Showing posts with label childhood story. Show all posts
Showing posts with label childhood story. Show all posts

Saturday, 8 April 2017

সিনেমার গল্প

গৌতম ঘোষের 'দেখা  ' দেখছিলাম সেদিন,  ট্রেনে যেতে যেতে, সদ্য আলাপ হওয়া সহযাত্রিণীর মুঠোফোনে. অন্যের ফোনে উঁকি দেওয়া খুব একটা ভাল স্বভাব নয় জানি, কিন্তু বাংলা সংলাপ শুনে চোখ কান দুই -ই ধেয়ে যাচ্ছিল ফোনের পানে।

এটা আমার ছোটবেলার অভ্যেস. ট্রেনে কিছু করার না থাকলেই পাশের জনের দিকে নজর যাবে, তার হাতে যদি গল্পের বই থাকে তো ঘাড় বাড়িয়ে তার সঙ্গে আমিও পড়তে শুরু করব, খোলা পাতাটা হুড়োহুড়ি করে শেষ করে উদাস মুখে বসে থাকব সে কখন পাতা উল্টে পরের পাতায় যাবে, হাত নিশপিশ করবে নিজেই পাতা উল্টে নেওয়ার জন্যে. এভাবে নাম না জানা বহু বই শেষ না হতেই ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে অনেকবার. 

বই পড়ার বদলে যদি কেউ বাংলা ছবি দেখে, তাহলেও একই কাজ করে ফেলি. প্রথমে আড়চোখে, তারপর গলা বাড়িয়ে দেখতে বসে যাই. এইদিনও তেমন হয়েছিল.

ছবিতে এক জায়গায় দেখলাম ছোট্ট একটা ছেলেকে "শশী -দা" বিনে পয়সার বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন. মনটা হইহই করে উঠল. আরে! এ তো আমার বহুকালের চেনা জিনিস!

টিভিতে সিনেমা দেখা যায়, একথা জানার আগে থেকেই জানতাম রাত্তিরবেলায় অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে সিনেমা দেখা যায়. আমাদের মামারবাড়ি একদম বড় রাস্তার ধারেই. ভোর থেকে মাঝরাত, সর্বক্ষণ রাস্তায় গাড়ির সারি, হর্ণের আওয়াজে বাড়ির লোক অতিষ্ঠ. আমার কিন্তু বেশ লাগত. আমাদের বাড়িটা আবার ছিল একটু গলির ভেতরে, সারাদিনে গাড়ি -টাড়ি দেখার সুযোগ বিশেষ হত না. তাই মামারবাড়ি গেলে বারান্দা ছেড়ে নড়তে চাইতাম না.
সবচেয়ে মজা হত একটু রাত্তির হলে যখন ভারী ভারী ট্রাক -ট্রেলার গুলো যেত রাস্তা দিয়ে, প্রায় একশো বছরের পুরনো বাড়িটার গায়ে হাল্কা একটা কাঁপুনি ধরত, সেই কাঁপুনি চারিয়ে যেত মা বা দিদার পাশে শুয়ে থাকা আমার মধ্যেও. কাঁপছি না, অথচ পিঠের নিচে একটা গুড়গুড় করা ভাব, ভূমিকম্পের সময়েও কি এমনটাই হয়? জিজ্ঞেস করে বকুনিও খেয়েছি বারকয়েক. ওনারা দু 'তিনবারের ভূমিকম্পের সাক্ষী, রাতবিরেতে ওসব কথা ওনাদের ভাল লাগবে কেন?

এই ভারী ট্রাকগুলো যখন ছুটে যেত, দেখতাম ঘরের দেওয়ালেও একদিক থেকে আরেকদিকে সাঁ করে একটা ছায়া সরে গেল. প্রথমে ভাল বুঝতাম না, ভয় করত কিনা মনে নেই, সম্ভবত অজানাকে ভয় পাওয়ার মত বড় তখনো হইনি. ওইসব ছায়াগুলো যে সিনেমা, এই তত্ত্ব-টাই বা কে বুঝিয়েছিল সেটাও মনে নেই. তবে যেই বুঝলাম যে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেলেই দেওয়ালে আলো -ছায়াদের দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, আর গাড়ির আওয়াজ মিলিয়ে গেলেই দেওয়ালে এসে পড়া রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো আবার শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, অমনি আমাদের নতুন খেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল.

ঘুম আসার আগে অব্দি রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেলেই "এই... আসছে আসছে" বলে বোনেরা ঠেলাঠেলি শুরু করতাম, একলা শুলে নিজেকে ঠেলতাম. "এই -ই-ই যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে.... যা:, চলে গেল", "আবার আসবে দাঁড়া না", এরকম কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত থামত মা, মাসিমণি বা দিদাদের কারো ধমকে.

একটু বড় হওয়ার পরে খেলাটা কিছুটা পাল্টাল. তখন সরে যাওয়া সিনেমার আলো দেখে বোঝার চেষ্টা চলত গাড়ির চরিত্র কেমন. চার চাকা না আট চাকা, গাড়ির মাথায় মাল বোঝাই নাকি অতটা ভার নেই, এমন নানা তথ্য পাওয়ার জন্য কসরত হত. অত কাণ্ড না করে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তা না, এ যেন সিনেমা দেখতে বসে নামের লিস্টি না দেখে মেক-আপের আড়াল থেকে আসল মানুষটাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা!

মাঝেমধ্যে গুনতাম কে ক 'টা গাড়ির তৈরি সিনেমা দেখলাম. এই গুনতি করার সুবিধেটা হল ঠিক কোন সময়ে ঘুমটা এসে পড়ল সেটার একটা আবছা হিসেব পাওয়া যায়. বেশ "কাল পাঁচটা গাড়ি যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছি, আজ দেখি একই সময়ে ঘুম আসে কিনা" এরকম একটা হিসেব. আপেক্ষিকতার মত ঝামেলার বস্তু ভাগ্যিস তখন জানা ছিল না!

তো, এই হল সিনেমার গল্প. বছর কুড়ি  -পঁচিশ আগে গল্পের শুরু. জানিনা এখনও এমন সিনেমার গল্প তৈরি হয় কিনা. নিশ্চয়ই হয়. অবাক হওয়ার অভ্যেস তো আজও আছে. এখনও শোওয়ার ঘরে রাস্তার আলো এসে পড়ে. গাড়ির আওয়াজে আলো -ছায়ার ছুটোছুটি এখনো চলে.
 "ওটা কি মা? এদিক থেকে ওদিকে চলে গেল?" প্রশ্নটা কারো মনে আসে কিনা তারই অপেক্ষা এখন!

Tuesday, 30 June 2015

এক টুকরো পুজোর ছবি




দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই আমাদের চন্দননগরের বাড়িতে শুরু হয়ে যেত জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য ঘর ঝাড়ামোছার পালা। শোওয়ার ঘরের তাক থেকে বছরখানেকের ধুলো ঝেড়ে সেখানে নতুন করে পুরনো খবরের কাগজ পেতে গুছিয়ে রাখা হত কাচের শিবমূর্তি, পিতলের নৌকো, ডিমের খোলা আর কালো ভেলভেটের তৈরি পেঙ্গুইন, নৈনিতাল থেকে আনা মোমের কুকুর আর এরকম নানা ঘর সাজানোর জিনিস। এর কোনোটা মা বাবা পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কোনোটা রথের মেলা বা রাজস্থানের সংগ্রহ। প্রতিবার গুছোনোর সময় আমি চেষ্টা করতাম একটা প্যাটার্ন মেনে জিনিসগুলো সাজানোর, যেমন, কেরালার কাঠের আর চন্দননগরের রথের মেলার বাঁশের নৌকা একই সারিতে থাকবে, হরিদ্বারের পাথরের আর পুরীর ঝিনুকের ধূপদানি পাশাপাশি থাকবে, তাহলে বিবিধের মাঝে মিলনের মাহাত্ম্য চোখে পড়বে সহজে, কিন্তু প্রতিবারই শুরু করার একটু পরেই খেই হারিয়ে রাজস্থানী পুতুলের পাশে বসে পড়ত তাজমহল বা হাতির দাঁতের হাতির সারি।

ঘর গোছানোর পাশাপাশি চলত পর্দা বেডকভার কাচা, রান্নাঘরে বড়মাপের হাঁড়ি ডেকচি নামিয়ে মাজা ধোওয়ার পর্ব। ঠাকুরঘর থেকে বসার ঘর, গোটা বাড়ি ঝকঝকে হয়ে কাচা পর্দায় সেজেগুজে তৈরি হয়ে থাকতো অতিথিদের জন্যে। আর ফ্রিজের ভেতর তৈরি থাকত মায়ের হাতের রসগোল্লার পায়েস। ঘন দুধের মধ্যে সরজড়ানো রসগোল্লাগুলোর স্বাদ একবার পেলে আর ভোলা যায় না।

আমাদের স্কুল তো দুর্গাপুজোর আগে বন্ধ হয়ে খুলতো একেবারে জগদ্ধাত্রী পুজোর পর, কাজেই এই একটা মাস কাটতো যাকে বলে তুরীয় আনন্দে। মাঝেমাঝেই একবেলার পড়তে বসা মুলতুবি রয়ে যেত বইয়ের তাক গোছানো বা জানলার পর্দা লাগানোর অছিলায়। আমাদের মতলব বুঝে মা চোখ পাকানোর আগেই তাঁর হাত থেকে ঝাড়ন নিয়ে লেগে পড়তাম খাটের ছত্রি মোছার কাজে।

এরকমই এক বছর, সেটা বোধহয় 1998 সাল, পুজোর মাসদুয়েক আগে বাড়ির দোতলার ঘরগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। রং করা নতুন দোতলাটায় উঠলে মনে হচ্ছে যেন আমাদেরই আরেকটা বাড়িতে এলাম। আত্মীয়মহলে তো জানতোই আমাদের নতুন দোতলার খবর, জগদ্ধাত্রীপুজোর আগে আগে মামা-মাসিদের মহল থেকে দাবি উঠল 'দিদির বাড়িতে দোতলা-প্রবেশ করতে হবে"।

"দোতলা-প্রবেশ মানে? এটা কি আলাদা বাড়ি নাকি যে নতুন করে গৃহপ্রবেশ করতে হবে?" মা-র কাছে মামা-মাসিদের পাঠানো প্রস্তাব শুনে বাবার প্রথম কথা ছিল এটাই।

"তাছাড়া লোকে গৃহপ্রবেশের পুজো করে আনকোরা নতুন বাড়িতে, পুজোর আগে সেবাড়িতে কেউ থাকেনা। আমাদের দোতলায় তো আমরা অলরেডি রাত্রে ঘুমোচ্ছি, মানে সেটা তো আর নতুন নেই। তাহলে আর পুজোর দরকার কি? প্রতিবারের মতো পুজোর কদিন সবাই মিলে হই-চই করলেই হলো, আলাদা পুজো আবার কেন?"

বাবার অকাট্য যুক্তির উত্তরে মা পুজোর উপকারিতা বোঝাতে বসলেন, "আহা বুঝছো না কেন, পুজো সবসময়ই ভালো। বাড়ি নতুন হোক বা পুরনো, তোমাদের সবার ভালোর জন্যই তো পুজো করা। তাছাড়া বেশি কিছু তো হবে না, সকালে পুজো আর দুপুরে খাওয়া-দাওয়া, ব্যস। এই দ্যাখো লিস্ট বানিয়ে রেখেছি, চল্লিশজন হচ্ছে"

"চল্‌-লিশ! কোত্থেকে?!" বাবার জিজ্ঞাসায় মায়ের মুখ থমথমে হয়ে উঠলো।  আবহাওয়া গরম হচ্ছে দেখে বাবা তড়িঘড়ি সামলালেন "মাত্র চল্লিশ! আমি ভাবলাম একশো ছাড়াবে"!

অষ্টমীতে গৃহপ্রবেশের দিন আছে, ঠিক হল ঐদিন আমাদের 'দোতলা প্রবেশ'এর পুজো হবে।

অষ্টমীর দিন সকাল থেকেই ব্যস্ততা। অন্যান্য বারের মতো আগের দিন ঠাকুর দেখে রাত বারোটায় বাড়ি ফেরা হয়নি। সপ্তমীর সন্ধেয় বেরনোর প্রোগ্রামটাই বাতিল হয়ে গেছে পরেরদিনের পুজোর জোগাড়ের জন্য। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সক্কাল সক্কাল উঠে মা-মাসি দের তাড়ায় চান সেরে পুজোর জন্য চন্দন বাটা, ফুল সাজানো এইসব কাজ, তাও আবার উপোস ক'রে। পুজো মিটলে তবে নাকি খাওয়াদাওয়ার পাট শুরু হবে। কে না জানে সামনে খাবার ভর্তি থালা থাকলে যত ক্ষিধে পায়, "উপোস করছি" ভাবলেই ক্ষিধে পায় তার তিনগুণ!

পুজো, পুজোর পর নতুন দোতলায় মেঝেতে পাত পেড়ে বসে জনা চল্লিশেকের হই-হই করে খাওয়া-দাওয়া পর্ব ভালোভাবেই মিটল, বিকেল চারটে নাগাদ শুরু হলো কেলো, থুড়ি, মেঘের কীর্তি। হঠাৎ দেখি, আকাশ অন্ধকার করে বিকেলেই সন্ধে নেমে এসেছে, আর বেশ শনশন আওয়াজ করে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নভেম্বরে কালবৈশাখী! চৈত্র-বৈশাখের ঘাটতি অঘ্রাণে পুষিয়ে নিতে চাইছে নাকি? এরকম তো কথা ছিলো না! ঘণ্টাখানেক আগেও আকাশ দিব্যি ঝকঝকে ছিল। জ্ঞান হয়ে অব্দি জগদ্ধাত্রী পুজোয় কখনো ঝড়বৃষ্টি দেখিনি, এবার সেটা দেখতে হবে ভেবে মনটা খারাপ লাগছিল।

 দেখতে দেখতে চড়বড় চড়বড় আওয়াজ করে শুরু হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি। বাড়িতে তখন আমরা আঠেরো জন। হুড়োহুড়ি করে জানলা দরজা বন্ধ করে সবাই একটু হাঁফ জিরোতে যেই বসেছি, ব্যস, লোডশেডিং। "এই রে, ঝড়বৃষ্টির জন্য পাওয়ার গেল বোধহয়। কখন আসবে কে জানে! কি যে হচ্ছে এবার?" বাবার ঘোষণা শুনে সবাই মুষড়ে পড়লাম। একে তো পুজোর মধ্যে বৃষ্টি ব্যাপারটাই মন খারাপ করে দেয়, তারপর আবার লোডশেডিং!কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর মামা হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো। ঘরের কোণে আমার আর দিদির গোঁজ করে রাখা মুখগুলো দেখে বোধহয় মায়া হয়েছিল।

"দিদি, ক'টা ছাতা আছে রে বাড়িতে? তুতু-বুবু চল্‌ খুঁজবি চল্‌ ক'টা ছাতা পাওয়া যায়"।

মা-ও উঠলেন ছাতা খুঁজতে। আনাচে-কানাচে খুঁজে সাতটা বিভিন্ন সাইজের ছাতা পাওয়া গেল, তার মধ্যে একটা খুললে সহজে বন্ধ হয় না, বন্ধ হলে খুলতে চায় না।

"এক-একটা ছাতায় দুজন করে হলে মোট চোদ্দোজন, বাকি চারজন কি ভিজবে?"

আরে, মামা তো দারুণ প্ল্যান করেছে। ছাতা নিয়ে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরনো! দশমীর আগেই আমাদের ছাতাওয়ালা প্রসেশন। আর সঙ্গে যদি থাকে সাতটা টর্চ, উফ্‌ফ্‌, জমে যাবে তাহলে! ছাতা-টর্চের জোনাকি-থিম প্রসেশন বাম্পার হিট!

 প্ল্যানটা বুঝতে পেরে মান্তুমাসি তাড়াতাড়ি ব্যাগ হাতড়ে দুটো ছাতা আর একটা টর্চ বের করলেন। "দ্যাখো, ভাগ্যিস এনেছিলাম ছাতাদুটো, নইলে আজ বেরনোই হত না।"

দীপঙ্কর মেসো মাসির এই দূরদর্শিতায় মোটেই প্রীত হলেন না, "না বেরলেও ক্ষতি হত না। আমি বেরোচ্ছি না। এই সোফা থেকে আজ সন্ধেয় আমাকে কেউ উঠতে বোলো না"। মেসো পূর্ণ সমর্থন পেলেন বাবার কাছে, "যার যেখানে যাবার ইচ্ছে বেরিয়ে পড়ো, আমরা দুজন বাড়ি ছেড়ে নড়ছি না"।

অগত্যা আটটা ছাতা, ষোলোজন মানুষ। টর্চ পাওয়া গেল তিনটে। 'জোনাকি থিম' সফল হলো না দেখে মনটা দমে গেল, তবে ছাতার প্রসেশনই বা কম কীসে! ইতিমধ্যে কারেণ্ট চলে এসেছে। ষোলোজনের মধ্যে থেকে বেছে বেছে লম্বা-বেঁটে, মোটা-রোগা সবরকম কম্বিনেশন মিলিয়ে মিশিয়ে জুটি তৈরি হলো, যাতে মাথায় বৃষ্টির জল যথাসম্ভব কম পড়ে। বৃষ্টিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আটজোড়া মানুষ আটটা ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়লাম ঠাকুর দেখতে।

রাস্তায় বেরিয়ে কিছুদূর এসে সে এক অসাধারণ দৃশ্য। পরে অনেকবার আফসোস হয়েছে সেই দৃশ্যের ছবি তুলে রাখতে পারিনি বলে। দেখা গেল রাস্তায় হাজার হাজার ছাতা, তার নিচে হাজার হাজার মানুষ। সবাই আমার মামার প্ল্যানে সামিল হয়েছে।

রাস্তায় জল থৈ-থৈ, মাঝেমাঝেই আওয়াজ উঠছে 'ছপাৎ ছপাৎ', ঘাড় উঁচু করে প্যাণ্ডেলের কারুকাজ দেখতে গেলেই সামনের ছাতাওয়ালার ছাতা থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে পিছনে দাঁড়ানো মানুষের গায়ে, পিছনে হেঁটে আসা মানুষের জুতোর জল ছিটকে লাগছে সামনে চলতে থাকা মানুষের গায়ে। প্রথম দু'একবার ঝগড়া করছে দু'পক্ষই, "কিরকম লোক মশাই, দেখে চলুন, গোটা প্যাণ্টটাই তো দিলেন কাদায় ভিজিয়ে", "ও দিদি, ছাতাটা ঠিক করে ধরুন, আমার শাড়িটা তো গেল", একটু পরেই সব্বাই বুঝছে ঝগড়া করা বৃথা। এভাবেই চলতে হবে আজ, বৃষ্টি মাথায় করে ঠাকুর দেখতে বেরনোর প্ল্যান তো আর পাশেরবাড়ির মেজমাইমার নয়, ওটা পুরোপুরি নিজের ইচ্ছে। কাজেই যতক্ষণ না নিজের সেই ইচ্ছে বলছে, "ভাই রে, অনেক হল ঠাকুর দেখা, চান করা, এবার ঘরে ফিরি চল্‌", ততক্ষণ এভাবেই এর গায়ে ছাতার জল গড়িয়ে পড়বে, ওর শাড়িতে কাদা ছিটকে লাগবে, ছাতায় ছাতায় ঠোকাঠুকি হবে, "কেন যে লোকে ঠাকুর দেখতে বেরোয়" বলতে গিয়েই নিজেকে সামলে নেবে ঠাকুর দেখতে বেরনো লোকজন।

বলা বাহুল্য, আমরা ষোলোজনই সেদিন প্রায় চান করে বাড়ি ফিরেছিলাম। এবং সেদিনই ছিল প্রথমদিন, যেদিন বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা সত্ত্বেও মা আমাকে আর দিদিকে একবারের জন্যও বকুনি দেননি। বাড়ি ফিরে আমরা অবাক! বাবা আর মেসো রান্নাঘরে। কোমরে গামছা জড়িয়ে মেসো খিচুড়ির হাঁড়ি নামাচ্ছেন, আর বাবা মন দিয়ে আঠেরো পিস ডিমের ওমলেট ভেজে চলেছেন। সে রাতে ভিজে গায়ে নাক টানতে টানতে গুলিয়ে ফেলছিলাম কোন্‌টা খিচুড়ি-ওমলেট আর কোন্‌টা অমৃত!

উপসংহার হিসাবে যদিও পরের দিন সকাল থেকেই ষোলোজনের হাঁচির কনসার্ট শুরু হয়ে গিয়েছিল। হাঁচির চোটে কখনো মা-মাসি দের চায়ের কাপ থেকে চা চলকে পড়ছে, তো কখনো ছোড়দাদুর বাড়ি কাঁপানো হাঁচির আওয়াজে চমকে পালাতে গিয়ে পাড়াতুতো বেড়াল কম্বল নার্ভাস হয়ে পিছলে পড়ছে মেঝেয়।

যাইহোক, আমাদের 'দোতলা-প্রবেশ, বৃষ্টি-পুজো-ছাতা প্রসেশন সবে মিলেমিশে সেবারের জগদ্ধাত্রী পুজো বেশ ঘটনাবহুল ছিল। তবে সেবার বৃষ্টির হুজ্জোতি চলেছিল আরো দু'দিন, এবং পুজোর বিসর্জন বরাবরের মত দশমীতে না হয়ে হয়েছিল একাদশীর দিন। সুতরাং, আমরা বইপত্তর ঝেড়েঝুড়ে পড়াশুনোর পর্ব শুরু করেছিলাম আরো একদিন দেরিতে। বুকের ভেতরের "ধুত্‌! আবার পড়তে বসতে হবে!" ভাবটাকে আরো একদিন সরিয়ে রাখা গিয়েছিল সেবার।

Sunday, 19 May 2013

ছুটি-ঘড়ি-আর সব

আমার দিদার একটা রিস্টওয়াচ ছিলো। দিদা আর ছোড়দিদা দুজনের একটাই ঘড়ি। আমি যখন ক্লাস এইট-এ, তখন বোধহয় মামা ওনাদের কিনে দিয়েছিলেন ঘড়িটা। মামা বলেছিলেন দুজনকে দুটো কিনে দেবেন, কিন্তু দিদারা রাজি হননি। টাইটান-এর ঘড়ি। আমরা কেউই ঘড়িটা ওনাদের খুব বেশি পরতে দেখিনি। আমার তো মনে পড়েনা।
অথচ একদম যে বাড়ি থেকে বেরতেন না, তাও নয়, মাসে একবার অন্তত বেরতেই হত পেনশন আনতে, তখন পরতেন সরু পাড়ের সাদা ছাপা অথবা তাঁতের শাড়ী, প্রথম শর্ত শাড়ীটা নরম হতে হবে, এতটুকু বেশি মাড়ওয়ালা খড়মড়ে শাড়ী হলে চলবেনা। সঙ্গে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ, যেটা ওনারা কখনোই ঠিকমতো কাঁধে নিতেননা, হাতেই থাকতো।
আমরা যখন স্কুলের লম্বা ছুটিতে মামারবাড়ি যেতাম, আমাদের সেবাড়ির প্রতি আকর্ষণের অন্যতম কারণ ছিল দিদার এই পেনশন তুলতে যাওয়া। সেদিন সকালে দিদা স্নান করে তৈরি হয়ে বেরোতেন। উনি বেরনোর সময় যে হাল্কা ওডিকোলনের গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে থাকত, সেটাও মামারবাড়িকে ভালোলাগার আরেকটা কারণ ছিলো। মায়েদের ব্যবহারের সেণ্ট-এ কেন যে সেই গন্ধটা পেতাম না ছোটবেলায় বুঝতাম না, এটাও বুঝতাম না, মা, মাসিমণিরা কেন ওডিকোলন ব্যবহার করতেন না।
দিদা বাইরে বেরনোর পরে উন্মুখ হয়ে থাকতাম কখন উনি ফিরবেন। কারণ, ফেরার পরেই ব্যাগ থেকে একে-একে বেরোতো ঠোঙাভর্তি সাদা চক, চিনি বসানো নরম রঙ্গিন জেলি লজেন্স, কখনো বাদাম-তক্তি।
যখন ঘড়িটা কেনা হয়েছে ততদিনে আমার কাছে মামারবাড়ির আকর্ষণের ক্ষেত্র বদলেছে, আমি খুঁজে পেয়েছি সাত টাকা দামের সেলাম প্রফেসর শঙ্কু, মামার পৈতেয় পাওয়া শার্লক হোমস অমনিবাস, প্রায় তিরিশ বছর আগের কেনা রবীন্দ্ররচনাবলী আর পুরনো বইয়ের গন্ধ। তা-ও দিদার পেনশন আনতে বেরনোর সাজটি আমি মন দিয়েই লক্ষ্য করতাম, ঘড়িটা কখনো হাতে দেখিনি। ছোড়দিদা, মানে দিদার সাতবছরের ছোট বোন, তিনিও সেটা কখনো হাতে পরেননি। ঘড়িটা বসার ঘরের শোকেসের উপর সুন্দর কেসের মধ্যে প্যাক করে রাখা থাকতো। কোনও আত্মীয় বন্ধু বাড়িতে এলে ওনারা কিন্তু কখনো জানাতে ভুলতেন না যে ছেলে ওনাদের ঘড়ি কিনে দিয়েছে!
মামা ঘড়িটা দেখলেই রেগে যেতেন। তিনি শখ করে কিনে এনেছিলেন মা-মাসি ঘড়ি পরবে বলে, সেটাকে প্যাকেটমোড়া হয়ে থাকতে দেখলে রাগ তো হবেই।
বছরখানেক কেটেছে। মামার বিয়ের কিছুদিন পরে, বোধহয় ক্লাস নাইনের পুজোর ছুটি, ঠিক মনে নেই। একদিন দিদাদের মনে হলো আমার সামনে মাধ্যমিক, সময় দেখে পড়াশুনা করা এবং পরীক্ষায় ঘড়ি পরে যাওয়া অতি আবশ্যক। সন্ধ্যেবেলা মামা বাড়ি ফিরলে দিদা বললেন আমরা আর ঘড়ি কোথায় পরে যাই? এখানে ওটা পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হবে, ওটা আমরা তুতুকে দিচ্ছি। ওর এখন সামনে পরীক্ষা, ঘড়ি খুব দরকার"। অগত্যা আমায় নিতেই হলো। এখন বলছি বটে নিতেই হলো, তখন মনে হয়েছিল একলাফে আমি পনেরো থেকে আঠেরোর কোঠায় পৌঁছে গিয়েছি। এর আগে বাবাকে একবার বলেছিলাম ঘড়ি না থাকার অসুবিধার কথা, বাবা-মা চটজলদি সমাধানরূপে মায়ের বিয়ের ঘড়ি এগিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা হাতে গলিয়ে দেখেওছিলাম, জিনিসটা ঘড়ি না চুড়ি কি ভাবলে ভাল লাগবে বুঝতে পারিনি বলে আর পরা হয়নি। এখন ঘড়িটা হাতে পেয়ে কি আর করবো, খুবই কুন্ঠিত মুখ করে হাতে নিলাম।  সেবার ছুটির পর টানা সাতদিন স্কুলে পরে গিয়েছিলাম ঘড়িটা। ক্লাসের মোটামুটি সবাইকে দেখিয়ে উত্তেজনাটা একটু কমেছিলো, তারপর শুধু পরীক্ষাতেই হাতে বেঁধে যেতাম। পরীক্ষার প্রথম দিন বোধহয় মিনিট পনেরো বেশি সময় লেগেছিল ঘড়িটাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে।
এরপর বেশ কয়েকটা বছর কেটেছে। উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছি, দিদা আমাদের ছেড়ে ওনার পূর্বপুরুষদের কাছে গিয়েছেন, আমি অপ্রত্যাশিতভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শুরু করেছি, কিন্তু ঘড়িটাকে ছাড়তে পারিনি। এই ক'বছরে বার দুয়েক ব্যাণ্ড পাল্টাতে হয়েছে, তাছাড়া সে ঘড়ি দিব্যি সুস্থ থেকে আমায় সময় দিয়েছে।
 স্কুলের পরীক্ষা-যুদ্ধে আমার স্থায়ী কিছু অস্ত্র ছিল-----একটা রবার ব্যাণ্ড জড়ানো ভাঙ্গা সবুজ রেনল্ডস জেটার পেন, একটা হাল্কা সবুজ (রংটা একমাত্র আমিই বুঝতে পারতাম) রুমাল, যেটায় জেটার-এর ধেবড়ে যাওয়া অক্ষমতার বহু চিহ্ন মুছে রাখা থাকত, আর ক্লাস নাইন থেকে এই ঘড়িটা। কলেজে আসা, হোস্টেল গোছানো, এসবের মাঝে কবে যেন পেনটা আর রুমালটা হারিয়ে ফেলেছি। ঘড়ির সাথে সম্পর্কটা আর ভাঙতে পারিনি।
ঘড়িটা হাতে পরলে মনে হত দিদা যা যা দেখে যেতে পারেননি, সেসব দেখুক এই ঘড়ি। আমার পরীক্ষায় পাশ, চাকরি, প্রথম প্রেম, অনুরাগ, অভিমান, সবকিছুরই সাক্ষী রুপোলি ডায়াল আর সোনালি কাঁটার ঘড়িটা।
বয়স বাড়লো, সময় এল ছোট্টবেলার অগোছালো ঘর ছেড়ে মনের মানুষের ঘর গোছাতে যাওয়ার, সেই উপলক্ষ্যে সাথে নিলাম টাইটান রাগা-র  এক সোনালি সুন্দরী তন্বীকে। বড় হওয়ার অনুভূতি জানা রুপোলি ডায়াল অবশ্য আমার সাথেই নতুন সংসারে গেল। আমার ধারণা ছিল ওটা সঙ্গে না থাকলে আমি ভালো থাকবো না। অষ্টমঙ্গলায় বাড়ি এসে মনে হল ঘড়িটার একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। অনেকগুলো বছর আমার সাথে থেকেছে, আমার নানা অত্যাচার সয়েছে, এবার আমার পরীক্ষা দেওয়ার পালা। দেখি বড় হয়েছি কিনা। তুলে রাখলাম যত্ন ক'রে।
বছর খানেক কেটেছে তারপর। একদিন মনটা খুব অগোছালো হয়ে রয়েছে, টাইম মেশিনে বছর পনেরো পিছিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, মনে পড়লো ঘড়িটার কথা।  খুঁজতে লাগলাম। মনে পড়ছে না কিছুতেই কোথায় রেখেছি। ঘণ্টাখানেক হয়ে গেছে ওলোটপালোট করছি আমার আলমারি, বইএর তাক, সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সমস্ত জায়গা। এক-একটা সেকেণ্ড মনে হচ্ছে অনন্তকাল। শেষ অবধি ঘড়িটা পাওয়া গেল বিয়ের গয়নার বাক্স থেকে।
এতক্ষণের গলার ব্যথাটা এখন চোখের জল হয়ে অঝোরধারে বেরিয়ে এল। কেন কাঁদছি নিজেই বুঝছি না, কান্না থামাতেও পারছিনা, বয়সটা যেন সত্যিই পিছিয়ে গেছে বছর পনেরো আগে। এটা কী অনেকদিন পর ছোটবেলার সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার আনন্দ? নাকি ছোটবেলাটাই হারিয়ে ফেলেছি, সেই কষ্ট? জানিনা। তবে, এই প্রায় মাঝতিরিশেও যে ষোলোর মতোই চোখ জলে ভেসে যায় না জানা কারণে, ঘড়িটা খুঁজে না পেলে জানতেই পারতাম না।।