Sunday, 7 May 2017

এতদিনে বুঝিলাম...

গত বছর আমার বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করেছিলাম পুজো বলতে অবশ্য যদি ভাবেন, বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসারে ষোড়শপচার সাজিয়ে আসন পেতে মা লক্ষ্মীকে বসতে ডেকেছিলাম, তাহলে আমায় অতিরিক্ত ভক্তীমতী ভেবে ফেলা হবে অতটা আমি নই সত্যি বলতে কি, দুর্গাপুজোর আগে থেকেই মনটা অনবরত নারকেল নাড়ু-মুড়ির মোয়ার নাম জপছিল, তাকে ধমকে থামানো যাচ্ছিল না মোটে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোয় কেউ না কেউ নিশ্চয়ই কোজাগরী পূর্ণিমায় পুজো করেন, আমার বছর দুয়েকের কন্যার জনপ্রিয়তা সেসব বাড়িতে কিছু কম নয়, তার দৌলতে নিশ্চয়ই দু'তিন বাটি নাড়ু-মোয়া বাড়িতে আসবে ও মা, সে গুড়ে বালি! খোঁজ নিয়ে জানলাম পাড়াতুতো কাকীমা-বৌদি-ননদরা যে যার দেশে রওনা দিচ্ছেন লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষ্যে এদিকে আমার মনের ততক্ষণে পুজোর লুচি-মোহনভোগের কথা মনে পড়ে গেছে

ছোটবেলায়  প্রতিবছর টুটুনমাসীদের বাড়িতে পাত পেড়ে কলা-আপেলকুচি-নাড়ু-লুচি-মোহনভোগ খেয়ে বাড়ি এসে খোঁজ নিতাম আর কাদের বাড়ি থেকে প্রসাদ এসেছে, যাতে পরদিন সকালেও প্রসাদ থাকছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়

সেসব দিন বহুকাল হল ইতিহাস হয়েছে, তবে পুজোর দিন মায়ের হাতের নারকেল নাড়ু প্রতি বছরই পাওয়া যেত মা নিজের  অফিস এবং সংসার সামলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে লক্ষ্মীপুজোর আগের সন্ধেয় নারকেল নাড়ু তৈরি করতেন দুর্গাপুজোর পরেই অফিসে কাজের চাপে লক্ষ্মীপুজোয় আর ছুটি নেওয়া যেত না, ব্যস্ত সকালে ঝড়ের বেগে কাজকর্ম মিটিয়ে নতুন একটা শাড়ি পরে মা-লক্ষ্মীর আরাধনা নিজের মত করে সেরে নিয়ে অফিসের পথে পা বাড়াতেন আমাদের স্কুল-কলেজ ছুটি থাকলেও আমরা বিশেষ কিছুই করতাম না, বড়জোর মায়ের শাড়ির কুঁচি ধরে দেওয়া, কিংবা কোনো বছর একটু সকাল-সকাল চান সেরে দু'একটা ফল কেটে রাখা বা ঠাকুরঘর মুছে রাখা, এটুকুই প্রসাদ খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজই বাধ্যতামূলক বলে আমাদের মনে হতনা মা নিজেই উদ্যোগী হয়ে একা হাতে সব করতেন 

তা, বছরতিনেক হল সে রীতিরও ইতি হয়েছে মা নিজেই মা-লক্ষ্মীর কাছে গিয়ে পৌঁছেছেন, বোধহয় আরও মন দিয়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ চাইবেন বলেই মা নেই, ওসব-ও আর হয় না

তবে এবার পুজোর আগে থেকেই মনটা বড় প্রসাদ প্রসাদ করছিল কিনা, তাই লোভে পড়ে ভেবে ফেললাম আমিই যদি বাড়িতে প্রসাদ, মানে পুজোর জোগাড় করে ফেলি? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমি পুজোআচ্চার নিয়মকানুন বিশেষ কিছুই জানিনা যেকোনো পুজোর আগে আলপনা আঁকা, বাসনকোসন ঘষেমেজে ধুয়ে তাতে নানা উপাদেয় খাবারদাবার নিয়ে ঠাকুরঘরে সাজিয়ে রাখা, ফুল জোগাড় হলে ভাল, নহলে শুধু হাত জোড় করেই "ঠাকুর তুমি ভাল থাকো, তাহলেই আমরা ভাল থাকব" গোত্রের প্রার্থনা করা (পৃথিবীর সাতশো কোটি মানুষের রোজ দু'বেলা চোদ্দোশো কোটি চাওয়া মেটাতে ভগবান জেরবার তাঁর ভাল থাকার কথাটাও তো ভাবতে হবে!),এবং সবশেষে হাত ধুয়ে এসে ঐসব নানাবিধ সুখাদ্য আয়েস করে বসে খেয়ে আঙ্গুল চাটা--- আমার কাছে পুজোর অত্যাবশ্যক কাজ হল এগুলোই

আমার ডেরায় আমিই সর্বেসর্বা কাজেই প্রসাদের লিস্টি আমি নিজেই বানিয়ে ফেললাম মেয়ের বাবা কোথায় যেন গিয়েছিলেন অফিস ট্যুর উপলক্ষ্যে (গিন্নির প্রসাদভক্তির ঠ্যালায় বাজার করতে বেরনোর চেয়ে অফিস ট্যুর শতগুণে আদরণীয়, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ মানুষ-মাত্রেই একমত হবেন), ফিরবেন পুজোর দিন বিকেলে, অগত্যা বাঁ কাঁখে মেয়েকে চেপে ডান হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম বাজারের দিকে

বাচ্চা কোলে বাজার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা আশা করি আমার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবেন আমার নিজেরও একসময়, তখনও মা হইনি, মনে হত, "আহা, ফুলের মত বাচ্চাগুলো প্রজাপতির মত খেলে বেড়ায়" ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু এখন কাঁধের ঝোলা, কোলের বাচ্চা, হাতের থলে সবকিছু একসঙ্গে সামলে বাজার করার পরিস্থিতিতে পড়লে নিজের বাচ্চাকে দেখেও উড়ন্ত আরশোলা কিংবা খেলে বেড়ানো ছাগলছানা ছাড়া অন্য কোনো উপমা মাথায় আসে না, বিশ্বাস করুন!
যাই হোক,মহৎ উদ্দেশ্যে মানুষ উদ্যোগী হলে ভগবান সহায় হন, তাই মেয়ে বার দুয়েক মুড়কি-বাতাসার ঝুড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও, এবং বাধা পেলেই বার বার মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়া সত্ত্বেও মোটের উপর নির্বিঘ্নেই একথলি বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম

পরদিন ভোরবেলায় উঠব ভেবে রেখেছিলাম, ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম আটটা বেজে গেছে নিজের ঘুমের রাশ কেন যে নিজের হাতে থাকে না কে জানে? যাই হোক, রান্নার জোগাড় করতে করতে হঠাৎ মনে হল সবাই তো শুনেছি সারাদিন উপবাসী থেকে সন্ধ্যেবেলায় লক্ষ্মীপুজো করে, আমিও করব নাকি উপোস? এমনিতে ঘণ্টাতিনেকের বেশি না খেয়ে আমি থাকতে পারি না, তায় আবার লো প্রেশারের ধাত! মাথা ঘুরে পড়ে গেলে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হবে তার ওপর 'উপোস করছি' ভাবলেই বেশি ক্ষিধে পায় ঠিক করলাম উপোসই করব, তবে ফি-ঘণ্টায় এক গেলাস করে শরবত খেয়ে যাব

দুপুরে মেনু ছিল গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি আর আলুর দম খাওয়ার লোক বলতে কন্যে,তাও আবার সে হাঁ করবে আর আমি খাওয়াব ভাবুন দেখি একবার, নুন-চিনির শরবত খেয়ে উপোস করে আছেন, সামনে বেড়ে রেখেছেন এক থালা ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর আলুর দম কতখানি সহনশক্তি থাকলে ওই ধোঁয়া-ওঠা থালার হাতছানি এড়িয়ে থাকা যায়! কিন্তু আমি তো দিব্যি মুখ ফিরিয়ে রইলাম! তবে কি এ মাহাত্ম্য উপোসের , নাকি বিকেলের হবু প্রসাদের, কি জানি??

মনের কষ্ট মনেই চেপে রেখে "উপোস করে চোদ্দোবার 'ক্ষিধে পাচ্ছে ক্ষিধে পাচ্ছে' ভাবতে নেই" এসব আউড়ে মনকে ধমকে চুপ করানো হল এরপর মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ভোগ রান্নার পালা সকালে অবশ্য নারকেল কোরা সেরে রাখা হয়েছে পাশে বসে মেয়ে মন দিয়ে নারকেল কোরা দেখেছে (বেড়াল যেভাবে মাছ কোটা দ্যাখে), মাঝে মাঝে থালার দিকে হাত বাড়ালে তাকে বুঝিয়েছি, "বিকেলে আগে ঠাকুর খাবে, মা লক্ষ্মী খাবেন, তারপর আমরা খাব", শুনে ছোট্ট মানুষটা হাত গুটিয়ে নিয়েছে ছবির মধ্যে থেকে হাত বাড়িয়ে মা-লক্ষ্মী যখন নারকেল কোরা খাবেন, তখন তাঁকে না জানি কেমন দেখতে লাগবে, এসবই বোধকরি ভাবতে শুরু করেছে ভারি অবাক হয়ে আর তাকে বারণ করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেছে আরেকটা ছোট্ট মেয়ের কথা, থালায় রাখা সাদা নারকেল কোরা দেখলে আর গুড়ের পাক দেওয়া নারকেল নাড়ুর গন্ধে যার জিভে জল আসতোই আসতো, আর মায়ের নরম-গরম চাউনিতে জিভের জল গিলে নিয়ে সে-ই কখন পুজোর শেষে থালায় করে মা প্রসাদ আনবে, তার জন্য হা-পিত্যেশ করে তাকে বসে থাকতে হত

মা আর মেয়ে, মেয়ে আর মা--- কি অদ্ভুত ভাবে ভূমিকা গুলো অদল-বদল হয়ে যায়, তাই না! আজ মেয়েকে যখন চোখ রাঙাই, তখন যদি কেউ আমার সামনে আয়না ধরে, তবে বোধহয় আমার চাউনি আর মায়ের সেই নরম-গরম চাউনির মধ্যে বেশ কিছুটা মিল খুঁজে পাব

সন্ধ্যেবেলায় পুজোর শেষে (ক্ষুদে গিন্নি অবশ্য থালায় ভোগ সাজিয়ে ঠাকুরঘরে রাখার পরেই একখানা লুচি আর একখানা নারকেল নাড়ু তুলে গালে পুরেছিল) পড়শিদের প্রসাদ দিয়ে এসে যখন নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসলাম, দেখলাম লুচি, মোহনভোগ, আলুভাজা, নারকেল নাড়ু, মায় সিন্নি অব্দি খাসা হয়েছে খেতে আমি যে এত ভালো রাঁধতে জানি, নিজেই জানতুম না! মা যদি জানতেন তাঁর 'কুটোটি ভেঙে দুটো না করা' মেয়েটা কেবল মায়ের হাতের রান্না খেতে কেমন হত তা মনে করার চেষ্টা করতে করতেই দিব্যি রেঁধে ফেলেছে, বেশ নিশ্চিন্ত হতেন তা, মা-কে তো আর এই নতুন শেখা বিদ্যের নমুনা দেখানো গেল না

মা যেখানে আছেন সবই জানতে পারছেন, আমাদের হাসি-কান্না-রাগ-হৈ-চৈ-এর সব খবরই রাখছেন, এসব ভেবে মনকে আগলানোর চেষ্টা তো করি, কিন্তু মা যে জানতে পারছেনই, সে খবরটা তো আর কেউ এসে আমার কাছে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, সবই তো আমাদের মনগড়া ধারণা, নিজেদের ভাল থাকার জন্য মনকে প্রবোধ দেওয়া, তাই কখনো কখনো মন কিচ্ছুটি বোঝে না সারাদিনের কাজের মাঝে মনের মধ্যেকার একটা ছোট্ট আমি ছোটবেলার সেই রোজকার ভুলগুলো করে আবার মায়ের বকুনি খেতে চায়, আর যে আমিটা বছরদুয়েক হল মা হয়েছে, সে চায় একবার অন্তত তার মা এসে তাকে মা হওয়ার পাঠ দিক, মা হতে শেখাক সে তো আর হওয়ার নয়, তাই নিজের ছোটবেলা-টাকে মনে করতে করতেই মায়ের মত মা হওয়ার একটা বৃথা চেষ্টা করতে থাকি রোজ।।


(এখানে পুজো-আচ্চা সম্পর্কে যা কিছু লিখলাম সবই আমার নিজের মনের কথা যেসব মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে নিয়মিত পূজার্চনা করে থাকেন, তাঁদের মনে কোথাও আঘাত দিয়ে ফেললে তাঁরা যেন নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করে দেন, এই অনুরোধ রইল)


['আমি অনন্যা' পত্রিকা (ISSN:2394-4307), ধানবাদ- January-March 2017 সংখ্যায় প্রকাশিত]

No comments:

Post a Comment