Tuesday, 30 June 2015

এক টুকরো পুজোর ছবি




দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই আমাদের চন্দননগরের বাড়িতে শুরু হয়ে যেত জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য ঘর ঝাড়ামোছার পালা। শোওয়ার ঘরের তাক থেকে বছরখানেকের ধুলো ঝেড়ে সেখানে নতুন করে পুরনো খবরের কাগজ পেতে গুছিয়ে রাখা হত কাচের শিবমূর্তি, পিতলের নৌকো, ডিমের খোলা আর কালো ভেলভেটের তৈরি পেঙ্গুইন, নৈনিতাল থেকে আনা মোমের কুকুর আর এরকম নানা ঘর সাজানোর জিনিস। এর কোনোটা মা বাবা পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে, কোনোটা রথের মেলা বা রাজস্থানের সংগ্রহ। প্রতিবার গুছোনোর সময় আমি চেষ্টা করতাম একটা প্যাটার্ন মেনে জিনিসগুলো সাজানোর, যেমন, কেরালার কাঠের আর চন্দননগরের রথের মেলার বাঁশের নৌকা একই সারিতে থাকবে, হরিদ্বারের পাথরের আর পুরীর ঝিনুকের ধূপদানি পাশাপাশি থাকবে, তাহলে বিবিধের মাঝে মিলনের মাহাত্ম্য চোখে পড়বে সহজে, কিন্তু প্রতিবারই শুরু করার একটু পরেই খেই হারিয়ে রাজস্থানী পুতুলের পাশে বসে পড়ত তাজমহল বা হাতির দাঁতের হাতির সারি।

ঘর গোছানোর পাশাপাশি চলত পর্দা বেডকভার কাচা, রান্নাঘরে বড়মাপের হাঁড়ি ডেকচি নামিয়ে মাজা ধোওয়ার পর্ব। ঠাকুরঘর থেকে বসার ঘর, গোটা বাড়ি ঝকঝকে হয়ে কাচা পর্দায় সেজেগুজে তৈরি হয়ে থাকতো অতিথিদের জন্যে। আর ফ্রিজের ভেতর তৈরি থাকত মায়ের হাতের রসগোল্লার পায়েস। ঘন দুধের মধ্যে সরজড়ানো রসগোল্লাগুলোর স্বাদ একবার পেলে আর ভোলা যায় না।

আমাদের স্কুল তো দুর্গাপুজোর আগে বন্ধ হয়ে খুলতো একেবারে জগদ্ধাত্রী পুজোর পর, কাজেই এই একটা মাস কাটতো যাকে বলে তুরীয় আনন্দে। মাঝেমাঝেই একবেলার পড়তে বসা মুলতুবি রয়ে যেত বইয়ের তাক গোছানো বা জানলার পর্দা লাগানোর অছিলায়। আমাদের মতলব বুঝে মা চোখ পাকানোর আগেই তাঁর হাত থেকে ঝাড়ন নিয়ে লেগে পড়তাম খাটের ছত্রি মোছার কাজে।

এরকমই এক বছর, সেটা বোধহয় 1998 সাল, পুজোর মাসদুয়েক আগে বাড়ির দোতলার ঘরগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। রং করা নতুন দোতলাটায় উঠলে মনে হচ্ছে যেন আমাদেরই আরেকটা বাড়িতে এলাম। আত্মীয়মহলে তো জানতোই আমাদের নতুন দোতলার খবর, জগদ্ধাত্রীপুজোর আগে আগে মামা-মাসিদের মহল থেকে দাবি উঠল 'দিদির বাড়িতে দোতলা-প্রবেশ করতে হবে"।

"দোতলা-প্রবেশ মানে? এটা কি আলাদা বাড়ি নাকি যে নতুন করে গৃহপ্রবেশ করতে হবে?" মা-র কাছে মামা-মাসিদের পাঠানো প্রস্তাব শুনে বাবার প্রথম কথা ছিল এটাই।

"তাছাড়া লোকে গৃহপ্রবেশের পুজো করে আনকোরা নতুন বাড়িতে, পুজোর আগে সেবাড়িতে কেউ থাকেনা। আমাদের দোতলায় তো আমরা অলরেডি রাত্রে ঘুমোচ্ছি, মানে সেটা তো আর নতুন নেই। তাহলে আর পুজোর দরকার কি? প্রতিবারের মতো পুজোর কদিন সবাই মিলে হই-চই করলেই হলো, আলাদা পুজো আবার কেন?"

বাবার অকাট্য যুক্তির উত্তরে মা পুজোর উপকারিতা বোঝাতে বসলেন, "আহা বুঝছো না কেন, পুজো সবসময়ই ভালো। বাড়ি নতুন হোক বা পুরনো, তোমাদের সবার ভালোর জন্যই তো পুজো করা। তাছাড়া বেশি কিছু তো হবে না, সকালে পুজো আর দুপুরে খাওয়া-দাওয়া, ব্যস। এই দ্যাখো লিস্ট বানিয়ে রেখেছি, চল্লিশজন হচ্ছে"

"চল্‌-লিশ! কোত্থেকে?!" বাবার জিজ্ঞাসায় মায়ের মুখ থমথমে হয়ে উঠলো।  আবহাওয়া গরম হচ্ছে দেখে বাবা তড়িঘড়ি সামলালেন "মাত্র চল্লিশ! আমি ভাবলাম একশো ছাড়াবে"!

অষ্টমীতে গৃহপ্রবেশের দিন আছে, ঠিক হল ঐদিন আমাদের 'দোতলা প্রবেশ'এর পুজো হবে।

অষ্টমীর দিন সকাল থেকেই ব্যস্ততা। অন্যান্য বারের মতো আগের দিন ঠাকুর দেখে রাত বারোটায় বাড়ি ফেরা হয়নি। সপ্তমীর সন্ধেয় বেরনোর প্রোগ্রামটাই বাতিল হয়ে গেছে পরেরদিনের পুজোর জোগাড়ের জন্য। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সক্কাল সক্কাল উঠে মা-মাসি দের তাড়ায় চান সেরে পুজোর জন্য চন্দন বাটা, ফুল সাজানো এইসব কাজ, তাও আবার উপোস ক'রে। পুজো মিটলে তবে নাকি খাওয়াদাওয়ার পাট শুরু হবে। কে না জানে সামনে খাবার ভর্তি থালা থাকলে যত ক্ষিধে পায়, "উপোস করছি" ভাবলেই ক্ষিধে পায় তার তিনগুণ!

পুজো, পুজোর পর নতুন দোতলায় মেঝেতে পাত পেড়ে বসে জনা চল্লিশেকের হই-হই করে খাওয়া-দাওয়া পর্ব ভালোভাবেই মিটল, বিকেল চারটে নাগাদ শুরু হলো কেলো, থুড়ি, মেঘের কীর্তি। হঠাৎ দেখি, আকাশ অন্ধকার করে বিকেলেই সন্ধে নেমে এসেছে, আর বেশ শনশন আওয়াজ করে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নভেম্বরে কালবৈশাখী! চৈত্র-বৈশাখের ঘাটতি অঘ্রাণে পুষিয়ে নিতে চাইছে নাকি? এরকম তো কথা ছিলো না! ঘণ্টাখানেক আগেও আকাশ দিব্যি ঝকঝকে ছিল। জ্ঞান হয়ে অব্দি জগদ্ধাত্রী পুজোয় কখনো ঝড়বৃষ্টি দেখিনি, এবার সেটা দেখতে হবে ভেবে মনটা খারাপ লাগছিল।

 দেখতে দেখতে চড়বড় চড়বড় আওয়াজ করে শুরু হয়ে গেল মুষলধারে বৃষ্টি। বাড়িতে তখন আমরা আঠেরো জন। হুড়োহুড়ি করে জানলা দরজা বন্ধ করে সবাই একটু হাঁফ জিরোতে যেই বসেছি, ব্যস, লোডশেডিং। "এই রে, ঝড়বৃষ্টির জন্য পাওয়ার গেল বোধহয়। কখন আসবে কে জানে! কি যে হচ্ছে এবার?" বাবার ঘোষণা শুনে সবাই মুষড়ে পড়লাম। একে তো পুজোর মধ্যে বৃষ্টি ব্যাপারটাই মন খারাপ করে দেয়, তারপর আবার লোডশেডিং!কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর মামা হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো। ঘরের কোণে আমার আর দিদির গোঁজ করে রাখা মুখগুলো দেখে বোধহয় মায়া হয়েছিল।

"দিদি, ক'টা ছাতা আছে রে বাড়িতে? তুতু-বুবু চল্‌ খুঁজবি চল্‌ ক'টা ছাতা পাওয়া যায়"।

মা-ও উঠলেন ছাতা খুঁজতে। আনাচে-কানাচে খুঁজে সাতটা বিভিন্ন সাইজের ছাতা পাওয়া গেল, তার মধ্যে একটা খুললে সহজে বন্ধ হয় না, বন্ধ হলে খুলতে চায় না।

"এক-একটা ছাতায় দুজন করে হলে মোট চোদ্দোজন, বাকি চারজন কি ভিজবে?"

আরে, মামা তো দারুণ প্ল্যান করেছে। ছাতা নিয়ে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরনো! দশমীর আগেই আমাদের ছাতাওয়ালা প্রসেশন। আর সঙ্গে যদি থাকে সাতটা টর্চ, উফ্‌ফ্‌, জমে যাবে তাহলে! ছাতা-টর্চের জোনাকি-থিম প্রসেশন বাম্পার হিট!

 প্ল্যানটা বুঝতে পেরে মান্তুমাসি তাড়াতাড়ি ব্যাগ হাতড়ে দুটো ছাতা আর একটা টর্চ বের করলেন। "দ্যাখো, ভাগ্যিস এনেছিলাম ছাতাদুটো, নইলে আজ বেরনোই হত না।"

দীপঙ্কর মেসো মাসির এই দূরদর্শিতায় মোটেই প্রীত হলেন না, "না বেরলেও ক্ষতি হত না। আমি বেরোচ্ছি না। এই সোফা থেকে আজ সন্ধেয় আমাকে কেউ উঠতে বোলো না"। মেসো পূর্ণ সমর্থন পেলেন বাবার কাছে, "যার যেখানে যাবার ইচ্ছে বেরিয়ে পড়ো, আমরা দুজন বাড়ি ছেড়ে নড়ছি না"।

অগত্যা আটটা ছাতা, ষোলোজন মানুষ। টর্চ পাওয়া গেল তিনটে। 'জোনাকি থিম' সফল হলো না দেখে মনটা দমে গেল, তবে ছাতার প্রসেশনই বা কম কীসে! ইতিমধ্যে কারেণ্ট চলে এসেছে। ষোলোজনের মধ্যে থেকে বেছে বেছে লম্বা-বেঁটে, মোটা-রোগা সবরকম কম্বিনেশন মিলিয়ে মিশিয়ে জুটি তৈরি হলো, যাতে মাথায় বৃষ্টির জল যথাসম্ভব কম পড়ে। বৃষ্টিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আটজোড়া মানুষ আটটা ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়লাম ঠাকুর দেখতে।

রাস্তায় বেরিয়ে কিছুদূর এসে সে এক অসাধারণ দৃশ্য। পরে অনেকবার আফসোস হয়েছে সেই দৃশ্যের ছবি তুলে রাখতে পারিনি বলে। দেখা গেল রাস্তায় হাজার হাজার ছাতা, তার নিচে হাজার হাজার মানুষ। সবাই আমার মামার প্ল্যানে সামিল হয়েছে।

রাস্তায় জল থৈ-থৈ, মাঝেমাঝেই আওয়াজ উঠছে 'ছপাৎ ছপাৎ', ঘাড় উঁচু করে প্যাণ্ডেলের কারুকাজ দেখতে গেলেই সামনের ছাতাওয়ালার ছাতা থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে পিছনে দাঁড়ানো মানুষের গায়ে, পিছনে হেঁটে আসা মানুষের জুতোর জল ছিটকে লাগছে সামনে চলতে থাকা মানুষের গায়ে। প্রথম দু'একবার ঝগড়া করছে দু'পক্ষই, "কিরকম লোক মশাই, দেখে চলুন, গোটা প্যাণ্টটাই তো দিলেন কাদায় ভিজিয়ে", "ও দিদি, ছাতাটা ঠিক করে ধরুন, আমার শাড়িটা তো গেল", একটু পরেই সব্বাই বুঝছে ঝগড়া করা বৃথা। এভাবেই চলতে হবে আজ, বৃষ্টি মাথায় করে ঠাকুর দেখতে বেরনোর প্ল্যান তো আর পাশেরবাড়ির মেজমাইমার নয়, ওটা পুরোপুরি নিজের ইচ্ছে। কাজেই যতক্ষণ না নিজের সেই ইচ্ছে বলছে, "ভাই রে, অনেক হল ঠাকুর দেখা, চান করা, এবার ঘরে ফিরি চল্‌", ততক্ষণ এভাবেই এর গায়ে ছাতার জল গড়িয়ে পড়বে, ওর শাড়িতে কাদা ছিটকে লাগবে, ছাতায় ছাতায় ঠোকাঠুকি হবে, "কেন যে লোকে ঠাকুর দেখতে বেরোয়" বলতে গিয়েই নিজেকে সামলে নেবে ঠাকুর দেখতে বেরনো লোকজন।

বলা বাহুল্য, আমরা ষোলোজনই সেদিন প্রায় চান করে বাড়ি ফিরেছিলাম। এবং সেদিনই ছিল প্রথমদিন, যেদিন বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা সত্ত্বেও মা আমাকে আর দিদিকে একবারের জন্যও বকুনি দেননি। বাড়ি ফিরে আমরা অবাক! বাবা আর মেসো রান্নাঘরে। কোমরে গামছা জড়িয়ে মেসো খিচুড়ির হাঁড়ি নামাচ্ছেন, আর বাবা মন দিয়ে আঠেরো পিস ডিমের ওমলেট ভেজে চলেছেন। সে রাতে ভিজে গায়ে নাক টানতে টানতে গুলিয়ে ফেলছিলাম কোন্‌টা খিচুড়ি-ওমলেট আর কোন্‌টা অমৃত!

উপসংহার হিসাবে যদিও পরের দিন সকাল থেকেই ষোলোজনের হাঁচির কনসার্ট শুরু হয়ে গিয়েছিল। হাঁচির চোটে কখনো মা-মাসি দের চায়ের কাপ থেকে চা চলকে পড়ছে, তো কখনো ছোড়দাদুর বাড়ি কাঁপানো হাঁচির আওয়াজে চমকে পালাতে গিয়ে পাড়াতুতো বেড়াল কম্বল নার্ভাস হয়ে পিছলে পড়ছে মেঝেয়।

যাইহোক, আমাদের 'দোতলা-প্রবেশ, বৃষ্টি-পুজো-ছাতা প্রসেশন সবে মিলেমিশে সেবারের জগদ্ধাত্রী পুজো বেশ ঘটনাবহুল ছিল। তবে সেবার বৃষ্টির হুজ্জোতি চলেছিল আরো দু'দিন, এবং পুজোর বিসর্জন বরাবরের মত দশমীতে না হয়ে হয়েছিল একাদশীর দিন। সুতরাং, আমরা বইপত্তর ঝেড়েঝুড়ে পড়াশুনোর পর্ব শুরু করেছিলাম আরো একদিন দেরিতে। বুকের ভেতরের "ধুত্‌! আবার পড়তে বসতে হবে!" ভাবটাকে আরো একদিন সরিয়ে রাখা গিয়েছিল সেবার।

Sunday, 19 May 2013

ছুটি-ঘড়ি-আর সব

আমার দিদার একটা রিস্টওয়াচ ছিলো। দিদা আর ছোড়দিদা দুজনের একটাই ঘড়ি। আমি যখন ক্লাস এইট-এ, তখন বোধহয় মামা ওনাদের কিনে দিয়েছিলেন ঘড়িটা। মামা বলেছিলেন দুজনকে দুটো কিনে দেবেন, কিন্তু দিদারা রাজি হননি। টাইটান-এর ঘড়ি। আমরা কেউই ঘড়িটা ওনাদের খুব বেশি পরতে দেখিনি। আমার তো মনে পড়েনা।
অথচ একদম যে বাড়ি থেকে বেরতেন না, তাও নয়, মাসে একবার অন্তত বেরতেই হত পেনশন আনতে, তখন পরতেন সরু পাড়ের সাদা ছাপা অথবা তাঁতের শাড়ী, প্রথম শর্ত শাড়ীটা নরম হতে হবে, এতটুকু বেশি মাড়ওয়ালা খড়মড়ে শাড়ী হলে চলবেনা। সঙ্গে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ, যেটা ওনারা কখনোই ঠিকমতো কাঁধে নিতেননা, হাতেই থাকতো।
আমরা যখন স্কুলের লম্বা ছুটিতে মামারবাড়ি যেতাম, আমাদের সেবাড়ির প্রতি আকর্ষণের অন্যতম কারণ ছিল দিদার এই পেনশন তুলতে যাওয়া। সেদিন সকালে দিদা স্নান করে তৈরি হয়ে বেরোতেন। উনি বেরনোর সময় যে হাল্কা ওডিকোলনের গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে থাকত, সেটাও মামারবাড়িকে ভালোলাগার আরেকটা কারণ ছিলো। মায়েদের ব্যবহারের সেণ্ট-এ কেন যে সেই গন্ধটা পেতাম না ছোটবেলায় বুঝতাম না, এটাও বুঝতাম না, মা, মাসিমণিরা কেন ওডিকোলন ব্যবহার করতেন না।
দিদা বাইরে বেরনোর পরে উন্মুখ হয়ে থাকতাম কখন উনি ফিরবেন। কারণ, ফেরার পরেই ব্যাগ থেকে একে-একে বেরোতো ঠোঙাভর্তি সাদা চক, চিনি বসানো নরম রঙ্গিন জেলি লজেন্স, কখনো বাদাম-তক্তি।
যখন ঘড়িটা কেনা হয়েছে ততদিনে আমার কাছে মামারবাড়ির আকর্ষণের ক্ষেত্র বদলেছে, আমি খুঁজে পেয়েছি সাত টাকা দামের সেলাম প্রফেসর শঙ্কু, মামার পৈতেয় পাওয়া শার্লক হোমস অমনিবাস, প্রায় তিরিশ বছর আগের কেনা রবীন্দ্ররচনাবলী আর পুরনো বইয়ের গন্ধ। তা-ও দিদার পেনশন আনতে বেরনোর সাজটি আমি মন দিয়েই লক্ষ্য করতাম, ঘড়িটা কখনো হাতে দেখিনি। ছোড়দিদা, মানে দিদার সাতবছরের ছোট বোন, তিনিও সেটা কখনো হাতে পরেননি। ঘড়িটা বসার ঘরের শোকেসের উপর সুন্দর কেসের মধ্যে প্যাক করে রাখা থাকতো। কোনও আত্মীয় বন্ধু বাড়িতে এলে ওনারা কিন্তু কখনো জানাতে ভুলতেন না যে ছেলে ওনাদের ঘড়ি কিনে দিয়েছে!
মামা ঘড়িটা দেখলেই রেগে যেতেন। তিনি শখ করে কিনে এনেছিলেন মা-মাসি ঘড়ি পরবে বলে, সেটাকে প্যাকেটমোড়া হয়ে থাকতে দেখলে রাগ তো হবেই।
বছরখানেক কেটেছে। মামার বিয়ের কিছুদিন পরে, বোধহয় ক্লাস নাইনের পুজোর ছুটি, ঠিক মনে নেই। একদিন দিদাদের মনে হলো আমার সামনে মাধ্যমিক, সময় দেখে পড়াশুনা করা এবং পরীক্ষায় ঘড়ি পরে যাওয়া অতি আবশ্যক। সন্ধ্যেবেলা মামা বাড়ি ফিরলে দিদা বললেন আমরা আর ঘড়ি কোথায় পরে যাই? এখানে ওটা পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হবে, ওটা আমরা তুতুকে দিচ্ছি। ওর এখন সামনে পরীক্ষা, ঘড়ি খুব দরকার"। অগত্যা আমায় নিতেই হলো। এখন বলছি বটে নিতেই হলো, তখন মনে হয়েছিল একলাফে আমি পনেরো থেকে আঠেরোর কোঠায় পৌঁছে গিয়েছি। এর আগে বাবাকে একবার বলেছিলাম ঘড়ি না থাকার অসুবিধার কথা, বাবা-মা চটজলদি সমাধানরূপে মায়ের বিয়ের ঘড়ি এগিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা হাতে গলিয়ে দেখেওছিলাম, জিনিসটা ঘড়ি না চুড়ি কি ভাবলে ভাল লাগবে বুঝতে পারিনি বলে আর পরা হয়নি। এখন ঘড়িটা হাতে পেয়ে কি আর করবো, খুবই কুন্ঠিত মুখ করে হাতে নিলাম।  সেবার ছুটির পর টানা সাতদিন স্কুলে পরে গিয়েছিলাম ঘড়িটা। ক্লাসের মোটামুটি সবাইকে দেখিয়ে উত্তেজনাটা একটু কমেছিলো, তারপর শুধু পরীক্ষাতেই হাতে বেঁধে যেতাম। পরীক্ষার প্রথম দিন বোধহয় মিনিট পনেরো বেশি সময় লেগেছিল ঘড়িটাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে।
এরপর বেশ কয়েকটা বছর কেটেছে। উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছি, দিদা আমাদের ছেড়ে ওনার পূর্বপুরুষদের কাছে গিয়েছেন, আমি অপ্রত্যাশিতভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শুরু করেছি, কিন্তু ঘড়িটাকে ছাড়তে পারিনি। এই ক'বছরে বার দুয়েক ব্যাণ্ড পাল্টাতে হয়েছে, তাছাড়া সে ঘড়ি দিব্যি সুস্থ থেকে আমায় সময় দিয়েছে।
 স্কুলের পরীক্ষা-যুদ্ধে আমার স্থায়ী কিছু অস্ত্র ছিল-----একটা রবার ব্যাণ্ড জড়ানো ভাঙ্গা সবুজ রেনল্ডস জেটার পেন, একটা হাল্কা সবুজ (রংটা একমাত্র আমিই বুঝতে পারতাম) রুমাল, যেটায় জেটার-এর ধেবড়ে যাওয়া অক্ষমতার বহু চিহ্ন মুছে রাখা থাকত, আর ক্লাস নাইন থেকে এই ঘড়িটা। কলেজে আসা, হোস্টেল গোছানো, এসবের মাঝে কবে যেন পেনটা আর রুমালটা হারিয়ে ফেলেছি। ঘড়ির সাথে সম্পর্কটা আর ভাঙতে পারিনি।
ঘড়িটা হাতে পরলে মনে হত দিদা যা যা দেখে যেতে পারেননি, সেসব দেখুক এই ঘড়ি। আমার পরীক্ষায় পাশ, চাকরি, প্রথম প্রেম, অনুরাগ, অভিমান, সবকিছুরই সাক্ষী রুপোলি ডায়াল আর সোনালি কাঁটার ঘড়িটা।
বয়স বাড়লো, সময় এল ছোট্টবেলার অগোছালো ঘর ছেড়ে মনের মানুষের ঘর গোছাতে যাওয়ার, সেই উপলক্ষ্যে সাথে নিলাম টাইটান রাগা-র  এক সোনালি সুন্দরী তন্বীকে। বড় হওয়ার অনুভূতি জানা রুপোলি ডায়াল অবশ্য আমার সাথেই নতুন সংসারে গেল। আমার ধারণা ছিল ওটা সঙ্গে না থাকলে আমি ভালো থাকবো না। অষ্টমঙ্গলায় বাড়ি এসে মনে হল ঘড়িটার একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। অনেকগুলো বছর আমার সাথে থেকেছে, আমার নানা অত্যাচার সয়েছে, এবার আমার পরীক্ষা দেওয়ার পালা। দেখি বড় হয়েছি কিনা। তুলে রাখলাম যত্ন ক'রে।
বছর খানেক কেটেছে তারপর। একদিন মনটা খুব অগোছালো হয়ে রয়েছে, টাইম মেশিনে বছর পনেরো পিছিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, মনে পড়লো ঘড়িটার কথা।  খুঁজতে লাগলাম। মনে পড়ছে না কিছুতেই কোথায় রেখেছি। ঘণ্টাখানেক হয়ে গেছে ওলোটপালোট করছি আমার আলমারি, বইএর তাক, সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সমস্ত জায়গা। এক-একটা সেকেণ্ড মনে হচ্ছে অনন্তকাল। শেষ অবধি ঘড়িটা পাওয়া গেল বিয়ের গয়নার বাক্স থেকে।
এতক্ষণের গলার ব্যথাটা এখন চোখের জল হয়ে অঝোরধারে বেরিয়ে এল। কেন কাঁদছি নিজেই বুঝছি না, কান্না থামাতেও পারছিনা, বয়সটা যেন সত্যিই পিছিয়ে গেছে বছর পনেরো আগে। এটা কী অনেকদিন পর ছোটবেলার সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার আনন্দ? নাকি ছোটবেলাটাই হারিয়ে ফেলেছি, সেই কষ্ট? জানিনা। তবে, এই প্রায় মাঝতিরিশেও যে ষোলোর মতোই চোখ জলে ভেসে যায় না জানা কারণে, ঘড়িটা খুঁজে না পেলে জানতেই পারতাম না।।

Thursday, 2 May 2013

Mission mobile

গতবছরের মাঝামাঝি একদিন। সকালে রোজকার মতো চুঁচুড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছি। ওঠার আগে মহুয়া, অমৃতা, মৌসুমীদের মিসড কল দিয়ে ট্রেনের খবর জানিয়েছি। চন্দননগরে বাকিরা ট্রেনে উঠল, অমৃতার দেখা নেই। অথচ আমার সাথে ফোনে কথা হয়েছে, ও আমাদের সাথে কাটোয়া লোকাল ধরবে বলেই অটোয় আসছিলো। দিব্যি সময় হাতে নিয়ে বেরিয়েছে, ট্রেন না পাওয়ার কোনো কারণ-ই নেই। তাহলে? "ফোন কর" বলতে বলতে মৌসুমী ডায়াল করল। Not reachable. মিনিটখানেক বাদে আবার। এবার রিং হচ্ছে। কিন্তু দুবার রিং হতেই ফোন কেটে দিলো। আছে কোথায় মেয়েটা? এবার আমি রিং করলাম। একবার ফোন কাটার পর রিসিভ হলো, কিন্তু ওপাশে তো অমৃতা নেই, এক পুরুষকন্ঠ! আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম "আপনি কে? ফোন আপনি পেলেন কোথায়?" ফোন চুরি হয়েছে, এই ভয়-ই পাচ্ছিলাম সবাই, তা-বলে এত সাহসী চোর? চোরাই ফোনে আসা কল রিসিভ করছে!
যদিও ফোনে লোকটার কথা শুনে সত্যি চোর কিনা বোঝা যচ্ছিলোনা, সে বলছিল ফোনটা অটোয় কুড়িয়ে পেয়েছে। একবার ভাবলাম জিজ্ঞেস করি কুড়িয়ে পেয়ে ফোন রিসিভ না করে কেটে দিচ্ছিল কেন,  আমাদের ফোনটা ফেরত
পেতে হবে, এই ভেবেই ও-কথা আর তুললাম না।
গলাটা একটু নরম করে বললাম "আপনি কোথায় আছেন এখন? যেখানে আছেন প্লিজ সেখানেই দাড়ান, আমার ভাইকে পাঠাচ্ছি এক্ষুণি"। উত্তর এল "পাদ্রীপাড়ার কাছে Raymond দোকানের কাছে একটা ফেলাট উঠছে, ওইখেনেই আছি। ভাইকে তাড়াতাড়ি আসতে বলুন"।
আমি লোকটার নিজের ফোন নম্বর চেয়ে নিলাম। ক্রসচেক করার জন্য মহুয়া নম্বরটায় ডায়াল করে ব্যস্ত হয়ে আমার হাতে দিলো ওর ফোন, ঠিক-ই তো, আমিই একমাত্র লোকটার গলা চিনি। দেখলাম আমাদের ভয় অমূলক, লোকটা, মানে, গুরুপদ মন্ডল, ফোন ধরল। ইতিমধ্যে রেশমি অমৃতার বাড়ির ফোনে কল করেছে। কি ভাগ্যিস নম্বরটা সেভড ছিল! ওর ভাইকে সব বোঝানো হলো, এর মাঝে অমৃতা বাড়ি ফিরেছে। ওরা দুজন তক্ষুণি বেরিয়ে পড়ল গুরুপদ মন্ডল এবং ফোনের উদ্দেশ্যে।
আমরা ততক্ষণে নিজেদের থ্রিলারের ক্লাইম্যাক্সে নিয়ে গিয়েছি। ট্রেনের ওই অঞ্চলের প্রায় সবার মুখেই ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা ফুটে উঠছে। ব্রততীর হঠাৎ মনে পড়ল ওর বর এখন জ্যোতির মোড়ের কাছে আছে। "ওকেও ফোন করে লোকটার কাছে যেতে বলি, বল? ও তো তাড়াতাড়ি পৌঁছবে" খবর পৌঁছলো যথাস্থানে।
মিনিট পাঁচেক রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। তারপর-ই ব্রততীর ফোনে খবর এলো, রাজকন্যে উদ্ধার হয়েছেন! গুরুপদ মন্ডল নাকি সাতসকালে এহেন কান্ডে অত্যন্ত বিরক্ত, শ্যামনগর যাওয়ার কথা ওনার, অনেক দেরি হয়ে গেল।
আরও কিছুক্ষণ পর ফোন পৌঁছলো তার নিজের বাড়ি। শুনলাম অমৃতা নাকি ফোন হারিয়ে বাড়ি ফেরার সময় অটোতেই একটু কেঁদে নিয়েছিল!
আমাদের 'মোবাইল উদ্ধার অভিযান'-এর ঘোর কাটিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি ট্রেন কারশেড ঢুকছে। ভাবা  যায়! অন্যদিন এই রাস্তাটা আসতে আমরা কতবার ঘড়ি দেখি, আর আজ! সকালটা কাটলো টানটান উত্তেজনায়।
এমন ঘটনা মাঝেমাঝে ঘটলে তবু বৈচিত্র্য আসে জীবনে! অবশ্য এই বৈচিত্র্যপূর্ণ 'অভিযান' মজার স্মৃতি  হয়ে রয়েছে গুরুপদ মন্ডলের সৌজন্যে। লোকটাকে আমরা প্রথমে চোর-ই ভেবেছিলাম, জানিনা সে কি উদ্দেশ্যে ফোনটা কুড়িয়ে নিয়েছিল, তবে শেষপর্জন্ত ফোন ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের পরিশ্রম সার্থক করেছিলো!
















Wednesday, 1 May 2013

রোজনামচা

হালকা হেসে দু এক টুকরো কথা
অজান্তেই মেলাই হাতঘড়ি,
এই আমাদের দিনের হলো শুরু
এই আমাদের দিনের হাতেখড়ি।
কেউ ফিরেছে আগের সন্ধ্যেবেলা
কেউ ফিরেছে একলা নিঝুম রাতে,
আলতো ঘুমের স্পর্শ চোখে নিয়ে
আমরা আবার নিয়মমাফিক পথে।
ক'জন এলো মিনিট দশেক আগে
চেনামুখ আসছে কিছু আরো,
অমুক দিদির আসার সময় হলো
ঘড়ির কঁাটাও ছুঁলো আটটা বারো।
"যে ছেলেটা ট্রেনের খবর বলে
তার কি বাড়ি অনেক দূর কোথাও?
নইলে কেন ঘুমজড়ানো স্বর?"
আলোচনা হচ্ছে এসব কথাও।
এরই মাঝে স্টেশন ব্যস্ত করে
ঢুকলো আটটা ষোলোর গ্যালপ লোকাল,
ওড়না-আঁচল-খোঁপা সামলে নিয়ে
শুরু করলাম আরো একটা সকাল।


Monday, 22 April 2013

মেঘজড়ান বিকেলবেলায় যেদিন ঝড় এলো
ইচ্ছে রা সব বাঁধন ছিঁড়ে উড়ল এলোমেলো

একটুকরো ইচ্ছে গেলো  পদ্মদিঘির ঘাট
সেইখানেতে খুকুর খেলার আসর জমজমাট

হঠাৎ খুকু দুচোখ তুলে দেখলো ইচ্ছে কে
চিনতে পেরে আদর করে খেলতে নিলো ডেকে

খুকুর খেলার নিয়মগুলো আজকে লাগছে ভারি নতুন
ইচ্ছে বসে আপনমনে জলের ছবি আঁকে

কাঁচের পুতুল মাটির পুতুল সবই আছে আগের মতন
ইচ্ছে পুতুল হারিয়ে গেছে সময় পথের বাঁকে.