Monday, 30 July 2018

#আধেক_ঘুমে

ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্য - kromosho prokashyo থেকে



#ধূপছায়া_মজুমদার

একটা ডায়েরি। সম্ভবত আর্চিজের, হ্যাঁ, সেই আর্চিজ গ্যালারির, কাদের যেন কথা অনুযায়ী একসময় যে আর্চিজ গ্যালারি আর ভালবাসা নাকি সমার্থক শব্দ ছিল, সেই আর্চিজ গ্যালারিরই নাম ছোট্ট করে খোদাই করা আছে ডায়েরিটার মলাটের পিঠের দিকে। ডায়েরিটার মলাটের ছবিটা দেখলেই কেন জানি মামারবাড়ির চিলেকোঠার বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে তাতানের। যদিও ডায়েরিটা সেখানে পাওয়া যায়নি, ওটা আসলে তাতানের পিসি শিরীনের ছিলো, দাদুর ঘরের বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে সেখান থেকে এক দুপুরে তাতান পেয়েছিল ডায়েরিটা, তাও হলো বছরখানেক। আঠেরো উনিশ বছর ধরে জিনিসটা কারও চোখে পড়েনি কেন কে জানে!

ডায়েরিটার হাল্কা মেরুন বর্ডার, সেই বর্ডারের মাঝে হলদেটে দেওয়ালের সামনে কাঠের মেঝেতে রাখা একটা বেতের ঝুড়ির ছবি, বেতের ঝুড়িটা আধখোলা হয়ে উপচে পড়ছে কার যেন জাঙ্ক জুয়েলারি আর জমিয়ে রাখা কিছু হলদেটে চিঠি, ছবিটা দেখলেই তাতানের মনে হয় মামারবাড়ির বাতিল ট্রাঙ্কটার কথা। ওই ট্রাঙ্কটায় বম্মার বিয়ের বেনারসি আর দাদুর জন্মের খবর বয়ে আনা একটা চিঠি দেখেছিল তাতান, তারপর থেকেই কোথাও কোনও আড়াল থেকে পুরনো জিনিসকে উঁকি মারতে দেখলেই ওর ওই ট্রাঙ্কটার কথা মনে পড়ে যায়।

তা, তাতান যে ওর পিসির ডায়েরি নিয়ে নাড়াচাড়া করে, ও কি জানে না অন্যের ডায়েরিতে হাত দিতে নেই, অন্যের ডায়েরি পড়তে নেই? শিরীন জানতে পারলে রাগ করবে না? তা সে একটু করে বোধহয় রাগ, তাতান খেয়াল করে দেখেছে, এই একবছরেও ও ডায়েরিটার নামের পাতা আর যে পাতায় একটা ফার্ণের পেন্সিল স্কেচ করা আছে, সেটা উল্টে আর ভেতরে ঢুকতে পারেনি। হয় দুচোখে নেমে এসেছে রাজ্যের ঘুম, নইলে হঠাৎ শুরু হওয়া যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে গেছে প্রায়, তাতানের সাইনাসের প্রব্লেম আছে, মাথাব্যথা সর্দি এগুলো ওর বারোমাসের সাথী। তবুও, ডায়েরির পাতা ওল্টানো আর সাইনাসের ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠার দিনগুলো মিলে যাওয়াটাকে ও ঠিক কাকতালীয় বলে মেনে নিতে পারে না। ও জানে, শিরীনের ডায়েরিটাকে ঘিরে থাকে এমন একটা কিছু, যার নাগাল কারও পাওয়া সম্ভব নয়।

পিসিকে তাতান শিরীন বলেই ডাকে, বাড়ির বাকি সবার কাছে শুনে শুনে ছোট থেকেই অভ্যেসটা হয়েছে। শিরীন ওদের সময়ে ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টদের মধ্যে একজন ছিলো। মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম হয়েছিল, শিরীনের ঝকঝকে চেহারা আর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ বহুদিন পরেও ওর স্কুলের টিচার, নন টিচিং স্টাফ সবার মনে ছিল, কেউ কেউ বোধহয় এখনও মনে রেখেছে। কারণ, ওদের এই ছোট্ট শহরে রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই ইলাদিদা, তপতীদিদাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, ওর ঠাম্মিও শিরীনদের স্কুলেই ইংলিশ টিচার ছিলেন, সেই সুবাদে তাঁর কলিগরা সবাই তাতানের দিদা। তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করেন, তাতানের মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো। শিরীনকে স্পষ্টভাবে মনে না রাখলে তুলনাটা তাঁরা করতে পারতেন?

"তাতান, তাতান, উঠবি না? ডায়েরিটা খোলা রয়েছে যে টেবিলে, পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে হাওয়ায়, ধরবি না? আয়, পাতাগুলো ধুলো হয়ে যাওয়ার আগে নেড়েচেড়ে দেখে নে, আয়, আয়!"
ধড়মড় করে উঠে বসল তাতান। কে ডাকছিল ওকে? কোথায় ডায়েরি? বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালতেই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর খোলা ডায়েরিটা, ফরফর শব্দে পাতা উড়ছে, এক দুটো পাতা বোধহয় আলগা হয়ে এসেছে। হবে না? আঠেরো বছর কম সময় নাকি? তাতান তাড়াতাড়ি উঠে এসে পাতাগুলো গুছিয়ে তুলে রাখল ডায়েরির মধ্যে। কিন্তু ওকে ডাকল কে? গলাটা অচেনা, কিন্তু কথা বলার ধরনটা ঠাম্মির মতো, ডাকছিল এমন আপন করে, যেন কতজন্মের চেনা সে!

"মা, শিরীনের ভয়েস কেমন ছিলো? কথা বলতো কেমন করে?"
"এ আবার কি প্রশ্ন সকাল সকাল? নাও, কর্নফ্লেক্সের বাটি শেষ করে উদ্ধার করো আমায়। আমায় যা বললে বললে, ঠাম্মির সামনে নামটা ভুলেও উচ্চারণ করবে না। জানো তো সবই, তাও কেন কথার অবাধ্য হও!"

তাতান জানে, এবাড়িতে শিরীনের নাম উচ্চারণ করা, ওর ছবি দেখতে চাওয়া, ওর কথা জিজ্ঞেস করা সবই একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু তাতানই বা কি করবে? এতদিন ছোট ছিল, যে যা বলেছে শুনেছে, কিন্তু এখন বড় হচ্ছে ও, কৌতুহলও বড় হচ্ছে, নিজের পিসি, তার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করবে না মানুষের? আশ্চর্য! কিসের এত রাখঢাক তাতান বোঝে না।

"তাতান, তাতান, তুই জানতে চাস সব কথা? শুনতে চাস?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবটুকু জানতে চাই। ওরা কেন কিচ্ছু বলে না জানি না। তুমি বলবে?"
"বলব রে, সব বলব। বলব বলেই তো বার বার..."
"কিন্তু তুমি কে? তোমায় দেখলে কেন মনে হয় আয়না দেখছি? কিন্তু চিনতে পারি না! কে তুমি?"
"হি হি হি, আমি তোর আয়না? নাকি তুই আমার চোখ?"

"তাতান, অ্যাই তাতান, ওঠ ওঠ, অনেক বেলা হয়ে গেল, এক্ষুনি মামারা এসে পড়বে মা।"
ঘুমটা ছিঁড়ে গেল মায়ের ডাকে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটাও ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল। কি যেন একটা ধরতে চাইছিল হাত বাড়িয়ে, হলো না, ফসকে গেল, ছেঁড়া ছেঁড়া চিন্তা নিয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছে, মেসেজ এল, সায়ক।
"মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্য ডে! মেনু কি ওবেলা? মাটন ছাড়া আজকাল কিছু হজম হচ্ছে না, জানিস! কি কেলো মাইরি!"
ঝরঝর করে হেসে ফেলল তাতান। চড়ের একটা ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই করে বাথরুমে ঢুকল। বেসিনের কলটা খুলতেই স্বপ্নটা ফিরে এলো আবার, আয়নায় চোখ পড়তেই ঝট করে মনে পড়ে গেল, ওর মুখে শিরীনের মুখ কেটে বসানো।

"তাতান, তাতান, হ্যাপি বার্থডে! ইউ আর এইটিন নাউ। বড় হয়ে গেছিস তুই।"
"তুমি শিরীন?"
"এই দ্যাখো! মেয়ে চিনে ফেলেছে।" ঝরঝর করে হেসে ফেলল আয়না, আর তাতান অবাক হয়ে দেখল আয়না, নাকি শিরীন, তারও মাড়ির ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একজোড়া গজদাঁত।
"তুমি রোজ আমায় ডাকছ কেন? আগে তো কখনও দেখিনি তোমায়? হঠাৎ কোত্থেকে এলে? ঠাম্মির কাছে তোমার কথা বলতে নেই কেন? কেন তোমার নাম করা এবাড়িতে বারণ? বলো শিরীন, বলো।" সব্বাইকে বারবার করা প্রশ্নগুলো তাতান করে বসল স্বপ্নে আসা আয়নাকেও।
"ওই যে টেবিলে রেখেছিস ডায়েরিটা, ওটা কি আগে কখনও দেখেছিলি নেড়েচেড়ে? ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো এর আগে উল্টেছিলি কখনও? ওতে হাত না দিলে আমায় জানবি কেমন করে? আয় তাতান আয়, পাতা উল্টে দ্যাখ!"

এবার আর ওই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না তাতান। উঠে গিয়ে বসলো টেবিলে, পাতা ওল্টাতে হলো না, কেউ যেন ওর পাশে বসে যত্ন করে উল্টে দিতে লাগল ধুলো হয়ে আসা পাতাগুলো, আর তাতানের আঠেরো বছরের জন্মদিনে ওর সামনে উঠে এলো একটা ছবি, চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া, আর অচেনা কারও চেনা হয়ে আসা, সব একাকার হয়ে যেতে লাগল মিলেমিশে।

মাধ্যমিকে জেলায় প্রথম শিরীন যে উচ্চমাধ্যমিকেও মারকাটারি রেজাল্ট করবে, সে নিয়ে কারও কোনও সন্দেহই ছিলো না। টেস্টের রেজাল্টেও তার একটা আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর একে একে ফাইনাল, জয়েন্ট, জয়েন্টের রেজাল্ট, এসব পেরিয়ে এসেছিল উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন। স্কুলে রেজাল্ট জানতে গিয়েছিল শিরীন, গিয়েই শুনেছিল তুমুল হট্টগোল, ইংলিশের বনানীদি, অর্থাৎ শিরীনের মা, নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। রেজাল্ট দেখা শিকেয় তুলে শিরীন ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে, মায়ের মাথাটা কোলে তুলে নিতে নিতে দেখেছিল ভিড়টা পাতলা হয়ে যাচ্ছে, কেমন যেন চোরা চাউনিতে দেখছে সবাই ওকে, জ্ঞান ফেরার পর মাকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখে আবার রেজাল্টের বোর্ডের কাছে এসেছিল ও, বন্ধুরা তখন নীরবতা পালন করছে নোটিশ বোর্ডের সামনে। চোখে প্রশ্ন নিয়ে বোর্ডে নিজের রোল নম্বরটা খুঁজে পেয়ে খুঁটিয়ে দেখতেই দুলে উঠেছিল পায়ের নিচের মাটি। পাশে দাঁড়ানো শ্রীপর্ণা দুহাত দিয়ে ওকে আঁকড়ে না ধরলে ওও বোধহয় মায়ের মতোই জ্ঞান হারাতো। অঙ্কে নাকি শিরীন ব্যাক পেয়েছে, ওর নামের পাশে লেখা আছে যে এবারের উচ্চমাধ্যমিকে হেরে যাওয়া মানুষদের মধ্যে ও একজন। রেজাল্ট হাতে নিয়ে জানা গিয়েছিল নয় পেয়েছে ও অঙ্কে, দুশো নম্বরের মধ্যে একশো বিরাশি ও ঠিক করে এসেছিল, পৃথিবী উল্টে গেলেও এই সত্যিটা উল্টে যাওয়ার নয়, তার পরেও ওর রেজাল্টে লেখা আছে ও নয় পেয়েছে, অনলি নাইন।
"এক লহমায় দুনিয়ার সব রং কেউ শুষে নিলে দুনিয়াটাকে কেমন দেখতে লাগে জানিস? আমি জানি। আজ একমাস ধরে দেখে আসছি কেমন হয় রংহীন দুনিয়া, ঠিক কতটা সহজে সবটুকু ভুলে গিয়ে কাছের লোকেরাও দূরে ঠেলে ফেলে দেয় ফেল করা ছেলেমেয়েদের। ফেল করিনি কোনওদিন, বুঝলি! এই অভিজ্ঞতাটা কেমন হয় জানতাম না। কতটা অসহায় লাগে একশো আশির বদলে নয় দেখতে, জানা ছিল না, জানা ছিল না।"
লিখেছিল শিরীন, রেজাল্টের একমাস পরে। আরও লেখা ছিল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে চলেছে তাতান, ঠাম্মি নাকি ওই একমাসে মেয়ের মুখ দেখেননি, তাকে খেতে দেননি, তার বেশিরভাগ বইখাতা একদিন নাকি পুড়িয়েও দিয়েছিলেন। যেটুকু যা যত্ন করার করতো তাতানের বাবা আর মা। তাতান তখনও পৃথিবীর আলো দেখেনি।
অবাক হয়ে ভাবে তাতান, তার এই নরম ঠাম্মি এতটা নিষ্ঠুর কেমন করে হয়েছিলেন?

ভাবতে ভাবতে টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল তাতান।

"তাতান, বাকিটুকু জানবি না? ওই দ্যাখ, ওই ঘরের খাটে, ফুলের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে শিরীন, জানিস, আগের দিনই দাদাভাই রিভিউয়ের জন্য অ্যাপ্লাই করে এসেছিল, বউমণিকে বলেছিল, আমি ঘুমোচ্ছিলাম বলে রাতে আর জানায়নি, ভেবেছিল পরেরদিন সকালে বলবে। ওরা কি করে জানবে বল, বিকেলে, যখন দাদাভাই বউমণি অফিসে, তখন মা শিপ্রাদির ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা বলেছে, পরের মাসেই রেজিস্ট্রির কথাও পাকা করে ফেলেছে, ওরা কি করে জানবে যে একশো আশি উল্টেপাল্টে নয় হয়ে গেছে বলে আমি রাতারাতি মায়ের গলগ্রহ হয়ে গিয়েছি ওই কদিনে? বড্ড লেগেছিল জানিস তাতান! গালে চড় এসে না পড়লেও যে বুকে কতটা লাগে সেদিন বুঝেছিলাম। বাবার কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে হয়েছিল হঠাৎ। একমাসের ঘুমের ওষুধ তো ছিলোই, আর কিচ্ছু ভাবিনি, জানিস! ওই দ্যাখ, মা কেমন পাথর হয়ে বসে আছে, হয়তো আফসোসও করেছিল। নইলে রিভিউয়ের রেজাল্ট আসার পরের দুবছর কি আর রিহ্যাবে থাকতে হয়! রিভিউয়ের রেজাল্টে সবাই বুঝেছিল আমি সত্যি বলেছিলাম, জানিস! নয় নয়, ওটা আসলে একশো আশিই ছিল।"

কে রিহ্যাবে ছিল, ঠাম্মি? চমকে উঠল তাতান। এরা কত কিছু বলেনি তাকে!

"তুমি, তুমি কি করে জানলে সব?"

আচ্ছা, শিরীনকে কি ওর ভয় পাওয়া উচিত? মানে, স্বপ্ন, না সত্যি, বোঝা যাচ্ছে না, তবে শিরীন যে অশরীরী, তাতে তো সন্দেহ নেই। কি করবে তাতান?

"হি হি, অত ভেবেচিন্তে ভয় পেতে হয় নাকি রে পাগলি? ভয় করলেই ভয়, নইলে কিছুই নয়। শুনিসনি?"
"তুমি এতদিন আসোনি কেন শিরীন?"
"ওই ডায়েরিটা যে এতদিন সামনে আসেনি রে! আমার সবটুকু যে ওতেই আছে। ঘুমিয়ে ছিলাম ওখানেই এত বছর, তুইই তো আমায় জাগালি, নিয়ে এলি ধুলো ঝেড়ে। আমিও জানতে পারলাম তুই কিচ্ছু জানিস না।"
"তুমি যাবে না তো শিরীন, আর যাবে না তো আমায় ছেড়ে? জানো, এবাড়িতে আমার কোনও বন্ধু নেই, তুমি থাকো প্লিজ!"
"আমার কি থাকলে চলে রে? কতটা কষ্ট যে হয়, যদি বোঝাতে পারতাম! টান, শুধু টান, একটা অদ্ভুত কষ্ট রে, মনে হয় আমার সবটুকু ভেঙেচুরে যাচ্ছে, আর পারছি না রে তাতান, এবার আমায় মুক্তি দে।"

তাতান কি করবে বুঝে উঠতে পারে না, এই ক'দিনে শিরীনকে এই প্রথম বড় ম্রিয়মাণ লাগে।

"ওই ডায়েরিটা, ওটাকে কাল পুড়িয়ে দিতে পারবি? ওটা থাকলে আমারও আর কোত্থাও যাওয়া হবে না।"
"তুমি যেও না পিসিমণি! আমি ডায়েরিটা আবার ওই বইয়ের তাকে রেখে আসব। আমার কাছে তোমার বলতে তো এইটুকুই রইলো, বলো? এটুকুও নিয়ে চলে যেও না, প্লিজ!"

স্বপ্ন, নাকি সত্যি? জানে না তাতান। আলো আঁধারির মাঝে আধোঘুমের ঘোরে তাতানের চোখ উপচে জল ঝরে ঝরঝর, সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চায় তার আসার আগেই চলে যাওয়া পিসিমণির হাত, ধরা যায় কিনা বোঝা যায় না, ওদিকে বাইরে দুই একটা পাখির ডাক জানান দেয় শেষের দিকে আরও একটা দিন এগিয়ে যাওয়া হলো।

(সমাপ্ত)

Sunday, 29 July 2018

#আন্তর্জাতিক_শিশুশ্রমবিরোধী_দিবসে

#ধূপছায়া_মজুমদার

************************

"বয়স বারো কি তেরো বড়জোর চোদ্দ
রিকশা চালাতে শিখে নিয়েছে সে সদ্য"

ঘর ভরে আছে মৃদু স্বরে আর সুরে, স্নান সেরে সোফায় এসে বসে খবরের কাগজটা খুললেন মিসেস সেন। এইটুকুই সময়, নিজেকে দেওয়ার। মিনু চা রেখে গেছে, মুখে দিতেই মুখটা বেঁকে গেল।

"মিনু, মিনু!"

"হ্যাঁ মামীমা!"

"জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেবো তোমার, এত ক্যালাস কেন? একটা কথা বললে মনে থাকে না? কতবার বলেছি আমার চায়ে চিনি দিবি না!"

"এ বাবা, চিনি দিয়েছি? ভুল হয়ে গেছে মামীমা, আর হবে না।"

"ভুল হয়ে গেছে মামীমা! ন্যাকামো! চোদ্দ বছরের ধাড়ি মেয়ে, তাকে রোজ পাখিপড়া করে কাজের ফিরিস্তি বোঝাতে হবে। মাস গেলে মাইনের টাকা গুনে নিয়ে বাপের হাতে তুলে দিতে তো ভুল হয় না? ভালোমন্দ গিলে শাঁসেজলে বেড়েছিস, হাড়হাভাতে চেহারাটা ভুলে গেছিস বোধহয়? দূর করে দেবো বাড়ি থেকে, মরবি না খেতে পেয়ে, তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!"

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বাশুলিথান গাঁ থেকে আসা রাতদিনের ঝি মিনু, মিসেস সেনের মুখ চলতে থাকে, তার সঙ্গে প্রাণপণে পাল্লা দিতে গিয়ে হেরে যান সাউন্ড সিস্টেমের সুমন, ফ্যানের হাওয়ায় ফরফর করে উল্টে যায় কাগজের প্রথম পাতাটা, কাগজের নামের অক্ষরগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকে কড়া পড়ে যাওয়া কচি কচি হাতগুলো, তাদের ছবির নিচে ক্ষুদে অক্ষরে লেখাটা চোখে পড়েই না প্রায়, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস।

***********************

রিয়া আর ওর বাবা একটু পরে বেরোবে ফর্ম জমা দিতে। এই চত্বরে ভালো স্কুল একটাই, কাজেই ঝেঁটিয়ে মেয়েরা আসবে ভর্তি হতে, এক্ষুনি না বেরোলে লাইন অনেক লম্বা হয়ে যাবে। ছুটোছুটি করে জলখাবারের জোগাড় করছিল সোমা, পিঙ্কির দিকে চোখ যেতেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। গামলায় ধরে রাখা জলটার মধ্যে বাসনগুলোকে ডুবিয়ে কোনওরকমে ধুয়েই ছুঁড়ে দিচ্ছে মাজা বাসনের ঝুড়িতে।

"ও কি পিঙ্কি? ও কেমন বাসন ধোয়া? ম্যা গো, ওই সাবানগোলা ঘোলা জলটায় ধুয়ে রেখে দিচ্ছিস? কল খোল, রগড়ে ধো আবার সবকটা বাসন, যেদিকে দেখব না সেদিকেই ফাঁকি। এইজন্য কড়কড়ে নোটগুলো গুনে দিই প্রতিমাসে?"

"কাকিমা কাল থেকে সব ভালো করে ধুয়ে দেবো, রগড়ে রগড়ে, ঝকঝকে করে। আজ ছাড়ান দ্যাও, ইস্কুলে যেতে হবে, ভত্তির ফরম জমা করতে।"

"অ্যাঁঃ, ইস্কুল যাবেন, বিদ্যের জাহাজ হবেন! এবার বলবি সায়েন্স নিয়ে পড়বি! কালে কালে কত যে দেখব!"

একটু থেমে যোগ করে সোমা,

"ওসব ইস্কুল ফিস্কুল গেলে তোর মাকে পাঠিয়ে দিবি, টাইম পেলে সে করুক, নইলে অন্য লোক দেখব। বিদ্যেধরী ঠিকের ঝি রেখে কাজ নেই আমার, দুদিন অন্তর পড়া, পরীক্ষা, নিজে খেটে মরো তখন!"

জলখাবার গোছাতে গোছাতে গজগজ করতে থাকে সোমা, মুখ বুজে বাসন ধুতে থাকে পিঙ্কি, ডাইনিং চেয়ারে বসে তখন রিয়া ওর এক বন্ধুর দিদির প্রোফাইলে শেয়ার করা একটা লেখা পড়ছে মন দিয়ে, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস উপলক্ষ্যে লেখা বেশ জ্বালাময়ী একটা আর্টিকেল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে রিয়ার বাবার মোবাইলেও খোলা রয়েছে ওই আর্টিকেলটাই, অন্য কারও প্রোফাইলে শেয়ার করা। এসব জ্বালাময়ী আর্টিকেল কয়েক মিনিটে কয়েকশো শেয়ার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে, উঠোন থেকে উঠোনে।

****************************

তিন্নির আজ ভ্যাকসিন নেওয়ার ডেট ছিলো। বুস্টারের ফার্স্ট ডোজ, নেওয়ার সময় খুব হাত-পা ছুঁড়েছে, কেঁদেছে। ডক্টর বললেন জ্বর আসবে, তাই একটু টেনশন মতন হচ্ছে শ্রেয়ার। সকালে কিছু খেয়ে বেরোয়নি, এখন ফেরার পথে একটা কচুরির দোকানে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে প্রদীপ্ত। তিন্নি ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই শ্রেয়া গাড়িতেই রয়েছে, প্রদীপ্ত ওর প্লেটটা পাঠিয়ে দিয়েছে দোকানে কাজ করা ছেলেটাকে দিয়ে।

বাচ্চা ছেলে, বছরদশেক হবে হয়তো, খাবার দিতে এসে কেমন জুলজুল করে দেখছিল ঘুমন্ত তিন্নির দিকে। তিন্নির দিকেই কি? নাকি ওর পাশে সিটের ওপর রাখা পিঙ্ক টেডি, অরেঞ্জ বল আর রংবেরঙের ক্যাটারপিলারটার দিকে? বোঝেনি শ্রেয়া, শুধু আড় হয়ে ঘুরে বসে তিন্নিকে আর খেলনাগুলোকে আড়াল করে ছেলেটার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নিয়েছিল।

সকাল থেকে কিছু খায়নি, কচুরির প্রথম টুকরো মুখে পুরতেই আবেশে চোখ বুজে এসেছিল আপনাআপনি। কাঁচতোলা গাড়ির জানলায় টকটক আওয়াজ শুনে চোখ খুলে তাই চমকেই গিয়েছিল শ্রেয়া।

একটা কটা চোখ কটা চুলের ফ্যাকাশে গায়ের রঙের ছেলে কাঁখে একটা কালোকোলো বাচ্চাকে নিয়ে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে, আর ইশারায় নিজের আর বোনের পেটের দিকে দেখাচ্ছে। দুজনেরই সারা গায়ে চিটধরা ময়লা, ভাগ্যিস গাড়ির কাঁচ তোলা, নইলে গন্ধে টেকা যেতো না বোধহয়। শ্রেয়া জানে, এই ভিখিরীদের একটা বিরাট বড় ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলো খুব এফিশিয়েন্ট ওয়ার্কার। এরা ভিক্ষে হিসেবে খাবারের চেয়ে টাকা প্রেফার করে বেশি, ভাগটাগ করে নিজেদের কপালে যা জোটে সবই নেশায় উড়িয়ে দেয়। এদের পয়সা দেওয়া মানে পয়সা নষ্ট করা। এঁটো ডানহাতটা কপালের কাছে তুলে 'মাফ করো' গোছের একটা সিগন্যাল দেয় শ্রেয়া। তাতেও ঠ্যাঁটার মতো দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। হাল ছেড়ে দিয়ে ওদের দিকে পিছন ঘুরে বসে কচুরিতে মন দেয় শ্রেয়া, টেস্টটা সত্যিই ভালো।

গাড়িতে বাজতে থাকা এফ এম চ্যানেলটায় মর্নিং শো-র আর. জে. তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে শ্রোতাবন্ধুদের জানাতে থাকেন আজকের দিনটির তাৎপর্য, আজ বারোই জুন, আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস।

(সমাপ্ত)

ছবি : http://www.un.org/en/events/childlabourday/

Thursday, 26 July 2018

#বাঞ্জি-পুরাণ কথা (অক্ষর পত্রিকায় প্রকাশিত)


আমার পতিদেবতাটি, বুঝলেন, মনে মনে বেজায় অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষ। এমনিতে হাবভাব দেখে সেকথা মনে হবে না, দিব্যি ভালোমানুষের মতো পালা করে তিনবেলার শিফটে আপিস যাচ্ছেন, বাড়ি থাকলে হয় ঘুমোচ্ছেন, নইলে টিভি চালিয়ে শেয়ারবাজারের খবর খুলে গ্যাঁট হয়ে সোফায় বসে থাকছেন, ফ্রিজের আনাজপাতি এক্কেবারে ফুরিয়ে গেলে দু'থলি বাজার করে এনে আমায় কৃতার্থ করে দিচ্ছেন, আর ফ্রিজটা বড্ড নোংরা হয়ে থাকলে ঘষেমেজে সেটিকে ঝকঝকে করে তুলছেন। অবিশ্যি বাড়িতে থাকলে মেয়ে তাঁর বাবাকে একদণ্ড একলা ছাড়েন না, সে আলাদা কথা। যাইহোক, এহেন নিরীহ মানুষটির মনে যে থেকে থেকে অ্যাডভেঞ্চারের ঘন্টি বেজে ওঠে, সেকথা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

বছর দুয়েক আগে একবার খেয়াল চাপলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এভারেস্ট দেখতে ফালুট যাবেন ট্রেক করে। তখন কন্যারত্নটি একেবারে কচি, তাকে কাঁখে নিয়ে বারোহাজার ফুট উঁচুতে হেঁটে ওঠার দু:সাহস দেখানো অসম্ভব, তাই তিনি ঠিক করলেন ব্যাচেলর সেজেই বেরিয়ে পড়বেন। তা ভালো, কিন্তু বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে যাও! তা নয়, দুচারজন বন্ধুকে শুধোলেন, তারা কেউ গা করল না, অমনি ছড়ি হাতে আর রুকস্যাক পিঠে শেরপাভায়ার হাত ধরে তিনি একলাই ঘুরে এলেন সান্দাকফু আর ফালুট, চাট্টি নয়া ইয়ারবন্ধুও জুটিয়েছিলেন শুনেছিলাম সেখানে গিয়ে।

সে নয় হলো, কিন্তু এই অভিযানের পর তাঁর সাহস গেল বেড়ে। তার পরের বছর কালিম্পং গিয়েছি বেড়াতে, তিনি বললেন উড়বেন। প্রথমে ভেবেছিলাম বেড়ানোর আনন্দে ভুল বকছেন বোধহয়, তারপর ডেলো পাহাড়ের রংচঙে পার্কে ঢোকার মুখে উড়নেওয়ালাদের বুকিং আপিস দেখে বুঝলাম কেবল আমার কত্তাটির নয়, ভুল বকা রোগে ধরেছে আরও দুতিনজনকে, তাঁরা সব লাইন লাগিয়েছেন উড়বেন বলে, মানে ওই প্যারাগ্লাইডিং-এর প্যারাস্যুট গোছের জিনিসটা গায়েপিঠে মাথায় বেঁধে নিয়ে সাঁইই করে আকাশে ভেসে খানিকক্ষণ পাখি পাখি ভাব জাগানোর চেষ্টা আর কি! ব্যাপারস্যাপার দেখে গলা জিভ শুকিয়ে আসছিল, ভাবছিলাম কেঁদেকেটে ওড়াউড়ির শখ ঘুচিয়ে দিই। কিন্তু অতীতের কথা মনে এল, নিজেকে সামলালাম।  হয়েছিল কি, বিয়ের পরপর গোয়ায় গিয়ে সমুদ্রের বুকে উড়ব বলে বিচ্ছিরি একখানা যন্ত্রে উঠেছিলাম যুগলে। তারপর আমি ভয়ে ভয়ানক কান্নাকাটি চেঁচামেচি জুড়েছিলাম, আর তাইতে ঘাবড়ে গিয়ে কত্তামশাই ওড়ার আনন্দ ভুলে আমায় নিয়ে তড়িঘড়ি নিচে নেমে এসেছিলেন। নামার পর বলেছিলাম, "এবার ভয়টা কমলো, আরেকবার উড়লে হয়!" তাই শুনে নাকি তাঁর গায়ে জ্বালা ধরেছিল ভয়ানক।

 আমার জন্য তিনি মন খুলে উড়তে পারেন নি, এ খোঁটা আমায় আজও সইতে হয়। তাই ঠিক করলাম, যা মন চায় করুকগে লোকটা, বারণ-টারণ কিচ্ছু করব না। আমি মেয়ে নিয়ে ফুল পাখি দেখে বেড়ালাম, আর তিনি সারা গায়ে বকলস বেঁধে ওড়াউড়ি সেরে এলেন। মোক্ষলাভ কদ্দূর কি হয়েছিল জানি না, তবে কিছুদিন দেখলাম মুখেচোখে প্রশান্তি খেলা করছে।

সেই প্রশান্তি আসার ফলেই বোধহয়, একদিন শুনলাম কত্তামশাই বলছেন, "এবার ঋষিকেশ যেতে হবে।"

ঋষিকেশ কেন রে বাবা? সে তো সাধুসন্ন্যাসীদের জায়গা শুনেছি, আমার ইনি আর যাই হোন, সন্নিসীভক্ত ছিলেন না তো কোনওকালে! তবে কি আমার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বিবাগী হয়ে যাবেন ভাবছেন? কি এমন জ্বালাময়ী মানুষ বাপু আমি? স্বয়ং ভোলানাথকেও গিন্নির বচন শাসন একটু আধটু মেনে চলতে হয়, তুমি কি তাঁর চেয়েও ইয়ে নাকি হে! ভাবছি মুখ খুলব, নিজেই হেসে বললেন,
"ঋষিকেশে গিয়ে বাঞ্জি করতে হবে, বাঞ্জি!"

গেঞ্জি শুনেছি, শিম্পাঞ্জী শুনেছি, এমনকি নীলগিরি পাহাড়ে বারো বছর অন্তর ফুটে ওঠা 'নীলকুরিঞ্জি ' ফুলের নামও শুনেছি, কিন্তু বাঞ্জি? সে তো শুনিনি! শুধোলাম তাঁকেই, তিনিও বিগলিত হয়ে জ্ঞান বিতরণে বসলেন, সুযোগ তেমন পান না তো, পেলেই তাই বর্তে যান।

শুনলাম বানুয়াটু (Vanuatu) দেশের পেন্টেকোস্ট (Pentecost) দ্বীপের ছেলেছোকরার দল নাবালক থেকে সাবালক, অর্থাৎ, পুরুষ মানুষ হয়েছেন কিনা তা পরখ করতে 'গল' (Gol) নামে একখানা খেলা খেলে থাকেন, তাতে  পায়ে লতা বেঁধে ২০-৩০ মিটার উঁচু একটা মিনার থেকে ঝাঁপ দিতে হয়। সেই ঝাঁপ থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে নাকি 'বাঞ্জি জাম্পিং ' নামক অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসটির উৎপত্তি। নিউজিল্যান্ডের বেশ কয়েক জায়গায় নাকি বেশ আটঘাট বেঁধে লোকজন এই ঝাঁপদোলনার খেলাটি খেলেন। বেশ শক্তপোক্ত একখানা ইলাস্টিক দড়ি পায়ে কষে বেঁধে ৮০-৯০ মিটার উঁচু টাওয়ার বা ব্রিজ বা পাহাড়চুড়ো থেকে লোকজন মনের আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়েন, ওই একখানা ইলাস্টিক দড়ি তাঁদের ভূপতন এবং হাড়গোড় চূর্ণনের হাত থেকে রক্ষা করবে, এই ভরসায়।

গপ্প শুনতে ভালোই লাগছিল, শেষটায় কত্তামশাই বললেন,
"ইন্ডিয়ায় হাইয়েস্ট লেভেল থেকে বাঞ্জি করায় ঋষিকেশে"
"কত?"
"৮৩ মিটার।"
"তুমি ওই তিরাশি মিটার উঁচু থেকে ঝাঁপাবে? একসময় বয়লারে উঠলে পা কাঁপতো যে তোমার? সেই সেবার এন টি পি সি বিন্ধ্যাচলে হামাগুড়ি দিয়ে বয়লার থেকে নেমেছিলে না?"
"ছো:! সে তো তেরো বচ্ছর আগে। তারপর দামোদর দিয়ে কত জল বয়ে গেছে জানো? আমি এখন হপ্তায় ক'বার বয়লারে চড়ি জানো? ওসব হাইট ফাইট কিস্যুতে আমার ভয় নেই আর। আমি ঋষিকেশ যাবোই, আর বাঞ্জি করবোই। তুমি করবে?"
আমি ক্ষীণজীবী নিরীহ মানুষ, প্যালারামের ফিমেল ভার্শন, তায় আবার এখন একটি ছানামানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিত্যিদিন মাজার ব্যথায় নড়তে পারি না। ওসব শখ করে ঝাঁপাঝাঁপি খেলার শখ মোটেও নেই আমার। ওঁকেও আটকাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেই গোয়ার প্যারাসেলিং-এর পর আমায় হ্যাটা করাটা মনে পড়ে গেল আবার। মনে মনে বুক ভর্তি করে নিশ্বাস নিয়ে বলে ফেললাম,
"চলো তবে, ওই চত্বরে ছানাকোলে যাওয়া যায়, এমন কোনও জায়গা বাছো। আমি ছানাকোলে হোটেলের ব্যালকনিতে বসে ছেলেভুলোনো ছড়া আউড়াবো, আর তুমি ঝাঁপদোলনা খেলে আসবে।"

জায়গা বাছা, পকেট গুছোনো, সস্তায় হোটেল খোঁজা সব সেরেসুরে দেখা গেল রুট ম্যাপে ঢুকে পড়েছে ধানোল্টি আর হরিদ্বার। হরিদ্বার যখন, ধার্মিক মানুষজনকে সঙ্গে নেওয়া উচিত, নইলে আমরা পাপীতাপী মানুষ, কোথায় কি দোষত্রুটি হয়ে যাবে, শেষটায় পুণ্যার্জনের খাতায় শূন্য পাই আর কি! দল তৈরি হল পাঁচজনের, আমরা কত্তাগিন্নি, শ্বশুর শাশুড়ি আর আমাদের কন্যা।

গুরুজনদের কাছে এই সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য চেপে যাওয়া হলো ভালোমানুষের মতো মুখ করে। তাঁরা তো উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ের ঝকঝকে আকাশ দেখে আর তাজা হাওয়ায় নিশ্বাস নিয়ে এক্কেবারে আপ্লুত, ধানোল্টিতে দূরে হিমালয়ের হাতছানিতে আমরা সবাই মুগ্ধ, মেয়ে তো ক্ষেপে উঠেছিল পাহাড়ে উঠবেই বলে, কেবল আমার উনিই দেখলাম সুযোগ পেলেই ইউটিউব খুলে ঘাড় গুঁজে কিসব দেখছেন আর হাত মুঠো করছেন, খুলছেন, আবার মুঠো করছেন। বুঝলাম রাজ্যির বাঞ্জি জাম্পের ভিডিও দেখে বুকে বল আনছেন। তা বুকে বল তো একটু লাগবেই বাপু, বাঙালির ছেলে নেচে উঠে চলেছেন ঝাঁপদোলনা খেলতে, তায় আবার এক্কেবারে নির্বান্ধব অবস্থায়, একলাটি। পায়ে ইলাস্টিক দড়ি বেঁধে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার আগে অ্যাড্রিনালিনের বান ডাকে যে 'হুই- হাই - ইয়োওওও' গোছের চিৎকারগুলোয়, সেধরনের হইহল্লা ওঁর পাশটিতে দাঁড়িয়ে করার মতো কেউ নেই যে!

 আমি মানুষটা এমনিতে বেজায় মোটিভেটিং ধরনের, মানে নিজে সেফ জোনে থেকে জ্বালাময়ী বক্তৃতার দ্বারা আশেপাশের জনতাকে ভারি সুন্দর উদ্বুদ্ধ করতে পারি, কত্তামশাইকেও ভোকাল টনিক দিয়ে চাঙ্গা রাখছিলাম। যেদিন উনি একলা যাবেন ঋষিকেশে, তার আগেরদিন একপ্রস্থ ঋষিকেশ ট্রিপ সেরে এসেছি সবাই মিলে, বড়দের বলা হয়েছে কত্তামশাইয়ের এক বন্ধু থাকেন ঋষিকেশে, তিনি পরদিন ওঁকে নেমন্তন্ন করেছেন। শাশুড়ি সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন সে বন্ধু সবাইকে, নিদেনপক্ষে আমাকে আর মেয়েকে কেন নেমন্তন্ন করলেন না, কোনওরকমে চাট্টি মিছে কথা বলে তাঁকে ভুলিয়েছি, আর মনে মনে মা গঙ্গাকে পেন্নাম ঠুকেছি, "হেই মা গঙ্গা, মিছে কথা বলার পাপ দিও না মা, ছেলে ঝাঁপদোলনা খেলে এলেই তার বাপ-মাকে সব সত্যি কথা বলে দেবো।" ছেলে যাচ্ছেন পায়ে দড়ি বেঁধে পাহাড়ের ওপর থেকে টপাং করে খাদে ঝাঁপাতে, নিচে বয়ে চলেছেন মা গঙ্গার পাহাড়ি ভার্শন, এসব কথা কোন মুখে তার মা-বাবাকে জানাই বলুন তো?

রাত্তিরবেলায় সবাই ঘুমোতে গেলে আমরা দুটিতে গঙ্গার ধারের ঝুলন্ত ব্যালকনিতে এসে বসলাম। ইতিমধ্যে কত্তামশাই জাম্পিন হাইটস (Jumpin Heights)-এর ওয়েবসাইট থেকে বুকিং সেরে ফেলেছেন পরেরদিনের জন্য, আর তারপরেই শুরু হয়েছে তাঁর বুক দুরদুর, পেট গুড়গুড়। 'যাবো কি যাবো না' জাতীয় দোলাচলে দুলছেন তিনি গঙ্গাতীরে বসে বসে। আমি গিয়ে পাশে বসতেই "থাক, যাব না " দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে, অনুমোদন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। কঠোর স্বরে মনে করালাম টাকাপয়সা দেওয়া হয়ে গেছে, এখন আর পেট গুড়গুড়ের দোহাই দিলে চলবে না। মনে মনে ভাবছি, "হুঁ হুঁ বাবা, আমায় খুব হ্যাটা করা হয়েছিল সমুদ্রের ওপর উড়তে ভয় পেয়েছিলাম বলে, এখন দ্যাখো, ডরে হাত-পা পেটের ভেতরে সেঁধোয় কিনা!"

আমার চোখরাঙানিতে হোক, বা নিজের মনের ভেতরে চাট্টি কাঠকুটো জ্বেলে মনটাকে সেঁকে তাজা করেই হোক, মোটকথা মাঝরাত নাগাদ কত্তামশাই বেশ তরতরে হয়ে উঠলেন। 'ভয় নেমেছে, আপদ গেছে' ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম, সকালে উঠে শুনি তিনি রাত জেগে ঝাঁপের ভিডিও দেখেছেন মন দিয়ে, আর পেট গুড়গুড় ভাবটা আবার ফিরে এসেছে। যাইহোক, রংচঙে জামাজুতো পরে তিনি রওনা হলেন, 'দুগগা দুগগা' বলে সি অফ করে এলাম তাঁকে, আর বুড়োবুড়িকে অনবরত মিছেকথা বলার জন্য ওয়ার্ম আপ করতে লাগলাম। মিছে কথা বলতে গেলে আমার চোখেমুখে একখানা কালচেমতো ছায়া চলে আসে, নিষ্পাপ প্রাণী হওয়ার সমস্যা, বুঝতেই পারছেন, এদিকে কোনওমতে সত্যিকথা বলে ফেললেই ওঁরা দুজন অটো ভাড়া করে ঋষিকেশ পৌঁছে ভিনদেশী জাম্প মাস্টারকে তল্পিতল্পা সমেত দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন, আমার মিছে কথা বলতে না পারার দায় সে ভদ্রলোক বইবেন কেন খামোখা! মা গঙ্গাকে আবার পেন্নাম ঠুকে মানুষদুটোকে মিছে কথায় ভুলিয়ে রাখতে হলো।

ওদিকে তখন কত্তামশাই পৌঁছে গিয়েছেন ঋষিকেশের তপোবনে, পুরাকালে তপোবন-চত্বরে পুণ্যাত্মা সন্ন্যাসীরা আশ্রম-টাশ্রম গড়তেন, আর কলিকালের তপোবনে আপিস খুলে বসেছেন ঝাঁপদোলনার কলকাঠি নাড়ার কোম্পানি জাম্পিন হাইটস। বাঞ্জি জাম্পিং-এর পাশাপাশি তাঁরা ফ্লাইং ফক্স, জায়ান্ট সুইং ইত্যাদি নানাবিধ খেলাধুলোরও ব্যবস্থা করেন সিংহহৃদয় অকুতোভয় পর্যটকদের জন্য। ঋষিকেশ থেকে প্রায় ঘন্টাখানেক গেলে পাওয়া যায় নীলকণ্ঠ মহাদেব মন্দির, তার কাছেই এইসব সাহসী খেলাধুলোর পীঠস্থান। মহাদেবের আশীর্বাদ নিয়ে তবেই না এসব ভয়ানক খেলাধুলোয় নাম লেখানো উচিত!

তপোবন থেকে কোম্পানির একখানা হলদে রঙের বাসে করে কত্তামশাই চললেন সেই পীঠস্থানের পানে, সে বাসে সহযাত্রী দুটি মেয়ে। কত্তা প্রথমে ভেবেছিলেন তারাও বুঝি বাঞ্জি জাম্প করতেই যাচ্ছে, মনে ভরসা এসেছিল খানিক, পরে শুনলেন ওরা যাচ্ছে ফ্লাইং ফক্স সেজে তারে ঝোলানো খাঁচায় ঢুকে ওড়াউড়ি করতে, বাঞ্জির মক্কেল তিনিই একা। সামনে আরেকটা বাস যাচ্ছিল, তাতে লোকজন ভর্তি। সেই দেখে তো তিনি খুব খুশি। অ্যাত্তো লোকের মধ্যে চার পাঁচজন ঝাঁপদোলনা খেলবে নিশ্চয়ই। ড্রাইভার ভুল ভাঙালো,
" ও সব তো স্টাফলোগ হ্যায় জী, হামারা ক্রু মেম্বারস।"

তাঁর ততক্ষণে গলা শুকিয়ে কাঠ। তিনি সত্যিই একা? বাঞ্জি জাম্পিং কি তার মানে বিরাট দু:সাহসের কাজ? হুট করে নাম না লেখালেই ভালো হতো কি? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন সাইটে পৌঁছে গেছেন, নাম, বয়স, ওজন, অসুখবিসুখ আছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, "ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলে কোম্পানি কোনও দায় নেবেন না, অমুককে খবর দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলবেন" জাতীয় বয়ানে সইসাবুদ করে গাইডের দেখানো রাস্তায় ওপরে উঠে একখানা হলদে খাঁচায় ঢুকে পড়েছেন। সেখানে সার বেঁধে বসে আছেন শখ করে ঝাঁপাতে আসা গুটিকয় সাহসী মানুষজন, সবারই মুখ শুকিয়ে এতটুকু। কত্তামশাইয়ের সামনেই ছিলেন একটি মেয়ে, তিনি বাঞ্জি লাফ দেবেন বলে এসেও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে শেষ অব্দি উড়ন্ত শেয়াল সেজেই খুশি রইলেন। তারপর আলাপ হলো মুম্বই থেকে আসা দুটি ছেলেমেয়ের সঙ্গে। মেয়েটি বসে বসে পা নাচাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গী তখন ঝাঁপ মেরেছেন।
"এক্সাইটেড?" হাঁটু নাচাতে নাচাতে তাঁর প্রশ্ন।
"নো:, স্কেয়ার্ড!"
"ডরনে কা কেয়া হ্যায়? যা কে সির্ফ কুদ যানা হ্যায়, ব্যস!"
মারাঠা-তনয়ার এহেন কনফিডেন্স দেখে আমার কত্তামশাইয়ের বঙ্গজ সত্ত্বা চমৎকৃত। 'হাম কিসিসে কম নেহি ' ফিলিং মনের মধ্যে নেড়েচেড়ে নিজেকে চাগিয়ে তুললেন তিনি। সেই মেয়ে ঝাঁপাতে যাওয়ার পরেই ওঁর পালা। তিনপ্রস্থ দড়ি বাঁধাবাঁধি সেরে, ঘাড়ে বুকে কোমরে পায়ে নানা রকমের বকলস বেঁধে সেইসব বকলস ধরে টেনেটুনে জাম্প মাস্টার দেখে নিয়েছেন ঝুলন্ত অবস্থায় দড়ি ছিঁড়ে 'খানখান' হওয়ার আশঙ্কা কতখানি, আমার উনিও ভয়ে খাবি খেতে খেতে বাঞ্জি জাম্পের ভালোমন্দ সম্পর্কে শুধিয়েছেন জাম্প মাস্টারকে, তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে ঠ্যালা মেরে ঝাঁপাতে বাধ্য করা হয় না কাউকেই, সেটা নাকি স্পোর্টসম্যানশিপের বিরোধী।
একটু আগে এক বীরপুঙ্গব নাকি ঝাঁপানোর আগে কাঁপা গলায় জাম্প মাস্টারকে বলেছিলেন জাম্প মাস্টার নিজেই যদি তাঁকে ঠেলে খাদে পড়তে সাহায্য করেন, তবে ভালো হয়। নিজে নিজে ঝাঁপাতে তাঁর পা কাঁপছে। জাম্প মাস্টার তাঁকে সটান 'না' বলে দিয়েছেন।
ঠিকই তো, খাদের ধারে ঠ্যালা মেরে ফেলে দেওয়া তো সিনেমার ভিলেনদের কাজ, জাম্প মাস্টার অমন বেয়াড়া কাজ করবেন কেন? তিনি পায়ে দড়িবাঁধা মানুষটিকে যত্ন করে ধরে নিয়ে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের ধারে দাঁড় করিয়ে তার পিঠে আলতো করে হাত ঠেকিয়ে দুই সেট 'ফাইভ ফোর থ্রি টু ওয়ান ' গোনেন, আর বলে দেন কাউন্টডাউন শেষ হলেই নিজেকে পাখি ভেবে দুদিকে হাত ছড়িয়ে টুক করে ঝাঁপ দিয়ে ফেলতে হবে। দুই সেট কাউন্টডাউনের পরেও যদি কেউ ঝাঁপাতে ভয় পান, তবে দড়িদড়া খুলে তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়, টাকাপয়সা ফেরত পাওয়ার কোনও গল্প নেই।

না ঝাঁপালেও টাকা ফেরত হবে না, একথা শুনেই কত্তা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। কি জানি, পয়সাকড়ির বাজে খরচা হওয়ার আঁচ পেলেই আমার চাঁদপানা মুখখানা তেলোহাঁড়ি হয়ে যায়, একথাও মনে পড়ে গিয়েছিল হয়তো, মোটকথা তিনি ভারি উদ্বুদ্ধ হয়ে 'জীনে কে হ্যায় চারদিন, বাকি হ্যায় বেকার দিন ' কিংবা 'থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে' জাতীয় কিছু বিড়বিড় করতে করতে এগোলেন অকুস্থলের দিকে।

তার পর? তারপর অ্যাড্রিনালিনের ক্রমাগত ক্ষরণ, (হরমোন গ্ল্যাণ্ডের ওভারটাইমের চার্জ চাওয়ার খ্যামতা থাকলে সেদিন চাইতোই, আমি শিওর) কাউন্টডাউন বিগিনস অ্যান্ড এন্ডস, হুউউউ হাআআআ ধ্বনি, এবং..... ঝপাং! ঝাঁপ দিলেন তিনি, বহুদিন ধরে মনের কোণে লালিত স্বপ্ন আজ সফল হলো তাঁর। বলিহারি যাই বাপু অমন স্বপ্নের! সে যাকগে, স্বপ্ন মানুষের নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, অন্য লোকের, সে হোক না কেন অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা বউ, তারও কিচ্ছুটি বলার হক থাকে না।

বাঞ্জি জাম্পের নিয়ম হলো প্রথম ঝাঁপের পর পায়ে বাঁধা ইলাস্টিক দড়িটা তোমায় খেলিয়ে খেলিয়ে নিয়ে বেশ কিছুদূর নামবে, তারপর আবার দড়ির ইলাস্টিসিটি তোমায় টেনে তুলবে ওপর দিকে, তারপর আবার নীচে নামাবে। এরকম বারতিনেক ওপর নীচ করে ল্যাজে, থুড়ি, দড়িতে খেলার পর আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে থাকবে তুমি। সেখানে পাহাড়ী গঙ্গার ধারে মাচা বেঁধে ওঁত পেতে বসে আছেন ঝাঁপদোলনা কোম্পানির লোকজন। তাঁরা একখানা ঘুরন্ত লাঠি তোমার হাতের নাগালে এগিয়ে দিয়ে তোমায় আস্তে করে পেড়ে এনে খুলে নিয়ে মাচায় শুইয়ে দেবেন। তারপর হাত ধরে দাঁড় করিয়ে পায়ের থরোথরো কাঁপুনি থামার সময় দিয়ে এক বোতল জল গিফট করবেন তোমায়। উঁহু, কেবল জল নয়, আরও আছে। একখানা গোলমতো ব্যাজ, যাতে লেখা রয়েছে, শখ করে পাহাড় থেকে লাফানোর ধক তোমার বুকে রয়েছে। আর দেওয়া হবে একখানা তেলা সুন্দর শক্তপোক্ত কাগজে লেখা সার্টিফিকেট, যেখানে লেখা আছে, তুমি বিনা প্ররোচনায় এবং বিনা ঠ্যালায়, 'জাম্পিন হাইটস'-এর তত্ত্বাবধানে সফলভাবে বাঞ্জি জাম্প করতে পেরেছ, এবং নিজের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা টারজান নামক ভদ্দরলোকটিকে (তুমি মহিলা হলে খুঁজে পেয়েছ নিজের মধ্যে থাকা জেন নামের এক বীরাঙ্গনাকে, তিনি কে, আমি জানি না) উপলব্ধি করতে পেরেছো।

এসব অ্যাডভেঞ্চার সেরে আমার কত্তামশাই যখন হরিদ্বারে ফিরলেন, এবং বাবা-মাকে ঘটনাটা জানালেন, তখন সে যে কি কাণ্ড হলো, সে আর বলার নয়। সব শুনেটুনে শ্বশুরমশাই তো পুজো দিয়ে আসবেন বলে বেরিয়েই পড়ছিলেন। ঝাঁপদোলনা খেলার সাড়ে তিন মিনিটের ভিডিও দেখে তাঁদের চোখ যখন ছলছল করছে, তখন সযত্নে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে ছেলে ঘোষণা করলেন, "আমি, অর্থাৎ শ্রী অমুকশঙ্কর অমুক, আজ, পুণ্যতীর্থ হরিদ্বারে গঙ্গাতীরে বসে শপথ নিলাম, আমার পরবর্তী লক্ষ্য হবে স্কাইডাইভিং। একলা ট্রেকিং, ওড়া, পাহাড় থেকে ঝাঁপ ইত্যাদির পর আমার মুকুটে গুঁজতে বাকি রইলো কেবল উড়ন্ত এরোপ্লেন থেকে ঝাঁপানোর পালকটি। আজ থেকে শুরু করলাম ভাঁড়ে মা-লক্ষ্মীর আসন পাতার কাজ।" বলেই একখানা নয়া টাকা মানিব্যাগের এই পকেট থেকে ওই পকেটে চালান করে কৌটো খুলে একমুঠো বাদামভাজা তুলে নিয়ে চিবোতে লাগলেন।

।।বাঞ্জি-পুরাণ কথা সমাপ্ত।।

Wednesday, 25 July 2018

বিজলিঘরের কারিগরেরা

চারপাশে বেজায় পুজো-পুজো গন্ধ। আকাশ ঘন নীল কিংবা মেঘ-কালো যা-ই হোক না কেন, বাঙালির পুজোর আনন্দ তাতে কমে না। আর শুধু বাঙালিই বা বলি কেন, দেশের নানা কোণেই তো এই মরসুমে পুজোর আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। জন্মাষ্টমী-গণেশ চতুর্থী থেকে সেই যে পুজো-পার্বণের হুল্লোড় শুরু হয়, দীপাবলী-ভাইফোঁটা পার করে শীতের হাওয়া গায়ে লাগলেও তার রেশ ফিকে হয় না। আর কে না জানে, উৎসব মানেই আলো, দিনের আলো না ফুরোতেই প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে, রাস্তার দু’পাশে, আমার-আপনার-সবার বাড়িতে সর্বত্র জ্বলে ওঠে হরেক কিসিমের মন-ভোলানো চোখ-ধাঁধানো আলোর মালা। এই সময়ে সন্ধেবেলায় হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার করে ঝুপ করে লোডশেডিং হ’লে কেমন লাগে বলুন তো? তেড়ে গাল পাড়তে ইচ্ছে করে না ‘ইলেক্ট্রিক অফিস’-এর লোকজনকে? ঠিক যেমন রাস্তায় বেরিয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকালে ট্রাফিক পুলিশের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করা ‘নিয়ম’, কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে যদি শোনেন এমার্জেন্সি ও. টি অ্যাটেণ্ড করতে হচ্ছে ব’লে ডাক্তার দু’ঘণ্টা পরে আসবেন, তখন যেমন ডাক্তারবাবুর ‘টাকার খাঁই’-কে তুলোধনা করেন মনে মনে, ঠিক তেমনই ‘ঠাণ্ডা ঘরে বসে পা নাচানো’ লোকগুলোর ‘ক্যালাসনেস’-এর কারণে পাওয়ার-অফের হুজ্জোতি পোহাতে হচ্ছে পুজোর সময়েও, এই ভেবে তিতিবরক্ত হই না কি আমরা?

কিন্তু জানেন কি, পুজোর মরসুমে যাতে আমরা আলো-ঝলমলে রাস্তায় নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারি, তার জন্য শহর থেকে অনেক দূরের কতগুলো কারখানায় ওইসময় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজকর্ম চলে? সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেককেই পোশাকি ভাষায় ইঞ্জিনিয়ার বলা হয়, সেই ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে কিছুজন হিমশীতল একটা ঘরে সারাদিন কাটান, আট থেকে দশঘণ্টা ঠায় কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে, মাথায় বরফ চাপিয়ে, এক মুহূর্তের জন্যেও চেয়ার ছেড়ে ওঠার উপায় নেই তাঁদের। বাকিদের সারাদিন দৌড়ে বেড়াতে হয় সারা কারখানার বিভিন্ন এলাকা জুড়ে, কাউকে হয়তো নব্বই মিটার উঁচুতে উঠতে হলো, আবার কাউকে মাটির নিচে তিরিশ মিটার নামতে হলো। কিন্তু, কারখানাগুলোয় কি এমন দরকারি জিনিস তৈরি হয়, যে, পুজোর ক’টাদিন সেখানে ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়?

যে জিনিসটা না হলে ইদানীং কালে আমাদের চোখে আঁধার ঘনাচ্ছে, সেই অমূল্য রতন বিদ্যুৎ তৈরি হয় শহর থেকে অনেক দূরের ঐ কারখানাগুলোতে। এদিকে আবার বেশিরভাগ বিদ্যুৎ-কারখানার কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা থাকে কারখানার কাছাকাছি অঞ্চলেই, সেগুলোও জনবসতির কাছাকাছি নয়, পুজোপার্বণের রোশনাই সেখানে খুব বেশি পৌঁছায় না। উৎসবের দিনগুলোয় সবারই ইচ্ছে করে কাজ থেকে একটু ছুটি নিই, দুটোদিন বাড়ির লোকের কাছে থাকি, বাচ্চাদের সঙ্গে হৈ-হৈ করি, কিন্তু, ওই যে বিদ্যুৎ তৈরির কারখানা, সেখানে ইয়াব্বড় এক উনুনে গরম জলের হাঁড়িতে অষ্টপ্রহর জল ফুটছে, ফুটন্ত জলের বাষ্প পাইপ বেয়ে গিয়ে টারবাইন নামের একটা মস্ত বড়ো চাকা জাতীয় বস্তুকে অনবরত ঘুরিয়েই চলেছে, সেই ঘূর্ণন আবার কোন্‌ বিচিত্র পদ্ধতিতে জেনারেটর নামক একটি যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করছে মহামূল্যবান সম্পদ বিদ্যুৎ। তারপর তাকে গুনে-গেঁথে মাপ করে কমিয়ে বাড়িয়ে গুচ্ছখানেক তারের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয় ন্যাশনাল গ্রিড নামক ভয়ানক জটিল একটা ব্যবস্থার কাছে। সেই গ্রিডই নাকি সারা দেশের কোথায় কত বিদ্যুৎ পৌঁছোবে তার মাপজোক করে দেয়। এই গ্রিডে বিদ্যুৎ পাঠানোর কাজ চুকলে তবে কারখানার কর্মীদের কাজ শেষ, কিংবা হয়তো শেষ নয়, কারণ এই যে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রিডে পাঠানো—এই কাজটা তো চব্বিশ ঘণ্টা ধ’রে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই চলতে থাকে। উৎসবের দিনগুলোয় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে আকাশছোঁয়া, একমুহূর্তের জন্যেও চাহিদার চেয়ে জোগান কম হলে চলবে না। সে যদি পুজোর মুখে হঠাৎ বর্ষায় জ্বালানি কয়লা ভিজে স্যাঁতসেতে হয়ে যায়, ভেজা কয়লায় যদি উনুনে আগুন না জ্বলে, তবুও পুজোর রোশনাই কম হলে গোলমাল বেধে যাবে চারপাশে। এবার ভিজে কয়লা কেমন করে শুকিয়ে খটখটে ক’রে তা দিয়ে আগুন জ্বালা হবে, সে ভাবনা আমাদের নয়, ওসব ভাববে ‘ঠাণ্ডা ঘরে বসে থাকা’ লোকগুলো। আমাদের কেবল বাড়িতে-প্যাণ্ডেলে আলোর ঝলকানি আর রাতভর হুল্লোড়ের ব্যবস্থাটুকু হ’লেই হলো। প্রদীপের আলোটুকু পেলেই আমরা খুশি, সলতে পাকানোর গল্পে আমাদের কাজ কী?

তবে কিনা যাঁরা এই সলতে পাকানোর কাজটি করেন, তাঁরাও তো আমাদেরই মতো শখ-আহ্লাদপূর্ণ জীবন কাটাতে চাওয়া কয়েকটি সাধারণ মানুষ, তাই পুজোর দিনগুলোতেও তাঁরা মুখটি বুজে কাজ সামলে চলেছেন, ভাবলে মনটা কেমন হয়ে যায়। ঠিক যেমন দমকলকর্মী, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, অনেকটা তেমনই এঁদের কাজটাও জরুরি পরিষেবার অঙ্গ।

ধরুন আজ দুর্গাপুজোর সপ্তমী,বাড়িতে বছর পাঁচেকের মেয়েটা নতুন জামা পরে বারবার বাবাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছে, বাবা কখন বাড়ি আসবে, কখন ঠাকুর দেখতে বেরনো হবে, ওদিকে বাবা তখন অফিসে সেই কম্পিউটারগুলোর সামনে বসে একনাগাড়ে কতগুলো বোতাম টেপাটিপি করে চলেছে। তার কাছে তখন পুজো মানে সে যতক্ষণ ওই চেয়ারে বসে আছে ততক্ষণ বিজলী তৈরির কাজটাকে সুষ্ঠুভাবে চালানো। মেয়ের হাসিমুখ দেখার চেয়েও এই কাজটা সেই মুহূর্তে তার কাছে বেশি দরকারি।

এবারে আসা যাক ছুটির কথায়। পুজো-দীপাবলীতে বিদ্যুৎ-কর্মীদের যে একেবারেই ছুটি মেলে না, এটা বলা উচিত নয়। অমনটা করলে চলবে কিভাবে? কারখানার বাইরেও পরিবার, বাড়ি, সামাজিকতা—এসবও তো আছে নাকি? এই যে অষ্টপ্রহর কারখানায় শ্রমদান, সে হোক না ঠাণ্ডা ঘরে বসে সুইচ টেপা, তাতেও মাথার পরিশ্রম কম হয় না, তা সেই শ্রমদানের বিনিময়ে মাসের শেষে যে টাকাটা পাওয়া যায়, সেটা তো ঐ পরিবার আর সমাজ-সামাজিকতার জন্যই জোগাড় করা! যে লোকটার দেশের পৈতৃক ভিটেয় বহুকালের দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যেতে পারে সে গিয়ে পুজোর ক’টাদিন তদারকি না করলে, তার কি ঐ চারদিন ছুটি না নিলে চলবে? চাকরি পাওয়ার আগের সেই সংগ্রামের দিনগুলোয় সে হয়তো মনে মনে মা দুগ্‌গাকে বলে রেখেছিল, “একবার চাকরিটা পেতে দাও মা, কাঁধ পেতে পুজোর চারদিনের সব কাজ তুলে দেব সুষ্ঠুভাবে”, পুজোর খরচের টাকাটুকু পাঠিয়ে কর্তব্য সারলে তার কি মন ভরে?

কিংবা ধরো যে ছেলেটার বোন পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল স্বামীর হাত ধ’রে, পাঁচ বছর পরে কোলে দেড় বছরের ছেলে নিয়ে দেশে আসছে পনেরোদিনের জন্য, দীপাবলী আর ভাইফোঁটায় বাবা-মা-দাদার সঙ্গে বাড়িতে থাকবে ব’লে, সেই ছেলেটা ঐ ক’দিন বাড়ি না গিয়ে থাকে কেমন করে?

তাই পালা-পার্বণে ছুটি মঞ্জুরের প্রসঙ্গ উঠলে দেখা হয় ছুটির প্রয়োজন কার বেশি। এমনিতেই সারা বছরই এর-ওর ছুটির প্রয়োজন হয়, আজ এঁর বিয়ে, কাল ওঁর মেয়ের বিয়ে, পরের সপ্তাহে কারও ছেলের ভিনরাজ্যে কলেজে ভর্তি হ’তে যাওয়া, কিংবা আরেকদিন কারও মায়ের চোখ অপারেশন, এমন সব কারণে ছুটির প্রয়োজন বছর-ভর চলতেই থাকে। যার যখন বেশি দরকার তখন তাকে ছুটি নিতে দেওয়া হয়, তবে কারখানা তো চব্বিশ ঘণ্টা চালাতেই হবে, তাতে ফাঁকি পড়লে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধবে, কাজেই কোনও একজন ছুটি নিলে তার কাজের দায়িত্ব নিতে হয় অন্য কাউকে। সেটা কেমন?

কারখানা সাধারণত চলে তিনটে শিফ্‌টে। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হওয়া মর্নিং শিফ্‌ট, ভরদুপুরে শুরু হওয়া ইভনিং শিফ্‌ট, আর রাতভর চলতে থাকা নাইট শিফ্‌ট। ধরো, প্রত্যেক শিফ্‌টে চারজন কম্পিউটারে বসা ইঞ্জিনিয়ার (অর্থাৎ কন্ট্রোল ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ার) আর ছ’জন টহলদারি করা ইঞ্জিনিয়ার (এঁদের ভালো নাম ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার) থাকবেন, এমনটা নিয়ম। এবার কোনও একদিন ইভনিং শিফ্‌টে একজন ডেস্ক ইঞ্জিনিয়ার ছুটি নিলেন। তখন কাকভোরে কারখানায় ঢোকা একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ইভনিং শিফ্‌টের কাজও ক’রে দিতে হবে, অর্থাৎ তিনি একটানা ষোলো-সতেরো ঘণ্টা ঠায় কম্পিউটারের সামনে ব’সে মাথা খেলিয়ে যাবেন। কেউ ছুটি নিলে তাঁর কাজের দায়িত্ব কে নেবেন, তাঁর একটানা কাজ করে দেওয়ার পরের পাওনা ছুটি আবার কেমন করে তিনি জোগাড় করবেন, সেসব ভারি জটিল হিসেব, ও বোঝা আমাদের কম্ম নয়। যাঁদের গরজ তাঁরা বুঝে নিয়ে কাজ চালাতে থাকেন।

তা, দোল-দুর্গোৎসবের ছুটিগুলোও এমনভাবেই ঝুলিতে জড়ো করা হয়। ধরো, কেউ ছুটি পেলো ষষ্ঠী-সপ্তমী, সে হয়তো ঐ দু’দিনের ছুটি জোগাড়ের জন্য পঞ্চমীর দিনে ষোলো ঘণ্টা আপিস করল, আবার অষ্টমীর দিনে কারখানায় গিয়ে ফেরত এল নবমীর সকালে। আবার কেউ হয়তো ভাইফোঁটার দিনের ছুটিটায় বাড়িতে থাকতে পেলো ঠিকই, তবে তার আগের দু’রাত তাকে জেগে কাটাতে হলো কারখানায়। সে মানুষটার ঘুমের ঘোর কাটতে কাটতেই ভাইফোঁটার সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল।

এই হলো এই মানুষগুলোর জীবনের রোজনামচা। আলো গড়ার কারিগর এঁরা। বাইরে থেকে দেখলে ভারি সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা মনে হয় এঁদের ঘর-গেরস্থালীকে। কেমন গাছের ছায়ায় ঘেরা ছিমছাম উপনগরে বাস এঁদের আর এঁদের পরিবারদের। কোম্পানির দেওয়া ঘর-বাড়ি, নামমাত্র খরচে বিদ্যুৎ-জল ইত্যাদি পরিষেবা, দিব্যি কোম্পানির গাড়িতে চেপে সুখকর অফিসযাত্রা --- বাইরে থেকে দেখলে বেশ লাগে, ঈর্ষাও জাগতে পারে মনে, কিন্তু পর্দা সরিয়ে অন্দরে উঁকি দিন, দেখতে পাবেন আমাদের বিদ্যুৎ-নির্ভর আধুনিক জীবনযাত্রাকে আরও মসৃণ করে তুলবেন ব’লে ঐ আপাত-সুখটুকুর আড়ালে মানুষগুলো কেমন দিন-রাত্রি একাকার করে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন।।

(অক্ষর পত্রিকা, শারদ সংখ্যা ২০১৭ তে প্রকাশিত )

Friday, 23 March 2018

উদযাপন



তিনবাটির টিফিন ক্যারিয়ারটা ব্যাগের মধ্যে ভরে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছোটি ম্যাডামের মহল থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে হাঁটা লাগালো সাবিত্রী। অন্যদিন যাহোক ডালভাত রেঁধে টিফিনবাক্সয় পুরে নিয়ে যায়। আজ তো আর তেমন করলে চলবে না, আজ যে ফেব্রুয়ারির চোদ্দ তারিখ! আজ এবাড়িতে হরেক কিসিমের রান্নাবান্না, মাছ মুর্গি মটনের গন্ধে চারিদিক ম ম করছে, ওবেলা দলে দলে লোক আসবে দামী দামী ফুলের তোড়া হাতে করে, বাড়িতে থাকলে কল্যাণও কেমন সুন্দর এসব তাক লাগানো ব্যাপারস্যাপারে ভাগ নিতে পারতো! সবই কপাল সাবিত্রীর। আউটহাউসের বাইরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে সে। তাদেরও তো আজকের দিনেই মালাবদল হয়েছিল, ছোটি ম্যাডাম ছোটাসাবের বিয়ের পরেই, ওই লগ্নেই। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ব্রাহ্মণত্বের অহঙ্কার ভুলে গিয়ে সাবিত্রীর বাবা কল্যাণ বাউরিকে জামাই হিসেবে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তাই সাবিত্রী তার বাড়ির ঠিকানা মন থেকে মুছে ফেলে কল্যাণের হাত ধরে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল পাঁচ বছর আগে, আজকের দিনেই। সেদিন ছোটাসাবের বিয়ে, চৌধুরী সাব লোক ভালো, ওই হট্টগোলের মাঝেও কল্যাণ আর সাবিত্রীর মুখ চুন করে এসে দাঁড়ানো দেখে, সব কথা শুনে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওইদিন তাঁর ছেলের বিয়ে হয়ে গেলে ওই আসনেই কল্যাণ মন্ত্র পড়ে সাবিত্রীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেবে। কল্যাণের বাকি দুই কূলেও কেউ ছিল না, কাজেই 'ঝট মাংনি পট বিহা'র জবাবদিহি কাউকেই করতে হয়নি। তারপর কেটে গেছে পাঁচ বছর, কমলা এসেছে ওদের কোল জুড়ে, চৌধুরী ইণ্ডাস্ট্রিজের দুই মালিকের খাস ড্রাইভার তখন কল্যাণ, শাকেভাতে বেশ কাটছিল ওদের দিনকাল, অন্তত এই ছমাস আগে পর্যন্তও।

ভাবনার ঘোরেই হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন চৌধুরী ভিলা ছেড়ে বেরিয়ে এসে অটোস্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়েছে সাবিত্রী, সামনের অটোটা স্টার্ট দিয়ে কাছে এসে দাঁড়াতে হুঁশ ফেরে তার।

"আরে ও বউদি, কি অত ভাবছেন? অত ভাবলে মাথা কাজ করবে না আর। দেড় বচ্ছর বাদে দাদা ফেরা অব্দি মাথাটা ঠিক রাখতে হবে ত, নাকি? নিন নিন, উঠুন জলদি, আজ পোচ্চুর প্যাসেঞ্জার!"

পাড়াতুতো দেওর প্রদীপের অটোয় উঠে বসে সাবিত্রী। গন্তব্য আর নতুন করে বলার কিছু নেই, প্রদীপ সবই জানে। শুধু প্রদীপ কেন, গত ছমাস ধরে এ মহল্লার প্রত্যেকটা লোক জানে রোজ দুপুরে সাবিত্রী কোথায় যায়, বছর দেড়েক পর কল্যাণের কোত্থেকে ফেরার অপেক্ষায় সাবিত্রীকে এখন চৌধুরী ভিলায়ছোটি ম্যাডামের রাতদিনের ঝিয়ের কাজ করতে হচ্ছে, সবাই সব জানে।

অটোয় প্রায় আধঘণ্টার রাস্তা, শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত। আজ রাস্তায় একটু বেশিই ভিড় চোখে পড়ছে, বিশেষ করে অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েদের। জোড়ায় জোড়ায় জেন্টস সাইকেল -লেডিস সাইকেল পাশাপাশি, কিংবা একই সাইকেলে দুজনে দুজনের গা ঘেঁষে বসে, গালে গাল ঠেকিয়ে চলেছে সব, কোন চুলোয় কে জানে? এই ভরদুপুরে এত পীরিত জাগছে কোত্থেকে, ভগবান জানেন! মনে মনে গজগজ করতে করতে তিনবাটির টিফিন ক্যারিয়ারটা আঁকড়ে ধরে সাবিত্রী। আজ দইমাছটা খুব মন দিয়ে রেঁধেছে, লোকটা খুশি হবে তো খেয়ে?

ম্যাডামরা বলছিল বোনলেস কিসব রাঁধতে, এত বড় কাতলার আবার ওসব ভাল্লাগে নাকি? সে জোর করে ছোটি ম্যাডামকে বলেছে সে দইমাছই রাঁধবে, তার হাতের দইমাছ একবার খেলে আর ভুলতে পারবে না কেউ। ছ'মাস আগের ঘটনাটার পর থেকে ছোটি ম্যাডাম তার কাছে মুখ তুলে বা জোর গলায় কিছু বলতে পারে না, আর তার কমলাকে এমনভাবে আগলায়, যেন নিজের পেটের মেয়ে। ম্যাডামের নিজের এখনও ছেলেপুলে হয়নি, ডাক্তার দেখাচ্ছে নাকি, কানাঘুষোয় শুনেছে। আগে হলে বাঁজা মেয়েমানুষের অন্যের বাচ্চার ওপর এত দরদ সাবিত্রী সাদা চোখে দেখত না মোটেই, কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। কমলার ওপর ম্যাডামের টান বাড়লে যদি সাবকে বলে কল্যাণকে দুমাস আগেও বাড়ি ফেরাতে পারেন!

মুন্সিপালিটি বাজারের পাশ দিয়ে অটোটা যাওয়ার সময় প্রতিদিনের মতোই আজও সাবিত্রী কাঠ হয়ে বসে ছিল, দেখব না দেখব না করেও চোখ পড়ে গেল বাজারগেটের সামনের পানগুমটিটার দিকে। এই দোকানটাতেই ধাক্কা মেরেছিল ছোটাসাব, ছ'মাস আগের এক সন্ধেয়, গয়নার দোকান থেকে ফেরার সময়। ড্রাইভার কল্যাণকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালানোর শখ হয়েছিল তাঁর সেদিন। রঙিন চোখ, নাকি চশমার অভাবে, কেন সাবিত্রী জানে না, পানদোকান ভেঙে তার মালিকের ঘাড়ে আরামসে গাড়ি তুলে দিয়েছিলেন তিনি। ঠিক তেমনিভাবেই, থানাপুলিশ যখন হলো, নিজের সব দোষ তিনি অবলীলায় তুলে দিয়েছিলেন কল্যাণের ঘাড়ে।

সাবিত্রী আজও জানে না, ঠিক কি কারণে কল্যাণ এতবড় একটা মিথ্যে অপবাদ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে দু'বছরের শাস্তিভোগ করছে সদরজেলে। যতবার জিজ্ঞেস করেছে, কল্যাণের এক উত্তর, "তোদের বাঁচাতে চাই, তাই।"

অবশ্য শুনেছে নাকি জেল হয়েছিল আরও কয়েক বছরের জন্য, বড়াসাবের অসীম দয়া, তাঁর পরিবারের সম্মান বাঁচানোর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি কলকাঠি নেড়ে সে শাস্তি দু'বছরে কমিয়ে এনেছেন। সেই একই কৃতজ্ঞতার উদাহরণ হলো সাবিত্রীর এবাড়িতে রাতদিনের ঝিয়ের চাকরি পাওয়া। আজকের দিনে মেয়েসমেত খাওয়াপরা মানইজ্জত ইত্যাদির দায়িত্ব আত্মীয়রাই কেউ নেয় না, সেদিক দিয়ে এঁরা মহানুভব বৈকি! এমনকি এই যে সাবিত্রী রোজ দুপুরে জেলখাটা বরের জন্য খাবার বয়ে নিয়ে যায়, এও মেমসাব আর বড়াসাবের সুপারিশেই সম্ভব হয়েছে।

বাপরে, ফুলের দোকানগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে। স্কুলকলেজের ছেলেমেয়েদের ভিড় সব। বিরক্ত হতে গিয়ে সাবিত্রীর মনে পড়ে, আরে, তাদের বিয়ের দিনেই ভ্যালিন্টাইন দিনও না? বিয়ের আগে জানতো না, বিয়ের পরেই জানতে পারে আজকের দিনটা নাকি ভালবাসার দিন! অবাক হয়ে গিয়েছিল শুনে। ভালোও বাসতে হয় দিনক্ষণ দেখে! এ তো তার বাপের পাঁজি দেখে নিমবেগুন খাওয়ার মতো ব্যাপার! কল্যাণ বুঝিয়েছিল, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ভালবাসাকে মনে রেখে দেওয়ার জন্য এ হলো ভালবাসার উৎসব। তেমন কিছুই বোঝেনি সাবিত্রী, তবে দুবছর আগে এই দিনটায় কল্যাণ পায়ের আঙুলে পরার চুটকি এনে দিয়েছিল একজোড়া, মুখে রাগ দেখালেও মনে মনে ভারি খুশি হয়েছিল সে।

আগের কথা মনে করে ছোট্ট একটা নিশ্বাস পড়ে। তারপর মনে হয়, মনে রেখে দেওয়া নিয়ে তো কথা! আগেরবার কল্যাণ দিয়েছে, এবার নাহয় সেই দিক কিছুমিছু। কিন্তু জেলের গারদের ওপারে থাকা মরদকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে তথা বিবাহবার্ষিকীতে কি উপহার দেওয়া যায়, তা ভেবে কুলকিনারা পায় না বেচারি সাবিত্রী।

গন্তব্যে পৌঁছে অটো থেকে নেমে চোখ পড়ে পানের দোকানটার দিকে। এই তো, পেয়ে গেছে দেওয়ার জিনিস! লোকটা পান খেতে খুব ভালবাসতো, মোলায়েম মিঠাপাত্তির মিষ্টি পান, জর্দা কম দিয়ে। সাবিত্রীই রাগারাগি করে ছাড়িয়েছে একসময়, খরচা বেড়ে যাওয়ার ভয়ে। আজ সেই একখিলি মিঠা পান কিনে টিফিনবাটির ব্যাগে ঢুকিয়ে থানার ভেতর ঢুকে পড়ে সে, ঠোঁটে লেগে থাকে একচিলতে একটা হাসি, মায়ামাখা, একটু অন্যরকম।

আর তক্ষুনি, ব্রহ্মাণ্ডের কোনও এক কোণে বসে মুচকি হাসেন, কোনও এক সেইণ্ট ভ্যালেন্টাইন।।

(সমাপ্ত)

হারায়_না_তো_কিছু


"ওই ফর্সাপানা মেয়েটা কে গো দিদা, হিরোইনের মতো? আর সঙ্গে ওই কিরিম মাখা বাচ্চাটা?"

"ও মা, ও তো আমার মেয়ে, তোর তুতুলমাসি। বাচ্চাটা ওর ছেলে, আমার দাদুভাই। আজ কত বচ্ছর পর দেশে এসেছে, ক'মাস থাকবে এখন।"

"হ্যা:! ওইটা নাকি তোমার মেয়ে! তোমার মেয়ে তো ওই ফটোকের তুতুলমাসি, রোজ বিকেলে খেলে এসে তোমার কাছে বসে মাথায় তেল মেখে বিনুনি বেঁধে দুধমুড়ি খেয়ে পড়তে বসতো। এমন হিরোইনপানা মেয়ে কখনও মাথায় তেল দেয়? নাকি দুধমুড়ি খায়?"

"না রে পাগলি, ওটাই আমার মেয়ে, তোর তুতুলমাসি। তোরা আসার পরে আর আসেনি তো, তাই চিনতে পারছিস না। নে নে, অনেক বকেছিস, যা ওপর ঘর থেকে গ্রামার বইটা নিয়ে আয়, ক'টা ট্রান্সলেশন দিই।"

একটু পরে দৌড়ে দৌড়ে ঘরে ঢোকে ছোট্ট দুটো হরিণ-পায়ের মালকিন, হাতে গ্রামার বই আর আরেকটা মোটা বই।

"ও দিদা, ওই মেয়েটা 'আরে আরে জাগমোন ' জানে! আমিও বলতে পেরেছি দেখে হাততালি দিয়ে নেচে নিলো একপাক। আমি 'হুঁকোমুখো'ও বলতে পেরেছি, তাই আমায় এটা দিলো, আর বলল জাগমোন নয়, জগোমোহোন।"

"দেখলি! তোকে উচ্চারণ ঠিক করতে বলি, শুনিস না।"

 "এটা তো তুতুলমাসির বই দিদা, ও কেন দিলো এটা? তোমার মেয়ের বইয়ের আলমারি থেকে একটা করে বই নামাচ্ছিল আর শুঁকছিল, বুকে জড়াচ্ছিল আর চোখ মুছছিল, কেন গো? তুতুলমাসিও বইগুলোকে আদর করতো না এরম করেই, তুমি বলো মাঝেমাঝে? তাহলে কি এটাই তুতুলমাসি, হ্যাঁ দিদা?"

"হ্যাঁ রে বাবা হ্যাঁ। বিশ্বাস হলো এবার? মাথায় তেল আর দুধমুড়ি নেই, কিন্তু তোর তুতুলমাসি আছে, ঠিক সেইইরকম।"

(সমাপ্ত)

ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্য - kromosho prokashyo তে প্রকাশিত

Monday, 6 November 2017

খটকা


বিকেল হলেই আজকাল বাড়িটা বড় টানে ভবতোষকে। আগে যেমন সন্ধে হতেই টানতো ক্লাবঘরে তাসের আড্ডা, এখন তেমন করেই দুহাত বাড়িয়ে ডাকে ছোট্ট একতলা বাড়িটা।
এই বুঝি গিন্নি এলেন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, এসেই বুঝি ভবতোষের হাত থেকে রিমোটটা ছোঁ মেরে নিয়েই নিমেষে চ্যানেল বদলে ফুটবল থেকে পটলকুমারের গানে ঢুকে পড়বেন, মোক্ষম গোলখানাই আর দেখতে দেবেন না পতিদেবতাটিকে।
ভাবতে ভাবতেই খেয়াল হয়, আরে, পটল কুমার তো ক-অ-বে শেষ হয়ে গেছে, সেইসঙ্গেই মনে পড়ে, বড়ছেলেকে কালকেই দেখলেন কাবলের দোকান থেকে টুপি কিনতে, ন্যাড়া মাথায় রোদটা বেজায় ঝাঁঝালো লাগে কিনা!
আচ্ছা, এই পোড়া গরমে ছেলেটা ন্যাড়া হয়েছে কোন আক্কেলে? প্রশ্নটা মনে আসতেই সবকিছু মনে পড়ে যায় ভবতোষের।
কেবল একটা খটকা যায় না কিছুতেই। দুদিন আগেই অত খরচা করে দুই ছেলেতে বাপের শেষ কাজ করলো, তাতেও তাঁর শখসাধে ভরা আত্মাটি মুক্তি না নিয়ে রোজ বিকেল হলেই বাড়িটার পানে ধেয়ে যায় কেন?

গোলাপি তিমির বৃত্তান্ত



সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নীল তিমির ধাক্কায় টেক-স্যাভি গেমপ্রিয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে জীবন থেকে সরে যাওয়ার এক উদ্দাম প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে, মিডিয়ার কল্যাণে সে সংবাদ আমাদের সবার কাছেই পৌঁছেছে। সত্যি বলতে কি, নীল তিমি সংক্রান্ত খেলাটি সম্পর্কে আপনার বিন্দুমাত্র কৌতূহল না থাকলেও সাবধান করার অছিলায় সেটি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য আপনার মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও অনেকে নিয়ে ফেলেছে। তাই এই মারণখেলা নিয়ে বেশি কথা খরচ করছি না। বরং আজ একটা গোলাপি তিমির গল্প শুনব চলুন।

এই 2017-র এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে একটা খেলা শুরু করেছে Baleia Rosa (পর্তুগিজ ভাষায় গোলাপি তিমি) নামক একটি ওয়েবসাইট, ইতিমধ্যে সাড়ে তিন লাখের ওপর লোক তাদের ফেসবুকের পাতায় খেলাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন, খেলতে শুরুও করেছেন।

এইটুকু পড়ে ভুরু কুঁচকে ফেলেছেন তো? ভাবছেন আপদগুলো আবার একটা মরণফাঁদের গল্প শোনাতে এসেছে! আজ্ঞে না মশাই, এ কোনও মরণফাঁদ নয়, বরং নীল তিমির করালগ্রাস থেকে আমার আপনার আশেপাশের সদ্যযৌবন পাওয়া প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটা চেষ্টা বলতে পারেন, অন্তত পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টাদের বক্তব্য তাই। তা, কেমন এই খেলা?

ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতোই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমেও রয়েছে পঞ্চাশটি কাজের এক তালিকা, খেলব বলে তাদের খাতায় নাম তুললে আপনাকে টুকটুক করে সেইসব কাজগুলো একে একে সেরে ফেলতে হবে। তবে গোলাপি তিমির দেওয়া কাজগুলো অতীব জীবনমুখী।

হয়তো আপনাকে বলা হল রোজ একটা করে চিরকুটে লিখে ফেলুন সেদিন কি ভাল কাজ করলেন, তারপর সেটা জমা করুন লক্ষ্মীর ভাঁড়ে, এক বছর পর ভাঁড় ভেঙ্গে ভাল কাজের ডায়েরি পড়বেন।

কিংবা ধরুন বাবা-মা-পিসি-মাসি এঁদের সবাইকে আপনি কত্ত ভালবাসেন সেটা তাঁদের জানানোর দায়িত্ব পড়ল আপনার ওপর। তা, এদেশে তো গুরুজনদের জড়িয়ে ধরে 'ভালোবাসি' বলার চল বিশেষ নেই, কাজেই তাঁদের হাতে হাতে ক'টা কাজ করে দেবেন, নিদেনপক্ষে আধঘণ্টাটাক সময় বের করে তাঁদের মুখোমুখি বসে দুটো নিঃস্বার্থ কথা বলবেন, ওতেই ওঁরা আপনার ভালবাসা দিব্যি অনুভব করবেন।

আমাদের দেশে এখন জোরকদমে স্বচ্ছতা অভিযান চলছে। তাতেও উৎসাহ জোগানোর উপায় আছে গোলাপি তিমির কাছে। সারাদিনে একবারের জন্য হলেও যদি অন্য কারও রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা নিজে হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসেন, তবে আপনি একজন সফল খেলোয়াড়। বিনা কারণে রাস্তা পরিষ্কার রাখার দায় আমাদের না-ই থাকতে পারে, কিন্তু খেলায় জেতার বাসনায় তো অবশ্যই আমরা রাস্তা সাফসুতরো করে ফেলব, তাই না?

এমন ভালো কাজের তালিকা বেশ লম্বা, যেমন, নিজের অব্যবহৃত জিনিসপত্র দুর্গত মানুষের সাহায্যার্থে দান করা, মজাদার পোশাক পরে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা, মাঝেমধ্যে আয়নার ওপারের মানুষটার সঙ্গে হেসে রঙ্গতামাসা করা, যাতে বোঝা যায় সে সত্যিই ভাল আছে, মেঘের মধ্যে তুলোর ঝুড়ি বা ডাইনোসর লুকিয়ে আছে কিনা তা খোঁজা, মনের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে কাগজে এঁকে ফেলে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য চলতে শুরু করা, এবং সবার শেষে সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি, একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা। জীবন শেষ করে দেওয়ার চেয়ে জীবন বাঁচানো যে অনেক কঠিন কাজ সে তো আমরা সবাই জানি। গোলাপি তিমির ছুঁড়ে দেওয়া এই যে জীবন বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ, এটা যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার জীবনে হতাশা বলে সম্ভবত আর কিছু থাকবে না। যে মানুষটা হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিলো, তাকে আরেকটা জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনা, এই কাজটাই করতে চাইছে গোলাপি তিমি। তার দেওয়া আপাত বালখিল্য কাজগুলো এই উদ্দেশ্যেই তৈরি। বারবার 'তুমি ভালো, তুমি সুন্দর, তুমি কত কিছু করতে পারো!' এগুলো মনে করিয়ে খেলতে থাকা মানুষটার আত্মবিশ্বাসের ভিত পোক্ত করে দেয় সে, যেখানে হতাশার কোনও জায়গা নেই।

 2015 থেকে ওয়েবদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল নীল তিমির আক্রমণ, তার মোকাবিলায় 2017 তে এল গোলাপি তিমি। সাও পাওলোতে সরকারের পক্ষ থেকেও গোলাপি তিমির প্রয়াসকে সমর্থন করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বব্যাপী মারণখেলাকে কিছুটা হলেও রোখা যায়। ভারতেও থাবা বসিয়েছে নীল তিমি, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষেধক হিসেবে এখানেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমটাকে যদি নাও ব্যবহার করতে চাই, খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ভালো কাজের তালিকাকেও যদি রোজকার জীবনে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, তাতে আর কিছু না হোক, জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগাযোগ বাড়বে, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অকালে পরপারে পাড়ি দিতে চাওয়ার প্রবণতা তাতে কিছুটা কমতে পারে।।

********************

তথ্যসূত্রঃ
http://baleiarosa.com.br
http://indianexpress.com


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.708159399363905.1073741828.707552542757924/776736352506209/?type=3&source=54

পরিণতি



আধঘণ্টা আগে মধু ফোন করেছিল। কথা বলে ফোন কাটার পরেও সৃজা ব্যালকনিতেই বসে রয়েছে। মা দুবার এসে উঁকি দিয়ে গেছে। রিমির খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে নিজেই ভাত বেড়ে নাতনিকে নিয়ে বসেছে। রোজ মা- ই মেয়েটার পিছনে দৌড়ে বেড়ায় সারাদিন, রোব্বারগুলোয় তাই সৃজা চেষ্টা করে নিজেই রিমির কাজগুলো করতে, মায়ের বুড়ো হাড়ে কত আর সইবে! কিন্তু মধুর কাছে খবরটা পাওয়ার পর থেকে আর উঠতে ইচ্ছে করছে না, ইন ফ্যাক্ট মাথাই কাজ করছে না। মামণি! সেই মামণি, যাকে নিয়ে শুভ্র আর তার দাপুটে বাবাকে বরাবর হাসাহাসি করতে দেখেছে সৃজা, সেই নরম ভীতু মহিলা কাজটা পারলেন কি করে? এ তো আর মাছ চুরি করতে রান্নাঘরে ঢোকা বেড়ালকে ঠ্যাঙানো নয়, এই কাজটা করতে বুকে যতটা সাহস আর মনে যতটা রাগ পুষে   রাখতে হয় ততটা সাহস আর রাগ মামণির কাছে ছিল সেটা কল্পনাই করা যায় না। যে মামণি বিত্তবান রগচটা স্বামী এবং বাপের জুতোয় পা গলানো উকিল ছেলের চোখের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস কোনওদিন পাননি, তিনি এতখানি বল পেলেন কোত্থেকে?
মধু সৃজার স্কুলবেলার বন্ধুদের মধ্যে একজন। সত্যি বলতে কি, একরকম তার ঘটকালিতেই শুভ্র আর সৃজার বিয়েটা হয়েছিল। সে শুভ্রর মাসীর মেয়ে। বিয়ের পর যবে থেকে সৃজা দেহে মনে অব্যক্ত যন্ত্রণা ভোগ করতে শুরু করল, তখন থেকে মধু বেচারী মরমে মরে থাকে। বাল্যসখী বলেই মধুর কাছে মন খুলতো সৃজা, নইলে এসব কথা কি কাউকে বলতে আছে? তবে আরেকজনও বোধহয় মরমে মরে থাকত শুভ্রর কৃতকর্মের জন্য। গুমোট গরমের দিনগুলোতেও যখন পিঠে-হাতে বেল্টের বাড়ির দাগ ঢাকার জন্য সৃজা ফুল স্লিভ কলার তোলা জামা পরে রান্নাঘরে ঢুকত, মামণির কুণ্ঠিত দৃষ্টি তাকে বুঝিয়ে দিত, ছেলের কীর্তি মায়ের অজানা নেই। অসহ্য রাগে মাথা দপদপ করত তখন। এই মানুষটা এত শান্ত, নিজের কথা কোনওদিন জোর গলায় বলেননি বলেই আজ সবাই এঁর মাথায় চড়ে বসেছে। মা হয়ে ছেলেকে শাসন করেননা কেন? শ্বশুরমশাইয়ের আর শুভ্রর কত যে অন্যায় আদেশ মামণি মাথা পেতে নিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। স্বামী খেতে বসলে একটি একটি করে বাটি তাঁর থালার কাছে এগিয়ে দিতে হবে, রান্নার সোয়াদ কোনও একদিন স্বামীর মনোমত না হলে তিনি ভাতের থালায় জল ঢেলে উঠে যাবেন, সেই জলঢালা ভাতের পিণ্ডি গিলবেন মামণি, তাও স্বামীর জন্য নতুন কোনও সুস্বাদু পদ রেঁধে তাঁকে খাইয়ে তবেই। আর এই পুরো সময়টায় স্বামীর কাছে তাঁকে শুনতে হবে রোজগার না করে বাড়িতে বসে ভাত খাওয়ার খোঁটা। এমন ঘটনা সৃজা বহুবার দেখেছে। তার ঠোঁটে চলে আসা শক্ত জবাবগুলোকে সে অতি কষ্টে দমিয়ে রাখত শাশুড়ির মুখ চেয়ে। তিনি তাঁর মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করিয়েছিলেন, সৃজা যেন শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে চাপান উতোরে না যায়।
সৃজা কিচ্ছু বলত না শ্বশুরমশাইকে। শুধু একদিন, বোধহয় লক্ষ্মীপুজোর পরেরদিন কোর্ট খুলছে সেদিন, বাপ -ছেলেয় কোর্টে বেরোচ্ছে, বাপ দেখলেন জুতো দুটোয় ধুলো পড়েছে। তিনি একপাটি জুতো তুলে সপাটে ছুঁড়ে মেরেছিলেন মামণির গায়ের দিকে। সৃজা তখন প্রেগন্যান্ট। সেই অবস্থাতেও ও লাফিয়ে উঠে জুতোটা লুফে নিয়ে ঘটতে চলা পাপটা আটকেছিল। তারপর দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে বলেছিল সেই মুহূর্তে মামণিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। শ্বশুরমশাই বোধহয় তাকে মেরেই বসতেন, মামণি তাঁর পায়ে ধরে তাঁকে থামান। মজার ব্যাপার হল মামণির ছেলেটি কিন্তু এই ঘটনাটি দেখে স্রেফ মজা লুটেছিল , একটা কথাও বলেনি।
সেইদিনই দুপুরে মামণি সৃজাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, এই পোয়াতি অবস্থায় সে যেন ভুলেও বাপ-ব্যাটার কোনও কাজ বা কথার প্রতিবাদ না করে। অবাক হয়ে সৃজা কারণ জিজ্ঞেস করলে মামণি কাঁদতে কাঁদতে শুনিয়েছিলেন তিরিশ বছর আগের ঘটনা। তখন তিনি ছ'মাসের অন্তঃসত্ত্বা, এক রাতে স্বামীর কোনও এক গোপন অনুরোধ রাখতে না চাওয়ায় তাঁর স্বামী লাথি মেরে তাঁকে খাট থেকে ফেলে দেন, ফলতঃ প্রথম সন্তানের বিসর্জন ঘটে।
এই গল্প শুনে সৃজা স্থির থাকতে পারেনি। শুভ্র আর শ্বশুরের অমতেই সে রিমি হওয়ার আগের বাকি দিনগুলো বাপেরবাড়িতে থাকবে বলে চলে এসেছিল। সরাসরি সংঘাতের সেই শুরু। তবে বার ডান্সার রোশনি সিংয়ের রেপকেসটা আগুনে ঘিয়ের কাজ করেছিল কিছুটা। মাঝরাতে রাস্তা থেকে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে খেয়েছিল যারা, শুভ্র তাদেরই বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল আদালতে।  'খারাপ' মেয়েটাকে আরও খারাপ দেখানো যায় কিভাবে, তারই চেষ্টা করছিল মন দিয়ে। ঘেন্না, জাস্ট ঘেন্না করতো সৃজার, তখন লোকটার হাবভাব দেখলে। সম্ভবত সেই ঘেন্না থেকেই রোশনির পাশে দাঁড়িয়ে শুভ্রর বিরুদ্ধে লড়ার শক্তি পেয়েছিল ও। রিমি হওয়ার পর অবশ্য মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুদিন ওবাড়িতে থাকার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ততদিনে জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। শুভ্রকে দেখলে একটা অস্থির রাগ ছাড়া আর কোনও অনুভূতি হত না শেষদিকে। ভাগ্যিস সে চেপে রাখেনি রাগটাকে। চেপে রাখলে হয়তো মামণি আজ যে কাজটা করেছেন সেটা সে-ই করে বসতো!

নতুন পাখি পোষা হয়েছিল আগেই, ডিভোর্স পাকা হয়ে যাওয়ার পর শুভ্র তার নতুন পাখিকে নিয়ে রায়চক-ডায়মণ্ডহারবার পাড়ি দিতে শুরু করেছিল ফি-হপ্তায়, কানাঘুষোয় সৃজা খবর পেতো। মেয়েটির নাম বৃন্দা, বাবা মা নেই, টাকাপয়সাও নয়। কাজেই একে নিয়ে খেলতে শুভ্রর তেমন সমস্যা হচ্ছিলো না, মুশকিল বাধালো মেয়েটা নিজেই। কোনও এক উইকএণ্ড ট্যুরে বোধহয় ওষুধপত্র নিতে ভুলেছিল, সময়েরও গোলমাল হয়ে থাকবে হয়তো, টেস্ট রিপোর্ট দেখা গেল পজিটিভ। ব্যস, মাতৃত্বের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বৃন্দা বিয়ের জন্য ক্ষেপে উঠলো, নইলে যে বাচ্চা নষ্ট করতে হবে! বাচ্চাকে বাঁচানোর কথায় মানুষে আর পাখিতে বিশেষ তফাৎ নেই, জানা কথা। কাজেই লাস্যময়ী নতুন পাখি বৃন্দা নিমেষে গায়ের পালক ফুলিয়ে শুভ্রকে ধাওয়া করে পৌঁছে গেল তাদের বাড়িতে, শেষ ঠোকরটা দেবে বলে।

মধু সেদিন মাসীর কাছেই গেছে। তার সামনেই নাটক শুরু, এবং ক্লাইম্যাক্স। মামণি নাকি বৃন্দার কাছে সব কথা শুনতে শুনতে কেঁপে উঠছিলেন, আর তাঁর ছোট্ট ফরসা মুখখানা টকটকে লাল হয়ে উঠেছিল দেখতে দেখতে। মাসীর শরীর খারাপ লাগছে ভেবে মধু ওঁর হাতদুটো ধরে রেখেছিল শক্ত করে। উনি মধুর হাত ছাড়িয়ে  উঠে গিয়ে শুভ্রকে ডেকে আনেন ঘর থেকে। বলেন, বৃন্দাকে বিয়ের জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে নোটিশ ইত্যাদি দেওয়ার জন্য। ডাক্তার দেখানোর প্রসঙ্গও আনেন। তখনও তাঁর গলার স্বরে উষ্মার আভাস নেই।   এরপর শুভ্র জানিয়ে দেয় অন্যের মাল সে নিজের নামে পুষবে না। সেটা শুনে বৃন্দা ঝাঁঝিয়ে উঠলে রাগের মাথায় শুভ্র তাকে ঠেলে ফেলে দেয় মেঝেতে। শুভ্রর মায়ের হাতের কাছে ছিল দরজার খিল, উনি সেটা দিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে থাকেন তাঁর ছেলের পিঠে। প্রথমে শুভ্র আটকাতে চেষ্টা করে, কিন্তু মামণির গায়ে তখন হাজার হাতির বল ভর করেছে। মধুও আটকাতে গিয়ে পড়ে যায়। শুভ্রর বাবা গেছেন বন্ধুর বাড়ি। ওদিকে বৃন্দাও সব দেখে কেমন এলিয়ে পড়েছে,  মধু কি করবে বুঝতে পারে না। তার মাসী তখনও শুভ্রকে মারছেন আর দুর্বোধ্য ভাষায় উগরে দিচ্ছেন এত বছরের পুষে রাখা রাগ, সারা জীবন ধরে যে অন্যায় ব্যবহার তিনি পেয়েছেন, একটা একটা করে সবক'টা ফিরিয়ে দিচ্ছেন তিনি। এত বছরের জমে থাকা রাগ আজ প্রতিবাদের ভাষা পেয়েছে, আজ তাঁকে রোখে, কার সাধ্যি!

এসব কথা সৃজা শুনেছে মধুর কাছে, শুনেছে আর ভেবেছে, এখনও ভাবছে, সেই নরমসরম ভীতু মহিলা, তিনি তবে রক্তমাংসেরই মানুষ! লোকে যে আড়ালে তাঁকে 'পাপোশ' বলে ডাকত, তাঁর অন্তরেও রাগ অপমান এসবের বোধ ছিল? তাঁর সত্ত্বায় সারা জীবন পা মুছে চলা মানুষদুটোকে তিনি তবে ঘৃণা করতেন? নিশ্চয়ই তাই, নইলে কিসের বশে তিনি এমন কাণ্ড ঘটালেন? সৃজা ভাবতে থাকে, বারবার তার মনে পড়ে সেই কুণ্ঠিত চোখ দুটোকে।।


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.738361219677056.1073741843.707552542757924/788922447954266/?type=3&source=54

উত্তরণ


'সই' এর পাতায় আমার গল্প 'উত্তরণ'।

লিঙ্কঃ

http://www.soicreativewomen.org/blog/silence-like-a-cancer-grows-blog-series/92-uttaran-dhoopchhaya-majumder.html

Wednesday, 9 August 2017

এ ত মেয়ে মেয়ে নয়

রাতের ট্রেন পদ্মাবৎ এক্সপ্রেস। জেনারেল কামরা, তিলধারণের জায়গা নেই। তারই মধ্যে এক কোণায় একখানা সিট পেয়ে বসেছে বাইশ তেইশ বছর বয়সী একটা মেয়ে। একাই যাচ্ছে , সঙ্গে কোনও পুরুষমানুষ নেই। মেয়েটা দিল্লি চলল চাকরির পরীক্ষার ব্যাপারে। একলা বসে নানান কথা ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসেছিল বোধহয়, কাদের যেন গালাগালির চোটে চটকা ভাঙল। ও মা গো, চারটে মুশকো চেহারার লোক, হাতে কিসব ছোরা-ছুরিও আছে মনে হচ্ছে। কি চায় ওরা? ওর গলার হারটা? ওটা ওর মায়ের দেওয়া, বড় দামী জিনিস যে! না না, ওটায় হাত লাগাতে দেবে না কাউকে। দাঁতে দাঁত চেপে ডাকাতগুলোর সঙ্গে লড়তে থাকে একলা মেয়েটা। কামরাভর্তি মানুষ, কিন্তু তারা তো সব 'পাবলিক', আম আদমি, তাই তাদের কারোরই ক্ষমতা হয় না এগিয়ে এসে মেয়েটার পাশে দাঁড়ানোর। সোনার হারটা বাগাতে না পেরে রাগী ডাকাতরা একসময় কয়েকশো আম আদমির চোখের সামনে মেয়েটাকে ধাক্কা মেরে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় রেললাইনে। রেললাইনে পড়ে ট্র্যাক থেকে বাঁ পা -টা সরানোর আগেই সেটার ওপর দিয়ে আরেকখানা ট্রেন চলে যায়।

এরপর মেয়েটা সারারাত ছেঁড়খোঁড়া পা নিয়ে ওইভাবেই পড়ে রইল রেললাইনে। সকালে লাইনের ধারে প্রাত:কৃত্য সারতে আসা লোকজন (কারও বদভ্যাস কারও কাছে আশীর্বাদ হয়েও আসতে পারে!) তাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে জানা গেল বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। এসব ঘটনা যখন ঘটছে তখন ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়েছে, মিডিয়া খবর পেয়েছে। মিডিয়ার চাপে ঘটনার কারণ খোঁজা শুরু হয়। প্রথম কদিন সহানুভূতি পেলেও যেই 'কে দায়ী? কেন দায়ী? ' গোছের প্রশ্ন উঠল, অমনি বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টায় রইলেন। কেউ বললেন মেয়েটা নাকি টিকিট কাটেনি, টিটিইকে দেখে ভয়ে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়েছে, কেউ বললেন সে নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।

এসব কথা যখন হাসপাতালে শুয়ে থাকা মেয়েটার কানে পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার মনে অসহায় রাগ থেকে জন্ম নিচ্ছিল একটা অসম্ভব ইচ্ছে। মাউণ্ট এভারেস্ট। হ্যাঁ, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে নিজেকে দেখতে পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করল মেয়েটা।

কি ভাবছেন? সাতসকালে আষাঢ়ে গপ্প শুরু করেছি? আজ্ঞে না মশাই, একটু খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, 2013 সালের এপ্রিল মাসে টাটা স্টিলের স্পনসরশিপে একটা এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। বাহান্ন দিনের সেই অভিযানের শেষে মে মাসের একুশ তারিখে এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা গেঁথে দিয়েছিলেন যিনি, উত্তরপ্রদেশের মানুষ সেই অরুণিমা সিনহা হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা পর্বতারোহী, যিনি কৃত্রিম অঙ্গের সাহায্যে এভারেস্ট জয় করেছেন। তাঁর একটি পা কৃত্রিম, আরেকটি পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে ধরে রাখার জন্য সেই পায়ে রড বসানো আছে। শুরুতে যে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া ঘটনাটি পড়লেন, সেটি অরুণিমারই জীবনের ঘটনা। তখনও তিনি পর্বতারোহী হননি, জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন।

ভাগ্য (পড়ুন সেদিনের সেই ডাকাতদল) তাঁর পা কেড়ে নেওয়ার পরে শুধুমাত্র মনের জোরে আর সাহসে ভর করে অরুণিমা নিজের জীবনকে নতুন খাতে বইয়েছেন। কেবল এভারেস্ট নয়, 2016 পর্যন্ত বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে তিনি দেশের নিশান উড়িয়ে এসেছেন। ইচ্ছে আছে সবকটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখার। এছাড়া বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের বিকাশে খেলাধুলোর ভূমিকা বুঝে তাদের জন্য গড়েছেন শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি।

উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আজ অরুণিমা সিনহার জন্মদিন। এই অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটির জন্য আমাদের সবার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল। ইনি তো শুধু ভবিষ্যতের পর্বতারোহীদের কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের কাছেই আদর্শ নন, যে মেয়েটা গরীব বাবার মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে বিয়ের বাজারে অচল, কিংবা যে ছেলেটা চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়ে রোজ ভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, অরুণিমার গল্প যে তাদেরও বাঁচার মন্ত্র শেখায়। তাদের বলে, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হেরে পালিয়ে না গিয়ে তোর যেটুকু সম্বল আছে, তাই নিয়েই লড়ে যা, একদিন তুইই জিতবি।

তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/

জল বাঁচানোর কিছু উপায়


প্রতি বছরের মতই এবারও গ্রীষ্ম এসে পড়েছে বীরবিক্রমে। বাড়িতে, স্কুলে সর্বত্র একই আলোচনা, “কি গরম রে বাবা! আগে তো এত গরম পড়ত না!” ঠিক তাই। প্রতি বছরই গরমের পরিমাণ আগের বারের চেয়ে বেড়ে চলেছে। গরম বাড়লেই বাড়ে জলের চাহিদা। এদিকে সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ায় নদী-পুকুরের জল যায় শুকিয়ে, বৃষ্টি খুব কম হয় ব’লে নদী-পুকুরে জল জমতেও পারে না। মাটির নীচের জলও আরো নীচে নেমে যায়। কুয়ো-নলকূপ থেকেও ব্যবহারের যোগ্য জল খুব বেশি পাওয়া যায় না। এমনিতেই আমাদের দেশের জনসংখ্যা যা, ব্যবহারযোগ্য জলের পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম। তার ওপর গরমকালে কম বৃষ্টি, পুকুর-নালা শুকিয়ে যাওয়া--- এসব কাণ্ডের জেরে অবস্থাটা আরো করুণ হয়ে পড়ে।
আমরা যদি একটু ভাবনা চিন্তা করে জল ব্যবহার করি, আর কতগুলো খুব ছোট্ট ছোট্ট অভ্যেস নিজেরা আর বাড়ির বড়রা মিলে মেনে চলতে পারি, তাহলে কিন্তু গ্রীষ্মকালে জলের সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
প্রথমে বলি, এই গরমে, মানে আজ থেকেই তুমি কোন্‌কোন্‌ অভ্যাস তৈরি করতে পারো।
বাড়িতে বৈদ্যুতিন জলের ফিল্টার বসানো আছে কি? থাকলে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, ফিল্টারে যখন জল ভর্তি হয়, যে সরু পাইপটা ফিল্টারের নীচের দিকে বেরিয়ে থাকে, সেটা দিয়ে তখন বেশ অনেকটা জল বাইরে বেরিয়ে যায়। বিশুদ্ধ জল পেতে গেলে এই জলটুকু নষ্ট করতেই হবে, পদ্ধতিটাই এমন। কিন্তু ভেবে দ্যাখো তো, এই নষ্ট হয়ে যাওয়া জলকে কাজে লাগানো গেলে সারাদিনে কতটা জলের অপচয় কমানো যাবে? প্রশ্ন হল, কিভাবে কাজে লাগাবে এই জলকে? খাওয়া যাবে না, রান্না বা বাসন ধোওয়ার কাজেও ব্যবহার করা যাবে না, তবে?
যদি পারো তো, জল বেরনো সরু পাইপটার নীচে একটা বালতি রেখে দাও। না পারলে মাঝারি একটা পাত্র পেতে রেখো, জমতে থাকা জল নিয়ে বারে বারে একটা বালতিতে জমা কোরো। দেখবে সারাদিনে এক-দেড় বালতি জল জমেছে। এই এত্তখানি জল নষ্ট হচ্ছিল, ভাবতে পারো!এই জল দিয়ে তুমি ঘর মুছতে পারো, বাথরুম পরিষ্কারের কাজে লাগাতে পারো, বিভিন্ন আসবাবপত্র পরিষ্কার, এমনকি সাইকেল-বাইক-গাড়ি ধোওয়ার কাজেও লাগবে এই জল।
আরেকটা কাজ করবে, মা-কাকীমাদেরও অনুরোধ করবে কাজটা করতে। ধরো, সবজি কাটার পরে সেগুলোকে জল দিয়ে ধুচ্ছো। ধোওয়া হয়ে গেলে জলটা ফেলে দিয়ো না। খুব নোংরা হয়ে গেলে আলাদা কথা, নইলে এই জলটা দিয়েই রান্নার জায়গাটা পরিষ্কার, কিংবা সবজি কাটার ছুরি-বঁটিগুলো ধোওয়া হয়ে যাবে।
বাথরুমে কিংবা রান্নাঘরে,যে কোনো কল-ই খুব ভাল করে বন্ধ করার পরেও দেখবে, ফোঁটা-ফোঁটা করে জল কিছুক্ষণ পর পর পড়তে থাকে। কলের ঠিক নীচে একটা বালতি বা কোনো পাত্র রেখে দাও। কয়েক ঘণ্টা পরে দেখো, কতখানি জল জমা হয়েছে। বালতি পেতে না রাখলে জলটার অপচয় হত তো! অভ্যেসটা নিজে তো করোই,বাড়ির সব্বাইকেও ধরিয়ে দাও এই অভ্যেস। দেখবে জল-সমস্যার কিছুটা সুরাহা হয়েছে।
 পথ ভুল করে এক-আধদিন বিকেলে যদি একপশলা বৃষ্টি তোমার বাড়িতে হাজির হয়, তবে যে বারান্দা বা জানলায় বৃষ্টির জল আসে, সেখানে বড়সড় পাত্র রেখে বৃষ্টির জল জমাতে ভুলো না। পরেরদিন সকালে ঘর মোছা, বাসন ধোওয়ার মত কাজ এই জলে দিব্যি চলবে।
এ তো হল এক্ষুণি তুমি জল বাঁচানোর জন্য কি কি করতে পারো, তার ছোট্ট ফর্দ। আরও অনেক আছে, সব মনে পড়ছে না বলে লিখতে পারছি না। তুমিও একটু মাথা ঘামাও, দেখো আরো কত ভাল ভাল উপায় বেরোবে। উপায়গুলো কাজে লাগিয়ো, আর ইচ্ছামতীকে জানিও, একসঙ্গে বসে বেশ আলোচনা করা যাবে একদিন।
এবার আসি, জলাভাব কমাবার জন্য সারা বছর আমরা কি কি কাজ করতে পারি, সে কথায়।
জন্মদিনে খুব হই-চই করো নিশ্চয়ই। সারাদিন ভীষণ ব্যস্ত থাকো। এই ব্যস্ততার মধ্যে একটা ছোট্ট কাজ সেরে ফ্যালো। প্রতিবছর জন্মদিনে সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে বাগানে গিয়ে একটা করে গাছ লাগাও। বাড়িতে বাগান না থাকলেও চিন্তা নেই, বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে অল্প ফাঁকা জমি নিশ্চয়ই থাকবে। বাড়ির বড় কাউকে সঙ্গে নিয়ে সেখানেই পুঁতে দিয়ে এস একটা চারাগাছ। দেখবে গোটা বছর তোমার সঙ্গে হৈ-হৈ করে সে গাছ দিব্যি বেড়ে উঠবে পরের জন্মদিনের আগেই। এই রীতি মেনে চল বাড়ির সবার জন্মদিনে। অভ্যেসটা ছড়িয়ে দাও স্কুলের বন্ধু, পাড়ার বন্ধু---- সবার মধ্যে। যে বাড়িতে যতজন সদস্য, সে বাড়ির আশপাশে সারা বছরে বেড়ে উঠবে ততগুলো নতুন চারাগাছ। একবছর পরে দেখবে বাড়ির আশেপাশে সবুজের সংখ্যা কত্ত বেড়ে গেছে! আর গাছ বাড়লে তাদের শিকড়ের টানে মাটি জমাট বেঁধে থাকে, মাটি আরো বেশি জল ধরে রাখতে পারে, বৃষ্টির জল আরও সহজে মাটির গভীরে জমতে পারে, এসব কথা নিশ্চয়ই নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হবে না!
বর্ষাকালে যখন তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি আসবে, তৈরি থেকো। বৃষ্টির জল জমাতে হবে। জানো কি, বেঙ্গালুরু-র ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-র বৈজ্ঞানিক এ. আর. শিবকুমার দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির জল জমানো এবং তাকে কাজে লাগিয়ে সারা বছরের জলের চাহিদা মেটানোর কাজে ব্যস্ত আছেন, এবং তাঁর পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়ে কর্ণাটক, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্য এবং বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশও উপকৃত হচ্ছে? নানা ছোটখাটো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই বৈজ্ঞানিক নিজের বাড়িতে শুধুমাত্র বৃষ্টির জলকেই কাজে লাগিয়ে সারা বছরের জলের চাহিদা মেটান।
এতটা পরিকল্পনা করে এক্ষুণি অবশ্য সবার বাড়িতে বৃষ্টির জল ব্যবহার করা যাবে না, তবে বৃষ্টির দিনগুলোতে জলের চাহিদা কিছুটা মেটানোই যায়।
অনেকের বাড়িতেই দেখবে, বাড়ির গা বেয়ে ছাদ থেকে নীচে একটা মোটা পাইপ নেমে এসেছে। এটা হল রেন-পাইপ। বৃষ্টির জল ছাদ থেকে এই পাইপ বেয়ে নেমে নিচে বাগানে বা নর্দমায় গিয়ে পড়ে। এই রেন-পাইপের নিচের খোলা মুখের সামনে যদি একটা বড় ড্রাম রেখে দেওয়া যায়, তবে বৃষ্টির জল ছাদ থেকে নেমে ড্রামটায় জমা হবে। ড্রামের ওপর একটা পাতলা কাপড় ঢেকে রেখো, যাতে আবর্জনা না পড়ে, আর জলের ওপরে অল্প সাদা তেল ঢেলে দিয়ো, তাহলে মশারা ডিম পাড়তে পারবে না। এই জমা হওয়া বৃষ্টির জল দিয়ে এবার তুমি সাইকেল-গাড়ি ধোয়া-মোছা কর, বাসনপত্র ধুতে পারো, এমনকি, মাঠ থেকে খেলে এসে কাদা-মাখা পা-দুটোও ধুয়ে নিতে পারো। তবে হ্যাঁ, এই জল বেশিদিন জমিয়ে রেখো না।
রাস্তায়, স্টেশনে, স্কুলে--- কোথাও যদি দ্যাখো জলের কল খোলা রয়েছে, জল অপচয় হচ্ছে, বন্ধ করার লোক নেই, কোনো দিকে না তাকিয়ে সটান গিয়ে কলটা বন্ধ করে এসো। কে দেখে কি ভাবল, কিচ্ছুটি ভাবার দরকার নেই। স্কুলে তো আমরা সবাই পড়ি জল সঞ্চয় বাড়ানোর কথা, জলের অপচয় রোধ করার কথা। বইয়ে পড়া কথাগুলোকে কাজে করে দেখো, প্রকৃতির ভারসাম্য তো রক্ষা পাবেই, নিজের মনটাকেও দেখবে অনেক তরতাজা লাগছে।।

তথ্যসূত্রঃ www.thebetterindia.com/92434/a-r-shivakumar-rainwater-harvesting-bengaluru-karnataka/

একটা জেদী মেয়ের গল্প


চলো, আজ একটা হার না মানা মেয়ের জয়ের গল্প শুনব। মেয়েটার নাম অরুণিমা সিন্‌হা।

তার বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্মৌ নগরী থেকে ২০০ কিমি দূরে আম্বেদকরনগর বলে একটা শহরে। বাবা সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার, মা স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্মী। তিন বছর বয়সে বাবাকে হারালেও মা, দিদি, জামাইবাবু, ভাই, এদের ছত্রছায়ায় সেই মেয়ে মোটামুটি হেসেখেলেই বড় হচ্ছিল। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোয় উৎসাহ ছিল, জাতীয় স্তরে ভলিবলও খেলেছে সে। একটু বড় হতে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরি খোঁজার সময় এল। ২০১১ সালে CISF এ চাকরির ব্যাপারে ডাক পেল অরুণিমা।

এরপর এল সেই দিনটা। চাকরি-সংক্রান্ত একটা কাজেই পদ্মাবৎ এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় উঠে মেয়েটা দিল্লি যাচ্ছিল। প্রচণ্ড ভিড় সেই কামরায় হঠাৎই চার-পাঁচজন ডাকাত এসে হাজির হয়। তারা অরুণিমার গলা থেকে সোনার হার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে রুখে দাঁড়ায়, বাধা পেয়ে ডাকাতরা রাগের বশে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে রেললাইনে ফেলে দেয়। রেললাইনে প'ড়ে বাঁ পা-টাকে লাইনের ওপর থেকে সরানোর আগেই আরেকটা ট্রেন চলে যায় সেই পায়ের ওপর দিয়ে।

তারপর সারা রাত অরুণিমা ছিন্নভিন্ন বাঁ-পা নিয়ে রেললাইনের ওপরেই পড়ে রইল। সকালে রেললাইনের ধারে প্রাতঃকৃত্য সারতে আসা লোকজন তাকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করল। সেখানে তার বাঁ-পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হল, ডান পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে জুড়ে রাখতে সেখানে বসানো হল রড। এরপর কিছুদিন হৈ-চৈ, সহানুভূতি, তারপর ধীরে ধীরে লোকে অরুণিমাকে ভুলে যেতে লাগল।

অরুণিমা কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্রথমে মনে মনে ভেঙে পড়লেও আস্তে আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগল। একটা নকল পা আর আরেকটা রড-বসানো পা, এই সম্বল নিয়ে সে মনে মনে ঠিক করল মাউণ্ট এভারেস্ট জয় করবে। তার ইচ্ছেটা অদম্য, কারণ, হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই সে যোগাযোগ করল ভারতের প্রথম এভারেস্ট-বিজয়িনী পর্বতারোহী বাচেন্দ্রী পালের সঙ্গে। উত্তরকাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অফ মাউণ্টেনিয়ারিং থেকে আঠেরো মাসের ট্রেনিং নিল সে। কৃত্রিম পা নিয়ে পাহাড়ে চড়ার যেসব মারাত্মক সমস্যা, সেগুলোকে কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবলের সাহায্যে জয় করতে লাগল অরুণিমা।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে টাটা গ্রুপ-প্রযোজিত ইকো-এভারেস্ট অভিযানের দলের সদস্য অরুণিমা তার হিমালয় যাত্রা শুরু করল, বাহান্ন দিন পরে, ২০১৩ সালের ২১শে মে সে পৌঁছালো বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে। ভারতের অরুণিমা সিন্‌হার নাম লেখা রইল ইতিহাসের পাতায়, সে হল বিশ্বের প্রথম মহিলা, যিনি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাহায্যে মাউণ্ট এভারেস্ট জয় করেছেন।

ভাগ্যলিখন ইত্যাদির দোহাই দিয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে না থেকে যাঁরা জেতার অদম্য ইচ্ছে আর চেষ্টাকে প্রাধান্য দেন, ঈশ্বর এবং ভাগ্য তাঁদেরই সাহায্য করেন, অরুণিমা এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাই আকস্মিক দুর্ঘটনায় জীবনের ছন্দ কেটে গেলেও নিজের মনের জোর আর চেষ্টাকে সম্বল করে মেয়েটা সাফল্যের শিখরে পৌঁছে গেল। এরপর শুরু হল তার জয়যাত্রা।

প্রতিটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দেশের জাতীয় পতাকা ওড়াবে, এই হল তার নতুন লক্ষ্য। আফ্রিকার মাউণ্ট কিলিমাঞ্জারো (২০১৪ সালে), অস্ট্রেলিয়ার মাউণ্ট কোসিউজকো (২০১৫ সালে), দক্ষিণ আমেরিকার মাউণ্ট আকঙ্কাগুয়া (২০১৫ সালে), ইউরোপের মাউণ্ট এলব্রুস (২০১৪ সালে)-সহ পর্যন্ত ছ'টি শৃঙ্গ জয় করেছে সে, আণ্টার্কটিকা আর উত্তর আমেরিকা অভিযান এখনও বাকি।

অভূতপূর্ব সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকারের কাছ থেকে অরুণিমা ২০১৫ সালে 'পদ্মশ্রী' পুরস্কার লাভ করেন। এভারেস্ট-জয় এবং তার নেপথ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে অরুণিমা সিন্‌হার লেখা বই Born Again on the Mountain প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে। অরুণিমার অভিজ্ঞতা জানতে হলে এবং তাঁর জেদ আর লড়াই থেকে কিছু শিখতে চাইলে বইটা পড়ে দেখতে পারো।

পর্বতারোহণের পাশাপাশি অরুণিমা আরও একটা ব্রতে নিজেকে সামিল করেছেন। বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের জন্য সে তৈরি করেছে খেলাধুলো শেখার স্কুল, শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি এবং কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র। উত্তরপ্রদেশের এই সংস্থা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ, বিশেষত বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের প্রয়োজনে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন খেলার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কাজেও এই সংস্থা এগিয়ে আসে।

এই হল অরুণিমা সিন্‌হার কাহিনী, যা আরেকবার প্রমাণ করে, ভাগ্যে কি লেখা আছে, তা নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি নিজে কি চাও, সেটা আগে বুঝে নাও, তারপর সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে নিজের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে থাকো, সাফল্য তোমার হাত ধরবেই। অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, তোমার চেষ্টা তোমায় আলোয় ফেরাবে।।


তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/

রাখীবন্ধন

আজ রাখীপূর্ণিমা। বোনেরা বড় যত্নে আজ ভাইদের হাতে রাখী বেঁধে দিয়েছেন, কেউ কেউ হয়তো হাজার কয়েক মাইল দূরে প্রবাসে রয়েছেন, হাতে রাখী বাঁধার আনন্দ তাঁদের মেটাতে হয়েছে স্কাইপে বা ফেসবুকেই। সারাদিন ধরেই বোনেদের আদরে প্রণামে ভাইদের জীবন মঙ্গলময় হয়ে উঠেছে, ভাইদের আশিসে শ্রদ্ধায় বোনেরা ঋদ্ধ হয়েছেন। রাখীপূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে ক্রমশঃ প্রকাশ্যের পক্ষ থেকে সব বন্ধুদের জন্য রইল শুভেচ্ছা।
বন্ধুরা, ডোকা -লা কিংবা কার্গিল, সিয়াচেন কিংবা জালেপ -লা, এইসব জায়গাগুলোতেও কিন্তু ছড়িয়ে রয়েছেন আমাদেরই ভাইয়েরা, বন্ধুরা। ওঁরা  ওখানে রাতের পর রাত জাগছেন বলেই আমরা এত নিশ্চিন্তে রাখী, বন্ধুদিবস যাপন করতে পারছি। আসুন না, আমরা প্রত্যেকে একবারের জন্য হলেও মনে মনে রাখী পরিয়ে দিই সেইসব ভাই আর বন্ধুদের।
আমার চেনা দুই দিদির ভাই সেনাবাহিনীর কর্মী। কার্গিলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁকে যেতে হয়েছিল। গল্প শুনেছি, যুদ্ধের দিনগুলোয় বাড়িতে অশীতিপর বাবা-মাকে কোনো খবর জানানো হত না। দুইবোনে রাত্রে বাগানে গিয়ে কেঁদে হাল্কা হতেন। আশা করি, সেই ভাইবোনের রাখীবন্ধন উৎসব সুখে কাটছে।
হাওড়া-ব্যাণ্ডেল মেন লাইনের ট্রেনে হকারি করেন বিশুদা। কখনও টর্চ, কখনও ছাতা কিংবা ব্যাগ, তাঁর পসরা বদলে যায় মাঝেমধ্যে। দু -তিনবার রাত দশটার পরের কোনও ট্রেনে দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। ট্রেন ভদ্রেশ্বর পেরোনোর পর মহিলা কামরায় হয়ত দুজন যাত্রী, আশ্বাস পেয়েছি বিশুদার কাছে, "এই বিশুদা ট্রেনে থাকলে দিদি লাস্ট ট্রেনেও কোনও চিন্তা নেই তোমাদের"। আজকের উৎসব তাঁর জন্যও।
বাবলু ভাইয়া, আমাদের পাড়ার কিছু কচিকাঁচা পড়ুয়াদের স্কুলভ্যানের সারথি। গত সপ্তাহে পরপর দু'দিন তাদের বাড়ি আসার সময় আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি। ভাবছি, বাচ্চাগুলো বোধহয় ভিজেই যাবে। ভ্যান এলো, দেখলাম বাচ্চাদের গায়ে বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও লাগেনি, তবে ভ্যান থেকে নেমে গাড়ির জানলা বন্ধ করতে গিয়ে বাবলু ভাইয়া ভিজে চান করে গেছেন। তবে তাতে তিনি বিরক্ত নন, বাচ্চাদের গায়ে যে জল লাগেনি এতেই তিনি খুশি। আজ রক্ষাবন্ধনের উৎসবের একজন শরিক তিনিও।
তবুও আমরা কি এঁদের একশো শতাংশ বিশ্বাস করতে পারি? অবিশ্বাস করছি, এটা ভাবলে বুকে কাঁটা বেঁধে, তাও আমরা নিরুপায়। পরিস্থিতি আমাদের কাছ থেকে বিশ্বাস করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। আজকের এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়েও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, "মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ"। সেই পাপের বোঝা যাতে আমাদের খুব বেশি বইতে না হয়, রাখীবন্ধন উৎসবের দিনে মঙ্গলময়ের কাছে এই প্রার্থনা রইল।

Tuesday, 18 July 2017

ঋণস্বীকার

একজন মানুষ, মনে করো সে শহরের একজন নামকরা ব্যবসায়ী। কিসের ব্যবসা? ধরে নাও খেলনার ব্যবসা। সেই ব্যবসায়ী, যার নাম অমল (চন্দ্রকান্ত হলেও ক্ষতি ছিলোনা, নামটা এই গল্পে জরুরি বিষয় নয়) সেই অমলবাবু এক নিভে আসা বিকেলে তাঁর বাড়ির লাগোয়া ঝাঁ-চকচকে আউটলেটটায় এসে বসলেন। দোকানটা যদিও বরাবর এমন ঝাঁ-চকচকে ছিলো না, লাগোয়া তিনমহলা বাড়িটাও ভদ্রলোকের কিছু পৈতৃক সম্পত্তি নয়। একপেট ক্ষিদে আর বাপের রেখে যাওয়া ক’টা ময়লা নোট সম্বল করে অমলবাবু বহু বছর আগের এক সকালে এই বাড়ির তখনকার মালিকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, গেটের পাশে মালির একচিলতে ঘরখানা ভাড়া নিয়ে একটা ছোট্ট দোকান খুলবেন ব’লে। ওনার বোন মাটি, কাগজ, পুরনো কাপড় দিয়ে ভারি সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাত। সেইসব পুতুল শ’খানেক জড়ো ক’রে দোকানটার পত্তন করেছিলেন ভদ্রলোক।

তারপরে কালে কালে কত কী হল। মালির ঘরের দোকান মা-লক্ষ্মীর দয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠলো, ঐ তিনমহলা বাড়ির চাবি হাতবদল হয়ে এল দোকানদারের হাতে, সেদিনের ‘হাতের পুতুল’ দিনে দিনে ‘টয়ল্যাণ্ড’ হয়ে তিনটে শহরে ডালপালা মেলল, অমলবাবু কিন্তু এই মালির ঘরের দোকানটাকে ভুলে যাননি। কাঁচ দিয়ে মুড়ে দোকানটাকে সুন্দর ক’রে সাজিয়েছেন। ব্যবসার গোড়াপত্তন এখানে, ঋণও তো থেকে যায় প্রথম দোকানের প্রতি। মা-লক্ষ্মী যে এই দোকানেই প্রথমবার পা রেখেছিলেন। তাই কাঁচে মোড়া এই ঝকঝকে দোকানটা ব্যবসায়ীর একপ্রকার ঋণস্বীকারই বলতে পারো।

টয়ল্যাণ্ড আজকে খেলনাপাতির দুনিয়ায় বেশ বড় একটা নাম। চাবি ঘোরানো বিদেশী খেলনাও ইনি বেচেন বটে, তবে ঐ মাটি-কাগজ-কাপড়ে বানানো ‘হাতের পুতুল’-এর জুড়ি মেলা ভার। আজকাল তো বিদেশেও যাচ্ছে ওসব পুতুল। এখন অবশ্য আর বোন পুতুল তৈরি করেন না, দু-দু’টো কারখানায় প্রায় শ’খানেক লোকের হাতে ওগুলো তৈরি হয় এখন। বছর সাতেক আগে একটা অ্যাকসিডেন্টে বোন-ভগ্নীপতি দুজনেই গত হয়েছেন। ভাগ্নীটাকে কাছে এনে রেখেছেন অমলবাবু। গিন্নির সঙ্গে এই নিয়ে মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ মন কষাকষি চলে, বিশেষ করে ভাগ্নীর জ্বরজারি হ’লে, তবে কিনা বোনের হাতে তৈরি পুতুলকে মূলধন করেই তো টয়ল্যাণ্ড-এর চলা শুরু, জীবনে মা-লক্ষ্মী আসার নেপথ্যে বোনের শ্রমকে অস্বীকার করেন কি ক’রে? তাই বোনের ঋণের শোধ করতেই মা-বাপ মরা ভাগ্নীটার দায় ঘাড় পেতে নিতে হয়েছে। পাত্র দেখছেন, এই দোকানটার জন্য একজন বলিয়ে-কইয়ে অথচ পকেট ফাঁকা, এমন একজন ম্যানেজারও খুঁজছেন, চলনসই কাউকে পেয়ে গেলে রাজত্ব,রাজকন্যা দুই-ই তার কাঁধে চাপিয়ে ঋণমুক্ত হবেন।

তিন-মহলা বাড়িটার ঠিক পেছনেই একটা বস্তি আছে, যেখানে জীবনের শুরুটা কাটিয়েছিলেন আমাদের অমলবাবু। তখন অবশ্য কেউ তাঁকে কেউ আপনি-আজ্ঞে করত না। সে যাই হোক, টাকার মুখ দেখে এনার মাথা ঘুরে যায়নি কিন্তু, ছোটবেলার আশ্রয় সেই বস্তির ঋণ তিনি শুধে চলেছেন সাধ্যমত। বস্তির বেশ কিছু ছেলে তাঁর কারখানায় কাজ করে, দুটো ছেলেকে এই দোকানেও কাজ দিয়েছেন। তবে কিনা ছোটলোকের মন তো, হতেই পারে কোনওদিন ক’টা দামী খেলনা ব্যাগে পুরে পাচার করল লোভ সামলাতে না পেরে! তাই আগেভাগেই সাবধান হয়েছেন অমলবাবু। গেটকীপার তো আছেই, তাছাড়া গেটের কাছে ঘুরঘুর করে বুলডগ জেম্‌স। বাঘেরও বাপ। বেচাল দেখলেই টুঁটি ছিঁড়ে নেবে।

সন্ধ্যের ভিড়টা একটু হাল্কা হয়েছে, কাউণ্টারে বসে টাকা গুনছিলেন ভদ্রলোক। টাকা চটকাতে চটকাতে বেশ একটা তরঙ্গ বাজছিল মনের গভীরে, ঘোর কাটল বাচ্চাদের গলার আওয়াজে। এতগুলো গেঁড়িগুগলি কোত্থেকে এল? তাঁর দোকানে তো ফিনফিনে মায়েদের হাতে ধরা ফটফট বুলি-ফোটা ফুটফুটে বাচ্চারাই আসে, তারা তো এমন খলবল করেনা! মুখ তুলে দেখলেন দোকানে কাজ করে মানিক, তারই বউ এসেছে তিনটে বাচ্চার হাত ধ’রে। শোকেসে খেলনার বাহার দেখে মা-ছা সবারই চোখ ট্যারা হয়ে গেছে। এটা চাই, ওটা চাই ক’রে বায়না জুড়েছে সবক’টা। একটু সাফসুতরো করে আনতে পারত তো ছেলেগুলোকে! নাক দিয়ে সর্দি গড়াচ্ছে, একটার তো পা ভর্তি কাদা। নর্দমায় পড়ে গেছিল নাকি? ইসস্‌, দোকানটা ভাল করে ধোওয়াতে হবে।

বউটাকে বাইরে দাঁড়াতে বলবেন বলে উঠতে যাচ্ছিলেন, চোখ পড়ল ছোট ছেলেটার দিকে। সে তখন একহাতে নিজের প্যাণ্টটা কোমরের কাছে চেপে ধরে পা উঁচু করে তাক থেকে বল নামানোর চেষ্টা করছে। হাত ছাড়লেই প্যাণ্ট হড়কে নীচে নেমে যাবে। অমলবাবুর মনে পড়ে গেল আরেকটা ছেলের কথা। তার বাবা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। একবার বিশ্বকর্মা পুজোয় দোকানে মাংসভাত খাওয়ার নেমন্তন্নে গিয়েছিলো ছেলেটা, বাবার সঙ্গে। অনেকদিন পরে মাংসভাত পেয়ে এইসান খেয়েছিল সে, খাওয়ার পর উঠে দাঁড়াতেই পুরনো রদ্দিমার্কা হাফপ্যাণ্টের বোতাম ছিঁড়ে সে প্যাণ্ট সুড়ুৎ ক’রে পড়ল পায়ের নীচে। কি লজ্জা কি লজ্জা! ঘরভর্তি লোকের হো-হো হাসি মনে পড়লে এখনও কান লাল হয়ে ওঠে টয়ল্যাণ্ড-এর মালিক অমলবাবুর। বাবা ভাগ্যিস শর্মাজ্যাঠার কাছে কেঁদেকেটে একটা নতুন প্যাণ্ট চেয়ে পরিয়েছিল। প্যাণ্টটার দাম শুধতে বাবাকে দু’মাস দুপুরে জল খেয়ে থাকতে হয়েছিল বটে, তবে সেদিন অমন লজ্জার হাত থেকে বারো বছরের ছেলেটা বেঁচে গিয়েছিলো তো!

শুধু তাই নয়, বাবার কাকুতি-মিনতি, শর্মাজ্যাঠার খ্যাক-খ্যাক হাসি, দিনের পর দিন বাবার সারাদিন না খেয়ে থাকা, সব মিলিয়ে ছেলেটার মনে একটা জেদ জন্মেছিল আস্তে আস্তে, মালিক হওয়ার জেদ। মালিক হলে স-অ-ব কিছু হাতের মুঠোয় চলে আসে, বুঝেছিল ছেলেটা। সেই জেদ থেকেই তো বেড়ে উঠেছে টয়ল্যাণ্ড, দোকানটার পত্তনে বাবার ঋণও তো তবে অস্বীকার করার নয়, ভাবেন অমলবাবু।

বাবার ঋণ শোধ করতেই কিনা বোঝা যায় না, তবে মাঝবয়সী অমলবাবু কাউণ্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলেন একহাতে প্যাণ্ট চেপে ধরা ছেলেটার বাপের দিকে, না, না, ওদের বাইরে যেতে বলবেন বলে নয়, ক’টা টাকা বাপের হাতে ধরাবেন ব’লে, ফুটপাতের দোকানগুলোয় তো সস্তার প্যাণ্ট পাওয়া যায় এখনও, এই ক’টা টাকাই যথেষ্ট।।

(অক্ষর-এ প্রকাশিত)