Tuesday, 18 July 2017

ঋণস্বীকার

একজন মানুষ, মনে করো সে শহরের একজন নামকরা ব্যবসায়ী। কিসের ব্যবসা? ধরে নাও খেলনার ব্যবসা। সেই ব্যবসায়ী, যার নাম অমল (চন্দ্রকান্ত হলেও ক্ষতি ছিলোনা, নামটা এই গল্পে জরুরি বিষয় নয়) সেই অমলবাবু এক নিভে আসা বিকেলে তাঁর বাড়ির লাগোয়া ঝাঁ-চকচকে আউটলেটটায় এসে বসলেন। দোকানটা যদিও বরাবর এমন ঝাঁ-চকচকে ছিলো না, লাগোয়া তিনমহলা বাড়িটাও ভদ্রলোকের কিছু পৈতৃক সম্পত্তি নয়। একপেট ক্ষিদে আর বাপের রেখে যাওয়া ক’টা ময়লা নোট সম্বল করে অমলবাবু বহু বছর আগের এক সকালে এই বাড়ির তখনকার মালিকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, গেটের পাশে মালির একচিলতে ঘরখানা ভাড়া নিয়ে একটা ছোট্ট দোকান খুলবেন ব’লে। ওনার বোন মাটি, কাগজ, পুরনো কাপড় দিয়ে ভারি সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাত। সেইসব পুতুল শ’খানেক জড়ো ক’রে দোকানটার পত্তন করেছিলেন ভদ্রলোক।

তারপরে কালে কালে কত কী হল। মালির ঘরের দোকান মা-লক্ষ্মীর দয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠলো, ঐ তিনমহলা বাড়ির চাবি হাতবদল হয়ে এল দোকানদারের হাতে, সেদিনের ‘হাতের পুতুল’ দিনে দিনে ‘টয়ল্যাণ্ড’ হয়ে তিনটে শহরে ডালপালা মেলল, অমলবাবু কিন্তু এই মালির ঘরের দোকানটাকে ভুলে যাননি। কাঁচ দিয়ে মুড়ে দোকানটাকে সুন্দর ক’রে সাজিয়েছেন। ব্যবসার গোড়াপত্তন এখানে, ঋণও তো থেকে যায় প্রথম দোকানের প্রতি। মা-লক্ষ্মী যে এই দোকানেই প্রথমবার পা রেখেছিলেন। তাই কাঁচে মোড়া এই ঝকঝকে দোকানটা ব্যবসায়ীর একপ্রকার ঋণস্বীকারই বলতে পারো।

টয়ল্যাণ্ড আজকে খেলনাপাতির দুনিয়ায় বেশ বড় একটা নাম। চাবি ঘোরানো বিদেশী খেলনাও ইনি বেচেন বটে, তবে ঐ মাটি-কাগজ-কাপড়ে বানানো ‘হাতের পুতুল’-এর জুড়ি মেলা ভার। আজকাল তো বিদেশেও যাচ্ছে ওসব পুতুল। এখন অবশ্য আর বোন পুতুল তৈরি করেন না, দু-দু’টো কারখানায় প্রায় শ’খানেক লোকের হাতে ওগুলো তৈরি হয় এখন। বছর সাতেক আগে একটা অ্যাকসিডেন্টে বোন-ভগ্নীপতি দুজনেই গত হয়েছেন। ভাগ্নীটাকে কাছে এনে রেখেছেন অমলবাবু। গিন্নির সঙ্গে এই নিয়ে মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ মন কষাকষি চলে, বিশেষ করে ভাগ্নীর জ্বরজারি হ’লে, তবে কিনা বোনের হাতে তৈরি পুতুলকে মূলধন করেই তো টয়ল্যাণ্ড-এর চলা শুরু, জীবনে মা-লক্ষ্মী আসার নেপথ্যে বোনের শ্রমকে অস্বীকার করেন কি ক’রে? তাই বোনের ঋণের শোধ করতেই মা-বাপ মরা ভাগ্নীটার দায় ঘাড় পেতে নিতে হয়েছে। পাত্র দেখছেন, এই দোকানটার জন্য একজন বলিয়ে-কইয়ে অথচ পকেট ফাঁকা, এমন একজন ম্যানেজারও খুঁজছেন, চলনসই কাউকে পেয়ে গেলে রাজত্ব,রাজকন্যা দুই-ই তার কাঁধে চাপিয়ে ঋণমুক্ত হবেন।

তিন-মহলা বাড়িটার ঠিক পেছনেই একটা বস্তি আছে, যেখানে জীবনের শুরুটা কাটিয়েছিলেন আমাদের অমলবাবু। তখন অবশ্য কেউ তাঁকে কেউ আপনি-আজ্ঞে করত না। সে যাই হোক, টাকার মুখ দেখে এনার মাথা ঘুরে যায়নি কিন্তু, ছোটবেলার আশ্রয় সেই বস্তির ঋণ তিনি শুধে চলেছেন সাধ্যমত। বস্তির বেশ কিছু ছেলে তাঁর কারখানায় কাজ করে, দুটো ছেলেকে এই দোকানেও কাজ দিয়েছেন। তবে কিনা ছোটলোকের মন তো, হতেই পারে কোনওদিন ক’টা দামী খেলনা ব্যাগে পুরে পাচার করল লোভ সামলাতে না পেরে! তাই আগেভাগেই সাবধান হয়েছেন অমলবাবু। গেটকীপার তো আছেই, তাছাড়া গেটের কাছে ঘুরঘুর করে বুলডগ জেম্‌স। বাঘেরও বাপ। বেচাল দেখলেই টুঁটি ছিঁড়ে নেবে।

সন্ধ্যের ভিড়টা একটু হাল্কা হয়েছে, কাউণ্টারে বসে টাকা গুনছিলেন ভদ্রলোক। টাকা চটকাতে চটকাতে বেশ একটা তরঙ্গ বাজছিল মনের গভীরে, ঘোর কাটল বাচ্চাদের গলার আওয়াজে। এতগুলো গেঁড়িগুগলি কোত্থেকে এল? তাঁর দোকানে তো ফিনফিনে মায়েদের হাতে ধরা ফটফট বুলি-ফোটা ফুটফুটে বাচ্চারাই আসে, তারা তো এমন খলবল করেনা! মুখ তুলে দেখলেন দোকানে কাজ করে মানিক, তারই বউ এসেছে তিনটে বাচ্চার হাত ধ’রে। শোকেসে খেলনার বাহার দেখে মা-ছা সবারই চোখ ট্যারা হয়ে গেছে। এটা চাই, ওটা চাই ক’রে বায়না জুড়েছে সবক’টা। একটু সাফসুতরো করে আনতে পারত তো ছেলেগুলোকে! নাক দিয়ে সর্দি গড়াচ্ছে, একটার তো পা ভর্তি কাদা। নর্দমায় পড়ে গেছিল নাকি? ইসস্‌, দোকানটা ভাল করে ধোওয়াতে হবে।

বউটাকে বাইরে দাঁড়াতে বলবেন বলে উঠতে যাচ্ছিলেন, চোখ পড়ল ছোট ছেলেটার দিকে। সে তখন একহাতে নিজের প্যাণ্টটা কোমরের কাছে চেপে ধরে পা উঁচু করে তাক থেকে বল নামানোর চেষ্টা করছে। হাত ছাড়লেই প্যাণ্ট হড়কে নীচে নেমে যাবে। অমলবাবুর মনে পড়ে গেল আরেকটা ছেলের কথা। তার বাবা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। একবার বিশ্বকর্মা পুজোয় দোকানে মাংসভাত খাওয়ার নেমন্তন্নে গিয়েছিলো ছেলেটা, বাবার সঙ্গে। অনেকদিন পরে মাংসভাত পেয়ে এইসান খেয়েছিল সে, খাওয়ার পর উঠে দাঁড়াতেই পুরনো রদ্দিমার্কা হাফপ্যাণ্টের বোতাম ছিঁড়ে সে প্যাণ্ট সুড়ুৎ ক’রে পড়ল পায়ের নীচে। কি লজ্জা কি লজ্জা! ঘরভর্তি লোকের হো-হো হাসি মনে পড়লে এখনও কান লাল হয়ে ওঠে টয়ল্যাণ্ড-এর মালিক অমলবাবুর। বাবা ভাগ্যিস শর্মাজ্যাঠার কাছে কেঁদেকেটে একটা নতুন প্যাণ্ট চেয়ে পরিয়েছিল। প্যাণ্টটার দাম শুধতে বাবাকে দু’মাস দুপুরে জল খেয়ে থাকতে হয়েছিল বটে, তবে সেদিন অমন লজ্জার হাত থেকে বারো বছরের ছেলেটা বেঁচে গিয়েছিলো তো!

শুধু তাই নয়, বাবার কাকুতি-মিনতি, শর্মাজ্যাঠার খ্যাক-খ্যাক হাসি, দিনের পর দিন বাবার সারাদিন না খেয়ে থাকা, সব মিলিয়ে ছেলেটার মনে একটা জেদ জন্মেছিল আস্তে আস্তে, মালিক হওয়ার জেদ। মালিক হলে স-অ-ব কিছু হাতের মুঠোয় চলে আসে, বুঝেছিল ছেলেটা। সেই জেদ থেকেই তো বেড়ে উঠেছে টয়ল্যাণ্ড, দোকানটার পত্তনে বাবার ঋণও তো তবে অস্বীকার করার নয়, ভাবেন অমলবাবু।

বাবার ঋণ শোধ করতেই কিনা বোঝা যায় না, তবে মাঝবয়সী অমলবাবু কাউণ্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলেন একহাতে প্যাণ্ট চেপে ধরা ছেলেটার বাপের দিকে, না, না, ওদের বাইরে যেতে বলবেন বলে নয়, ক’টা টাকা বাপের হাতে ধরাবেন ব’লে, ফুটপাতের দোকানগুলোয় তো সস্তার প্যাণ্ট পাওয়া যায় এখনও, এই ক’টা টাকাই যথেষ্ট।।

(অক্ষর-এ প্রকাশিত)

No comments:

Post a Comment