Monday, 30 January 2017

কুটুন এবং কেশচর্চা

একরত্তি মেয়ে কুটুন। বছরতিনেকের কিছুটা কম হবে বয়স, একমাথা কোঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, দেখে মনে হবে জন্মের পর থেকে সে চুলে তেল-সাবান-শ্যাম্পু-চিরুনি কিচ্ছুটি পড়েনি। তা কিন্তু মোটেই নয়। রোজ সকালে চানের আগে তাকে জাপটে ধরে তার মাথায় বেশ করে তেল মাখানোর চেষ্টা করা হয়। এই কাজটি কুটুনের ভয়ানক অপছন্দের। ফাঁক পেলেই সে মায়ের নাগাল এড়িয়ে দৌড়ে পালায়, নিজের ভাষায় "আমায় ধরতে পারে-এ-এ না" বলতে বলতে (কুটুনের মাতৃভাষা এবং তার নিজের ভাষার মধ্যে এখনও কিঞ্চিৎ ফারাক রয়ে গেছে)। দৌড়ে পালানোর সময় আবার আড়ে আড়ে পিছনে চেয়ে দেখে মা-ও দৌড়ে আসছে কিনা। মা যদি আসনপিঁড়ি হয়ে একজায়গায় বসে থাকেন তবে তো মজাটাই মাটি! মেয়ের মজা বাড়িয়ে দিতে অগত্যা মা-কেও দৌড়ের উদ্যোগ নিতে হয়।
এ হল চানের আগের কাহিনী। চান সারা হলে ঝাঁকড়া-চুলো মাথাখানা ঘষে ঘষে মুছিয়ে রোদে শুকোনো হয়। সে আবার আরেক যুদ্ধ। মেয়ে যত বলে রোদে থাকবে না, মায়ের তত রোখ চেপে যায় অন্তত চুলগুলো শুকোনো অব্দি তাকে নিয়ে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকবেনই। গুঁতোগুঁতির শেষে মাথাটা কোনোমতে অর্ধেক শুকনো হলেই কুটুন ছুট্টে ঘরে ঢুকে পড়ে।
এরপর শুরু চুল আঁচড়ানোর পালা। মা একখানা চিরুনি হাতে তুললেই মেয়েরও একখানা নেওয়া প্রয়োজন। "আমি আমি" অথবা 'তুতুন চিউনি দাও" বলে লাফালাফি জুড়ে দেয়। একখানা পছন্দের চিরুনি আছে তার। সেইটেই হাতে নেওয়া চাই। ঐ চিরুনি সমেত তাকে যা-ইচ্ছে-তাই করতে দাও, দেখবে ঘরে কেমন নিঃশব্দ শান্তি বিরাজ করছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে (ড্রেসিং টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছে প্রবল, বাবার কাছে একদিন রামবকুনি খেয়েছিল, তারপর থেকে ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখে) চিরুনি নিয়ে হরেকরকম কেরামতি দেখায়। উৎসাহের আতিশয্যে আয়নায় বারকয়েক জিভও বুলিয়ে নেয় সে। এসব যাচ্ছেতাই কাণ্ড কিছুক্ষণ চলার পর মা-কে লাগাম টেনে ধরতে হয়। দুই হাঁটুর মধ্যিখানে কুটুনের মাথা চেপে ধ'রে, কিংবা মেয়ের বাবা বাড়িতে থাকলে তাঁর কোলে মেয়েকে বসিয়ে চুল আঁচড়ানোর চেষ্টা চলে। কোঁকড়া-ঝাঁকড়া-পাখির বাসা চুল, তাকে কি সহজে পোষ মানানো যায়? মাথার বাঁদিকের চুলের জট ছাড়াতে না ছাড়াতে ডানদিকের চুলগুলোয় গিঁট বেঁধে যায়। যদি বা কোনোদিন পুরো মাথাটা ভালো করে আঁচড়ে 'বাবুসোনা' গোছের একটা আদল মেয়ের মুখে আনতে পারা যায়, হয়ত বা ডগমগ হয়ে মেয়ের মুখখানা আয়নার সামনে ধরে মা সবে বলতে শুরু করেছেন,
"কি সুন্দর লাগছে রে কুটুনকে, রোজ চুল আঁচড়ালে কত ভালো লাগে বলো তো সোনা"
অমনি হাসি-হাসি মুখ করে কুটুন নিজের মাথাটা ঝড়ের বেগে ডানদিকে-বাঁদিকে ঝাঁকাতে থাকে, ব্যস, মায়ের এতক্ষণের চেষ্টা জলে যায়। সেই চেনা পাখির বাসাটা যখন আবার মাথায় ফিরে আসে, মেয়ে তখন একগাল হেসে আয়না দেখিয়ে বলে,
"বাঃ বাঃ, তি সুন্দল!"
কুটুনের সৌন্দর্য্যবোধ যে কিঞ্চিৎ প্রথা-ভাঙ্গা, সেকথা এতক্ষণে মায়ের মগজে ঢোকে।
ধরো, বিকেলবেলায় কোথাও বেড়াতে যাওয়া হবে, কিংবা সেজেগুজে বিয়েবাড়ি যাওয়া হবে। কুটুনের ঝালর দেওয়া বাহারি জামার সঙ্গে রঙ মিলিয়ে মা ভারি শখ করে গুটিকয় ক্লিপ বা হেয়ারব্যাণ্ড কিনেছেন। নিজের সাজুগুজু মেটার পর আহ্লাদ করে মেয়েকে সাজিয়েছেন ধৈর্য্য ধ'রে। খরগোশের মত দৌড়ে বেড়ানো মেয়ে এবং নিজের সাজের ভার সামলে সে কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করা যে কি ঝকমারি তা বলে বোঝানো মায়ের কম্ম নয়। মেয়ের চাহিদামতো কপালে টিপ, জামার কোণায় 'ফস্‌', অর্থাৎ পারফিউম (অবশ্যই মিছিমিছি), সবই দেওয়া হয়েছে, সবশেষে মায়ের নিজের চাহিদা অনুসারে মাথায় ক্লিপটি বা হেয়ারব্যাণ্ডটি লাগানো হল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হল, সাজটি মেয়ের মনে ধরেছে। আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ এদিকে হেলে ওদিকে ঘুরে জামার কুঁচি দু'আঙ্গুলে ধ'রে প্রজাপতির মত নেচে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা হল। তারপরেই নজর গেল মাথায় লাগানো ক্লিপ বা ব্যাণ্ডের দিকে। অমন সুন্দর জিনিসটা মাথার ওপর উঠে বসে থাকবে? হাতের নাগালে পেলে বেশ একটু নেড়েচেড়ে চিবিয়ে চেখে দেখা যেত,  যেমন চেখে দেখা যায় জামার জরি-চুমকির নকশাগুলোকে।
ব্যস, শুরু হয়ে যাবে নতুন যুদ্ধ। কুটুনের চেষ্টা হবে মাথা থেকে ব্যাণ্ডটাকে খুলে হাতে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার, আর মায়ের প্রাণপণ চেষ্টা হবে সেটাকে মেয়ের মাথাতেই রেখে জিনিসটার সৌন্দর্য্য বাড়ানোর। এই যুদ্ধে মাঝেমাঝে বাবাও নেমে পড়েন, কোন পক্ষে, সেটা অবশ্য নিজেও জানেন না।
রণক্লান্ত মা যখন হাল ছেড়ে গজগজ করতে থাকেন,
"থাক ভূতের মতো, কিচ্ছু বাঁধতে হবে না, সব চুল কেটে ন্যাড়া করে দেব, দরকার নেই চুল রাখার" ইত্যাদি ইত্যাদি,
কুটুন হয়তো তখন বিজয়ী হাসি হেসে মায়ের ব্যাগ কাঁধে এগিয়ে চলেছে সদর দরজার দিকে।
মেয়ের ক্ষিধে পেলে বিস্কুট, তেষ্টা পেলে জলের বোতল, বমি হলে পাল্টানোর জন্য বাড়তি জামা, এসব ঝোলায় ভ'রে যখন ব্যাগ-বোঁচকা-সমেত রওনা হচ্ছেন, তখনও কিন্তু মা সন্তর্পণে ক্লিপটাকে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে ভোলেন না, বিয়েবাড়িতে ঢোকার আগেও যদি বুঝিয়েসুজিয়ে একটু সাজানো যায় মেয়েটাকে। পয়সা দিয়ে কেনা জিনিস, কাজে না লাগলে খারাপ লাগে যে!
এসব হ্যাপা সামলে মাঝেমাঝে মায়ের সত্যিই মনে হয়, "দিই চুলগুলোকে কচকচ করে কেটে",
কিন্তু সত্যিই যখন মা বসেন মেয়ের চুল কাটতে (তাবড় তাবড় বিউটিশিয়ানের চেয়েও মা এ ব্যাপারে নিজেকে বেশি ভরসা করেন),তখন ইঞ্চিখানেক চুল কেটেই  মনে হয়, "আহা, এটুকু থাক, আর কাটবো না"।
কি জানি, হয়ত মায়ের মনটা তখন ভাবে, চুলগুলো আছে বলেই তো সেগুলোকে বাগ মানানোর জন্য এত লম্ফঝম্প, হৈ-চৈ। কাঁচি চালিয়ে সেগুলোকে উড়িয়ে দিলে এত কাণ্ড করার তো আর দরকারই পড়বে না। সারাদিনের রুটিনে একটা ফাঁক তৈরি হয়ে যাবে যে তবে! তার চেয়ে, এমনটাই চলুক, মা আর একফোঁটা মেয়ের এই চুল নিয়ে চুলোচুলি,হুড়োহুড়ি!!

No comments:

Post a Comment