Wednesday, 24 May 2017

কুটুন আর বাবা

কুটুনের বাবার বেশ কিছুদিনের অভিযোগ, মেয়ের দিনযাপনে বাবার অবদানকে একেবারেই প্রচারের আলোয় আনা হচ্ছে না। তাঁকে যতই বোঝানো হোক, বাবা -মেয়ের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে হলে যতখানি সময়ের দরকার ততটা পাওয়া যাচ্ছে না বলেই কাজটা হয়ে উঠছে না, তিনি শোনার মানুষ নন। ব্যাপারটায় চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে টুকরো সময় হাতে নিয়েই বসতে হল, জানিনা বাপু এতটুকু সময়ে দুই প্রতিভাধরের গুণ কতটা গাওয়া যাবে।

সকাল থেকেই শুরু হোক। হপ্তায় তিনদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ে দেখে বাবা পাশে ঘুমোচ্ছে (বাকি দিনগুলোয় নিজেই হাত উল্টে বলে "বাবা অফিসি")। কুটুনের ঘুম ভাঙ্গার পরেও যদি কেউ বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় সেটা এক ধরনের অপরাধ। সঙ্গে সঙ্গে সে তার নিজের ভাষায় বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। শুধু মুখের কথায় বাবা উঠে পড়েন তা নয়, তিনি হয়ত তখন কুটুনের বালিশটাই টেনে আরেকবার চোখ বোজার চেষ্টায় আছেন, কুটুন অমনি  "তুতুন-বালিশ নিও না, ওথো ওথো" বলে তাঁকে ব্যস্ত করে তোলে। সবশেষে বালিশ ধরে টান মারে কিংবা বাবার চোখের পাতা টেনে খোলার চেষ্টা করে, অগত্যা বাবাকে উঠে বসতেই হয়।

এসব কাণ্ড চলাকালীন মা কিন্তু ভুলেও ঘরে ঢোকেন না। কি দরকার বাপু কাঁধ পেতে ঝামেলা নেওয়ার. বাবা মেয়ে থাকুন নিজেদের নিয়ে, উনি ততক্ষণে হাতের কাজ একটু এগিয়ে রাখেন।

এরপর সকালের কাজকম্ম জলখাবার ইত্যাদি সেরে দিন এগোয়। বাবা বাড়িতে থাকলে মায়ের চেষ্টা থাকে কুটুন-সংক্রান্ত বেশিরভাগ দায়িত্ব বাবার হেফাজতে দেওয়ার। তিনি নিজের মনে রান্না, কাচাকুচি, বিছানা ঝাড়া আর ফাঁকে ফাঁকে খবরের কাগজে চোখ বোলানোর কাজ সারেন। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার কাজটা করতে হচ্ছেনা বলে এসব দিনে মায়ের মন ভারি ফুরফুরে থাকে।

ওদিকে তখন খাওয়ার টেবিলে কিংবা সোফায় বসে বাবা আর মেয়ের জলসা শুরু হয়েছে। "আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে",  "ভেঙ্গেচুরে যায় আমাদের ঘরবাড়ি" হয়ে  "ভুখ লাগি ভুখ লাগি" , গানের তালিকা বিশাল। কখনও টেবিলে তাল ঠোকা, কখনও আবেগ সামলাতে না পেরে নাচ, হামাগুড়ি, ডিগবাজি সবই ঢুকে পড়ে জলসার মেনুতে।

মাঝেমধ্যে চলে জল খাওয়া পর্ব। এই কাজটি মা বিশেষ ভাল পারেন না। মায়ের হাতে জলের গ্লাস দেখলেই কুটুন হয় দৌড়ে পালায়, নয়ত জলের গ্লাসটা নিয়ে জলটা হড়াত করে মেঝেতে ঢেলে গায়ে মাথায় মাখে, কিংবা কুলকুচি করার সময় কেমন দেখতে লাগে সেটা আয়নায় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বাড়িতে থাকলে এই দায়িত্বটাও বাবাকেই নিতে হয়। তিনি নিজে একটি বড় কাচের গেলাস নিয়ে এবং এরই একখানা ধাতব সংস্করণ মেয়ের হাতে ধরিয়ে দুজন মিলে মাটিতে বসে গেলাসে গেলাসে ঠোকাঠুকি,  "তুই আগে না আমি আগে" এরকম নানা খেলাধুলো দিয়ে জলপান পর্ব পালন করেন। কখনও কখনও ঘুষ হিসেবে ফ্রিজ থেকে এক টুকরো চকলেটও বেরোয়। বাড়ির সব্বাই তাদের বরাদ্দ পেল কিনা সেদিকেও কুটুনের নজর থাকে।

এরপর শুরু হয় ওনাদের শরীরচর্চা। ধরো বাবা অফিসে বেরোবেন বেলা একটায় (হপ্তায় দুদিন উনি দুপুরের গাড়িতে অফিস যান, দুদিন কাকডাকা ভোরে, আর দুদিন রাত জাগেন), ওনার ব্যায়ামের ক্ষিধে জাগবে বেলা বারোটা নাগাদ। সঙ্গী অবশ্যই ক্ষুদে কুটুন। দুই প্রতিভাবানের এই পর্বের কাজের বহর দেখবার মত।

শুরু হয় দৌড় দিয়ে। বসার ঘর থেকে শোওয়ার ঘরের দেওয়াল... এই রাস্তায় বার দশেক ছুটোছুটি চলে, মেয়েকে অন্তত পাঁচবার জিততে দিতেই হয়। এরপর একে একে বার্পি, এক -দুই (সিট আপ), পুশ আপ, চেয়ারে এক পা তুলে মেঝেতে হাত রেখে খানিকটা কসরৎ, খাওয়ার ঘরের মাথায় বাতিল জিনিস জড়ো করার যে তাক আছে সেইটা ধরে কিছুক্ষণ ঝোলাঝুলি করা (বাবা অবশ্য শক্ত করে মেয়েকে ধরে রাখেন ) , এবং অবশ্যই নমো ব্যায়াম।

এটা কি ব্যাপার? বাবার কাছে একটা ভয়ঙ্কর ভারি বারবেল আছে। তাতে কুটুনের হাত দেওয়া বারণ। বাবাকে ওটা তুলে কায়দা করতে দেখে মেয়ের মনেও শখ জাগত জিনিসটা মাঝেমাঝে ছুঁয়ে দেখার , কিন্তু বকুনির ভয়ে কাছে ঘেঁষা হত না, হাত ঠেকিয়ে নমো করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াতে হত। কিছুদিন এভাবে চলার পর কুটুন আবিষ্কার করল, আরে,  রান্নাঘরে তো বারবেলের মত দেখতে একখানা খাসা জিনিস পাওয়া গেছে। আড়ালে আবডালে হয়ত দু  'একদিন মকশো করেও থাকবে, কেননা, একদিন বাবা বারবেল হাতে তুলতেই "দাঁড়াও আমারটা আনি" বলে গটগটিয়ে রান্নাঘর থেকে রুটি বেলার বেলনখানা এনে হাজির করল। কিচ্ছু বলার নেই, নিরীহ হাল্কা বেলন, কুটুনের হাতে বারবেল হিসেবে দিব্যি মানিয়ে গেল। তারপর থেকে বাবা বারবেল ভাঁজতে শুরু করলেই সে-ও তার বেলন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাবা যদি সেই বারবেলের দুপাশে দু 'খানি বাড়তি ওজনের চাকতি ঝোলান, তবে সেও "আম্মো কম কিসে" গোছের মুখ করে তার বেলনের দুপাশে তার মায়ের দুটি ফিনফিনে চুড়ি ঝুলিয়ে নেয়। সমমানের ব্যায়ামের অধিকার সকলের আছে।

যাই হোক, ব্যায়ামের উত্তেজনা কমার পর ঘড়ির দিকে চোখ পড়লে দেখা যায় সাড়ে বারোটা বাজে। অতঃপর হুড়োহুড়ি, চান এবং খেতে বসা... বাবাকে ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। কুটুনও এই ব্যস্ততার আঁচ পোহায়। বাবা চান করতে ঢুকেছেন, মেয়ে এসে দরজা ধাক্কিয়ে বলে চলল "বাবা সালোতা (সাড়ে বারোটা) বেজে গেছে, বেরোও ", কিংবা মায়ের হাত থেকে ডালের বাটিটা নিজেই নিয়ে পরিবেশনের চেষ্টা, এইসব চলতে থাকে।

বাবা আর মেয়ে একসঙ্গে খেতে বসে। দুজনে টেবিলের দুই প্রান্তে, দুই থালায়। এটা না করলে গোল বাধবেই। বাবা যতই ধোপদুরস্ত জামাপ্যাণ্ট পরে খেতে বসুন না কেন, মেয়ে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে কোলে উঠে বাবার থালা থেকে খাবার মুখে তুলবেই, দু  'এক চামচ দই বাবার জামায় ঢালবেই। তাই এইসময় তাকে নিজের কাজে ব্যস্ত রাখতে হয়।

খাওয়ার পর হুড়োহুড়ি করে জুতোমোজা পরে বাবা অফিসে রওনা হন। বেরোনোর আগে দুজনের টা -টা পর্ব চলে কিছুক্ষণ, শেষ অব্দি মায়ের ঠ্যালায় বাবা গিয়ে লিফটে ওঠেন। কোনও কোনও দিন কুটুনও ঝোলভাত মাখা মুখে বাবার পিছু পিছু দৌড়ায়। মা গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে ঘরে আনেন।

এরপরের বাকি দিনটা মা আর মেয়ের। বাবা ফিরবেন সে - ই রাত সাড়ে দশটায়। মেয়ের ততক্ষণে রাতের খাওয়া সারা, কিন্তু বাবা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত ঘুমোতে নেই, তাই চোখ কচলে ঘুম তাড়িয়ে সে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। বাবা এলে আরেক প্রস্থ নাচ গান বাবার থালায় আরেকবার খাওয়া ইত্যাদি সেরে বাবা আর মা দুজনকেই বগলদাবা করে তবে কুটুনের ঘুমের অবসর মিলবে।

1 comment:

  1. Baba-Meyer ei khelagulor sombondhe pore besh laaglo. Kutun je ki Toon ta saamne theke na dekhle bojha bhar.

    ReplyDelete