Tuesday, 14 February 2017

চল্‌ যাব তোকে নিয়ে



দিন গুলো চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে কি তোমায়? একছুট্টে কোথাও পালিয়ে গিয়ে দিনকতক ঘাপটি মেরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে কি? চলো তাহলে, সেরে আসি একটা ছোট্ট সফর।

কি বলছ? ছুটি নেওয়া অসম্ভব? আরে না মশাই, ছুটি নিতে বলছে কে? শুধু ছুটি কেন, টিকিট, ব্যাগ, ক্যামেরা, জলের বোতল, রোদ্দুর আড়াল করার টুপি, নিজেকে আড়াল করার রোদচশমা—কিচ্ছুটি সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই। এমনকি, যাদের সঙ্গে তোমার সারাদিনের কিচির-মিচির চলে, তাদেরও কাউকে ডেকো না। বেরিয়ে পড়ো শুদ্ধু নিজেকে নিয়ে, শুদ্ধ নিজেকে নিয়ে।

ভাবছ, এমন ঝাড়া-হাত-পা হয়ে যাবে কোথায়? আহা, নিজের মনটাকে একটু ভরসা করোই না বাপু! বলি কি, একদিন একটু কষ্ট করে ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে পড়ো। বসন্ত তো এসেই গেছে, ভোররাতে বিছানা ছাড়তে বুকে আর অতটা কাঁপন ধরবে না এখন। চোখ কচলে উঠোনে এসে কুস্‌মি-লাল সূর্যটার ঘুম-ভাঙ্গা হাসি গায়ে মেখে ঝুপ করে একখানা ডুব দাও মনের গহীনে। ডুব দিয়েই দ্যাখো না একবার, কাছেপিঠে একখানা জঙ্গল পাবেই পাবে। সেই তেমন জঙ্গল, যেখানে হাতে তৈরি রাস্তার থাকতে মানা, সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গালগল্প করতে থাকা গাছেদের পাশ দিয়ে কারা যেন হেঁটে গিয়ে তৈরি করে দিয়েছে পায়ে-চলা পথ, সে পথ এমনিতে ঢেকে থাকে গাছেদের ঝরানো পাতায়, কেবল তুমি আসবে বলেই আজ হাওয়া এসে পাতা সরিয়ে সে পথকে মেলে ধরেছে তোমার পায়ের সামনে। চলো, এগিয়ে চলো, পায়ের নীচে ঝরা পাতা-রা তোমারই ভুলে মচ-মচ আওয়াজে ধুলো হয়ে যাচ্ছে, “সর্‌-সর্‌” আওয়াজ তুলে সাবধানী হাওয়া কিছু অবাধ্য পাতাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার গাছ-মায়ের কাছে,এসবের মাঝ দিয়ে তুমি হেঁটে চলো।

কখনো যদি মনে হয়, কেউ বুঝি পিছু পিছু হেঁটে আসছে, উতলা হয়োনা। আসলে আর কেউ নেই,এখানে কেউ পিছু নেয় না। ও তোমারই পায়ের শব্দ। নিজের পায়ের আওয়াজ তেমনভাবে রোজ শোনা হয় না কিনা, তাই চিনতে পারছিলে না। এবার দু’পাশে তাকিয়ে দেখো, তুমি এসেছ ব’লে এরা সব কত্ত খুশি। ডাল-পাতা-পত্তর মেলে দিয়ে সবাই কেমন দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে তোমায়! আহা, যাও, ওদের কারো পায়ের কাছটায় দু’দণ্ড বোসো, শুনবে ওরা হাসতে হাসতে বলছে, “বাব্বাঃ! শেষ পর্যন্ত ঠিকানা খুঁজে এলি তাহলে! পুরোটা যে আসতে পারবি, ভাবিইনি কখনো!”

কারো কারো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আবার দেখবে তোমার গায়ে টুপ-টুপ করে ঝরে পড়ছে দু’চার ফোঁটা জল। রাতের পুরনো শিশির ভেবে মুছে ফেলো না যেন! এরা আনন্দাশ্রু। তুমি যে নিজেকে সঙ্গে করে এসেছ ওদের কাছে, তাই আজ আনন্দ বাঁধ মানছে না।

নিজের সঙ্গে শেষ কবে একলা হয়েছ, তলিয়ে ভাবো যদি, দেখবে তোমারও দু’চোখের কোণ ভিজে উঠছে।

খুব বেশি সময় তো হাতে নেই, চোখ মুছে এগিয়ে চলো আরও। একটু পরে জঙ্গল শেষ হয়ে আসবে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখবে পায়ে-চলা রাস্তাটা ঢালু হয়ে গিয়ে নেমেছে এক তিরতিরে নদীর কোলে। ভারি রোগা আর মিষ্টি সে। হাত নেড়ে তোমায় কাছে ডাকছে আর কলকল করে কত কথা বলছে। সে ভাষা বোঝা তোমার কম্ম নয়, তবে তার জলে পা ডোবাও, দেখবে তোমার এতবছরের জমে ওঠা ক্লান্তি, অভিমান সে কেমন শুষে নিচ্ছে, আর তার আলতো হাওয়া তোমার এলোমেলো চুলে কেমন বিলি কেটে দু’চোখে ঘুম এনে দিচ্ছে। অনেকদিন আগে কে যেন এভাবেই তোমার চোখে ঘুম এনে দিত না? তার হলুদমাখা আটপৌরে আঁচল তোমার ক্লান্তি মুছিয়ে দিত না এইভাবেই?

ওহো, বলতে ভুলে গিয়েছি, নদীর পাড়ে নামার রাস্তাটা কিন্তু একটু পিচ্ছিল। অবশ্য তোমায় তো রোজ এর চেয়ে অনেক বেশি পিছল রাস্তায় চলাফেরা করতে হয়। অভ্যেস হয়ে গেছে নিশ্চয়ই এতদিনে!

অমন সুন্দর নদী, তার জলে নিজেকে না ধুলে চলে নাকি? নেমে পড়ো নদীর কোলে। এতদিন ধরে যত ছাল-বাকল-মুখোশ-চাদর গায়ে জড়িয়েছ, সেসব খুলে পরিপাটি ভাঁজ করে শুকনো ডাঙ্গায় রেখে তবেই জলে নেমো কিন্তু! জঙ্গলের চৌকাঠ পেরিয়ে এপাশে আসার আগেই আবার ধরাচূড়ো পরে ফেলতে হবে। নইলে যে চেনা মানুষেরও সাধ্যি হবে না তোমায় চেনার। 

নাও, এবার বয়ে চলা নদীর জলে নিজেকে বেশ করে ঘষেমেজে ধুয়ে নাও। নিজেকে নিয়ে যা কিছু ধন্দ আছে মনের খাঁজে, দূর করে দাও সব। সূর্যের আলোয় নদীর আয়নায় নিজেকে দেখে নাও ভালো ক’রে। নিজের যা-কিছু সাদা, যা-কিছু কালো, সেসব মিলিয়ে মিশিয়ে তুমি ধূসর, নাকি তুমি রঙিন, সে দ্বন্দ্বের মীমাংসা আজকেই করে নাও। একবার এপাশে এসে পড়লে আর সুযোগ মিলবে না। রঙিন আলোয় নিজেকে দেখতে দেখতে নিজের আসল রঙখানাই ভুলে যাবে দিনে দিনে।

এবার তো ফিরতে হবে, নিজেকে গুছিয়ে নাও। সেই যাদের সঙ্গে তোমার দিন যাপন, তাদের কেউ এখনও চায়ের কাপ হাতে তোমার অপেক্ষায়, কেউ একটু পরেই বাসস্ট্যাণ্ডে এসে তোমায় খুঁজবে, কেউ-বা অফিসের করিডর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে উঁকি দিয়ে দেখে যাবে তুমি চেয়ারে বসে নিজের কাজে মগ্ন কিনা। এদের জন্যই সফর শেষ করে ফিরতে হবে তোমায়।

মন খারাপ কোরো না। ঠিকানা তো রইলোই। যখন-তখন, ইচ্ছে হলেই ঘুরে এসো। তোমার সঙ্গে থাকা ওদেরও দিয়ো ঠিকানাটা। হয়ত ওরাও কেউ হঠাৎ কোনোদিন পৌঁছে যাবে সেই নদীটার কাছে, আর গলা মেলাবে নদীর কাছে রেখে আসা তোমার গানের সাথে,
“বাহিরে নয় বাহিরে নয়                  ভিতরে জলে ভাসতে বলো
আমায় ভালবাসতে বলো               ভীষণ ভালবাসতে বলো”।।
  

1 comment: