রাতের ট্রেন পদ্মাবৎ এক্সপ্রেস। জেনারেল কামরা, তিলধারণের জায়গা নেই। তারই মধ্যে এক কোণায় একখানা সিট পেয়ে বসেছে বাইশ তেইশ বছর বয়সী একটা মেয়ে। একাই যাচ্ছে , সঙ্গে কোনও পুরুষমানুষ নেই। মেয়েটা দিল্লি চলল চাকরির পরীক্ষার ব্যাপারে। একলা বসে নানান কথা ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসেছিল বোধহয়, কাদের যেন গালাগালির চোটে চটকা ভাঙল। ও মা গো, চারটে মুশকো চেহারার লোক, হাতে কিসব ছোরা-ছুরিও আছে মনে হচ্ছে। কি চায় ওরা? ওর গলার হারটা? ওটা ওর মায়ের দেওয়া, বড় দামী জিনিস যে! না না, ওটায় হাত লাগাতে দেবে না কাউকে। দাঁতে দাঁত চেপে ডাকাতগুলোর সঙ্গে লড়তে থাকে একলা মেয়েটা। কামরাভর্তি মানুষ, কিন্তু তারা তো সব 'পাবলিক', আম আদমি, তাই তাদের কারোরই ক্ষমতা হয় না এগিয়ে এসে মেয়েটার পাশে দাঁড়ানোর। সোনার হারটা বাগাতে না পেরে রাগী ডাকাতরা একসময় কয়েকশো আম আদমির চোখের সামনে মেয়েটাকে ধাক্কা মেরে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় রেললাইনে। রেললাইনে পড়ে ট্র্যাক থেকে বাঁ পা -টা সরানোর আগেই সেটার ওপর দিয়ে আরেকখানা ট্রেন চলে যায়।
এরপর মেয়েটা সারারাত ছেঁড়খোঁড়া পা নিয়ে ওইভাবেই পড়ে রইল রেললাইনে। সকালে লাইনের ধারে প্রাত:কৃত্য সারতে আসা লোকজন (কারও বদভ্যাস কারও কাছে আশীর্বাদ হয়েও আসতে পারে!) তাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে জানা গেল বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। এসব ঘটনা যখন ঘটছে তখন ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়েছে, মিডিয়া খবর পেয়েছে। মিডিয়ার চাপে ঘটনার কারণ খোঁজা শুরু হয়। প্রথম কদিন সহানুভূতি পেলেও যেই 'কে দায়ী? কেন দায়ী? ' গোছের প্রশ্ন উঠল, অমনি বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টায় রইলেন। কেউ বললেন মেয়েটা নাকি টিকিট কাটেনি, টিটিইকে দেখে ভয়ে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়েছে, কেউ বললেন সে নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।
এসব কথা যখন হাসপাতালে শুয়ে থাকা মেয়েটার কানে পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার মনে অসহায় রাগ থেকে জন্ম নিচ্ছিল একটা অসম্ভব ইচ্ছে। মাউণ্ট এভারেস্ট। হ্যাঁ, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে নিজেকে দেখতে পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করল মেয়েটা।
কি ভাবছেন? সাতসকালে আষাঢ়ে গপ্প শুরু করেছি? আজ্ঞে না মশাই, একটু খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, 2013 সালের এপ্রিল মাসে টাটা স্টিলের স্পনসরশিপে একটা এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। বাহান্ন দিনের সেই অভিযানের শেষে মে মাসের একুশ তারিখে এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা গেঁথে দিয়েছিলেন যিনি, উত্তরপ্রদেশের মানুষ সেই অরুণিমা সিনহা হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা পর্বতারোহী, যিনি কৃত্রিম অঙ্গের সাহায্যে এভারেস্ট জয় করেছেন। তাঁর একটি পা কৃত্রিম, আরেকটি পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে ধরে রাখার জন্য সেই পায়ে রড বসানো আছে। শুরুতে যে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া ঘটনাটি পড়লেন, সেটি অরুণিমারই জীবনের ঘটনা। তখনও তিনি পর্বতারোহী হননি, জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন।
ভাগ্য (পড়ুন সেদিনের সেই ডাকাতদল) তাঁর পা কেড়ে নেওয়ার পরে শুধুমাত্র মনের জোরে আর সাহসে ভর করে অরুণিমা নিজের জীবনকে নতুন খাতে বইয়েছেন। কেবল এভারেস্ট নয়, 2016 পর্যন্ত বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে তিনি দেশের নিশান উড়িয়ে এসেছেন। ইচ্ছে আছে সবকটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখার। এছাড়া বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের বিকাশে খেলাধুলোর ভূমিকা বুঝে তাদের জন্য গড়েছেন শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি।
উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আজ অরুণিমা সিনহার জন্মদিন। এই অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটির জন্য আমাদের সবার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল। ইনি তো শুধু ভবিষ্যতের পর্বতারোহীদের কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের কাছেই আদর্শ নন, যে মেয়েটা গরীব বাবার মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে বিয়ের বাজারে অচল, কিংবা যে ছেলেটা চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়ে রোজ ভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, অরুণিমার গল্প যে তাদেরও বাঁচার মন্ত্র শেখায়। তাদের বলে, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হেরে পালিয়ে না গিয়ে তোর যেটুকু সম্বল আছে, তাই নিয়েই লড়ে যা, একদিন তুইই জিতবি।
তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/
এরপর মেয়েটা সারারাত ছেঁড়খোঁড়া পা নিয়ে ওইভাবেই পড়ে রইল রেললাইনে। সকালে লাইনের ধারে প্রাত:কৃত্য সারতে আসা লোকজন (কারও বদভ্যাস কারও কাছে আশীর্বাদ হয়েও আসতে পারে!) তাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে জানা গেল বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। এসব ঘটনা যখন ঘটছে তখন ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়েছে, মিডিয়া খবর পেয়েছে। মিডিয়ার চাপে ঘটনার কারণ খোঁজা শুরু হয়। প্রথম কদিন সহানুভূতি পেলেও যেই 'কে দায়ী? কেন দায়ী? ' গোছের প্রশ্ন উঠল, অমনি বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টায় রইলেন। কেউ বললেন মেয়েটা নাকি টিকিট কাটেনি, টিটিইকে দেখে ভয়ে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়েছে, কেউ বললেন সে নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।
এসব কথা যখন হাসপাতালে শুয়ে থাকা মেয়েটার কানে পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার মনে অসহায় রাগ থেকে জন্ম নিচ্ছিল একটা অসম্ভব ইচ্ছে। মাউণ্ট এভারেস্ট। হ্যাঁ, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে নিজেকে দেখতে পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করল মেয়েটা।
কি ভাবছেন? সাতসকালে আষাঢ়ে গপ্প শুরু করেছি? আজ্ঞে না মশাই, একটু খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, 2013 সালের এপ্রিল মাসে টাটা স্টিলের স্পনসরশিপে একটা এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। বাহান্ন দিনের সেই অভিযানের শেষে মে মাসের একুশ তারিখে এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা গেঁথে দিয়েছিলেন যিনি, উত্তরপ্রদেশের মানুষ সেই অরুণিমা সিনহা হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা পর্বতারোহী, যিনি কৃত্রিম অঙ্গের সাহায্যে এভারেস্ট জয় করেছেন। তাঁর একটি পা কৃত্রিম, আরেকটি পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে ধরে রাখার জন্য সেই পায়ে রড বসানো আছে। শুরুতে যে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া ঘটনাটি পড়লেন, সেটি অরুণিমারই জীবনের ঘটনা। তখনও তিনি পর্বতারোহী হননি, জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন।
ভাগ্য (পড়ুন সেদিনের সেই ডাকাতদল) তাঁর পা কেড়ে নেওয়ার পরে শুধুমাত্র মনের জোরে আর সাহসে ভর করে অরুণিমা নিজের জীবনকে নতুন খাতে বইয়েছেন। কেবল এভারেস্ট নয়, 2016 পর্যন্ত বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে তিনি দেশের নিশান উড়িয়ে এসেছেন। ইচ্ছে আছে সবকটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখার। এছাড়া বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের বিকাশে খেলাধুলোর ভূমিকা বুঝে তাদের জন্য গড়েছেন শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি।
উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আজ অরুণিমা সিনহার জন্মদিন। এই অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটির জন্য আমাদের সবার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল। ইনি তো শুধু ভবিষ্যতের পর্বতারোহীদের কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের কাছেই আদর্শ নন, যে মেয়েটা গরীব বাবার মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে বিয়ের বাজারে অচল, কিংবা যে ছেলেটা চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়ে রোজ ভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, অরুণিমার গল্প যে তাদেরও বাঁচার মন্ত্র শেখায়। তাদের বলে, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হেরে পালিয়ে না গিয়ে তোর যেটুকু সম্বল আছে, তাই নিয়েই লড়ে যা, একদিন তুইই জিতবি।
তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/