

তো, এই হল সিনেমার গল্প. বছর কুড়ি  -পঁচিশ আগে গল্পের শুরু. জানিনা এখনও এমন সিনেমার গল্প তৈরি হয় কিনা. নিশ্চয়ই হয়. অবাক হওয়ার অভ্যেস তো আজও আছে. এখনও শোওয়ার ঘরে রাস্তার আলো এসে পড়ে. গাড়ির আওয়াজে আলো -ছায়ার ছুটোছুটি এখনো চলে.
 "ওটা কি মা? এদিক থেকে ওদিকে চলে গেল?" প্রশ্নটা কারো মনে আসে কিনা তারই অপেক্ষা এখন!