Tuesday, 20 December 2016

একদিন বৃষ্টিতে

বৃষ্টিটা শুরু হল দ্যাখো! সারাদিন ধরে রাজ্যির মেঘ জড়ো করে এই সন্ধ্যেবেলায় জল ঢালতে লেগেছে! আপিস-ফেরতা লোকগুলো সব মাথা বাঁচিয়ে বাড়ি ঢুকবে কেমন করে বলো দিকি? হ্যাঁ, ভোররাত থেকে আকাশের মুখ গোমড়া বলে সক্কলে নিশ্চয়ই ছাতা বগলেই বেরিয়েছে বাড়ি থেকে, কিন্তু এ যা গাছ-উপড়োনো পাগুলে  হাওয়া বইছে থেকে থেকে, বৃষ্টি তো পেলয়-তাণ্ডব চালাচ্ছে চতুর্দিকে। ছাতার দল উল্টে উড়ে তেপান্তর পেরিয়ে যাবে গো!
ওই দ্যাখো দ্যাখো! চশমাওয়ালা আপিসবাবুটি বাস থেকে নেমে ছাতা খুললেন আর অমনি হাওয়ার তোড়ে ছাতা নিজেকে টকাস করে উলটে ফেললে! শিক-ক'খানা আস্ত রইবে কি আর! আহা গো, বাবুর চশমা যে জলে ঝাপসা হল! হোঁচট না খেয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারলে বাঁচেন। হাওড়া স্টেশনের সামনে এক-একখানা বাস এসে পেটভর্তি মানুষজনকে উগরে নামিয়ে দিচ্ছে, আর রাস্তায় শুরু হয়ে যাচ্ছে মাথা বাঁচানো দৌড়। ট্যাক্সি ধরার লাইনটা যেখানে দাঁড়ায় সেখানে মাথা গোঁজার একখানা সরু জায়গা আছে, তাতে লোক ঠাসাঠাসি ভিড় এখন। উল্টোনো ছাতা, ভাঙ্গা ছাতা, সব বগলদাবা করে ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চা সবাই সবার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ছে। এর-ওর ছাতার জল টপটপিয়ে গায়ে পড়ছে বটে, কেউ ফোঁস করছে না তাব'লে। গা তো আর শুকনো নেই, আরো দু'চার ফোঁটা জল নাহয় পড়লোই!
ভর সন্ধ্যেবেলা তো, পাঁচমিনিট পর পর বাড়ি ফেরার ট্রেনগুলো ছাড়ছে। কি আশ্চর্য, এই আকাশভাঙ্গা বৃষ্টিতেও সব ট্রেন ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ছাড়ছে। ঝড়জলের ডাক ছাপিয়ে মাইকে ট্রেনের ডাক কানে এলেই ট্যাক্সি-স্ট্যাণ্ডের ভিড়টা ককিয়ে উঠছে,
"এ হে হে, সুপারটা বেরিয়ে গেল। আজও রাইট টাইম?"
"আন্দোলনটাও পেলাম না। ধুত্তোর!"
আফসোস বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বৃষ্টিকে কাঁচকলা দেখিয়ে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ছে। কাঁধের ব্যাগের সম্পত্তিকে জলের আঁচ থেকে বাঁচাতে বাঁচাতে কিছু মানুষ ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে। ব্যাগটা না থাকলে দিব্যি ট্রেনটা পাওয়া যেত!
হট্টগোলের মাঝে কাঁখে বাচ্চা নিয়ে ওটা কে দাঁড়িয়ে গো? আহা, সঙ্গে একটা ছাতাও নেই। নিজের আঁচল দিয়ে কোনরকমে খুকিটাকে মুড়ে রেখেছে। ডানকাঁধে একখানা ঢাউস ব্যাগ। রোগা বউটা ব্যাগ আর খুকির  ভার সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। সঙ্গে কেউ নেই নাকি? কেমন ভীতু ভীতু চোখ তুলে চারপাশে তাকিয়ে দেখছে। কাঁখের বাচ্চাটা একবার আঁচল সরিয়ে মুখ তুলল। ওরে বাবা, দমকা হাওয়া দিয়েছে খুকির মাথা মুখ সব ভিজিয়ে। রোগা মা একখানা শাড়ীর আঁচল দিয়ে আর কতক্ষণ খুকিকে শুকনো রাখবে?এলোমেলো হাওয়াতে ভারি ভয় পেয়েছে খুকি। চুপটি করে মায়ের কাঁখে আঁচল জড়িয়ে ঝুলে আছে।
আর মেঘের আক্কেলখানাও বলিহারি বাপু! তর্জনগর্জন করে জল ঢালার আর সময় পেলে না? কেন হে? পথেঘাটে যে যেখানে আছে ঘরে ঢুকে পড়ার পর বৃষ্টি-বাজের যাত্রাপালা শুরু হলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? দ্যাখো দিকি, ঐটুকু একখানা গুঁড়োকে নিয়ে রোগা মা-টা এখন কেমন করে ট্রেনে উঠবে? আশপাশে দাঁড়ানো বাবু-রা বৃষ্টি থামার আশা ছেড়ে দিয়ে কাকভেজা হয়েই ট্রেন ধরতে দৌড়চ্ছেন। ওনারা কেউ খুকি আর তার মা-কে একখানা ছাতা ধার দিতে পারেন না? ওহো, ছাতা দিয়ে দিলে নিজেদের মাথাগুলো বাঁচবে কেমন করে? কি আর করা যাবে? এরা তাহলে দাঁড়িয়েই থাক। আচ্ছা, ঐ ঢাউস ব্যাগখানায় কি একখানা শুকনো গামছা বা কাপড় নেই? সেটা দিয়ে খুকিকে ঢেকে একদৌড়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারে তো! যাবে সেই দু'ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কালনা। রাত সাড়ে আটটার পর লোকাল ট্রেন আর নেই। একলা মেয়ে, বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরবে কি করে গো? বউটা চারপাশে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। ছাতাওয়ালা ভালমানুষ কাউকে পায় কিনা দেখছে? নাকি শুকনো জায়গা খুঁজছে ব্যাগ খুলে শুকনো কাপড় বার করবে বলে? বাঁদিকে একটা ডিমওয়ালা আর একটা ফলওয়ালা তাদের ঠেলাগাড়িদুটোকে কোনরকমে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ওদেরকে বলতে পারে তো বউটা, খুকিকে একটু কোলে নেওয়ার জন্য? অবিশ্যি দিনকাল তো ভালো নয় মোটেই, কে যে আসল ফলওয়ালা, আর কে যে ভেকের আড়ালে মুখ লুকোনো ছেলেধরা, বোঝা দায়! যদি খুকিকে ট্যাঁকে গুঁজে সে বাছাধন দৌড় মারে? না না বাপু, থাক খুকি ভিজে জামা গায়ে, ঘণ্টাখানেক ভিজে জামা পরে থাকলে কিছু নিমুনিয়া হবেনা খুকির। ছেলেধরাকে মেয়ে ধরতে দেওয়ার চাইতে নিমুনিয়া ঢের ভালো, তাই নয় কি?
আচ্ছা, ফলওয়ালা আর ডিমওয়ালার সঙ্গে ঐ সিড়িঙ্গে চেহারার ছোকরাটি কে হে? দেখে তো ঠিক ফলওয়ালাদের ভাই-বন্ধু মনে হচ্ছে না। দিব্যি ছুঁচোলো গোঁফ, গালে বাসি দাড়ি নেই, গায়ে রোদে পোড়া তামাটে দাগ নেই, লোকটা কে বলো তো? গামছা-কাঁধে ফলওয়ালা আর মাথায় ফেট্টি ডিমওয়ালার কানে কিসব ফিসফিসোচ্ছে আর আড়ে আড়ে মায়ের কোলের গুঁড়োর পানে চাইছে? হ্যাঁ, লোকটার পরনের কাপড় এমন কিছু গোলমেলে নয়, যা দেখে বোঝা যাবে বাছাধন একটি মার্কামারা ছেলেধরা, তবে কিনা সপসপে জামাপ্যাণ্টে, আর পাঁচটা লোকে যেমন পড়িমরি করে বাড়ি, থুড়ি, ট্রেনের পানে দৌড়ুচ্ছে, তা না করে এ লোকটা অমন ফিসফিসোচ্ছে কেন?
গুঁড়োর মা-ও দেখি ব্যাপারখানা নজর করেছে। গুঁড়োকে আর নিজেকে পরনের ভিজে কাপড়খানা দিয়ে যতটা পারে ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখছে। তবে কিনা ভিজে ন্যাতা একখানা শাড়ী কি আর পশমের চাদরের কাজ করে গো বাছা?
ও মা, কি কাণ্ড! লোকটা যে গুঁড়ো আর তার মায়ের দিকেই আসছে গো! হাতে আবার ইয়াব্বড় একখানা পলিথিন চাদর। ফেরিওয়ালারা যেমন চাদর দিয়ে তাদের পসরা আগলায় বিষ্টিবাদলা হলে, তেমন একখানা চাদর লোকটার হাতে। কি করবে বলো তো ওটা দিয়ে? মতলব বোঝা যাচ্ছে না। খুকিকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে চাদরে বেঁধে দৌড় লাগাবে না তো? বলা যায় না কিছুই। যা দিনকাল! খুকির মা-ও তো দেখি সিঁটিয়ে রয়েছে। ব্যাগ আগলাবে না মেয়ে আগলাবে বুঝে উঠতে পারছে না বোধহয়।
ঐ দ্যাখো গো, লোকটা আবার রোগা মা-কে কিসব জানি বোঝাতে লেগেছে। বউটাও দেখি ভালমানুষের মত ঢক ঢক করে
ঘাড় নাড়ছে। মুখটাও একটু চকচক করছে কি? ও বউ, অমন গলে যাসনি লো, কোথাকার কে এক অচেনা ছোকরা এসে দুটো দরদমাখানো কথা বলল, আর অমনি ফ্যাকফেকিয়ে হেসে ফেলবি, এ কেমনধারা ব্যাভার? আবার ঐ নোংরা কেলেকুচ্ছিত চাদরখানা খুকির গায়ে জুত করে জড়াচ্ছে দ্যাখো! ম্যা গো, ঘেন্নাপিত্তি সব বাড়িতে রেখে এসেছিস নাকি রে? নাহয় বিষ্টিবাদলায় মেয়ে কোলে আতান্তরেই পড়েছিস, তা বলে অচেনা ফিরিওয়ালার নোংরা পলিথিন দিয়ে মেয়েকে মুড়তে হবে?
অবিশ্যি উপায়ই বা কি আর? খুকি যদি এতে নিমুনিয়া থেকে বাঁচে, হোক না ফেরিওয়ালার ঘেমো গা আর হতকুচ্ছিত ঠেলাগাড়ি!
সে নাহয় মেয়েকে শুকনো চাদরে মোড়া হল, কিন্তু চেনা নেই জানা নেই, একটা উটকো লোকের সঙ্গে খুকি কাঁধে বউটা চলল কোথায়? স্টেশনের দিকেই এগোচ্ছে দেখি! সব্বোনাশ! ছোকরাকে আবার সাকিনঠিকানা বলে বসেনি তো? 'একলা মেয়েলোক' বলে আলগা দরদ দেখিয়ে বদলোকটা বুঝি বউটার বাড়ির রাস্তা জেনে নিয়েছে গো! হায় হায়, কি হবে এবার? যদি সত্যি ছেলেধরা হয়? খুকিকে যদি বাড়ি থেকে চুরি করে  নিয়ে পালায়?
আহ্‌হ্‌, দ্যাখোই না বাপু চুপটি করে, কি হয় শেষটায়। কূটকচালে মনখানার সবেতেই বড় সন্দবাতিক। ঐত্তো, প্ল্যাটফর্মের শুকনো ডাঙ্গায় মা-মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে সিড়িঙ্গে ফিরে আসছে। পলিথিন চাদরটা ফেরত নিয়ে বেশ করে নিজের গায়ে জড়িয়েছে এবার। এখন তো চেহারাখানাও অত বদলোকের মত লাগছে না। দিব্যি বিষ্টিধোওয়া ভালমানুষের চেহারা। তোমাদের মনে বড় প্যাঁচ, বুঝলে? পরের উব্‌গার করা নিরীহ ছোকরাকে, বলা নেই কওয়া নেই, চোর-ছ্যাঁচোড় বানিয়ে দিচ্ছিলে আরেকটু হলেই! ধন্যি মানুষ যাহোক!
জেগে স্বপন দেখতে বড় ভালবাস, না? আর স্বপনই যদি দেখবে, কালো-কে সাদা করার স্বপন দেখতে পারো না? যত্তসব! নাও, বিষ্টি ধরে এল, এইবেলা মানে মানে বাড়ি ঢোকো দিকিনি সব! ওদিকে গুঁড়ো আর তার মা-র ট্রেনও ছাড়লো ব'লে। বসার জায়গাও পেয়েছে দিব্যি। নাঃ, বঊটার ভাগ্য বেশ ভালোই বলতে হবে, নইলে আর বাদুড়ঝোলা ট্রেনেও গ্যাঁট হয়ে বসার একখানা জায়গা পায়! এখন ভালোয় ভালোয় বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরের বউ ঘরে ফিরুক, তাহলেই রক্ষে। ওই তো, ট্রেন ছেড়েছে। দুগ্‌গা দুগ্‌গা!!


('আমি অনন্যা' পত্রিকা [ISSN:2394-4307], ধানবাদ- October-December 2016 সংখ্যায় প্রকাশিত)

3 comments: