Monday, 6 November 2017

গোলাপি তিমির বৃত্তান্ত



সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নীল তিমির ধাক্কায় টেক-স্যাভি গেমপ্রিয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে জীবন থেকে সরে যাওয়ার এক উদ্দাম প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে, মিডিয়ার কল্যাণে সে সংবাদ আমাদের সবার কাছেই পৌঁছেছে। সত্যি বলতে কি, নীল তিমি সংক্রান্ত খেলাটি সম্পর্কে আপনার বিন্দুমাত্র কৌতূহল না থাকলেও সাবধান করার অছিলায় সেটি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য আপনার মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও অনেকে নিয়ে ফেলেছে। তাই এই মারণখেলা নিয়ে বেশি কথা খরচ করছি না। বরং আজ একটা গোলাপি তিমির গল্প শুনব চলুন।

এই 2017-র এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ নামে একটা খেলা শুরু করেছে Baleia Rosa (পর্তুগিজ ভাষায় গোলাপি তিমি) নামক একটি ওয়েবসাইট, ইতিমধ্যে সাড়ে তিন লাখের ওপর লোক তাদের ফেসবুকের পাতায় খেলাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন, খেলতে শুরুও করেছেন।

এইটুকু পড়ে ভুরু কুঁচকে ফেলেছেন তো? ভাবছেন আপদগুলো আবার একটা মরণফাঁদের গল্প শোনাতে এসেছে! আজ্ঞে না মশাই, এ কোনও মরণফাঁদ নয়, বরং নীল তিমির করালগ্রাস থেকে আমার আপনার আশেপাশের সদ্যযৌবন পাওয়া প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার একটা চেষ্টা বলতে পারেন, অন্তত পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জের স্রষ্টাদের বক্তব্য তাই। তা, কেমন এই খেলা?

ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জের মতোই পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমেও রয়েছে পঞ্চাশটি কাজের এক তালিকা, খেলব বলে তাদের খাতায় নাম তুললে আপনাকে টুকটুক করে সেইসব কাজগুলো একে একে সেরে ফেলতে হবে। তবে গোলাপি তিমির দেওয়া কাজগুলো অতীব জীবনমুখী।

হয়তো আপনাকে বলা হল রোজ একটা করে চিরকুটে লিখে ফেলুন সেদিন কি ভাল কাজ করলেন, তারপর সেটা জমা করুন লক্ষ্মীর ভাঁড়ে, এক বছর পর ভাঁড় ভেঙ্গে ভাল কাজের ডায়েরি পড়বেন।

কিংবা ধরুন বাবা-মা-পিসি-মাসি এঁদের সবাইকে আপনি কত্ত ভালবাসেন সেটা তাঁদের জানানোর দায়িত্ব পড়ল আপনার ওপর। তা, এদেশে তো গুরুজনদের জড়িয়ে ধরে 'ভালোবাসি' বলার চল বিশেষ নেই, কাজেই তাঁদের হাতে হাতে ক'টা কাজ করে দেবেন, নিদেনপক্ষে আধঘণ্টাটাক সময় বের করে তাঁদের মুখোমুখি বসে দুটো নিঃস্বার্থ কথা বলবেন, ওতেই ওঁরা আপনার ভালবাসা দিব্যি অনুভব করবেন।

আমাদের দেশে এখন জোরকদমে স্বচ্ছতা অভিযান চলছে। তাতেও উৎসাহ জোগানোর উপায় আছে গোলাপি তিমির কাছে। সারাদিনে একবারের জন্য হলেও যদি অন্য কারও রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা নিজে হাতে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে আসেন, তবে আপনি একজন সফল খেলোয়াড়। বিনা কারণে রাস্তা পরিষ্কার রাখার দায় আমাদের না-ই থাকতে পারে, কিন্তু খেলায় জেতার বাসনায় তো অবশ্যই আমরা রাস্তা সাফসুতরো করে ফেলব, তাই না?

এমন ভালো কাজের তালিকা বেশ লম্বা, যেমন, নিজের অব্যবহৃত জিনিসপত্র দুর্গত মানুষের সাহায্যার্থে দান করা, মজাদার পোশাক পরে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা, মাঝেমধ্যে আয়নার ওপারের মানুষটার সঙ্গে হেসে রঙ্গতামাসা করা, যাতে বোঝা যায় সে সত্যিই ভাল আছে, মেঘের মধ্যে তুলোর ঝুড়ি বা ডাইনোসর লুকিয়ে আছে কিনা তা খোঁজা, মনের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে কাগজে এঁকে ফেলে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য চলতে শুরু করা, এবং সবার শেষে সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি, একটি জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা। জীবন শেষ করে দেওয়ার চেয়ে জীবন বাঁচানো যে অনেক কঠিন কাজ সে তো আমরা সবাই জানি। গোলাপি তিমির ছুঁড়ে দেওয়া এই যে জীবন বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ, এটা যদি কেউ গ্রহণ করে, তবে তার জীবনে হতাশা বলে সম্ভবত আর কিছু থাকবে না। যে মানুষটা হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছিলো, তাকে আরেকটা জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব দিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনা, এই কাজটাই করতে চাইছে গোলাপি তিমি। তার দেওয়া আপাত বালখিল্য কাজগুলো এই উদ্দেশ্যেই তৈরি। বারবার 'তুমি ভালো, তুমি সুন্দর, তুমি কত কিছু করতে পারো!' এগুলো মনে করিয়ে খেলতে থাকা মানুষটার আত্মবিশ্বাসের ভিত পোক্ত করে দেয় সে, যেখানে হতাশার কোনও জায়গা নেই।

 2015 থেকে ওয়েবদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল নীল তিমির আক্রমণ, তার মোকাবিলায় 2017 তে এল গোলাপি তিমি। সাও পাওলোতে সরকারের পক্ষ থেকেও গোলাপি তিমির প্রয়াসকে সমর্থন করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বব্যাপী মারণখেলাকে কিছুটা হলেও রোখা যায়। ভারতেও থাবা বসিয়েছে নীল তিমি, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষেধক হিসেবে এখানেও নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। পিঙ্ক হোয়েল চ্যালেঞ্জ গেমটাকে যদি নাও ব্যবহার করতে চাই, খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ভালো কাজের তালিকাকেও যদি রোজকার জীবনে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, তাতে আর কিছু না হোক, জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগাযোগ বাড়বে, জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অকালে পরপারে পাড়ি দিতে চাওয়ার প্রবণতা তাতে কিছুটা কমতে পারে।।

********************

তথ্যসূত্রঃ
http://baleiarosa.com.br
http://indianexpress.com


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.708159399363905.1073741828.707552542757924/776736352506209/?type=3&source=54

পরিণতি



আধঘণ্টা আগে মধু ফোন করেছিল। কথা বলে ফোন কাটার পরেও সৃজা ব্যালকনিতেই বসে রয়েছে। মা দুবার এসে উঁকি দিয়ে গেছে। রিমির খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে নিজেই ভাত বেড়ে নাতনিকে নিয়ে বসেছে। রোজ মা- ই মেয়েটার পিছনে দৌড়ে বেড়ায় সারাদিন, রোব্বারগুলোয় তাই সৃজা চেষ্টা করে নিজেই রিমির কাজগুলো করতে, মায়ের বুড়ো হাড়ে কত আর সইবে! কিন্তু মধুর কাছে খবরটা পাওয়ার পর থেকে আর উঠতে ইচ্ছে করছে না, ইন ফ্যাক্ট মাথাই কাজ করছে না। মামণি! সেই মামণি, যাকে নিয়ে শুভ্র আর তার দাপুটে বাবাকে বরাবর হাসাহাসি করতে দেখেছে সৃজা, সেই নরম ভীতু মহিলা কাজটা পারলেন কি করে? এ তো আর মাছ চুরি করতে রান্নাঘরে ঢোকা বেড়ালকে ঠ্যাঙানো নয়, এই কাজটা করতে বুকে যতটা সাহস আর মনে যতটা রাগ পুষে   রাখতে হয় ততটা সাহস আর রাগ মামণির কাছে ছিল সেটা কল্পনাই করা যায় না। যে মামণি বিত্তবান রগচটা স্বামী এবং বাপের জুতোয় পা গলানো উকিল ছেলের চোখের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস কোনওদিন পাননি, তিনি এতখানি বল পেলেন কোত্থেকে?
মধু সৃজার স্কুলবেলার বন্ধুদের মধ্যে একজন। সত্যি বলতে কি, একরকম তার ঘটকালিতেই শুভ্র আর সৃজার বিয়েটা হয়েছিল। সে শুভ্রর মাসীর মেয়ে। বিয়ের পর যবে থেকে সৃজা দেহে মনে অব্যক্ত যন্ত্রণা ভোগ করতে শুরু করল, তখন থেকে মধু বেচারী মরমে মরে থাকে। বাল্যসখী বলেই মধুর কাছে মন খুলতো সৃজা, নইলে এসব কথা কি কাউকে বলতে আছে? তবে আরেকজনও বোধহয় মরমে মরে থাকত শুভ্রর কৃতকর্মের জন্য। গুমোট গরমের দিনগুলোতেও যখন পিঠে-হাতে বেল্টের বাড়ির দাগ ঢাকার জন্য সৃজা ফুল স্লিভ কলার তোলা জামা পরে রান্নাঘরে ঢুকত, মামণির কুণ্ঠিত দৃষ্টি তাকে বুঝিয়ে দিত, ছেলের কীর্তি মায়ের অজানা নেই। অসহ্য রাগে মাথা দপদপ করত তখন। এই মানুষটা এত শান্ত, নিজের কথা কোনওদিন জোর গলায় বলেননি বলেই আজ সবাই এঁর মাথায় চড়ে বসেছে। মা হয়ে ছেলেকে শাসন করেননা কেন? শ্বশুরমশাইয়ের আর শুভ্রর কত যে অন্যায় আদেশ মামণি মাথা পেতে নিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। স্বামী খেতে বসলে একটি একটি করে বাটি তাঁর থালার কাছে এগিয়ে দিতে হবে, রান্নার সোয়াদ কোনও একদিন স্বামীর মনোমত না হলে তিনি ভাতের থালায় জল ঢেলে উঠে যাবেন, সেই জলঢালা ভাতের পিণ্ডি গিলবেন মামণি, তাও স্বামীর জন্য নতুন কোনও সুস্বাদু পদ রেঁধে তাঁকে খাইয়ে তবেই। আর এই পুরো সময়টায় স্বামীর কাছে তাঁকে শুনতে হবে রোজগার না করে বাড়িতে বসে ভাত খাওয়ার খোঁটা। এমন ঘটনা সৃজা বহুবার দেখেছে। তার ঠোঁটে চলে আসা শক্ত জবাবগুলোকে সে অতি কষ্টে দমিয়ে রাখত শাশুড়ির মুখ চেয়ে। তিনি তাঁর মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করিয়েছিলেন, সৃজা যেন শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে চাপান উতোরে না যায়।
সৃজা কিচ্ছু বলত না শ্বশুরমশাইকে। শুধু একদিন, বোধহয় লক্ষ্মীপুজোর পরেরদিন কোর্ট খুলছে সেদিন, বাপ -ছেলেয় কোর্টে বেরোচ্ছে, বাপ দেখলেন জুতো দুটোয় ধুলো পড়েছে। তিনি একপাটি জুতো তুলে সপাটে ছুঁড়ে মেরেছিলেন মামণির গায়ের দিকে। সৃজা তখন প্রেগন্যান্ট। সেই অবস্থাতেও ও লাফিয়ে উঠে জুতোটা লুফে নিয়ে ঘটতে চলা পাপটা আটকেছিল। তারপর দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে বলেছিল সেই মুহূর্তে মামণিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। শ্বশুরমশাই বোধহয় তাকে মেরেই বসতেন, মামণি তাঁর পায়ে ধরে তাঁকে থামান। মজার ব্যাপার হল মামণির ছেলেটি কিন্তু এই ঘটনাটি দেখে স্রেফ মজা লুটেছিল , একটা কথাও বলেনি।
সেইদিনই দুপুরে মামণি সৃজাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, এই পোয়াতি অবস্থায় সে যেন ভুলেও বাপ-ব্যাটার কোনও কাজ বা কথার প্রতিবাদ না করে। অবাক হয়ে সৃজা কারণ জিজ্ঞেস করলে মামণি কাঁদতে কাঁদতে শুনিয়েছিলেন তিরিশ বছর আগের ঘটনা। তখন তিনি ছ'মাসের অন্তঃসত্ত্বা, এক রাতে স্বামীর কোনও এক গোপন অনুরোধ রাখতে না চাওয়ায় তাঁর স্বামী লাথি মেরে তাঁকে খাট থেকে ফেলে দেন, ফলতঃ প্রথম সন্তানের বিসর্জন ঘটে।
এই গল্প শুনে সৃজা স্থির থাকতে পারেনি। শুভ্র আর শ্বশুরের অমতেই সে রিমি হওয়ার আগের বাকি দিনগুলো বাপেরবাড়িতে থাকবে বলে চলে এসেছিল। সরাসরি সংঘাতের সেই শুরু। তবে বার ডান্সার রোশনি সিংয়ের রেপকেসটা আগুনে ঘিয়ের কাজ করেছিল কিছুটা। মাঝরাতে রাস্তা থেকে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে খেয়েছিল যারা, শুভ্র তাদেরই বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল আদালতে।  'খারাপ' মেয়েটাকে আরও খারাপ দেখানো যায় কিভাবে, তারই চেষ্টা করছিল মন দিয়ে। ঘেন্না, জাস্ট ঘেন্না করতো সৃজার, তখন লোকটার হাবভাব দেখলে। সম্ভবত সেই ঘেন্না থেকেই রোশনির পাশে দাঁড়িয়ে শুভ্রর বিরুদ্ধে লড়ার শক্তি পেয়েছিল ও। রিমি হওয়ার পর অবশ্য মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুদিন ওবাড়িতে থাকার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ততদিনে জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। শুভ্রকে দেখলে একটা অস্থির রাগ ছাড়া আর কোনও অনুভূতি হত না শেষদিকে। ভাগ্যিস সে চেপে রাখেনি রাগটাকে। চেপে রাখলে হয়তো মামণি আজ যে কাজটা করেছেন সেটা সে-ই করে বসতো!

নতুন পাখি পোষা হয়েছিল আগেই, ডিভোর্স পাকা হয়ে যাওয়ার পর শুভ্র তার নতুন পাখিকে নিয়ে রায়চক-ডায়মণ্ডহারবার পাড়ি দিতে শুরু করেছিল ফি-হপ্তায়, কানাঘুষোয় সৃজা খবর পেতো। মেয়েটির নাম বৃন্দা, বাবা মা নেই, টাকাপয়সাও নয়। কাজেই একে নিয়ে খেলতে শুভ্রর তেমন সমস্যা হচ্ছিলো না, মুশকিল বাধালো মেয়েটা নিজেই। কোনও এক উইকএণ্ড ট্যুরে বোধহয় ওষুধপত্র নিতে ভুলেছিল, সময়েরও গোলমাল হয়ে থাকবে হয়তো, টেস্ট রিপোর্ট দেখা গেল পজিটিভ। ব্যস, মাতৃত্বের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বৃন্দা বিয়ের জন্য ক্ষেপে উঠলো, নইলে যে বাচ্চা নষ্ট করতে হবে! বাচ্চাকে বাঁচানোর কথায় মানুষে আর পাখিতে বিশেষ তফাৎ নেই, জানা কথা। কাজেই লাস্যময়ী নতুন পাখি বৃন্দা নিমেষে গায়ের পালক ফুলিয়ে শুভ্রকে ধাওয়া করে পৌঁছে গেল তাদের বাড়িতে, শেষ ঠোকরটা দেবে বলে।

মধু সেদিন মাসীর কাছেই গেছে। তার সামনেই নাটক শুরু, এবং ক্লাইম্যাক্স। মামণি নাকি বৃন্দার কাছে সব কথা শুনতে শুনতে কেঁপে উঠছিলেন, আর তাঁর ছোট্ট ফরসা মুখখানা টকটকে লাল হয়ে উঠেছিল দেখতে দেখতে। মাসীর শরীর খারাপ লাগছে ভেবে মধু ওঁর হাতদুটো ধরে রেখেছিল শক্ত করে। উনি মধুর হাত ছাড়িয়ে  উঠে গিয়ে শুভ্রকে ডেকে আনেন ঘর থেকে। বলেন, বৃন্দাকে বিয়ের জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে নোটিশ ইত্যাদি দেওয়ার জন্য। ডাক্তার দেখানোর প্রসঙ্গও আনেন। তখনও তাঁর গলার স্বরে উষ্মার আভাস নেই।   এরপর শুভ্র জানিয়ে দেয় অন্যের মাল সে নিজের নামে পুষবে না। সেটা শুনে বৃন্দা ঝাঁঝিয়ে উঠলে রাগের মাথায় শুভ্র তাকে ঠেলে ফেলে দেয় মেঝেতে। শুভ্রর মায়ের হাতের কাছে ছিল দরজার খিল, উনি সেটা দিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে থাকেন তাঁর ছেলের পিঠে। প্রথমে শুভ্র আটকাতে চেষ্টা করে, কিন্তু মামণির গায়ে তখন হাজার হাতির বল ভর করেছে। মধুও আটকাতে গিয়ে পড়ে যায়। শুভ্রর বাবা গেছেন বন্ধুর বাড়ি। ওদিকে বৃন্দাও সব দেখে কেমন এলিয়ে পড়েছে,  মধু কি করবে বুঝতে পারে না। তার মাসী তখনও শুভ্রকে মারছেন আর দুর্বোধ্য ভাষায় উগরে দিচ্ছেন এত বছরের পুষে রাখা রাগ, সারা জীবন ধরে যে অন্যায় ব্যবহার তিনি পেয়েছেন, একটা একটা করে সবক'টা ফিরিয়ে দিচ্ছেন তিনি। এত বছরের জমে থাকা রাগ আজ প্রতিবাদের ভাষা পেয়েছে, আজ তাঁকে রোখে, কার সাধ্যি!

এসব কথা সৃজা শুনেছে মধুর কাছে, শুনেছে আর ভেবেছে, এখনও ভাবছে, সেই নরমসরম ভীতু মহিলা, তিনি তবে রক্তমাংসেরই মানুষ! লোকে যে আড়ালে তাঁকে 'পাপোশ' বলে ডাকত, তাঁর অন্তরেও রাগ অপমান এসবের বোধ ছিল? তাঁর সত্ত্বায় সারা জীবন পা মুছে চলা মানুষদুটোকে তিনি তবে ঘৃণা করতেন? নিশ্চয়ই তাই, নইলে কিসের বশে তিনি এমন কাণ্ড ঘটালেন? সৃজা ভাবতে থাকে, বারবার তার মনে পড়ে সেই কুণ্ঠিত চোখ দুটোকে।।


ধারাবাহিক : ক্রমশ প্রকাশ্যে প্রকাশিত

https://m.facebook.com/kromosho.prokashyo/photos/a.738361219677056.1073741843.707552542757924/788922447954266/?type=3&source=54

উত্তরণ


'সই' এর পাতায় আমার গল্প 'উত্তরণ'।

লিঙ্কঃ

http://www.soicreativewomen.org/blog/silence-like-a-cancer-grows-blog-series/92-uttaran-dhoopchhaya-majumder.html

Wednesday, 9 August 2017

এ ত মেয়ে মেয়ে নয়

রাতের ট্রেন পদ্মাবৎ এক্সপ্রেস। জেনারেল কামরা, তিলধারণের জায়গা নেই। তারই মধ্যে এক কোণায় একখানা সিট পেয়ে বসেছে বাইশ তেইশ বছর বয়সী একটা মেয়ে। একাই যাচ্ছে , সঙ্গে কোনও পুরুষমানুষ নেই। মেয়েটা দিল্লি চলল চাকরির পরীক্ষার ব্যাপারে। একলা বসে নানান কথা ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসেছিল বোধহয়, কাদের যেন গালাগালির চোটে চটকা ভাঙল। ও মা গো, চারটে মুশকো চেহারার লোক, হাতে কিসব ছোরা-ছুরিও আছে মনে হচ্ছে। কি চায় ওরা? ওর গলার হারটা? ওটা ওর মায়ের দেওয়া, বড় দামী জিনিস যে! না না, ওটায় হাত লাগাতে দেবে না কাউকে। দাঁতে দাঁত চেপে ডাকাতগুলোর সঙ্গে লড়তে থাকে একলা মেয়েটা। কামরাভর্তি মানুষ, কিন্তু তারা তো সব 'পাবলিক', আম আদমি, তাই তাদের কারোরই ক্ষমতা হয় না এগিয়ে এসে মেয়েটার পাশে দাঁড়ানোর। সোনার হারটা বাগাতে না পেরে রাগী ডাকাতরা একসময় কয়েকশো আম আদমির চোখের সামনে মেয়েটাকে ধাক্কা মেরে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় রেললাইনে। রেললাইনে পড়ে ট্র্যাক থেকে বাঁ পা -টা সরানোর আগেই সেটার ওপর দিয়ে আরেকখানা ট্রেন চলে যায়।

এরপর মেয়েটা সারারাত ছেঁড়খোঁড়া পা নিয়ে ওইভাবেই পড়ে রইল রেললাইনে। সকালে লাইনের ধারে প্রাত:কৃত্য সারতে আসা লোকজন (কারও বদভ্যাস কারও কাছে আশীর্বাদ হয়েও আসতে পারে!) তাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে জানা গেল বাঁ পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হবে। এসব ঘটনা যখন ঘটছে তখন ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়েছে, মিডিয়া খবর পেয়েছে। মিডিয়ার চাপে ঘটনার কারণ খোঁজা শুরু হয়। প্রথম কদিন সহানুভূতি পেলেও যেই 'কে দায়ী? কেন দায়ী? ' গোছের প্রশ্ন উঠল, অমনি বিভিন্ন মন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টায় রইলেন। কেউ বললেন মেয়েটা নাকি টিকিট কাটেনি, টিটিইকে দেখে ভয়ে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়েছে, কেউ বললেন সে নাকি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।

এসব কথা যখন হাসপাতালে শুয়ে থাকা মেয়েটার কানে পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার মনে অসহায় রাগ থেকে জন্ম নিচ্ছিল একটা অসম্ভব ইচ্ছে। মাউণ্ট এভারেস্ট। হ্যাঁ, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে নিজেকে দেখতে পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করল মেয়েটা।

কি ভাবছেন? সাতসকালে আষাঢ়ে গপ্প শুরু করেছি? আজ্ঞে না মশাই, একটু খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, 2013 সালের এপ্রিল মাসে টাটা স্টিলের স্পনসরশিপে একটা এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। বাহান্ন দিনের সেই অভিযানের শেষে মে মাসের একুশ তারিখে এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা গেঁথে দিয়েছিলেন যিনি, উত্তরপ্রদেশের মানুষ সেই অরুণিমা সিনহা হলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা পর্বতারোহী, যিনি কৃত্রিম অঙ্গের সাহায্যে এভারেস্ট জয় করেছেন। তাঁর একটি পা কৃত্রিম, আরেকটি পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে ধরে রাখার জন্য সেই পায়ে রড বসানো আছে। শুরুতে যে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া ঘটনাটি পড়লেন, সেটি অরুণিমারই জীবনের ঘটনা। তখনও তিনি পর্বতারোহী হননি, জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন।

ভাগ্য (পড়ুন সেদিনের সেই ডাকাতদল) তাঁর পা কেড়ে নেওয়ার পরে শুধুমাত্র মনের জোরে আর সাহসে ভর করে অরুণিমা নিজের জীবনকে নতুন খাতে বইয়েছেন। কেবল এভারেস্ট নয়, 2016 পর্যন্ত বিশ্বের পাঁচটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে তিনি দেশের নিশান উড়িয়ে এসেছেন। ইচ্ছে আছে সবকটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় পা রাখার। এছাড়া বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের বিকাশে খেলাধুলোর ভূমিকা বুঝে তাদের জন্য গড়েছেন শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি।

উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আজ অরুণিমা সিনহার জন্মদিন। এই অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটির জন্য আমাদের সবার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল। ইনি তো শুধু ভবিষ্যতের পর্বতারোহীদের কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের কাছেই আদর্শ নন, যে মেয়েটা গরীব বাবার মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে বিয়ের বাজারে অচল, কিংবা যে ছেলেটা চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়ে রোজ ভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, অরুণিমার গল্প যে তাদেরও বাঁচার মন্ত্র শেখায়। তাদের বলে, ভাগ্যের দোহাই দিয়ে হেরে পালিয়ে না গিয়ে তোর যেটুকু সম্বল আছে, তাই নিয়েই লড়ে যা, একদিন তুইই জিতবি।

তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/

জল বাঁচানোর কিছু উপায়


প্রতি বছরের মতই এবারও গ্রীষ্ম এসে পড়েছে বীরবিক্রমে। বাড়িতে, স্কুলে সর্বত্র একই আলোচনা, “কি গরম রে বাবা! আগে তো এত গরম পড়ত না!” ঠিক তাই। প্রতি বছরই গরমের পরিমাণ আগের বারের চেয়ে বেড়ে চলেছে। গরম বাড়লেই বাড়ে জলের চাহিদা। এদিকে সূর্যের তাপে জল বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ায় নদী-পুকুরের জল যায় শুকিয়ে, বৃষ্টি খুব কম হয় ব’লে নদী-পুকুরে জল জমতেও পারে না। মাটির নীচের জলও আরো নীচে নেমে যায়। কুয়ো-নলকূপ থেকেও ব্যবহারের যোগ্য জল খুব বেশি পাওয়া যায় না। এমনিতেই আমাদের দেশের জনসংখ্যা যা, ব্যবহারযোগ্য জলের পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম। তার ওপর গরমকালে কম বৃষ্টি, পুকুর-নালা শুকিয়ে যাওয়া--- এসব কাণ্ডের জেরে অবস্থাটা আরো করুণ হয়ে পড়ে।
আমরা যদি একটু ভাবনা চিন্তা করে জল ব্যবহার করি, আর কতগুলো খুব ছোট্ট ছোট্ট অভ্যেস নিজেরা আর বাড়ির বড়রা মিলে মেনে চলতে পারি, তাহলে কিন্তু গ্রীষ্মকালে জলের সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
প্রথমে বলি, এই গরমে, মানে আজ থেকেই তুমি কোন্‌কোন্‌ অভ্যাস তৈরি করতে পারো।
বাড়িতে বৈদ্যুতিন জলের ফিল্টার বসানো আছে কি? থাকলে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, ফিল্টারে যখন জল ভর্তি হয়, যে সরু পাইপটা ফিল্টারের নীচের দিকে বেরিয়ে থাকে, সেটা দিয়ে তখন বেশ অনেকটা জল বাইরে বেরিয়ে যায়। বিশুদ্ধ জল পেতে গেলে এই জলটুকু নষ্ট করতেই হবে, পদ্ধতিটাই এমন। কিন্তু ভেবে দ্যাখো তো, এই নষ্ট হয়ে যাওয়া জলকে কাজে লাগানো গেলে সারাদিনে কতটা জলের অপচয় কমানো যাবে? প্রশ্ন হল, কিভাবে কাজে লাগাবে এই জলকে? খাওয়া যাবে না, রান্না বা বাসন ধোওয়ার কাজেও ব্যবহার করা যাবে না, তবে?
যদি পারো তো, জল বেরনো সরু পাইপটার নীচে একটা বালতি রেখে দাও। না পারলে মাঝারি একটা পাত্র পেতে রেখো, জমতে থাকা জল নিয়ে বারে বারে একটা বালতিতে জমা কোরো। দেখবে সারাদিনে এক-দেড় বালতি জল জমেছে। এই এত্তখানি জল নষ্ট হচ্ছিল, ভাবতে পারো!এই জল দিয়ে তুমি ঘর মুছতে পারো, বাথরুম পরিষ্কারের কাজে লাগাতে পারো, বিভিন্ন আসবাবপত্র পরিষ্কার, এমনকি সাইকেল-বাইক-গাড়ি ধোওয়ার কাজেও লাগবে এই জল।
আরেকটা কাজ করবে, মা-কাকীমাদেরও অনুরোধ করবে কাজটা করতে। ধরো, সবজি কাটার পরে সেগুলোকে জল দিয়ে ধুচ্ছো। ধোওয়া হয়ে গেলে জলটা ফেলে দিয়ো না। খুব নোংরা হয়ে গেলে আলাদা কথা, নইলে এই জলটা দিয়েই রান্নার জায়গাটা পরিষ্কার, কিংবা সবজি কাটার ছুরি-বঁটিগুলো ধোওয়া হয়ে যাবে।
বাথরুমে কিংবা রান্নাঘরে,যে কোনো কল-ই খুব ভাল করে বন্ধ করার পরেও দেখবে, ফোঁটা-ফোঁটা করে জল কিছুক্ষণ পর পর পড়তে থাকে। কলের ঠিক নীচে একটা বালতি বা কোনো পাত্র রেখে দাও। কয়েক ঘণ্টা পরে দেখো, কতখানি জল জমা হয়েছে। বালতি পেতে না রাখলে জলটার অপচয় হত তো! অভ্যেসটা নিজে তো করোই,বাড়ির সব্বাইকেও ধরিয়ে দাও এই অভ্যেস। দেখবে জল-সমস্যার কিছুটা সুরাহা হয়েছে।
 পথ ভুল করে এক-আধদিন বিকেলে যদি একপশলা বৃষ্টি তোমার বাড়িতে হাজির হয়, তবে যে বারান্দা বা জানলায় বৃষ্টির জল আসে, সেখানে বড়সড় পাত্র রেখে বৃষ্টির জল জমাতে ভুলো না। পরেরদিন সকালে ঘর মোছা, বাসন ধোওয়ার মত কাজ এই জলে দিব্যি চলবে।
এ তো হল এক্ষুণি তুমি জল বাঁচানোর জন্য কি কি করতে পারো, তার ছোট্ট ফর্দ। আরও অনেক আছে, সব মনে পড়ছে না বলে লিখতে পারছি না। তুমিও একটু মাথা ঘামাও, দেখো আরো কত ভাল ভাল উপায় বেরোবে। উপায়গুলো কাজে লাগিয়ো, আর ইচ্ছামতীকে জানিও, একসঙ্গে বসে বেশ আলোচনা করা যাবে একদিন।
এবার আসি, জলাভাব কমাবার জন্য সারা বছর আমরা কি কি কাজ করতে পারি, সে কথায়।
জন্মদিনে খুব হই-চই করো নিশ্চয়ই। সারাদিন ভীষণ ব্যস্ত থাকো। এই ব্যস্ততার মধ্যে একটা ছোট্ট কাজ সেরে ফ্যালো। প্রতিবছর জন্মদিনে সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে বাগানে গিয়ে একটা করে গাছ লাগাও। বাড়িতে বাগান না থাকলেও চিন্তা নেই, বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে অল্প ফাঁকা জমি নিশ্চয়ই থাকবে। বাড়ির বড় কাউকে সঙ্গে নিয়ে সেখানেই পুঁতে দিয়ে এস একটা চারাগাছ। দেখবে গোটা বছর তোমার সঙ্গে হৈ-হৈ করে সে গাছ দিব্যি বেড়ে উঠবে পরের জন্মদিনের আগেই। এই রীতি মেনে চল বাড়ির সবার জন্মদিনে। অভ্যেসটা ছড়িয়ে দাও স্কুলের বন্ধু, পাড়ার বন্ধু---- সবার মধ্যে। যে বাড়িতে যতজন সদস্য, সে বাড়ির আশপাশে সারা বছরে বেড়ে উঠবে ততগুলো নতুন চারাগাছ। একবছর পরে দেখবে বাড়ির আশেপাশে সবুজের সংখ্যা কত্ত বেড়ে গেছে! আর গাছ বাড়লে তাদের শিকড়ের টানে মাটি জমাট বেঁধে থাকে, মাটি আরো বেশি জল ধরে রাখতে পারে, বৃষ্টির জল আরও সহজে মাটির গভীরে জমতে পারে, এসব কথা নিশ্চয়ই নতুন করে মনে করিয়ে দিতে হবে না!
বর্ষাকালে যখন তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি আসবে, তৈরি থেকো। বৃষ্টির জল জমাতে হবে। জানো কি, বেঙ্গালুরু-র ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-র বৈজ্ঞানিক এ. আর. শিবকুমার দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির জল জমানো এবং তাকে কাজে লাগিয়ে সারা বছরের জলের চাহিদা মেটানোর কাজে ব্যস্ত আছেন, এবং তাঁর পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়ে কর্ণাটক, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্য এবং বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশও উপকৃত হচ্ছে? নানা ছোটখাটো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই বৈজ্ঞানিক নিজের বাড়িতে শুধুমাত্র বৃষ্টির জলকেই কাজে লাগিয়ে সারা বছরের জলের চাহিদা মেটান।
এতটা পরিকল্পনা করে এক্ষুণি অবশ্য সবার বাড়িতে বৃষ্টির জল ব্যবহার করা যাবে না, তবে বৃষ্টির দিনগুলোতে জলের চাহিদা কিছুটা মেটানোই যায়।
অনেকের বাড়িতেই দেখবে, বাড়ির গা বেয়ে ছাদ থেকে নীচে একটা মোটা পাইপ নেমে এসেছে। এটা হল রেন-পাইপ। বৃষ্টির জল ছাদ থেকে এই পাইপ বেয়ে নেমে নিচে বাগানে বা নর্দমায় গিয়ে পড়ে। এই রেন-পাইপের নিচের খোলা মুখের সামনে যদি একটা বড় ড্রাম রেখে দেওয়া যায়, তবে বৃষ্টির জল ছাদ থেকে নেমে ড্রামটায় জমা হবে। ড্রামের ওপর একটা পাতলা কাপড় ঢেকে রেখো, যাতে আবর্জনা না পড়ে, আর জলের ওপরে অল্প সাদা তেল ঢেলে দিয়ো, তাহলে মশারা ডিম পাড়তে পারবে না। এই জমা হওয়া বৃষ্টির জল দিয়ে এবার তুমি সাইকেল-গাড়ি ধোয়া-মোছা কর, বাসনপত্র ধুতে পারো, এমনকি, মাঠ থেকে খেলে এসে কাদা-মাখা পা-দুটোও ধুয়ে নিতে পারো। তবে হ্যাঁ, এই জল বেশিদিন জমিয়ে রেখো না।
রাস্তায়, স্টেশনে, স্কুলে--- কোথাও যদি দ্যাখো জলের কল খোলা রয়েছে, জল অপচয় হচ্ছে, বন্ধ করার লোক নেই, কোনো দিকে না তাকিয়ে সটান গিয়ে কলটা বন্ধ করে এসো। কে দেখে কি ভাবল, কিচ্ছুটি ভাবার দরকার নেই। স্কুলে তো আমরা সবাই পড়ি জল সঞ্চয় বাড়ানোর কথা, জলের অপচয় রোধ করার কথা। বইয়ে পড়া কথাগুলোকে কাজে করে দেখো, প্রকৃতির ভারসাম্য তো রক্ষা পাবেই, নিজের মনটাকেও দেখবে অনেক তরতাজা লাগছে।।

তথ্যসূত্রঃ www.thebetterindia.com/92434/a-r-shivakumar-rainwater-harvesting-bengaluru-karnataka/

একটা জেদী মেয়ের গল্প


চলো, আজ একটা হার না মানা মেয়ের জয়ের গল্প শুনব। মেয়েটার নাম অরুণিমা সিন্‌হা।

তার বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্মৌ নগরী থেকে ২০০ কিমি দূরে আম্বেদকরনগর বলে একটা শহরে। বাবা সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার, মা স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্মী। তিন বছর বয়সে বাবাকে হারালেও মা, দিদি, জামাইবাবু, ভাই, এদের ছত্রছায়ায় সেই মেয়ে মোটামুটি হেসেখেলেই বড় হচ্ছিল। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোয় উৎসাহ ছিল, জাতীয় স্তরে ভলিবলও খেলেছে সে। একটু বড় হতে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর চাকরি খোঁজার সময় এল। ২০১১ সালে CISF এ চাকরির ব্যাপারে ডাক পেল অরুণিমা।

এরপর এল সেই দিনটা। চাকরি-সংক্রান্ত একটা কাজেই পদ্মাবৎ এক্সপ্রেসের অসংরক্ষিত কামরায় উঠে মেয়েটা দিল্লি যাচ্ছিল। প্রচণ্ড ভিড় সেই কামরায় হঠাৎই চার-পাঁচজন ডাকাত এসে হাজির হয়। তারা অরুণিমার গলা থেকে সোনার হার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে রুখে দাঁড়ায়, বাধা পেয়ে ডাকাতরা রাগের বশে তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে রেললাইনে ফেলে দেয়। রেললাইনে প'ড়ে বাঁ পা-টাকে লাইনের ওপর থেকে সরানোর আগেই আরেকটা ট্রেন চলে যায় সেই পায়ের ওপর দিয়ে।

তারপর সারা রাত অরুণিমা ছিন্নভিন্ন বাঁ-পা নিয়ে রেললাইনের ওপরেই পড়ে রইল। সকালে রেললাইনের ধারে প্রাতঃকৃত্য সারতে আসা লোকজন তাকে দেখতে পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করল। সেখানে তার বাঁ-পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দিতে হল, ডান পায়ের টুকরো হয়ে যাওয়া হাড়গুলোকে জুড়ে রাখতে সেখানে বসানো হল রড। এরপর কিছুদিন হৈ-চৈ, সহানুভূতি, তারপর ধীরে ধীরে লোকে অরুণিমাকে ভুলে যেতে লাগল।

অরুণিমা কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্রথমে মনে মনে ভেঙে পড়লেও আস্তে আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগল। একটা নকল পা আর আরেকটা রড-বসানো পা, এই সম্বল নিয়ে সে মনে মনে ঠিক করল মাউণ্ট এভারেস্ট জয় করবে। তার ইচ্ছেটা অদম্য, কারণ, হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই সে যোগাযোগ করল ভারতের প্রথম এভারেস্ট-বিজয়িনী পর্বতারোহী বাচেন্দ্রী পালের সঙ্গে। উত্তরকাশীর নেহরু ইন্সটিটিউট অফ মাউণ্টেনিয়ারিং থেকে আঠেরো মাসের ট্রেনিং নিল সে। কৃত্রিম পা নিয়ে পাহাড়ে চড়ার যেসব মারাত্মক সমস্যা, সেগুলোকে কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবলের সাহায্যে জয় করতে লাগল অরুণিমা।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে টাটা গ্রুপ-প্রযোজিত ইকো-এভারেস্ট অভিযানের দলের সদস্য অরুণিমা তার হিমালয় যাত্রা শুরু করল, বাহান্ন দিন পরে, ২০১৩ সালের ২১শে মে সে পৌঁছালো বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে। ভারতের অরুণিমা সিন্‌হার নাম লেখা রইল ইতিহাসের পাতায়, সে হল বিশ্বের প্রথম মহিলা, যিনি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাহায্যে মাউণ্ট এভারেস্ট জয় করেছেন।

ভাগ্যলিখন ইত্যাদির দোহাই দিয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে না থেকে যাঁরা জেতার অদম্য ইচ্ছে আর চেষ্টাকে প্রাধান্য দেন, ঈশ্বর এবং ভাগ্য তাঁদেরই সাহায্য করেন, অরুণিমা এই তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাই আকস্মিক দুর্ঘটনায় জীবনের ছন্দ কেটে গেলেও নিজের মনের জোর আর চেষ্টাকে সম্বল করে মেয়েটা সাফল্যের শিখরে পৌঁছে গেল। এরপর শুরু হল তার জয়যাত্রা।

প্রতিটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দেশের জাতীয় পতাকা ওড়াবে, এই হল তার নতুন লক্ষ্য। আফ্রিকার মাউণ্ট কিলিমাঞ্জারো (২০১৪ সালে), অস্ট্রেলিয়ার মাউণ্ট কোসিউজকো (২০১৫ সালে), দক্ষিণ আমেরিকার মাউণ্ট আকঙ্কাগুয়া (২০১৫ সালে), ইউরোপের মাউণ্ট এলব্রুস (২০১৪ সালে)-সহ পর্যন্ত ছ'টি শৃঙ্গ জয় করেছে সে, আণ্টার্কটিকা আর উত্তর আমেরিকা অভিযান এখনও বাকি।

অভূতপূর্ব সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকারের কাছ থেকে অরুণিমা ২০১৫ সালে 'পদ্মশ্রী' পুরস্কার লাভ করেন। এভারেস্ট-জয় এবং তার নেপথ্যের অভিজ্ঞতা নিয়ে অরুণিমা সিন্‌হার লেখা বই Born Again on the Mountain প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে। অরুণিমার অভিজ্ঞতা জানতে হলে এবং তাঁর জেদ আর লড়াই থেকে কিছু শিখতে চাইলে বইটা পড়ে দেখতে পারো।

পর্বতারোহণের পাশাপাশি অরুণিমা আরও একটা ব্রতে নিজেকে সামিল করেছেন। বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের জন্য সে তৈরি করেছে খেলাধুলো শেখার স্কুল, শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদ দিব্যাঙ্গ খেল একাডেমি এবং কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গবেষণা কেন্দ্র। উত্তরপ্রদেশের এই সংস্থা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ, বিশেষত বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের প্রয়োজনে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন খেলার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কাজেও এই সংস্থা এগিয়ে আসে।

এই হল অরুণিমা সিন্‌হার কাহিনী, যা আরেকবার প্রমাণ করে, ভাগ্যে কি লেখা আছে, তা নিয়ে তোমার দুশ্চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি নিজে কি চাও, সেটা আগে বুঝে নাও, তারপর সেই লক্ষ্যে অবিচল থেকে নিজের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে থাকো, সাফল্য তোমার হাত ধরবেই। অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়, তোমার চেষ্টা তোমায় আলোয় ফেরাবে।।


তথ্যসূত্রঃ http://azadsports.com
http://www.arunimasinha.com
https://yourstory.com/2015/05/arunima-sinha-world-champion/

রাখীবন্ধন

আজ রাখীপূর্ণিমা। বোনেরা বড় যত্নে আজ ভাইদের হাতে রাখী বেঁধে দিয়েছেন, কেউ কেউ হয়তো হাজার কয়েক মাইল দূরে প্রবাসে রয়েছেন, হাতে রাখী বাঁধার আনন্দ তাঁদের মেটাতে হয়েছে স্কাইপে বা ফেসবুকেই। সারাদিন ধরেই বোনেদের আদরে প্রণামে ভাইদের জীবন মঙ্গলময় হয়ে উঠেছে, ভাইদের আশিসে শ্রদ্ধায় বোনেরা ঋদ্ধ হয়েছেন। রাখীপূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে ক্রমশঃ প্রকাশ্যের পক্ষ থেকে সব বন্ধুদের জন্য রইল শুভেচ্ছা।
বন্ধুরা, ডোকা -লা কিংবা কার্গিল, সিয়াচেন কিংবা জালেপ -লা, এইসব জায়গাগুলোতেও কিন্তু ছড়িয়ে রয়েছেন আমাদেরই ভাইয়েরা, বন্ধুরা। ওঁরা  ওখানে রাতের পর রাত জাগছেন বলেই আমরা এত নিশ্চিন্তে রাখী, বন্ধুদিবস যাপন করতে পারছি। আসুন না, আমরা প্রত্যেকে একবারের জন্য হলেও মনে মনে রাখী পরিয়ে দিই সেইসব ভাই আর বন্ধুদের।
আমার চেনা দুই দিদির ভাই সেনাবাহিনীর কর্মী। কার্গিলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁকে যেতে হয়েছিল। গল্প শুনেছি, যুদ্ধের দিনগুলোয় বাড়িতে অশীতিপর বাবা-মাকে কোনো খবর জানানো হত না। দুইবোনে রাত্রে বাগানে গিয়ে কেঁদে হাল্কা হতেন। আশা করি, সেই ভাইবোনের রাখীবন্ধন উৎসব সুখে কাটছে।
হাওড়া-ব্যাণ্ডেল মেন লাইনের ট্রেনে হকারি করেন বিশুদা। কখনও টর্চ, কখনও ছাতা কিংবা ব্যাগ, তাঁর পসরা বদলে যায় মাঝেমধ্যে। দু -তিনবার রাত দশটার পরের কোনও ট্রেনে দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। ট্রেন ভদ্রেশ্বর পেরোনোর পর মহিলা কামরায় হয়ত দুজন যাত্রী, আশ্বাস পেয়েছি বিশুদার কাছে, "এই বিশুদা ট্রেনে থাকলে দিদি লাস্ট ট্রেনেও কোনও চিন্তা নেই তোমাদের"। আজকের উৎসব তাঁর জন্যও।
বাবলু ভাইয়া, আমাদের পাড়ার কিছু কচিকাঁচা পড়ুয়াদের স্কুলভ্যানের সারথি। গত সপ্তাহে পরপর দু'দিন তাদের বাড়ি আসার সময় আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি। ভাবছি, বাচ্চাগুলো বোধহয় ভিজেই যাবে। ভ্যান এলো, দেখলাম বাচ্চাদের গায়ে বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও লাগেনি, তবে ভ্যান থেকে নেমে গাড়ির জানলা বন্ধ করতে গিয়ে বাবলু ভাইয়া ভিজে চান করে গেছেন। তবে তাতে তিনি বিরক্ত নন, বাচ্চাদের গায়ে যে জল লাগেনি এতেই তিনি খুশি। আজ রক্ষাবন্ধনের উৎসবের একজন শরিক তিনিও।
তবুও আমরা কি এঁদের একশো শতাংশ বিশ্বাস করতে পারি? অবিশ্বাস করছি, এটা ভাবলে বুকে কাঁটা বেঁধে, তাও আমরা নিরুপায়। পরিস্থিতি আমাদের কাছ থেকে বিশ্বাস করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। আজকের এই অস্থির সময়ে দাঁড়িয়েও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, "মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ"। সেই পাপের বোঝা যাতে আমাদের খুব বেশি বইতে না হয়, রাখীবন্ধন উৎসবের দিনে মঙ্গলময়ের কাছে এই প্রার্থনা রইল।

Tuesday, 18 July 2017

ঋণস্বীকার

একজন মানুষ, মনে করো সে শহরের একজন নামকরা ব্যবসায়ী। কিসের ব্যবসা? ধরে নাও খেলনার ব্যবসা। সেই ব্যবসায়ী, যার নাম অমল (চন্দ্রকান্ত হলেও ক্ষতি ছিলোনা, নামটা এই গল্পে জরুরি বিষয় নয়) সেই অমলবাবু এক নিভে আসা বিকেলে তাঁর বাড়ির লাগোয়া ঝাঁ-চকচকে আউটলেটটায় এসে বসলেন। দোকানটা যদিও বরাবর এমন ঝাঁ-চকচকে ছিলো না, লাগোয়া তিনমহলা বাড়িটাও ভদ্রলোকের কিছু পৈতৃক সম্পত্তি নয়। একপেট ক্ষিদে আর বাপের রেখে যাওয়া ক’টা ময়লা নোট সম্বল করে অমলবাবু বহু বছর আগের এক সকালে এই বাড়ির তখনকার মালিকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, গেটের পাশে মালির একচিলতে ঘরখানা ভাড়া নিয়ে একটা ছোট্ট দোকান খুলবেন ব’লে। ওনার বোন মাটি, কাগজ, পুরনো কাপড় দিয়ে ভারি সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাত। সেইসব পুতুল শ’খানেক জড়ো ক’রে দোকানটার পত্তন করেছিলেন ভদ্রলোক।

তারপরে কালে কালে কত কী হল। মালির ঘরের দোকান মা-লক্ষ্মীর দয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠলো, ঐ তিনমহলা বাড়ির চাবি হাতবদল হয়ে এল দোকানদারের হাতে, সেদিনের ‘হাতের পুতুল’ দিনে দিনে ‘টয়ল্যাণ্ড’ হয়ে তিনটে শহরে ডালপালা মেলল, অমলবাবু কিন্তু এই মালির ঘরের দোকানটাকে ভুলে যাননি। কাঁচ দিয়ে মুড়ে দোকানটাকে সুন্দর ক’রে সাজিয়েছেন। ব্যবসার গোড়াপত্তন এখানে, ঋণও তো থেকে যায় প্রথম দোকানের প্রতি। মা-লক্ষ্মী যে এই দোকানেই প্রথমবার পা রেখেছিলেন। তাই কাঁচে মোড়া এই ঝকঝকে দোকানটা ব্যবসায়ীর একপ্রকার ঋণস্বীকারই বলতে পারো।

টয়ল্যাণ্ড আজকে খেলনাপাতির দুনিয়ায় বেশ বড় একটা নাম। চাবি ঘোরানো বিদেশী খেলনাও ইনি বেচেন বটে, তবে ঐ মাটি-কাগজ-কাপড়ে বানানো ‘হাতের পুতুল’-এর জুড়ি মেলা ভার। আজকাল তো বিদেশেও যাচ্ছে ওসব পুতুল। এখন অবশ্য আর বোন পুতুল তৈরি করেন না, দু-দু’টো কারখানায় প্রায় শ’খানেক লোকের হাতে ওগুলো তৈরি হয় এখন। বছর সাতেক আগে একটা অ্যাকসিডেন্টে বোন-ভগ্নীপতি দুজনেই গত হয়েছেন। ভাগ্নীটাকে কাছে এনে রেখেছেন অমলবাবু। গিন্নির সঙ্গে এই নিয়ে মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ মন কষাকষি চলে, বিশেষ করে ভাগ্নীর জ্বরজারি হ’লে, তবে কিনা বোনের হাতে তৈরি পুতুলকে মূলধন করেই তো টয়ল্যাণ্ড-এর চলা শুরু, জীবনে মা-লক্ষ্মী আসার নেপথ্যে বোনের শ্রমকে অস্বীকার করেন কি ক’রে? তাই বোনের ঋণের শোধ করতেই মা-বাপ মরা ভাগ্নীটার দায় ঘাড় পেতে নিতে হয়েছে। পাত্র দেখছেন, এই দোকানটার জন্য একজন বলিয়ে-কইয়ে অথচ পকেট ফাঁকা, এমন একজন ম্যানেজারও খুঁজছেন, চলনসই কাউকে পেয়ে গেলে রাজত্ব,রাজকন্যা দুই-ই তার কাঁধে চাপিয়ে ঋণমুক্ত হবেন।

তিন-মহলা বাড়িটার ঠিক পেছনেই একটা বস্তি আছে, যেখানে জীবনের শুরুটা কাটিয়েছিলেন আমাদের অমলবাবু। তখন অবশ্য কেউ তাঁকে কেউ আপনি-আজ্ঞে করত না। সে যাই হোক, টাকার মুখ দেখে এনার মাথা ঘুরে যায়নি কিন্তু, ছোটবেলার আশ্রয় সেই বস্তির ঋণ তিনি শুধে চলেছেন সাধ্যমত। বস্তির বেশ কিছু ছেলে তাঁর কারখানায় কাজ করে, দুটো ছেলেকে এই দোকানেও কাজ দিয়েছেন। তবে কিনা ছোটলোকের মন তো, হতেই পারে কোনওদিন ক’টা দামী খেলনা ব্যাগে পুরে পাচার করল লোভ সামলাতে না পেরে! তাই আগেভাগেই সাবধান হয়েছেন অমলবাবু। গেটকীপার তো আছেই, তাছাড়া গেটের কাছে ঘুরঘুর করে বুলডগ জেম্‌স। বাঘেরও বাপ। বেচাল দেখলেই টুঁটি ছিঁড়ে নেবে।

সন্ধ্যের ভিড়টা একটু হাল্কা হয়েছে, কাউণ্টারে বসে টাকা গুনছিলেন ভদ্রলোক। টাকা চটকাতে চটকাতে বেশ একটা তরঙ্গ বাজছিল মনের গভীরে, ঘোর কাটল বাচ্চাদের গলার আওয়াজে। এতগুলো গেঁড়িগুগলি কোত্থেকে এল? তাঁর দোকানে তো ফিনফিনে মায়েদের হাতে ধরা ফটফট বুলি-ফোটা ফুটফুটে বাচ্চারাই আসে, তারা তো এমন খলবল করেনা! মুখ তুলে দেখলেন দোকানে কাজ করে মানিক, তারই বউ এসেছে তিনটে বাচ্চার হাত ধ’রে। শোকেসে খেলনার বাহার দেখে মা-ছা সবারই চোখ ট্যারা হয়ে গেছে। এটা চাই, ওটা চাই ক’রে বায়না জুড়েছে সবক’টা। একটু সাফসুতরো করে আনতে পারত তো ছেলেগুলোকে! নাক দিয়ে সর্দি গড়াচ্ছে, একটার তো পা ভর্তি কাদা। নর্দমায় পড়ে গেছিল নাকি? ইসস্‌, দোকানটা ভাল করে ধোওয়াতে হবে।

বউটাকে বাইরে দাঁড়াতে বলবেন বলে উঠতে যাচ্ছিলেন, চোখ পড়ল ছোট ছেলেটার দিকে। সে তখন একহাতে নিজের প্যাণ্টটা কোমরের কাছে চেপে ধরে পা উঁচু করে তাক থেকে বল নামানোর চেষ্টা করছে। হাত ছাড়লেই প্যাণ্ট হড়কে নীচে নেমে যাবে। অমলবাবুর মনে পড়ে গেল আরেকটা ছেলের কথা। তার বাবা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। একবার বিশ্বকর্মা পুজোয় দোকানে মাংসভাত খাওয়ার নেমন্তন্নে গিয়েছিলো ছেলেটা, বাবার সঙ্গে। অনেকদিন পরে মাংসভাত পেয়ে এইসান খেয়েছিল সে, খাওয়ার পর উঠে দাঁড়াতেই পুরনো রদ্দিমার্কা হাফপ্যাণ্টের বোতাম ছিঁড়ে সে প্যাণ্ট সুড়ুৎ ক’রে পড়ল পায়ের নীচে। কি লজ্জা কি লজ্জা! ঘরভর্তি লোকের হো-হো হাসি মনে পড়লে এখনও কান লাল হয়ে ওঠে টয়ল্যাণ্ড-এর মালিক অমলবাবুর। বাবা ভাগ্যিস শর্মাজ্যাঠার কাছে কেঁদেকেটে একটা নতুন প্যাণ্ট চেয়ে পরিয়েছিল। প্যাণ্টটার দাম শুধতে বাবাকে দু’মাস দুপুরে জল খেয়ে থাকতে হয়েছিল বটে, তবে সেদিন অমন লজ্জার হাত থেকে বারো বছরের ছেলেটা বেঁচে গিয়েছিলো তো!

শুধু তাই নয়, বাবার কাকুতি-মিনতি, শর্মাজ্যাঠার খ্যাক-খ্যাক হাসি, দিনের পর দিন বাবার সারাদিন না খেয়ে থাকা, সব মিলিয়ে ছেলেটার মনে একটা জেদ জন্মেছিল আস্তে আস্তে, মালিক হওয়ার জেদ। মালিক হলে স-অ-ব কিছু হাতের মুঠোয় চলে আসে, বুঝেছিল ছেলেটা। সেই জেদ থেকেই তো বেড়ে উঠেছে টয়ল্যাণ্ড, দোকানটার পত্তনে বাবার ঋণও তো তবে অস্বীকার করার নয়, ভাবেন অমলবাবু।

বাবার ঋণ শোধ করতেই কিনা বোঝা যায় না, তবে মাঝবয়সী অমলবাবু কাউণ্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলেন একহাতে প্যাণ্ট চেপে ধরা ছেলেটার বাপের দিকে, না, না, ওদের বাইরে যেতে বলবেন বলে নয়, ক’টা টাকা বাপের হাতে ধরাবেন ব’লে, ফুটপাতের দোকানগুলোয় তো সস্তার প্যাণ্ট পাওয়া যায় এখনও, এই ক’টা টাকাই যথেষ্ট।।

(অক্ষর-এ প্রকাশিত)

Tuesday, 27 June 2017

কুটুনের শিল্পচর্চা

আজকের পর্বটা বেশ লম্বা-চওড়া হবে মনে হচ্ছে। কুটুনের নানাবিধ শিল্পচর্চার বিবরণী থাকছে কিনা, বেশ ওজনদার রচনা হবে সম্ভবত। গৌরচন্দ্রিকা না করে শুরু করা যাক তবে।

প্রথমেই আসি কুটুনের সঙ্গীতচর্চার কথায়। মেয়ের গানের গলাটি প্রথম দিন থেকেই ভারি সরেস। তার জীবনের প্রথম দু’তিন রাত তো নার্সিং-হোমেই কেটেছিল, রোজ সকালে রাতের আয়ামাসিরা এসে তার মা-কে গপ্প শোনাত, সে নাকি খিদে পেলেই বাজখাঁই গলায় চেঁচায়। মা মোটেই বিশ্বাস করেননি সেকথা। কাঁথা-অয়েলক্লথে মোড়া ঐ একফোঁটা পুঁচকে, সে অমন গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার জুড়বে! বললেই হল! এসব অপপ্রচার। যাই হোক, ক’দিন পরে মা হাসিমুখে ছা নিয়ে ঘরে ফিরলেন। প্রথম কিছুদিন পুঁচকে মেয়ে সারা দিন সারা রাত ঘুমোত। মা মনে মনে আয়ামাসিদের ওপর বিরক্তই হচ্ছিলেন, “দ্যাখো দেখি, কেমন মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে আমার শান্তশিষ্ট বাছাটির নামে!”

দিনপনেরো পর থেকে কুটুনের রুটিনে সামান্য বদল ঘটল। সারাদিন সে ক্লান্তির চোটে চোখের পাতা খুলতে পারত না, ঠিক রাত সাড়ে ন’টা-দশটার পর ক্লান্তি দূর হত। তারপর প্রায় সারারাত ধরে চলত তার সুরসাধনা। বাড়ির লোকে অবশ্য অতটা সঙ্গীতবোদ্ধা নন, তাই এই সাধনার মাহাত্ম্য তেমন করে বুঝে উঠতেন না। তাঁরা  কখনও কোলে দুলিয়ে, কখনও কাঁধে নাচিয়ে, যেভাবে হোক মেয়েকে ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। আর তাইতে কুটুন আরো বিরক্ত হয়ে দাপুটে গলায় প্রতিবাদ করত। সে এক সময় গেছে, বুঝলে? সারা রাত মেয়ের গলা সাধার দাপটে বাড়ির লোক তটস্থ হয়ে থাকেন, আর দিনভর চোখেমুখে জল ছিটিয়ে ঝিমুনি কাটিয়ে সংসারের কাজ সারেন।

মাসচারেকের পর থেকে অবশ্য রাতের জলসার সময়টা কমে এসেছিল। মা হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে নেচেকুঁদে দু’ঘণ্টার মধ্যেই মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়তেন। আহা! ঘুম যে তখন মায়ের কাছে কতটা কাঙ্খিত ছিল সে বলে বোঝানো যায় না।

এই সময় থেকেই মা, এবং বাবা উপলব্ধি করলেন, কুটুন গান শুনতে ভালবাসে। মা আবার ইতিমধ্যে নানা পত্রপত্রিকায় পড়ে ফেলেছেন “শিশুমস্তিষ্কে সুরের উপকারিতা” ইত্যাদি বিষয়ে, ব্যস, মেয়েকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, তেল মাখানো, নাওয়ানো সবেতেই তিনি সুরের ছোঁয়া বোলাতে শুরু করলেন। তাঁর গান গাওয়ার ইতিহাস যে খুব জনমোহিনী, তা নয়, কলেজে পড়াকালীন এক বান্ধবীর বাড়িতে ঘরোয়া আড্ডায় তাঁরা তিন বান্ধবী এমন দাপুটে ভঙ্গীতে “জীবনে কি পাবো না” গেয়ে উঠেছিলেন, যে, বাকি বন্ধুরা নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা অবশ্য ভ্রূক্ষেপ করেননি, গানখানি শেষ করে তবেই থেমেছিলেন। এখনও, মেয়ে তাঁর গাওয়া গান পছন্দ করছে কিনা সে ব্যাপারে তিনি বিশেষ খোঁজ রাখেন না। তিনি গেয়ে চলেন নিজের সন্তুষ্টির জন্যই, ছেলেভোলানো গানে কথা কম পড়লে আবার নিজের বোনা কাব্যিও গেঁথে দেন ঐ গানের সুরেই।
যেমন ধরো, মা গাইছেন,

“চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদমতলায় কে?
হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে খুকুমণির বে”।

গানের কথা ফুরিয়েছে, এদিকে মেয়ে তখনও জেগে,ব্যস, মা গেঁথে নিলেন নতুন কথা,

“খুকুমণির বে’তে কে কে এল?
জেব্রা এল আর এল আর্মাডিলো।
আর এল সজারু শিম্পাঞ্জি
জিরাফ এল গায়ে তার সাদা গেঞ্জি”, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এহেন গেঞ্জি-পরিহিত জিরাফের গান শুনেই সঙ্গীতচর্চায় কুটুনের হাতেখড়ি হয়। এরপর কুটুন, আর তার মা, দুজনেরই বয়স এবং সঙ্গীতচর্চা সমান লয়ে এগিয়ে চলে।

বছর দেড়েক আগের কথা। কুটুনের মুখে তখন  দু’একটি বুলি ফুটেছে। নিজের ভাষায় সে তার পছন্দের গানের ফরমায়েস করতে শিখেছে। মায়ের গলায় (সম্ভবত কিঞ্চিৎ এলোমেলো সুরে) গান শোনার পাশাপাশি রেডিও (মায়ের আবার রেডিও শোনার বাতিক আছে, রেডিওর কান মুচড়ে পিঠ চাপড়ে তিনি ধানবাদে বসে মাঝেমধ্যে কলকাতার স্টেশন ধরে ভারি আরাম পান), মোবাইল ফোন, এসবে ধীরে ধীরে তার কান পাকছে, মায়ের সঙ্গে তার ভাব-বিনিময় ভাষা পাচ্ছে ক্রমশ। সে যদি বলে, “হাই-ই”, মা অমনি বুঝে নেন এটি হল “হা-রে-রে-রে” শোনানোর অনুরোধ, কিংবা, মেয়ে যদি বলে, “হুই-ই”, তবে মা ধরে ফেলেন, মেয়ে এখন “ওরে গৃহবাসী” শুনতে চায়। তিনিও দিব্যি রুটি সেঁকতে সেঁকতে কিংবা আলনায় কাপড় গোছাতে গোছাতে একটাই গান দশ-বারোবার গেয়ে চলেন, আর কুটুনও আহ্লাদে মাথা দুলিয়ে জামাকাপড়ের ভাঁজ খুলতে খুলতে ভাঙ্গা গলার গান মন দিয়ে শুনে চলে।

এরকমই একদিন, বাবা সন্ধেবেলায় খাওয়ার টেবিলে তাল ঠুকে কি যেন একটা গুনগুন করছেন, কুটুন আবিষ্কার করল, আরে, বাবাও তো কম বড় গাইয়ে নন! সে তড়িঘড়ি বাবার কাছে গিয়ে নতুন গান শোনানোর আর্জি জানায়,
“বাবা, তি-নু-নুন্‌-নুন্‌”

বাবাও বোঝেন না, মেয়েও এর বেশি কিছু বোঝাতে পারে না। বিচ্ছিরি কমিউনিকেশন গ্যাপ। বাবার কাছে মেয়ের ভাষার শব্দকোষ হলেন মা। প্রথমে মা-ও কিচ্ছু বোঝেন না। অনেক ভেবে মনে পড়ে আগের সন্ধেয় “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে” কুটুনের মনে প্রথমবার ঢুকেছিল। সে গানের কলি “কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ” যে কোন্‌ জাদুতে কুটুনের ভাষায় “তি-নু-নুন্‌-নুন্‌” হয়ে গেছে তা বোঝা স্বয়ং গুরুদেবেরও অসাধ্য।

ঘুম উপলক্ষে গাইতে হবে, এমন কিছু বাঁধাধরা গান আছে। যেমন, “মন মোর মেঘের সঙ্গী”। এটি কুটুনের কথা ফোটার বয়সের আগে থেকেই মা গেয়ে আসছেন। ফলে, কথা ফুটতে শুরু হওয়ার পরেও, রোজ রাতে বালিশে মাথা রেখেই সে “মনো, মনো” বলে মা-কে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। কোনোদিন হয়ত মেয়ে ঘুমোনোর আগেই মায়ের একটু ঝিমন্ত ভাব এসেছে, মেয়ে অমনি উঠে বসে মা-কে থাবড়ে-থুবড়ে বাকি গানটা গাইয়ে তবে ঘুমোতো।

আরেকটা গান ছিল, “ধুম এসো”, অর্থাৎ কিনা, “ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো”। কাঁদো কাঁদো মুখে “ধুম এসো” আওড়ানো মানেই এবার ঘুমের জোগাড় করতে হবে। এখন তো কুটুন একটু বড় হয়েছে, একেকদিন রাতে বালিশে শুয়ে সে নিজেই নিজেকে চাপড়ে “ধুম পালানি মাসিপিসি মোদেল বালি এস” গাইতে থাকে।

কুটুনের ঝাঁপিতে এখন অনেক গান জমে উঠেছে। এত অল্প জায়গায় সেসব বলে শেষ করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ, সলিল চৌধুরী থেকে শুরু করে এ. আর. রহমান হয়ে ভাটিয়ালির আন্তর্জাতিক সংস্করণ, সবেতেই সে সমান উৎসাহী। স্কুলের সৌজন্যে সম্প্রতি কুটুনের গলায় তার নিজের ভাষায় দেশের জাতীয় সঙ্গীতও শোনা যাচ্ছে। আবার কোত্থেকে যেন বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি, তিন ভাষাতেই “পিসা-বুদান”, অর্থাৎ, “We shall overcome” শিখে এসেছে।

এবার আসি কুটুনের ছবি আঁকার গল্পে। দেড় বছর বয়সেই তাকে ব্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে মা এক বাক্স রঙ পেন্সিল আর একখানা সাদা খাতা কিনে তার সামনে রেখে দিয়েছিলেন। সেই থেকে তার আঁকায় হাতেখড়ি। ভাড়াবাড়ির দেওয়াল তো নানা রঙে রঙিন হয়েছেই, বাবার ল্যাপটপ, মায়ের সাধের ফ্রিজ, মায় তার নিজের ভাত খাওয়ার থালাও মাঝেমাঝেই রং পেন্সিলের দাগে সেজেগুজে ওঠে। আর, ছবি আঁকার খাতায় মেয়ের কল্পনাশক্তি মনের আনন্দে ডানা মেলে।

হযবরল-র সেই চন্দ্রবিন্দু বেড়ালকে মনে আছে? যে মাটিতে দাগ কেটে কেটে “এই মনে করো গেছোদাদা, এই মনে করো গেছোবৌদি রান্না করছে” এইসব আঁকাআঁকি করছিল? ঠিক ঐরকমভাবেই কুটুনও তার খাতায় একটা করে দাগ কিংবা গোল্লা আঁকে, আর বলতে থাকে, “এতা বাবা, এতা মা, এতা তুতুন, এতা মাম্মাম, এতা দাদু”, এমন করে চটি, ব্যাগ, স্কুল, চাঁদ, বালিশ, দই-মাখা ভাত, সব এঁকে ফেলে সে। একদিন তো স্বামী বিবেকানন্দেরও একখানা ছবি এঁকেছিল। ছবিটার সঙ্গে বিশেষ একটি সব্জির খুব মিল পাওয়া গিয়েছিল বটে, তবে চোখ, কান আর মুখ নিজের নিজের জায়াগায় ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। কুটুনের আঁকা ছবিতে বাবা চেনা যায় দাড়ি দে’খে, মা চেনা যায় দাঁত বের করা হাসিমুখ দে’খে, আর মাম্মাম (ঠাকুমা) চেনা যায় কপালের টিপ দে’খে। ছবি আঁকার বিদ্যে মাঝেমাঝে তার পুষ্যিপুতুলদেরও শেখানোর চেষ্টা চলে। মা আড়াল থেকে দেখেন, ছুটকি-পুতুলের হাতে পেন্সিল ধরিয়ে কুটুন প্রাণপণে বিদ্যাদানের চেষ্টা করছে, “পাত্তো পাত্তো (পাকড়ো, পাকড়ো), অ্যায়সে”!


নাচের গল্পে বিশেষ কিছু বলার নেই। এদিকে আবার মেলা লেখা হয়ে গেছে, পড়তে বসে লোকের হাঁফ ধরবে, তাই ছোট করেই বলে নিই।

কুটুন যখন সাত-আটমাসের ছানা ছিল, রাতবিরেতে অকারণ কান্না জুড়লে তার মায়ের আর সব জারিজুরি যখন ফেল করত, তখন তিনি নিজের ছোটবেলায় শেখা খানকতক নাচের মুদ্রা জড়ো করে এর ঘাড়ে ওকে চাপিয়ে হাতেকলমে করে দেখিয়ে মেয়ের কান্না থামাতেন। বাবা বাড়িতে থাকলে তিনিও এব্যাপারে নিজের দক্ষতা জাহির করতে ছাড়তেন না। সেই থেকেই বোধহয় কুটুনের ধারণা হয়েছিল, তার মা, বাবা দুজনেই প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী। ব্যস, এখন যখন যেখানে তার নাচ করতে ইচ্ছে করে, অবশ্যই বাবাকে অথবা মা-কে তার সঙ্গে পা মেলাতে হয়। সে স্কুলের ফাংশানই হোক, কিংবা ঘরোয়া জলসাই হোক, কুটুন স্টেজে উঠছে মানে মা অথবা বাবাকেও সঙ্গে থাকতে হবে। বাড়িতে একেকদিন সন্ধেবেলায় নাচ প্র্যাকটিসের শখ জাগে মেয়ের মনে। মা হয়ত সবে রুটি বেলে তাওয়া-তে সেঁকতে শুরু করেছেন, মেয়ের নাচ পেল, অমনি তার সনির্বন্ধ অনুরোধে মা-কে রুটি সেঁকার জালতি হাতেই একপাক নেচে নিতে হল। সেসব রাতে খাওয়ার থালায় দু’তিনটে পোড়া রুটি পাওয়া যায় বটে, তবে মেয়ের শখ তো পূরণ হয়!!

Sunday, 28 May 2017

অন্ধকারের কথা

"মা, বাইরে অন্ধকার", কদিন ধরেই রাত্রে বিছানায় শোবার আগে কচি গলায় একটু আপত্তির সুরে কথাটা শুনতে হচ্ছে। বাইরে অন্ধকারের উপস্থিতি খুব একটা ভাল লাগছে না, সেটা ছোট্ট মানুষের কথায় বোঝা যাচ্ছে। প্রথম দু -একদিন আমল দিইনি, "রাত্রে তো অন্ধকার হবেই" এসব বলে চাপড়ে ঘুম পাড়িয়েছি।

কালকেও একই কথা আবার। ভয়ানক ঘুম পাচ্ছিল। একবার ভাবলাম বাইরের অন্ধকারকেই হাতিয়ার করে হাল্কা ভয় দেখাই, তাহলে ঝিমুনি আসার সময়টাতেই যে গায়ে ঠেলা দিয়ে "মা, ও মা, বাইরে অন্ধকার" বলে ব্যস্ত করা, সেটা থামবে।

তারপরেই মনে হল, ছি ছি, কি করছি, নিজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে দেব না বলে মিছিমিছি একটা অবান্তর ভয় মেয়েটার মনে ঢুকিয়ে দিতে চাইছি? আলোর না থাকাটাই যে অন্ধকার, আলাদা করে কোনও ভয় জাগানো মানে যে অন্ধকারের নেই, সেটা তো আমরাই বোঝাব, নাকি? বাগানে গাছটার নিচে ঝুপসি মত কি একটা প্রাণী যেন গুঁড়ি মেরে বসে আছে মনে হচ্ছে, ওটা যে আসলে গাছেরই ছায়া, ছায়ার চলাফেরা আসলে আলো -আঁধারের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়, চাঁদের আলো এগোলে কিংবা মেঘের আড়ালে লুকোলে যে গাছের ঝুপসি ছায়াটাও ভোল পাল্টায়, সেসব তো কচি মনটাকে বোঝাতে হবে। নইলে খামোখা ছোট্ট মনটা বিনা কারণে অন্ধকারকে ভিলেন ঠাউরে বসবে। আর এই বয়সে একবার কোনও ভয় মনে বাসা বাঁধলে তাকে তাড়ানো মহা ঝকমারি।

অগত্যা নিজের ঘুমে লাগাম পরিয়ে বোঝাতে  শুরু করলাম, "দ্যাখো বাবু, রাত্তিরে যেমন আমাদের ঘুম পায়, তেমন আলোরও ঘুম পায়। আলো চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেই অন্ধকার হয়ে যায়।"
সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন এল, "যেমন আমরাও হই?"
থমকালাম। তাই তো! আমরাও কি অন্ধকার হয়ে যাই? চোখ বুজলে চারপাশ অন্ধকার, এ তো খুব সত্যি কথা। এটাকে কি "আমরাও অন্ধকার হয়ে গেলাম" বলা যায়? উত্তর হাতড়াচ্ছি, এমন সময় শুনলাম আলো -আঁধারির তত্ত্বে উৎসাহ হারিয়ে মেয়ে তার ঘুমের আগের গান গাওয়ার রুটিনে ঢুকে পড়েছে। আমিও প্রসঙ্গ পাল্টে গলা মেলাতে লাগলাম৷

মেয়ে তো ঘুমলো একটু পরেই, আমার মনে ঢুকে পড়ল ভাবনার নতুন সুতো। অন্ধকারকে ভয়, এ কি মানুষের রক্তে মিশে থাকা অভ্যেস, যা নিয়েই সে জন্মায়? নাকি পৃথিবীতে যারা কিছুদিন আগে এসেছে, দু 'চারটে বর্ষা -ভূমিকম্প -মহামারি দেখেশুনে ভয় পেতে শিখেছে, অন্ধকারের ভয়টা নতুন মানুষের মনে তারাই গেঁথে দেয়? নাকি যাকে আমরা দেখতে পাই না, তা -ই আমাদের কাছে অজানা? জানি না বলেই তাকে ভয় পাই? তা -ই যদি হবে, তবে যারা নিজের বাড়ির চেনা বাথরুমটাতেও অন্ধকারে যেতে ভয় পায় তাদের কি বলবে? বাড়ির বাথরুমটাকে দিনের বেলায় চিনতাম, আর মাঝরাতে হুট করে সেটা অচেনা হয়ে গেল, এ হয় নাকি?

তারপর দ্যাখো, মানুষের ভাষাতেও অন্ধকারকে কেমন নেতিবাচক করে দেখায়! অন্ধকার আর কালো, এই দুটো কথা যেন যত ময়লা আর খারাপের বোঝা বইছে। কারো মন খারাপ, অমনি তার মনে আঁধার জমল। কারও ছেলে বদসঙ্গে পড়েছে, ব্যস, সে নাকি অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যে টাকা সৎপথে আয় হয়নি, সে টাকা অমনি হয়ে গেল কালো টাকা। কেন, অসৎ টাকা ময়লা টাকা হতে পারত না? ময়লা কি শুধুই কালো? তার রং তো হলুদ সবুজ ফিকে বেগুনি হতেই পারে? শুধু কালোর কপালেই ময়লার বদনাম কেন? মনের খারাপ হওয়ার দায় অন্ধকার নিতে যাবে কোন দু:খে? তোমার মনের কোন তারে ব্যথা লেগেছে বলে তোমার মন খারাপ, তাতে অন্ধকারের দোষ কি?

আলো সারাদিনের পরে একটু বিশ্রাম নিতে যায়, তখন পৃথিবীর সব রং মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়ে আসে অন্ধকার, আঁধারের মানে তো এইটুকুই। তাকে কেমন আমরা ভিলেন বানিয়ে ফেলি, নিজেদের মনের পাপচিন্তাগুলোকে অন্ধকারের আড়ালে বাইরে এনে ফেলি, আর দোষ চাপাই কালো আঁধারের ঘাড়ে। রাতের অন্ধকার না থাকলে যে সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে আবার পরেরদিনের সূর্যটার আসা হত না, সেকথা আমরা ভুলেই যাই।

Wednesday, 24 May 2017

কুটুন আর বাবা

কুটুনের বাবার বেশ কিছুদিনের অভিযোগ, মেয়ের দিনযাপনে বাবার অবদানকে একেবারেই প্রচারের আলোয় আনা হচ্ছে না। তাঁকে যতই বোঝানো হোক, বাবা -মেয়ের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে হলে যতখানি সময়ের দরকার ততটা পাওয়া যাচ্ছে না বলেই কাজটা হয়ে উঠছে না, তিনি শোনার মানুষ নন। ব্যাপারটায় চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে টুকরো সময় হাতে নিয়েই বসতে হল, জানিনা বাপু এতটুকু সময়ে দুই প্রতিভাধরের গুণ কতটা গাওয়া যাবে।

সকাল থেকেই শুরু হোক। হপ্তায় তিনদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ে দেখে বাবা পাশে ঘুমোচ্ছে (বাকি দিনগুলোয় নিজেই হাত উল্টে বলে "বাবা অফিসি")। কুটুনের ঘুম ভাঙ্গার পরেও যদি কেউ বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় সেটা এক ধরনের অপরাধ। সঙ্গে সঙ্গে সে তার নিজের ভাষায় বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। শুধু মুখের কথায় বাবা উঠে পড়েন তা নয়, তিনি হয়ত তখন কুটুনের বালিশটাই টেনে আরেকবার চোখ বোজার চেষ্টায় আছেন, কুটুন অমনি  "তুতুন-বালিশ নিও না, ওথো ওথো" বলে তাঁকে ব্যস্ত করে তোলে। সবশেষে বালিশ ধরে টান মারে কিংবা বাবার চোখের পাতা টেনে খোলার চেষ্টা করে, অগত্যা বাবাকে উঠে বসতেই হয়।

এসব কাণ্ড চলাকালীন মা কিন্তু ভুলেও ঘরে ঢোকেন না। কি দরকার বাপু কাঁধ পেতে ঝামেলা নেওয়ার. বাবা মেয়ে থাকুন নিজেদের নিয়ে, উনি ততক্ষণে হাতের কাজ একটু এগিয়ে রাখেন।

এরপর সকালের কাজকম্ম জলখাবার ইত্যাদি সেরে দিন এগোয়। বাবা বাড়িতে থাকলে মায়ের চেষ্টা থাকে কুটুন-সংক্রান্ত বেশিরভাগ দায়িত্ব বাবার হেফাজতে দেওয়ার। তিনি নিজের মনে রান্না, কাচাকুচি, বিছানা ঝাড়া আর ফাঁকে ফাঁকে খবরের কাগজে চোখ বোলানোর কাজ সারেন। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার কাজটা করতে হচ্ছেনা বলে এসব দিনে মায়ের মন ভারি ফুরফুরে থাকে।

ওদিকে তখন খাওয়ার টেবিলে কিংবা সোফায় বসে বাবা আর মেয়ের জলসা শুরু হয়েছে। "আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে",  "ভেঙ্গেচুরে যায় আমাদের ঘরবাড়ি" হয়ে  "ভুখ লাগি ভুখ লাগি" , গানের তালিকা বিশাল। কখনও টেবিলে তাল ঠোকা, কখনও আবেগ সামলাতে না পেরে নাচ, হামাগুড়ি, ডিগবাজি সবই ঢুকে পড়ে জলসার মেনুতে।

মাঝেমধ্যে চলে জল খাওয়া পর্ব। এই কাজটি মা বিশেষ ভাল পারেন না। মায়ের হাতে জলের গ্লাস দেখলেই কুটুন হয় দৌড়ে পালায়, নয়ত জলের গ্লাসটা নিয়ে জলটা হড়াত করে মেঝেতে ঢেলে গায়ে মাথায় মাখে, কিংবা কুলকুচি করার সময় কেমন দেখতে লাগে সেটা আয়নায় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বাড়িতে থাকলে এই দায়িত্বটাও বাবাকেই নিতে হয়। তিনি নিজে একটি বড় কাচের গেলাস নিয়ে এবং এরই একখানা ধাতব সংস্করণ মেয়ের হাতে ধরিয়ে দুজন মিলে মাটিতে বসে গেলাসে গেলাসে ঠোকাঠুকি,  "তুই আগে না আমি আগে" এরকম নানা খেলাধুলো দিয়ে জলপান পর্ব পালন করেন। কখনও কখনও ঘুষ হিসেবে ফ্রিজ থেকে এক টুকরো চকলেটও বেরোয়। বাড়ির সব্বাই তাদের বরাদ্দ পেল কিনা সেদিকেও কুটুনের নজর থাকে।

এরপর শুরু হয় ওনাদের শরীরচর্চা। ধরো বাবা অফিসে বেরোবেন বেলা একটায় (হপ্তায় দুদিন উনি দুপুরের গাড়িতে অফিস যান, দুদিন কাকডাকা ভোরে, আর দুদিন রাত জাগেন), ওনার ব্যায়ামের ক্ষিধে জাগবে বেলা বারোটা নাগাদ। সঙ্গী অবশ্যই ক্ষুদে কুটুন। দুই প্রতিভাবানের এই পর্বের কাজের বহর দেখবার মত।

শুরু হয় দৌড় দিয়ে। বসার ঘর থেকে শোওয়ার ঘরের দেওয়াল... এই রাস্তায় বার দশেক ছুটোছুটি চলে, মেয়েকে অন্তত পাঁচবার জিততে দিতেই হয়। এরপর একে একে বার্পি, এক -দুই (সিট আপ), পুশ আপ, চেয়ারে এক পা তুলে মেঝেতে হাত রেখে খানিকটা কসরৎ, খাওয়ার ঘরের মাথায় বাতিল জিনিস জড়ো করার যে তাক আছে সেইটা ধরে কিছুক্ষণ ঝোলাঝুলি করা (বাবা অবশ্য শক্ত করে মেয়েকে ধরে রাখেন ) , এবং অবশ্যই নমো ব্যায়াম।

এটা কি ব্যাপার? বাবার কাছে একটা ভয়ঙ্কর ভারি বারবেল আছে। তাতে কুটুনের হাত দেওয়া বারণ। বাবাকে ওটা তুলে কায়দা করতে দেখে মেয়ের মনেও শখ জাগত জিনিসটা মাঝেমাঝে ছুঁয়ে দেখার , কিন্তু বকুনির ভয়ে কাছে ঘেঁষা হত না, হাত ঠেকিয়ে নমো করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াতে হত। কিছুদিন এভাবে চলার পর কুটুন আবিষ্কার করল, আরে,  রান্নাঘরে তো বারবেলের মত দেখতে একখানা খাসা জিনিস পাওয়া গেছে। আড়ালে আবডালে হয়ত দু  'একদিন মকশো করেও থাকবে, কেননা, একদিন বাবা বারবেল হাতে তুলতেই "দাঁড়াও আমারটা আনি" বলে গটগটিয়ে রান্নাঘর থেকে রুটি বেলার বেলনখানা এনে হাজির করল। কিচ্ছু বলার নেই, নিরীহ হাল্কা বেলন, কুটুনের হাতে বারবেল হিসেবে দিব্যি মানিয়ে গেল। তারপর থেকে বাবা বারবেল ভাঁজতে শুরু করলেই সে-ও তার বেলন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাবা যদি সেই বারবেলের দুপাশে দু 'খানি বাড়তি ওজনের চাকতি ঝোলান, তবে সেও "আম্মো কম কিসে" গোছের মুখ করে তার বেলনের দুপাশে তার মায়ের দুটি ফিনফিনে চুড়ি ঝুলিয়ে নেয়। সমমানের ব্যায়ামের অধিকার সকলের আছে।

যাই হোক, ব্যায়ামের উত্তেজনা কমার পর ঘড়ির দিকে চোখ পড়লে দেখা যায় সাড়ে বারোটা বাজে। অতঃপর হুড়োহুড়ি, চান এবং খেতে বসা... বাবাকে ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। কুটুনও এই ব্যস্ততার আঁচ পোহায়। বাবা চান করতে ঢুকেছেন, মেয়ে এসে দরজা ধাক্কিয়ে বলে চলল "বাবা সালোতা (সাড়ে বারোটা) বেজে গেছে, বেরোও ", কিংবা মায়ের হাত থেকে ডালের বাটিটা নিজেই নিয়ে পরিবেশনের চেষ্টা, এইসব চলতে থাকে।

বাবা আর মেয়ে একসঙ্গে খেতে বসে। দুজনে টেবিলের দুই প্রান্তে, দুই থালায়। এটা না করলে গোল বাধবেই। বাবা যতই ধোপদুরস্ত জামাপ্যাণ্ট পরে খেতে বসুন না কেন, মেয়ে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে কোলে উঠে বাবার থালা থেকে খাবার মুখে তুলবেই, দু  'এক চামচ দই বাবার জামায় ঢালবেই। তাই এইসময় তাকে নিজের কাজে ব্যস্ত রাখতে হয়।

খাওয়ার পর হুড়োহুড়ি করে জুতোমোজা পরে বাবা অফিসে রওনা হন। বেরোনোর আগে দুজনের টা -টা পর্ব চলে কিছুক্ষণ, শেষ অব্দি মায়ের ঠ্যালায় বাবা গিয়ে লিফটে ওঠেন। কোনও কোনও দিন কুটুনও ঝোলভাত মাখা মুখে বাবার পিছু পিছু দৌড়ায়। মা গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে ঘরে আনেন।

এরপরের বাকি দিনটা মা আর মেয়ের। বাবা ফিরবেন সে - ই রাত সাড়ে দশটায়। মেয়ের ততক্ষণে রাতের খাওয়া সারা, কিন্তু বাবা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত ঘুমোতে নেই, তাই চোখ কচলে ঘুম তাড়িয়ে সে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। বাবা এলে আরেক প্রস্থ নাচ গান বাবার থালায় আরেকবার খাওয়া ইত্যাদি সেরে বাবা আর মা দুজনকেই বগলদাবা করে তবে কুটুনের ঘুমের অবসর মিলবে।

Sunday, 7 May 2017

এতদিনে বুঝিলাম...

গত বছর আমার বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করেছিলাম পুজো বলতে অবশ্য যদি ভাবেন, বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসারে ষোড়শপচার সাজিয়ে আসন পেতে মা লক্ষ্মীকে বসতে ডেকেছিলাম, তাহলে আমায় অতিরিক্ত ভক্তীমতী ভেবে ফেলা হবে অতটা আমি নই সত্যি বলতে কি, দুর্গাপুজোর আগে থেকেই মনটা অনবরত নারকেল নাড়ু-মুড়ির মোয়ার নাম জপছিল, তাকে ধমকে থামানো যাচ্ছিল না মোটে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোয় কেউ না কেউ নিশ্চয়ই কোজাগরী পূর্ণিমায় পুজো করেন, আমার বছর দুয়েকের কন্যার জনপ্রিয়তা সেসব বাড়িতে কিছু কম নয়, তার দৌলতে নিশ্চয়ই দু'তিন বাটি নাড়ু-মোয়া বাড়িতে আসবে ও মা, সে গুড়ে বালি! খোঁজ নিয়ে জানলাম পাড়াতুতো কাকীমা-বৌদি-ননদরা যে যার দেশে রওনা দিচ্ছেন লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষ্যে এদিকে আমার মনের ততক্ষণে পুজোর লুচি-মোহনভোগের কথা মনে পড়ে গেছে

ছোটবেলায়  প্রতিবছর টুটুনমাসীদের বাড়িতে পাত পেড়ে কলা-আপেলকুচি-নাড়ু-লুচি-মোহনভোগ খেয়ে বাড়ি এসে খোঁজ নিতাম আর কাদের বাড়ি থেকে প্রসাদ এসেছে, যাতে পরদিন সকালেও প্রসাদ থাকছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়

সেসব দিন বহুকাল হল ইতিহাস হয়েছে, তবে পুজোর দিন মায়ের হাতের নারকেল নাড়ু প্রতি বছরই পাওয়া যেত মা নিজের  অফিস এবং সংসার সামলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে লক্ষ্মীপুজোর আগের সন্ধেয় নারকেল নাড়ু তৈরি করতেন দুর্গাপুজোর পরেই অফিসে কাজের চাপে লক্ষ্মীপুজোয় আর ছুটি নেওয়া যেত না, ব্যস্ত সকালে ঝড়ের বেগে কাজকর্ম মিটিয়ে নতুন একটা শাড়ি পরে মা-লক্ষ্মীর আরাধনা নিজের মত করে সেরে নিয়ে অফিসের পথে পা বাড়াতেন আমাদের স্কুল-কলেজ ছুটি থাকলেও আমরা বিশেষ কিছুই করতাম না, বড়জোর মায়ের শাড়ির কুঁচি ধরে দেওয়া, কিংবা কোনো বছর একটু সকাল-সকাল চান সেরে দু'একটা ফল কেটে রাখা বা ঠাকুরঘর মুছে রাখা, এটুকুই প্রসাদ খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজই বাধ্যতামূলক বলে আমাদের মনে হতনা মা নিজেই উদ্যোগী হয়ে একা হাতে সব করতেন 

তা, বছরতিনেক হল সে রীতিরও ইতি হয়েছে মা নিজেই মা-লক্ষ্মীর কাছে গিয়ে পৌঁছেছেন, বোধহয় আরও মন দিয়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ চাইবেন বলেই মা নেই, ওসব-ও আর হয় না

তবে এবার পুজোর আগে থেকেই মনটা বড় প্রসাদ প্রসাদ করছিল কিনা, তাই লোভে পড়ে ভেবে ফেললাম আমিই যদি বাড়িতে প্রসাদ, মানে পুজোর জোগাড় করে ফেলি? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমি পুজোআচ্চার নিয়মকানুন বিশেষ কিছুই জানিনা যেকোনো পুজোর আগে আলপনা আঁকা, বাসনকোসন ঘষেমেজে ধুয়ে তাতে নানা উপাদেয় খাবারদাবার নিয়ে ঠাকুরঘরে সাজিয়ে রাখা, ফুল জোগাড় হলে ভাল, নহলে শুধু হাত জোড় করেই "ঠাকুর তুমি ভাল থাকো, তাহলেই আমরা ভাল থাকব" গোত্রের প্রার্থনা করা (পৃথিবীর সাতশো কোটি মানুষের রোজ দু'বেলা চোদ্দোশো কোটি চাওয়া মেটাতে ভগবান জেরবার তাঁর ভাল থাকার কথাটাও তো ভাবতে হবে!),এবং সবশেষে হাত ধুয়ে এসে ঐসব নানাবিধ সুখাদ্য আয়েস করে বসে খেয়ে আঙ্গুল চাটা--- আমার কাছে পুজোর অত্যাবশ্যক কাজ হল এগুলোই

আমার ডেরায় আমিই সর্বেসর্বা কাজেই প্রসাদের লিস্টি আমি নিজেই বানিয়ে ফেললাম মেয়ের বাবা কোথায় যেন গিয়েছিলেন অফিস ট্যুর উপলক্ষ্যে (গিন্নির প্রসাদভক্তির ঠ্যালায় বাজার করতে বেরনোর চেয়ে অফিস ট্যুর শতগুণে আদরণীয়, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ মানুষ-মাত্রেই একমত হবেন), ফিরবেন পুজোর দিন বিকেলে, অগত্যা বাঁ কাঁখে মেয়েকে চেপে ডান হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম বাজারের দিকে

বাচ্চা কোলে বাজার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা আশা করি আমার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবেন আমার নিজেরও একসময়, তখনও মা হইনি, মনে হত, "আহা, ফুলের মত বাচ্চাগুলো প্রজাপতির মত খেলে বেড়ায়" ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু এখন কাঁধের ঝোলা, কোলের বাচ্চা, হাতের থলে সবকিছু একসঙ্গে সামলে বাজার করার পরিস্থিতিতে পড়লে নিজের বাচ্চাকে দেখেও উড়ন্ত আরশোলা কিংবা খেলে বেড়ানো ছাগলছানা ছাড়া অন্য কোনো উপমা মাথায় আসে না, বিশ্বাস করুন!
যাই হোক,মহৎ উদ্দেশ্যে মানুষ উদ্যোগী হলে ভগবান সহায় হন, তাই মেয়ে বার দুয়েক মুড়কি-বাতাসার ঝুড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও, এবং বাধা পেলেই বার বার মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়া সত্ত্বেও মোটের উপর নির্বিঘ্নেই একথলি বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম

পরদিন ভোরবেলায় উঠব ভেবে রেখেছিলাম, ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম আটটা বেজে গেছে নিজের ঘুমের রাশ কেন যে নিজের হাতে থাকে না কে জানে? যাই হোক, রান্নার জোগাড় করতে করতে হঠাৎ মনে হল সবাই তো শুনেছি সারাদিন উপবাসী থেকে সন্ধ্যেবেলায় লক্ষ্মীপুজো করে, আমিও করব নাকি উপোস? এমনিতে ঘণ্টাতিনেকের বেশি না খেয়ে আমি থাকতে পারি না, তায় আবার লো প্রেশারের ধাত! মাথা ঘুরে পড়ে গেলে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হবে তার ওপর 'উপোস করছি' ভাবলেই বেশি ক্ষিধে পায় ঠিক করলাম উপোসই করব, তবে ফি-ঘণ্টায় এক গেলাস করে শরবত খেয়ে যাব

দুপুরে মেনু ছিল গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি আর আলুর দম খাওয়ার লোক বলতে কন্যে,তাও আবার সে হাঁ করবে আর আমি খাওয়াব ভাবুন দেখি একবার, নুন-চিনির শরবত খেয়ে উপোস করে আছেন, সামনে বেড়ে রেখেছেন এক থালা ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর আলুর দম কতখানি সহনশক্তি থাকলে ওই ধোঁয়া-ওঠা থালার হাতছানি এড়িয়ে থাকা যায়! কিন্তু আমি তো দিব্যি মুখ ফিরিয়ে রইলাম! তবে কি এ মাহাত্ম্য উপোসের , নাকি বিকেলের হবু প্রসাদের, কি জানি??

মনের কষ্ট মনেই চেপে রেখে "উপোস করে চোদ্দোবার 'ক্ষিধে পাচ্ছে ক্ষিধে পাচ্ছে' ভাবতে নেই" এসব আউড়ে মনকে ধমকে চুপ করানো হল এরপর মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ভোগ রান্নার পালা সকালে অবশ্য নারকেল কোরা সেরে রাখা হয়েছে পাশে বসে মেয়ে মন দিয়ে নারকেল কোরা দেখেছে (বেড়াল যেভাবে মাছ কোটা দ্যাখে), মাঝে মাঝে থালার দিকে হাত বাড়ালে তাকে বুঝিয়েছি, "বিকেলে আগে ঠাকুর খাবে, মা লক্ষ্মী খাবেন, তারপর আমরা খাব", শুনে ছোট্ট মানুষটা হাত গুটিয়ে নিয়েছে ছবির মধ্যে থেকে হাত বাড়িয়ে মা-লক্ষ্মী যখন নারকেল কোরা খাবেন, তখন তাঁকে না জানি কেমন দেখতে লাগবে, এসবই বোধকরি ভাবতে শুরু করেছে ভারি অবাক হয়ে আর তাকে বারণ করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেছে আরেকটা ছোট্ট মেয়ের কথা, থালায় রাখা সাদা নারকেল কোরা দেখলে আর গুড়ের পাক দেওয়া নারকেল নাড়ুর গন্ধে যার জিভে জল আসতোই আসতো, আর মায়ের নরম-গরম চাউনিতে জিভের জল গিলে নিয়ে সে-ই কখন পুজোর শেষে থালায় করে মা প্রসাদ আনবে, তার জন্য হা-পিত্যেশ করে তাকে বসে থাকতে হত

মা আর মেয়ে, মেয়ে আর মা--- কি অদ্ভুত ভাবে ভূমিকা গুলো অদল-বদল হয়ে যায়, তাই না! আজ মেয়েকে যখন চোখ রাঙাই, তখন যদি কেউ আমার সামনে আয়না ধরে, তবে বোধহয় আমার চাউনি আর মায়ের সেই নরম-গরম চাউনির মধ্যে বেশ কিছুটা মিল খুঁজে পাব

সন্ধ্যেবেলায় পুজোর শেষে (ক্ষুদে গিন্নি অবশ্য থালায় ভোগ সাজিয়ে ঠাকুরঘরে রাখার পরেই একখানা লুচি আর একখানা নারকেল নাড়ু তুলে গালে পুরেছিল) পড়শিদের প্রসাদ দিয়ে এসে যখন নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসলাম, দেখলাম লুচি, মোহনভোগ, আলুভাজা, নারকেল নাড়ু, মায় সিন্নি অব্দি খাসা হয়েছে খেতে আমি যে এত ভালো রাঁধতে জানি, নিজেই জানতুম না! মা যদি জানতেন তাঁর 'কুটোটি ভেঙে দুটো না করা' মেয়েটা কেবল মায়ের হাতের রান্না খেতে কেমন হত তা মনে করার চেষ্টা করতে করতেই দিব্যি রেঁধে ফেলেছে, বেশ নিশ্চিন্ত হতেন তা, মা-কে তো আর এই নতুন শেখা বিদ্যের নমুনা দেখানো গেল না

মা যেখানে আছেন সবই জানতে পারছেন, আমাদের হাসি-কান্না-রাগ-হৈ-চৈ-এর সব খবরই রাখছেন, এসব ভেবে মনকে আগলানোর চেষ্টা তো করি, কিন্তু মা যে জানতে পারছেনই, সে খবরটা তো আর কেউ এসে আমার কাছে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, সবই তো আমাদের মনগড়া ধারণা, নিজেদের ভাল থাকার জন্য মনকে প্রবোধ দেওয়া, তাই কখনো কখনো মন কিচ্ছুটি বোঝে না সারাদিনের কাজের মাঝে মনের মধ্যেকার একটা ছোট্ট আমি ছোটবেলার সেই রোজকার ভুলগুলো করে আবার মায়ের বকুনি খেতে চায়, আর যে আমিটা বছরদুয়েক হল মা হয়েছে, সে চায় একবার অন্তত তার মা এসে তাকে মা হওয়ার পাঠ দিক, মা হতে শেখাক সে তো আর হওয়ার নয়, তাই নিজের ছোটবেলা-টাকে মনে করতে করতেই মায়ের মত মা হওয়ার একটা বৃথা চেষ্টা করতে থাকি রোজ।।


(এখানে পুজো-আচ্চা সম্পর্কে যা কিছু লিখলাম সবই আমার নিজের মনের কথা যেসব মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে নিয়মিত পূজার্চনা করে থাকেন, তাঁদের মনে কোথাও আঘাত দিয়ে ফেললে তাঁরা যেন নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করে দেন, এই অনুরোধ রইল)


['আমি অনন্যা' পত্রিকা (ISSN:2394-4307), ধানবাদ- January-March 2017 সংখ্যায় প্রকাশিত]

Saturday, 8 April 2017

সিনেমার গল্প

গৌতম ঘোষের 'দেখা  ' দেখছিলাম সেদিন,  ট্রেনে যেতে যেতে, সদ্য আলাপ হওয়া সহযাত্রিণীর মুঠোফোনে. অন্যের ফোনে উঁকি দেওয়া খুব একটা ভাল স্বভাব নয় জানি, কিন্তু বাংলা সংলাপ শুনে চোখ কান দুই -ই ধেয়ে যাচ্ছিল ফোনের পানে।

এটা আমার ছোটবেলার অভ্যেস. ট্রেনে কিছু করার না থাকলেই পাশের জনের দিকে নজর যাবে, তার হাতে যদি গল্পের বই থাকে তো ঘাড় বাড়িয়ে তার সঙ্গে আমিও পড়তে শুরু করব, খোলা পাতাটা হুড়োহুড়ি করে শেষ করে উদাস মুখে বসে থাকব সে কখন পাতা উল্টে পরের পাতায় যাবে, হাত নিশপিশ করবে নিজেই পাতা উল্টে নেওয়ার জন্যে. এভাবে নাম না জানা বহু বই শেষ না হতেই ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে অনেকবার. 

বই পড়ার বদলে যদি কেউ বাংলা ছবি দেখে, তাহলেও একই কাজ করে ফেলি. প্রথমে আড়চোখে, তারপর গলা বাড়িয়ে দেখতে বসে যাই. এইদিনও তেমন হয়েছিল.

ছবিতে এক জায়গায় দেখলাম ছোট্ট একটা ছেলেকে "শশী -দা" বিনে পয়সার বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন. মনটা হইহই করে উঠল. আরে! এ তো আমার বহুকালের চেনা জিনিস!

টিভিতে সিনেমা দেখা যায়, একথা জানার আগে থেকেই জানতাম রাত্তিরবেলায় অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে সিনেমা দেখা যায়. আমাদের মামারবাড়ি একদম বড় রাস্তার ধারেই. ভোর থেকে মাঝরাত, সর্বক্ষণ রাস্তায় গাড়ির সারি, হর্ণের আওয়াজে বাড়ির লোক অতিষ্ঠ. আমার কিন্তু বেশ লাগত. আমাদের বাড়িটা আবার ছিল একটু গলির ভেতরে, সারাদিনে গাড়ি -টাড়ি দেখার সুযোগ বিশেষ হত না. তাই মামারবাড়ি গেলে বারান্দা ছেড়ে নড়তে চাইতাম না.
সবচেয়ে মজা হত একটু রাত্তির হলে যখন ভারী ভারী ট্রাক -ট্রেলার গুলো যেত রাস্তা দিয়ে, প্রায় একশো বছরের পুরনো বাড়িটার গায়ে হাল্কা একটা কাঁপুনি ধরত, সেই কাঁপুনি চারিয়ে যেত মা বা দিদার পাশে শুয়ে থাকা আমার মধ্যেও. কাঁপছি না, অথচ পিঠের নিচে একটা গুড়গুড় করা ভাব, ভূমিকম্পের সময়েও কি এমনটাই হয়? জিজ্ঞেস করে বকুনিও খেয়েছি বারকয়েক. ওনারা দু 'তিনবারের ভূমিকম্পের সাক্ষী, রাতবিরেতে ওসব কথা ওনাদের ভাল লাগবে কেন?

এই ভারী ট্রাকগুলো যখন ছুটে যেত, দেখতাম ঘরের দেওয়ালেও একদিক থেকে আরেকদিকে সাঁ করে একটা ছায়া সরে গেল. প্রথমে ভাল বুঝতাম না, ভয় করত কিনা মনে নেই, সম্ভবত অজানাকে ভয় পাওয়ার মত বড় তখনো হইনি. ওইসব ছায়াগুলো যে সিনেমা, এই তত্ত্ব-টাই বা কে বুঝিয়েছিল সেটাও মনে নেই. তবে যেই বুঝলাম যে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেলেই দেওয়ালে আলো -ছায়াদের দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, আর গাড়ির আওয়াজ মিলিয়ে গেলেই দেওয়ালে এসে পড়া রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো আবার শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, অমনি আমাদের নতুন খেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল.

ঘুম আসার আগে অব্দি রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেলেই "এই... আসছে আসছে" বলে বোনেরা ঠেলাঠেলি শুরু করতাম, একলা শুলে নিজেকে ঠেলতাম. "এই -ই-ই যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে.... যা:, চলে গেল", "আবার আসবে দাঁড়া না", এরকম কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত থামত মা, মাসিমণি বা দিদাদের কারো ধমকে.

একটু বড় হওয়ার পরে খেলাটা কিছুটা পাল্টাল. তখন সরে যাওয়া সিনেমার আলো দেখে বোঝার চেষ্টা চলত গাড়ির চরিত্র কেমন. চার চাকা না আট চাকা, গাড়ির মাথায় মাল বোঝাই নাকি অতটা ভার নেই, এমন নানা তথ্য পাওয়ার জন্য কসরত হত. অত কাণ্ড না করে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তা না, এ যেন সিনেমা দেখতে বসে নামের লিস্টি না দেখে মেক-আপের আড়াল থেকে আসল মানুষটাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা!

মাঝেমধ্যে গুনতাম কে ক 'টা গাড়ির তৈরি সিনেমা দেখলাম. এই গুনতি করার সুবিধেটা হল ঠিক কোন সময়ে ঘুমটা এসে পড়ল সেটার একটা আবছা হিসেব পাওয়া যায়. বেশ "কাল পাঁচটা গাড়ি যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছি, আজ দেখি একই সময়ে ঘুম আসে কিনা" এরকম একটা হিসেব. আপেক্ষিকতার মত ঝামেলার বস্তু ভাগ্যিস তখন জানা ছিল না!

তো, এই হল সিনেমার গল্প. বছর কুড়ি  -পঁচিশ আগে গল্পের শুরু. জানিনা এখনও এমন সিনেমার গল্প তৈরি হয় কিনা. নিশ্চয়ই হয়. অবাক হওয়ার অভ্যেস তো আজও আছে. এখনও শোওয়ার ঘরে রাস্তার আলো এসে পড়ে. গাড়ির আওয়াজে আলো -ছায়ার ছুটোছুটি এখনো চলে.
 "ওটা কি মা? এদিক থেকে ওদিকে চলে গেল?" প্রশ্নটা কারো মনে আসে কিনা তারই অপেক্ষা এখন!