Friday, 25 November 2016

একটা একলা গল্প

লিখি লিখি করেও বেশ ক’দিন  কেটে গেল তোকে লিখতে বসা হয়নি। Compose Mail এ ঢুকেও কোনো না কোনো সমস্যায় ল্যাপি বন্ধ করে দিতে হয়েছে রোজই। কোনোদিন পাওয়ার অফ তো কোনোদিন দীপের সঙ্গে ঝগড়া করে ফোন মুড দুটোই অফ, এইসব আর কি! আজ আমি ফোন অফ করে লিখতে বসেছি। আজ তোকে লিখবোই।
মনে আছে তোর, হস্টেলে একবার ইঁদুরের প্রবল উৎপাত শুরু হয়েছিল? রান্নাঘরের যত প্লাস্টিকের কৌটো কেটে টুকরো করছিল? আমার দুটো ওড়না ওদের কবলে গিয়েছিল, তুই সান্ত্বনা দিয়েছিলি আমায়, “ওরা এটা জেনেবুঝে করেনি, তুই তো ওদের ব্যক্তিগত শত্রু নোস, তাছাড়া এই কাটাকুটিগুলো না করলে ওরা বাঁচবে না রে”,
পেস্ট-ক্লেশনিবারণী সমিতির সভানেত্রী বানিয়েছিলাম তোকে তক্ষুণি।
তোর সেই আদরের Jerry-রা গত কিছুদিন ধরে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
উৎপাতের শুরু মাসখানেক আগে। তুই তো জানিস, পুরনো ম্যাগাজিন জমানো আমার স্বভাব। মাইক্রোওয়েভের বাক্সটায় সব জড়ো করা থাকে। একদিন মাঝরাত্রে বাক্সের ভেতর থেকে খুটখাট আওয়াজ এল। তখন উঠে তদন্ত করার প্রশ্নই ওঠে না, চাদরে কান ঢেকে উল্টোদিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সন্ধেয় রান্নাঘরে দেখি দুটো ডালের ঠোঙা ফাটা, শেল্‌ফে ডাল ছড়ানো। আগের রাত্রের আওয়াজটার কথা মনে পড়ল। বাক্স ঘেঁটে কোনো প্রাণী চোখে পড়ল না, তবে বেশ কিছু পত্রিকা কুচি কুচি করে কাটা। বুঝলাম Jerries are back in my life. কিন্তু শ্রীমুখ দর্শন হল না। বাবাজিরা এখন কোথায় কম্ম সারছেন তাঁরাই জানেন। আমি লেগে পড়লাম বই ঝাড়াইয়ের কাজে। এরপর দিনকয়েক কোথাও কিছু চোখে পড়লনা। একদিন অফিস থেকে ফিরে চা নিয়ে টিভি চালিয়ে বসেছি, সাঁ করে কী একটা ঢুকে গেল ছোট ঘরের ভেতরে। ওই ঘরটায় বাড়িওয়ালার কিছু ফার্ণিচার রাখা আছে, বন্ধই থাকে, তবে দরজার নিচের ফাঁকটা এমন, সাপও দিব্যি ঢুকে পড়তে পারবে ঘরটাতে। ঘরে ঢুকে গেছে, নিশ্চিন্তি, এই ভেবে একটা তোয়ালে দরজার নিচের ফাঁকে আটকে দিলাম।
আলনায় হপ্তাদুয়েকের জামাকাপড় ডাঁই হয়ে আছে, গত সপ্তাহে বাড়ি গিয়েছিলাম বলে কাচা হয়নি, পরদিন রোববার, সবক’টাকে ওয়াশিং মেশিনে ঢোকাতে হবে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী পরদিন সকালে আলনা খালি করছি, আলনার পিছনে মেঝেতে পড়ে ছিল গত বছর পুজোয় দীপের দেওয়া সবুজ পিওর সিল্ক। সেটা তুলে ধরতেই গলা দিয়ে আপনা-আপনি একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। শাড়িটার প্রায় অর্ধেকটা কুচি কুচি করে কাটা। গত দু’দিন শান্তিমাসি কাজে আসেনি, আলনার পিছনে ঝাঁটা-ন্যাতা বোলানো হয়নি। সেখানে উঁকি মেরে দেখি আমার অত সুন্দর শাড়িটার কুচি কুচি টুকরো মেঝেয় খেলে বেড়াচ্ছে। রাগে, দুঃখে কি করব বুঝতে না পেরে দীপকে ফোন করে ফেললাম। ইঁদুরদের যখন কব্‌জা করতে পারছিনা, গায়ের ঝাল ঝাড়ার জন্য কাউকে তো লাগবেই! দীপই সবচেয়ে সহজ বালির বস্তা রাগ  মেটানোর জন্য! তা, সে বেচারা তখনো ঘুমের কোলে দুলছে, ঘুম-কানে ইঁদুরের উপাখ্যান ভালো করে বুঝতে না পেরে আমার চিৎকার থেকে রেহাই পেতে আবার ঘুমিয়ে পড়াই উচিত কাজ বলে মনে করল। ফোনটা কেটে তখন মনে হচ্ছে সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে যাই। কোনোরকমে বাকি জামাকাপড় কেচে রান্না বসালাম। ও, বলতে ভুলে গেছি, একটা নীল বাঁধনির ওড়নাও ওদের দাঁতের বাড় কমাতে কাজে লেগেছে।
দুপুরে খেতে বসে প্রতিজ্ঞা করলাম এদের শিক্ষা দিতেই হবে। শাড়িটার কথা ভেবে এখনো চোখে জল আসছে রে, ক’দিন আগেই ওটার সাথে ম্যাচিং একটা সেট কিনেছি। ঠিক করলাম বিকেলে ইঁদুর মারার বিষ কিনে আনতে হবে। ওই যেগুলো খেলে ইঁদুর বাড়ির বাইরে গিয়ে মরে, সেগুলোর মধ্যে কোনো একটা। বাড়িতে কিছু বলা যাবেনা। ইঁদুর মারা বিষ কিনছি শুনে মা আবার রাত্রে ঘুমোবেন না কিনা! যদি ভুল করে আমার খাবারে বিষ মিশে যায়! জানিসই তো, আমার মা Innovative দুশ্চিন্তায় গবেষণা করছেন।
বিকেল হতেই গেলাম পাড়ার দোকানে। দোকানদার শ্রী তপন ঘোষ কিছু কিছু কথা শুদ্ধ বাংলায় বলেন,
“ওইটি তো নেই দিদি, এইটি আছে, অব্যর্থ ঔষধ দিদি, ইঁদুর খাবে আর সেখানেই মরবে, বাইরে ছোটার অবকাশও পাবেনা”
আমার ‘ওইটি’ই চাই বলাতে ঘোষমশাই বললেন,
“দিদিভাই ‘ওইটি’ আপনি অবশ্যই কাল বৈকালে পেয়ে যাবেন, অ্যাই আমি খাতায় লিখে রাখলুম”
কিন্তু আমার তো আজই চাই, ভেবে শেষ পর্যন্ত বাজারেই গেলাম। একহাতে বিষের প্যাকেট, অন্যহাতে আলুর চপের ঠোঙা নিয়ে বাড়ি ঢুকলাম, বুঝলি!
তেলেভাজার মধ্যে শুধু আলুর চপটাই আমি খেতাম না, ভেবেছিস ওটাও শুরু করেছি? উঁহু, ওটা ইঁদুরদের জন্য। বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব হলেই ছোট থেকে দেখে আসছি বাবা প্রথম ক’দিন আটা আর ইঁদুর-মারা ওষুধ একসাথে মেখে গুলি পাকিয়ে বাড়ির বিভিন্ন কোণে রেখে দেন আর রোজ সকালে খুব মন দিয়ে সেগুলোকে লক্ষ্য করেন, যদি একটা গুলিও ইঁদুরের পেটে গেছে বলে নজরে আসে! কিন্তু, অতি অনভিজ্ঞ শিশু ইঁদুরও ওগুলো ছোঁয় না। তখন আলুর চপে ওষুধ চটকে ইঁদুরদের জন্য মুখরোচক মারণ ওষুধ তৈরী করা হয়।
যাই হোক, আমি আর দেরি না করে প্রথমেই আলুর চপের রাস্তায় হাঁটলাম। ডিনারের পর হাতে গ্লাভ্‌স পরে চপের সাথে ওষুধ মেখে দু’তিনটে গোল্লা পাকিয়ে রান্নাঘরে, বন্ধ ঘরটার সামনে, আর আমার শোবার ঘরের কোণে রেখে দিলাম। বিজ্ঞাপনে দেখেছি এই ওষুধটা খেয়ে ইঁদুর বাড়ির বাইরে গিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে, তা-ও একটু ভয়ে ভয়ে রইলাম, কি জানি, পরেরদিন সন্ধেয় গন্ধে টিকতে পারব তো?
পরদিন সোমবার, প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ঘুম ভাঙে। ঢুলতে ঢুলতে টুথব্রাশ মুখে নিয়ে শান্তিমাসিকে দরজা খুলে দিয়েই মনে পড়ল রেজাল্ট দেখতে হবে। আলুর চপে কামড় পড়েছে কিনা।
“এঃ হে দিদি, ঝ্যাঁটায় কি একটা চটকে গেল গো, তরকারি ফেলেছ নাকি মেঝেয়?”
দেখি শান্তিমাসির হাতে ঝাড়ুর আগায় চপ-ওষুধ মাখানো। বাকিটুকু মেঝেতে লেপ্টে আছে। ইঁদুরে আদৌ খেয়েছে কিনা বোঝা গেল না। রান্নাঘরের আর আমার ঘরের স্যাম্প্‌লগুলো যেমন ছিল তেমনই আছে, ছুঁয়েও দেখেনি।
“মাসি, ওগুলো ইঁদুর মারার ওষুধ। চপের সাথে মিশিয়ে রেখেছি। ওগুলো বাঁচিয়ে ঝ্যাঁটা-ন্যাতা বুলিও, ওগুলো যেন চটকে না যায়। ইঁদুরে খেয়েছে কিনা বুঝতে পারছিনা, রাখা থাক আজ যদি খায়”
“ন্যাও, এবার ইঁদুর মরে আলমারির নিচে পচে থাকবে, আর আমায় সাতসকালে এসে সেসব ফেলতে হবে? আচ্ছা ঝকমারি!” গজগজ করতে করতে মাসি ঘরদোর পরিষ্কার করতে লাগল। আমিও কথা না বাড়িয়ে ব্রেকফাস্ট আর মাসির চা রেডি  করতে লাগলাম।
ঘণ্টাখানেক পর, বুঝলি, মাসি চলে গেছে, আমিও চান-টান সেরে স্যাণ্ডুইচ, ওমলেট আর চা নিয়ে জুত করে বসেছি, হঠাৎ ম্যাগাজিনের বাক্স থেকে খচমচ আওয়াজ। তার মানে, ক্ষুদে শয়তানগুলো ঘাপটি মেরে বাক্সে বসে আমার জলখাবার খাওয়া দেখছে! এবার আমি মজা দ্যাখাবো! গোটা বাক্স ধরে টেনে বাড়ির বাইরে বের করে দেব। চুলোয় যাক আমার সব পুরনো ম্যাগাজিন। আপদগুলো তো বিদেয় হবে। এসব ভেবে কুর্তির আস্তিন গুটিয়ে যেই  উঠতে গেছি, তুড়ুক করে কি একটা বেরলো বাক্স থেকে। মা গো! অতি বদখৎ চেহারার একটা কালচে নেংটি ইঁদুর। সেটাকে দেখেই এতক্ষণের প্রতিশোধ স্পৃহা আর সাহস দুটোই একটু কমে এল আমার। ও মা, একটু পর দেখি টুক টুক করে আরো দুখানা ইঁদুর বেরিয়ে আগেরটার পাশে দাঁড়াল। আমি কেমন ভেবলে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, আমার সামনে দিয়ে তিনটেয় মিলে দিব্যি মার্চপাস্ট করতে করতে এগিয়ে গেল ফ্ল্যাটের মেন দরজার দিকে।
জানিস, নিশ্চয়ই আমার মনের ভুল, মনে হল দরজার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনটেই আমার দিকে একবার করে কাতরচোখে তাকিয়ে নিলো। ভিটেছাড়া হয়ে নিশ্চয়ই ইঁদুরদের কষ্ট অভিমান হয় না। হয় কি??
ইঁদুরগুলোকে চোখের সামনেই বেরিয়ে যেতে দেখলাম। যেভাবে নাজেহাল করছিল আমায় ক’দিন ধ’রে, আমার তো এখন আনন্দে ডিগবাজি খাওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানিনা আনন্দটা পুরোমাত্রায় হচ্ছেনা। প্রথমত, জানিনা এখনও বাড়িতে আর ইঁদুর রইল কিনা, দ্বিতীয়ত, এই, আগেই বলছি, হাসবি না খবরদার, দ্বিতীয় কারণ, মনটা বড্ড খালি খালি লাগছে। ইঁদুর আছে নাকি নেই, থাকলে কিভাবে সরানো যায়, এসব ভেবে ক’টা সন্ধে বেশ কেটে গেল তো, আজ থেকে আবার বাড়ি ফিরে চুপচাপ একা একা নিজের কাজ করে যাওয়া। শুনলে তোর মনে হবে ন্যাকামো, কিন্তু এই ক’দিন অফিস থেকে ফিরে বাড়িতে আরো কয়েকটা প্রাণীর অস্তিত্ব টের পেতাম। হোক না কাগজ কাটা- কাপড় কাটা কেলেকুচ্ছিৎ নেংটি ইঁদুর, তবু তো বাড়িতে কিছু প্রাণী বাস করত।
সারা সন্ধে একা একা থাকা, দীপকে ফোন করলে “মিটিং-এ আছি পরে কথা বলব” কিংবা “সন্ধেয় কিছু কাজকর্ম তো করতে পারো আমায় ফোন না করে”, বাড়িতে ফোন করলে মায়ের কাছে সংসারের নানান ঝামেলার কথা শোনা আর মাঝেমাঝে মায়ের গলা ধরে আসা, দিনের পর দিন এই রুটিন কারই বা ভাল লাগে বল?
সারাদিন তো কাজেকর্মে আর কথায় ডুবে থাকি, তাইজন্যই বোধহয় সন্ধেগুলো একদম একা হয়ে আর কিছুতেই কাটতে চায় না। দীপের সাথেও সারাদিনে হয়তো মিনিটদশেকের জন্য কথা হয়, কোনোদিন সেটারও সময় থাকেনা। সারাদিন আমি ওর ফোনের ডাকে সাড়া দিতে পারিনা, বিকেলে দেখি ৫-৬ টা করে মিস্‌ড কল, আমার যখন কল করার সময় হয়, ততক্ষণে ও ঢুকে পড়েছে অফিসের ঘেরাটোপে। আমরা রয়েছি হাজারদুয়েক কিলোমিটার দূরত্বে, ওয়ার্কিং আওয়ারগুলোও যদি দুজনের ম্যাচ করত তাও নাহয় হত। এভাবে কদ্দিন চলবে জানিনা রে। আজকাল আমাদের কথা মানেই ঝগড়া, জানিস! দেখা হয় বছরে দু’বার, পুজোয় আর বছরশেষে। এভাবে কি একটা রিলেশন চলে? হয়ত চলে, চালাতে হয়! দুই বাড়িতেই বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে, আমরাই আলোচনাটা এগোতে দিচ্ছি না। সম্পর্কটাকে দানা বাঁধতে দিতে ভয় পাচ্ছি বোধহয় দুজনেই। কেউই মুখে কিছু বলছি না ঝগড়ার ভয়ে। তুই তো প্রতি সোমবার মন্দিরে যাস পুজো দিতে, আমাদের রিলেশনটার রেজাল্টের কথা দেবাদিদেবকে জিজ্ঞেস করিস তো! দেখি উনি ভাল কোনো খবর দিতে পারেন কিনা!
এখন আমি মাঝেমাঝে ভাবছি সাদা ইঁদুর বা গিনিপিগ পুষলে কেমন হয়? ইঁদুরের দাঁত বেড়ে যাওয়াটা একটা সমস্যা বটে, কিন্তু যদি উলের বল বানিয়ে দিই পোষা সাদা ইঁদুরটাকে?একটা বল কেটে কুচি করলে আরেকটা বল- এইভাবে চলতে থাকবে। তবে হ্যাঁ, পুষলে যে কোন একপিস। একটা সাদা ইঁদুর, বা একটা গিনিপিগ। দুটো প্রাণীকে একসাথে আনলেই তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-খুনসুটি-খেলাধুলো করতে আরম্ভ করবে, আর আমি আবার একলা আলাদা হয়ে বসে থাকব।
আমার ইঁদুর পোষার আইডিয়াটা কেমন প্লিজ জানাস। একটু তাড়াতাড়ি উত্তরটা পাঠাস।।


('আমি অনন্যা' পত্রিকা [ISSN:2394-4307], ধানবাদ- Oct-Dec '2015 সংখ্যায় প্রকাশিত)

4 comments: