Monday, 6 November 2017

খটকা


বিকেল হলেই আজকাল বাড়িটা বড় টানে ভবতোষকে। আগে যেমন সন্ধে হতেই টানতো ক্লাবঘরে তাসের আড্ডা, এখন তেমন করেই দুহাত বাড়িয়ে ডাকে ছোট্ট একতলা বাড়িটা।
এই বুঝি গিন্নি এলেন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, এসেই বুঝি ভবতোষের হাত থেকে রিমোটটা ছোঁ মেরে নিয়েই নিমেষে চ্যানেল বদলে ফুটবল থেকে পটলকুমারের গানে ঢুকে পড়বেন, মোক্ষম গোলখানাই আর দেখতে দেবেন না পতিদেবতাটিকে।
ভাবতে ভাবতেই খেয়াল হয়, আরে, পটল কুমার তো ক-অ-বে শেষ হয়ে গেছে, সেইসঙ্গেই মনে পড়ে, বড়ছেলেকে কালকেই দেখলেন কাবলের দোকান থেকে টুপি কিনতে, ন্যাড়া মাথায় রোদটা বেজায় ঝাঁঝালো লাগে কিনা!
আচ্ছা, এই পোড়া গরমে ছেলেটা ন্যাড়া হয়েছে কোন আক্কেলে? প্রশ্নটা মনে আসতেই সবকিছু মনে পড়ে যায় ভবতোষের।
কেবল একটা খটকা যায় না কিছুতেই। দুদিন আগেই অত খরচা করে দুই ছেলেতে বাপের শেষ কাজ করলো, তাতেও তাঁর শখসাধে ভরা আত্মাটি মুক্তি না নিয়ে রোজ বিকেল হলেই বাড়িটার পানে ধেয়ে যায় কেন?

গোলাপি তিমির বৃত্তান্ত



সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নীল তিমির ধাক্কায় টেক-স্যাভি গেমপ্রিয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে জীবন থেকে সরে যাওয়ার এক উদ্দাম প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে, মিডিয়ার কল্যাণে সে সংবাদ আমাদের সবার কাছেই পৌঁছেছে। সত্যি বলতে কি, নীল তিমি সংক্রান্ত খেলাটি সম্পর্কে আপনার বিন্দুমাত্র কৌতূহল না থাকলেও সাবধান করার অছিলায় সেটি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য আপনার মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও অনেকে নিয়ে ফেলেছে। তাই এই মারণখেলা নিয়ে বেশি কথা খরচ করছি না। বরং আজ একটা গোলাপি তিমির গল্প শুনব চলুন।

এই 2017-র এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে একটা খেলা শুরু করেছে Baleia Rosa (পর্তুগিজ ভাষায় গোলাপি তিমি) নামক একটি ওয়েবসাইট, ইতিমধ্যে সাড়ে তিন লাখের ওপর লোক তাদের ফেসবুকের পাতায় খেলাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন, খেলতে শুরুও করেছেন।

এইটুকু পড়ে ভুরু কুঁচকে ফেলেছেন তো? ভাবছেন আপদগুলো আবার একটা মরণফাঁদের গল্প শোনাতে এসেছে! আজ্ঞে না মশাই, এ কোনও মরণফাঁদ নয়, বরং নীল তিমির করালগ্রাস থেকে আমার আপনার আশেপাশের সদ্যযৌবন পাওয়া প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটা চেষ্টা বলতে পারেন, অন্তত পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টাদের বক্তব্য তাই। তা, কেমন এই খেলা?

ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতোই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমেও রয়েছে পঞ্চাশটি কাজের এক তালিকা, খেলব বলে তাদের খাতায় নাম তুললে আপনাকে টুকটুক করে সেইসব কাজগুলো একে একে সেরে ফেলতে হবে। তবে গোলাপি তিমির দেওয়া কাজগুলো অতীব জীবনমুখী।

হয়তো আপনাকে বলা হল রোজ একটা করে চিরকুটে লিখে ফেলুন সেদিন কি ভাল কাজ করলেন, তারপর সেটা জমা করুন লক্ষ্মীর ভাঁড়ে, এক বছর পর ভাঁড় ভেঙ্গে ভাল কাজের ডায়েরি পড়বেন।

কিংবা ধরুন বাবা-মা-পিসি-মাসি এঁদের সবাইকে আপনি কত্ত ভালবাসেন সেটা তাঁদের জানানোর দায়িত্ব পড়ল আপনার ওপর। তা, এদেশে তো গুরুজনদের জড়িয়ে ধরে 'ভালোবাসি' বলার চল বিশেষ নেই, কাজেই তাঁদের হাতে হাতে ক'টা কাজ করে দেবেন, নিদেনপক্ষে আধঘণ্টাটাক সময় বের করে তাঁদের মুখোমুখি বসে দুটো নিঃস্বার্থ কথা বলবেন, ওতেই ওঁরা আপনার ভালবাসা দিব্যি অনুভব করবেন।

আমাদের দেশে এখন জোরকদমে স্বচ্ছতা অভিযান চলছে। তাতেও উৎসাহ জোগানোর উপায় আছে গোলাপি তিমির কাছে। সারাদিনে একবারের জন্য হলেও যদি অন্য কারও রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা নিজে হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসেন, তবে আপনি একজন সফল খেলোয়াড়। বিনা কারণে রাস্তা পরিষ্কার রাখার দায় আমাদের না-ই থাকতে পারে, কিন্তু খেলায় জেতার বাসনায় তো অবশ্যই আমরা রাস্তা সাফসুতরো করে ফেলব, তাই না?

এমন ভালো কাজের তালিকা বেশ লম্বা, যেমন, নিজের অব্যবহৃত জিনিসপত্র দুর্গত মানুষের সাহায্যার্থে দান করা, মজাদার পোশাক পরে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা, মাঝেমধ্যে আয়নার ওপারের মানুষটার সঙ্গে হেসে রঙ্গতামাসা করা, যাতে বোঝা যায় সে সত্যিই ভাল আছে, মেঘের মধ্যে তুলোর ঝুড়ি বা ডাইনোসর লুকিয়ে আছে কিনা তা খোঁজা, মনের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে কাগজে এঁকে ফেলে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য চলতে শুরু করা, এবং সবার শেষে সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি, একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা। জীবন শেষ করে দেওয়ার চেয়ে জীবন বাঁচানো যে অনেক কঠিন কাজ সে তো আমরা সবাই জানি। গোলাপি তিমির ছুঁড়ে দেওয়া এই যে জীবন বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ, এটা যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার জীবনে হতাশা বলে সম্ভবত আর কিছু থাকবে না। যে মানুষটা হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিলো, তাকে আরেকটা জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনা, এই কাজটাই করতে চাইছে গোলাপি তিমি। তার দেওয়া আপাত বালখিল্য কাজগুলো এই উদ্দেশ্যেই তৈরি। বারবার 'তুমি ভালো, তুমি সুন্দর, তুমি কত কিছু করতে পারো!' এগুলো মনে করিয়ে খেলতে থাকা মানুষটার আত্মবিশ্বাসের ভিত পোক্ত করে দেয় সে, যেখানে হতাশার কোনও জায়গা নেই।

 2015 থেকে ওয়েবদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল নীল তিমির আক্রমণ, তার মোকাবিলায় 2017 তে এল গোলাপি তিমি। সাও পাওলোতে সরকারের পক্ষ থেকেও গোলাপি তিমির প্রয়াসকে সমর্থন করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বব্যাপী মারণখেলাকে কিছুটা হলেও রোখা যায়। ভারতেও থাবা বসিয়েছে নীল তিমি, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষেধক হিসেবে এখানেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমটাকে যদি নাও ব্যবহার করতে চাই, খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ভালো কাজের তালিকাকেও যদি রোজকার জীবনে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, তাতে আর কিছু না হোক, জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগাযোগ বাড়বে, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অকালে পরপারে পাড়ি দিতে চাওয়ার প্রবণতা তাতে কিছুটা কমতে পারে।।

********************

তথ্যসূত্রঃ
http://baleiarosa.com.br
http://indianexpress.com


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.708159399363905.1073741828.707552542757924/776736352506209/?type=3&source=54

পরিণতি



আধঘণ্টা আগে মধু ফোন করেছিল। কথা বলে ফোন কাটার পরেও সৃজা ব্যালকনিতেই বসে রয়েছে। মা দুবার এসে উঁকি দিয়ে গেছে। রিমির খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে নিজেই ভাত বেড়ে নাতনিকে নিয়ে বসেছে। রোজ মা- ই মেয়েটার পিছনে দৌড়ে বেড়ায় সারাদিন, রোব্বারগুলোয় তাই সৃজা চেষ্টা করে নিজেই রিমির কাজগুলো করতে, মায়ের বুড়ো হাড়ে কত আর সইবে! কিন্তু মধুর কাছে খবরটা পাওয়ার পর থেকে আর উঠতে ইচ্ছে করছে না, ইন ফ্যাক্ট মাথাই কাজ করছে না। মামণি! সেই মামণি, যাকে নিয়ে শুভ্র আর তার দাপুটে বাবাকে বরাবর হাসাহাসি করতে দেখেছে সৃজা, সেই নরম ভীতু মহিলা কাজটা পারলেন কি করে? এ তো আর মাছ চুরি করতে রান্নাঘরে ঢোকা বেড়ালকে ঠ্যাঙানো নয়, এই কাজটা করতে বুকে যতটা সাহস আর মনে যতটা রাগ পুষে   রাখতে হয় ততটা সাহস আর রাগ মামণির কাছে ছিল সেটা কল্পনাই করা যায় না। যে মামণি বিত্তবান রগচটা স্বামী এবং বাপের জুতোয় পা গলানো উকিল ছেলের চোখের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস কোনওদিন পাননি, তিনি এতখানি বল পেলেন কোত্থেকে?
মধু সৃজার স্কুলবেলার বন্ধুদের মধ্যে একজন। সত্যি বলতে কি, একরকম তার ঘটকালিতেই শুভ্র আর সৃজার বিয়েটা হয়েছিল। সে শুভ্রর মাসীর মেয়ে। বিয়ের পর যবে থেকে সৃজা দেহে মনে অব্যক্ত যন্ত্রণা ভোগ করতে শুরু করল, তখন থেকে মধু বেচারী মরমে মরে থাকে। বাল্যসখী বলেই মধুর কাছে মন খুলতো সৃজা, নইলে এসব কথা কি কাউকে বলতে আছে? তবে আরেকজনও বোধহয় মরমে মরে থাকত শুভ্রর কৃতকর্মের জন্য। গুমোট গরমের দিনগুলোতেও যখন পিঠে-হাতে বেল্টের বাড়ির দাগ ঢাকার জন্য সৃজা ফুল স্লিভ কলার তোলা জামা পরে রান্নাঘরে ঢুকত, মামণির কুণ্ঠিত দৃষ্টি তাকে বুঝিয়ে দিত, ছেলের কীর্তি মায়ের অজানা নেই। অসহ্য রাগে মাথা দপদপ করত তখন। এই মানুষটা এত শান্ত, নিজের কথা কোনওদিন জোর গলায় বলেননি বলেই আজ সবাই এঁর মাথায় চড়ে বসেছে। মা হয়ে ছেলেকে শাসন করেননা কেন? শ্বশুরমশাইয়ের আর শুভ্রর কত যে অন্যায় আদেশ মামণি মাথা পেতে নিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। স্বামী খেতে বসলে একটি একটি করে বাটি তাঁর থালার কাছে এগিয়ে দিতে হবে, রান্নার সোয়াদ কোনও একদিন স্বামীর মনোমত না হলে তিনি ভাতের থালায় জল ঢেলে উঠে যাবেন, সেই জলঢালা ভাতের পিণ্ডি গিলবেন মামণি, তাও স্বামীর জন্য নতুন কোনও সুস্বাদু পদ রেঁধে তাঁকে খাইয়ে তবেই। আর এই পুরো সময়টায় স্বামীর কাছে তাঁকে শুনতে হবে রোজগার না করে বাড়িতে বসে ভাত খাওয়ার খোঁটা। এমন ঘটনা সৃজা বহুবার দেখেছে। তার ঠোঁটে চলে আসা শক্ত জবাবগুলোকে সে অতি কষ্টে দমিয়ে রাখত শাশুড়ির মুখ চেয়ে। তিনি তাঁর মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করিয়েছিলেন, সৃজা যেন শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে চাপান উতোরে না যায়।
সৃজা কিচ্ছু বলত না শ্বশুরমশাইকে। শুধু একদিন, বোধহয় লক্ষ্মীপুজোর পরেরদিন কোর্ট খুলছে সেদিন, বাপ -ছেলেয় কোর্টে বেরোচ্ছে, বাপ দেখলেন জুতো দুটোয় ধুলো পড়েছে। তিনি একপাটি জুতো তুলে সপাটে ছুঁড়ে মেরেছিলেন মামণির গায়ের দিকে। সৃজা তখন প্রেগন্যান্ট। সেই অবস্থাতেও ও লাফিয়ে উঠে জুতোটা লুফে নিয়ে ঘটতে চলা পাপটা আটকেছিল। তারপর দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে বলেছিল সেই মুহূর্তে মামণিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। শ্বশুরমশাই বোধহয় তাকে মেরেই বসতেন, মামণি তাঁর পায়ে ধরে তাঁকে থামান। মজার ব্যাপার হল মামণির ছেলেটি কিন্তু এই ঘটনাটি দেখে স্রেফ মজা লুটেছিল , একটা কথাও বলেনি।
সেইদিনই দুপুরে মামণি সৃজাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, এই পোয়াতি অবস্থায় সে যেন ভুলেও বাপ-ব্যাটার কোনও কাজ বা কথার প্রতিবাদ না করে। অবাক হয়ে সৃজা কারণ জিজ্ঞেস করলে মামণি কাঁদতে কাঁদতে শুনিয়েছিলেন তিরিশ বছর আগের ঘটনা। তখন তিনি ছ'মাসের অন্তঃসত্ত্বা, এক রাতে স্বামীর কোনও এক গোপন অনুরোধ রাখতে না চাওয়ায় তাঁর স্বামী লাথি মেরে তাঁকে খাট থেকে ফেলে দেন, ফলতঃ প্রথম সন্তানের বিসর্জন ঘটে।
এই গল্প শুনে সৃজা স্থির থাকতে পারেনি। শুভ্র আর শ্বশুরের অমতেই সে রিমি হওয়ার আগের বাকি দিনগুলো বাপেরবাড়িতে থাকবে বলে চলে এসেছিল। সরাসরি সংঘাতের সেই শুরু। তবে বার ডান্সার রোশনি সিংয়ের রেপকেসটা আগুনে ঘিয়ের কাজ করেছিল কিছুটা। মাঝরাতে রাস্তা থেকে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে খেয়েছিল যারা, শুভ্র তাদেরই বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল আদালতে।  'খারাপ' মেয়েটাকে আরও খারাপ দেখানো যায় কিভাবে, তারই চেষ্টা করছিল মন দিয়ে। ঘেন্না, জাস্ট ঘেন্না করতো সৃজার, তখন লোকটার হাবভাব দেখলে। সম্ভবত সেই ঘেন্না থেকেই রোশনির পাশে দাঁড়িয়ে শুভ্রর বিরুদ্ধে লড়ার শক্তি পেয়েছিল ও। রিমি হওয়ার পর অবশ্য মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুদিন ওবাড়িতে থাকার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ততদিনে জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। শুভ্রকে দেখলে একটা অস্থির রাগ ছাড়া আর কোনও অনুভূতি হত না শেষদিকে। ভাগ্যিস সে চেপে রাখেনি রাগটাকে। চেপে রাখলে হয়তো মামণি আজ যে কাজটা করেছেন সেটা সে-ই করে বসতো!

নতুন পাখি পোষা হয়েছিল আগেই, ডিভোর্স পাকা হয়ে যাওয়ার পর শুভ্র তার নতুন পাখিকে নিয়ে রায়চক-ডায়মণ্ডহারবার পাড়ি দিতে শুরু করেছিল ফি-হপ্তায়, কানাঘুষোয় সৃজা খবর পেতো। মেয়েটির নাম বৃন্দা, বাবা মা নেই, টাকাপয়সাও নয়। কাজেই একে নিয়ে খেলতে শুভ্রর তেমন সমস্যা হচ্ছিলো না, মুশকিল বাধালো মেয়েটা নিজেই। কোনও এক উইকএণ্ড ট্যুরে বোধহয় ওষুধপত্র নিতে ভুলেছিল, সময়েরও গোলমাল হয়ে থাকবে হয়তো, টেস্ট রিপোর্ট দেখা গেল পজিটিভ। ব্যস, মাতৃত্বের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বৃন্দা বিয়ের জন্য ক্ষেপে উঠলো, নইলে যে বাচ্চা নষ্ট করতে হবে! বাচ্চাকে বাঁচানোর কথায় মানুষে আর পাখিতে বিশেষ তফাৎ নেই, জানা কথা। কাজেই লাস্যময়ী নতুন পাখি বৃন্দা নিমেষে গায়ের পালক ফুলিয়ে শুভ্রকে ধাওয়া করে পৌঁছে গেল তাদের বাড়িতে, শেষ ঠোকরটা দেবে বলে।

মধু সেদিন মাসীর কাছেই গেছে। তার সামনেই নাটক শুরু, এবং ক্লাইম্যাক্স। মামণি নাকি বৃন্দার কাছে সব কথা শুনতে শুনতে কেঁপে উঠছিলেন, আর তাঁর ছোট্ট ফরসা মুখখানা টকটকে লাল হয়ে উঠেছিল দেখতে দেখতে। মাসীর শরীর খারাপ লাগছে ভেবে মধু ওঁর হাতদুটো ধরে রেখেছিল শক্ত করে। উনি মধুর হাত ছাড়িয়ে  উঠে গিয়ে শুভ্রকে ডেকে আনেন ঘর থেকে। বলেন, বৃন্দাকে বিয়ের জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে নোটিশ ইত্যাদি দেওয়ার জন্য। ডাক্তার দেখানোর প্রসঙ্গও আনেন। তখনও তাঁর গলার স্বরে উষ্মার আভাস নেই।   এরপর শুভ্র জানিয়ে দেয় অন্যের মাল সে নিজের নামে পুষবে না। সেটা শুনে বৃন্দা ঝাঁঝিয়ে উঠলে রাগের মাথায় শুভ্র তাকে ঠেলে ফেলে দেয় মেঝেতে। শুভ্রর মায়ের হাতের কাছে ছিল দরজার খিল, উনি সেটা দিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে থাকেন তাঁর ছেলের পিঠে। প্রথমে শুভ্র আটকাতে চেষ্টা করে, কিন্তু মামণির গায়ে তখন হাজার হাতির বল ভর করেছে। মধুও আটকাতে গিয়ে পড়ে যায়। শুভ্রর বাবা গেছেন বন্ধুর বাড়ি। ওদিকে বৃন্দাও সব দেখে কেমন এলিয়ে পড়েছে,  মধু কি করবে বুঝতে পারে না। তার মাসী তখনও শুভ্রকে মারছেন আর দুর্বোধ্য ভাষায় উগরে দিচ্ছেন এত বছরের পুষে রাখা রাগ, সারা জীবন ধরে যে অন্যায় ব্যবহার তিনি পেয়েছেন, একটা একটা করে সবক'টা ফিরিয়ে দিচ্ছেন তিনি। এত বছরের জমে থাকা রাগ আজ প্রতিবাদের ভাষা পেয়েছে, আজ তাঁকে রোখে, কার সাধ্যি!

এসব কথা সৃজা শুনেছে মধুর কাছে, শুনেছে আর ভেবেছে, এখনও ভাবছে, সেই নরমসরম ভীতু মহিলা, তিনি তবে রক্তমাংসেরই মানুষ! লোকে যে আড়ালে তাঁকে 'পাপোশ' বলে ডাকত, তাঁর অন্তরেও রাগ অপমান এসবের বোধ ছিল? তাঁর সত্ত্বায় সারা জীবন পা মুছে চলা মানুষদুটোকে তিনি তবে ঘৃণা করতেন? নিশ্চয়ই তাই, নইলে কিসের বশে তিনি এমন কাণ্ড ঘটালেন? সৃজা ভাবতে থাকে, বারবার তার মনে পড়ে সেই কুণ্ঠিত চোখ দুটোকে।।


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.738361219677056.1073741843.707552542757924/788922447954266/?type=3&source=54

উত্তরণ


'সই' এর পাতায় আমার গল্প 'উত্তরণ'।

লিঙ্কঃ

http://www.soicreativewomen.org/blog/silence-like-a-cancer-grows-blog-series/92-uttaran-dhoopchhaya-majumder.html