Tuesday, 20 December 2016

একদিন বৃষ্টিতে

বৃষ্টিটা শুরু হল দ্যাখো! সারাদিন ধরে রাজ্যির মেঘ জড়ো করে এই সন্ধ্যেবেলায় জল ঢালতে লেগেছে! আপিস-ফেরতা লোকগুলো সব মাথা বাঁচিয়ে বাড়ি ঢুকবে কেমন করে বলো দিকি? হ্যাঁ, ভোররাত থেকে আকাশের মুখ গোমড়া বলে সক্কলে নিশ্চয়ই ছাতা বগলেই বেরিয়েছে বাড়ি থেকে, কিন্তু এ যা গাছ-উপড়োনো পাগুলে  হাওয়া বইছে থেকে থেকে, বৃষ্টি তো পেলয়-তাণ্ডব চালাচ্ছে চতুর্দিকে। ছাতার দল উল্টে উড়ে তেপান্তর পেরিয়ে যাবে গো!
ওই দ্যাখো দ্যাখো! চশমাওয়ালা আপিসবাবুটি বাস থেকে নেমে ছাতা খুললেন আর অমনি হাওয়ার তোড়ে ছাতা নিজেকে টকাস করে উলটে ফেললে! শিক-ক'খানা আস্ত রইবে কি আর! আহা গো, বাবুর চশমা যে জলে ঝাপসা হল! হোঁচট না খেয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারলে বাঁচেন। হাওড়া স্টেশনের সামনে এক-একখানা বাস এসে পেটভর্তি মানুষজনকে উগরে নামিয়ে দিচ্ছে, আর রাস্তায় শুরু হয়ে যাচ্ছে মাথা বাঁচানো দৌড়। ট্যাক্সি ধরার লাইনটা যেখানে দাঁড়ায় সেখানে মাথা গোঁজার একখানা সরু জায়গা আছে, তাতে লোক ঠাসাঠাসি ভিড় এখন। উল্টোনো ছাতা, ভাঙ্গা ছাতা, সব বগলদাবা করে ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-বাচ্চা সবাই সবার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ছে। এর-ওর ছাতার জল টপটপিয়ে গায়ে পড়ছে বটে, কেউ ফোঁস করছে না তাব'লে। গা তো আর শুকনো নেই, আরো দু'চার ফোঁটা জল নাহয় পড়লোই!
ভর সন্ধ্যেবেলা তো, পাঁচমিনিট পর পর বাড়ি ফেরার ট্রেনগুলো ছাড়ছে। কি আশ্চর্য, এই আকাশভাঙ্গা বৃষ্টিতেও সব ট্রেন ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ছাড়ছে। ঝড়জলের ডাক ছাপিয়ে মাইকে ট্রেনের ডাক কানে এলেই ট্যাক্সি-স্ট্যাণ্ডের ভিড়টা ককিয়ে উঠছে,
"এ হে হে, সুপারটা বেরিয়ে গেল। আজও রাইট টাইম?"
"আন্দোলনটাও পেলাম না। ধুত্তোর!"
আফসোস বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বৃষ্টিকে কাঁচকলা দেখিয়ে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ছে। কাঁধের ব্যাগের সম্পত্তিকে জলের আঁচ থেকে বাঁচাতে বাঁচাতে কিছু মানুষ ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে। ব্যাগটা না থাকলে দিব্যি ট্রেনটা পাওয়া যেত!
হট্টগোলের মাঝে কাঁখে বাচ্চা নিয়ে ওটা কে দাঁড়িয়ে গো? আহা, সঙ্গে একটা ছাতাও নেই। নিজের আঁচল দিয়ে কোনরকমে খুকিটাকে মুড়ে রেখেছে। ডানকাঁধে একখানা ঢাউস ব্যাগ। রোগা বউটা ব্যাগ আর খুকির  ভার সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। সঙ্গে কেউ নেই নাকি? কেমন ভীতু ভীতু চোখ তুলে চারপাশে তাকিয়ে দেখছে। কাঁখের বাচ্চাটা একবার আঁচল সরিয়ে মুখ তুলল। ওরে বাবা, দমকা হাওয়া দিয়েছে খুকির মাথা মুখ সব ভিজিয়ে। রোগা মা একখানা শাড়ীর আঁচল দিয়ে আর কতক্ষণ খুকিকে শুকনো রাখবে?এলোমেলো হাওয়াতে ভারি ভয় পেয়েছে খুকি। চুপটি করে মায়ের কাঁখে আঁচল জড়িয়ে ঝুলে আছে।
আর মেঘের আক্কেলখানাও বলিহারি বাপু! তর্জনগর্জন করে জল ঢালার আর সময় পেলে না? কেন হে? পথেঘাটে যে যেখানে আছে ঘরে ঢুকে পড়ার পর বৃষ্টি-বাজের যাত্রাপালা শুরু হলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত? দ্যাখো দিকি, ঐটুকু একখানা গুঁড়োকে নিয়ে রোগা মা-টা এখন কেমন করে ট্রেনে উঠবে? আশপাশে দাঁড়ানো বাবু-রা বৃষ্টি থামার আশা ছেড়ে দিয়ে কাকভেজা হয়েই ট্রেন ধরতে দৌড়চ্ছেন। ওনারা কেউ খুকি আর তার মা-কে একখানা ছাতা ধার দিতে পারেন না? ওহো, ছাতা দিয়ে দিলে নিজেদের মাথাগুলো বাঁচবে কেমন করে? কি আর করা যাবে? এরা তাহলে দাঁড়িয়েই থাক। আচ্ছা, ঐ ঢাউস ব্যাগখানায় কি একখানা শুকনো গামছা বা কাপড় নেই? সেটা দিয়ে খুকিকে ঢেকে একদৌড়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারে তো! যাবে সেই দু'ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কালনা। রাত সাড়ে আটটার পর লোকাল ট্রেন আর নেই। একলা মেয়ে, বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরবে কি করে গো? বউটা চারপাশে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। ছাতাওয়ালা ভালমানুষ কাউকে পায় কিনা দেখছে? নাকি শুকনো জায়গা খুঁজছে ব্যাগ খুলে শুকনো কাপড় বার করবে বলে? বাঁদিকে একটা ডিমওয়ালা আর একটা ফলওয়ালা তাদের ঠেলাগাড়িদুটোকে কোনরকমে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ওদেরকে বলতে পারে তো বউটা, খুকিকে একটু কোলে নেওয়ার জন্য? অবিশ্যি দিনকাল তো ভালো নয় মোটেই, কে যে আসল ফলওয়ালা, আর কে যে ভেকের আড়ালে মুখ লুকোনো ছেলেধরা, বোঝা দায়! যদি খুকিকে ট্যাঁকে গুঁজে সে বাছাধন দৌড় মারে? না না বাপু, থাক খুকি ভিজে জামা গায়ে, ঘণ্টাখানেক ভিজে জামা পরে থাকলে কিছু নিমুনিয়া হবেনা খুকির। ছেলেধরাকে মেয়ে ধরতে দেওয়ার চাইতে নিমুনিয়া ঢের ভালো, তাই নয় কি?
আচ্ছা, ফলওয়ালা আর ডিমওয়ালার সঙ্গে ঐ সিড়িঙ্গে চেহারার ছোকরাটি কে হে? দেখে তো ঠিক ফলওয়ালাদের ভাই-বন্ধু মনে হচ্ছে না। দিব্যি ছুঁচোলো গোঁফ, গালে বাসি দাড়ি নেই, গায়ে রোদে পোড়া তামাটে দাগ নেই, লোকটা কে বলো তো? গামছা-কাঁধে ফলওয়ালা আর মাথায় ফেট্টি ডিমওয়ালার কানে কিসব ফিসফিসোচ্ছে আর আড়ে আড়ে মায়ের কোলের গুঁড়োর পানে চাইছে? হ্যাঁ, লোকটার পরনের কাপড় এমন কিছু গোলমেলে নয়, যা দেখে বোঝা যাবে বাছাধন একটি মার্কামারা ছেলেধরা, তবে কিনা সপসপে জামাপ্যাণ্টে, আর পাঁচটা লোকে যেমন পড়িমরি করে বাড়ি, থুড়ি, ট্রেনের পানে দৌড়ুচ্ছে, তা না করে এ লোকটা অমন ফিসফিসোচ্ছে কেন?
গুঁড়োর মা-ও দেখি ব্যাপারখানা নজর করেছে। গুঁড়োকে আর নিজেকে পরনের ভিজে কাপড়খানা দিয়ে যতটা পারে ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখছে। তবে কিনা ভিজে ন্যাতা একখানা শাড়ী কি আর পশমের চাদরের কাজ করে গো বাছা?
ও মা, কি কাণ্ড! লোকটা যে গুঁড়ো আর তার মায়ের দিকেই আসছে গো! হাতে আবার ইয়াব্বড় একখানা পলিথিন চাদর। ফেরিওয়ালারা যেমন চাদর দিয়ে তাদের পসরা আগলায় বিষ্টিবাদলা হলে, তেমন একখানা চাদর লোকটার হাতে। কি করবে বলো তো ওটা দিয়ে? মতলব বোঝা যাচ্ছে না। খুকিকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে চাদরে বেঁধে দৌড় লাগাবে না তো? বলা যায় না কিছুই। যা দিনকাল! খুকির মা-ও তো দেখি সিঁটিয়ে রয়েছে। ব্যাগ আগলাবে না মেয়ে আগলাবে বুঝে উঠতে পারছে না বোধহয়।
ঐ দ্যাখো গো, লোকটা আবার রোগা মা-কে কিসব জানি বোঝাতে লেগেছে। বউটাও দেখি ভালমানুষের মত ঢক ঢক করে
ঘাড় নাড়ছে। মুখটাও একটু চকচক করছে কি? ও বউ, অমন গলে যাসনি লো, কোথাকার কে এক অচেনা ছোকরা এসে দুটো দরদমাখানো কথা বলল, আর অমনি ফ্যাকফেকিয়ে হেসে ফেলবি, এ কেমনধারা ব্যাভার? আবার ঐ নোংরা কেলেকুচ্ছিত চাদরখানা খুকির গায়ে জুত করে জড়াচ্ছে দ্যাখো! ম্যা গো, ঘেন্নাপিত্তি সব বাড়িতে রেখে এসেছিস নাকি রে? নাহয় বিষ্টিবাদলায় মেয়ে কোলে আতান্তরেই পড়েছিস, তা বলে অচেনা ফিরিওয়ালার নোংরা পলিথিন দিয়ে মেয়েকে মুড়তে হবে?
অবিশ্যি উপায়ই বা কি আর? খুকি যদি এতে নিমুনিয়া থেকে বাঁচে, হোক না ফেরিওয়ালার ঘেমো গা আর হতকুচ্ছিত ঠেলাগাড়ি!
সে নাহয় মেয়েকে শুকনো চাদরে মোড়া হল, কিন্তু চেনা নেই জানা নেই, একটা উটকো লোকের সঙ্গে খুকি কাঁধে বউটা চলল কোথায়? স্টেশনের দিকেই এগোচ্ছে দেখি! সব্বোনাশ! ছোকরাকে আবার সাকিনঠিকানা বলে বসেনি তো? 'একলা মেয়েলোক' বলে আলগা দরদ দেখিয়ে বদলোকটা বুঝি বউটার বাড়ির রাস্তা জেনে নিয়েছে গো! হায় হায়, কি হবে এবার? যদি সত্যি ছেলেধরা হয়? খুকিকে যদি বাড়ি থেকে চুরি করে  নিয়ে পালায়?
আহ্‌হ্‌, দ্যাখোই না বাপু চুপটি করে, কি হয় শেষটায়। কূটকচালে মনখানার সবেতেই বড় সন্দবাতিক। ঐত্তো, প্ল্যাটফর্মের শুকনো ডাঙ্গায় মা-মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে সিড়িঙ্গে ফিরে আসছে। পলিথিন চাদরটা ফেরত নিয়ে বেশ করে নিজের গায়ে জড়িয়েছে এবার। এখন তো চেহারাখানাও অত বদলোকের মত লাগছে না। দিব্যি বিষ্টিধোওয়া ভালমানুষের চেহারা। তোমাদের মনে বড় প্যাঁচ, বুঝলে? পরের উব্‌গার করা নিরীহ ছোকরাকে, বলা নেই কওয়া নেই, চোর-ছ্যাঁচোড় বানিয়ে দিচ্ছিলে আরেকটু হলেই! ধন্যি মানুষ যাহোক!
জেগে স্বপন দেখতে বড় ভালবাস, না? আর স্বপনই যদি দেখবে, কালো-কে সাদা করার স্বপন দেখতে পারো না? যত্তসব! নাও, বিষ্টি ধরে এল, এইবেলা মানে মানে বাড়ি ঢোকো দিকিনি সব! ওদিকে গুঁড়ো আর তার মা-র ট্রেনও ছাড়লো ব'লে। বসার জায়গাও পেয়েছে দিব্যি। নাঃ, বঊটার ভাগ্য বেশ ভালোই বলতে হবে, নইলে আর বাদুড়ঝোলা ট্রেনেও গ্যাঁট হয়ে বসার একখানা জায়গা পায়! এখন ভালোয় ভালোয় বাচ্চাটাকে নিয়ে ঘরের বউ ঘরে ফিরুক, তাহলেই রক্ষে। ওই তো, ট্রেন ছেড়েছে। দুগ্‌গা দুগ্‌গা!!


('আমি অনন্যা' পত্রিকা [ISSN:2394-4307], ধানবাদ- October-December 2016 সংখ্যায় প্রকাশিত)

Friday, 25 November 2016

একটা একলা গল্প

লিখি লিখি করেও বেশ ক’দিন  কেটে গেল তোকে লিখতে বসা হয়নি। Compose Mail এ ঢুকেও কোনো না কোনো সমস্যায় ল্যাপি বন্ধ করে দিতে হয়েছে রোজই। কোনোদিন পাওয়ার অফ তো কোনোদিন দীপের সঙ্গে ঝগড়া করে ফোন মুড দুটোই অফ, এইসব আর কি! আজ আমি ফোন অফ করে লিখতে বসেছি। আজ তোকে লিখবোই।
মনে আছে তোর, হস্টেলে একবার ইঁদুরের প্রবল উৎপাত শুরু হয়েছিল? রান্নাঘরের যত প্লাস্টিকের কৌটো কেটে টুকরো করছিল? আমার দুটো ওড়না ওদের কবলে গিয়েছিল, তুই সান্ত্বনা দিয়েছিলি আমায়, “ওরা এটা জেনেবুঝে করেনি, তুই তো ওদের ব্যক্তিগত শত্রু নোস, তাছাড়া এই কাটাকুটিগুলো না করলে ওরা বাঁচবে না রে”,
পেস্ট-ক্লেশনিবারণী সমিতির সভানেত্রী বানিয়েছিলাম তোকে তক্ষুণি।
তোর সেই আদরের Jerry-রা গত কিছুদিন ধরে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
উৎপাতের শুরু মাসখানেক আগে। তুই তো জানিস, পুরনো ম্যাগাজিন জমানো আমার স্বভাব। মাইক্রোওয়েভের বাক্সটায় সব জড়ো করা থাকে। একদিন মাঝরাত্রে বাক্সের ভেতর থেকে খুটখাট আওয়াজ এল। তখন উঠে তদন্ত করার প্রশ্নই ওঠে না, চাদরে কান ঢেকে উল্টোদিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সন্ধেয় রান্নাঘরে দেখি দুটো ডালের ঠোঙা ফাটা, শেল্‌ফে ডাল ছড়ানো। আগের রাত্রের আওয়াজটার কথা মনে পড়ল। বাক্স ঘেঁটে কোনো প্রাণী চোখে পড়ল না, তবে বেশ কিছু পত্রিকা কুচি কুচি করে কাটা। বুঝলাম Jerries are back in my life. কিন্তু শ্রীমুখ দর্শন হল না। বাবাজিরা এখন কোথায় কম্ম সারছেন তাঁরাই জানেন। আমি লেগে পড়লাম বই ঝাড়াইয়ের কাজে। এরপর দিনকয়েক কোথাও কিছু চোখে পড়লনা। একদিন অফিস থেকে ফিরে চা নিয়ে টিভি চালিয়ে বসেছি, সাঁ করে কী একটা ঢুকে গেল ছোট ঘরের ভেতরে। ওই ঘরটায় বাড়িওয়ালার কিছু ফার্ণিচার রাখা আছে, বন্ধই থাকে, তবে দরজার নিচের ফাঁকটা এমন, সাপও দিব্যি ঢুকে পড়তে পারবে ঘরটাতে। ঘরে ঢুকে গেছে, নিশ্চিন্তি, এই ভেবে একটা তোয়ালে দরজার নিচের ফাঁকে আটকে দিলাম।
আলনায় হপ্তাদুয়েকের জামাকাপড় ডাঁই হয়ে আছে, গত সপ্তাহে বাড়ি গিয়েছিলাম বলে কাচা হয়নি, পরদিন রোববার, সবক’টাকে ওয়াশিং মেশিনে ঢোকাতে হবে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন সকালে আলনা খালি করছি, আলনার পিছনে মেঝেতে পড়ে ছিল গত বছর পুজোয় দীপের দেওয়া সবুজ পিওর সিল্ক। সেটা তুলে ধরতেই গলা দিয়ে আপনা-আপনি একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। শাড়িটার প্রায় অর্ধেকটা কুচি কুচি করে কাটা। গত দু’দিন শান্তিমাসি কাজে আসেনি, আলনার পিছনে ঝাঁটা-ন্যাতা বোলানো হয়নি। সেখানে উঁকি মেরে দেখি আমার অত সুন্দর শাড়িটার কুচি কুচি টুকরো মেঝেয় খেলে বেড়াচ্ছে। রাগে, দুঃখে কি করব বুঝতে না পেরে দীপকে ফোন করে ফেললাম। ইঁদুরদের যখন কব্‌জা করতে পারছিনা, গায়ের ঝাল ঝাড়ার জন্য কাউকে তো লাগবেই! দীপই সবচেয়ে সহজ বালির বস্তা রাগ  মেটানোর জন্য! তা, সে বেচারা তখনো ঘুমের কোলে দুলছে, ঘুম-কানে ইঁদুরের উপাখ্যান ভালো করে বুঝতে না পেরে আমার চিৎকার থেকে রেহাই পেতে আবার ঘুমিয়ে পড়াই উচিত কাজ বলে মনে করল। ফোনটা কেটে তখন মনে হচ্ছে সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে যাই। কোনোরকমে বাকি জামাকাপড় কেচে রান্না বসালাম। ও, বলতে ভুলে গেছি, একটা নীল বাঁধনির ওড়নাও ওদের দাঁতের বাড় কমাতে কাজে লেগেছে।
দুপুরে খেতে বসে প্রতিজ্ঞা করলাম এদের শিক্ষা দিতেই হবে। শাড়িটার কথা ভেবে এখনো চোখে জল আসছে রে, ক’দিন আগেই ওটার সাথে ম্যাচিং একটা সেট কিনেছি। ঠিক করলাম বিকেলে ইঁদুর মারার বিষ কিনে আনতে হবে। ওই যেগুলো খেলে ইঁদুর বাড়ির বাইরে গিয়ে মরে, সেগুলোর মধ্যে কোনো একটা। বাড়িতে কিছু বলা যাবেনা। ইঁদুর মারা বিষ কিনছি শুনে মা আবার রাত্রে ঘুমোবেন না কিনা! যদি ভুল করে আমার খাবারে বিষ মিশে যায়! জানিসই তো, আমার মা Innovative দুশ্চিন্তায় গবেষণা করছেন।
বিকেল হতেই গেলাম পাড়ার দোকানে। দোকানদার শ্রী তপন ঘোষ কিছু কিছু কথা শুদ্ধ বাংলায় বলেন,
“ওইটি তো নেই দিদি, এইটি আছে, অব্যর্থ ঔষধ দিদি, ইঁদুর খাবে আর সেখানেই মরবে, বাইরে ছোটার অবকাশও পাবেনা”
আমার ‘ওইটি’ই চাই বলাতে ঘোষমশাই বললেন,
“দিদিভাই ‘ওইটি’ আপনি অবশ্যই কাল বৈকালে পেয়ে যাবেন, অ্যাই আমি খাতায় লিখে রাখলুম”
কিন্তু আমার তো আজই চাই, ভেবে শেষ পর্যন্ত বাজারেই গেলাম। একহাতে বিষের প্যাকেট, অন্যহাতে আলুর চপের ঠোঙা নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম, বুঝলি!
তেলেভাজার মধ্যে শুধু আলুর চপটাই আমি খেতাম না, ভেবেছিস ওটাও শুরু করেছি? উঁহু, ওটা ইঁদুরদের জন্য। বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব হলেই ছোট থেকে দেখে আসছি বাবা প্রথম ক’দিন আটা আর ইঁদুর-মারা ওষুধ একসাথে মেখে গুলি পাকিয়ে বাড়ির বিভিন্ন কোণে রেখে দেন আর রোজ সকালে খুব মন দিয়ে সেগুলোকে লক্ষ্য করেন, যদি একটা গুলিও ইঁদুরের পেটে গেছে বলে নজরে আসে! কিন্তু, অতি অনভিজ্ঞ শিশু ইঁদুরও ওগুলো ছোঁয় না। তখন আলুর চপে ওষুধ চটকে ইঁদুরদের জন্য মুখরোচক মারণ ওষুধ তৈরী করা হয়।
যাই হোক, আমি আর দেরি না করে প্রথমেই আলুর চপের রাস্তায় হাঁটলাম। ডিনারের পর হাতে গ্লাভ্‌স পরে চপের সাথে ওষুধ মেখে দু’তিনটে গোল্লা পাকিয়ে রান্নাঘরে, বন্ধ ঘরটার সামনে, আর আমার শোবার ঘরের কোণে রেখে দিলাম। বিজ্ঞাপনে দেখেছি এই ওষুধটা খেয়ে ইঁদুর বাড়ির বাইরে গিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে, তা-ও একটু ভয়ে ভয়ে রইলাম, কি জানি, পরেরদিন সন্ধেয় গন্ধে টিকতে পারব তো?
পরদিন সোমবার, প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ঘুম ভাঙে। ঢুলতে ঢুলতে টুথব্রাশ মুখে নিয়ে শান্তিমাসিকে দরজা খুলে দিয়েই মনে পড়ল রেজাল্ট দেখতে হবে। আলুর চপে কামড় পড়েছে কিনা।
“এঃ হে দিদি, ঝ্যাঁটায় কি একটা চটকে গেল গো, তরকারি ফেলেছ নাকি মেঝেয়?”
দেখি শান্তিমাসির হাতে ঝাড়ুর আগায় চপ-ওষুধ মাখানো। বাকিটুকু মেঝেতে লেপ্টে আছে। ইঁদুরে আদৌ খেয়েছে কিনা বোঝা গেল না। রান্নাঘরের আর আমার ঘরের স্যাম্প্‌লগুলো যেমন ছিল তেমনই আছে, ছুঁয়েও দেখেনি।
“মাসি, ওগুলো ইঁদুর মারার ওষুধ। চপের সাথে মিশিয়ে রেখেছি। ওগুলো বাঁচিয়ে ঝ্যাঁটা-ন্যাতা বুলিও, ওগুলো যেন চটকে না যায়। ইঁদুরে খেয়েছে কিনা বুঝতে পারছিনা, রাখা থাক আজ যদি খায়”
“ন্যাও, এবার ইঁদুর মরে আলমারির নিচে পচে থাকবে, আর আমায় সাতসকালে এসে সেসব ফেলতে হবে? আচ্ছা ঝকমারি!” গজগজ করতে করতে মাসি ঘরদোর পরিষ্কার করতে লাগল। আমিও কথা না বাড়িয়ে ব্রেকফাস্ট আর মাসির চা রেডি  করতে লাগলাম।
ঘণ্টাখানেক পর, বুঝলি, মাসি চলে গেছে, আমিও চান-টান সেরে স্যাণ্ডুইচ, ওমলেট আর চা নিয়ে জুত করে বসেছি, হঠাৎ ম্যাগাজিনের বাক্স থেকে খচমচ আওয়াজ। তার মানে, ক্ষুদে শয়তানগুলো ঘাপটি মেরে বাক্সে বসে আমার জলখাবার খাওয়া দেখছে! এবার আমি মজা দ্যাখাবো! গোটা বাক্স ধরে টেনে বাড়ির বাইরে বের করে দেব। চুলোয় যাক আমার সব পুরনো ম্যাগাজিন। আপদগুলো তো বিদেয় হবে। এসব ভেবে কুর্তির আস্তিন গুটিয়ে যেই  উঠতে গেছি, তুড়ুক করে কি একটা বেরলো বাক্স থেকে। মা গো! অতি বদখৎ চেহারার একটা কালচে নেংটি ইঁদুর। সেটাকে দেখেই এতক্ষণের প্রতিশোধ স্পৃহা আর সাহস দুটোই একটু কমে এল আমার। ও মা, একটু পর দেখি টুক টুক করে আরো দুখানা ইঁদুর বেরিয়ে আগেরটার পাশে দাঁড়াল। আমি কেমন ভেবলে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, আমার সামনে দিয়ে তিনটেয় মিলে দিব্যি মার্চপাস্ট করতে করতে এগিয়ে গেল ফ্ল্যাটের মেন দরজার দিকে।
জানিস, নিশ্চয়ই আমার মনের ভুল, মনে হল দরজার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনটেই আমার দিকে একবার করে কাতরচোখে তাকিয়ে নিলো। ভিটেছাড়া হয়ে নিশ্চয়ই ইঁদুরদের কষ্ট অভিমান হয় না। হয় কি??
ইঁদুরগুলোকে চোখের সামনেই বেরিয়ে যেতে দেখলাম। যেভাবে নাজেহাল করছিল আমায় ক’দিন ধ’রে, আমার তো এখন আনন্দে ডিগবাজি খাওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানিনা আনন্দটা পুরোমাত্রায় হচ্ছেনা। প্রথমত, জানিনা এখনও বাড়িতে আর ইঁদুর রইল কিনা, দ্বিতীয়ত, এই, আগেই বলছি, হাসবি না খবরদার, দ্বিতীয় কারণ, মনটা বড্ড খালি খালি লাগছে। ইঁদুর আছে নাকি নেই, থাকলে কিভাবে সরানো যায়, এসব ভেবে ক’টা সন্ধে বেশ কেটে গেল তো, আজ থেকে আবার বাড়ি ফিরে চুপচাপ একা একা নিজের কাজ করে যাওয়া। শুনলে তোর মনে হবে ন্যাকামো, কিন্তু এই ক’দিন অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে আরো কয়েকটা প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেতাম। হোক না কাগজ কাটা- কাপড় কাটা কেলেকুচ্ছিৎ নেংটি ইঁদুর, তবু তো বাড়িতে কিছু প্রাণী বাস করত।
সারা সন্ধে একা একা থাকা, দীপকে ফোন করলে “মিটিং-এ আছি পরে কথা বলব” কিংবা “সন্ধেয় কিছু কাজকর্ম তো করতে পারো আমায় ফোন না করে”, বাড়িতে ফোন করলে মায়ের কাছে সংসারের নানান ঝামেলার কথা শোনা আর মাঝেমাঝে মায়ের গলা ধরে আসা, দিনের পর দিন এই রুটিন কারই বা ভাল লাগে বল?
সারাদিন তো কাজেকর্মে আর কথায় ডুবে থাকি, তাইজন্যই বোধহয় সন্ধেগুলো একদম একা হয়ে আর কিছুতেই কাটতে চায় না। দীপের সাথেও সারাদিনে হয়তো মিনিটদশেকের জন্য কথা হয়, কোনোদিন সেটারও সময় থাকেনা। সারাদিন আমি ওর ফোনের ডাকে সাড়া দিতে পারিনা, বিকেলে দেখি ৫-৬ টা করে মিস্‌ড কল, আমার যখন কল করার সময় হয়, ততক্ষণে ও ঢুকে পড়েছে অফিসের ঘেরাটোপে। আমরা রয়েছি হাজারদুয়েক কিলোমিটার দূরত্বে, ওয়ার্কিং আওয়ারগুলোও যদি দুজনের ম্যাচ করত তাও নাহয় হত। এভাবে কদ্দিন চলবে জানিনা রে। আজকাল আমাদের কথা মানেই ঝগড়া, জানিস! দেখা হয় বছরে দু’বার, পুজোয় আর বছরশেষে। এভাবে কি একটা রিলেশন চলে? হয়ত চলে, চালাতে হয়! দুই বাড়িতেই বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে, আমরাই আলোচনাটা এগোতে দিচ্ছি না। সম্পর্কটাকে দানা বাঁধতে দিতে ভয় পাচ্ছি বোধহয় দুজনেই। কেউই মুখে কিছু বলছি না ঝগড়ার ভয়ে। তুই তো প্রতি সোমবার মন্দিরে যাস পুজো দিতে, আমাদের রিলেশনটার রেজাল্টের কথা দেবাদিদেবকে জিজ্ঞেস করিস তো! দেখি উনি ভাল কোনো খবর দিতে পারেন কিনা!
এখন আমি মাঝেমাঝে ভাবছি সাদা ইঁদুর বা গিনিপিগ পুষলে কেমন হয়? ইঁদুরের দাঁত বেড়ে যাওয়াটা একটা সমস্যা বটে, কিন্তু যদি উলের বল বানিয়ে দিই পোষা সাদা ইঁদুরটাকে?একটা বল কেটে কুচি করলে আরেকটা বল- এইভাবে চলতে থাকবে। তবে হ্যাঁ, পুষলে যে কোন একপিস। একটা সাদা ইঁদুর, বা একটা গিনিপিগ। দুটো প্রাণীকে একসাথে আনলেই তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-খুনসুটি-খেলাধুলো করতে আরম্ভ করবে, আর আমি আবার একলা আলাদা হয়ে বসে থাকব।
আমার ইঁদুর পোষার আইডিয়াটা কেমন প্লিজ জানাস। একটু তাড়াতাড়ি উত্তরটা পাঠাস।।


('আমি অনন্যা' পত্রিকা [ISSN:2394-4307], ধানবাদ- Oct-Dec '2015 সংখ্যায় প্রকাশিত)

Sunday, 31 July 2016

বিকু-বোম্বার ব্যাট্‌ল্‌

(এটা আমার বছরখানেক আগে লেখা একটা গল্প। গত বছর আমার এক বন্ধুর অনুরোধে হায়দ্রাবাদের একটি পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। পত্রিকাটির শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত সেই গল্প এখানে টুকে রাখলাম, আমার ব্লগের বন্ধুদের জন্য।)

বড়দিনে তিনাই আর বিকু বাবা মা তানুমাসি মেসোর সঙ্গে দেওঘর যাচ্ছে এস্দা-বুই এক্সপ্রেসে করে হ্যাঁ সত্যি ট্রেনটার এটাই নাম বাবা যখন টিকিট কাটছিল পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছে Sdah Bui Exp. পরেরদিন সকালে টেবিলে বসে মায়েদের ট্রেনের নামটা বলতেই হাসির চোটে মার মুখ থেকে চা পড়ে বিকুর জামা ভিজে একসা এদের এত হাসি কেন পায় বোঝা যায় না।
তিনাইয়ের পরীক্ষা শেষ 24তারিখ আর সেদিনই বেলা দেড়টায় ট্রেন তাই মায়ের বকুনি খেয়েও সাতদিন আগে থেকে ব্যাগ গুছিয়েছে ভালো জামা চারটে আর বাড়িতে পরার দুটো নেবে, সাথে ম্যাচিং ক্লিপ আর চুড়ি কমলা বাটারফ্লাই ক্লিপটা নতুন, তাই কমলা তুলতুলে জামাটা নিচ্ছিল কিন্তু বিকু কমলা রং সহ্য করতে পারেনা যতবার তিনাই জামাটা ব্যাগে ভরেছে, ও বের করে খাটের নিচে ফেলে দিয়েছে তিনাই একবার কান মুলতে গিয়ে হাতে কামড় খেয়ে আর ঘাঁটায়নি

24 ডিসেম্বর বাড়ির সবাই পরীক্ষার পর তিনাইকে স্কুল থেকে তুলে সোজা শিয়ালদহ স্টেশন চলে যাবে এরকমই ঠিক হয়েছিল স্কুলড্রেস পরে বেড়াতে যাওয়া তিনাই একদম পছন্দ করে না ভেবে রেখেছিল ট্যাক্সি তে উঠে বায়না করে গোলাপী ফ্রক পরবে, কিন্তু পরীক্ষায় বিহারের রাজধানী আর পশ্চিমবঙ্গের হিল স্টেশন দুটোরই উত্তর দেওঘর বলেছে, শুনে মিস বললেনদেওঘরে খুব ভাল প্যাঁড়া পাওয়া যায়। খাবি, বুদ্ধি খুলবে এসব কথা মা জানেনা, ফ্রক পাল্টানোর বায়না শুনে মায়ের প্রশ্ন শুরু হলে মুশকিলে পড়ে যাবে। তাই চুপ করে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
শিয়ালদা স্টেশনে এসে হুড়োহুড়ি করে সবকটা ব্যাগ, তিনাই আর বিকুকে গুণে গেঁথে মা মাসি সমেত S3 তে বসিয়ে বাবা আর মেসো স্টেশনে বেড়াতে নামলেন। ট্রেন ছাড়তে নাকি মিনিট দশেক বাকি আছে। জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে তিনাই দেখতে পেলো বাবা একটা কালো জামা পরা গোঁফওয়ালা লোকের সাথে কথা বলছেন, পাশে মেসো দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছেন। জানলার ধারে বসবে বলে বিকু সমানে ঠেলতে লাগল বলে তিনাইকে সরে আসতে হল, বাবাদের আর দেখা হল না।
ট্রেন ছাড়ার একটু পরেই কেমন একটা ঢুলুনি মতন এল তিনাইয়ের। মায়ের ব্যাগে নতুন গুড়ের কাঁচাগোল্লা আছে, ওগুলো এবার দিতে পারে তো, তা নয়, খালি নিজেরা বকবক করে যাচ্ছে! তিনাইয়ের একটুও ভালো লাগছিল না, এমন সময়ে বিকুরমা ক্ষিদে, গোল্লা খাবোচিৎকারে মায়ের খেয়াল হল।
বিকু তোর গোল্লা ক্ষিধে পেয়েছে? অন্য ক্ষিধে নয়?” মেসোর প্রশ্নের উত্তরে বিকু একটু লাজুক হেসে চুপ করে রইল। কাঁচাগোল্লাকে বিকুগোল্লাবলে, আর গোল্লা খেতে বড় ভালবাসে।
গোল্লার বাক্স শেষ হওয়ার পর কে কি কথা বলছে তিনাই সেসব আর কিছু শুনতে পায়নি। বাবার গায়ে হেলান দিয়ে কখন যেন ঘুমে কাদা হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গলো।
মা, মা আর মাসি হাউহাউ করে কাঁদছে কেন? “মা গো, কি সর্বনাশ হল? ঠাকুর, রক্ষা করো। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে বেরিয়েছি, তুমি দেখো ঠাকুর, বলছিনা চুপ করে বসে থাক্কোলেমা বিকুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন আর বিকুকে বকুনি দিচ্ছেন। বিকু খুব বিরক্ত হয়ে কোল থেকে নামার চেষ্টা করে চলেছে মাসি সিটে পা তুলে দুটো ব্যাগ বুকে চেপে হাতজোড় করে বসে আছেন। বাবার দিকে তাকিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময়ে
একটাও আওয়াজ যেন না শুনি। যার কাছে যা টাকাপয়সা সোনাদানা, ধুৎ, সোনা তো আজকাল কেউ পরে না, যাক গে, যা আছে সব এই ব্যাগটায় ফেলুন দেখি! আহা, দিদিরা মাসিমারা কাঁদেন কেন, আমার আবার চোখের জলে একটু ইয়ে আছে, দেখছেন না, আমারো চোখগুলো জলে ভরে যাচ্ছে!”
বোম্বাদা, তুমি রুমাল নিয়ে ওধারে সরো তো, আমি ঝটাপট ব্যাগ ভত্তি করি। বেশি না ভেবে দামী জিনিস সব ফেলুন ব্যাগে, কি বলে, ওই, মুক্তহস্তে দান করুন। জানেন তো, ‘যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে’! আজ বোম্বাদার নামে দান করুন, কাল পকেট ভরে আমদানি হবে
শুঁটকো চেহারার লোকটা হাতে বন্দুক নাচাতে নাচাতে ব্যাগ নিয়ে মাসির সামনে এসে দাঁড়ালো এবার। আর তখনই
এইত্তো আমার ক্যাপ। তোমরা কেউ পুজোয় আমায় ক্যাপ কিনে দিলেনা মা ভয় পায় বলে, এই কাকুটা কত্ত ভাল, আমার জন্য ক্যাপ বন্দুক এনেছে। দাও দাও ওটা আমারবলতে বলতে বিকু মায়ের কোল থেকে ঝাঁপিয়ে শুঁটকোর কোলে উঠে বন্দুক নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করল। শুঁটকোর একহাতে ব্যাগ একহাতে বন্দুক, গলা ধরে ঝুলে আছে বিকু। কি করবে বুঝতে না পেরে যেই বিকুর হাত ধরতে গেছে, ব্যস, বন্দুক চলে এল বিকুর হাতে।
ডাকাত সর্দার বোম্বাদা চোখ মুছে এসে দেখল পয়লা শাগরেদ ময়লা বোঁচা একহাতে ব্যাগ আরেক হাতে একটা বছরতিনেকের ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ময়লার পিস্তলটা বাচ্চাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। দুই আর তিন নম্বর শাগরেদ ডাকাতি ভুলে পয়লাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বাচ্চাটাকে তুতিয়ে পাতিয়ে বন্দুকটা নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। প্যাসেঞ্জাররা হরিনাম জপছে, শুধু একটা বাচ্চা মেয়ে, বোধহয় এইটার দিদি, খিলখিল করে হাসছে আর হাততালি দিয়ে বলছেবিকু ডাকাত, বিকু ডাকাত, সব ডাকাত কুপোকাৎ
চোপ্‌! সব্বাই মুখ বন্ধ কর্ নইলে কিন্তু আমি টেরেন উড়িয়ে দেবো। বোম্বার সঙ্গে ইয়ার্কি? এই বোম্বা একহাতে চাকু একহাতে পেটো নিয়ে টেরেনে একসান করে বড় হয়েছে মাসিমা-দিদিমার চোখের জল সহ্য হয়না বলে ভাববেন না বোম্বার মন দুব্বল। এই বাচ্চাটাকে আছড়ে ফেলে বন্দুকটা কাড়তে আমার দুমিনিট লাগবে, বুঝলেন দাদারা? ফেলব নাকি?” হাত-পা নাচিয়ে বোম্বা কথাগুলো শেষ করতেই মা আর মাসি ককিয়ে কেঁদে উঠল। মেসোতবে রেবলে তেড়ে যাচ্ছিলেন, বাবা হাত ধরে থামালেন।  “মাথা গরম করে লাভ নেই পার্থ, ঠাণ্ডা মাথায় বিকুকে বাঁচাতে হবেফিসফিস করে বলা বাবার কথাগুলো শুনে তিনাইয়ের গলা ব্যথা করতে লাগল। বিকুকে বাঁচাতে হবে মানে? কি করবে ডাকাতগুলো বিকুকে? ওরা তো ওকে কিডন্যাপ করেনি? বিকুটা তো নিজেই পাকামো করে শুঁটকোর কোলে চেপে বসল যেন ক্যাপ বন্দুক দেখেনি কখনো! এখন কি হবে? বন্দুক না দিলে যদি ওরা সত্যি আছাড় মারে ভাইকে? কান্না আটকাতে গিয়েও তিনাই আর পারলো না, চোখ ঝাপসা হয়ে দুচোখ ছাপিয়ে জল চলে এল।  নেহাৎ ক্লাস থ্রি তে পড়ে, তাই ভ্যাঁ করে কাঁদলো না, বাবার কোলে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে লাগলো।
কম্পার্টমেণ্টে ডাকাতি হয়েও হচ্ছে না, ডাকাতের বক্তৃতা শোনা যাচ্ছে কেন, খোঁজখবর নিতে অন্যান্য বার্থের লোকজন এবার সাহস করে তিনাইদের বার্থের কাছে জড়ো হল। ডাকাতি না হলে নিজেদের পয়সাকড়ি হিসেব করে ফেরৎ নিতে হবে তোএসেই দৃশ্য দেখতে পেলো সবাই বিকুকে ডাকাতের কোলে দেখে দুতিনজনডাকাতির সাথে বাচ্চা পাচারও করছে রে, দে ধোলাই সবকটাকেবলে ময়লা বোঁচার দিকে ধেয়ে যাচ্ছিলো, হঠাৎ বিকুর হাতে বন্দুক দেখে কি করবে বুঝতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো। বিকু আবার তখনই বন্দুকটা সবার দিকে তাক করে মুখেঢিঁচ্যাঢিঁচ্যাঢিঁচ্যাআওয়াজ করতে লাগল। তিনাই ফোঁপাতে ফোঁপাতে শুনতে পেল বাবা দাঁতে দাঁত ঘষে বলছেনবাঁদর ছেলে! হাতে পাই একবার, পিঠের ছাল তুলব
মেসো বসে হাত কামড়াচ্ছেন, মা কেঁদে কেঁদে মাসির কোলে প্রায় অজ্ঞান, বোম্বাসর্দার সমানে তড়পে যাচ্ছেবাচ্চাটাকে আছড়ে ফেলববলে, কিন্তু গুলিভরা বন্দুকের ভয়ে কিংবা ঘিরে থাকা প্যাসেঞ্জারদের ভয়ে, যে কারণেই হোক, আছাড় মারতে পারছে না বলে রাগে গরগর করছে।  বিকু এখন হাসিহাসি মুখ করে ময়লা বোঁচার রগের কাছে পিস্তলটা ঠেকিয়ে মাঝেমাঝেআক্কেল গুড়ুমবলে হাঁক পাড়ছে আরক্যাপ বন্দুকএর ট্রিগার টেপার চেষ্টা করছে বিকাশজেঠুর কাছে শুনেছে কথাটা। মানে জানে না, তবেগুড়ুমআছে তো, বন্দুক জাতীয় কিছু হবে নিশ্চয়ই
কিছুক্ষণ পিস্তলের নলের খোঁচা খেয়ে ময়লা বোঁচার মাথাটা হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল।  মনে পড়ল কাল রাত্রে গুলিগুলো বালিশের নিচে নিয়ে শুয়েছিল, রোজ রাত্রে যেমন শোয়। আজ সকালে উঠে দেখে উচ্ছে আর বিচ্ছু, দুই শয়তান ভাইপো পিস্তলটা নিয়ে লোফালুফি খেলছে। দেখেই লাফিয়ে পড়েছিল পিস্তলটা ওদের হাত থেকে কাড়বে লে। সেইটে উদ্ধার করেই তো সোজা চলে এসেছে বোম্বাদার ডেরায়। তার মানে, তার মানে, গুলিগুলো তো বালিশের নিচেই রয়ে গেছে!
মার দিয়া কেল্লা মার দিয়া কেল্লা একশোয় পাওয়া গেলো গোল্লাগাইতে গাইতে বিকুকে কোলে  নিয়েই একপাক ঘুরে নিলো বোঁচা। খুব আনন্দ হলে ছোটবেলা থেকেই এই গানটা গায় 
এত ফূর্তি কিসের? গুলি না খেয়েই মাথা গেল? তোকেও আছাড় মারব নাকি?”
গুরু, গুলি  বালিশের নিচে! এটা খালি গো এটা খালি। আহ্‌, বেঁচে গেলাম গো গুরু, এই বিট্লের হাতে গুলি খেয়ে মরলে পেস্টিজ দাউন হয়ে যেত গো, মুখ দেখাতে পারতাম না লজ্জায়”  
এটা খালি!!!” দশ-বারোটা গলা একসাথে চিৎকার করে উঠল। হতভম্ব বোম্বাদা পকেট থেকে চাকু বের করতে গিয়ে বুঝল দেরি হয়ে গেছে। দুদিক থেকে দুজন এসে সর্দারের দুটো হাত চেপে ধরল। বোঁচাকে কবজা করেছেন তিনাই-বিকুর বাবা আর মেসো। বাকি দুজন, মানে, সন্তু আর ফাটকা তো দুধভাত। ওরা নিজেরাই সিটে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। আহা! বেচারারা লাইনে নতুন, গণধোলাইয়ের গল্প অনেক শুনেছে, আজ প্রথমবার ওদের কপালে জুটবে লে ভয় পাচ্ছে
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ওদের চারজনের কারো ভাগ্যেই গণধোলাই জুটল না। সিনেমায় অ্যাকশান সিনের ক্লাইম্যাক্সে যেভাবে পুলিশবাহিনী উপস্থিত হয়, তিনাইদের কম্পার্টমেণ্টে সেইভাবে ঢুকলেন কালো-কোট টিকিট পরীক্ষক, সঙ্গে পাঁচজন পুলিশ। ভদ্রলোক যখন ডাকাতির খবর পান, তখন এসি কোচে ছিলেন। পুলিশ জোগাড় করে আসতে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।
সবকটাই ধরা পড়েছে তো? শুনলাম নাকি ট্রেন ওড়াবে বলে হুমকি দিচ্ছিল? ব্যাগ সার্চ করে দেখেছেন বোমা-টোমা  কিছু আছে কিনা?”
এবার বাবা মুখ খুললেনআমরা মশাই সাধারণ মানুষ, ডাকাতের ব্যাগ সার্চ করা তো দূরের কথা, তাদের টিকি ছোঁওয়ারও বুকের পাটা আমাদের আছে নাকি? নেহাৎ আমার বাচ্চা ছেলেটা ডাকাতের কোলে উঠে বন্দুকটা বাগালো, তাই তো এদের আপনারা এসে দেখতে পেলেন। নইলে এখন আমাদের কপাল চাপড়াতে হত
ডাকাতের কোলে? বাবা, তো খাসা ছেলে! দেখি সোনা, কোলে এসো  তো, কি সাহস এই বয়সে!”
তোমার কোলে যাব কেন? তোমার কাছে ক্যাপ বন্দুক আছে? ওই কাকুর কাছে কত ভালো বন্দুক আছে। দাও না, দাও নাকরে বিকু আবার বায়না শুরু করল  
এরপরের ঘটনাগুলো পরপর ঘটে গেল। বিকুর বায়নায় অতিষ্ঠ হয়ে বাবা ঠাস করে চড় বসালেন ওর গালে চড় খেয়ে বিকু চিৎকার জুড়লো আর পুলিশের হাত থেকে বোঁচার বন্দুক কাড়ার চেষ্টা করতে লাগল। টিকিট পরীক্ষক হৈ হৈ করে উঠলেনএই এই, না বাবা, বন্দুক নয়, আরে হাতের ছাপ রয়ে যাবে যে! সেই ছাপ টেনে এনে বাচ্চাটাকে থানা-পুলিশ-কোর্ট-কাছারি করাবে রে, হে হে”! ব্যস, আর যায় কোথায়! রে রে করে তেড়ে এল কম্পার্টমেণ্টের লোকজন।
ইয়ার্কি পেয়েছেন? ডাকাত ধরার কাজ রেলের আর পুলিশের, আপনারা তো ডাকাত পড়ার কথা শুনে ভয়ে ঠাণ্ডা গাড়িতে সেঁধিয়েছিলেন,”
ওইটুকু ছেলে, বুঝে হোক, না বুঝে হোক, ডাকাতগুলোকে আটকেছিল, ওর জন্যই আমরা সর্বস্ব ফিরে পেলাম, এখন আপনারা দুধের শিশুকে থানা-পুলিশ দেখাচ্ছেন?”
হিউম্যান রাইট্ কমিশনের নাম শুনেছেন? ক্রেতা সুরক্ষা আদালত কি জিনিস জানেন? নিজেদের নাম দেখতে চান ওসব জায়গায়?”

টিকিট পরীক্ষক ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছিলেন, আর পারলেন না, হাত জোড় করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন বিকুর কাছে। বিকু তখন মায়ের পাশে বসে খুব মন দিয়ে ক্রিম বিস্কুটের ক্রিম চেটে চেটে খাচ্ছে।