Saturday, 8 April 2017

সিনেমার গল্প

গৌতম ঘোষের 'দেখা  ' দেখছিলাম সেদিন,  ট্রেনে যেতে যেতে, সদ্য আলাপ হওয়া সহযাত্রিণীর মুঠোফোনে. অন্যের ফোনে উঁকি দেওয়া খুব একটা ভাল স্বভাব নয় জানি, কিন্তু বাংলা সংলাপ শুনে চোখ কান দুই -ই ধেয়ে যাচ্ছিল ফোনের পানে।

এটা আমার ছোটবেলার অভ্যেস. ট্রেনে কিছু করার না থাকলেই পাশের জনের দিকে নজর যাবে, তার হাতে যদি গল্পের বই থাকে তো ঘাড় বাড়িয়ে তার সঙ্গে আমিও পড়তে শুরু করব, খোলা পাতাটা হুড়োহুড়ি করে শেষ করে উদাস মুখে বসে থাকব সে কখন পাতা উল্টে পরের পাতায় যাবে, হাত নিশপিশ করবে নিজেই পাতা উল্টে নেওয়ার জন্যে. এভাবে নাম না জানা বহু বই শেষ না হতেই ট্রেন থেকে নামার সময় হয়ে গেছে অনেকবার. 

বই পড়ার বদলে যদি কেউ বাংলা ছবি দেখে, তাহলেও একই কাজ করে ফেলি. প্রথমে আড়চোখে, তারপর গলা বাড়িয়ে দেখতে বসে যাই. এইদিনও তেমন হয়েছিল.

ছবিতে এক জায়গায় দেখলাম ছোট্ট একটা ছেলেকে "শশী -দা" বিনে পয়সার বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন. মনটা হইহই করে উঠল. আরে! এ তো আমার বহুকালের চেনা জিনিস!

টিভিতে সিনেমা দেখা যায়, একথা জানার আগে থেকেই জানতাম রাত্তিরবেলায় অন্ধকার ঘরের দেওয়ালে সিনেমা দেখা যায়. আমাদের মামারবাড়ি একদম বড় রাস্তার ধারেই. ভোর থেকে মাঝরাত, সর্বক্ষণ রাস্তায় গাড়ির সারি, হর্ণের আওয়াজে বাড়ির লোক অতিষ্ঠ. আমার কিন্তু বেশ লাগত. আমাদের বাড়িটা আবার ছিল একটু গলির ভেতরে, সারাদিনে গাড়ি -টাড়ি দেখার সুযোগ বিশেষ হত না. তাই মামারবাড়ি গেলে বারান্দা ছেড়ে নড়তে চাইতাম না.
সবচেয়ে মজা হত একটু রাত্তির হলে যখন ভারী ভারী ট্রাক -ট্রেলার গুলো যেত রাস্তা দিয়ে, প্রায় একশো বছরের পুরনো বাড়িটার গায়ে হাল্কা একটা কাঁপুনি ধরত, সেই কাঁপুনি চারিয়ে যেত মা বা দিদার পাশে শুয়ে থাকা আমার মধ্যেও. কাঁপছি না, অথচ পিঠের নিচে একটা গুড়গুড় করা ভাব, ভূমিকম্পের সময়েও কি এমনটাই হয়? জিজ্ঞেস করে বকুনিও খেয়েছি বারকয়েক. ওনারা দু 'তিনবারের ভূমিকম্পের সাক্ষী, রাতবিরেতে ওসব কথা ওনাদের ভাল লাগবে কেন?

এই ভারী ট্রাকগুলো যখন ছুটে যেত, দেখতাম ঘরের দেওয়ালেও একদিক থেকে আরেকদিকে সাঁ করে একটা ছায়া সরে গেল. প্রথমে ভাল বুঝতাম না, ভয় করত কিনা মনে নেই, সম্ভবত অজানাকে ভয় পাওয়ার মত বড় তখনো হইনি. ওইসব ছায়াগুলো যে সিনেমা, এই তত্ত্ব-টাই বা কে বুঝিয়েছিল সেটাও মনে নেই. তবে যেই বুঝলাম যে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেলেই দেওয়ালে আলো -ছায়াদের দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, আর গাড়ির আওয়াজ মিলিয়ে গেলেই দেওয়ালে এসে পড়া রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টের আলো আবার শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, অমনি আমাদের নতুন খেলা শুরু হয়ে গিয়েছিল.

ঘুম আসার আগে অব্দি রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেলেই "এই... আসছে আসছে" বলে বোনেরা ঠেলাঠেলি শুরু করতাম, একলা শুলে নিজেকে ঠেলতাম. "এই -ই-ই যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে.... যা:, চলে গেল", "আবার আসবে দাঁড়া না", এরকম কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত থামত মা, মাসিমণি বা দিদাদের কারো ধমকে.

একটু বড় হওয়ার পরে খেলাটা কিছুটা পাল্টাল. তখন সরে যাওয়া সিনেমার আলো দেখে বোঝার চেষ্টা চলত গাড়ির চরিত্র কেমন. চার চাকা না আট চাকা, গাড়ির মাথায় মাল বোঝাই নাকি অতটা ভার নেই, এমন নানা তথ্য পাওয়ার জন্য কসরত হত. অত কাণ্ড না করে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তা না, এ যেন সিনেমা দেখতে বসে নামের লিস্টি না দেখে মেক-আপের আড়াল থেকে আসল মানুষটাকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা!

মাঝেমধ্যে গুনতাম কে ক 'টা গাড়ির তৈরি সিনেমা দেখলাম. এই গুনতি করার সুবিধেটা হল ঠিক কোন সময়ে ঘুমটা এসে পড়ল সেটার একটা আবছা হিসেব পাওয়া যায়. বেশ "কাল পাঁচটা গাড়ি যাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছি, আজ দেখি একই সময়ে ঘুম আসে কিনা" এরকম একটা হিসেব. আপেক্ষিকতার মত ঝামেলার বস্তু ভাগ্যিস তখন জানা ছিল না!

তো, এই হল সিনেমার গল্প. বছর কুড়ি  -পঁচিশ আগে গল্পের শুরু. জানিনা এখনও এমন সিনেমার গল্প তৈরি হয় কিনা. নিশ্চয়ই হয়. অবাক হওয়ার অভ্যেস তো আজও আছে. এখনও শোওয়ার ঘরে রাস্তার আলো এসে পড়ে. গাড়ির আওয়াজে আলো -ছায়ার ছুটোছুটি এখনো চলে.
 "ওটা কি মা? এদিক থেকে ওদিকে চলে গেল?" প্রশ্নটা কারো মনে আসে কিনা তারই অপেক্ষা এখন!

Wednesday, 29 March 2017

অলিম্পিক? ওদের?

মার্চের চোদ্দ থেকে পঁচিশ তারিখে অস্ট্রিয়াতে বসেছিল বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষদের অলিম্পিকের শীতকালীন আসর. সম্প্রতি ইণ্টারনেটে এসম্পর্কে খুব ছোট্ট একটা খবর চোখে পড়েছিল. ভারতীয় দল (Special Olympics Bharat) নাকি সেখানে তিয়াত্তরটি পদক জিতেছে! তার মধ্যে আবার সাঁইতিরিশটা সোনা!

 ভাবলাম আরেকটু খুঁজি. কম বড় কৃতিত্ব তো নয়, নিশ্চয়ই ভারতীয় মিডিয়া বিস্তারিত খবর জানাবে সাধারণ মানুষকে. 

আমার উদ্দেশ্য অবশ্য বিশেষ মহান ছিল না. মাসকয়েক হল একটা ছোটদের পত্রিকার সন্ধান পেয়েছি, তার সম্পাদকের কাছে নিজের বেশ ভারিক্কি একখানা ইমেজ খাড়া করেছি ভাল ভাল কথা ব'লে, এখন একখানা লেখা না পাঠালে মান থাকে নাকি! ভাবলাম এ খবর তো মন্দ নয়, দু 'চারটে খবরের কাগজ ঘেঁটে দু 'পাতার রচনা লিখে পাঠিয়ে দিলেই হল. লেখা পাঠিয়ে মানরক্ষাও হবে, আবার 'দ্যাখো আমি কেমন দরদী মানুষ, সব দিকে লক্ষ্য রাখি ' একথা বেশ ঘটা করে সবাইকে জানানোও যাবে!

সারাদিন খেটেখুটে নেট ঘেঁটেও একটা খবরের কাগজের আধপাতা রিপোর্ট ছাড়া আর কিচ্ছুটি পেলাম না. পরেরদিন আবার খুঁজতে বসলাম. ততদিনে গেমস শেষ, খেলোয়াড়দের ঘরে ফেরার পালা এবার. ভাবলাম এতগুলো মেডেল নিয়ে সোনার ছেলেমেয়েরা দেশে ফিরছে, ছবিসহ না হলেও খবরটা অন্তত ছাপা হবে. 
দুটো কি তিনটে খবরের খোঁজ পাওয়া গেল নেটে. কয়েক লাইনের খবর. যা খুঁজছিলাম সেভাবে পেলাম না.

একটি দৈনিকের খেলার পাতায় ছবি পাওয়া গেল মেরি কম, সাইনা নেহাওয়াল প্রমুখ ক্রীড়াবিদদের, ওনারা নাকি কোনো এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অলিম্পিকের পদকজয়ীদের সংবর্ধনা দিতে এসেছিলেন. রিপোর্টে মেরি কমের আবার রিং -এ ফেরার ইচ্ছে ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু কথা পাওয়া গেল, কিন্তু স্পেশাল অলিম্পিক ভারতের 73 টি পদকজয়ের ব্যাপারে পাওয়া গেল কেবল একটি বাক্য. ছবির তো প্রশ্নই ওঠে না.

 হ্যাঁ, মানছি, পদকজয়ীদের সংবর্ধনার ছবি ছাপতে হলে হয় সে ছবির অর্ধেক জুড়ে থাকত কতগুলো ক্রাচ কিংবা হুইলচেয়ার, নয়ত চোখেমুখে তথাকথিত মেধা বা সৌন্দর্য কোনোটারই ছাপ না থাকা কতগুলো মুখ. তবে কিনা সেই মানুষগুলো বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছেশক্তি দিয়ে, কখনো কখনো নিজের শারীরিক ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েও 105 টা দেশের প্রায় 2600 মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যখন সাঁইতিরিশটা সোনা, দশটা রূপো আর ছাব্বিশটা ব্রোঞ্জ নিয়ে ঘরে ফেরে, তখন তাদের কথা জানা আর তাদের চেনাটা দেশের মানুষের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে. হ্যাঁ, এই চিনতে চাওয়াটাও একরকমের দেশপ্রেম.

দিনতিনেকের খোঁজাখুঁজির পর কিছু তথ্য পেয়েছি. হয়ত আমারই অক্ষমতা, সেভাবে মন দিয়ে চোখকান খুলে রাখলে হয়ত আরো আগে আরো বেশি তথ্য পাওয়া যেত. যাইহোক, এটুকু সম্বল করেই আপাতত এগোনোর চেষ্টা করি, আশা থাকুক আগামীতে নিশ্চয়ই দেশপ্রেমিক দেশবাসী সঞ্জয় কুমার, শিখা রানিদের একডাকে চিনবে. কি, আসবে তেমন কোনো দিন?


তথ্যসূত্র: www.specialolympics.org
              www.financialexpress.com

(লেখার মতামত সম্পূর্ণ আমার নিজের. কোনো কথা কাউকে আঘাত দিয়ে থাকলে আমি তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী. তথ্যে কোনো ত্রুটি থাকলে জানানোর অনুরোধ করছি.)


Friday, 10 March 2017

"কবে ছেল?"

ঘটনাটা শুনেছিলাম আমার ছোড়দিদার কাছে।
কোনো এক গরমকালের বিকেল, দিদা গাছে জল দেওয়া সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়েছেন দু 'দণ্ড জিরোবেন ব 'লে।  আমার মামারবাড়ি ছিল একেবারে বড়রাস্তার ধারেই। অলস দুপুর সবে আড়মোড়া ভেঙ্গে গুটিগুটি পায়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে, বড়রাস্তায় গাড়ির চলাচল বাড়ছে একটু একটু, বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে নিচের ফুটপাতের ফলওয়ালা তার পসরায় আঁজলা করে খানিকটা জল ছিটিয়ে দিল, যে জুতো - ছাতা -সারাইওয়ালা ঠা -ঠা রোদ্দুরে  বসে না থেকে 103 নম্বরের রোয়াকে গিয়ে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিল এতক্ষণ, সে আবার নিজের জায়গায় এসে জুতো সারানোর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখছে। ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা এরকমই নানা ছবি ছোড়দিদা দেখছিলেন কিছুটা মন দিয়ে, বাকিটা আনমনে।
হঠাৎ চোখ পড়ল নিচে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসা এক মাঝবয়সী মহিলার দিকে। পাড়াতেই কিছু বাড়িতে রোজের বাসনমাজা - ঘরমোছার কাজ করে সে। তার মা করত এক সময়, মেয়েও করেছে বিয়ের আগে কদিন, ছেলেপুলেসমেত বর যবে এবাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গেল, তবে থেকে সেসব বাড়ির ঠিকে কাজের ভার পাকাপাকিভাবে মেয়ের হাতে। রোজ বিকেলে এই সময়টায় সে হাতের শাঁখাপলা আর লোহায় ঝোলানো সেফটিপিন ঝমঝমিয়ে কাজের বাড়ির দিকে হেঁটে যায়।  কালোকোলো চেহারায় সিঁথির সিঁদুর বেশ খোলতাই হয়। কিন্তু আজ চেহারাটা এমন ম্যাড়ম্যাড়ে কেন? ভাল করে নজর করতেই দিদা চমকে উঠলেন। আহা রে! সিঁথিটা আজ একদম খালি যে! হাতগুলোও ন্যাড়া, শাঁখাপলা নোয়া উধাও! পরনের কাপড়টাও সাদাটে।   ওইজন্যই বউটাকে ক 'দিন দেখা যায়নি। দিদা শুনেছিলেন, মনে ছিল না। মনটা একটু ভারি হয়ে গেল।  শাঁখায় সিঁদুরে চেহারাটা বেশ লাগত।
বউটা অবশ্য রোজের মতই কাপড়ের কুঁচিটাকে পায়ের গোছের একটু ওপরে তুলে হেঁটে আসছিল, পথ আগলালো ওর মতোই আরেকজন। সে -ও বাড়ি বাড়ি ঠিকে কাজ করে। আগের জনের নতুন বেশ সে বোধহয় আজকেই দেখল, খবরটা পায়নি আগে। গালে হাত দিয়ে একটুক্ষণ বান্ধবীকে দেখে সে শুধোলো,
 "কবে গেল?"
সদ্যবিধবা বান্ধবীটি হাত উল্টে নিস্পৃহ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
"কবে ছেলো?"
বলে কাপড়ের কুঁচিটাকে আবার পায়ের গোছের ওপর তুলে হেঁটে চলল কাজের বাড়ির দিকে।


Tuesday, 14 February 2017

চল্‌ যাব তোকে নিয়ে



দিন গুলো চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে কি তোমায়? একছুট্টে কোথাও পালিয়ে গিয়ে দিনকতক ঘাপটি মেরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে কি? চলো তাহলে, সেরে আসি একটা ছোট্ট সফর।

কি বলছ? ছুটি নেওয়া অসম্ভব? আরে না মশাই, ছুটি নিতে বলছে কে? শুধু ছুটি কেন, টিকিট, ব্যাগ, ক্যামেরা, জলের বোতল, রোদ্দুর আড়াল করার টুপি, নিজেকে আড়াল করার রোদচশমা—কিচ্ছুটি সঙ্গে নেওয়ার দরকার নেই। এমনকি, যাদের সঙ্গে তোমার সারাদিনের কিচির-মিচির চলে, তাদেরও কাউকে ডেকো না। বেরিয়ে পড়ো শুদ্ধু নিজেকে নিয়ে, শুদ্ধ নিজেকে নিয়ে।

ভাবছ, এমন ঝাড়া-হাত-পা হয়ে যাবে কোথায়? আহা, নিজের মনটাকে একটু ভরসা করোই না বাপু! বলি কি, একদিন একটু কষ্ট করে ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে পড়ো। বসন্ত তো এসেই গেছে, ভোররাতে বিছানা ছাড়তে বুকে আর অতটা কাঁপন ধরবে না এখন। চোখ কচলে উঠোনে এসে কুস্‌মি-লাল সূর্যটার ঘুম-ভাঙ্গা হাসি গায়ে মেখে ঝুপ করে একখানা ডুব দাও মনের গহীনে। ডুব দিয়েই দ্যাখো না একবার, কাছেপিঠে একখানা জঙ্গল পাবেই পাবে। সেই তেমন জঙ্গল, যেখানে হাতে তৈরি রাস্তার থাকতে মানা, সার বেঁধে দাঁড়িয়ে গালগল্প করতে থাকা গাছেদের পাশ দিয়ে কারা যেন হেঁটে গিয়ে তৈরি করে দিয়েছে পায়ে-চলা পথ, সে পথ এমনিতে ঢেকে থাকে গাছেদের ঝরানো পাতায়, কেবল তুমি আসবে বলেই আজ হাওয়া এসে পাতা সরিয়ে সে পথকে মেলে ধরেছে তোমার পায়ের সামনে। চলো, এগিয়ে চলো, পায়ের নীচে ঝরা পাতা-রা তোমারই ভুলে মচ-মচ আওয়াজে ধুলো হয়ে যাচ্ছে, “সর্‌-সর্‌” আওয়াজ তুলে সাবধানী হাওয়া কিছু অবাধ্য পাতাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার গাছ-মায়ের কাছে,এসবের মাঝ দিয়ে তুমি হেঁটে চলো।

কখনো যদি মনে হয়, কেউ বুঝি পিছু পিছু হেঁটে আসছে, উতলা হয়োনা। আসলে আর কেউ নেই,এখানে কেউ পিছু নেয় না। ও তোমারই পায়ের শব্দ। নিজের পায়ের আওয়াজ তেমনভাবে রোজ শোনা হয় না কিনা, তাই চিনতে পারছিলে না। এবার দু’পাশে তাকিয়ে দেখো, তুমি এসেছ ব’লে এরা সব কত্ত খুশি। ডাল-পাতা-পত্তর মেলে দিয়ে সবাই কেমন দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে তোমায়! আহা, যাও, ওদের কারো পায়ের কাছটায় দু’দণ্ড বোসো, শুনবে ওরা হাসতে হাসতে বলছে, “বাব্বাঃ! শেষ পর্যন্ত ঠিকানা খুঁজে এলি তাহলে! পুরোটা যে আসতে পারবি, ভাবিইনি কখনো!”

কারো কারো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আবার দেখবে তোমার গায়ে টুপ-টুপ করে ঝরে পড়ছে দু’চার ফোঁটা জল। রাতের পুরনো শিশির ভেবে মুছে ফেলো না যেন! এরা আনন্দাশ্রু। তুমি যে নিজেকে সঙ্গে করে এসেছ ওদের কাছে, তাই আজ আনন্দ বাঁধ মানছে না।

নিজের সঙ্গে শেষ কবে একলা হয়েছ, তলিয়ে ভাবো যদি, দেখবে তোমারও দু’চোখের কোণ ভিজে উঠছে।

খুব বেশি সময় তো হাতে নেই, চোখ মুছে এগিয়ে চলো আরও। একটু পরে জঙ্গল শেষ হয়ে আসবে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখবে পায়ে-চলা রাস্তাটা ঢালু হয়ে গিয়ে নেমেছে এক তিরতিরে নদীর কোলে। ভারি রোগা আর মিষ্টি সে। হাত নেড়ে তোমায় কাছে ডাকছে আর কলকল করে কত কথা বলছে। সে ভাষা বোঝা তোমার কম্ম নয়, তবে তার জলে পা ডোবাও, দেখবে তোমার এতবছরের জমে ওঠা ক্লান্তি, অভিমান সে কেমন শুষে নিচ্ছে, আর তার আলতো হাওয়া তোমার এলোমেলো চুলে কেমন বিলি কেটে দু’চোখে ঘুম এনে দিচ্ছে। অনেকদিন আগে কে যেন এভাবেই তোমার চোখে ঘুম এনে দিত না? তার হলুদমাখা আটপৌরে আঁচল তোমার ক্লান্তি মুছিয়ে দিত না এইভাবেই?

ওহো, বলতে ভুলে গিয়েছি, নদীর পাড়ে নামার রাস্তাটা কিন্তু একটু পিচ্ছিল। অবশ্য তোমায় তো রোজ এর চেয়ে অনেক বেশি পিছল রাস্তায় চলাফেরা করতে হয়। অভ্যেস হয়ে গেছে নিশ্চয়ই এতদিনে!

অমন সুন্দর নদী, তার জলে নিজেকে না ধুলে চলে নাকি? নেমে পড়ো নদীর কোলে। এতদিন ধরে যত ছাল-বাকল-মুখোশ-চাদর গায়ে জড়িয়েছ, সেসব খুলে পরিপাটি ভাঁজ করে শুকনো ডাঙ্গায় রেখে তবেই জলে নেমো কিন্তু! জঙ্গলের চৌকাঠ পেরিয়ে এপাশে আসার আগেই আবার ধরাচূড়ো পরে ফেলতে হবে। নইলে যে চেনা মানুষেরও সাধ্যি হবে না তোমায় চেনার। 

নাও, এবার বয়ে চলা নদীর জলে নিজেকে বেশ করে ঘষেমেজে ধুয়ে নাও। নিজেকে নিয়ে যা কিছু ধন্দ আছে মনের খাঁজে, দূর করে দাও সব। সূর্যের আলোয় নদীর আয়নায় নিজেকে দেখে নাও ভালো ক’রে। নিজের যা-কিছু সাদা, যা-কিছু কালো, সেসব মিলিয়ে মিশিয়ে তুমি ধূসর, নাকি তুমি রঙিন, সে দ্বন্দ্বের মীমাংসা আজকেই করে নাও। একবার এপাশে এসে পড়লে আর সুযোগ মিলবে না। রঙিন আলোয় নিজেকে দেখতে দেখতে নিজের আসল রঙখানাই ভুলে যাবে দিনে দিনে।

এবার তো ফিরতে হবে, নিজেকে গুছিয়ে নাও। সেই যাদের সঙ্গে তোমার দিন যাপন, তাদের কেউ এখনও চায়ের কাপ হাতে তোমার অপেক্ষায়, কেউ একটু পরেই বাসস্ট্যাণ্ডে এসে তোমায় খুঁজবে, কেউ-বা অফিসের করিডর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে উঁকি দিয়ে দেখে যাবে তুমি চেয়ারে বসে নিজের কাজে মগ্ন কিনা। এদের জন্যই সফর শেষ করে ফিরতে হবে তোমায়।

মন খারাপ কোরো না। ঠিকানা তো রইলোই। যখন-তখন, ইচ্ছে হলেই ঘুরে এসো। তোমার সঙ্গে থাকা ওদেরও দিয়ো ঠিকানাটা। হয়ত ওরাও কেউ হঠাৎ কোনোদিন পৌঁছে যাবে সেই নদীটার কাছে, আর গলা মেলাবে নদীর কাছে রেখে আসা তোমার গানের সাথে,
“বাহিরে নয় বাহিরে নয়                  ভিতরে জলে ভাসতে বলো
আমায় ভালবাসতে বলো               ভীষণ ভালবাসতে বলো”।।
  

Tuesday, 7 February 2017

কুটুনের পুষ্যিপুতুল-রা

আজকের গল্পের শুরু বছর দুয়েক আগে। কুটুন যখন নেহাৎ সাত মাসের খুকী ছিল, এ তখনকার কথা। তার প্রথম লেজুড়টি হাজির হয়েছিল মুখেভাতের দিনে। আজ একটা মস্ত ঝুড়ি জুড়ে তার যেসব নিষ্প্রাণ সাঙ্গোপাঙ্গো-রা খোশমেজাজে দিন কাটান, সেদিনেই ছিল তাঁদের আনাগোনার শুরু। সেদিনের আগে তাকে কেউ কোনো পুতুল কিনে দেয়নি গো, না বাবা-মা, না অন্য কেউ। মায়ের চশমা হোক কিংবা পেন-ড্রাইভ, বাবার মোজা হোক কিংবা দাদুর বাজারের থলে, সবকিছুকেই সে দিব্যি নিজের খেলনা ভেবে আপন করে নিয়ে মুখে পুরতো। তাইতেই বিরক্ত হয়ে মা আর পুতুল কেনার হাঙ্গামায় যাননি। পুতুলের গা থেকে একখাবলা লোম কিংবা একখানা চোখ তুলে নিয়ে মেয়ে যদি গিলে ফেলে? ওনাকেই তো তখন ডাক্তার-বদ্যির কাছে দৌড়তে হবে!

অবশ্য খাটের ওপর দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা অতি বিচ্ছিরি টর্‌-টর্‌ আওয়াজ করা একটা রং-বেরং-এর ঘুরুন্তি ছিল, আর ছিল দু-তিনটে বল। ওসব কি আর চিবোনো যায়? নাকি চেটে সাফ করা যায়? হ্যাঁ, কে যেন একবার নীলচেমতন একটা পুতুল এনে দিয়েছিল,ইয়াব্বড় হাঁ-মুখ তার, তখন নাম জানত না, এখন জেনেছে, ডোরেমন, তার গায়ে লাগানো চাবি ঘোরালে সে আবার নানান ভঙ্গিতে আছাড়ি-পিছাড়ি খেতো, তা দেখে সেই পাঁচ মাস বয়সেই হাসতে হাসতে কুটুনের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে পড়ত। এখনও রয়েছে সেটা। অত ভালো আছাড় খায় না বটে আর, তবে সেটার মুণ্ডুখানা মুখে পুরে কিছুক্ষণ বসে ভাবলে নানা জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যায় (কারো কারো যেমন বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিলে বেশ বুদ্ধি খোলে, তেমনই কিছু বোধহয়)।

মুখেভাতের দিনের কথায় আসা যাক এবার। সেদিন এক পাড়াতুতো ঠাকুমা কুটুনের হাতে তুলে দিলেন কপালে তিলকধারী, মাথায়-টিকি ও হাতে-লাড্ডু একখানি পুতুল, ছোটা ভীম। সে-ই তার পুতুল-পরিবারের প্রথম মানুষ। কচি মাথার কাঁচা বুদ্ধিতে অবশ্য কুটুন তাকে নিজের শত্তুর ঠাউরেছিল, কেননা, সারা সন্ধ্যে সেটাকে দেখে রে-রে করে তেড়ে যাচ্ছিল, আর নাগালে পেলেই সেটার টিকি ধরে টান মারছিল। মা দেখলেন বেগতিক, নতুন পুতুল বুঝি আজই মারা পড়ল, তিনি সন্তর্পণে সেটিকে কোঁচড়ে গুঁজে আলমারিতে লুকিয়ে ফেললেন।

বড়রা এসব দেখলেই বলবে, "পুতুল কি তুলে রাখার জন্যে? দে না মেয়েটার হাতে, যা করছে করুক", ইত্যাদি,
তাই মা চুপিচুপি কাজ সেরে এসে শান্ত হয়ে মেয়েকে দুধ খাওয়াতে বসলেন। অমন সুন্দর নতুন পুতুলটাকে প্রথম দিনেই এলোমেলো করে দিলে ভালো লাগে নাকি?

হপ্তাখানেক পর মেয়ের বুদ্ধি আরো খানিক পাকলে সে পুতুলকে আবার জনসমক্ষে আনা হল। তদ্দিনে কুটুনের জ্ঞানগম্যি কিছুটা বেড়েছে, কাজকর্ম না থাকলে দিব্যি পেটের ওপর পুতুলটাকে শুইয়ে রেখে আয়েস করে তার টিকি কিংবা হাতে ধরা লাড্ডু চিবোয়। একদিন দেখা গেল সেই লাড্ডু ভীমের হাতের মায়া কাটিয়ে কুটুনের মুখের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এবং ভীমের গলার ছোট্ট লকেট তার হাতের মুঠোয়। অমন নিরীহ খেলার সঙ্গী সত্যিই দুর্লভ। কুটুনের সেসময় ভীম-পুতুলের হাত চিবোনোর এমন নেশা হয়েছিল যে মাঝেমধ্যে তার বাবার হাতও মুখে পুরে চিবোনোর চেষ্টা করত।

সংসারের প্রথম অতিথি ব'লে অবশ্য ভীমকে একটু বেশিই অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। বাকিদের অতটা সইতে হয়নি। কেবল একটা ন্যাড়া বাচ্চা-পুতুল, সম্ভবত বড়পিসির কাছে পাওয়া, সেটাকে শোওয়ালে চোখ বন্ধ করত, আর চড়-চাপড় মারলে পুতুলটার ভেতর থেকে কান্নাকাটির আওয়াজ বেরোত, তাকে হাতে পেয়েই কুটুন অতিরিক্ত উৎসুক হয়ে পড়েছিল। ঐ কান্নার আওয়াজ্টাই ছিল আসক্তির মূল কারণ। বাকিদের মাটিতে আছড়ে ফেললেও টুঁ শব্দটি করে না, এর মধ্যে এমন কি আছে যে আলতো টোকা মারলেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করে? ব্যস, কুটুন অমনি গোয়েন্দা গণ্ডালু-র পাঁচ নম্বর সভ্য হয়ে লেগে পড়ল কান্না-রহস্য উদ্ধারে। দিনদুয়েকের মধ্যে ন্যাড়া-পুতুলের ধড়-মুড়ো আলাদা করে তার তোয়ালে-জামার দূর্গ ভেদ করে ব্যাটারিসমেত 'কান্নার'-র উৎসকে উদ্ধার করে সে এনে দিল তার দাদুর হাতে। মেয়ের সাফল্যে গর্বিত হওয়া উচিত, নাকি অত সুন্দর ধবধবে সাদা পু্তুলটার এই দশা দেখে রাগে দাঁত কিড়মিড় করা উচিত, মা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ঠাকুমা অবশ্য ন্যাড়ার ঘাড় সেলাই করে ধড়ে জোড়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ততদিনে মেয়ের মন অন্য পুতুলের কাছে চলে গেছে।

মাঝে আবার সোনালি চুল-লাল জামা এক মেম পুতুল হাজির হয়েছিল। কুটুনের মা নামকরণ করতে ভারি ভালবাসেন তো, মেমকে 'রোজি' বা ঐ জাতীয় একটা নামও দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু রোজির চুল চিবোনো এবং তার জামা থেকে চুমকি খুলে নেওয়াতে মেয়ের এত উৎসাহ দেখা গেল, যে মা যথারীতি ভয়-টয় পেয়ে রোজি-কে প্যাকেটে মুড়ে শোকেসে সাজিয়ে রাখলেন। আজও সে তেমনিই আছে।

রোজি-র একটা হলদে সংস্করণ, নাম ডলি, তাকে কুটুন পেয়েছিল মামারবাড়িতে, এক ইস্কুলতুতো মাসীমণি (মায়ের স্কুলবেলার বান্ধবীকে এছাড়া আর কি বলা যায়?) ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলেন। অদ্ভুত কাণ্ড, ডলিকে নিত্যি চান করানো, পাউডার মাখানো-এসব চললেও তার চুল বা জামার চুমকির দিকে কিন্তু কুটুন ফিরেও তাকায়নি।

একবার এক ঝলমলে দোকান থেকে মা শখ করে মেয়ের জন্য একবাক্স খেলনা কিনে আনলেন। ডজনদুয়েক খেলনাকুচি নাকি এলোমেলো হয়ে আছে বাক্সের ভেতর, বুদ্ধি খাটিয়ে তাদের জড়ো করে সাজিয়ে গুছিয়ে খামারবাড়ি বানাতে হবে। ভালো কথা, মা ভাবলেন, এবার তবে দু'বছরের মেয়েকে এক জায়গায় চুপটি করে বসিয়ে রাখার, আর সেইসঙ্গে তার বুদ্ধি পাকানোর মজবুত সরঞ্জাম পাওয়া গেল। তা, বাক্স তো খোলা হল। ভেতর থেকে রং-বেরং-এর প্লাস্টিকের ব্লক (খামারবাড়িতে এরা কোন্‌ কাজে লাগে মা আজও ভেবে পান নি), দু-চারখানা প্লাস্টিকের পশুপাখি, একটা লতানে গাছ, কোদাল-হাতে একটি ছোট্ট পুতুল (কুটুনের কোদাল-দাদা), এরা বেরিয়ে এল। তারপর থেকে মাসখানেক সন্ধ্যেবেলায় কুটুনদের বাড়ি গেলে দেখা যেত কুটুনের মা ঘরের মাঝখানে বসে খামারবাড়ি তৈরির চেষ্টায় মগ্ন, আর কুটুন "এ-এ-ই-ই তুম্মো (কুমড়ো), এ-ই-ই হাম্বা (গোরু), এ-এ-ই কোদাল-দাদা" ব'লে সেগুলোকে সোল্লাসে ছুঁড়ে ঘরের বিভিন্ন কোণায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। চোখের আড়াল হলে আবার আকুল কণ্ঠে তাদের ডাকাডাকিও চলছে, যেন "তুম্মো" ডাক শুনেই কুমড়ো দৌড়ে এসে কুটুনের কোলে উঠবে!

এভাবেই কুটুনের বয়স বাড়তে থাকে। তার সংসারেও নতুন সদস্যরা ভর্তি হয়। কুটুন তাদের নাওয়ায়, খাওয়ায়, তেল মাখায়, ঘুম পাড়ায়। মাঝেমধ্যে কোলে-কাঁখে-সাইকেলে চড়িয়ে পাড়া বেরোতেও বেরোয়। এখন যদি তার ঝুড়িতে উঁকি দাও, দেখবে কমলা রঙের কাঠবিড়ালি, গোলাপি রঙের একদম এক রকম দেখতে তিনটে তিনরকম সাইজের টেডি, তাদের সবারই নাম পিঙ্কু, দু'দিকে বিনুনি বাঁধা পুতুল রিনিচিনি, সে সারাদিন পা ছড়িয়ে বসে থাকে (এটিও এক মাসীমণির কাছে পাওয়া), একদিন তেল মাখানোর সময় কুটুন রিনিচিনির জামা খুলে ফেলেছিল, তারপর থেকে সেই জামা দিয়ে ঘর মোছা হয় (এটি মেয়ের বড় প্রিয় কাজ)। আর আছে ছুটকি, যার হাত ধরে নেচে নেচে ছড়া বলা, কিংবা নিজের ভাষায় "অ্যাই, চোখ মোছো, একদম কাঁদবে না" ব'লে ধমক দেওয়া, সবই চলতে থাকে।

একেকদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির বৈঠকখানায় ঝুড়ি-বাড়ির পড়ুয়াদের নিয়ে কুটুনের ক্লাস বসে। মা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখেন কাঁচ দিয়ে বাঁধানো শখের সেণ্টার টেবিলের ওপর উঠে বসে তাঁর সাধের কন্যে হাত-পা নেড়ে পড়ুয়াদের ছড়া মুখস্থ করাচ্ছে।।

Monday, 30 January 2017

কুটুন এবং কেশচর্চা

একরত্তি মেয়ে কুটুন। বছরতিনেকের কিছুটা কম হবে বয়স, একমাথা কোঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, দেখে মনে হবে জন্মের পর থেকে সে চুলে তেল-সাবান-শ্যাম্পু-চিরুনি কিচ্ছুটি পড়েনি। তা কিন্তু মোটেই নয়। রোজ সকালে চানের আগে তাকে জাপটে ধরে তার মাথায় বেশ করে তেল মাখানোর চেষ্টা করা হয়। এই কাজটি কুটুনের ভয়ানক অপছন্দের। ফাঁক পেলেই সে মায়ের নাগাল এড়িয়ে দৌড়ে পালায়, নিজের ভাষায় "আমায় ধরতে পারে-এ-এ না" বলতে বলতে (কুটুনের মাতৃভাষা এবং তার নিজের ভাষার মধ্যে এখনও কিঞ্চিৎ ফারাক রয়ে গেছে)। দৌড়ে পালানোর সময় আবার আড়ে আড়ে পিছনে চেয়ে দেখে মা-ও দৌড়ে আসছে কিনা। মা যদি আসনপিঁড়ি হয়ে একজায়গায় বসে থাকেন তবে তো মজাটাই মাটি! মেয়ের মজা বাড়িয়ে দিতে অগত্যা মা-কেও দৌড়ের উদ্যোগ নিতে হয়।
এ হল চানের আগের কাহিনী। চান সারা হলে ঝাঁকড়া-চুলো মাথাখানা ঘষে ঘষে মুছিয়ে রোদে শুকোনো হয়। সে আবার আরেক যুদ্ধ। মেয়ে যত বলে রোদে থাকবে না, মায়ের তত রোখ চেপে যায় অন্তত চুলগুলো শুকোনো অব্দি তাকে নিয়ে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকবেনই। গুঁতোগুঁতির শেষে মাথাটা কোনোমতে অর্ধেক শুকনো হলেই কুটুন ছুট্টে ঘরে ঢুকে পড়ে।
এরপর শুরু চুল আঁচড়ানোর পালা। মা একখানা চিরুনি হাতে তুললেই মেয়েরও একখানা নেওয়া প্রয়োজন। "আমি আমি" অথবা 'তুতুন চিউনি দাও" বলে লাফালাফি জুড়ে দেয়। একখানা পছন্দের চিরুনি আছে তার। সেইটেই হাতে নেওয়া চাই। ঐ চিরুনি সমেত তাকে যা-ইচ্ছে-তাই করতে দাও, দেখবে ঘরে কেমন নিঃশব্দ শান্তি বিরাজ করছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে (ড্রেসিং টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছে প্রবল, বাবার কাছে একদিন রামবকুনি খেয়েছিল, তারপর থেকে ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখে) চিরুনি নিয়ে হরেকরকম কেরামতি দেখায়। উৎসাহের আতিশয্যে আয়নায় বারকয়েক জিভও বুলিয়ে নেয় সে। এসব যাচ্ছেতাই কাণ্ড কিছুক্ষণ চলার পর মা-কে লাগাম টেনে ধরতে হয়। দুই হাঁটুর মধ্যিখানে কুটুনের মাথা চেপে ধ'রে, কিংবা মেয়ের বাবা বাড়িতে থাকলে তাঁর কোলে মেয়েকে বসিয়ে চুল আঁচড়ানোর চেষ্টা চলে। কোঁকড়া-ঝাঁকড়া-পাখির বাসা চুল, তাকে কি সহজে পোষ মানানো যায়? মাথার বাঁদিকের চুলের জট ছাড়াতে না ছাড়াতে ডানদিকের চুলগুলোয় গিঁট বেঁধে যায়। যদি বা কোনোদিন পুরো মাথাটা ভালো করে আঁচড়ে 'বাবুসোনা' গোছের একটা আদল মেয়ের মুখে আনতে পারা যায়, হয়ত বা ডগমগ হয়ে মেয়ের মুখখানা আয়নার সামনে ধরে মা সবে বলতে শুরু করেছেন,
"কি সুন্দর লাগছে রে কুটুনকে, রোজ চুল আঁচড়ালে কত ভালো লাগে বলো তো সোনা"
অমনি হাসি-হাসি মুখ করে কুটুন নিজের মাথাটা ঝড়ের বেগে ডানদিকে-বাঁদিকে ঝাঁকাতে থাকে, ব্যস, মায়ের এতক্ষণের চেষ্টা জলে যায়। সেই চেনা পাখির বাসাটা যখন আবার মাথায় ফিরে আসে, মেয়ে তখন একগাল হেসে আয়না দেখিয়ে বলে,
"বাঃ বাঃ, তি সুন্দল!"
কুটুনের সৌন্দর্য্যবোধ যে কিঞ্চিৎ প্রথা-ভাঙ্গা, সেকথা এতক্ষণে মায়ের মগজে ঢোকে।
ধরো, বিকেলবেলায় কোথাও বেড়াতে যাওয়া হবে, কিংবা সেজেগুজে বিয়েবাড়ি যাওয়া হবে। কুটুনের ঝালর দেওয়া বাহারি জামার সঙ্গে রঙ মিলিয়ে মা ভারি শখ করে গুটিকয় ক্লিপ বা হেয়ারব্যাণ্ড কিনেছেন। নিজের সাজুগুজু মেটার পর আহ্লাদ করে মেয়েকে সাজিয়েছেন ধৈর্য্য ধ'রে। খরগোশের মত দৌড়ে বেড়ানো মেয়ে এবং নিজের সাজের ভার সামলে সে কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করা যে কি ঝকমারি তা বলে বোঝানো মায়ের কম্ম নয়। মেয়ের চাহিদামতো কপালে টিপ, জামার কোণায় 'ফস্‌', অর্থাৎ পারফিউম (অবশ্যই মিছিমিছি), সবই দেওয়া হয়েছে, সবশেষে মায়ের নিজের চাহিদা অনুসারে মাথায় ক্লিপটি বা হেয়ারব্যাণ্ডটি লাগানো হল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হল, সাজটি মেয়ের মনে ধরেছে। আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ এদিকে হেলে ওদিকে ঘুরে জামার কুঁচি দু'আঙ্গুলে ধ'রে প্রজাপতির মত নেচে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা হল। তারপরেই নজর গেল মাথায় লাগানো ক্লিপ বা ব্যাণ্ডের দিকে। অমন সুন্দর জিনিসটা মাথার ওপর উঠে বসে থাকবে? হাতের নাগালে পেলে বেশ একটু নেড়েচেড়ে চিবিয়ে চেখে দেখা যেত,  যেমন চেখে দেখা যায় জামার জরি-চুমকির নকশাগুলোকে।
ব্যস, শুরু হয়ে যাবে নতুন যুদ্ধ। কুটুনের চেষ্টা হবে মাথা থেকে ব্যাণ্ডটাকে খুলে হাতে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার, আর মায়ের প্রাণপণ চেষ্টা হবে সেটাকে মেয়ের মাথাতেই রেখে জিনিসটার সৌন্দর্য্য বাড়ানোর। এই যুদ্ধে মাঝেমাঝে বাবাও নেমে পড়েন, কোন পক্ষে, সেটা অবশ্য নিজেও জানেন না।
রণক্লান্ত মা যখন হাল ছেড়ে গজগজ করতে থাকেন,
"থাক ভূতের মতো, কিচ্ছু বাঁধতে হবে না, সব চুল কেটে ন্যাড়া করে দেব, দরকার নেই চুল রাখার" ইত্যাদি ইত্যাদি,
কুটুন হয়তো তখন বিজয়ী হাসি হেসে মায়ের ব্যাগ কাঁধে এগিয়ে চলেছে সদর দরজার দিকে।
মেয়ের ক্ষিধে পেলে বিস্কুট, তেষ্টা পেলে জলের বোতল, বমি হলে পাল্টানোর জন্য বাড়তি জামা, এসব ঝোলায় ভ'রে যখন ব্যাগ-বোঁচকা-সমেত রওনা হচ্ছেন, তখনও কিন্তু মা সন্তর্পণে ক্লিপটাকে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে ভোলেন না, বিয়েবাড়িতে ঢোকার আগেও যদি বুঝিয়েসুজিয়ে একটু সাজানো যায় মেয়েটাকে। পয়সা দিয়ে কেনা জিনিস, কাজে না লাগলে খারাপ লাগে যে!
এসব হ্যাপা সামলে মাঝেমাঝে মায়ের সত্যিই মনে হয়, "দিই চুলগুলোকে কচকচ করে কেটে",
কিন্তু সত্যিই যখন মা বসেন মেয়ের চুল কাটতে (তাবড় তাবড় বিউটিশিয়ানের চেয়েও মা এ ব্যাপারে নিজেকে বেশি ভরসা করেন),তখন ইঞ্চিখানেক চুল কেটেই  মনে হয়, "আহা, এটুকু থাক, আর কাটবো না"।
কি জানি, হয়ত মায়ের মনটা তখন ভাবে, চুলগুলো আছে বলেই তো সেগুলোকে বাগ মানানোর জন্য এত লম্ফঝম্প, হৈ-চৈ। কাঁচি চালিয়ে সেগুলোকে উড়িয়ে দিলে এত কাণ্ড করার তো আর দরকারই পড়বে না। সারাদিনের রুটিনে একটা ফাঁক তৈরি হয়ে যাবে যে তবে! তার চেয়ে, এমনটাই চলুক, মা আর একফোঁটা মেয়ের এই চুল নিয়ে চুলোচুলি,হুড়োহুড়ি!!

Tuesday, 20 December 2016

একদিন বৃষ্টিতে

বৃষ্টিটা শুরু হল দ্যাখো! সারাদিন ধরে রাজ্যির মেঘ জড়ো করে এই সন্ধ্যেবেলায় জল ঢালতে লেগেছে! আপিস-ফেরতা লোকগুলো সব মাথা বাঁচিয়ে বাড়ি ঢুকবে কেমন করে বলো দিকি? হ্যাঁ, ভোররাত থেকে আকাশের মুখ গোমড়া বলে সক্কলে নিশ্চয়ই ছাতা বগলেই বেরিয়েছে বাড়ি থেকে, কিন্তু এ যা গাছ-উপড়োনো পাগুলে  হাওয়া বইছে থেকে থেকে, বৃষ্টি তো পেলয়-তাণ্ডব চালাচ্ছে চতুর্দিকে। ছাতার দল উল্টে উড়ে তেপান্তর পেরিয়ে যাবে গো!
ওই দ্যাখো দ্যাখো! চশমাওয়ালা আপিসবাবুটি বাস থেকে নেমে ছাতা খুললেন আর অমনি হাওয়ার তোড়ে ছাতা নিজেকে টকাস করে উলটে ফেললে! শিক-ক'খানা আস্ত রইবে কি আর! আহা গো, বাবুর চশমা যে জলে ঝাপসা হল! হোঁচট না খেয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারলে বাঁচেন। হাওড়া স্টেশনের সামনে এক-একখানা বাস এসে পেটভর্তি মানুষজনকে উগরে নামিয়ে দিচ্ছে, আর রাস্তায় শুরু হয়ে যাচ্ছে মাথা বাঁচানো দৌড়। ট্যাক্সি ধরার লাইনটা যেখানে দাঁড়ায় সেখানে মাথা গোঁজার একখানা সরু জায়গা আছে, তাতে লোক ঠাসাঠাসি ভিড় এখন। উল্টোনো ছাতা, ভাঙ্গা ছাতা, সব বগলদাবা করে ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চা সবাই সবার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ছে। এর-ওর ছাতার জল টপটপিয়ে গায়ে পড়ছে বটে, কেউ ফোঁস করছে না তাব'লে। গা তো আর শুকনো নেই, আরো দু'চার ফোঁটা জল নাহয় পড়লোই!
ভর সন্ধ্যেবেলা তো, পাঁচমিনিট পর পর বাড়ি ফেরার ট্রেনগুলো ছাড়ছে। কি আশ্চর্য, এই আকাশভাঙ্গা বৃষ্টিতেও সব ট্রেন ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ছাড়ছে। ঝড়জলের ডাক ছাপিয়ে মাইকে ট্রেনের ডাক কানে এলেই ট্যাক্সি-স্ট্যাণ্ডের ভিড়টা ককিয়ে উঠছে,
"এ হে হে, সুপারটা বেরিয়ে গেল। আজও রাইট টাইম?"
"আন্দোলনটাও পেলাম না। ধুত্তোর!"
আফসোস বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বৃষ্টিকে কাঁচকলা দেখিয়ে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ছে। কাঁধের ব্যাগের সম্পত্তিকে জলের আঁচ থেকে বাঁচাতে বাঁচাতে কিছু মানুষ ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে। ব্যাগটা না থাকলে দিব্যি ট্রেনটা পাওয়া যেত!
হট্টগোলের মাঝে কাঁখে বাচ্চা নিয়ে ওটা কে দাঁড়িয়ে গো? আহা, সঙ্গে একটা ছাতাও নেই। নিজের আঁচল দিয়ে কোনরকমে খুকিটাকে মুড়ে রেখেছে। ডানকাঁধে একখানা ঢাউস ব্যাগ। রোগা বউটা ব্যাগ আর খুকির  ভার সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। সঙ্গে কেউ নেই নাকি? কেমন ভীতু ভীতু চোখ তুলে চারপাশে তাকিয়ে দেখছে। কাঁখের বাচ্চাটা একবার আঁচল সরিয়ে মুখ তুলল। ওরে বাবা, দমকা হাওয়া দিয়েছে খুকির মাথা মুখ সব ভিজিয়ে। রোগা মা একখানা শাড়ীর আঁচল দিয়ে আর কতক্ষণ খুকিকে শুকনো রাখবে?এলোমেলো হাওয়াতে ভারি ভয় পেয়েছে খুকি। চুপটি করে মায়ের কাঁখে আঁচল জড়িয়ে ঝুলে আছে।
আর মেঘের আক্কেলখানাও বলিহারি বাপু! তর্জনগর্জন করে জল ঢালার আর সময় পেলে না? কেন হে? পথেঘাটে যে যেখানে আছে ঘরে ঢুকে পড়ার পর বৃষ্টি-বাজের যাত্রাপালা শুরু হলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? দ্যাখো দিকি, ঐটুকু একখানা গুঁড়োকে নিয়ে রোগা মা-টা এখন কেমন করে ট্রেনে উঠবে? আশপাশে দাঁড়ানো বাবু-রা বৃষ্টি থামার আশা ছেড়ে দিয়ে কাকভেজা হয়েই ট্রেন ধরতে দৌড়চ্ছেন। ওনারা কেউ খুকি আর তার মা-কে একখানা ছাতা ধার দিতে পারেন না? ওহো, ছাতা দিয়ে দিলে নিজেদের মাথাগুলো বাঁচবে কেমন করে? কি আর করা যাবে? এরা তাহলে দাঁড়িয়েই থাক। আচ্ছা, ঐ ঢাউস ব্যাগখানায় কি একখানা শুকনো গামছা বা কাপড় নেই? সেটা দিয়ে খুকিকে ঢেকে একদৌড়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারে তো! যাবে সেই দু'ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কালনা। রাত সাড়ে আটটার পর লোকাল ট্রেন আর নেই। একলা মেয়ে, বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরবে কি করে গো? বউটা চারপাশে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। ছাতাওয়ালা ভালমানুষ কাউকে পায় কিনা দেখছে? নাকি শুকনো জায়গা খুঁজছে ব্যাগ খুলে শুকনো কাপড় বার করবে বলে? বাঁদিকে একটা ডিমওয়ালা আর একটা ফলওয়ালা তাদের ঠেলাগাড়িদুটোকে কোনরকমে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ওদেরকে বলতে পারে তো বউটা, খুকিকে একটু কোলে নেওয়ার জন্য? অবিশ্যি দিনকাল তো ভালো নয় মোটেই, কে যে আসল ফলওয়ালা, আর কে যে ভেকের আড়ালে মুখ লুকোনো ছেলেধরা, বোঝা দায়! যদি খুকিকে ট্যাঁকে গুঁজে সে বাছাধন দৌড় মারে? না না বাপু, থাক খুকি ভিজে জামা গায়ে, ঘণ্টাখানেক ভিজে জামা পরে থাকলে কিছু নিমুনিয়া হবেনা খুকির। ছেলেধরাকে মেয়ে ধরতে দেওয়ার চাইতে নিমুনিয়া ঢের ভালো, তাই নয় কি?
আচ্ছা, ফলওয়ালা আর ডিমওয়ালার সঙ্গে ঐ সিড়িঙ্গে চেহারার ছোকরাটি কে হে? দেখে তো ঠিক ফলওয়ালাদের ভাই-বন্ধু মনে হচ্ছে না। দিব্যি ছুঁচোলো গোঁফ, গালে বাসি দাড়ি নেই, গায়ে রোদে পোড়া তামাটে দাগ নেই, লোকটা কে বলো তো? গামছা-কাঁধে ফলওয়ালা আর মাথায় ফেট্টি ডিমওয়ালার কানে কিসব ফিসফিসোচ্ছে আর আড়ে আড়ে মায়ের কোলের গুঁড়োর পানে চাইছে? হ্যাঁ, লোকটার পরনের কাপড় এমন কিছু গোলমেলে নয়, যা দেখে বোঝা যাবে বাছাধন একটি মার্কামারা ছেলেধরা, তবে কিনা সপসপে জামাপ্যাণ্টে, আর পাঁচটা লোকে যেমন পড়িমরি করে বাড়ি, থুড়ি, ট্রেনের পানে দৌড়ুচ্ছে, তা না করে এ লোকটা অমন ফিসফিসোচ্ছে কেন?
গুঁড়োর মা-ও দেখি ব্যাপারখানা নজর করেছে। গুঁড়োকে আর নিজেকে পরনের ভিজে কাপড়খানা দিয়ে যতটা পারে ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখছে। তবে কিনা ভিজে ন্যাতা একখানা শাড়ী কি আর পশমের চাদরের কাজ করে গো বাছা?
ও মা, কি কাণ্ড! লোকটা যে গুঁড়ো আর তার মায়ের দিকেই আসছে গো! হাতে আবার ইয়াব্বড় একখানা পলিথিন চাদর। ফেরিওয়ালারা যেমন চাদর দিয়ে তাদের পসরা আগলায় বিষ্টিবাদলা হলে, তেমন একখানা চাদর লোকটার হাতে। কি করবে বলো তো ওটা দিয়ে? মতলব বোঝা যাচ্ছে না। খুকিকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে চাদরে বেঁধে দৌড় লাগাবে না তো? বলা যায় না কিছুই। যা দিনকাল! খুকির মা-ও তো দেখি সিঁটিয়ে রয়েছে। ব্যাগ আগলাবে না মেয়ে আগলাবে বুঝে উঠতে পারছে না বোধহয়।
ঐ দ্যাখো গো, লোকটা আবার রোগা মা-কে কিসব জানি বোঝাতে লেগেছে। বউটাও দেখি ভালমানুষের মত ঢক ঢক করে
ঘাড় নাড়ছে। মুখটাও একটু চকচক করছে কি? ও বউ, অমন গলে যাসনি লো, কোথাকার কে এক অচেনা ছোকরা এসে দুটো দরদমাখানো কথা বলল, আর অমনি ফ্যাকফেকিয়ে হেসে ফেলবি, এ কেমনধারা ব্যাভার? আবার ঐ নোংরা কেলেকুচ্ছিত চাদরখানা খুকির গায়ে জুত করে জড়াচ্ছে দ্যাখো! ম্যা গো, ঘেন্নাপিত্তি সব বাড়িতে রেখে এসেছিস নাকি রে? নাহয় বিষ্টিবাদলায় মেয়ে কোলে আতান্তরেই পড়েছিস, তা বলে অচেনা ফিরিওয়ালার নোংরা পলিথিন দিয়ে মেয়েকে মুড়তে হবে?
অবিশ্যি উপায়ই বা কি আর? খুকি যদি এতে নিমুনিয়া থেকে বাঁচে, হোক না ফেরিওয়ালার ঘেমো গা আর হতকুচ্ছিত ঠেলাগাড়ি!
সে নাহয় মেয়েকে শুকনো চাদরে মোড়া হল, কিন্তু চেনা নেই জানা নেই, একটা উটকো লোকের সঙ্গে খুকি কাঁধে বউটা চলল কোথায়? স্টেশনের দিকেই এগোচ্ছে দেখি! সব্বোনাশ! ছোকরাকে আবার সাকিনঠিকানা বলে বসেনি তো? 'একলা মেয়েলোক' বলে আলগা দরদ দেখিয়ে বদলোকটা বুঝি বউটার বাড়ির রাস্তা জেনে নিয়েছে গো! হায় হায়, কি হবে এবার? যদি সত্যি ছেলেধরা হয়? খুকিকে যদি বাড়ি থেকে চুরি করে  নিয়ে পালায়?
আহ্‌হ্‌, দ্যাখোই না বাপু চুপটি করে, কি হয় শেষটায়। কূটকচালে মনখানার সবেতেই বড় সন্দবাতিক। ঐত্তো, প্ল্যাটফর্মের শুকনো ডাঙ্গায় মা-মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে সিড়িঙ্গে ফিরে আসছে। পলিথিন চাদরটা ফেরত নিয়ে বেশ করে নিজের গায়ে জড়িয়েছে এবার। এখন তো চেহারাখানাও অত বদলোকের মত লাগছে না। দিব্যি বিষ্টিধোওয়া ভালমানুষের চেহারা। তোমাদের মনে বড় প্যাঁচ, বুঝলে? পরের উব্‌গার করা নিরীহ ছোকরাকে, বলা নেই কওয়া নেই, চোর-ছ্যাঁচোড় বানিয়ে দিচ্ছিলে আরেকটু হলেই! ধন্যি মানুষ যাহোক!
জেগে স্বপন দেখতে বড় ভালবাস, না? আর স্বপনই যদি দেখবে, কালো-কে সাদা করার স্বপন দেখতে পারো না? যত্তসব! নাও, বিষ্টি ধরে এল, এইবেলা মানে মানে বাড়ি ঢোকো দিকিনি সব! ওদিকে গুঁড়ো আর তার মা-র ট্রেনও ছাড়লো ব'লে। বসার জায়গাও পেয়েছে দিব্যি। নাঃ, বঊটার ভাগ্য বেশ ভালোই বলতে হবে, নইলে আর বাদুড়ঝোলা ট্রেনেও গ্যাঁট হয়ে বসার একখানা জায়গা পায়! এখন ভালোয় ভালোয় বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরের বউ ঘরে ফিরুক, তাহলেই রক্ষে। ওই তো, ট্রেন ছেড়েছে। দুগ্‌গা দুগ্‌গা!!


('আমি অনন্যা' পত্রিকা [ISSN:2394-4307], ধানবাদ- October-December 2016 সংখ্যায় প্রকাশিত)

Friday, 25 November 2016

একটা একলা গল্প

লিখি লিখি করেও বেশ ক’দিন  কেটে গেল তোকে লিখতে বসা হয়নি। Compose Mail এ ঢুকেও কোনো না কোনো সমস্যায় ল্যাপি বন্ধ করে দিতে হয়েছে রোজই। কোনোদিন পাওয়ার অফ তো কোনোদিন দীপের সঙ্গে ঝগড়া করে ফোন মুড দুটোই অফ, এইসব আর কি! আজ আমি ফোন অফ করে লিখতে বসেছি। আজ তোকে লিখবোই।
মনে আছে তোর, হস্টেলে একবার ইঁদুরের প্রবল উৎপাত শুরু হয়েছিল? রান্নাঘরের যত প্লাস্টিকের কৌটো কেটে টুকরো করছিল? আমার দুটো ওড়না ওদের কবলে গিয়েছিল, তুই সান্ত্বনা দিয়েছিলি আমায়, “ওরা এটা জেনেবুঝে করেনি, তুই তো ওদের ব্যক্তিগত শত্রু নোস, তাছাড়া এই কাটাকুটিগুলো না করলে ওরা বাঁচবে না রে”,
পেস্ট-ক্লেশনিবারণী সমিতির সভানেত্রী বানিয়েছিলাম তোকে তক্ষুণি।
তোর সেই আদরের Jerry-রা গত কিছুদিন ধরে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
উৎপাতের শুরু মাসখানেক আগে। তুই তো জানিস, পুরনো ম্যাগাজিন জমানো আমার স্বভাব। মাইক্রোওয়েভের বাক্সটায় সব জড়ো করা থাকে। একদিন মাঝরাত্রে বাক্সের ভেতর থেকে খুটখাট আওয়াজ এল। তখন উঠে তদন্ত করার প্রশ্নই ওঠে না, চাদরে কান ঢেকে উল্টোদিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সন্ধেয় রান্নাঘরে দেখি দুটো ডালের ঠোঙা ফাটা, শেল্‌ফে ডাল ছড়ানো। আগের রাত্রের আওয়াজটার কথা মনে পড়ল। বাক্স ঘেঁটে কোনো প্রাণী চোখে পড়ল না, তবে বেশ কিছু পত্রিকা কুচি কুচি করে কাটা। বুঝলাম Jerries are back in my life. কিন্তু শ্রীমুখ দর্শন হল না। বাবাজিরা এখন কোথায় কম্ম সারছেন তাঁরাই জানেন। আমি লেগে পড়লাম বই ঝাড়াইয়ের কাজে। এরপর দিনকয়েক কোথাও কিছু চোখে পড়লনা। একদিন অফিস থেকে ফিরে চা নিয়ে টিভি চালিয়ে বসেছি, সাঁ করে কী একটা ঢুকে গেল ছোট ঘরের ভেতরে। ওই ঘরটায় বাড়িওয়ালার কিছু ফার্ণিচার রাখা আছে, বন্ধই থাকে, তবে দরজার নিচের ফাঁকটা এমন, সাপও দিব্যি ঢুকে পড়তে পারবে ঘরটাতে। ঘরে ঢুকে গেছে, নিশ্চিন্তি, এই ভেবে একটা তোয়ালে দরজার নিচের ফাঁকে আটকে দিলাম।
আলনায় হপ্তাদুয়েকের জামাকাপড় ডাঁই হয়ে আছে, গত সপ্তাহে বাড়ি গিয়েছিলাম বলে কাচা হয়নি, পরদিন রোববার, সবক’টাকে ওয়াশিং মেশিনে ঢোকাতে হবে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন সকালে আলনা খালি করছি, আলনার পিছনে মেঝেতে পড়ে ছিল গত বছর পুজোয় দীপের দেওয়া সবুজ পিওর সিল্ক। সেটা তুলে ধরতেই গলা দিয়ে আপনা-আপনি একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। শাড়িটার প্রায় অর্ধেকটা কুচি কুচি করে কাটা। গত দু’দিন শান্তিমাসি কাজে আসেনি, আলনার পিছনে ঝাঁটা-ন্যাতা বোলানো হয়নি। সেখানে উঁকি মেরে দেখি আমার অত সুন্দর শাড়িটার কুচি কুচি টুকরো মেঝেয় খেলে বেড়াচ্ছে। রাগে, দুঃখে কি করব বুঝতে না পেরে দীপকে ফোন করে ফেললাম। ইঁদুরদের যখন কব্‌জা করতে পারছিনা, গায়ের ঝাল ঝাড়ার জন্য কাউকে তো লাগবেই! দীপই সবচেয়ে সহজ বালির বস্তা রাগ  মেটানোর জন্য! তা, সে বেচারা তখনো ঘুমের কোলে দুলছে, ঘুম-কানে ইঁদুরের উপাখ্যান ভালো করে বুঝতে না পেরে আমার চিৎকার থেকে রেহাই পেতে আবার ঘুমিয়ে পড়াই উচিত কাজ বলে মনে করল। ফোনটা কেটে তখন মনে হচ্ছে সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে যাই। কোনোরকমে বাকি জামাকাপড় কেচে রান্না বসালাম। ও, বলতে ভুলে গেছি, একটা নীল বাঁধনির ওড়নাও ওদের দাঁতের বাড় কমাতে কাজে লেগেছে।
দুপুরে খেতে বসে প্রতিজ্ঞা করলাম এদের শিক্ষা দিতেই হবে। শাড়িটার কথা ভেবে এখনো চোখে জল আসছে রে, ক’দিন আগেই ওটার সাথে ম্যাচিং একটা সেট কিনেছি। ঠিক করলাম বিকেলে ইঁদুর মারার বিষ কিনে আনতে হবে। ওই যেগুলো খেলে ইঁদুর বাড়ির বাইরে গিয়ে মরে, সেগুলোর মধ্যে কোনো একটা। বাড়িতে কিছু বলা যাবেনা। ইঁদুর মারা বিষ কিনছি শুনে মা আবার রাত্রে ঘুমোবেন না কিনা! যদি ভুল করে আমার খাবারে বিষ মিশে যায়! জানিসই তো, আমার মা Innovative দুশ্চিন্তায় গবেষণা করছেন।
বিকেল হতেই গেলাম পাড়ার দোকানে। দোকানদার শ্রী তপন ঘোষ কিছু কিছু কথা শুদ্ধ বাংলায় বলেন,
“ওইটি তো নেই দিদি, এইটি আছে, অব্যর্থ ঔষধ দিদি, ইঁদুর খাবে আর সেখানেই মরবে, বাইরে ছোটার অবকাশও পাবেনা”
আমার ‘ওইটি’ই চাই বলাতে ঘোষমশাই বললেন,
“দিদিভাই ‘ওইটি’ আপনি অবশ্যই কাল বৈকালে পেয়ে যাবেন, অ্যাই আমি খাতায় লিখে রাখলুম”
কিন্তু আমার তো আজই চাই, ভেবে শেষ পর্যন্ত বাজারেই গেলাম। একহাতে বিষের প্যাকেট, অন্যহাতে আলুর চপের ঠোঙা নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম, বুঝলি!
তেলেভাজার মধ্যে শুধু আলুর চপটাই আমি খেতাম না, ভেবেছিস ওটাও শুরু করেছি? উঁহু, ওটা ইঁদুরদের জন্য। বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব হলেই ছোট থেকে দেখে আসছি বাবা প্রথম ক’দিন আটা আর ইঁদুর-মারা ওষুধ একসাথে মেখে গুলি পাকিয়ে বাড়ির বিভিন্ন কোণে রেখে দেন আর রোজ সকালে খুব মন দিয়ে সেগুলোকে লক্ষ্য করেন, যদি একটা গুলিও ইঁদুরের পেটে গেছে বলে নজরে আসে! কিন্তু, অতি অনভিজ্ঞ শিশু ইঁদুরও ওগুলো ছোঁয় না। তখন আলুর চপে ওষুধ চটকে ইঁদুরদের জন্য মুখরোচক মারণ ওষুধ তৈরী করা হয়।
যাই হোক, আমি আর দেরি না করে প্রথমেই আলুর চপের রাস্তায় হাঁটলাম। ডিনারের পর হাতে গ্লাভ্‌স পরে চপের সাথে ওষুধ মেখে দু’তিনটে গোল্লা পাকিয়ে রান্নাঘরে, বন্ধ ঘরটার সামনে, আর আমার শোবার ঘরের কোণে রেখে দিলাম। বিজ্ঞাপনে দেখেছি এই ওষুধটা খেয়ে ইঁদুর বাড়ির বাইরে গিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে, তা-ও একটু ভয়ে ভয়ে রইলাম, কি জানি, পরেরদিন সন্ধেয় গন্ধে টিকতে পারব তো?
পরদিন সোমবার, প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ঘুম ভাঙে। ঢুলতে ঢুলতে টুথব্রাশ মুখে নিয়ে শান্তিমাসিকে দরজা খুলে দিয়েই মনে পড়ল রেজাল্ট দেখতে হবে। আলুর চপে কামড় পড়েছে কিনা।
“এঃ হে দিদি, ঝ্যাঁটায় কি একটা চটকে গেল গো, তরকারি ফেলেছ নাকি মেঝেয়?”
দেখি শান্তিমাসির হাতে ঝাড়ুর আগায় চপ-ওষুধ মাখানো। বাকিটুকু মেঝেতে লেপ্টে আছে। ইঁদুরে আদৌ খেয়েছে কিনা বোঝা গেল না। রান্নাঘরের আর আমার ঘরের স্যাম্প্‌লগুলো যেমন ছিল তেমনই আছে, ছুঁয়েও দেখেনি।
“মাসি, ওগুলো ইঁদুর মারার ওষুধ। চপের সাথে মিশিয়ে রেখেছি। ওগুলো বাঁচিয়ে ঝ্যাঁটা-ন্যাতা বুলিও, ওগুলো যেন চটকে না যায়। ইঁদুরে খেয়েছে কিনা বুঝতে পারছিনা, রাখা থাক আজ যদি খায়”
“ন্যাও, এবার ইঁদুর মরে আলমারির নিচে পচে থাকবে, আর আমায় সাতসকালে এসে সেসব ফেলতে হবে? আচ্ছা ঝকমারি!” গজগজ করতে করতে মাসি ঘরদোর পরিষ্কার করতে লাগল। আমিও কথা না বাড়িয়ে ব্রেকফাস্ট আর মাসির চা রেডি  করতে লাগলাম।
ঘণ্টাখানেক পর, বুঝলি, মাসি চলে গেছে, আমিও চান-টান সেরে স্যাণ্ডুইচ, ওমলেট আর চা নিয়ে জুত করে বসেছি, হঠাৎ ম্যাগাজিনের বাক্স থেকে খচমচ আওয়াজ। তার মানে, ক্ষুদে শয়তানগুলো ঘাপটি মেরে বাক্সে বসে আমার জলখাবার খাওয়া দেখছে! এবার আমি মজা দ্যাখাবো! গোটা বাক্স ধরে টেনে বাড়ির বাইরে বের করে দেব। চুলোয় যাক আমার সব পুরনো ম্যাগাজিন। আপদগুলো তো বিদেয় হবে। এসব ভেবে কুর্তির আস্তিন গুটিয়ে যেই  উঠতে গেছি, তুড়ুক করে কি একটা বেরলো বাক্স থেকে। মা গো! অতি বদখৎ চেহারার একটা কালচে নেংটি ইঁদুর। সেটাকে দেখেই এতক্ষণের প্রতিশোধ স্পৃহা আর সাহস দুটোই একটু কমে এল আমার। ও মা, একটু পর দেখি টুক টুক করে আরো দুখানা ইঁদুর বেরিয়ে আগেরটার পাশে দাঁড়াল। আমি কেমন ভেবলে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, আমার সামনে দিয়ে তিনটেয় মিলে দিব্যি মার্চপাস্ট করতে করতে এগিয়ে গেল ফ্ল্যাটের মেন দরজার দিকে।
জানিস, নিশ্চয়ই আমার মনের ভুল, মনে হল দরজার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনটেই আমার দিকে একবার করে কাতরচোখে তাকিয়ে নিলো। ভিটেছাড়া হয়ে নিশ্চয়ই ইঁদুরদের কষ্ট অভিমান হয় না। হয় কি??
ইঁদুরগুলোকে চোখের সামনেই বেরিয়ে যেতে দেখলাম। যেভাবে নাজেহাল করছিল আমায় ক’দিন ধ’রে, আমার তো এখন আনন্দে ডিগবাজি খাওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানিনা আনন্দটা পুরোমাত্রায় হচ্ছেনা। প্রথমত, জানিনা এখনও বাড়িতে আর ইঁদুর রইল কিনা, দ্বিতীয়ত, এই, আগেই বলছি, হাসবি না খবরদার, দ্বিতীয় কারণ, মনটা বড্ড খালি খালি লাগছে। ইঁদুর আছে নাকি নেই, থাকলে কিভাবে সরানো যায়, এসব ভেবে ক’টা সন্ধে বেশ কেটে গেল তো, আজ থেকে আবার বাড়ি ফিরে চুপচাপ একা একা নিজের কাজ করে যাওয়া। শুনলে তোর মনে হবে ন্যাকামো, কিন্তু এই ক’দিন অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে আরো কয়েকটা প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেতাম। হোক না কাগজ কাটা- কাপড় কাটা কেলেকুচ্ছিৎ নেংটি ইঁদুর, তবু তো বাড়িতে কিছু প্রাণী বাস করত।
সারা সন্ধে একা একা থাকা, দীপকে ফোন করলে “মিটিং-এ আছি পরে কথা বলব” কিংবা “সন্ধেয় কিছু কাজকর্ম তো করতে পারো আমায় ফোন না করে”, বাড়িতে ফোন করলে মায়ের কাছে সংসারের নানান ঝামেলার কথা শোনা আর মাঝেমাঝে মায়ের গলা ধরে আসা, দিনের পর দিন এই রুটিন কারই বা ভাল লাগে বল?
সারাদিন তো কাজেকর্মে আর কথায় ডুবে থাকি, তাইজন্যই বোধহয় সন্ধেগুলো একদম একা হয়ে আর কিছুতেই কাটতে চায় না। দীপের সাথেও সারাদিনে হয়তো মিনিটদশেকের জন্য কথা হয়, কোনোদিন সেটারও সময় থাকেনা। সারাদিন আমি ওর ফোনের ডাকে সাড়া দিতে পারিনা, বিকেলে দেখি ৫-৬ টা করে মিস্‌ড কল, আমার যখন কল করার সময় হয়, ততক্ষণে ও ঢুকে পড়েছে অফিসের ঘেরাটোপে। আমরা রয়েছি হাজারদুয়েক কিলোমিটার দূরত্বে, ওয়ার্কিং আওয়ারগুলোও যদি দুজনের ম্যাচ করত তাও নাহয় হত। এভাবে কদ্দিন চলবে জানিনা রে। আজকাল আমাদের কথা মানেই ঝগড়া, জানিস! দেখা হয় বছরে দু’বার, পুজোয় আর বছরশেষে। এভাবে কি একটা রিলেশন চলে? হয়ত চলে, চালাতে হয়! দুই বাড়িতেই বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে, আমরাই আলোচনাটা এগোতে দিচ্ছি না। সম্পর্কটাকে দানা বাঁধতে দিতে ভয় পাচ্ছি বোধহয় দুজনেই। কেউই মুখে কিছু বলছি না ঝগড়ার ভয়ে। তুই তো প্রতি সোমবার মন্দিরে যাস পুজো দিতে, আমাদের রিলেশনটার রেজাল্টের কথা দেবাদিদেবকে জিজ্ঞেস করিস তো! দেখি উনি ভাল কোনো খবর দিতে পারেন কিনা!
এখন আমি মাঝেমাঝে ভাবছি সাদা ইঁদুর বা গিনিপিগ পুষলে কেমন হয়? ইঁদুরের দাঁত বেড়ে যাওয়াটা একটা সমস্যা বটে, কিন্তু যদি উলের বল বানিয়ে দিই পোষা সাদা ইঁদুরটাকে?একটা বল কেটে কুচি করলে আরেকটা বল- এইভাবে চলতে থাকবে। তবে হ্যাঁ, পুষলে যে কোন একপিস। একটা সাদা ইঁদুর, বা একটা গিনিপিগ। দুটো প্রাণীকে একসাথে আনলেই তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-খুনসুটি-খেলাধুলো করতে আরম্ভ করবে, আর আমি আবার একলা আলাদা হয়ে বসে থাকব।
আমার ইঁদুর পোষার আইডিয়াটা কেমন প্লিজ জানাস। একটু তাড়াতাড়ি উত্তরটা পাঠাস।।


('আমি অনন্যা' পত্রিকা [ISSN:2394-4307], ধানবাদ- Oct-Dec '2015 সংখ্যায় প্রকাশিত)

Sunday, 31 July 2016

বিকু-বোম্বার ব্যাট্‌ল্‌

(এটা আমার বছরখানেক আগে লেখা একটা গল্প। গত বছর আমার এক বন্ধুর অনুরোধে হায়দ্রাবাদের একটি পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। পত্রিকাটির শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত সেই গল্প এখানে টুকে রাখলাম, আমার ব্লগের বন্ধুদের জন্য।)

বড়দিনে তিনাই আর বিকু বাবা মা তানুমাসি মেসোর সঙ্গে দেওঘর যাচ্ছে এস্দা-বুই এক্সপ্রেসে করে হ্যাঁ সত্যি ট্রেনটার এটাই নাম বাবা যখন টিকিট কাটছিল পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছে Sdah Bui Exp. পরেরদিন সকালে টেবিলে বসে মায়েদের ট্রেনের নামটা বলতেই হাসির চোটে মার মুখ থেকে চা পড়ে বিকুর জামা ভিজে একসা এদের এত হাসি কেন পায় বোঝা যায় না।
তিনাইয়ের পরীক্ষা শেষ 24তারিখ আর সেদিনই বেলা দেড়টায় ট্রেন তাই মায়ের বকুনি খেয়েও সাতদিন আগে থেকে ব্যাগ গুছিয়েছে ভালো জামা চারটে আর বাড়িতে পরার দুটো নেবে, সাথে ম্যাচিং ক্লিপ আর চুড়ি কমলা বাটারফ্লাই ক্লিপটা নতুন, তাই কমলা তুলতুলে জামাটা নিচ্ছিল কিন্তু বিকু কমলা রং সহ্য করতে পারেনা যতবার তিনাই জামাটা ব্যাগে ভরেছে, ও বের করে খাটের নিচে ফেলে দিয়েছে তিনাই একবার কান মুলতে গিয়ে হাতে কামড় খেয়ে আর ঘাঁটায়নি

24 ডিসেম্বর বাড়ির সবাই পরীক্ষার পর তিনাইকে স্কুল থেকে তুলে সোজা শিয়ালদহ স্টেশন চলে যাবে এরকমই ঠিক হয়েছিল স্কুলড্রেস পরে বেড়াতে যাওয়া তিনাই একদম পছন্দ করে না ভেবে রেখেছিল ট্যাক্সি তে উঠে বায়না করে গোলাপী ফ্রক পরবে, কিন্তু পরীক্ষায় বিহারের রাজধানী আর পশ্চিমবঙ্গের হিল স্টেশন দুটোরই উত্তর দেওঘর বলেছে, শুনে মিস বললেনদেওঘরে খুব ভাল প্যাঁড়া পাওয়া যায়। খাবি, বুদ্ধি খুলবে এসব কথা মা জানেনা, ফ্রক পাল্টানোর বায়না শুনে মায়ের প্রশ্ন শুরু হলে মুশকিলে পড়ে যাবে। তাই চুপ করে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
শিয়ালদা স্টেশনে এসে হুড়োহুড়ি করে সবকটা ব্যাগ, তিনাই আর বিকুকে গুণে গেঁথে মা মাসি সমেত S3 তে বসিয়ে বাবা আর মেসো স্টেশনে বেড়াতে নামলেন। ট্রেন ছাড়তে নাকি মিনিট দশেক বাকি আছে। জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে তিনাই দেখতে পেলো বাবা একটা কালো জামা পরা গোঁফওয়ালা লোকের সাথে কথা বলছেন, পাশে মেসো দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছেন। জানলার ধারে বসবে বলে বিকু সমানে ঠেলতে লাগল বলে তিনাইকে সরে আসতে হল, বাবাদের আর দেখা হল না।
ট্রেন ছাড়ার একটু পরেই কেমন একটা ঢুলুনি মতন এল তিনাইয়ের। মায়ের ব্যাগে নতুন গুড়ের কাঁচাগোল্লা আছে, ওগুলো এবার দিতে পারে তো, তা নয়, খালি নিজেরা বকবক করে যাচ্ছে! তিনাইয়ের একটুও ভালো লাগছিল না, এমন সময়ে বিকুরমা ক্ষিদে, গোল্লা খাবোচিৎকারে মায়ের খেয়াল হল।
বিকু তোর গোল্লা ক্ষিধে পেয়েছে? অন্য ক্ষিধে নয়?” মেসোর প্রশ্নের উত্তরে বিকু একটু লাজুক হেসে চুপ করে রইল। কাঁচাগোল্লাকে বিকুগোল্লাবলে, আর গোল্লা খেতে বড় ভালবাসে।
গোল্লার বাক্স শেষ হওয়ার পর কে কি কথা বলছে তিনাই সেসব আর কিছু শুনতে পায়নি। বাবার গায়ে হেলান দিয়ে কখন যেন ঘুমে কাদা হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গলো।
মা, মা আর মাসি হাউহাউ করে কাঁদছে কেন? “মা গো, কি সর্বনাশ হল? ঠাকুর, রক্ষা করো। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে বেরিয়েছি, তুমি দেখো ঠাকুর, বলছিনা চুপ করে বসে থাক্কোলেমা বিকুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন আর বিকুকে বকুনি দিচ্ছেন। বিকু খুব বিরক্ত হয়ে কোল থেকে নামার চেষ্টা করে চলেছে মাসি সিটে পা তুলে দুটো ব্যাগ বুকে চেপে হাতজোড় করে বসে আছেন। বাবার দিকে তাকিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময়ে
একটাও আওয়াজ যেন না শুনি। যার কাছে যা টাকাপয়সা সোনাদানা, ধুৎ, সোনা তো আজকাল কেউ পরে না, যাক গে, যা আছে সব এই ব্যাগটায় ফেলুন দেখি! আহা, দিদিরা মাসিমারা কাঁদেন কেন, আমার আবার চোখের জলে একটু ইয়ে আছে, দেখছেন না, আমারো চোখগুলো জলে ভরে যাচ্ছে!”
বোম্বাদা, তুমি রুমাল নিয়ে ওধারে সরো তো, আমি ঝটাপট ব্যাগ ভত্তি করি। বেশি না ভেবে দামী জিনিস সব ফেলুন ব্যাগে, কি বলে, ওই, মুক্তহস্তে দান করুন। জানেন তো, ‘যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে’! আজ বোম্বাদার নামে দান করুন, কাল পকেট ভরে আমদানি হবে
শুঁটকো চেহারার লোকটা হাতে বন্দুক নাচাতে নাচাতে ব্যাগ নিয়ে মাসির সামনে এসে দাঁড়ালো এবার। আর তখনই
এইত্তো আমার ক্যাপ। তোমরা কেউ পুজোয় আমায় ক্যাপ কিনে দিলেনা মা ভয় পায় বলে, এই কাকুটা কত্ত ভাল, আমার জন্য ক্যাপ বন্দুক এনেছে। দাও দাও ওটা আমারবলতে বলতে বিকু মায়ের কোল থেকে ঝাঁপিয়ে শুঁটকোর কোলে উঠে বন্দুক নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করল। শুঁটকোর একহাতে ব্যাগ একহাতে বন্দুক, গলা ধরে ঝুলে আছে বিকু। কি করবে বুঝতে না পেরে যেই বিকুর হাত ধরতে গেছে, ব্যস, বন্দুক চলে এল বিকুর হাতে।
ডাকাত সর্দার বোম্বাদা চোখ মুছে এসে দেখল পয়লা শাগরেদ ময়লা বোঁচা একহাতে ব্যাগ আরেক হাতে একটা বছরতিনেকের ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ময়লার পিস্তলটা বাচ্চাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। দুই আর তিন নম্বর শাগরেদ ডাকাতি ভুলে পয়লাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বাচ্চাটাকে তুতিয়ে পাতিয়ে বন্দুকটা নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। প্যাসেঞ্জাররা হরিনাম জপছে, শুধু একটা বাচ্চা মেয়ে, বোধহয় এইটার দিদি, খিলখিল করে হাসছে আর হাততালি দিয়ে বলছেবিকু ডাকাত, বিকু ডাকাত, সব ডাকাত কুপোকাৎ
চোপ্‌! সব্বাই মুখ বন্ধ কর্ নইলে কিন্তু আমি টেরেন উড়িয়ে দেবো। বোম্বার সঙ্গে ইয়ার্কি? এই বোম্বা একহাতে চাকু একহাতে পেটো নিয়ে টেরেনে একসান করে বড় হয়েছে মাসিমা-দিদিমার চোখের জল সহ্য হয়না বলে ভাববেন না বোম্বার মন দুব্বল। এই বাচ্চাটাকে আছড়ে ফেলে বন্দুকটা কাড়তে আমার দুমিনিট লাগবে, বুঝলেন দাদারা? ফেলব নাকি?” হাত-পা নাচিয়ে বোম্বা কথাগুলো শেষ করতেই মা আর মাসি ককিয়ে কেঁদে উঠল। মেসোতবে রেবলে তেড়ে যাচ্ছিলেন, বাবা হাত ধরে থামালেন।  “মাথা গরম করে লাভ নেই পার্থ, ঠাণ্ডা মাথায় বিকুকে বাঁচাতে হবেফিসফিস করে বলা বাবার কথাগুলো শুনে তিনাইয়ের গলা ব্যথা করতে লাগল। বিকুকে বাঁচাতে হবে মানে? কি করবে ডাকাতগুলো বিকুকে? ওরা তো ওকে কিডন্যাপ করেনি? বিকুটা তো নিজেই পাকামো করে শুঁটকোর কোলে চেপে বসল যেন ক্যাপ বন্দুক দেখেনি কখনো! এখন কি হবে? বন্দুক না দিলে যদি ওরা সত্যি আছাড় মারে ভাইকে? কান্না আটকাতে গিয়েও তিনাই আর পারলো না, চোখ ঝাপসা হয়ে দুচোখ ছাপিয়ে জল চলে এল।  নেহাৎ ক্লাস থ্রি তে পড়ে, তাই ভ্যাঁ করে কাঁদলো না, বাবার কোলে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে লাগলো।
কম্পার্টমেণ্টে ডাকাতি হয়েও হচ্ছে না, ডাকাতের বক্তৃতা শোনা যাচ্ছে কেন, খোঁজখবর নিতে অন্যান্য বার্থের লোকজন এবার সাহস করে তিনাইদের বার্থের কাছে জড়ো হল। ডাকাতি না হলে নিজেদের পয়সাকড়ি হিসেব করে ফেরৎ নিতে হবে তোএসেই দৃশ্য দেখতে পেলো সবাই বিকুকে ডাকাতের কোলে দেখে দুতিনজনডাকাতির সাথে বাচ্চা পাচারও করছে রে, দে ধোলাই সবকটাকেবলে ময়লা বোঁচার দিকে ধেয়ে যাচ্ছিলো, হঠাৎ বিকুর হাতে বন্দুক দেখে কি করবে বুঝতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো। বিকু আবার তখনই বন্দুকটা সবার দিকে তাক করে মুখেঢিঁচ্যাঢিঁচ্যাঢিঁচ্যাআওয়াজ করতে লাগল। তিনাই ফোঁপাতে ফোঁপাতে শুনতে পেল বাবা দাঁতে দাঁত ঘষে বলছেনবাঁদর ছেলে! হাতে পাই একবার, পিঠের ছাল তুলব
মেসো বসে হাত কামড়াচ্ছেন, মা কেঁদে কেঁদে মাসির কোলে প্রায় অজ্ঞান, বোম্বাসর্দার সমানে তড়পে যাচ্ছেবাচ্চাটাকে আছড়ে ফেলববলে, কিন্তু গুলিভরা বন্দুকের ভয়ে কিংবা ঘিরে থাকা প্যাসেঞ্জারদের ভয়ে, যে কারণেই হোক, আছাড় মারতে পারছে না বলে রাগে গরগর করছে।  বিকু এখন হাসিহাসি মুখ করে ময়লা বোঁচার রগের কাছে পিস্তলটা ঠেকিয়ে মাঝেমাঝেআক্কেল গুড়ুমবলে হাঁক পাড়ছে আরক্যাপ বন্দুকএর ট্রিগার টেপার চেষ্টা করছে বিকাশজেঠুর কাছে শুনেছে কথাটা। মানে জানে না, তবেগুড়ুমআছে তো, বন্দুক জাতীয় কিছু হবে নিশ্চয়ই
কিছুক্ষণ পিস্তলের নলের খোঁচা খেয়ে ময়লা বোঁচার মাথাটা হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল।  মনে পড়ল কাল রাত্রে গুলিগুলো বালিশের নিচে নিয়ে শুয়েছিল, রোজ রাত্রে যেমন শোয়। আজ সকালে উঠে দেখে উচ্ছে আর বিচ্ছু, দুই শয়তান ভাইপো পিস্তলটা নিয়ে লোফালুফি খেলছে। দেখেই লাফিয়ে পড়েছিল পিস্তলটা ওদের হাত থেকে কাড়বে লে। সেইটে উদ্ধার করেই তো সোজা চলে এসেছে বোম্বাদার ডেরায়। তার মানে, তার মানে, গুলিগুলো তো বালিশের নিচেই রয়ে গেছে!
মার দিয়া কেল্লা মার দিয়া কেল্লা একশোয় পাওয়া গেলো গোল্লাগাইতে গাইতে বিকুকে কোলে  নিয়েই একপাক ঘুরে নিলো বোঁচা। খুব আনন্দ হলে ছোটবেলা থেকেই এই গানটা গায় 
এত ফূর্তি কিসের? গুলি না খেয়েই মাথা গেল? তোকেও আছাড় মারব নাকি?”
গুরু, গুলি  বালিশের নিচে! এটা খালি গো এটা খালি। আহ্‌, বেঁচে গেলাম গো গুরু, এই বিট্লের হাতে গুলি খেয়ে মরলে পেস্টিজ দাউন হয়ে যেত গো, মুখ দেখাতে পারতাম না লজ্জায়”  
এটা খালি!!!” দশ-বারোটা গলা একসাথে চিৎকার করে উঠল। হতভম্ব বোম্বাদা পকেট থেকে চাকু বের করতে গিয়ে বুঝল দেরি হয়ে গেছে। দুদিক থেকে দুজন এসে সর্দারের দুটো হাত চেপে ধরল। বোঁচাকে কবজা করেছেন তিনাই-বিকুর বাবা আর মেসো। বাকি দুজন, মানে, সন্তু আর ফাটকা তো দুধভাত। ওরা নিজেরাই সিটে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। আহা! বেচারারা লাইনে নতুন, গণধোলাইয়ের গল্প অনেক শুনেছে, আজ প্রথমবার ওদের কপালে জুটবে লে ভয় পাচ্ছে
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওদের চারজনের কারো ভাগ্যেই গণধোলাই জুটল না। সিনেমায় অ্যাকশান সিনের ক্লাইম্যাক্সে যেভাবে পুলিশবাহিনী উপস্থিত হয়, তিনাইদের কম্পার্টমেণ্টে সেইভাবে ঢুকলেন কালো-কোট টিকিট পরীক্ষক, সঙ্গে পাঁচজন পুলিশ। ভদ্রলোক যখন ডাকাতির খবর পান, তখন এসি কোচে ছিলেন। পুলিশ জোগাড় করে আসতে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।
সবকটাই ধরা পড়েছে তো? শুনলাম নাকি ট্রেন ওড়াবে বলে হুমকি দিচ্ছিল? ব্যাগ সার্চ করে দেখেছেন বোমা-টোমা  কিছু আছে কিনা?”
এবার বাবা মুখ খুললেনআমরা মশাই সাধারণ মানুষ, ডাকাতের ব্যাগ সার্চ করা তো দূরের কথা, তাদের টিকি ছোঁওয়ারও বুকের পাটা আমাদের আছে নাকি? নেহাৎ আমার বাচ্চা ছেলেটা ডাকাতের কোলে উঠে বন্দুকটা বাগালো, তাই তো এদের আপনারা এসে দেখতে পেলেন। নইলে এখন আমাদের কপাল চাপড়াতে হত
ডাকাতের কোলে? বাবা, তো খাসা ছেলে! দেখি সোনা, কোলে এসো  তো, কি সাহস এই বয়সে!”
তোমার কোলে যাব কেন? তোমার কাছে ক্যাপ বন্দুক আছে? ওই কাকুর কাছে কত ভালো বন্দুক আছে। দাও না, দাও নাকরে বিকু আবার বায়না শুরু করল  
এরপরের ঘটনাগুলো পরপর ঘটে গেল। বিকুর বায়নায় অতিষ্ঠ হয়ে বাবা ঠাস করে চড় বসালেন ওর গালে চড় খেয়ে বিকু চিৎকার জুড়লো আর পুলিশের হাত থেকে বোঁচার বন্দুক কাড়ার চেষ্টা করতে লাগল। টিকিট পরীক্ষক হৈ হৈ করে উঠলেনএই এই, না বাবা, বন্দুক নয়, আরে হাতের ছাপ রয়ে যাবে যে! সেই ছাপ টেনে এনে বাচ্চাটাকে থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাছারি করাবে রে, হে হে”! ব্যস, আর যায় কোথায়! রে রে করে তেড়ে এল কম্পার্টমেণ্টের লোকজন।
ইয়ার্কি পেয়েছেন? ডাকাত ধরার কাজ রেলের আর পুলিশের, আপনারা তো ডাকাত পড়ার কথা শুনে ভয়ে ঠাণ্ডা গাড়িতে সেঁধিয়েছিলেন,”
ওইটুকু ছেলে, বুঝে হোক, না বুঝে হোক, ডাকাতগুলোকে আটকেছিল, ওর জন্যই আমরা সর্বস্ব ফিরে পেলাম, এখন আপনারা দুধের শিশুকে থানা-পুলিশ দেখাচ্ছেন?”
হিউম্যান রাইট্ কমিশনের নাম শুনেছেন? ক্রেতা সুরক্ষা আদালত কি জিনিস জানেন? নিজেদের নাম দেখতে চান ওসব জায়গায়?”

টিকিট পরীক্ষক ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছিলেন, আর পারলেন না, হাত জোড় করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন বিকুর কাছে। বিকু তখন মায়ের পাশে বসে খুব মন দিয়ে ক্রিম বিস্কুটের ক্রিম চেটে চেটে খাচ্ছে।