Tuesday, 18 July 2017

ঋণস্বীকার

একজন মানুষ, মনে করো সে শহরের একজন নামকরা ব্যবসায়ী। কিসের ব্যবসা? ধরে নাও খেলনার ব্যবসা। সেই ব্যবসায়ী, যার নাম অমল (চন্দ্রকান্ত হলেও ক্ষতি ছিলোনা, নামটা এই গল্পে জরুরি বিষয় নয়) সেই অমলবাবু এক নিভে আসা বিকেলে তাঁর বাড়ির লাগোয়া ঝাঁ-চকচকে আউটলেটটায় এসে বসলেন। দোকানটা যদিও বরাবর এমন ঝাঁ-চকচকে ছিলো না, লাগোয়া তিনমহলা বাড়িটাও ভদ্রলোকের কিছু পৈতৃক সম্পত্তি নয়। একপেট ক্ষিদে আর বাপের রেখে যাওয়া ক’টা ময়লা নোট সম্বল করে অমলবাবু বহু বছর আগের এক সকালে এই বাড়ির তখনকার মালিকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, গেটের পাশে মালির একচিলতে ঘরখানা ভাড়া নিয়ে একটা ছোট্ট দোকান খুলবেন ব’লে। ওনার বোন মাটি, কাগজ, পুরনো কাপড় দিয়ে ভারি সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাত। সেইসব পুতুল শ’খানেক জড়ো ক’রে দোকানটার পত্তন করেছিলেন ভদ্রলোক।

তারপরে কালে কালে কত কী হল। মালির ঘরের দোকান মা-লক্ষ্মীর দয়ায় ফুলে-ফেঁপে উঠলো, ঐ তিনমহলা বাড়ির চাবি হাতবদল হয়ে এল দোকানদারের হাতে, সেদিনের ‘হাতের পুতুল’ দিনে দিনে ‘টয়ল্যাণ্ড’ হয়ে তিনটে শহরে ডালপালা মেলল, অমলবাবু কিন্তু এই মালির ঘরের দোকানটাকে ভুলে যাননি। কাঁচ দিয়ে মুড়ে দোকানটাকে সুন্দর ক’রে সাজিয়েছেন। ব্যবসার গোড়াপত্তন এখানে, ঋণও তো থেকে যায় প্রথম দোকানের প্রতি। মা-লক্ষ্মী যে এই দোকানেই প্রথমবার পা রেখেছিলেন। তাই কাঁচে মোড়া এই ঝকঝকে দোকানটা ব্যবসায়ীর একপ্রকার ঋণস্বীকারই বলতে পারো।

টয়ল্যাণ্ড আজকে খেলনাপাতির দুনিয়ায় বেশ বড় একটা নাম। চাবি ঘোরানো বিদেশী খেলনাও ইনি বেচেন বটে, তবে ঐ মাটি-কাগজ-কাপড়ে বানানো ‘হাতের পুতুল’-এর জুড়ি মেলা ভার। আজকাল তো বিদেশেও যাচ্ছে ওসব পুতুল। এখন অবশ্য আর বোন পুতুল তৈরি করেন না, দু-দু’টো কারখানায় প্রায় শ’খানেক লোকের হাতে ওগুলো তৈরি হয় এখন। বছর সাতেক আগে একটা অ্যাকসিডেন্টে বোন-ভগ্নীপতি দুজনেই গত হয়েছেন। ভাগ্নীটাকে কাছে এনে রেখেছেন অমলবাবু। গিন্নির সঙ্গে এই নিয়ে মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ মন কষাকষি চলে, বিশেষ করে ভাগ্নীর জ্বরজারি হ’লে, তবে কিনা বোনের হাতে তৈরি পুতুলকে মূলধন করেই তো টয়ল্যাণ্ড-এর চলা শুরু, জীবনে মা-লক্ষ্মী আসার নেপথ্যে বোনের শ্রমকে অস্বীকার করেন কি ক’রে? তাই বোনের ঋণের শোধ করতেই মা-বাপ মরা ভাগ্নীটার দায় ঘাড় পেতে নিতে হয়েছে। পাত্র দেখছেন, এই দোকানটার জন্য একজন বলিয়ে-কইয়ে অথচ পকেট ফাঁকা, এমন একজন ম্যানেজারও খুঁজছেন, চলনসই কাউকে পেয়ে গেলে রাজত্ব,রাজকন্যা দুই-ই তার কাঁধে চাপিয়ে ঋণমুক্ত হবেন।

তিন-মহলা বাড়িটার ঠিক পেছনেই একটা বস্তি আছে, যেখানে জীবনের শুরুটা কাটিয়েছিলেন আমাদের অমলবাবু। তখন অবশ্য কেউ তাঁকে কেউ আপনি-আজ্ঞে করত না। সে যাই হোক, টাকার মুখ দেখে এনার মাথা ঘুরে যায়নি কিন্তু, ছোটবেলার আশ্রয় সেই বস্তির ঋণ তিনি শুধে চলেছেন সাধ্যমত। বস্তির বেশ কিছু ছেলে তাঁর কারখানায় কাজ করে, দুটো ছেলেকে এই দোকানেও কাজ দিয়েছেন। তবে কিনা ছোটলোকের মন তো, হতেই পারে কোনওদিন ক’টা দামী খেলনা ব্যাগে পুরে পাচার করল লোভ সামলাতে না পেরে! তাই আগেভাগেই সাবধান হয়েছেন অমলবাবু। গেটকীপার তো আছেই, তাছাড়া গেটের কাছে ঘুরঘুর করে বুলডগ জেম্‌স। বাঘেরও বাপ। বেচাল দেখলেই টুঁটি ছিঁড়ে নেবে।

সন্ধ্যের ভিড়টা একটু হাল্কা হয়েছে, কাউণ্টারে বসে টাকা গুনছিলেন ভদ্রলোক। টাকা চটকাতে চটকাতে বেশ একটা তরঙ্গ বাজছিল মনের গভীরে, ঘোর কাটল বাচ্চাদের গলার আওয়াজে। এতগুলো গেঁড়িগুগলি কোত্থেকে এল? তাঁর দোকানে তো ফিনফিনে মায়েদের হাতে ধরা ফটফট বুলি-ফোটা ফুটফুটে বাচ্চারাই আসে, তারা তো এমন খলবল করেনা! মুখ তুলে দেখলেন দোকানে কাজ করে মানিক, তারই বউ এসেছে তিনটে বাচ্চার হাত ধ’রে। শোকেসে খেলনার বাহার দেখে মা-ছা সবারই চোখ ট্যারা হয়ে গেছে। এটা চাই, ওটা চাই ক’রে বায়না জুড়েছে সবক’টা। একটু সাফসুতরো করে আনতে পারত তো ছেলেগুলোকে! নাক দিয়ে সর্দি গড়াচ্ছে, একটার তো পা ভর্তি কাদা। নর্দমায় পড়ে গেছিল নাকি? ইসস্‌, দোকানটা ভাল করে ধোওয়াতে হবে।

বউটাকে বাইরে দাঁড়াতে বলবেন বলে উঠতে যাচ্ছিলেন, চোখ পড়ল ছোট ছেলেটার দিকে। সে তখন একহাতে নিজের প্যাণ্টটা কোমরের কাছে চেপে ধরে পা উঁচু করে তাক থেকে বল নামানোর চেষ্টা করছে। হাত ছাড়লেই প্যাণ্ট হড়কে নীচে নেমে যাবে। অমলবাবুর মনে পড়ে গেল আরেকটা ছেলের কথা। তার বাবা কাপড়ের দোকানে কাজ করত। একবার বিশ্বকর্মা পুজোয় দোকানে মাংসভাত খাওয়ার নেমন্তন্নে গিয়েছিলো ছেলেটা, বাবার সঙ্গে। অনেকদিন পরে মাংসভাত পেয়ে এইসান খেয়েছিল সে, খাওয়ার পর উঠে দাঁড়াতেই পুরনো রদ্দিমার্কা হাফপ্যাণ্টের বোতাম ছিঁড়ে সে প্যাণ্ট সুড়ুৎ ক’রে পড়ল পায়ের নীচে। কি লজ্জা কি লজ্জা! ঘরভর্তি লোকের হো-হো হাসি মনে পড়লে এখনও কান লাল হয়ে ওঠে টয়ল্যাণ্ড-এর মালিক অমলবাবুর। বাবা ভাগ্যিস শর্মাজ্যাঠার কাছে কেঁদেকেটে একটা নতুন প্যাণ্ট চেয়ে পরিয়েছিল। প্যাণ্টটার দাম শুধতে বাবাকে দু’মাস দুপুরে জল খেয়ে থাকতে হয়েছিল বটে, তবে সেদিন অমন লজ্জার হাত থেকে বারো বছরের ছেলেটা বেঁচে গিয়েছিলো তো!

শুধু তাই নয়, বাবার কাকুতি-মিনতি, শর্মাজ্যাঠার খ্যাক-খ্যাক হাসি, দিনের পর দিন বাবার সারাদিন না খেয়ে থাকা, সব মিলিয়ে ছেলেটার মনে একটা জেদ জন্মেছিল আস্তে আস্তে, মালিক হওয়ার জেদ। মালিক হলে স-অ-ব কিছু হাতের মুঠোয় চলে আসে, বুঝেছিল ছেলেটা। সেই জেদ থেকেই তো বেড়ে উঠেছে টয়ল্যাণ্ড, দোকানটার পত্তনে বাবার ঋণও তো তবে অস্বীকার করার নয়, ভাবেন অমলবাবু।

বাবার ঋণ শোধ করতেই কিনা বোঝা যায় না, তবে মাঝবয়সী অমলবাবু কাউণ্টার ছেড়ে এগিয়ে গেলেন একহাতে প্যাণ্ট চেপে ধরা ছেলেটার বাপের দিকে, না, না, ওদের বাইরে যেতে বলবেন বলে নয়, ক’টা টাকা বাপের হাতে ধরাবেন ব’লে, ফুটপাতের দোকানগুলোয় তো সস্তার প্যাণ্ট পাওয়া যায় এখনও, এই ক’টা টাকাই যথেষ্ট।।

(অক্ষর-এ প্রকাশিত)

Tuesday, 27 June 2017

কুটুনের শিল্পচর্চা

আজকের পর্বটা বেশ লম্বা-চওড়া হবে মনে হচ্ছে। কুটুনের নানাবিধ শিল্পচর্চার বিবরণী থাকছে কিনা, বেশ ওজনদার রচনা হবে সম্ভবত। গৌরচন্দ্রিকা না করে শুরু করা যাক তবে।

প্রথমেই আসি কুটুনের সঙ্গীতচর্চার কথায়। মেয়ের গানের গলাটি প্রথম দিন থেকেই ভারি সরেস। তার জীবনের প্রথম দু’তিন রাত তো নার্সিং-হোমেই কেটেছিল, রোজ সকালে রাতের আয়ামাসিরা এসে তার মা-কে গপ্প শোনাত, সে নাকি খিদে পেলেই বাজখাঁই গলায় চেঁচায়। মা মোটেই বিশ্বাস করেননি সেকথা। কাঁথা-অয়েলক্লথে মোড়া ঐ একফোঁটা পুঁচকে, সে অমন গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার জুড়বে! বললেই হল! এসব অপপ্রচার। যাই হোক, ক’দিন পরে মা হাসিমুখে ছা নিয়ে ঘরে ফিরলেন। প্রথম কিছুদিন পুঁচকে মেয়ে সারা দিন সারা রাত ঘুমোত। মা মনে মনে আয়ামাসিদের ওপর বিরক্তই হচ্ছিলেন, “দ্যাখো দেখি, কেমন মিথ্যে অপবাদ দিয়েছে আমার শান্তশিষ্ট বাছাটির নামে!”

দিনপনেরো পর থেকে কুটুনের রুটিনে সামান্য বদল ঘটল। সারাদিন সে ক্লান্তির চোটে চোখের পাতা খুলতে পারত না, ঠিক রাত সাড়ে ন’টা-দশটার পর ক্লান্তি দূর হত। তারপর প্রায় সারারাত ধরে চলত তার সুরসাধনা। বাড়ির লোকে অবশ্য অতটা সঙ্গীতবোদ্ধা নন, তাই এই সাধনার মাহাত্ম্য তেমন করে বুঝে উঠতেন না। তাঁরা  কখনও কোলে দুলিয়ে, কখনও কাঁধে নাচিয়ে, যেভাবে হোক মেয়েকে ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। আর তাইতে কুটুন আরো বিরক্ত হয়ে দাপুটে গলায় প্রতিবাদ করত। সে এক সময় গেছে, বুঝলে? সারা রাত মেয়ের গলা সাধার দাপটে বাড়ির লোক তটস্থ হয়ে থাকেন, আর দিনভর চোখেমুখে জল ছিটিয়ে ঝিমুনি কাটিয়ে সংসারের কাজ সারেন।

মাসচারেকের পর থেকে অবশ্য রাতের জলসার সময়টা কমে এসেছিল। মা হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে নেচেকুঁদে দু’ঘণ্টার মধ্যেই মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়তেন। আহা! ঘুম যে তখন মায়ের কাছে কতটা কাঙ্খিত ছিল সে বলে বোঝানো যায় না।

এই সময় থেকেই মা, এবং বাবা উপলব্ধি করলেন, কুটুন গান শুনতে ভালবাসে। মা আবার ইতিমধ্যে নানা পত্রপত্রিকায় পড়ে ফেলেছেন “শিশুমস্তিষ্কে সুরের উপকারিতা” ইত্যাদি বিষয়ে, ব্যস, মেয়েকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, তেল মাখানো, নাওয়ানো সবেতেই তিনি সুরের ছোঁয়া বোলাতে শুরু করলেন। তাঁর গান গাওয়ার ইতিহাস যে খুব জনমোহিনী, তা নয়, কলেজে পড়াকালীন এক বান্ধবীর বাড়িতে ঘরোয়া আড্ডায় তাঁরা তিন বান্ধবী এমন দাপুটে ভঙ্গীতে “জীবনে কি পাবো না” গেয়ে উঠেছিলেন, যে, বাকি বন্ধুরা নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা অবশ্য ভ্রূক্ষেপ করেননি, গানখানি শেষ করে তবেই থেমেছিলেন। এখনও, মেয়ে তাঁর গাওয়া গান পছন্দ করছে কিনা সে ব্যাপারে তিনি বিশেষ খোঁজ রাখেন না। তিনি গেয়ে চলেন নিজের সন্তুষ্টির জন্যই, ছেলেভোলানো গানে কথা কম পড়লে আবার নিজের বোনা কাব্যিও গেঁথে দেন ঐ গানের সুরেই।
যেমন ধরো, মা গাইছেন,

“চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদমতলায় কে?
হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে খুকুমণির বে”।

গানের কথা ফুরিয়েছে, এদিকে মেয়ে তখনও জেগে,ব্যস, মা গেঁথে নিলেন নতুন কথা,

“খুকুমণির বে’তে কে কে এল?
জেব্রা এল আর এল আর্মাডিলো।
আর এল সজারু শিম্পাঞ্জি
জিরাফ এল গায়ে তার সাদা গেঞ্জি”, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এহেন গেঞ্জি-পরিহিত জিরাফের গান শুনেই সঙ্গীতচর্চায় কুটুনের হাতেখড়ি হয়। এরপর কুটুন, আর তার মা, দুজনেরই বয়স এবং সঙ্গীতচর্চা সমান লয়ে এগিয়ে চলে।

বছর দেড়েক আগের কথা। কুটুনের মুখে তখন  দু’একটি বুলি ফুটেছে। নিজের ভাষায় সে তার পছন্দের গানের ফরমায়েস করতে শিখেছে। মায়ের গলায় (সম্ভবত কিঞ্চিৎ এলোমেলো সুরে) গান শোনার পাশাপাশি রেডিও (মায়ের আবার রেডিও শোনার বাতিক আছে, রেডিওর কান মুচড়ে পিঠ চাপড়ে তিনি ধানবাদে বসে মাঝেমধ্যে কলকাতার স্টেশন ধরে ভারি আরাম পান), মোবাইল ফোন, এসবে ধীরে ধীরে তার কান পাকছে, মায়ের সঙ্গে তার ভাব-বিনিময় ভাষা পাচ্ছে ক্রমশ। সে যদি বলে, “হাই-ই”, মা অমনি বুঝে নেন এটি হল “হা-রে-রে-রে” শোনানোর অনুরোধ, কিংবা, মেয়ে যদি বলে, “হুই-ই”, তবে মা ধরে ফেলেন, মেয়ে এখন “ওরে গৃহবাসী” শুনতে চায়। তিনিও দিব্যি রুটি সেঁকতে সেঁকতে কিংবা আলনায় কাপড় গোছাতে গোছাতে একটাই গান দশ-বারোবার গেয়ে চলেন, আর কুটুনও আহ্লাদে মাথা দুলিয়ে জামাকাপড়ের ভাঁজ খুলতে খুলতে ভাঙ্গা গলার গান মন দিয়ে শুনে চলে।

এরকমই একদিন, বাবা সন্ধেবেলায় খাওয়ার টেবিলে তাল ঠুকে কি যেন একটা গুনগুন করছেন, কুটুন আবিষ্কার করল, আরে, বাবাও তো কম বড় গাইয়ে নন! সে তড়িঘড়ি বাবার কাছে গিয়ে নতুন গান শোনানোর আর্জি জানায়,
“বাবা, তি-নু-নুন্‌-নুন্‌”

বাবাও বোঝেন না, মেয়েও এর বেশি কিছু বোঝাতে পারে না। বিচ্ছিরি কমিউনিকেশন গ্যাপ। বাবার কাছে মেয়ের ভাষার শব্দকোষ হলেন মা। প্রথমে মা-ও কিচ্ছু বোঝেন না। অনেক ভেবে মনে পড়ে আগের সন্ধেয় “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে” কুটুনের মনে প্রথমবার ঢুকেছিল। সে গানের কলি “কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ” যে কোন্‌ জাদুতে কুটুনের ভাষায় “তি-নু-নুন্‌-নুন্‌” হয়ে গেছে তা বোঝা স্বয়ং গুরুদেবেরও অসাধ্য।

ঘুম উপলক্ষে গাইতে হবে, এমন কিছু বাঁধাধরা গান আছে। যেমন, “মন মোর মেঘের সঙ্গী”। এটি কুটুনের কথা ফোটার বয়সের আগে থেকেই মা গেয়ে আসছেন। ফলে, কথা ফুটতে শুরু হওয়ার পরেও, রোজ রাতে বালিশে মাথা রেখেই সে “মনো, মনো” বলে মা-কে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। কোনোদিন হয়ত মেয়ে ঘুমোনোর আগেই মায়ের একটু ঝিমন্ত ভাব এসেছে, মেয়ে অমনি উঠে বসে মা-কে থাবড়ে-থুবড়ে বাকি গানটা গাইয়ে তবে ঘুমোতো।

আরেকটা গান ছিল, “ধুম এসো”, অর্থাৎ কিনা, “ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো”। কাঁদো কাঁদো মুখে “ধুম এসো” আওড়ানো মানেই এবার ঘুমের জোগাড় করতে হবে। এখন তো কুটুন একটু বড় হয়েছে, একেকদিন রাতে বালিশে শুয়ে সে নিজেই নিজেকে চাপড়ে “ধুম পালানি মাসিপিসি মোদেল বালি এস” গাইতে থাকে।

কুটুনের ঝাঁপিতে এখন অনেক গান জমে উঠেছে। এত অল্প জায়গায় সেসব বলে শেষ করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ, সলিল চৌধুরী থেকে শুরু করে এ. আর. রহমান হয়ে ভাটিয়ালির আন্তর্জাতিক সংস্করণ, সবেতেই সে সমান উৎসাহী। স্কুলের সৌজন্যে সম্প্রতি কুটুনের গলায় তার নিজের ভাষায় দেশের জাতীয় সঙ্গীতও শোনা যাচ্ছে। আবার কোত্থেকে যেন বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি, তিন ভাষাতেই “পিসা-বুদান”, অর্থাৎ, “We shall overcome” শিখে এসেছে।

এবার আসি কুটুনের ছবি আঁকার গল্পে। দেড় বছর বয়সেই তাকে ব্যস্ত রাখার উদ্দেশ্যে মা এক বাক্স রঙ পেন্সিল আর একখানা সাদা খাতা কিনে তার সামনে রেখে দিয়েছিলেন। সেই থেকে তার আঁকায় হাতেখড়ি। ভাড়াবাড়ির দেওয়াল তো নানা রঙে রঙিন হয়েছেই, বাবার ল্যাপটপ, মায়ের সাধের ফ্রিজ, মায় তার নিজের ভাত খাওয়ার থালাও মাঝেমাঝেই রং পেন্সিলের দাগে সেজেগুজে ওঠে। আর, ছবি আঁকার খাতায় মেয়ের কল্পনাশক্তি মনের আনন্দে ডানা মেলে।

হযবরল-র সেই চন্দ্রবিন্দু বেড়ালকে মনে আছে? যে মাটিতে দাগ কেটে কেটে “এই মনে করো গেছোদাদা, এই মনে করো গেছোবৌদি রান্না করছে” এইসব আঁকাআঁকি করছিল? ঠিক ঐরকমভাবেই কুটুনও তার খাতায় একটা করে দাগ কিংবা গোল্লা আঁকে, আর বলতে থাকে, “এতা বাবা, এতা মা, এতা তুতুন, এতা মাম্মাম, এতা দাদু”, এমন করে চটি, ব্যাগ, স্কুল, চাঁদ, বালিশ, দই-মাখা ভাত, সব এঁকে ফেলে সে। একদিন তো স্বামী বিবেকানন্দেরও একখানা ছবি এঁকেছিল। ছবিটার সঙ্গে বিশেষ একটি সব্জির খুব মিল পাওয়া গিয়েছিল বটে, তবে চোখ, কান আর মুখ নিজের নিজের জায়াগায় ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। কুটুনের আঁকা ছবিতে বাবা চেনা যায় দাড়ি দে’খে, মা চেনা যায় দাঁত বের করা হাসিমুখ দে’খে, আর মাম্মাম (ঠাকুমা) চেনা যায় কপালের টিপ দে’খে। ছবি আঁকার বিদ্যে মাঝেমাঝে তার পুষ্যিপুতুলদেরও শেখানোর চেষ্টা চলে। মা আড়াল থেকে দেখেন, ছুটকি-পুতুলের হাতে পেন্সিল ধরিয়ে কুটুন প্রাণপণে বিদ্যাদানের চেষ্টা করছে, “পাত্তো পাত্তো (পাকড়ো, পাকড়ো), অ্যায়সে”!


নাচের গল্পে বিশেষ কিছু বলার নেই। এদিকে আবার মেলা লেখা হয়ে গেছে, পড়তে বসে লোকের হাঁফ ধরবে, তাই ছোট করেই বলে নিই।

কুটুন যখন সাত-আটমাসের ছানা ছিল, রাতবিরেতে অকারণ কান্না জুড়লে তার মায়ের আর সব জারিজুরি যখন ফেল করত, তখন তিনি নিজের ছোটবেলায় শেখা খানকতক নাচের মুদ্রা জড়ো করে এর ঘাড়ে ওকে চাপিয়ে হাতেকলমে করে দেখিয়ে মেয়ের কান্না থামাতেন। বাবা বাড়িতে থাকলে তিনিও এব্যাপারে নিজের দক্ষতা জাহির করতে ছাড়তেন না। সেই থেকেই বোধহয় কুটুনের ধারণা হয়েছিল, তার মা, বাবা দুজনেই প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী। ব্যস, এখন যখন যেখানে তার নাচ করতে ইচ্ছে করে, অবশ্যই বাবাকে অথবা মা-কে তার সঙ্গে পা মেলাতে হয়। সে স্কুলের ফাংশানই হোক, কিংবা ঘরোয়া জলসাই হোক, কুটুন স্টেজে উঠছে মানে মা অথবা বাবাকেও সঙ্গে থাকতে হবে। বাড়িতে একেকদিন সন্ধেবেলায় নাচ প্র্যাকটিসের শখ জাগে মেয়ের মনে। মা হয়ত সবে রুটি বেলে তাওয়া-তে সেঁকতে শুরু করেছেন, মেয়ের নাচ পেল, অমনি তার সনির্বন্ধ অনুরোধে মা-কে রুটি সেঁকার জালতি হাতেই একপাক নেচে নিতে হল। সেসব রাতে খাওয়ার থালায় দু’তিনটে পোড়া রুটি পাওয়া যায় বটে, তবে মেয়ের শখ তো পূরণ হয়!!

Sunday, 28 May 2017

অন্ধকারের কথা

"মা, বাইরে অন্ধকার", কদিন ধরেই রাত্রে বিছানায় শোবার আগে কচি গলায় একটু আপত্তির সুরে কথাটা শুনতে হচ্ছে। বাইরে অন্ধকারের উপস্থিতি খুব একটা ভাল লাগছে না, সেটা ছোট্ট মানুষের কথায় বোঝা যাচ্ছে। প্রথম দু -একদিন আমল দিইনি, "রাত্রে তো অন্ধকার হবেই" এসব বলে চাপড়ে ঘুম পাড়িয়েছি।

কালকেও একই কথা আবার। ভয়ানক ঘুম পাচ্ছিল। একবার ভাবলাম বাইরের অন্ধকারকেই হাতিয়ার করে হাল্কা ভয় দেখাই, তাহলে ঝিমুনি আসার সময়টাতেই যে গায়ে ঠেলা দিয়ে "মা, ও মা, বাইরে অন্ধকার" বলে ব্যস্ত করা, সেটা থামবে।

তারপরেই মনে হল, ছি ছি, কি করছি, নিজের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে দেব না বলে মিছিমিছি একটা অবান্তর ভয় মেয়েটার মনে ঢুকিয়ে দিতে চাইছি? আলোর না থাকাটাই যে অন্ধকার, আলাদা করে কোনও ভয় জাগানো মানে যে অন্ধকারের নেই, সেটা তো আমরাই বোঝাব, নাকি? বাগানে গাছটার নিচে ঝুপসি মত কি একটা প্রাণী যেন গুঁড়ি মেরে বসে আছে মনে হচ্ছে, ওটা যে আসলে গাছেরই ছায়া, ছায়ার চলাফেরা আসলে আলো -আঁধারের খেলা ছাড়া আর কিছুই নয়, চাঁদের আলো এগোলে কিংবা মেঘের আড়ালে লুকোলে যে গাছের ঝুপসি ছায়াটাও ভোল পাল্টায়, সেসব তো কচি মনটাকে বোঝাতে হবে। নইলে খামোখা ছোট্ট মনটা বিনা কারণে অন্ধকারকে ভিলেন ঠাউরে বসবে। আর এই বয়সে একবার কোনও ভয় মনে বাসা বাঁধলে তাকে তাড়ানো মহা ঝকমারি।

অগত্যা নিজের ঘুমে লাগাম পরিয়ে বোঝাতে  শুরু করলাম, "দ্যাখো বাবু, রাত্তিরে যেমন আমাদের ঘুম পায়, তেমন আলোরও ঘুম পায়। আলো চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লেই অন্ধকার হয়ে যায়।"
সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন এল, "যেমন আমরাও হই?"
থমকালাম। তাই তো! আমরাও কি অন্ধকার হয়ে যাই? চোখ বুজলে চারপাশ অন্ধকার, এ তো খুব সত্যি কথা। এটাকে কি "আমরাও অন্ধকার হয়ে গেলাম" বলা যায়? উত্তর হাতড়াচ্ছি, এমন সময় শুনলাম আলো -আঁধারির তত্ত্বে উৎসাহ হারিয়ে মেয়ে তার ঘুমের আগের গান গাওয়ার রুটিনে ঢুকে পড়েছে। আমিও প্রসঙ্গ পাল্টে গলা মেলাতে লাগলাম৷

মেয়ে তো ঘুমলো একটু পরেই, আমার মনে ঢুকে পড়ল ভাবনার নতুন সুতো। অন্ধকারকে ভয়, এ কি মানুষের রক্তে মিশে থাকা অভ্যেস, যা নিয়েই সে জন্মায়? নাকি পৃথিবীতে যারা কিছুদিন আগে এসেছে, দু 'চারটে বর্ষা -ভূমিকম্প -মহামারি দেখেশুনে ভয় পেতে শিখেছে, অন্ধকারের ভয়টা নতুন মানুষের মনে তারাই গেঁথে দেয়? নাকি যাকে আমরা দেখতে পাই না, তা -ই আমাদের কাছে অজানা? জানি না বলেই তাকে ভয় পাই? তা -ই যদি হবে, তবে যারা নিজের বাড়ির চেনা বাথরুমটাতেও অন্ধকারে যেতে ভয় পায় তাদের কি বলবে? বাড়ির বাথরুমটাকে দিনের বেলায় চিনতাম, আর মাঝরাতে হুট করে সেটা অচেনা হয়ে গেল, এ হয় নাকি?

তারপর দ্যাখো, মানুষের ভাষাতেও অন্ধকারকে কেমন নেতিবাচক করে দেখায়! অন্ধকার আর কালো, এই দুটো কথা যেন যত ময়লা আর খারাপের বোঝা বইছে। কারো মন খারাপ, অমনি তার মনে আঁধার জমল। কারও ছেলে বদসঙ্গে পড়েছে, ব্যস, সে নাকি অন্ধকারে হারিয়ে গেল। যে টাকা সৎপথে আয় হয়নি, সে টাকা অমনি হয়ে গেল কালো টাকা। কেন, অসৎ টাকা ময়লা টাকা হতে পারত না? ময়লা কি শুধুই কালো? তার রং তো হলুদ সবুজ ফিকে বেগুনি হতেই পারে? শুধু কালোর কপালেই ময়লার বদনাম কেন? মনের খারাপ হওয়ার দায় অন্ধকার নিতে যাবে কোন দু:খে? তোমার মনের কোন তারে ব্যথা লেগেছে বলে তোমার মন খারাপ, তাতে অন্ধকারের দোষ কি?

আলো সারাদিনের পরে একটু বিশ্রাম নিতে যায়, তখন পৃথিবীর সব রং মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়ে আসে অন্ধকার, আঁধারের মানে তো এইটুকুই। তাকে কেমন আমরা ভিলেন বানিয়ে ফেলি, নিজেদের মনের পাপচিন্তাগুলোকে অন্ধকারের আড়ালে বাইরে এনে ফেলি, আর দোষ চাপাই কালো আঁধারের ঘাড়ে। রাতের অন্ধকার না থাকলে যে সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে আবার পরেরদিনের সূর্যটার আসা হত না, সেকথা আমরা ভুলেই যাই।

Wednesday, 24 May 2017

কুটুন আর বাবা

কুটুনের বাবার বেশ কিছুদিনের অভিযোগ, মেয়ের দিনযাপনে বাবার অবদানকে একেবারেই প্রচারের আলোয় আনা হচ্ছে না। তাঁকে যতই বোঝানো হোক, বাবা -মেয়ের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে হলে যতখানি সময়ের দরকার ততটা পাওয়া যাচ্ছে না বলেই কাজটা হয়ে উঠছে না, তিনি শোনার মানুষ নন। ব্যাপারটায় চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে টুকরো সময় হাতে নিয়েই বসতে হল, জানিনা বাপু এতটুকু সময়ে দুই প্রতিভাধরের গুণ কতটা গাওয়া যাবে।

সকাল থেকেই শুরু হোক। হপ্তায় তিনদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ে দেখে বাবা পাশে ঘুমোচ্ছে (বাকি দিনগুলোয় নিজেই হাত উল্টে বলে "বাবা অফিসি")। কুটুনের ঘুম ভাঙ্গার পরেও যদি কেউ বালিশে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় সেটা এক ধরনের অপরাধ। সঙ্গে সঙ্গে সে তার নিজের ভাষায় বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। শুধু মুখের কথায় বাবা উঠে পড়েন তা নয়, তিনি হয়ত তখন কুটুনের বালিশটাই টেনে আরেকবার চোখ বোজার চেষ্টায় আছেন, কুটুন অমনি  "তুতুন-বালিশ নিও না, ওথো ওথো" বলে তাঁকে ব্যস্ত করে তোলে। সবশেষে বালিশ ধরে টান মারে কিংবা বাবার চোখের পাতা টেনে খোলার চেষ্টা করে, অগত্যা বাবাকে উঠে বসতেই হয়।

এসব কাণ্ড চলাকালীন মা কিন্তু ভুলেও ঘরে ঢোকেন না। কি দরকার বাপু কাঁধ পেতে ঝামেলা নেওয়ার. বাবা মেয়ে থাকুন নিজেদের নিয়ে, উনি ততক্ষণে হাতের কাজ একটু এগিয়ে রাখেন।

এরপর সকালের কাজকম্ম জলখাবার ইত্যাদি সেরে দিন এগোয়। বাবা বাড়িতে থাকলে মায়ের চেষ্টা থাকে কুটুন-সংক্রান্ত বেশিরভাগ দায়িত্ব বাবার হেফাজতে দেওয়ার। তিনি নিজের মনে রান্না, কাচাকুচি, বিছানা ঝাড়া আর ফাঁকে ফাঁকে খবরের কাগজে চোখ বোলানোর কাজ সারেন। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার কাজটা করতে হচ্ছেনা বলে এসব দিনে মায়ের মন ভারি ফুরফুরে থাকে।

ওদিকে তখন খাওয়ার টেবিলে কিংবা সোফায় বসে বাবা আর মেয়ের জলসা শুরু হয়েছে। "আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে",  "ভেঙ্গেচুরে যায় আমাদের ঘরবাড়ি" হয়ে  "ভুখ লাগি ভুখ লাগি" , গানের তালিকা বিশাল। কখনও টেবিলে তাল ঠোকা, কখনও আবেগ সামলাতে না পেরে নাচ, হামাগুড়ি, ডিগবাজি সবই ঢুকে পড়ে জলসার মেনুতে।

মাঝেমধ্যে চলে জল খাওয়া পর্ব। এই কাজটি মা বিশেষ ভাল পারেন না। মায়ের হাতে জলের গ্লাস দেখলেই কুটুন হয় দৌড়ে পালায়, নয়ত জলের গ্লাসটা নিয়ে জলটা হড়াত করে মেঝেতে ঢেলে গায়ে মাথায় মাখে, কিংবা কুলকুচি করার সময় কেমন দেখতে লাগে সেটা আয়নায় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই বাড়িতে থাকলে এই দায়িত্বটাও বাবাকেই নিতে হয়। তিনি নিজে একটি বড় কাচের গেলাস নিয়ে এবং এরই একখানা ধাতব সংস্করণ মেয়ের হাতে ধরিয়ে দুজন মিলে মাটিতে বসে গেলাসে গেলাসে ঠোকাঠুকি,  "তুই আগে না আমি আগে" এরকম নানা খেলাধুলো দিয়ে জলপান পর্ব পালন করেন। কখনও কখনও ঘুষ হিসেবে ফ্রিজ থেকে এক টুকরো চকলেটও বেরোয়। বাড়ির সব্বাই তাদের বরাদ্দ পেল কিনা সেদিকেও কুটুনের নজর থাকে।

এরপর শুরু হয় ওনাদের শরীরচর্চা। ধরো বাবা অফিসে বেরোবেন বেলা একটায় (হপ্তায় দুদিন উনি দুপুরের গাড়িতে অফিস যান, দুদিন কাকডাকা ভোরে, আর দুদিন রাত জাগেন), ওনার ব্যায়ামের ক্ষিধে জাগবে বেলা বারোটা নাগাদ। সঙ্গী অবশ্যই ক্ষুদে কুটুন। দুই প্রতিভাবানের এই পর্বের কাজের বহর দেখবার মত।

শুরু হয় দৌড় দিয়ে। বসার ঘর থেকে শোওয়ার ঘরের দেওয়াল... এই রাস্তায় বার দশেক ছুটোছুটি চলে, মেয়েকে অন্তত পাঁচবার জিততে দিতেই হয়। এরপর একে একে বার্পি, এক -দুই (সিট আপ), পুশ আপ, চেয়ারে এক পা তুলে মেঝেতে হাত রেখে খানিকটা কসরৎ, খাওয়ার ঘরের মাথায় বাতিল জিনিস জড়ো করার যে তাক আছে সেইটা ধরে কিছুক্ষণ ঝোলাঝুলি করা (বাবা অবশ্য শক্ত করে মেয়েকে ধরে রাখেন ) , এবং অবশ্যই নমো ব্যায়াম।

এটা কি ব্যাপার? বাবার কাছে একটা ভয়ঙ্কর ভারি বারবেল আছে। তাতে কুটুনের হাত দেওয়া বারণ। বাবাকে ওটা তুলে কায়দা করতে দেখে মেয়ের মনেও শখ জাগত জিনিসটা মাঝেমাঝে ছুঁয়ে দেখার , কিন্তু বকুনির ভয়ে কাছে ঘেঁষা হত না, হাত ঠেকিয়ে নমো করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াতে হত। কিছুদিন এভাবে চলার পর কুটুন আবিষ্কার করল, আরে,  রান্নাঘরে তো বারবেলের মত দেখতে একখানা খাসা জিনিস পাওয়া গেছে। আড়ালে আবডালে হয়ত দু  'একদিন মকশো করেও থাকবে, কেননা, একদিন বাবা বারবেল হাতে তুলতেই "দাঁড়াও আমারটা আনি" বলে গটগটিয়ে রান্নাঘর থেকে রুটি বেলার বেলনখানা এনে হাজির করল। কিচ্ছু বলার নেই, নিরীহ হাল্কা বেলন, কুটুনের হাতে বারবেল হিসেবে দিব্যি মানিয়ে গেল। তারপর থেকে বাবা বারবেল ভাঁজতে শুরু করলেই সে-ও তার বেলন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাবা যদি সেই বারবেলের দুপাশে দু 'খানি বাড়তি ওজনের চাকতি ঝোলান, তবে সেও "আম্মো কম কিসে" গোছের মুখ করে তার বেলনের দুপাশে তার মায়ের দুটি ফিনফিনে চুড়ি ঝুলিয়ে নেয়। সমমানের ব্যায়ামের অধিকার সকলের আছে।

যাই হোক, ব্যায়ামের উত্তেজনা কমার পর ঘড়ির দিকে চোখ পড়লে দেখা যায় সাড়ে বারোটা বাজে। অতঃপর হুড়োহুড়ি, চান এবং খেতে বসা... বাবাকে ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। কুটুনও এই ব্যস্ততার আঁচ পোহায়। বাবা চান করতে ঢুকেছেন, মেয়ে এসে দরজা ধাক্কিয়ে বলে চলল "বাবা সালোতা (সাড়ে বারোটা) বেজে গেছে, বেরোও ", কিংবা মায়ের হাত থেকে ডালের বাটিটা নিজেই নিয়ে পরিবেশনের চেষ্টা, এইসব চলতে থাকে।

বাবা আর মেয়ে একসঙ্গে খেতে বসে। দুজনে টেবিলের দুই প্রান্তে, দুই থালায়। এটা না করলে গোল বাধবেই। বাবা যতই ধোপদুরস্ত জামাপ্যাণ্ট পরে খেতে বসুন না কেন, মেয়ে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে কোলে উঠে বাবার থালা থেকে খাবার মুখে তুলবেই, দু  'এক চামচ দই বাবার জামায় ঢালবেই। তাই এইসময় তাকে নিজের কাজে ব্যস্ত রাখতে হয়।

খাওয়ার পর হুড়োহুড়ি করে জুতোমোজা পরে বাবা অফিসে রওনা হন। বেরোনোর আগে দুজনের টা -টা পর্ব চলে কিছুক্ষণ, শেষ অব্দি মায়ের ঠ্যালায় বাবা গিয়ে লিফটে ওঠেন। কোনও কোনও দিন কুটুনও ঝোলভাত মাখা মুখে বাবার পিছু পিছু দৌড়ায়। মা গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে ঘরে আনেন।

এরপরের বাকি দিনটা মা আর মেয়ের। বাবা ফিরবেন সে - ই রাত সাড়ে দশটায়। মেয়ের ততক্ষণে রাতের খাওয়া সারা, কিন্তু বাবা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত ঘুমোতে নেই, তাই চোখ কচলে ঘুম তাড়িয়ে সে বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। বাবা এলে আরেক প্রস্থ নাচ গান বাবার থালায় আরেকবার খাওয়া ইত্যাদি সেরে বাবা আর মা দুজনকেই বগলদাবা করে তবে কুটুনের ঘুমের অবসর মিলবে।

Sunday, 7 May 2017

এতদিনে বুঝিলাম...

গত বছর আমার বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করেছিলাম পুজো বলতে অবশ্য যদি ভাবেন, বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুসারে ষোড়শপচার সাজিয়ে আসন পেতে মা লক্ষ্মীকে বসতে ডেকেছিলাম, তাহলে আমায় অতিরিক্ত ভক্তীমতী ভেবে ফেলা হবে অতটা আমি নই সত্যি বলতে কি, দুর্গাপুজোর আগে থেকেই মনটা অনবরত নারকেল নাড়ু-মুড়ির মোয়ার নাম জপছিল, তাকে ধমকে থামানো যাচ্ছিল না মোটে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোয় কেউ না কেউ নিশ্চয়ই কোজাগরী পূর্ণিমায় পুজো করেন, আমার বছর দুয়েকের কন্যার জনপ্রিয়তা সেসব বাড়িতে কিছু কম নয়, তার দৌলতে নিশ্চয়ই দু'তিন বাটি নাড়ু-মোয়া বাড়িতে আসবে ও মা, সে গুড়ে বালি! খোঁজ নিয়ে জানলাম পাড়াতুতো কাকীমা-বৌদি-ননদরা যে যার দেশে রওনা দিচ্ছেন লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষ্যে এদিকে আমার মনের ততক্ষণে পুজোর লুচি-মোহনভোগের কথা মনে পড়ে গেছে

ছোটবেলায়  প্রতিবছর টুটুনমাসীদের বাড়িতে পাত পেড়ে কলা-আপেলকুচি-নাড়ু-লুচি-মোহনভোগ খেয়ে বাড়ি এসে খোঁজ নিতাম আর কাদের বাড়ি থেকে প্রসাদ এসেছে, যাতে পরদিন সকালেও প্রসাদ থাকছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়

সেসব দিন বহুকাল হল ইতিহাস হয়েছে, তবে পুজোর দিন মায়ের হাতের নারকেল নাড়ু প্রতি বছরই পাওয়া যেত মা নিজের  অফিস এবং সংসার সামলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে লক্ষ্মীপুজোর আগের সন্ধেয় নারকেল নাড়ু তৈরি করতেন দুর্গাপুজোর পরেই অফিসে কাজের চাপে লক্ষ্মীপুজোয় আর ছুটি নেওয়া যেত না, ব্যস্ত সকালে ঝড়ের বেগে কাজকর্ম মিটিয়ে নতুন একটা শাড়ি পরে মা-লক্ষ্মীর আরাধনা নিজের মত করে সেরে নিয়ে অফিসের পথে পা বাড়াতেন আমাদের স্কুল-কলেজ ছুটি থাকলেও আমরা বিশেষ কিছুই করতাম না, বড়জোর মায়ের শাড়ির কুঁচি ধরে দেওয়া, কিংবা কোনো বছর একটু সকাল-সকাল চান সেরে দু'একটা ফল কেটে রাখা বা ঠাকুরঘর মুছে রাখা, এটুকুই প্রসাদ খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজই বাধ্যতামূলক বলে আমাদের মনে হতনা মা নিজেই উদ্যোগী হয়ে একা হাতে সব করতেন 

তা, বছরতিনেক হল সে রীতিরও ইতি হয়েছে মা নিজেই মা-লক্ষ্মীর কাছে গিয়ে পৌঁছেছেন, বোধহয় আরও মন দিয়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ চাইবেন বলেই মা নেই, ওসব-ও আর হয় না

তবে এবার পুজোর আগে থেকেই মনটা বড় প্রসাদ প্রসাদ করছিল কিনা, তাই লোভে পড়ে ভেবে ফেললাম আমিই যদি বাড়িতে প্রসাদ, মানে পুজোর জোগাড় করে ফেলি? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমি পুজোআচ্চার নিয়মকানুন বিশেষ কিছুই জানিনা যেকোনো পুজোর আগে আলপনা আঁকা, বাসনকোসন ঘষেমেজে ধুয়ে তাতে নানা উপাদেয় খাবারদাবার নিয়ে ঠাকুরঘরে সাজিয়ে রাখা, ফুল জোগাড় হলে ভাল, নহলে শুধু হাত জোড় করেই "ঠাকুর তুমি ভাল থাকো, তাহলেই আমরা ভাল থাকব" গোত্রের প্রার্থনা করা (পৃথিবীর সাতশো কোটি মানুষের রোজ দু'বেলা চোদ্দোশো কোটি চাওয়া মেটাতে ভগবান জেরবার তাঁর ভাল থাকার কথাটাও তো ভাবতে হবে!),এবং সবশেষে হাত ধুয়ে এসে ঐসব নানাবিধ সুখাদ্য আয়েস করে বসে খেয়ে আঙ্গুল চাটা--- আমার কাছে পুজোর অত্যাবশ্যক কাজ হল এগুলোই

আমার ডেরায় আমিই সর্বেসর্বা কাজেই প্রসাদের লিস্টি আমি নিজেই বানিয়ে ফেললাম মেয়ের বাবা কোথায় যেন গিয়েছিলেন অফিস ট্যুর উপলক্ষ্যে (গিন্নির প্রসাদভক্তির ঠ্যালায় বাজার করতে বেরনোর চেয়ে অফিস ট্যুর শতগুণে আদরণীয়, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ মানুষ-মাত্রেই একমত হবেন), ফিরবেন পুজোর দিন বিকেলে, অগত্যা বাঁ কাঁখে মেয়েকে চেপে ডান হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনে বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম বাজারের দিকে

বাচ্চা কোলে বাজার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা আশা করি আমার অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবেন আমার নিজেরও একসময়, তখনও মা হইনি, মনে হত, "আহা, ফুলের মত বাচ্চাগুলো প্রজাপতির মত খেলে বেড়ায়" ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু এখন কাঁধের ঝোলা, কোলের বাচ্চা, হাতের থলে সবকিছু একসঙ্গে সামলে বাজার করার পরিস্থিতিতে পড়লে নিজের বাচ্চাকে দেখেও উড়ন্ত আরশোলা কিংবা খেলে বেড়ানো ছাগলছানা ছাড়া অন্য কোনো উপমা মাথায় আসে না, বিশ্বাস করুন!
যাই হোক,মহৎ উদ্দেশ্যে মানুষ উদ্যোগী হলে ভগবান সহায় হন, তাই মেয়ে বার দুয়েক মুড়কি-বাতাসার ঝুড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও, এবং বাধা পেলেই বার বার মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়া সত্ত্বেও মোটের উপর নির্বিঘ্নেই একথলি বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরলাম

পরদিন ভোরবেলায় উঠব ভেবে রেখেছিলাম, ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম আটটা বেজে গেছে নিজের ঘুমের রাশ কেন যে নিজের হাতে থাকে না কে জানে? যাই হোক, রান্নার জোগাড় করতে করতে হঠাৎ মনে হল সবাই তো শুনেছি সারাদিন উপবাসী থেকে সন্ধ্যেবেলায় লক্ষ্মীপুজো করে, আমিও করব নাকি উপোস? এমনিতে ঘণ্টাতিনেকের বেশি না খেয়ে আমি থাকতে পারি না, তায় আবার লো প্রেশারের ধাত! মাথা ঘুরে পড়ে গেলে কেলেঙ্কারি কাণ্ড হবে তার ওপর 'উপোস করছি' ভাবলেই বেশি ক্ষিধে পায় ঠিক করলাম উপোসই করব, তবে ফি-ঘণ্টায় এক গেলাস করে শরবত খেয়ে যাব

দুপুরে মেনু ছিল গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি আর আলুর দম খাওয়ার লোক বলতে কন্যে,তাও আবার সে হাঁ করবে আর আমি খাওয়াব ভাবুন দেখি একবার, নুন-চিনির শরবত খেয়ে উপোস করে আছেন, সামনে বেড়ে রেখেছেন এক থালা ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর আলুর দম কতখানি সহনশক্তি থাকলে ওই ধোঁয়া-ওঠা থালার হাতছানি এড়িয়ে থাকা যায়! কিন্তু আমি তো দিব্যি মুখ ফিরিয়ে রইলাম! তবে কি এ মাহাত্ম্য উপোসের , নাকি বিকেলের হবু প্রসাদের, কি জানি??

মনের কষ্ট মনেই চেপে রেখে "উপোস করে চোদ্দোবার 'ক্ষিধে পাচ্ছে ক্ষিধে পাচ্ছে' ভাবতে নেই" এসব আউড়ে মনকে ধমকে চুপ করানো হল এরপর মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ভোগ রান্নার পালা সকালে অবশ্য নারকেল কোরা সেরে রাখা হয়েছে পাশে বসে মেয়ে মন দিয়ে নারকেল কোরা দেখেছে (বেড়াল যেভাবে মাছ কোটা দ্যাখে), মাঝে মাঝে থালার দিকে হাত বাড়ালে তাকে বুঝিয়েছি, "বিকেলে আগে ঠাকুর খাবে, মা লক্ষ্মী খাবেন, তারপর আমরা খাব", শুনে ছোট্ট মানুষটা হাত গুটিয়ে নিয়েছে ছবির মধ্যে থেকে হাত বাড়িয়ে মা-লক্ষ্মী যখন নারকেল কোরা খাবেন, তখন তাঁকে না জানি কেমন দেখতে লাগবে, এসবই বোধকরি ভাবতে শুরু করেছে ভারি অবাক হয়ে আর তাকে বারণ করতে গিয়ে আমার মনে পড়ে গেছে আরেকটা ছোট্ট মেয়ের কথা, থালায় রাখা সাদা নারকেল কোরা দেখলে আর গুড়ের পাক দেওয়া নারকেল নাড়ুর গন্ধে যার জিভে জল আসতোই আসতো, আর মায়ের নরম-গরম চাউনিতে জিভের জল গিলে নিয়ে সে-ই কখন পুজোর শেষে থালায় করে মা প্রসাদ আনবে, তার জন্য হা-পিত্যেশ করে তাকে বসে থাকতে হত

মা আর মেয়ে, মেয়ে আর মা--- কি অদ্ভুত ভাবে ভূমিকা গুলো অদল-বদল হয়ে যায়, তাই না! আজ মেয়েকে যখন চোখ রাঙাই, তখন যদি কেউ আমার সামনে আয়না ধরে, তবে বোধহয় আমার চাউনি আর মায়ের সেই নরম-গরম চাউনির মধ্যে বেশ কিছুটা মিল খুঁজে পাব

সন্ধ্যেবেলায় পুজোর শেষে (ক্ষুদে গিন্নি অবশ্য থালায় ভোগ সাজিয়ে ঠাকুরঘরে রাখার পরেই একখানা লুচি আর একখানা নারকেল নাড়ু তুলে গালে পুরেছিল) পড়শিদের প্রসাদ দিয়ে এসে যখন নিজে প্রসাদের থালা নিয়ে বসলাম, দেখলাম লুচি, মোহনভোগ, আলুভাজা, নারকেল নাড়ু, মায় সিন্নি অব্দি খাসা হয়েছে খেতে আমি যে এত ভালো রাঁধতে জানি, নিজেই জানতুম না! মা যদি জানতেন তাঁর 'কুটোটি ভেঙে দুটো না করা' মেয়েটা কেবল মায়ের হাতের রান্না খেতে কেমন হত তা মনে করার চেষ্টা করতে করতেই দিব্যি রেঁধে ফেলেছে, বেশ নিশ্চিন্ত হতেন তা, মা-কে তো আর এই নতুন শেখা বিদ্যের নমুনা দেখানো গেল না

মা যেখানে আছেন সবই জানতে পারছেন, আমাদের হাসি-কান্না-রাগ-হৈ-চৈ-এর সব খবরই রাখছেন, এসব ভেবে মনকে আগলানোর চেষ্টা তো করি, কিন্তু মা যে জানতে পারছেনই, সে খবরটা তো আর কেউ এসে আমার কাছে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, সবই তো আমাদের মনগড়া ধারণা, নিজেদের ভাল থাকার জন্য মনকে প্রবোধ দেওয়া, তাই কখনো কখনো মন কিচ্ছুটি বোঝে না সারাদিনের কাজের মাঝে মনের মধ্যেকার একটা ছোট্ট আমি ছোটবেলার সেই রোজকার ভুলগুলো করে আবার মায়ের বকুনি খেতে চায়, আর যে আমিটা বছরদুয়েক হল মা হয়েছে, সে চায় একবার অন্তত তার মা এসে তাকে মা হওয়ার পাঠ দিক, মা হতে শেখাক সে তো আর হওয়ার নয়, তাই নিজের ছোটবেলা-টাকে মনে করতে করতেই মায়ের মত মা হওয়ার একটা বৃথা চেষ্টা করতে থাকি রোজ।।


(এখানে পুজো-আচ্চা সম্পর্কে যা কিছু লিখলাম সবই আমার নিজের মনের কথা যেসব মানুষ নিষ্ঠার সঙ্গে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে নিয়মিত পূজার্চনা করে থাকেন, তাঁদের মনে কোথাও আঘাত দিয়ে ফেললে তাঁরা যেন নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করে দেন, এই অনুরোধ রইল)


['আমি অনন্যা' পত্রিকা (ISSN:2394-4307), ধানবাদ- January-March 2017 সংখ্যায় প্রকাশিত]

Saturday, 8 April 2017

সিনেমার গল্প

গৌতম ঘোষের 'দেখা  ' দেখছিলাম সেদিন,  ট্রেনে যেতে যেতে, সদ্য আলাপ হওয়া সহযাত্রিণীর মুঠোফোনে. অন্যের ফোনে উঁকি দেওয়া খুব একটা ভাল স্বভাব নয় জানি, কিন্তু বাংলা সংলাপ শুনে চোখ কান দুই -ই ধেয়ে যাচ্ছিল ফোনের পানে।

এটা আমার ছোটবেলার অভ্যেস. ট্রেনে কিছু করার না থাকলেই পাশের জনের দিকে নজর যাবে, তার হাতে যদি গল্পের বই থাকে তো ঘাড় বাড়িয়ে তার সঙ্গে আমিও পড়তে শুরু করব, খোলা পাতাটা হুড়োহুড়ি করে শেষ করে উদাস মুখে বসে থাকব সে কখন পাতা উল্টে পরের পাতায় যাবে, হাত নিশপিশ করবে নিজেই পাতা উল্টে নেওয়ার জন্যে. এভাবে নাম না জানা বহু বই শেষ না হতেই ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে অনেকবার. 

বই পড়ার বদলে যদি কেউ বাংলা ছবি দেখে, তাহলেও একই কাজ করে ফেলি. প্রথমে আড়চোখে, তারপর গলা বাড়িয়ে দেখতে বসে যাই. এইদিনও তেমন হয়েছিল.

ছবিতে এক জায়গায় দেখলাম ছোট্ট একটা ছেলেকে "শশী -দা" বিনে পয়সার বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন. মনটা হইহই করে উঠল. আরে! এ তো আমার বহুকালের চেনা জিনিস!

টিভিতে সিনেমা দেখা যায়, একথা জানার আগে থেকেই জানতাম রাত্তিরবেলায় অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে সিনেমা দেখা যায়. আমাদের মামারবাড়ি একদম বড় রাস্তার ধারেই. ভোর থেকে মাঝরাত, সর্বক্ষণ রাস্তায় গাড়ির সারি, হর্ণের আওয়াজে বাড়ির লোক অতিষ্ঠ. আমার কিন্তু বেশ লাগত. আমাদের বাড়িটা আবার ছিল একটু গলির ভেতরে, সারাদিনে গাড়ি -টাড়ি দেখার সুযোগ বিশেষ হত না. তাই মামারবাড়ি গেলে বারান্দা ছেড়ে নড়তে চাইতাম না.
সবচেয়ে মজা হত একটু রাত্তির হলে যখন ভারী ভারী ট্রাক -ট্রেলার গুলো যেত রাস্তা দিয়ে, প্রায় একশো বছরের পুরনো বাড়িটার গায়ে হাল্কা একটা কাঁপুনি ধরত, সেই কাঁপুনি চারিয়ে যেত মা বা দিদার পাশে শুয়ে থাকা আমার মধ্যেও. কাঁপছি না, অথচ পিঠের নিচে একটা গুড়গুড় করা ভাব, ভূমিকম্পের সময়েও কি এমনটাই হয়? জিজ্ঞেস করে বকুনিও খেয়েছি বারকয়েক. ওনারা দু 'তিনবারের ভূমিকম্পের সাক্ষী, রাতবিরেতে ওসব কথা ওনাদের ভাল লাগবে কেন?

এই ভারী ট্রাকগুলো যখন ছুটে যেত, দেখতাম ঘরের দেওয়ালেও একদিক থেকে আরেকদিকে সাঁ করে একটা ছায়া সরে গেল. প্রথমে ভাল বুঝতাম না, ভয় করত কিনা মনে নেই, সম্ভবত অজানাকে ভয় পাওয়ার মত বড় তখনো হইনি. ওইসব ছায়াগুলো যে সিনেমা, এই তত্ত্ব-টাই বা কে বুঝিয়েছিল সেটাও মনে নেই. তবে যেই বুঝলাম যে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেলেই দেওয়ালে আলো -ছায়াদের দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, আর গাড়ির আওয়াজ মিলিয়ে গেলেই দেওয়ালে এসে পড়া রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো আবার শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, অমনি আমাদের নতুন খেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল.

ঘুম আসার আগে অব্দি রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেলেই "এই... আসছে আসছে" বলে বোনেরা ঠেলাঠেলি শুরু করতাম, একলা শুলে নিজেকে ঠেলতাম. "এই -ই-ই যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে.... যা:, চলে গেল", "আবার আসবে দাঁড়া না", এরকম কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত থামত মা, মাসিমণি বা দিদাদের কারো ধমকে.

একটু বড় হওয়ার পরে খেলাটা কিছুটা পাল্টাল. তখন সরে যাওয়া সিনেমার আলো দেখে বোঝার চেষ্টা চলত গাড়ির চরিত্র কেমন. চার চাকা না আট চাকা, গাড়ির মাথায় মাল বোঝাই নাকি অতটা ভার নেই, এমন নানা তথ্য পাওয়ার জন্য কসরত হত. অত কাণ্ড না করে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তা না, এ যেন সিনেমা দেখতে বসে নামের লিস্টি না দেখে মেক-আপের আড়াল থেকে আসল মানুষটাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা!

মাঝেমধ্যে গুনতাম কে ক 'টা গাড়ির তৈরি সিনেমা দেখলাম. এই গুনতি করার সুবিধেটা হল ঠিক কোন সময়ে ঘুমটা এসে পড়ল সেটার একটা আবছা হিসেব পাওয়া যায়. বেশ "কাল পাঁচটা গাড়ি যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছি, আজ দেখি একই সময়ে ঘুম আসে কিনা" এরকম একটা হিসেব. আপেক্ষিকতার মত ঝামেলার বস্তু ভাগ্যিস তখন জানা ছিল না!

তো, এই হল সিনেমার গল্প. বছর কুড়ি  -পঁচিশ আগে গল্পের শুরু. জানিনা এখনও এমন সিনেমার গল্প তৈরি হয় কিনা. নিশ্চয়ই হয়. অবাক হওয়ার অভ্যেস তো আজও আছে. এখনও শোওয়ার ঘরে রাস্তার আলো এসে পড়ে. গাড়ির আওয়াজে আলো -ছায়ার ছুটোছুটি এখনো চলে.
 "ওটা কি মা? এদিক থেকে ওদিকে চলে গেল?" প্রশ্নটা কারো মনে আসে কিনা তারই অপেক্ষা এখন!

Wednesday, 29 March 2017

অলিম্পিক? ওদের?

মার্চের চোদ্দ থেকে পঁচিশ তারিখে অস্ট্রিয়াতে বসেছিল বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষদের অলিম্পিকের শীতকালীন আসর. সম্প্রতি ইণ্টারনেটে এসম্পর্কে খুব ছোট্ট একটা খবর চোখে পড়েছিল. ভারতীয় দল (Special Olympics Bharat) নাকি সেখানে তিয়াত্তরটি পদক জিতেছে! তার মধ্যে আবার সাঁইতিরিশটা সোনা!

 ভাবলাম আরেকটু খুঁজি. কম বড় কৃতিত্ব তো নয়, নিশ্চয়ই ভারতীয় মিডিয়া বিস্তারিত খবর জানাবে সাধারণ মানুষকে. 

আমার উদ্দেশ্য অবশ্য বিশেষ মহান ছিল না. মাসকয়েক হল একটা ছোটদের পত্রিকার সন্ধান পেয়েছি, তার সম্পাদকের কাছে নিজের বেশ ভারিক্কি একখানা ইমেজ খাড়া করেছি ভাল ভাল কথা ব'লে, এখন একখানা লেখা না পাঠালে মান থাকে নাকি! ভাবলাম এ খবর তো মন্দ নয়, দু 'চারটে খবরের কাগজ ঘেঁটে দু 'পাতার রচনা লিখে পাঠিয়ে দিলেই হল. লেখা পাঠিয়ে মানরক্ষাও হবে, আবার 'দ্যাখো আমি কেমন দরদী মানুষ, সব দিকে লক্ষ্য রাখি ' একথা বেশ ঘটা করে সবাইকে জানানোও যাবে!

সারাদিন খেটেখুটে নেট ঘেঁটেও একটা খবরের কাগজের আধপাতা রিপোর্ট ছাড়া আর কিচ্ছুটি পেলাম না. পরেরদিন আবার খুঁজতে বসলাম. ততদিনে গেমস শেষ, খেলোয়াড়দের ঘরে ফেরার পালা এবার. ভাবলাম এতগুলো মেডেল নিয়ে সোনার ছেলেমেয়েরা দেশে ফিরছে, ছবিসহ না হলেও খবরটা অন্তত ছাপা হবে. 
দুটো কি তিনটে খবরের খোঁজ পাওয়া গেল নেটে. কয়েক লাইনের খবর. যা খুঁজছিলাম সেভাবে পেলাম না.

একটি দৈনিকের খেলার পাতায় ছবি পাওয়া গেল মেরি কম, সাইনা নেহাওয়াল প্রমুখ ক্রীড়াবিদদের, ওনারা নাকি কোনো এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অলিম্পিকের পদকজয়ীদের সংবর্ধনা দিতে এসেছিলেন. রিপোর্টে মেরি কমের আবার রিং -এ ফেরার ইচ্ছে ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু কথা পাওয়া গেল, কিন্তু স্পেশাল অলিম্পিক ভারতের 73 টি পদকজয়ের ব্যাপারে পাওয়া গেল কেবল একটি বাক্য. ছবির তো প্রশ্নই ওঠে না.

 হ্যাঁ, মানছি, পদকজয়ীদের সংবর্ধনার ছবি ছাপতে হলে হয় সে ছবির অর্ধেক জুড়ে থাকত কতগুলো ক্রাচ কিংবা হুইলচেয়ার, নয়ত চোখেমুখে তথাকথিত মেধা বা সৌন্দর্য কোনোটারই ছাপ না থাকা কতগুলো মুখ. তবে কিনা সেই মানুষগুলো বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছেশক্তি দিয়ে, কখনো কখনো নিজের শারীরিক ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েও 105 টা দেশের প্রায় 2600 মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যখন সাঁইতিরিশটা সোনা, দশটা রূপো আর ছাব্বিশটা ব্রোঞ্জ নিয়ে ঘরে ফেরে, তখন তাদের কথা জানা আর তাদের চেনাটা দেশের মানুষের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে. হ্যাঁ, এই চিনতে চাওয়াটাও একরকমের দেশপ্রেম.

দিনতিনেকের খোঁজাখুঁজির পর কিছু তথ্য পেয়েছি. হয়ত আমারই অক্ষমতা, সেভাবে মন দিয়ে চোখকান খুলে রাখলে হয়ত আরো আগে আরো বেশি তথ্য পাওয়া যেত. যাইহোক, এটুকু সম্বল করেই আপাতত এগোনোর চেষ্টা করি, আশা থাকুক আগামীতে নিশ্চয়ই দেশপ্রেমিক দেশবাসী সঞ্জয় কুমার, শিখা রানিদের একডাকে চিনবে. কি, আসবে তেমন কোনো দিন?


তথ্যসূত্র: www.specialolympics.org
              www.financialexpress.com

(লেখার মতামত সম্পূর্ণ আমার নিজের. কোনো কথা কাউকে আঘাত দিয়ে থাকলে আমি তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী. তথ্যে কোনো ত্রুটি থাকলে জানানোর অনুরোধ করছি.)


Friday, 10 March 2017

"কবে ছেল?"

ঘটনাটা শুনেছিলাম আমার ছোড়দিদার কাছে।
কোনো এক গরমকালের বিকেল, দিদা গাছে জল দেওয়া সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়েছেন দু 'দণ্ড জিরোবেন ব 'লে।  আমার মামারবাড়ি ছিল একেবারে বড়রাস্তার ধারেই। অলস দুপুর সবে আড়মোড়া ভেঙ্গে গুটিগুটি পায়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে, বড়রাস্তায় গাড়ির চলাচল বাড়ছে একটু একটু, বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে নিচের ফুটপাতের ফলওয়ালা তার পসরায় আঁজলা করে খানিকটা জল ছিটিয়ে দিল, যে জুতো - ছাতা -সারাইওয়ালা ঠা -ঠা রোদ্দুরে  বসে না থেকে 103 নম্বরের রোয়াকে গিয়ে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিল এতক্ষণ, সে আবার নিজের জায়গায় এসে জুতো সারানোর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখছে। ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা এরকমই নানা ছবি ছোড়দিদা দেখছিলেন কিছুটা মন দিয়ে, বাকিটা আনমনে।
হঠাৎ চোখ পড়ল নিচে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসা এক মাঝবয়সী মহিলার দিকে। পাড়াতেই কিছু বাড়িতে রোজের বাসনমাজা - ঘরমোছার কাজ করে সে। তার মা করত এক সময়, মেয়েও করেছে বিয়ের আগে কদিন, ছেলেপুলেসমেত বর যবে এবাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গেল, তবে থেকে সেসব বাড়ির ঠিকে কাজের ভার পাকাপাকিভাবে মেয়ের হাতে। রোজ বিকেলে এই সময়টায় সে হাতের শাঁখাপলা আর লোহায় ঝোলানো সেফটিপিন ঝমঝমিয়ে কাজের বাড়ির দিকে হেঁটে যায়।  কালোকোলো চেহারায় সিঁথির সিঁদুর বেশ খোলতাই হয়। কিন্তু আজ চেহারাটা এমন ম্যাড়ম্যাড়ে কেন? ভাল করে নজর করতেই দিদা চমকে উঠলেন। আহা রে! সিঁথিটা আজ একদম খালি যে! হাতগুলোও ন্যাড়া, শাঁখাপলা নোয়া উধাও! পরনের কাপড়টাও সাদাটে।   ওইজন্যই বউটাকে ক 'দিন দেখা যায়নি। দিদা শুনেছিলেন, মনে ছিল না। মনটা একটু ভারি হয়ে গেল।  শাঁখায় সিঁদুরে চেহারাটা বেশ লাগত।
বউটা অবশ্য রোজের মতই কাপড়ের কুঁচিটাকে পায়ের গোছের একটু ওপরে তুলে হেঁটে আসছিল, পথ আগলালো ওর মতোই আরেকজন। সে -ও বাড়ি বাড়ি ঠিকে কাজ করে। আগের জনের নতুন বেশ সে বোধহয় আজকেই দেখল, খবরটা পায়নি আগে। গালে হাত দিয়ে একটুক্ষণ বান্ধবীকে দেখে সে শুধোলো,
 "কবে গেল?"
সদ্যবিধবা বান্ধবীটি হাত উল্টে নিস্পৃহ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
"কবে ছেলো?"
বলে কাপড়ের কুঁচিটাকে আবার পায়ের গোছের ওপর তুলে হেঁটে চলল কাজের বাড়ির দিকে।


Tuesday, 14 February 2017

চল্‌ যাব তোকে নিয়ে



দিন গুলো চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে কি তোমায়? একছুট্টে কোথাও পালিয়ে গিয়ে দিনকতক ঘাপটি মেরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে কি? চলো তাহলে, সেরে আসি একটা ছোট্ট সফর।

কি বলছ? ছুটি নেওয়া অসম্ভব? আরে না মশাই, ছুটি নিতে বলছে কে? শুধু ছুটি কেন, টিকিট, ব্যাগ, ক্যামেরা, জলের বোতল, রোদ্দুর আড়াল করার টুপি, নিজেকে আড়াল করার রোদচশমা—কিচ্ছুটি সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই। এমনকি, যাদের সঙ্গে তোমার সারাদিনের কিচির-মিচির চলে, তাদেরও কাউকে ডেকো না। বেরিয়ে পড়ো শুদ্ধু নিজেকে নিয়ে, শুদ্ধ নিজেকে নিয়ে।

ভাবছ, এমন ঝাড়া-হাত-পা হয়ে যাবে কোথায়? আহা, নিজের মনটাকে একটু ভরসা করোই না বাপু! বলি কি, একদিন একটু কষ্ট করে ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে পড়ো। বসন্ত তো এসেই গেছে, ভোররাতে বিছানা ছাড়তে বুকে আর অতটা কাঁপন ধরবে না এখন। চোখ কচলে উঠোনে এসে কুস্‌মি-লাল সূর্যটার ঘুম-ভাঙ্গা হাসি গায়ে মেখে ঝুপ করে একখানা ডুব দাও মনের গহীনে। ডুব দিয়েই দ্যাখো না একবার, কাছেপিঠে একখানা জঙ্গল পাবেই পাবে। সেই তেমন জঙ্গল, যেখানে হাতে তৈরি রাস্তার থাকতে মানা, সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গালগল্প করতে থাকা গাছেদের পাশ দিয়ে কারা যেন হেঁটে গিয়ে তৈরি করে দিয়েছে পায়ে-চলা পথ, সে পথ এমনিতে ঢেকে থাকে গাছেদের ঝরানো পাতায়, কেবল তুমি আসবে বলেই আজ হাওয়া এসে পাতা সরিয়ে সে পথকে মেলে ধরেছে তোমার পায়ের সামনে। চলো, এগিয়ে চলো, পায়ের নীচে ঝরা পাতা-রা তোমারই ভুলে মচ-মচ আওয়াজে ধুলো হয়ে যাচ্ছে, “সর্‌-সর্‌” আওয়াজ তুলে সাবধানী হাওয়া কিছু অবাধ্য পাতাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার গাছ-মায়ের কাছে,এসবের মাঝ দিয়ে তুমি হেঁটে চলো।

কখনো যদি মনে হয়, কেউ বুঝি পিছু পিছু হেঁটে আসছে, উতলা হয়োনা। আসলে আর কেউ নেই,এখানে কেউ পিছু নেয় না। ও তোমারই পায়ের শব্দ। নিজের পায়ের আওয়াজ তেমনভাবে রোজ শোনা হয় না কিনা, তাই চিনতে পারছিলে না। এবার দু’পাশে তাকিয়ে দেখো, তুমি এসেছ ব’লে এরা সব কত্ত খুশি। ডাল-পাতা-পত্তর মেলে দিয়ে সবাই কেমন দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে তোমায়! আহা, যাও, ওদের কারো পায়ের কাছটায় দু’দণ্ড বোসো, শুনবে ওরা হাসতে হাসতে বলছে, “বাব্বাঃ! শেষ পর্যন্ত ঠিকানা খুঁজে এলি তাহলে! পুরোটা যে আসতে পারবি, ভাবিইনি কখনো!”

কারো কারো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আবার দেখবে তোমার গায়ে টুপ-টুপ করে ঝরে পড়ছে দু’চার ফোঁটা জল। রাতের পুরনো শিশির ভেবে মুছে ফেলো না যেন! এরা আনন্দাশ্রু। তুমি যে নিজেকে সঙ্গে করে এসেছ ওদের কাছে, তাই আজ আনন্দ বাঁধ মানছে না।

নিজের সঙ্গে শেষ কবে একলা হয়েছ, তলিয়ে ভাবো যদি, দেখবে তোমারও দু’চোখের কোণ ভিজে উঠছে।

খুব বেশি সময় তো হাতে নেই, চোখ মুছে এগিয়ে চলো আরও। একটু পরে জঙ্গল শেষ হয়ে আসবে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখবে পায়ে-চলা রাস্তাটা ঢালু হয়ে গিয়ে নেমেছে এক তিরতিরে নদীর কোলে। ভারি রোগা আর মিষ্টি সে। হাত নেড়ে তোমায় কাছে ডাকছে আর কলকল করে কত কথা বলছে। সে ভাষা বোঝা তোমার কম্ম নয়, তবে তার জলে পা ডোবাও, দেখবে তোমার এতবছরের জমে ওঠা ক্লান্তি, অভিমান সে কেমন শুষে নিচ্ছে, আর তার আলতো হাওয়া তোমার এলোমেলো চুলে কেমন বিলি কেটে দু’চোখে ঘুম এনে দিচ্ছে। অনেকদিন আগে কে যেন এভাবেই তোমার চোখে ঘুম এনে দিত না? তার হলুদমাখা আটপৌরে আঁচল তোমার ক্লান্তি মুছিয়ে দিত না এইভাবেই?

ওহো, বলতে ভুলে গিয়েছি, নদীর পাড়ে নামার রাস্তাটা কিন্তু একটু পিচ্ছিল। অবশ্য তোমায় তো রোজ এর চেয়ে অনেক বেশি পিছল রাস্তায় চলাফেরা করতে হয়। অভ্যেস হয়ে গেছে নিশ্চয়ই এতদিনে!

অমন সুন্দর নদী, তার জলে নিজেকে না ধুলে চলে নাকি? নেমে পড়ো নদীর কোলে। এতদিন ধরে যত ছাল-বাকল-মুখোশ-চাদর গায়ে জড়িয়েছ, সেসব খুলে পরিপাটি ভাঁজ করে শুকনো ডাঙ্গায় রেখে তবেই জলে নেমো কিন্তু! জঙ্গলের চৌকাঠ পেরিয়ে এপাশে আসার আগেই আবার ধরাচূড়ো পরে ফেলতে হবে। নইলে যে চেনা মানুষেরও সাধ্যি হবে না তোমায় চেনার। 

নাও, এবার বয়ে চলা নদীর জলে নিজেকে বেশ করে ঘষেমেজে ধুয়ে নাও। নিজেকে নিয়ে যা কিছু ধন্দ আছে মনের খাঁজে, দূর করে দাও সব। সূর্যের আলোয় নদীর আয়নায় নিজেকে দেখে নাও ভালো ক’রে। নিজের যা-কিছু সাদা, যা-কিছু কালো, সেসব মিলিয়ে মিশিয়ে তুমি ধূসর, নাকি তুমি রঙিন, সে দ্বন্দ্বের মীমাংসা আজকেই করে নাও। একবার এপাশে এসে পড়লে আর সুযোগ মিলবে না। রঙিন আলোয় নিজেকে দেখতে দেখতে নিজের আসল রঙখানাই ভুলে যাবে দিনে দিনে।

এবার তো ফিরতে হবে, নিজেকে গুছিয়ে নাও। সেই যাদের সঙ্গে তোমার দিন যাপন, তাদের কেউ এখনও চায়ের কাপ হাতে তোমার অপেক্ষায়, কেউ একটু পরেই বাসস্ট্যাণ্ডে এসে তোমায় খুঁজবে, কেউ-বা অফিসের করিডর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে উঁকি দিয়ে দেখে যাবে তুমি চেয়ারে বসে নিজের কাজে মগ্ন কিনা। এদের জন্যই সফর শেষ করে ফিরতে হবে তোমায়।

মন খারাপ কোরো না। ঠিকানা তো রইলোই। যখন-তখন, ইচ্ছে হলেই ঘুরে এসো। তোমার সঙ্গে থাকা ওদেরও দিয়ো ঠিকানাটা। হয়ত ওরাও কেউ হঠাৎ কোনোদিন পৌঁছে যাবে সেই নদীটার কাছে, আর গলা মেলাবে নদীর কাছে রেখে আসা তোমার গানের সাথে,
“বাহিরে নয় বাহিরে নয়                  ভিতরে জলে ভাসতে বলো
আমায় ভালবাসতে বলো               ভীষণ ভালবাসতে বলো”।।
  

Tuesday, 7 February 2017

কুটুনের পুষ্যিপুতুল-রা

আজকের গল্পের শুরু বছর দুয়েক আগে। কুটুন যখন নেহাৎ সাত মাসের খুকী ছিল, এ তখনকার কথা। তার প্রথম লেজুড়টি হাজির হয়েছিল মুখেভাতের দিনে। আজ একটা মস্ত ঝুড়ি জুড়ে তার যেসব নিষ্প্রাণ সাঙ্গোপাঙ্গো-রা খোশমেজাজে দিন কাটান, সেদিনেই ছিল তাঁদের আনাগোনার শুরু। সেদিনের আগে তাকে কেউ কোনো পুতুল কিনে দেয়নি গো, না বাবা-মা, না অন্য কেউ। মায়ের চশমা হোক কিংবা পেন-ড্রাইভ, বাবার মোজা হোক কিংবা দাদুর বাজারের থলে, সবকিছুকেই সে দিব্যি নিজের খেলনা ভেবে আপন করে নিয়ে মুখে পুরতো। তাইতেই বিরক্ত হয়ে মা আর পুতুল কেনার হাঙ্গামায় যাননি। পুতুলের গা থেকে একখাবলা লোম কিংবা একখানা চোখ তুলে নিয়ে মেয়ে যদি গিলে ফেলে? ওনাকেই তো তখন ডাক্তার-বদ্যির কাছে দৌড়তে হবে!

অবশ্য খাটের ওপর দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা অতি বিচ্ছিরি টর্‌-টর্‌ আওয়াজ করা একটা রং-বেরং-এর ঘুরুন্তি ছিল, আর ছিল দু-তিনটে বল। ওসব কি আর চিবোনো যায়? নাকি চেটে সাফ করা যায়? হ্যাঁ, কে যেন একবার নীলচেমতন একটা পুতুল এনে দিয়েছিল,ইয়াব্বড় হাঁ-মুখ তার, তখন নাম জানত না, এখন জেনেছে, ডোরেমন, তার গায়ে লাগানো চাবি ঘোরালে সে আবার নানান ভঙ্গিতে আছাড়ি-পিছাড়ি খেতো, তা দেখে সেই পাঁচ মাস বয়সেই হাসতে হাসতে কুটুনের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে পড়ত। এখনও রয়েছে সেটা। অত ভালো আছাড় খায় না বটে আর, তবে সেটার মুণ্ডুখানা মুখে পুরে কিছুক্ষণ বসে ভাবলে নানা জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যায় (কারো কারো যেমন বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিলে বেশ বুদ্ধি খোলে, তেমনই কিছু বোধহয়)।

মুখেভাতের দিনের কথায় আসা যাক এবার। সেদিন এক পাড়াতুতো ঠাকুমা কুটুনের হাতে তুলে দিলেন কপালে তিলকধারী, মাথায়-টিকি ও হাতে-লাড্ডু একখানি পুতুল, ছোটা ভীম। সে-ই তার পুতুল-পরিবারের প্রথম মানুষ। কচি মাথার কাঁচা বুদ্ধিতে অবশ্য কুটুন তাকে নিজের শত্তুর ঠাউরেছিল, কেননা, সারা সন্ধ্যে সেটাকে দেখে রে-রে করে তেড়ে যাচ্ছিল, আর নাগালে পেলেই সেটার টিকি ধরে টান মারছিল। মা দেখলেন বেগতিক, নতুন পুতুল বুঝি আজই মারা পড়ল, তিনি সন্তর্পণে সেটিকে কোঁচড়ে গুঁজে আলমারিতে লুকিয়ে ফেললেন।

বড়রা এসব দেখলেই বলবে, "পুতুল কি তুলে রাখার জন্যে? দে না মেয়েটার হাতে, যা করছে করুক", ইত্যাদি,
তাই মা চুপিচুপি কাজ সেরে এসে শান্ত হয়ে মেয়েকে দুধ খাওয়াতে বসলেন। অমন সুন্দর নতুন পুতুলটাকে প্রথম দিনেই এলোমেলো করে দিলে ভালো লাগে নাকি?

হপ্তাখানেক পর মেয়ের বুদ্ধি আরো খানিক পাকলে সে পুতুলকে আবার জনসমক্ষে আনা হল। তদ্দিনে কুটুনের জ্ঞানগম্যি কিছুটা বেড়েছে, কাজকর্ম না থাকলে দিব্যি পেটের ওপর পুতুলটাকে শুইয়ে রেখে আয়েস করে তার টিকি কিংবা হাতে ধরা লাড্ডু চিবোয়। একদিন দেখা গেল সেই লাড্ডু ভীমের হাতের মায়া কাটিয়ে কুটুনের মুখের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এবং ভীমের গলার ছোট্ট লকেট তার হাতের মুঠোয়। অমন নিরীহ খেলার সঙ্গী সত্যিই দুর্লভ। কুটুনের সেসময় ভীম-পুতুলের হাত চিবোনোর এমন নেশা হয়েছিল যে মাঝেমধ্যে তার বাবার হাতও মুখে পুরে চিবোনোর চেষ্টা করত।

সংসারের প্রথম অতিথি ব'লে অবশ্য ভীমকে একটু বেশিই অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। বাকিদের অতটা সইতে হয়নি। কেবল একটা ন্যাড়া বাচ্চা-পুতুল, সম্ভবত বড়পিসির কাছে পাওয়া, সেটাকে শোওয়ালে চোখ বন্ধ করত, আর চড়-চাপড় মারলে পুতুলটার ভেতর থেকে কান্নাকাটির আওয়াজ বেরোত, তাকে হাতে পেয়েই কুটুন অতিরিক্ত উৎসুক হয়ে পড়েছিল। ঐ কান্নার আওয়াজ্টাই ছিল আসক্তির মূল কারণ। বাকিদের মাটিতে আছড়ে ফেললেও টুঁ শব্দটি করে না, এর মধ্যে এমন কি আছে যে আলতো টোকা মারলেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে? ব্যস, কুটুন অমনি গোয়েন্দা গণ্ডালু-র পাঁচ নম্বর সভ্য হয়ে লেগে পড়ল কান্না-রহস্য উদ্ধারে। দিনদুয়েকের মধ্যে ন্যাড়া-পুতুলের ধড়-মুড়ো আলাদা করে তার তোয়ালে-জামার দূর্গ ভেদ করে ব্যাটারিসমেত 'কান্নার'-র উৎসকে উদ্ধার করে সে এনে দিল তার দাদুর হাতে। মেয়ের সাফল্যে গর্বিত হওয়া উচিত, নাকি অত সুন্দর ধবধবে সাদা পু্তুলটার এই দশা দেখে রাগে দাঁত কিড়মিড় করা উচিত, মা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ঠাকুমা অবশ্য ন্যাড়ার ঘাড় সেলাই করে ধড়ে জোড়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ততদিনে মেয়ের মন অন্য পুতুলের কাছে চলে গেছে।

মাঝে আবার সোনালি চুল-লাল জামা এক মেম পুতুল হাজির হয়েছিল। কুটুনের মা নামকরণ করতে ভারি ভালবাসেন তো, মেমকে 'রোজি' বা ঐ জাতীয় একটা নামও দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু রোজির চুল চিবোনো এবং তার জামা থেকে চুমকি খুলে নেওয়াতে মেয়ের এত উৎসাহ দেখা গেল, যে মা যথারীতি ভয়-টয় পেয়ে রোজি-কে প্যাকেটে মুড়ে শোকেসে সাজিয়ে রাখলেন। আজও সে তেমনিই আছে।

রোজি-র একটা হলদে সংস্করণ, নাম ডলি, তাকে কুটুন পেয়েছিল মামারবাড়িতে, এক ইস্কুলতুতো মাসীমণি (মায়ের স্কুলবেলার বান্ধবীকে এছাড়া আর কি বলা যায়?) ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলেন। অদ্ভুত কাণ্ড, ডলিকে নিত্যি চান করানো, পাউডার মাখানো-এসব চললেও তার চুল বা জামার চুমকির দিকে কিন্তু কুটুন ফিরেও তাকায়নি।

একবার এক ঝলমলে দোকান থেকে মা শখ করে মেয়ের জন্য একবাক্স খেলনা কিনে আনলেন। ডজনদুয়েক খেলনাকুচি নাকি এলোমেলো হয়ে আছে বাক্সের ভেতর, বুদ্ধি খাটিয়ে তাদের জড়ো করে সাজিয়ে গুছিয়ে খামারবাড়ি বানাতে হবে। ভালো কথা, মা ভাবলেন, এবার তবে দু'বছরের মেয়েকে এক জায়গায় চুপটি করে বসিয়ে রাখার, আর সেইসঙ্গে তার বুদ্ধি পাকানোর মজবুত সরঞ্জাম পাওয়া গেল। তা, বাক্স তো খোলা হল। ভেতর থেকে রং-বেরং-এর প্লাস্টিকের ব্লক (খামারবাড়িতে এরা কোন্‌ কাজে লাগে মা আজও ভেবে পান নি), দু-চারখানা প্লাস্টিকের পশুপাখি, একটা লতানে গাছ, কোদাল-হাতে একটি ছোট্ট পুতুল (কুটুনের কোদাল-দাদা), এরা বেরিয়ে এল। তারপর থেকে মাসখানেক সন্ধ্যেবেলায় কুটুনদের বাড়ি গেলে দেখা যেত কুটুনের মা ঘরের মাঝখানে বসে খামারবাড়ি তৈরির চেষ্টায় মগ্ন, আর কুটুন "এ-এ-ই-ই তুম্মো (কুমড়ো), এ-ই-ই হাম্বা (গোরু), এ-এ-ই কোদাল-দাদা" ব'লে সেগুলোকে সোল্লাসে ছুঁড়ে ঘরের বিভিন্ন কোণায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। চোখের আড়াল হলে আবার আকুল কণ্ঠে তাদের ডাকাডাকিও চলছে, যেন "তুম্মো" ডাক শুনেই কুমড়ো দৌড়ে এসে কুটুনের কোলে উঠবে!

এভাবেই কুটুনের বয়স বাড়তে থাকে। তার সংসারেও নতুন সদস্যরা ভর্তি হয়। কুটুন তাদের নাওয়ায়, খাওয়ায়, তেল মাখায়, ঘুম পাড়ায়। মাঝেমধ্যে কোলে-কাঁখে-সাইকেলে চড়িয়ে পাড়া বেরোতেও বেরোয়। এখন যদি তার ঝুড়িতে উঁকি দাও, দেখবে কমলা রঙের কাঠবিড়ালি, গোলাপি রঙের একদম এক রকম দেখতে তিনটে তিনরকম সাইজের টেডি, তাদের সবারই নাম পিঙ্কু, দু'দিকে বিনুনি বাঁধা পুতুল রিনিচিনি, সে সারাদিন পা ছড়িয়ে বসে থাকে (এটিও এক মাসীমণির কাছে পাওয়া), একদিন তেল মাখানোর সময় কুটুন রিনিচিনির জামা খুলে ফেলেছিল, তারপর থেকে সেই জামা দিয়ে ঘর মোছা হয় (এটি মেয়ের বড় প্রিয় কাজ)। আর আছে ছুটকি, যার হাত ধরে নেচে নেচে ছড়া বলা, কিংবা নিজের ভাষায় "অ্যাই, চোখ মোছো, একদম কাঁদবে না" ব'লে ধমক দেওয়া, সবই চলতে থাকে।

একেকদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির বৈঠকখানায় ঝুড়ি-বাড়ির পড়ুয়াদের নিয়ে কুটুনের ক্লাস বসে। মা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখেন কাঁচ দিয়ে বাঁধানো শখের সেণ্টার টেবিলের ওপর উঠে বসে তাঁর সাধের কন্যে হাত-পা নেড়ে পড়ুয়াদের ছড়া মুখস্থ করাচ্ছে।।