Showing posts with label nostalgic story. Show all posts
Showing posts with label nostalgic story. Show all posts

Sunday, 19 May 2013

ছুটি-ঘড়ি-আর সব

আমার দিদার একটা রিস্টওয়াচ ছিলো। দিদা আর ছোড়দিদা দুজনের একটাই ঘড়ি। আমি যখন ক্লাস এইট-এ, তখন বোধহয় মামা ওনাদের কিনে দিয়েছিলেন ঘড়িটা। মামা বলেছিলেন দুজনকে দুটো কিনে দেবেন, কিন্তু দিদারা রাজি হননি। টাইটান-এর ঘড়ি। আমরা কেউই ঘড়িটা ওনাদের খুব বেশি পরতে দেখিনি। আমার তো মনে পড়েনা।
অথচ একদম যে বাড়ি থেকে বেরতেন না, তাও নয়, মাসে একবার অন্তত বেরতেই হত পেনশন আনতে, তখন পরতেন সরু পাড়ের সাদা ছাপা অথবা তাঁতের শাড়ী, প্রথম শর্ত শাড়ীটা নরম হতে হবে, এতটুকু বেশি মাড়ওয়ালা খড়মড়ে শাড়ী হলে চলবেনা। সঙ্গে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ, যেটা ওনারা কখনোই ঠিকমতো কাঁধে নিতেননা, হাতেই থাকতো।
আমরা যখন স্কুলের লম্বা ছুটিতে মামারবাড়ি যেতাম, আমাদের সেবাড়ির প্রতি আকর্ষণের অন্যতম কারণ ছিল দিদার এই পেনশন তুলতে যাওয়া। সেদিন সকালে দিদা স্নান করে তৈরি হয়ে বেরোতেন। উনি বেরনোর সময় যে হাল্কা ওডিকোলনের গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে থাকত, সেটাও মামারবাড়িকে ভালোলাগার আরেকটা কারণ ছিলো। মায়েদের ব্যবহারের সেণ্ট-এ কেন যে সেই গন্ধটা পেতাম না ছোটবেলায় বুঝতাম না, এটাও বুঝতাম না, মা, মাসিমণিরা কেন ওডিকোলন ব্যবহার করতেন না।
দিদা বাইরে বেরনোর পরে উন্মুখ হয়ে থাকতাম কখন উনি ফিরবেন। কারণ, ফেরার পরেই ব্যাগ থেকে একে-একে বেরোতো ঠোঙাভর্তি সাদা চক, চিনি বসানো নরম রঙ্গিন জেলি লজেন্স, কখনো বাদাম-তক্তি।
যখন ঘড়িটা কেনা হয়েছে ততদিনে আমার কাছে মামারবাড়ির আকর্ষণের ক্ষেত্র বদলেছে, আমি খুঁজে পেয়েছি সাত টাকা দামের সেলাম প্রফেসর শঙ্কু, মামার পৈতেয় পাওয়া শার্লক হোমস অমনিবাস, প্রায় তিরিশ বছর আগের কেনা রবীন্দ্ররচনাবলী আর পুরনো বইয়ের গন্ধ। তা-ও দিদার পেনশন আনতে বেরনোর সাজটি আমি মন দিয়েই লক্ষ্য করতাম, ঘড়িটা কখনো হাতে দেখিনি। ছোড়দিদা, মানে দিদার সাতবছরের ছোট বোন, তিনিও সেটা কখনো হাতে পরেননি। ঘড়িটা বসার ঘরের শোকেসের উপর সুন্দর কেসের মধ্যে প্যাক করে রাখা থাকতো। কোনও আত্মীয় বন্ধু বাড়িতে এলে ওনারা কিন্তু কখনো জানাতে ভুলতেন না যে ছেলে ওনাদের ঘড়ি কিনে দিয়েছে!
মামা ঘড়িটা দেখলেই রেগে যেতেন। তিনি শখ করে কিনে এনেছিলেন মা-মাসি ঘড়ি পরবে বলে, সেটাকে প্যাকেটমোড়া হয়ে থাকতে দেখলে রাগ তো হবেই।
বছরখানেক কেটেছে। মামার বিয়ের কিছুদিন পরে, বোধহয় ক্লাস নাইনের পুজোর ছুটি, ঠিক মনে নেই। একদিন দিদাদের মনে হলো আমার সামনে মাধ্যমিক, সময় দেখে পড়াশুনা করা এবং পরীক্ষায় ঘড়ি পরে যাওয়া অতি আবশ্যক। সন্ধ্যেবেলা মামা বাড়ি ফিরলে দিদা বললেন আমরা আর ঘড়ি কোথায় পরে যাই? এখানে ওটা পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হবে, ওটা আমরা তুতুকে দিচ্ছি। ওর এখন সামনে পরীক্ষা, ঘড়ি খুব দরকার"। অগত্যা আমায় নিতেই হলো। এখন বলছি বটে নিতেই হলো, তখন মনে হয়েছিল একলাফে আমি পনেরো থেকে আঠেরোর কোঠায় পৌঁছে গিয়েছি। এর আগে বাবাকে একবার বলেছিলাম ঘড়ি না থাকার অসুবিধার কথা, বাবা-মা চটজলদি সমাধানরূপে মায়ের বিয়ের ঘড়ি এগিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা হাতে গলিয়ে দেখেওছিলাম, জিনিসটা ঘড়ি না চুড়ি কি ভাবলে ভাল লাগবে বুঝতে পারিনি বলে আর পরা হয়নি। এখন ঘড়িটা হাতে পেয়ে কি আর করবো, খুবই কুন্ঠিত মুখ করে হাতে নিলাম।  সেবার ছুটির পর টানা সাতদিন স্কুলে পরে গিয়েছিলাম ঘড়িটা। ক্লাসের মোটামুটি সবাইকে দেখিয়ে উত্তেজনাটা একটু কমেছিলো, তারপর শুধু পরীক্ষাতেই হাতে বেঁধে যেতাম। পরীক্ষার প্রথম দিন বোধহয় মিনিট পনেরো বেশি সময় লেগেছিল ঘড়িটাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে।
এরপর বেশ কয়েকটা বছর কেটেছে। উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছি, দিদা আমাদের ছেড়ে ওনার পূর্বপুরুষদের কাছে গিয়েছেন, আমি অপ্রত্যাশিতভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে শুরু করেছি, কিন্তু ঘড়িটাকে ছাড়তে পারিনি। এই ক'বছরে বার দুয়েক ব্যাণ্ড পাল্টাতে হয়েছে, তাছাড়া সে ঘড়ি দিব্যি সুস্থ থেকে আমায় সময় দিয়েছে।
 স্কুলের পরীক্ষা-যুদ্ধে আমার স্থায়ী কিছু অস্ত্র ছিল-----একটা রবার ব্যাণ্ড জড়ানো ভাঙ্গা সবুজ রেনল্ডস জেটার পেন, একটা হাল্কা সবুজ (রংটা একমাত্র আমিই বুঝতে পারতাম) রুমাল, যেটায় জেটার-এর ধেবড়ে যাওয়া অক্ষমতার বহু চিহ্ন মুছে রাখা থাকত, আর ক্লাস নাইন থেকে এই ঘড়িটা। কলেজে আসা, হোস্টেল গোছানো, এসবের মাঝে কবে যেন পেনটা আর রুমালটা হারিয়ে ফেলেছি। ঘড়ির সাথে সম্পর্কটা আর ভাঙতে পারিনি।
ঘড়িটা হাতে পরলে মনে হত দিদা যা যা দেখে যেতে পারেননি, সেসব দেখুক এই ঘড়ি। আমার পরীক্ষায় পাশ, চাকরি, প্রথম প্রেম, অনুরাগ, অভিমান, সবকিছুরই সাক্ষী রুপোলি ডায়াল আর সোনালি কাঁটার ঘড়িটা।
বয়স বাড়লো, সময় এল ছোট্টবেলার অগোছালো ঘর ছেড়ে মনের মানুষের ঘর গোছাতে যাওয়ার, সেই উপলক্ষ্যে সাথে নিলাম টাইটান রাগা-র  এক সোনালি সুন্দরী তন্বীকে। বড় হওয়ার অনুভূতি জানা রুপোলি ডায়াল অবশ্য আমার সাথেই নতুন সংসারে গেল। আমার ধারণা ছিল ওটা সঙ্গে না থাকলে আমি ভালো থাকবো না। অষ্টমঙ্গলায় বাড়ি এসে মনে হল ঘড়িটার একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। অনেকগুলো বছর আমার সাথে থেকেছে, আমার নানা অত্যাচার সয়েছে, এবার আমার পরীক্ষা দেওয়ার পালা। দেখি বড় হয়েছি কিনা। তুলে রাখলাম যত্ন ক'রে।
বছর খানেক কেটেছে তারপর। একদিন মনটা খুব অগোছালো হয়ে রয়েছে, টাইম মেশিনে বছর পনেরো পিছিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, মনে পড়লো ঘড়িটার কথা।  খুঁজতে লাগলাম। মনে পড়ছে না কিছুতেই কোথায় রেখেছি। ঘণ্টাখানেক হয়ে গেছে ওলোটপালোট করছি আমার আলমারি, বইএর তাক, সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সমস্ত জায়গা। এক-একটা সেকেণ্ড মনে হচ্ছে অনন্তকাল। শেষ অবধি ঘড়িটা পাওয়া গেল বিয়ের গয়নার বাক্স থেকে।
এতক্ষণের গলার ব্যথাটা এখন চোখের জল হয়ে অঝোরধারে বেরিয়ে এল। কেন কাঁদছি নিজেই বুঝছি না, কান্না থামাতেও পারছিনা, বয়সটা যেন সত্যিই পিছিয়ে গেছে বছর পনেরো আগে। এটা কী অনেকদিন পর ছোটবেলার সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার আনন্দ? নাকি ছোটবেলাটাই হারিয়ে ফেলেছি, সেই কষ্ট? জানিনা। তবে, এই প্রায় মাঝতিরিশেও যে ষোলোর মতোই চোখ জলে ভেসে যায় না জানা কারণে, ঘড়িটা খুঁজে না পেলে জানতেই পারতাম না।।